চতুরঙ্গ

দুর্গম পথে স্বপ্নযাত্রা!

প্রকাশ : ১৫ মে ২০১৯

দুর্গম পথে স্বপ্নযাত্রা!

  দেবব্রত চক্রবর্তী বিষ্ণু

তিউনিসিয়ার উপকূলে ভূমধ্যসাগরে লিবিয়া থেকে অবৈধভাবে ইতালি যাওয়ার পথে নৌকা ডুবে ৬০ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি নিশ্চিত করেছে, এর মধ্যে ২৭ জন্য বাংলাদেশি। তবে লিবিয়ায় বাংলাদেশ দূতাবাসের কর্মকর্তারা বলেছেন, নিহত বাংলাদেশির সংখ্যা বাড়তে পারে। তারা আশঙ্কা করছেন, এ সংখ্যা ৪০ থেকে ৬৫ হতে পারে।

গত ৯ মে রাতে লিবিয়ার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় জুয়ারা উপকূল থেকে একটি বড় নৌকায় ৭৫ অভিবাসী নিয়ে যাত্রা শুরু করে। পরে তাদের একটি ছোট নৌকায় তুলে দেওয়া হয় তিউনিসিয়ার জলসীমায়। তিউনিসীয় পুলিশের ভাষ্য থেকে জানা গেছে, ওই অভিবাসীদের বাতাস ভর্তি ছোট একটি নৌকায় গাদাগাদি করে উঠিয়ে দেওয়ায় দশ মিনিটের মধ্যে সেটি ডুবে যায়।

এ রকম মর্মন্তুদ ঘটনা যে এই প্রথম ঘটেছে তা নয়। স্বপ্নবিভোর অনেকেই জীবনবাজি রেখে মৃত্যুকে হাতে নিয়ে ছুটছে মরীচিকার পেছনে। এমন ঝুঁকিযাত্রায় অনেকের প্রাণহানি ঘটেছে সাগরে, জঙ্গলে, মরুপথে। গহিন অরণ্য, তপ্ত মরুভূমি, গভীর সমুদ্র পাড়ি দিয়ে স্বপ্নযাত্রার এই পরিণতি কতটা ভয়ঙ্কর সর্বশেষ তিউনিসিয়ার উপকূলে ঘটে যাওয়া ঘটনাটিই এর সাক্ষ্যবহ।

এই ভয়ঙ্কর স্বপ্নযাত্রায় শুধু বাংলাদেশি বেকাররাই নয়, আছে আরও কয়েকটি উন্নয়নশীল ও অনুন্নত দেশের নাগরিকও। তবে বাংলাদেশের দালালরা ভাগ্যান্বেষীদের আকুলতার সুযোগ নিতে অধিকতর তৎপর বিদ্যমান বাস্তবতা তাই তুলে ধরে। এই দুর্গম পথে স্বপ্নযাত্রায় ভাগ্য সহায় হলে কারও কারও জায়গা হয় আশ্রয় শিবিরে। এবারও এমনটিই দেখা গেছে। উন্নত জীবনের আশায় সহায়-সম্পদ বিক্রি করে প্রতারিত হয়ে কতজন আমাদের সমাজে সর্বস্ব হারিয়েছে- এর হিসাব মেলানো ভার।

বাংলাদেশিসহ অন্য দেশের বেকাররা বিশেষ করে তরুণ যুবকরা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বিভিন্ন উন্নত দেশে গিয়ে পাল্টাতে চায় জীবনচিত্র। উন্নত জীবনের স্বপ্নে বিভোর হয়ে দালালদের হাতে সব কিছু সঁপে দিয়ে যে পথে তারা পা বাড়ায় সেই পথ সম্পর্কে তাদের কোনো ধারণাও নেই। ইউরোপ যেতে বৈধ উপায় সঙ্কুচিত বিধায় ভাগ্যান্বেষীরা দালালদের কাছ থেকে 'মৃত্যুপরোয়ানা' কেনে। এ প্রবণতা বেশি পরিলক্ষিত হয় সিলেট অঞ্চলে।

