চতুরঙ্গ

ডেডলাইন ৩০ এপ্রিল :ট্রাম্প এবং নো-ট্রাম্প

প্রকাশ : ২৭ এপ্রিল ২০১৯

ডেডলাইন ৩০ এপ্রিল :ট্রাম্প এবং নো-ট্রাম্প

খালেদা জিয়া ও আবদুল জলিল

  অজয় দাশগুপ্ত

ঠিক ১৫ বছর এক মাস আগে ২০০৪ সালের ২২ মার্চ প্রথম আলো একটি খবর প্রকাশ করেছিল, যার শিরোনাম ছিল- '৩০ এপ্রিলের মধ্যে সরকার পতন- জলিল'। খবরে বলা হয়, 'আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবদুল জলিল আগামী ৩০ এপ্রিলের মধ্যেই ক্ষমতাসীন জোটের সরকারের পতন ঘটবে বলে দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা দিয়ে বলেছেন, একমাত্র আল্লাহ ছাড়া কোনো শক্তি এ সরকারের পতন ঠেকিয়ে রাখতে পারবে না। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ গণতান্ত্রিক পথ ছাড়া বিকল্প পন্থায় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা বদলের নীতিতে বিশ্বাস করে না। সুতরাং গণআন্দোলনের মুখেই ৩০ এপ্রিলের মধ্যে সরকার পদত্যাগ করতে বাধ্য হবে।'

তার এ বক্তব্যের পরপরই 'জলিলের ট্রাম্প কার্ড' কথাটি মুখে মুখে ফিরতে থাকে। আমরা তাস খেলায় ট্রাম্প ও নো-ট্রাম্প শুনে থাকি। ব্রিজে ডাক নেওয়ার সময় 'রঙ' যে জুটির পক্ষে থাকে, তারা ক্লাবসের দুই কড়া দিয়েই স্পেডের টেক্কাকে ঘায়েল করতে পারে। আর নো-ট্রাম্প কল হলে সবচেয়ে শক্তিশালী তাস স্পেডের টেক্কাতেও পিঠ মেলে না। আবদুল জলিল তার হাতে কী তাস আছে, যা দিয়ে নো-ট্রাম্প খেলা খেলবেন বা প্রতিপক্ষের কার্ড ট্রাম্প করবেন- সেটা খোলাসা করেননি। তবে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীকে যে যথেষ্ট দুশ্চিন্তায় ফেলতে পেরেছিলেন তিনি- তাতে সন্দেহ নেই।

১৫ বছর পর বিএনপি ফের ট্রাম্প কার্ড নিয়ে দুশ্চিন্তায়। ৩০ ডিসেম্বর (২০১৮) অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি মাত্র ৬টি আসনে জয়ী হয়। তাদের নির্বাচনী জোটের মিত্র ড. কামাল হোসেনের গণফোরাম থেকে জয়ী হন আরও দু'জন। এই ৮ জনের মধ্যে তিনজন ইতিমধ্যে স্পিকারের কাছে শপথ নিয়েছেন। ২৯ এপ্রিলের মধ্যে শপথ না নিলে বাকি পাঁচজন সংসদ সদস্য পদের যোগ্যতা হারাবেন। এ অবস্থায় তারা কী করবেন? আইনের প্যাঁচে তাদের ফেলা সম্ভব নয়- সেটা স্পষ্ট হয়ে গেছে। তারা নিজ নিজ দল থেকে পদত্যাগ করলে সদস্যপদ হারাবেন। কিন্তু দল থেকে বহিস্কার করা হলে সদস্যপদ হারাবেন না। যারা সদস্য হিসেবে শপথ নিয়েছেন, তারা এটা জেনে-বুঝেই অগ্রসর হয়েছেন।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেছেন, 'সাহসী লোক তৈরি করতে পারেননি খালেদা জিয়া। এটা তার ব্যর্থতা এবং তাকে তা বলেছিও। তার মুক্তির দাবিতে গণঅনশন ও মানববন্ধনের মতো কর্মসূচি পালিত হয়েছে। কিন্তু এসব সরকারের ওপর প্রভাব ফেলতে পারছে না।' বিএনপির যে ৬ জন সংসদে নির্বাচিত হয়েছেন, তারা খালেদা জিয়ার মুক্তি ছাড়া শপথ গ্রহণ করলে 'বিএনপির কর্মী-সমর্থকদের হাতে পিটুনি খেলে' কিছু করার নেই- এমন কথাও তিনি বলেছেন। ২৪ এপ্রিল তিনি বলেছেন, দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে যারা শপথ নেবেন, তারা গণদুশন। তবে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম বলেছেন, শপথ গ্রহণের জন্য সরকারের চাপ আছে। কী ধরনের চাপ, সেটা তিনি খোলাসা করেননি। দলের একজন সদস্য জাহিদুর রহমান জাহিদ ইতিমধ্যে শপথ নিয়েছেন, যিনি মির্জা ফখরুল ইসলামের নিজ জেলা ঠাকুরগাঁও থেকে নির্বাচিত। শপথ গ্রহণের পর কয়েক দিন অতিক্রান্ত হলেও তাকে বিএনপি কর্মী-সমর্থকরা হয়রানি-হেনস্থা করেছে, এমনটি শোনা যায়নি। তবে এটা কি ১৫ বছর আগের 'জলিলের ট্রাম্প কার্ড'-এর মতো ফাঁকা আওয়াজ?

