চতুরঙ্গ

বাজেট যেন সাধারণ মানুষের কষ্ট না বাড়ায়

প্রকাশ : ১৩ জুন ২০১৯ | আপডেট : ১৩ জুন ২০১৯

বাজেট যেন সাধারণ মানুষের কষ্ট না বাড়ায়

ড. মো. কামাল উদ্দিন

  ড. মো. কামাল উদ্দিন

অর্থমন্ত্রী আ.হ.ম মোস্তফা কামাল ৫ লক্ষ ২৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকার ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেট পেশ করেছেন। এ বাজেটে অতি সচেতন মহল ও নাগরিকদের একটু বাড়তি আগ্রহ থাকার কথা, কারণ এ বাজেট বর্তমান সরকারের তৃতীয় মেয়াদের প্রথম বাজেট এবং বর্তমান অর্থমন্ত্রীর প্রথম বাজেট। এ বাজেট বলে দেবে তৃতীয় মেয়াদে নবগঠিত সরকার দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতিকে কিভাবে দেখতে চায়, কোন খাতকে সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার দেবে। অর্থমন্ত্রীর ১৩৩ পৃষ্ঠার বাজেট বক্তৃতার ওপর বিশ্লেষণ করা স্বল্প সময়ে খুবই কঠিন কাজ।

তবে প্রাথমিকভাবে যে সব বিষয় নজরে এসেছে তা উল্লেখ করার চেষ্টা করবো। এ বাজেট হচ্ছে বাংলাদেশ সৃষ্টির ইতিহাসে আকারে সবচেয়ে বড় বাজেট। এবার বাজেটে ৮.২% প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। মোবাইল ফোন ব্যবহারের খরচ আগের তুলনায় বাড়বে। বাজেটে বেসরকারী খাতের উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। অর্থমন্ত্রী এ বাজেটকে দিনবদলের রূপকল্প ২০২১ বাস্তবায়ন এবং ক্ষুধা ও দারিদ্রমুক্ত ২০৩০ এর স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বাজেট হিসেবে উল্লেখ করেন। এ বাজেট বর্তমান সরকারের বিগত ১০ বছরের অভাবনীয় উন্নয়ন ও অর্জনের উপর ভিত্তি করে রচিত হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।

২০১৯-২০ সালের বাজেট কাঠামোতে বলা হয়, সকল মানুষের জন্য বাজেট। এ বাজেটে কাউকে বাদ দেয়া হয়নি, এ বাজেটের প্রভাবে কেউ অখুশি হবে না। সমাজের প্রত্যেক শ্রেণি-পেশার মানুষের স্বার্থ রক্ষা করার কথা বলা হয়েছে। বাজেটে মৌলিকভাবে রাজস্ব আহরণের প্রতি জোর দেওয়া হয়েছে, তবে তা করের হার বাড়িয়ে নয় বরং করের আওতা বৃদ্ধি করে। বাজেটে দাবি করা হয়েছে, ২০১৯-২০ সালের বাজেটের ফলে দেশের জনগণের নিত্য প্রয়োজনীয় কোন জিনিসপত্রের দাম বাড়তে পারে তেমন কোন উপকরণ নেই। করের আওতা বৃদ্ধির জন্য অব্যাহত প্রচেষ্টা চালানোর কথা বলা হয়, যা নতুন কিছু নয়। এ বাজেটে দাবি করা হয়েছে, বাংলাদেশের প্রায় ৪ কোটি নাগরিক মধ্যম আয়ের অন্তর্ভুক্ত কিন্তু আয়কর প্রদানকারীর সংখ্যা মাত্র ২১-২২ লাখ। যদিও এ বাজেটে তা এক কোটিতে রূপান্তর করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, কিন্তু আরো বাকী ৩ কোটি মানুষ কর না দেয়ার বা কর ফাঁকি দেয়ার সুযোগ পাবে। তবে সব নাগরিককে করের আওতায় আনার জন্য 'করজাল' তৈরির কথা বলা হয়। কর প্রদান করা যেন করদাতার ওপর বোঝা না হয় সে দিকে খেয়াল রাখার কথা বলা হয় এ বাজেটে। অর্থমন্ত্রী খুব সুন্দরভাবে ফ্রান্সের রাজা চতুর্দশ লুই এর একটি বিখ্যাত উক্তির উদ্বৃতি টানেন কর আদায়ের ক্ষেত্রে- 'রাজহাঁস থেকে পালক উঠাও যতটা সম্ভব ততটা, তবে সাধারণ রাজহাঁসটি যেন কোনভাবে ব্যাথা নায় পায়।' এ যদি হয় কর আদায়ের দৃষ্টিভঙ্গি, তাতে মাননীয় অর্থমন্ত্রী কর আদায়ে সফল হবে বলে মনে করি না। বাংলাদেশের মানুষের কর ফাঁকি দেয়া বা বিভিন্ন মাধ্যমে করের পরিমাণ কমানোয় লিপ্ত। কর ফাঁকি দেওয়াকে অধিকার মনে করা হয় এ দেশে। এক্ষেত্রে কর আদায়ের এ ধরনের নরমনীতি ফ্রান্সে কাজ আসতে পারে কিন্তু বাংলাদেশে সফলতা আসবে না। আরো বেশি কঠোর হতে হবে। রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে দুর্নীতি রোধ করে স্বচ্ছতা আনতে হবে। এ বাজেটের আওতায় ভ্যাট আইন ২০১২ বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছে কিন্তু এ আইন বাস্তবায়নের ফলে প্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের ওপর কি প্রভাব পড়বে তা স্পষ্ট নয়।

আসল কথা হলো-বাজেট কতো বড়, কি আছে এ বাজেটে- তাতে সাধারণ জনগণের কিছু যায় আসে না। সাধারণ জনগণের দৃষ্টি হচ্ছে তাদের আয় ও ব্যয়ের সামঞ্জস্যের ওপর। তারা সবসময় তাকিয়ে থাকে বাজারের ওপর। বাজার যদি তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকে, খেয়ে-পরে জীবন কাটাতে পারে তাতেই তারা সন্তুষ্ট। তাদের চাহিদা অনেক কম। তারা আমাদের মতো এতটা বাজেটপ্রেমী নন। বাজেট যেন সাধারণ মানুষের কষ্ট না বাড়ায় এবং বেসরকারী মাফিয়া তৈরি না করে।

লেখক: অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

ইমেইল- kamalircu@yahoo.com

মন্তব্য


অন্যান্য