চতুরঙ্গ

বায়ু দূষণের প্রভাব ও করণীয়

প্রকাশ : ০৫ জুন ২০১৯ | আপডেট : ০৫ জুন ২০১৯

বায়ু দূষণের প্রভাব ও করণীয়

প্রতীকী ছবি

  ড. মো. মাসুদ পারভেজ রানা

আজ ৫ জুন বিশ্ব পরিবেশ দিবস। পরিবেশকে রক্ষা ও টেকসই করে তোলার লক্ষ্যে জাতিসংঘ ১৯৭৪ সাল থেকে বিশ্ব পরিবেশ দিবস উদযাপন করার সিদ্ধান্ত নেয়। বিশ্বের ১০০টিরও বেশি দেশে দিবসটি গুরুত্ব সহকারে পালন করা হয়ে থাকে। প্রতি বছরের মত এবারও বিশ্ব পরিবেশ দিবস বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে উদযাপিত হচ্ছে। 

ব্যক্তি পর্যায় থেকে শুরু করে বিভিন্ন সংগঠন এবং জাতীয় পর্যায়ে দিবসটি উদযাপিত হয়। পরিবেশ সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা এবং ভবিষ্যৎ কর্মসূচি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে আমাদের করণীয় নির্ধারণই এই দিবসের উলে­খযোগ্য উদ্দেশ্য। বিশ্ব পরিবেশ দিবস-২০১৯ এবার চীন সরকার আয়োজন করছে। আলোচ্য বিষয় হলো ‘বায়ু দূষণ’। নানাবিধ পরিবেশ দূষণের মধ্যে বায়ু দুষণ সর্বাধিক ক্ষতিকর। নির্মল ও পরিচ্ছন্ন বায়ু আমাদের শ্বাস-প্রশ্বাসের জন্য অনিবার্য। তাই বায়ুর গুণমান বজায় রাখা ছাড়া আমাদের উপায় নেই।

বিশ্বব্যাপী প্রতি বছর আনুমানিক ৭ মিলিয়ন মানুষ মারা যায় বায়ু দূষণের কারণে। এদের মধ্যে ৪ মিলিয়ন মানুষের বসবাস হলো এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে।  বায়ু দূষণের ফলে মৃত্যুবরণকারী নব্বই ভাগেরও বেশি মানুষ গরীব দেশগুলোর বাসিন্দা। 

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার একটি হিসেবে দেখা যায়, বিশ্বে প্রতি ১০ জনের মধ্যে প্রায় ৯ জনই বেশি মাত্রায় দূষিত বায়ু শ্বাস-প্রশ্বাসে ব্যবহার করে। সংস্থাটি আরোও জানায়, বায়ু দূষণ এমন একটি মারাত্মক প্রভাবক যার জন্য ২৪ শতাংশ পূর্ণবয়স্ক মানুষের হার্টের অসুখ, ২৫ শতাংশ স্টোক, ৪৩ শতাংশ পাল্মনারি রোগ এবং ২৯ শতাংশ ফুসফুস ক্যান্সার হয়ে থাকে। 

এ বছর গ্রিনপিস থেকে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে জানা যায়, প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ৮০০ মানুষ মারা যায় যারা বায়ুদূষণজনিত রোগে আক্রান্ত ছিল। বায়ু দূষণের অর্থনৈতিক প্রভাবও কম নয়। প্রতি বছর বিশ্ব অর্থনীতির ৫ ট্রিলিয়ন ডলার ক্ষতি হয় বায়ু দূষণের কারণে। এছাড়া গ্রাউন্ড-লেভেল ওজোন-দূষণের জন্য আগামী ২০৩০ সাল নাগাদ পৃথিবীর প্রধান ফসলগুলোর উৎপাদন ২৬ শতাংশ হারে  হ্রাস পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

