চতুরঙ্গ

চরাঞ্চলের জীবন-জীবিকা ও বিকল্প কৃষি

প্রকাশ : ০১ জুলাই ২০১৯

চরাঞ্চলের জীবন-জীবিকা ও বিকল্প কৃষি

প্রায় ৮ হাজার হেক্টর চাষের জমি এখন সবজির দখলে

  আবু সিদ্দিক

জীবনযাপন আর সুযোগ-সুবিধায় বিস্তর অমিল থাকলেও চরে বাস করা মানুষগুলো সমতলের মতো এখনও জীবিকার জন্য কৃষিকাজের উপরই অনেকাংশে নির্ভরশীল। তবে জমির ধরন আর বালু মাটির আধিক্যের কারণে ফসলের ধরনে রয়েছে কিছুটা ভিন্নতা। যেমন সমতলে বছরে তিনবার ধান আবাদ হলেও বন্যা, বালু আর বর্ষার পানির দীর্ঘ স্থায়িত্বের কারণে চরে সেটা সম্ভব নয়।

সেই হিসেবে চরের ফসল বলতে গেলে কোথাও বোরো কিংবা আউশ কিংবা তেল বীজে সীমাবদ্ধ। আর আছে খুবই সীমিত আকারে কিছু পাট চাষ। এছাড়া গবাদি পশুপালন থেকেওে আসে চর জীবনের একটি বিশাল অর্থের যোগান। সব মিলিয়ে জীবিকার প্রশ্নে চরের মানুষ এখনও অনেক পিছিয়ে। তবে আশার কথা হলো, কৃষিকাজের সেই সীমাবদ্ধতা থেকে ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসছে চরের মানুষ– বিকল্প কৃষি যেমন, সবজি চাষ আর পশুপালনের মাধ্যমে।

ধরা যাক, করিমুন্নছো আর রফিকুল ইসলাম দম্পতির কথা। পরিবারটির বাস সিরাজগঞ্জের চৌহালি উপজেলার প্রত্যন্ত এক চরে। এনায়েতপুর খেয়া ঘাট থেকে সেখানে পৌঁছাতেই সময় লেগে যায় দু'ঘণ্টা। নিজেদের ৫০ শতাংশ কৃষি জমিতে তারা দীর্ঘদিন ধরেই তিল আর আউশ ধান চাষ করে জীবন চালাতে অভ্যস্ত ছিলেন। সেটা নুন আনতে পান্তা ফুরানোর মতোই। তবে শেষ চার বছরে শুধু আবাদের ধরনে পরিবর্তন আসায় তাদের পরিস্থিতি পাল্টেছে অনেকটাই। আগের তিল আর আউশের পরিবর্তে তারা এখন বছরে আট মাস জমিতে রাখেন বিভিন্ন ধরনের সবজি। কী নেই সেখানে? লাউ থেকে শুরু করে বেগুন, শশা, পটল কিংবা মূলা– সবই এখন ফলছে তাদের জমিতে।

গত শীত মৌসুমে শুধু এসব বিক্রি করেই এই দম্পতির আয় হয় ৪০ হাজার টাকা, যা চলতি ধারার ধান আর তিল আবাদ করে আয় করা কথনোই সম্ভব হয়নি বলে জানান তারা। যদিও সবজি আবাদে নিয়মিত ক্ষেতের পরিচর্যা আর অনেক সময় দরকার বলে জানান তারা।

মাঠের চাষীদের এই বিকল্প কৃষিতে ঝুঁকে পড়ার বিষয়ে অবশ্য সরকারে কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগও সচেতন। সিরাজগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণের উপ-পরিচালক মো. হাবিবুল হকও বলছিলেন একই কথা। চরের কৃষকরা এখন পুরনো ধারার ফসলের চেয়ে বেশি আগ্রহী অধিক লাভের সবজি চাষে। তার জেলার প্রায় ৮ হাজার হেক্টর জমি এখন সবজির দখলে।

বাড়তি আয়ের জন্য চরবাসীদের আরেকটি পছন্দ হলে পশুপালন। বিশেষ করে গরু মোটাতাজাকরণ। কিন্তু বছরের প্রায় ৪/৫ মাস বন্যা আর বর্ষা মৌসুমের পানি দিয়ে চরগুলো সয়লাব থাকে বিধায় পশুপালনের জন্য জরুরি খড়ের একটা ঘাটতি সারাবছরেই সেখানে কমবেশি লেগে থাকে। এই কারণে সেখানে ধীরে ধীরে বাড়ছে উন্নত জাতের ঘাসের আবাদ। আর এই ঘাসের আবাদ মানুষ করছে শুধু নিজেদের গবাদি পশুর জন্যই নয়, নিজেদের প্রয়োজন মিটিয়ে বাড়তি ঘাস অন্যদের কাছে বিক্রি করতে বাড়তি আয়ও নিশ্চিত করছে তারা।

এমনই একজন কৃষক মুসলিম আলী। নিজের বাড়ির ৮টি গরুর বাৎসরিক খাবারের যোগানের জন্য তাকে গত বছর পর্যন্ত খড় কেনার পেছনেই প্রায় ২০ হাজার টাকা খরচ করতে হতো। কিন্তু নেপিয়ার ঘাসের আবাদ তাকে দিয়েছে নিজের প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি বাড়তি ২০ হাজার টাকা আয়ের সুযোগ।

নেপিয়ার ঘাসের সুবিধা হলো– এটি দ্রুত বর্ধনশীল, জমিতে বীজ বপনের দিন থেকে ঘাস কাটার উপযোগী হওয়া পর্যন্ত সময় লাগে মাত্র ৩৫ দিন। এভাবেই বছরব্যাপী চলতে থাকে তার ঘাস আবাদ, শুধু বর্ষার সময়টুকু ছাড়া। জেলার পশুপালন কর্মকর্তা আখতারুজ্জামান ভুঁইয়া বলছিলেন, সিরজাগঞ্জের একটা বড় সংখ্যক মানুষ পশুপালনের সঙ্গে জড়িত। আর এর জন্য যে পরিমাণ ঘাস প্রয়োজন, তার একটা বড় অংশের যোগান আসে জেলার চরগুলো থেকে। এ কারণেই কেবল সদর উপজেলাতেই গড়ে উঠেছে ১৬টি ঘাসের বাজার, যেখান থেকে মানুষ তাদের প্রয়োজন মতো গবাদি পশুপালনের জন্য খাবার হিসেবে ঘাস কেনা-বেচা করেন।

সরকারের পশুসম্পদ বিভাগের হিসেব মতে, বাংলাদেশের গরু-ছাগল-মহিষ-ভেড়া আর অন্যান্য মিলিয়ে মোট পশুর সংখ্যা ২ কোটি উনচল্লিশ লাখ পয়ত্রিশ হাজার। এর মধ্যে শুধু সিরাজগঞ্জেই আছে ১১ লাখ।


লেখক: গবেষক

মন্তব্য


অন্যান্য