চতুরঙ্গ

সুবর্ণচরে বর্বরতার দীর্ঘ ছায়া

প্রকাশ : ০২ এপ্রিল ২০১৯ | আপডেট : ০২ এপ্রিল ২০১৯

সুবর্ণচরে বর্বরতার দীর্ঘ ছায়া

  দেবব্রত চক্রবর্তী বিষ্ণু

সেই কবে ওপার বাংলার শক্তিমান কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায় লিখেছিলেন—'মানুষ বড়ো কাঁদছে, তুমি মানুষ হয়ে পাশে দাঁড়াও/মানুষই ফাঁদ পাতছে, তুমি পাখির মতো পাশে দাঁড়াও/মানুষ বড় একলা, তুমি তাহার পাশে এসে দাঁড়াও/তোমাকে সেই সকাল থেকে তোমার মতো মনে পড়ছে/সন্ধে হলে মনে পড়ছে, রাতের বেলা মনে পড়ছে/মানুষ বড়ো একলা, তুমি তাহার পাশে এসে দাঁড়াও/এসে দাঁড়াও, ভেসে দাঁড়াও এবং ভালোবেসে দাঁড়াও/মানুষ বড়ো কাঁদছে, তুমি মানুষ হয়ে পাশে দাঁড়াও/মানুষ বড়ো একলা, তুমি তাহার পাশে এসে দাঁড়াও।' কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায় কত দশক আগে তার 'দাঁড়াও' কবিতায় মানুষের কোন বিপন্ন-বিপর্যস্ত চিত্র প্রত্যক্ষ করে এই পঙ্ক্তিগুলো লিখেছিলেন জানি না। কিন্তু এটুকু আমরা বিদ্যমান বাস্তবতায় বারবারই জানছি যে, মানুষ এখনও বড় একলা।

মানুষ এখনও বড় অসহায়। মানুষ এখনও কাঁদছে অস্তিত্ব রক্ষার ন্যূনতম অধিকারের তাগিদে এবং মানুষের (এদের মানুষ না বলে মানুষ নামধারী রাক্ষস-দানব বলাই শ্রেয়) ফাঁদে মানুষ বড় অসহায়ত্ব বোধ করছে। 

আজ থেকে সাড়ে চার দশক আগে যে অন্ধকারের বিরুদ্ধে, যে অপছায়ার বিরুদ্ধে, যে অপশক্তির বিরুদ্ধে এ দেশের মুক্তিকামী-প্রগতিবাদী মানুষ ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে এক কাতারে যূথবদ্ধ হয়ে মুক্তির লক্ষ্যে বিপুল আত্মত্যাগ আর বিসর্জন দিয়ে এই রক্তস্নাত বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটিয়েছিল, অশুভ অনেক কিছুর কবর রচনা করে সেই দেশে অন্ধকারের শক্তি এখনও ছোবল বসাচ্ছে। বর্বরতার দীর্ঘছায়ায় যেন ঢাকা পড়ে যায় দেশ-সমাজ। যদি বলি এখানে এখন পানির স্তরেরও নিচে নেমে গেছে সভ্যতা-মানবতার স্তর, তবে অত্যুক্তি হবে কি-না জানি না।

সুবর্ণচর। আহা কী সুন্দর নাম। যেন মনে হয় প্রকৃতি থেকে ধার করে নেওয়া এই শব্দটিই হয়ে গেল এ দেশের একটি জনপদের নাম। কিন্তু সেখানে (সারাদেশেই কমবেশি বর্বরতার এমন ছায়া রয়েছে) ধর্ষণ যেন দুরারোগ্য হয়ে উঠেছে, রাক্ষস-দানবের অরণ্যে রূপ নিয়েছে। সুবর্ণচর—এই সুন্দর নামের জনপদটির সুজলা-সুফলা-শস্য-শ্যামলা রূপটি যেন দানবের দল কেড়ে নিয়েছে। তাদের ছোবলাক্রান্ত জনপদটির সঙ্গে বিভীষিকা শব্দটি যুক্ত হয়ে পড়েছে। নেকড়ের দল হামলে পড়ছে নারীর (ব্যাপকার্থে মানুষ) ওপর, তার সর্বস্ব কেড়ে নিয়ে পৈশাচিক উল্লাসে মত্ত হচ্ছে! এই নিষ্ঠুরতা-বর্বরতায় ক্ষতবিক্ষত নারী দেহে কেউ কেউ ছবি তুলছে। ঘরে স্বামী-সন্তান-স্বজনরা নির্বাক-নিথর হয়ে আছে। সাধ্যি নেই অসহায়ত্বের বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়ে বলার—এই পৈশাচিকতায় উল্লসিত জনপদ আমার না। 