পরিতাপের বিষয় হলেও সত্য যে, পরিবেশ রক্ষায় বাংলাদেশের অবস্থান ক্রমাগতভাবে অবনতি হচ্ছে। বন উজাড়, বায়ু ও পানি দূষণ এবং কঠিন বর্জ্য সমস্যায় জর্জরিত শীর্ষ দশটি দেশের মধ্যে এখনও বাংলাদেশ রয়েছে। পরিবেশ ও বন রক্ষায় ১৮০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ ১৭৯তম। গত এক দশকে বৈশ্বিকভাবে পরিবেশ রক্ষায় বাংলাদেশ ৪০ ধাপ পিছিয়েছে। 

২০১৮ সালে প্রকাশিত বিশ্ব ব্যাংকের এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ২০১৫ সালে বাংলাদেশে যত মানুষ মৃত্যুবরণ করেছে তার ২৮ শতাংশই পবিবেশজনিত অসুখ-বিসুখের কারণে। 

নগর পরিবেশ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থা শোচনীয়। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শহর ও রাজধানী ঢাকাকে আমরা বসবাসের যোগ্য করে তুলতে পারিনি। বরং প্রতি বছর পরিবেশ সূচকে নিম্ন থেকে নিম্নতর অবস্থানে পতিত হচ্ছে। বায়ু দূষণে ঢাকা শহর এখনও শীর্ষ তিনটি শহরের মধ্যে রয়েছে। বিশ্বে যত বসবাসের অযোগ্য শহর রয়েছে তার মধ্যে প্রধানতম হলো আমাদের রাজধানী ঢাকা। 

অনিয়ন্ত্রিত নগরায়ণের সাথে সাথে অপরিকল্পিত অবকাঠামোগত উন্নয়ন পরিবেশ দূষণের জন্য প্রধানত দায়ী। পরিবেশ সচেতনতা এবং সঠিক পরিকল্পনার অভাবের জন্য উন্নয়ন ও পরিবেশ দূষণ পরস্পরের কারণ হিসেবে প্রতীয়মান হয়েছে। অবকাটামো উন্নয়নের ক্ষেত্রে ইটভাটা এবং আধুনিক জীবনযাপনের ক্ষেত্রে যানবাহনকে উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা যেতে পারে।

বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যায়, ঢাকাসহ দেশের সামগ্রিক বায়ু দূষণের ৫৬ শতাংশের উৎস হলো ইটভাটা। এর প্রায় সবগুলোই নাকি সম্প্রতি রচিত পরিবেশ বিধিমালা অনুযায়ী অবৈধ। এছাড়া বায়ুদূষণের ক্ষেত্রে পরিবহন খাতেরও বড় ধরনের ভূমিকা রয়েছে। ঢাকা শহরের বায়ুদূষণের জন্য যানবাহনের ভূমিকা প্রায় ১৬ শতাংশ। 

২০১৩ সালে ‘এটমসফেরিক পলিউশন রিসার্চ’ জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় পাওয়া যায়, অন্যান্য দূষকের তুলনায় বায়ুতে পার্টিকুলার ম্যাটারের অবস্থান স্বাস্থ্যের জন্য সবচেয়ে ক্ষতিকর। বায়ুতে অবস্থানকারী এই পার্টিকুলারগুলো যানবাহনের মত মাবনসৃষ্ট উৎস থেকে আসে। যানবাহন থেকে নির্গত কালো ধোয়া বায়ু দূষণের অন্যতম প্রধান কারণ। এর ফলে নির্গত কার্বন ডাই অক্সাইড, কার্বন মনোক্সাইড, লেড ইত্যাদি বায়ুর তাপমাত্রা বৃদ্ধি তথা জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য দায়ী। শহরগুলোতে গড়ে উঠা শিল্প-কলখানাও বায়ু দূষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