আবদুল জলিলের কথায় ফিরে যাই। ৩০ এপ্রিল সরকার পতন হবে- ২১ মার্চের এ ঘোষণার কয়েক দিন যেতে না যেতেই আওয়ামী লীগ ৩০ মার্চ রাজধানীর পল্লবী থেকে বাহাদুর শহ পার্ক পর্যন্ত ২২ কিলোমিটার 'গণঅনাস্থা প্রাচীর' গড়ে তুলেছিল, যাকে সংবাদপত্রে 'বাংলাদেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন' সফল রাজনৈতিক কর্মসূচি হিসেবে অভিহিত করা হয়। এ কর্মসূচিতে বিএনপি-জামায়াত সরকারের পদত্যাগের দাবি সামনে আনা হয়েছিল। তবে তাতে সরকারের টনক নড়েনি। এ কর্মসূচির ঠিক দু'দিন পর ১ এপ্রিল চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর এক প্রান্তে সরকার নিয়ন্ত্রিত চট্টগ্রাম ইউরিয়া সার কারখানায় ধরা পড়ে ১০ ট্রাক অস্ত্রের চালান, যাতে ছিল ১০ হাজার বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র, ৫ হাজার হ্যান্ড গ্রেনেড ও ৩ লাখ গুলি। সে সময়ে শিল্পমন্ত্রী ছিলেন ১৯৭১ সালের যুদ্ধাপরাধী, জামায়াতে ইসলামীর আমির মতিউর রহমান নিজামী। তবে প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া, তার পুত্র 'হাওয়া ভবনের' সর্বময় কর্তা তারেক রহমান এবং একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তারা এই অস্ত্রের চালান অবৈধ পথে বাংলাদেশের একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের জেটিতে প্রবেশ করার বিষয়টি জানতেন- সেটা পরবর্তী সময়ে প্রমাণিত। বিভিন্ন সূত্র বলেছে, অস্ত্রের চালান এসেছিল ভারতের আসাম রাজ্যের সরকারবিরোধী কোনো গোষ্ঠীর জন্য। এ গোষ্ঠীর জন্য সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল বিএনপি-জামায়াতে ইসলামীর সরকার। পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইর মদদ ছিল এ ঘটনার পেছনে- তেমন কথাও শোনা যায়। তারা ভারতের কংগ্রেস সরকারকে দুর্বল করতে আসামের একটি গোষ্ঠীকে মদদ দিচ্ছিল এবং এ কাজে খালেদা জিয়ার সরকারকে ব্যবহার করে। কাজটি ভালো হয়নি এবং বিএনপিকে তার খেসারত পরবর্তী সময়ে দিতে হয়েছে। এখনও কি দিচ্ছে না? বাংলাদেশের ভূখণ্ড নিকট প্রতিবেশী দেশ ভারতের বিরুদ্ধে এভাবে ব্যবহার করতে দেওয়া অনুচিত কাজ হয়েছে। পাকিস্তান ভারতকে দুর্বল করতে চায় তাদের স্বার্থে। বাংলাদেশ কেন তাদের স্বার্থ হাসিলের জন্য কাজ করবে?

