মন্তব্য

আমাদের কোনো দুঃখ নেই

প্রকাশ : ২৭ মে ২০১৯ | আপডেট : ২৭ মে ২০১৯ | প্রিন্ট সংস্করণ

আমাদের কোনো দুঃখ নেই

  সুমন্ত আসলাম

ফোনটা রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে চিৎকার করে উঠল মাসুক, 'আমাকে মাইরা ফালা, না হলে আমি নিজেই নিজেকে মাইরা ফালামু।'

'কী হয়েছে?' ঠাণ্ডা গলা আমার।

'রাত ৯টায় ছিনতাই হয়েছি আমি।'

'ছিনতাই হলে কথা বলছিস কীভাবে আমার সঙ্গে!'

'আমার কাছ থেকে সব ছিনতাই করা হয়েছে।' সরল অঙ্ক বোঝানোর মতো মাসুক বলল, 'যার সব ছিনতাই হয়, পক্ষান্তরে সে নিজেই তো ছিনতাই হয়ে যায়, তাই না?'

রেগে আছে মাসুক। তর্কে গেলাম না তাই। লঘু স্বরে বললাম, 'ঠিক।' আমি ওকে ঠাণ্ডা করার জন্য বললাম, 'পুরো ঘটনাটা খুলে বলা যাবে?'

'মগবাজারের ইনসাফ বারাকাহ কিডনি হাসপাতালে গিয়েছিলাম মেয়েকে নিয়ে। ডাক্তার দেখানো শেষে রাস্তার ওপাশ থেকে রিকশায় উঠি। পাশে অসুস্থ মেয়েটা। মোড়ের কাছে রিকশা আসতেই গতি রোধ করে একটা ছেলে। কোমর থেকে একটি পিস্তল বের করে পেটে ঠেকায় আমার। শান্ত গলায় বলে, যা আছে বের করেন, নইলে গুলি  করে দেব। মানিব্যাগে সাড়ে তিন হাজার টাকা ছিল। পুরোটাই ছেলেটার হাতে দিই। নিজের প্রাণ আর মেয়েটার প্রাণ নিয়ে ফিরে আসি বাসায়।'

'এ রকম তো হরহামেশাই হচ্ছে। এতে নিজেকে মেরে ফেলার কী হলো!' আগের মতোই শান্ত গলা আমার, 'গত ১৬ মার্চ মিরপুর বেড়িবাঁধে ছিনতাইয়ের কবলে পড়েছিলেন অভিনেত্রী রোজী সিদ্দিকী। ছিনতাইকারীরা তার গলায় রামদা ঠেকিয়ে হাতের হীরার আংটি, কানের দুল, মোবাইলসহ প্রায় তিন লাখ টাকার জিনিসপত্র ছিনিয়ে নেয়।'

'ছিনতাই হয়েছে বলে আমি কিন্তু মরতে চাইনি।'

'তাহলে?'

'বুধবার দুপুরে পল্টন কমিউনিটি সেন্টারে দুস্থদের মধ্যে ঈদের নতুন পোশাক বিতরণ করেছিলেন ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া। সেখানে তিনি বলেছেন, রাজধানীতে কোনো ছিনতাইকারী নেই।'

'উনি তো ঠিকই বলেছেন।'

'কীভাবে?'

'প্রতিটি জ্ঞানী মানুষ যা কিছুর উদাহরণ দেন, তা তার জীবন থেকেই দেন, জীবনে ঘটে যাওয়া ঘটনা থেকেই দেন। যেহেতু তিনি আগে কখনও ছিনতাইকারীর কবলে পড়েননি, বর্তমানেও পড়ছেন না এবং ভবিষ্যতেও পড়ার সম্ভাবনা নেই, তাই তিনি ওই কথাটা বলেছেন। বুদ্ধিমানরা এভাবেই কথা বলেন, অভিজ্ঞতা ছাড়া কোনো কথা বলেন না তারা।'

কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে মাসুক বলল, 'বন্ধুরে, আমাকে আর মেরে ফেলতে হবে না, আমারও আত্মহত্যা করার প্রয়োজন নেই। আমি সম্ভবত এরই মধ্যে মরে গেছি। তুই এসে কবর দিয়ে যা আমাকে।'

মাসুক না মরলেও এরই মধ্যে মরে গেছেন সারাদেশের ধান চাষ করা কয়েক হাজার নিরীহ কৃষক। ধানের দাম এত কম যে কেউ কেউ ধানভরা ক্ষেতে আগুন লাগিয়ে দিয়েছেন। তাই দেখে ও বুকের ভেতর প্রচণ্ড উত্তেজনা নিয়ে এবং চাল আমদানিকে নিরুৎসাহিত করতে উচ্চ শুল্ক্কহার আরোপ করা হয়েছে। যিনি বা যারা এই যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলতে ইচ্ছে করছে, 'জনাব, শুল্ক্কহার দ্বিগুণ করে কী হবে, পুরো আমদানিটাই বন্ধ করলে কী হয়? কার তাতে স্বার্থে আঘাত লাগবে, কে চোখে অন্ধকার দেখবে?'