শুধুমাত্র ইটভাটা, মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহন ও শিল্প কারখানা নয়, পরিবেশ আইন অমান্য করে উন্মুক্তভাবে ইট-বালি পরিবহন ও ভবন নির্মাণের সময় খোলা জায়গায় অথবা রাস্তার উপরে সেগুলো রেখে দেয়ার ফলেও বায়ুদূষণ হয়ে থাকে। অর্থাৎ বায়ুর শুধুমাত্র ধোয়া দূষণ নয়, ধুলি দূষণকেও সমানভাবে গুরুত্ব দিয়ে বায়ুদূষণ রোধে সমন্বিত কর্মসুচি নিতে হবে। ঢাকাসহ দেশের অন্যান্য বড় শহরগুলোতে সময়মত রাস্তা মেরামত না করার জন্য মারাত্মক ধুলি দূষণ হতে দেখা যায়। 

এছাড়া কোনো কোনো ক্ষেত্রে শহরের রাস্তাগুলো ভাল হলেও সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবে সেগুলোকে দূষণমুক্ত রাখা যাচ্ছে না। ভাল রাস্তাগুলোর উপরে যত্রযত্র বালি, মাটি, পলিথিন বা ইটের টুকরা পড়ে থাকতে দেখা যায়। সিটি কর্পোরেশনগুলো থেকে প্রতিনিয়ত ঝাড়ু দেয়ার ব্যবস্থা থাকলেও সেগুলো কার্যকরী নয়। যে পরিমান ইট-পাথর-বালি-মাটি-পলিথিন পড়ে থাকতে দেখা যায় সেগুলো সাধারণ মানের ঝাড়ু দিয়ে কোনো একজন ব্যক্তির পক্ষে সম্পূর্ণভাবে পরিষ্কার করা সম্ভব নয়। 

সম্প্রতি রাজশাহী শহরে বেশ কয়েকটি কালবৈশাখী ঝড় আঘাত হেনেছে। প্রতিটি ঝড়ের শুরুতে মনে হয়েছে আমরা যেন কোনো এক মরুভূমিতে অবস্থান করছি। প্রচণ্ড বেগে ধেয়ে আসা বাতাসের সাথে ধূলো-বালি নিমিষের মধ্যে শহরকে সাদা বানিয়ে দিয়েছিল। শুধু ঝড়ের সময়েই নয়, নগরীর ব্যস্ততম এলাকাতে যানবাহন চলাচলের প্রায় সবসময়ই ধূলিঝড় হচ্ছে বলে মনে হয়। রাস্তার উপর পড়ে থাকা মাটি ও বালি প্রতিনিয়ত এপাশ থেকে ওপাশ, আবার ওপাশ থেকে এপাশ করছে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, দীর্ঘদিন থেকে একই অবস্থা বিরাজ করলেও নাগরিকদের পক্ষ থেকে কোনো প্রতিবাদ বা প্রতিকার হচ্ছে বলে মনে হয় না। 

রাষ্ট্র বা সরকার যে একেবারেই চুপ করে ছিল বা আছে তা কিন্তু নয়। স্বাধীনতাত্তোর প্রায় প্রতিটি সরকারই পরিবেশ দুষণ রোধে ‘পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়’ ও ‘পরিবেশ অধিদপ্তর’সহ সংশ্লিষ্ট সকল প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে গঠনমূলক কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, সস্প্রতি ঢাকা দক্ষিণ ও উত্তর সিটি কর্পোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাদেরকে ঢাকা শহরের বায়ু দূষণ রোধে কি ভূমিকা নেয়া হয়েছিল তার ব্যাখ্যা চেয়ে হাইকোর্ট আদেশ দিয়েছে। এছাড়া পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় থেকেও সারাদেশে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে বায়ু দুষণ রোধে কার্যক্রম চালাতে দেখা গেছে। এছাড়া বাংলাদেশ দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার সাথেও একতাবদ্ধভাবে কাজ করে চলেছে। 