ইউরোপে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় পেতে ট্রানজিট দেশ হিসেবে বেছে নেওয়া হয় লিবিয়াকে। আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যাওয়ার পথ আরও বেশি বিপদ সঙ্কুল। এই স্বপ্নযাত্রার পথ অনেক দীর্ঘ। বাংলাদেশ থেকে মধ্যপ্রাচ্যের দুবাই আবার সেখান থেকে সাগর পাড়ি দিয়ে ব্রাজিল। সেখান থেকে আবার বলিভিয়া, মেপিকো, ইকুয়েডোরের দুর্গম পথ পাড়ি দিতে হয়। কোথাও জঙ্গল দিয়ে, কোথাও সমুদ্র পথে। এখানেই শেষ নয়। তারপরও রয়েছে নানারকম জীবনঝুঁকি। তবুও স্বপ্নের হাতছানি। ইউএনএইচসিআর-এর তথ্য মতে, শুধু চলতি বছরের তিন মাসে লিবিয়া থেকে সাগরপথে ইউরোপ যাওয়ার চেষ্টা করেছেন এসব অভিবাসীদের তিনজনের মধ্যে একজনের মৃত্যু হয়েছে। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, এ বছরের জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত ১৭ হাজার অভিবাসী ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে পৌঁছাছেন। দুর্গম এই যাত্রাপথে প্রায় পাঁচশ' অভিবাসীর মৃত্যু হয়েছে বলে তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

গত বছরের দ্বিতীয়ার্ধে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে পৌঁছানো অভিবাসীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বাংলাদেশি রয়েছে- এও তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

মানব পাচারকারী দালালচক্রের কী বেপরোয়া তৎপরতা! লোভের নেশায় কী ভয়ঙ্কর পথে চলে তারা জীবন নিয়ে জুয়া খেলছে! দেশি-বিদেশি দালালরা মিলে যে চক্র গড়ে উঠেছে তাদের কাছে কত তুচ্ছতুল্য মানুষের জীবন! ইতিমধ্যে তাদের লোভাতুর থাবায় এত জীবনপ্রদীপ নিভে গেলেও এত কর্মসন্ধানী মানুষের পরিবারে শোক ও সর্বস্ব হারানোর বেদনার ছায়া গাঢ় হলেও দালালদের চিহ্নিত করে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের নজির নেই বললেই চলে। বর্তমান বিশ্বে মানব পাচার এক বড় ধরনের সমস্যা হয়ে দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশের জন্য তা রীতিমতো অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ দারিদ্র্য, অসচেতনতা, কর্মসংস্থানের অভাবের কারণে বাংলাদেশ হচ্ছে এর ভয়ঙ্কর শিকার।

দেশি-বিদেশি চক্র গভীর সমুদ্র, জঙ্গল কিংব মরুপথ দিয়ে মানব পাচার করে যে অপতৎপরতায় লিপ্ত রয়েছে তা সভ্যতা-মানবতার কলঙ্ক বৈ কিছু নয়। যেসব দেশে বেকারত্ব বেশি সেসব দেশকেই এই চক্র লক্ষ্যবস্তু করে এবং এরই ফের প্রমাণ মিলল সর্বশেষ ভূমধ্যসাগরে ডুবে যাওয়া নৌকার আরোহীদের পরিচয়ের মধ্য দিয়ে। শুধু সমুদ্রপথই তো নয়, মরু-তুষারপথে, বন-জঙ্গল অতিক্রম করতে ইতিমধ্যে যেসব ঘটনা ঘটেছে এর খতিয়ান অনেক বিস্তৃত। যারা এত সব প্রতিকূলতা-প্রতিবন্ধকতা ভিঙিয়ে শেষ পর্যন্ত গন্তব্যে গিয়ে পৌঁছে তারাও তাদের স্বপ্ন বাস্তবায়ন তো নয়ই বরং পালিয়ে কিংবা কারাগারে দুর্ভিষহ জীবনযন্ত্রণা বহন করেন।