৩০ এপ্রিল খালেদা জিয়ার সরকারকে ট্রাম্প কার্ড দেখানো হবে- এমন ঘোষণার পর আওয়ামী লীগ ৬ ও ৭ এপ্রিল দেশব্যাপী দু'দিনের সকাল-সন্ধ্যা হরতাল আহ্বান করে। এপ্রিলের মাঝামাঝি ফের দু'দিন সকাল-সন্ধ্যা হরতাল ডাকা হয়। দেশের কোথাও বড় ধরনের সংঘাত হয়নি, তবে পুলিশ ছিল বেজায় তৎপর। কোথাও পিকেটিং করতে দেওয়া হয়নি।

২১ এপ্রিল আওয়ামী লীগ 'দুর্নীতির কেন্দ্র' হাওয়া ভবন ঘেরাও কর্মসূচি দেয়, কিন্তু বনানী এলাকায় রীতিমতো কারফিউ জারি করে পুলিশ। এদিন তারেক রহমান ও তার ভাই আরাফাত রহমান হাওয়া ভবনসংলগ্ন মাঠে ক্রিকেট খেলেন। উদ্দেশ্য ছিল সবকিছু শান্ত ও নিয়ন্ত্রণে- জনমনে এমন ধারণা দেওয়া। এ সময়ে চলে গণগ্রেফতার। ২৬ এপ্রিল (২০০৪) যুগান্তর জানায়, 'গণগ্রেফতারের শিকার হাজার হাজার নিরীহ লোক দিয়ে জেলখানা ভরে ফেলা হয়েছে। জেলের খোলা আকাশের নিচেও তারা থাকতে বাধ্য হচ্ছে। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের কর্মকর্তারা বলেন, যেখানে আড়াই হাজার বন্দি রাখার ব্যবস্থা আছে, সেখানে রয়েছে ৮-১০ হাজার। তার ওপর ৩০ এপ্রিল সামনে রেখে আরও প্রায় ৮ হাজার গ্রেফতার হয়েছে কেবল ঢাকা শহরে।'

বিএনপি টানা সাড়ে ১২ বছর ক্ষমতার বাইরে। এর মধ্যে ১০ বছরের বেশি ক্ষমতায় আওয়ামী লীগ। বিএনপি এ সময়ে নিয়মিত বিরতিতে সরকার পতনের ডাক দিয়েছে। ভাগ্যিস, সংবাদপত্র বা টেলিভিশনের খবরে কেউ পূর্ণ আস্থা রাখেনি! আবদুল জলিলের ট্রাম্প কার্ড খেলা হয়নি। বিএনপি সে যাত্রা ক্ষমতায় টিকে গিয়েছিল। ২৯ ও ৩০ এপ্রিল টানা হরতাল ডেকেই মুখ রক্ষা করেছিল আওয়ামী লীগ। আবদুল জলিল বলেছিলেন, সরকার পতনে আরও কিছুদিন সময় লাগবে।