কিন্তু বাস্তবতা হলো এরপরও বায়ু দূষণরোধে কার্যত কোনো উন্নয়ন হয়নি। তাহলে করণীয় কী? তিনটি পর্যায়ে আমাদেরকে কাজ করলে বায়ু দূষণরোধে কার্যকরী উন্নয়ন হবে বলে আশা করা যায়। প্রথমত, প্রাতিষ্ঠানিকভাবে করণীয় বিষয়গুলো সুনির্দিষ্ট করতে হবে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে পরিবেশসম্মত অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং আইন প্রণয়ন ও তার বাস্তবায়ন। দ্বিতীয়ত, ব্যক্তি ও পারিবারিক পর্যায়ে পরিবেশ সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। এবং সর্বশেষটি হলো, পরিবেশ শিক্ষায় অধিকতর মনোযোগী হওয়া। পর্যায়গতভাবে করণীয় তিনটি আলাদা মনে হলেও কার্যত সবগুলোই একে অপরের উপর নির্ভরশীল বা যুক্ত রয়েছে। অর্থাৎ তিনটি পর্যায়ে সমন্বিতভাবে কর্মসূচি প্রণয়ন ব্যতিরেকে সফলভাবে পরিবেশ উন্নয়ন অসম্ভব। 

বায়ু দূষণরোধে অনেকে বলে থাকেন, ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহারের বদলে পাবলিক গাড়ি ব্যবহার করতে হবে, আর এর জন্য প্রয়োজন ব্যক্তিপর্যায়ে সচেতনতা। কথাটি সত্য এবং আমাদের করণীয় তথাস্ত। কিন্তু, প্রশ্ন হলো, পর্যাপ্ত পাবলিক গাড়ি আছে কি? অনেকে আবার বলে থাকেন, গাড়ি চালিয়ে বায়ু দূষণ না করে, সাইকেল চালানো ও পায়ে হাঁটার অভ্যাস করা স্বাস্থ্যের জন্য ভাল। জার্মানি-পোলান্ড ইত্যাদি দেশে বড়লোকেরা  কি করে তার উদাহরণ অনেকে দিয়ে থাকেন। কিন্ত আবারো প্রশ্ন হলো, সাইকেল বা পায়ে হাঁটার মত রাস্তা আছে কি? শহরে কয়টি পার্ক আছে যেখানে মানুষ নিশ্চিন্তে ব্যয়াম করার জন্য যেতে পারে? অর্থাৎ ভাল ভাল কথা বা উদাহরণ অনেক দেয়া যায়, কিন্তু বাস্তবসম্মত উন্নয়ন দূরাশায় নিমজ্জিত। এজন্য দরকার সমন্বিত উদ্যোগ। এক্ষেতে প্রধানতম করণীয় হলো পরিবেশসম্মত অবকাঠামো নির্মাণ এবং তার সুষ্ঠু ব্যবহার। স্কুল পর্যায়ে পরিবেশ শিক্ষার যেমন প্রযোজন আছে, ব্যক্তি ও পারিবারিক পর্যায়ে সচেতনতার তেমনি দরকার রয়েছে। শিক্ষা ও সতেচনতা তখনই সার্থক হবে, যখন পরিবেশ-জ্ঞানভিত্তিক অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও তার ব্যবহার আমরা নিশ্চিত করতে পারবো। এর জন্য শুধু রাষ্ট্র বা সরকার নয়, প্রত্যেক মানুষের ভূমিকা থাকা অত্যন্ত জরুরি। তাই আসুন বায়ুকে দূষণমুক্ত করি, আর নিজেকে অনেকদিন বাঁচিয়ে রাখি। ২০১৯ সালের পরিবেশ দিবসে এই হোক আমাদের সকলের অঙ্গীকার।

লেখক: অধ্যাপক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় এবং চেয়ারপার্সন, রিভারাইন পিপল।
ই-মেইল: mprgesru@yahoo.com

মন্তব্য


অন্যান্য