কেন বার বার এমন মর্মন্তুদ উপাখ্যানের সৃষ্টি হয়? কর্মসন্ধানী, ভাগ্যান্বেষীদের আলাদীনের চেরাগের স্বপ্নে যারা বিভোর করে রাখে তারা থেকে যাচ্ছে অস্পর্শিত! এই চক্রের শিকড় উৎপাটন না করা পর্যন্ত মর্মান্তিকতার এমন গাঢ় ছায়া অপসারণ দুরূহ। সম্প্রতি একটি দৈনিকের প্রতিবেদনে প্রকাশ, সিলেটে সক্রিয় রয়েছে আদম ব্যবসার এমন প্রায় পাঁচশ' প্রতিষ্ঠান। ভূমধ্যসাগরের মর্মান্তিক ঘটার পর নাকি তাদের কেউ কেউ প্রতিষ্ঠান তালাবদ্ধ করে পালিয়েছে। দেশের অন্যত্রও এমন আছে তা ধারণা করা যায়। এ ধরনের মর্মান্তিকতা এড়াতে যেমন মানুষের সচেতনতা প্রয়োজন তেমনি প্রয়োজন অশুভচক্রের হোতাদের কঠোর আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তযোগ্য দণ্ড নিশ্চিতকরণ। পাশাপাশি দরকার দেশের ভেতরেও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র বিস্তৃত করা।

অবৈধভাবে বিদেশযাত্রার দায় কেউ নেয় না। এ ব্যাপারে সংশ্নিষ্ট দায়িত্বশীলদের কথাবার্তা-দায়হীনতার সাক্ষ্যই দেয়। ১৩ মে একটি দৈনিকের প্রতিবেদনে সংশ্নিষ্ট বিভাগের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, মানব পাচার ও অবৈধভাবে বিদেশ যাওয়ার বিষয়টি তাদের দেখার ব্যাপার নয়! এই যদি হয় দায়িত্বশীলদের বক্তব্য, তাহলে গত্যন্তরটা কী? অভিবাসন বিভাগ যদি যথাযথভাবে সক্রিয় হয় তাহলে এ ধরনের প্রতারকচক্রের অপতৎপরতা কি ঠেকানো দুরূহ? প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাজে আরও সমন্বয় প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা এবং সংশ্নিষ্ট অন্যান্য দাতব্য সংস্থার তথ্য থেকে জানা যায়, থাইল্যান্ড থেকে শুরু করে আফ্রিকা পর্যন্ত অনেক মানব পাচারকারী চক্র সিক্রয় রয়েছে। দেশে দেশে তারা নেটওয়ার্ক বিস্তার করে মানব পাচারের অবৈধ ব্যবসা পরিচালনা করে। শুধু পাচার নয়, নির্যাতনের মাধ্যমে মুক্তিপণ আদায়ও এদের অবৈধ উপার্জনের একটি বড় কৌশল। মানব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিক্রির মতো অনৈতিক ব্যবসার অভিযোগও রয়েছে এদের বিরুদ্ধে।

