মন্তব্য

ফের গেরুয়া ভারত?

প্রকাশ : ২৩ মে ২০১৯ | আপডেট : ২৩ মে ২০১৯

ফের গেরুয়া ভারত?

ভারতজুড়ে উল্লাসে মেতেছেন বিজেপি কর্মী-সমর্থকরা— এএফপি

  রাজীব নন্দী

দ্বিতীয়বারের মতো ভারতের প্রধানমন্ত্রী হতে চলেছেন নরেন্দ্র মোদি। গ্রীষ্মের দাবদাহে কৃষ্ণচূড়া ছাড়া কোথাও 'লাল' নেই ভারতে, বামেদের শোচনীয় পরাজয় হয়েছে। সবচেয়ে বেশি আসনের রাজ্য উত্তরপ্রদেশেও মায়াবতী-অখিলেশ যাদবের জোটকে ছাপিয়ে যাচ্ছে বিজেপির গেরুয়া রথের পাগলা ঘোড়া। লোকসভা নির্বাচনে এখন পর্যন্ত (২৩ মে দুপুর ১টা) ভোটের যে গণনা চলছে তাতে বিজেপি নেতৃত্বাধীন জোট ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্সের (এনডিএ) সহজ বিজয়ের চিত্র দেখা যাচ্ছে। বহুত্ববাদের ভারতে বামেদের ধুয়েমুছে যাওয়া ও সর্বভারতীয় রাজনীতিতে কংগ্রেসের গুরুত্ব হারানো এবং পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির উত্থান নিয়ে গভীর বিশ্লেষণ দরকার।

বাংলাদেশের একজন নাগরিক হিসেবে এবং প্রতিবেশী রাষ্ট্রের রাজনৈতিক পর্যেবেক্ষক হিসেবে আমি মনে করি, ভারত এক মহাবিচিত্র দেশ। একে দেশ না বলা যায় 'ইউনাইটেড স্টেইটস অব ইন্ডিয়া'! বিশ্বে দ্বিতীয় বৃহত্তম জনসংখ্যার এ দেশকে নির্বাচনী গণতন্ত্রের উজ্জ্বল উদাহারণ বলা হয়ে থাকে। সেই ভারতের লোকসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গে গতবারের চেয়ে বিজেপির এবার ভালো ফল করতে পারে বলে আভাস পাওয়া গিয়েছিল। ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে মোদি ঝড় থাকা সত্ত্বেও বাংলা থেকে মাত্র ২টি আসনে জয় পেয়েছিল বিজেপি। কিন্তু ইন্ডিয়া টুডে-অ্যাপিস মাই ইন্ডিয়া যৌথ জরিপে বাংলায় ৪২টি আসনের মধ্যে তৃণমূল কংগ্রেস ২৩টি আসন পেতে পারে বলে ইঙ্গিত মিলেছে। বিজেপি ভালো ফল করতে পারে বলে জানিয়েছে টুডেজ চাণক্য (১৮), টাইমস নাও-ভিএমআর (১১) এবং রিপাবলিক-জন কি বাত (১৮-২৬)-এর জরিপও। কিন্তু আজ দেখা যাচ্ছে, ভারতজুড়ে ফের গেরুয়া ঝড়। আর সেই ঝড়ে বেসামাল হিন্দি বলয় থেকে শুরু করে পশ্চিমবঙ্গ, বিহার-ওড়িশা, এমনকি উত্তর-পূর্ব। এককভাবে বিজেপি আগেরবারের ২৮২ আসন টপকে যাওয়ার পথে।

আনন্দবাজার অনলাইন জানাচ্ছে, ৩০০ আসন পার করার ইঙ্গিত এনডিএ জোটের। উল্টো দিকে বিরোধী শিবিরে শুধুই হতাশা। ভোট গণনার প্রবণতায় স্পষ্ট ইঙ্গিত, কংগ্রেসের আসন সংখ্যা বাড়লেও সরকার গঠনের ধারে-কাছে যাওয়ার সম্ভাবনা নেই ইউপিএ জোটের। চন্দ্রবাবু নাইডু, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, মায়বতী-অখিলেশরা যে জোট গড়ার চেষ্টায় ছিলেন, নিজেদের রাজ্যেই শোচনীয় ফল তাদের।