৩০ এপ্রিলের উত্তাপ কাটতে না কাটতেই ৭ মে টঙ্গীর জনপ্রিয় রাজনৈতিক নেতা ও মুক্তিযোদ্ধা আহ্‌সান উল্লাহ্‌ মাস্টারকে প্রকাশ্যে হত্যা করা হয়। এ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে ৯ মে দেশব্যাপী হরতাল পালিত হয়। ৩০ এপ্রিল বিএনপি-জামায়াতে ইসলামী সরকারের পতন ঘটাতে না পারা এবং আহ্‌সান উল্লাহ্‌ মাস্টারের নির্মম হত্যাকাণ্ডের পরও আওয়ামী লীগ হতোদ্যম হয়নি। তারা রাজনৈতিক কৌশলের পরিবর্তন ঘটায়। ১২ মে আওয়ামী লীগদলীয় সদস্যরা সংসদে যোগ দেন ১১ মাস পর এবং আহ্‌সান উল্লাহ্‌ মাস্টার হত্যার বিচার দাবি করে বক্তব্য রাখেন। ফলে সবার দৃষ্টি চলে যায় সংসদে দু'পক্ষের বক্তব্যের প্রতি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ হত্যাকাণ্ডকে আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের ফল অভিহিত করে যে প্রেসনোট দিয়েছিলেন, সেটা প্রত্যাহারের দাবি করে আওয়ামী লীগ। এর ফলে ৩০ এপ্রিল সরকার পতনের ব্যর্থতা চাপা পড়ে যায়।

বর্তমান বিএনপি নেতৃত্ব এ ধরনের রাজনৈতিক কৌশল কেন অনুসরণ করতে পারছে না? রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, সামরিক শাসনামলে ক্ষমতার প্রভাবে যে দলের জন্ম তার পক্ষে পরিস্থিতি বুঝে রাজনৈতিক কৌশল গ্রহণ সব সময় সম্ভব হয় না। বরং তারা খেই হারিয়ে ফেলে। একটানা প্রায় চার দশক দলটি যে টিকে আছে, সেটাই তো অনেক বেশি। আওয়ামী লীগের ৩০ এপ্রিলের ট্রাম্প কার্ড সফল হয়নি, কিন্তু বিএনপি সরকার তাদের কয়েক হাজার কর্মীকে গ্রেফতার করেছিল। ৩০ ডিসেম্বরের (২০১৮) নির্বাচন নির্বিঘ্নে পার করে নিতে আওয়ামী লীগ সরকার আগের কয়েকটি দিনে বিএনপির নেতা-কর্মীদের পাইকারি হারে গ্রেফতার করেছে। ফলে দলটি কার্যত নির্বিষ হয়ে পড়ে। নির্বাচনে জয়ী হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ তারা সহজেই গ্রহণ করতে পারে। এটা বিএনপির জন্য বড় ধাক্কা। নির্বাচনের ১০ মাসেরও বেশি আগে ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি খালেদা জিয়াকে দুর্নীতির মামলায় দণ্ডিত ব্যক্তি হিসেবে কারাগারে নেওয়া হয়। মামলা চলছিল নাজিমুদ্দিন রোডের পুরাতন জেলখানার পাশের একটি ভবনে। কয়েক পা দূরেই জেলখানায় খালেদা জিয়াকে রাখার জন্য একটি এলাকা তৈরি করে রাখা হয়েছিল- সে খবর বিএনপির শীর্ষ নেতাদের জানা থাকার কথা। তবে ধরে নিতে পারি, তারা বিষয়টিকে তেমন আমলে নেননি বা গুরুত্ব দেননি। খালেদার প্রকৃত জেল জীবনের প্রায় ১৪ মাস পর তারা নিশ্চয়ই এ খবর রাখেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতাল থেকে খালেদা জিয়াকে জেলখানায় ফেরত নেওয়ার পরিকল্পনা সরকারের সম্ভবত নেই। কারা প্রশাসনের সঙ্গে যুক্ত এক ব্যক্তিকে সম্প্রতি জিজ্ঞেস করেছিলাম, 'আগের সম্মানিত অতিথির জন্য তার কক্ষটি কি নিয়মিত পরিস্কার রাখা হচ্ছে?' উত্তরে তিনি বলেন, 'সম্ভবত আসছেন না।'

তাহলে খালেদা জিয়া কি হাসপাতালেই থাকবেন? না-কি, দেশের বাইরে যাবেন চিকিৎসার জন্য? গেলে জামিনে যাবেন? না-কি প্যারোলে? না-কি মুক্ত মানুষ হিসেবে? ৩০ এপ্রিলের মধ্যে এসব প্রশ্নের উত্তর মিলতেই পারে।

মন্তব্য


অন্যান্য