আরও ভয়াবহ তথ্য পাওয়া গেছে। শুধু ভূমধ্যসাগর অতিক্রম করতেই দালালদের জনপ্রতি দিতে হয় এক লাখ টাকা। ভূমধ্যসাগর ট্র্যাজেডির শিকার হওয়াদের মধ্যে সিলেটের রয়েছেন কয়েকজন। প্রবাসী অধ্যুষিত সিলেটের 'ইয়াহিয়া ওভারসিজ' জনপ্রতি ৮ লাখ টাকা করে তাদের কাছ থেকে হাতিয়ে নিয়েছে সরাসরি ফ্লাইটে ইতালি পাঠানোর শর্তে। কিন্তু তিন দেশ ঘুরিয়ে লিবিয়াতে তাদের নিয়ে রাখা হয় পাঁচ মাস। সেখানে ঠিকমতো খাবারও দেওয়া হতো না। অভিযোগ উঠেছে, এর প্রতিবাদ করায় এজেন্সির মালিক এনাম আহমেদ অনেকের স্বজনকে জিম্মি করে অতিরিক্ত তিন লাখ টাকা করে বাড়তি আদায় করেছে। ভূমধ্যসাগরে এই মর্মান্তিক ঘটনার পর সে পালিয়েছে। গোয়েন্দারা তার সন্ধানে মাঠে নেমেছেন। প্রশ্ন হচ্ছে, এত তুঘলকিকাণ্ড চলছে কী করে? আমাদের গোয়েন্দারা এ ব্যাপারে এত অন্ধকারে কেন?

বৈধভাবে মালয়েশিয়া যাওয়ার সুযোগ না পেয়ে অতীতে অনেকে অবৈধ পন্থায় দেশটিতে যাওয়ার প্রয়াস চালিয়েছে এবং পরে থাইল্যান্ডের গহিন অরণ্যে অবৈধ অভিবাসন প্রত্যাশীদের গণকবর আবিস্কৃৃত হলে বিশ্বজুড়ে শুরু হয় হৈচৈ। সে সময় মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া থেকেও বাংলাদেশি অভিবাসীদের উদ্ধার করা হয়েছিল। এই ঘটনা দূর অতীতের নয়। এই বাস্তবতা সামনে রেখে আমাদের নীতিনির্ধারকদের অবশ্যই নতুন করে ভাবতে হবে। ভূমধ্যসাগর ট্র্যাজেডি প্রমাণ করল, এ দেশের কর্মহীনরা কর্মসন্ধানে কিংবা উপার্জনে বিপজ্জনক পথে পা বাড়াচ্ছে নানারকম অপকৌশলের ফাঁদে পড়ে। অবৈধ অভিবাসীদের ইউরোপ থেকে বিতারিত করা হচ্ছে। ইউরোপ-আমেরিকা কিংবা যে কোনো উন্নত দেশে এখন অবৈধপথে যাওয়ার যেমন উপায় নেই, তেমনি দক্ষ জনশক্তি গড়ারও বিকল্প নেই। এ জন্য আমাদের দেশে জনসচেতনতা বাড়াতে উদ্যোগ নেওয়াও সমভাবেই জরুরি। ভূমধ্যসাগর ট্র্যাজেডি থেকে সৌভাগ্যক্রমে যারা বেঁচে গেছে তাদের কাছ থেকে নিশ্চয়ই দালালদের সন্ধানসূত্র মিলবে। দালালদের কেশাগ্র স্পর্শে নির্মোহ-কঠোর অবস্থান নিতেই হবে।

লিবিয়ায় অবস্থানরত বাংলাদেশিদের ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়াও জরুরি। বৈধভাবে জনশক্তি রপ্তানির পথ সুগম করতে হবে। এ ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা ফেরাতেই হবে। একটা বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে অবশ্যই আমলে রাখতে হবে যে, এত ঝুঁকি ও বিপত্তির পরও অবৈধ অভিবাসন প্রক্রিয়ার পথ রুদ্ধ হচ্ছে না। এ ক্ষেত্রে সরকারের করণীয় সম্পর্কে অনেক ক্ষেত্রেই ঘাটতি রয়েছে- এই অভিযোগ খণ্ডাতে হলে সরকারের দায়িত্বশীলদের কাজের মধ্য দিয়েই দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করতে হবে। অভিবাসন ইচ্ছুকরা যাতে বৈধপথে এগোতে পারে এই প্রক্রিয়ার রাস্তা সহজ করা দরকার। শুধু পাচারকারীরাই নয়, রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর দিকেও কঠোর দৃষ্টি দিতে হবে।

লেখক: সাংবাদিক
deba_bishnu@yahoo.com

মন্তব্য


অন্যান্য