ভারতে ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে বিজেপি ২৮২টি আসনে জিতে নির্বাচনে বিশাল জয় পেয়েছিল। সেটিই ছিল প্রথমবারের মতো বিজেপির নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা। নরেন্দ্র মোদি ঐতিহাসিক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে যে জোট সরকার নয়াদিল্লিতে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, গত ৫ বছর বছর ধরে তার মূল লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও ক্রিয়াকলাপ ধীরে ধীরে ভারতবাসীই শুধু নয়, বিশ্ববাসীর কাছেও যথেষ্ট স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ভারতে মোদির মতো প্রবল পরাক্রান্ত নেতৃত্বের মোকাবেলা একক রাজনৈতিক দলের দ্বারা সম্ভব হয়নি। তাই গত বছর দেড়েক ধরেই দেখা গেল মোদিবিরোধী সর্বভারতীয় ঐক্য। মোদি-বিরোধী ঐক্যে শান দিতে দিল্লিতে বৈঠকে সামিল হয়েছিল প্রায় সব প্রধান বিরোধীদল। শারদ পাওয়ারের বাড়িতে এক বৈঠকে পাশাপাশি বসেছেন রাহুল গান্ধী, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অরবিন্দ কেজরিওয়াল। ছিলেন চন্দ্রবাবু নাইডু, ফারুক আবদুল্লা, শরদ যাদবের মতো নেতারা। সেই বৈঠক থেকেই একসঙ্গে পথ চলা শুরু ইউনাইডেট ইন্ডিয়ার। নরেন্দ্র মোদি সরকারের বিরুদ্ধে জোট বাধার চেষ্টা করেছেন বিরোধীরা। কিন্তু বিরোধী শিবিরের সর্বভারতীয় মুখ কে? এই একটি প্রশ্ন ঘুরেফিরে ভোটের বছরে উঠে এসেছে অরুণাচল থেকে কাশ্মীর হয়ে কন্যাকুমারী পর্যন্ত। এত সহজ প্রশ্নের উত্তর এতটা জটিল হবে, সেটি কে জানতো? আনন্দবাজার পত্রিকা আজ থেকে ঠিক ৫ বছর আগে মোদির রাজ্যাভিষেক ক্ষণে ব্যানার লিড করেছিলো 'মোদি একাই'! যে একাকিত্বের সফলতা-ব্যর্থতা নিয়েই দিল্লি দখলের নতুন যুদ্ধে নেমেছিলেন মোদি। কিন্তু ভারতের ললিত মোদি দেশ ছেড়েছিলেন, নীরব মোদিও উধাও। বিপদে ফেলে গিয়েছেন যাকে, তিনি একমেবাদ্বিতীয়ম নরেন্দ্র মোদি। গুজরাটের রঙ্গমঞ্চের সেই অবিসংবাদী 'খলনায়কে'র চরিত্র থেকে উঠে এসে যিনি এতদিন দখলে রেখেছেন দিল্লির মসনদ। সেই মোদি, যিনি কার্যত একা-ই।

২০০২ সালে যে মোদি উগ্র হিন্দুত্ববাদী পরিচয়ে নিজের উত্থান ঘটিয়েছিলেন, ২০১৪ সালে সেই মোদি শিল্পায়নের গল্প শুনিয়েছেন একা। সেই একা মোদি এবার ২০১৯ সালে আরও একা; ঘুমন্ত বিরোধীদলীয় পাড়ায় একা চৌকিদারের ভূমিকায়! প্রবল সমালোচনা সত্ত্বেও কোনো একটি রাজনৈতিক দলের পরপর রাষ্ট্রক্ষমতায় আসা সেই দলের 'জনপ্রিয়তা' নয়, বরং সেই দেশের বিরোধী শক্তির 'অনৈক্য' এবং 'দুর্বলতা'কেই তুলে ধরে। কথায় আছে, জনতা যেমন, শাসকও তেমন। অ্যান্টি আওয়ামী জোট করতে বাংলাদেশের বিরোধীরা যেমন দৈন্য, বিজেপির পুনরুত্থানের পেছনেও সর্বভারতীয় কণ্ঠস্বরের শূন্যতাই বেশি দায়ী।

গত তিন মাস ধরে শত শত সর্বভারতীয় লেখক, শিল্পী, চলচ্চিত্রকর্মী ও বিজ্ঞানী বিজেপিকে ভোট দিতে না করলেও, ভোটটা কাকে দেয়া যায় তা কিন্তু বলতে পারেননি! এর মাঝ দিয়ে প্রকৃত সংকটটাও বোঝা যাচ্ছে যে, মানুষ তার পছন্দের যোগ্য কোনো দলও খুঁজে পাচ্ছে না। সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গের ঐতিহাসিক ব্রিগেড সমাবেশ, আসামের বাঙালি প্রত্যার্পন, দিল্লিমুখী কৃষক মহামিছিল, শবরীমালা মন্দির, বামেদের দুই দিনব্যাপী বনধ, বিজেপিবিরোধী সর্বভারতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার চেষ্টা থেকে ভারতবাসী যোগ্য শাসক চিনে নিতে পারবে কী? বহুত্ববাদের পরম্পরায় গড়ে ওঠা ভারতবর্ষ কোন দিকে হাঁটবে?

ভারতজুড়ে ফের গেরুয়া ঝড় দেখে ভাবছি, পশ্চিমবঙ্গের পরিণতি তাহলে কী হবে? এখানে মমতা ব্যানার্জির উচিৎ তৃণমূলের প্রো-পাকিস্তানি ক্ষতিকর অংশগুলার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে শেখ হাসিনা সরকারের সঙ্গে মৈত্রীর সম্পর্ক স্থাপন করা। তাহলে আজ পশ্চিমবঙ্গে লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি সুবিধা করতে পারতো না, তৃণমূলও এভাবে খারাপ ফল করতো না। হাতে এখনও এক বছর সময় আছে, পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের আগে তিস্তার জলবণ্টনে মমতার উচিৎ একগুয়েমি ছেড়ে ভারতীয় কেন্দ্রীয় সরকার ও বাংলাদেশ সরকারের মধ্যে ইতিবাচক ভূমিকা রাখা। নইলে আমাদের বাংলাদেশের খালেদা জিয়ার মতো সময়ের কৃষ্ণগহ্বরে হারিয়ে যাবেন।


লেখক: সহকারী অধ্যাপক, যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

মন্তব্য


অন্যান্য