বালিশ-সংক্রান্ত আলোচনাটা ছেঁড়া বালিশের তুলোর মতো উড়ে বেড়াচ্ছে এখন সারাদেশে। হলমার্ক গ্রুপ সোনালী ব্যাংক থেকে চার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার পর আমাদের সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত যেমন বলেছিলেন, 'রাবিশ, এটা কোনো টাকাই না।' আমারও বলতে ইচ্ছে করছে, 'রাবিশ। এটা কোনো খরচই না।' বিদেশ থেকে ভিক্ষে করে, ঋণ নিয়ে, মানবেতর পরিশ্রম করা বিদেশে থাকা ভাইবোনের পাঠানো রেমিট্যান্স এবং সর্বোপরি আমাদের ট্যাক্সের টাকা দিয়ে যখন রাস্তা বানানো হয় শহরের অলিগলিতে, এক বৃষ্টিতে তা কোনোরকমে সয়ে যায়। দ্বিতীয় বৃষ্টিতেই মেকআপ ধুয়ে যাওয়া কোনো বয়স্ক মুখের মতো মনে হয় সব- এবড়োখেবড়ো। গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে এত কিছুর রেকর্ড আছে, কেবল এই রেকর্ডটা নেই- বাংলাদেশের একেকটা রাস্তা বছরে কয়বার কাটা হয় এবং কত রকমভাবে কাটা হয়! উন্নয়নের জোয়ারের সুখানুভূতি নিয়ে সেই রাস্তায় সাধারণ মানুষ কী সুন্দরভাবে হেঁটে যায়। রূপকথার রাজপুত্র আর রাজকন্যার মতো তাদের সুখ আর শেষ হয় না।

দু'পায়ের দিকে ক্যামেরা, কয়েক সেকেন্ড। কিছু একটা পিষছে পা দুটো। ক্যামেরাটা ওপরে তুলতেই বুকের ভেতরে ছলাৎ! এভাবে সেমাই বানানো হয়! গরুর গোয়ালঘরে! নোংরা পায়ে, গা ঘিনঘিন করা পরিবেশে! লাফানোর প্রক্রিয়ায় মানুষটার গায়ের ঘামও মিশে যাচ্ছে পায়ের নিচের সেমাই বানানোর উপকরণে, যেন পানি আর লবণের সাশ্রয় হচ্ছে বেশ।

ঈদে আমরা সেই সেমাই খাব। তারপর তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলতে তুলতে হিন্দি সিরিয়াল দেখব মনোযোগ দিয়ে।

বাসে ধর্ষণ হচ্ছে, মাঠে ধর্ষণ হচ্ছে, হচ্ছে ঘরেও। স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসায়ও। এমনকি উপাসনালয়েও! ব্যাপারটা মহামারির আকার ধারণ করছে। আর সেই ধর্ষণে পরোক্ষভাবে সাহায্য করছে অন্য কেউ।

ধর্ষণ করার পর মেয়েকে মেরে ফেলা হয়েছে, মা অভিযোগ করে মামলা করেছেন। অথচ পটুয়াখালীর ডা. শাহ মো. মোজাহিদুল ইসলাম ও মেডিকেল অফিসার রেজাউর রহমান ময়নাতদন্তের যে তথ্য দিয়েছেন, এককথায় তা অস্বাভাবিক। আদালত তাদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানপূর্বক ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন এবং তাদের বলেছেন, 'এভাবে যদি ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন দেন, তাহলে জাতির কাছে কী বার্তা যায়?'

আমাদের ডাক্তাররা আমাদের সঙ্গে প্রতারণা করেন, প্রকৌশলীরা ৫০ ফুট দূরে সামান্য বালিশ বহনের খরচ দেখান কয়েক হাজার, তৈল প্রদান আর ক্ষমতার পদলেহন করতে করতে আমাদের সাংবাদিকরা হয়ে যান ব্যক্তিত্বহীন, কাণ্ডজ্ঞানহীন; সেখানে জাতির কাছে কোনো বার্তাই তো অজানা নয়। যত্রতত্র বার্তার আবরণে আমরা অলরেডি অন্ধ হয়ে গেছি, বোবাও।

পলিথিনে মোড়ানো নবজাতকের একটা লাশ পাওয়া গেছে গ্রিন রোডের এক ডাস্টবিনে। আরও একটা পাওয়া গেছে রামপুরার ড্রেনে। পল্লবীর ডোবাতেও একটা।

আমাদের দেশে মানুষ জন্মে বেশি, তাই তার মৃত্যুও এখন ভাবায় না কাউকে। খুবই স্বাভাবিক। অধিক ফলনের কিছুটা নষ্ট হলে আমাদের কখনও মন খারাপ হয় না। তবে কোনো কোনো ব্যাপারে মনটা ভালোও হয়ে যায় হঠাৎ- গত তিন বছরে সুন্দরবনে বাঘ বেড়েছে আটটি। একটি-দুটি নয়, পুরো আটটি। গড়ে বছরে ২.৬৬টি।

মস্ত বড় একটা সুখবর!

এই আনন্দে আমরা নুসরাতের ঘটনা ভুলে যাই, তানিয়ার কথা ভুলে যাই, যেমন ভুলে গিয়েছি তনুর কথা। আরও অনেক সম্ভ্রম হারানো বোনের কথা।

ইংরেজ লেখক জোনাথন সুইফট বলেছেন, 'সংসারে যারা সবকিছুকে মেনে নেওয়ার চেষ্টা করে, কোনো দুঃখ নেই তাদের।'

আমরাও সবকিছু মেনে নিয়েছি, মেনে নিচ্ছি, মেনে নেব– আমাদের কোনো দুঃখ নেই তাই! 

মন্তব্য


অন্যান্য