গত বছরের ডিসেম্বরে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিজের পছন্দের প্রতীকে ভোট দেওয়ায় গণধর্ষণের শিকার হয়েছিলেন নোয়াখালীর সুবর্ণচরের যে গৃহবধূ, দেশব্যাপী আলোচিত সেই ঘটনার রেশ এখনও কাটেনি। এরই মধ্যে আবার একই ঘটনা ঘটল একই উপজেলায়! প্রেক্ষাপট এক, শুধু পার্থক্য সময়ের। এবার উপজেলা নির্বাচনে পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দেওয়ায় এক বধূর ওপর হামলে পড়ল হায়ানার দল। স্বামীকে আটকে রেখে ছয় সন্তানের জননীকে পাষণ্ডরা ধর্ষণ করল, মারধর করল। ৩১ মার্চ রোববার রাতে সুবর্ণচরের চরজব্বার ইউনিয়নের একটি মৎস্য খামারে যেন নেমে এসেছিল মানবজীবনে বিপর্যয়ের হিংস্র থাবা। এবারও অভিযোগের তীর স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের কিছু বলবানের দিকে।

এর নাম রাজনীতি? আমরা বিস্মৃত হইনি ২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচনোত্তর বিএনপি-জামায়াত জোটের তথাকথিত বিজয়োল্লাসের সেই মর্মন্তুদ উপাখ্যানের অধ্যায়। পূর্ণিমা, কটুরানী দাশ, বনি বাইনসহ কত নারীই সেই দুঃসহতার বেদনার্থ স্মারক হয়ে আছেন। যারা রাজনীতির ডান-বাম কিছুই বুঝেন না এ রকম মূঢ়-ম্লান জীবনধারীরাও বাদ যাননি তখন হিংস্রতার থাবা থেকে। রামশীল, লালমোহনে তখন পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে মনে হয়েছিল বিজয় ('৭১-এর জয়োল্লাস) দেখিনি, কিন্তু স্বাধীন দেশে পরাজয়ের দীর্ঘ ছায়া দেখছি। সময় অনেক বয়ে গেছে, নদ-নদীতে জল অনেক গড়িয়ে আজ ২০১৯-এ এসেও এ কোন বর্বরতার দীর্ঘ ছায়া আমরা প্রত্যক্ষ করছি! সবকিছুর শেষ আছে কিন্তু মানুষের অধিকারের কোনো শেষ নেই—এই সত্য বাণীর মর্মার্থ এখানে কতভাবেই না বিপর্যস্ত। ধর্ষণের অনেক কারণ থাকতে পারে, কিন্তু এর সমাধানে যদি কিছু করণীয় থাকে তাহলে তা হচ্ছে—দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি। কিন্তু এখানে এর নজির পুষ্ট নয়। ২০০১-এর ঘটনাবলির প্রতীকার কি দৃষ্টান্তযোগ্য হয়ে আমাদের সামনে আছে? 

এখানে ধর্ষণের পরে ভুক্তভোগীকে যে সামাজিক গঞ্জনা ও আইনি জটিলতার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়, তাতেই বহু ঘটনা ধামাচাপা পড়ে যায়। সাহস করে যারা অপরাধীর শাস্তির দাবিতে রাস্তায় দাঁড়ান, তারা হন হেনস্তার শিকার—এ দৃষ্টান্তও তো আছে। যদি কোনোভাবেই এই স্তরটা পার হওয়া যায়, তাহলে আসে আসল পরীক্ষা। পরীক্ষাটা হলো শাস্তি প্রদানের আইনি প্রক্রিয়া। সেই প্রক্রিয়ায় সিংহভাগ ক্ষেত্রেই জয়ী হয় ধর্ষক। তাই আবারও তারা তৈরি হয় অপরাধ সংঘটনে ও অন্য বন্যদের উৎসাহী করতে।

২০০২ থেকে ২০১৬ পর্যন্ত ধর্ষণ-নির্যাতনের আট হাজার মামলার পরিস্থিতি নিয়ে একটি জাতীয় দৈনিক দীর্ঘ অনুসন্ধান করেছিল। দেখা গিয়েছিল, অর্ধেক মামলার নিষ্পত্তি হয়েছে ঠিকই কিন্তু সাজা হয়েছে মাত্র ৩ শতাংশ মামলায়! স্বল্প পরিসরে ওই অনুসন্ধান থেকেই ধর্ষকের শাস্তি না হওয়ার বিষয়টি আঁচ করা যায়। অনেক ক্ষেত্রে ধর্ষিতা কিংবা তার পরিবার ভয়ে ওই পর্যন্ত যেতেই চান না। অপরাধ করে পার পেয়ে যাওয়ার নানা প্রক্রিয়ার কত নজিরই না আছে। ধর্ষিতার মানসিক প্রতিক্রিয়া বলে শেষ করা যাবে না। দুঃস্বপ্ন তার স্থায়ী সঙ্গী হয়ে যায়।

বিচারহীনতার অপসংস্কৃতির বিরূপ প্রভাব সমাজে কতভাগেই না পড়ছে। আমরা নিশ্চয় ভুলে যাইনি রাজধানীর বনানীর দ্য রেইনট্রি হোটেলে বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া দুই ছাত্রীকে ধর্ষণের ঘটনা। বিত্তশালী ধর্ষকদের নিয়ে কত কিছুই না ঘটে গেল। শেষ পর্যন্ত হয়তো দেখা যাবে আইনের ফাঁক গলে ওরা মুক্তি পেয়ে গেছে। মনে আছে রূপার কথাও, যে মেয়েটি চলন্ত বাসে ধর্ষণের শিকার হয়েছিল। তার ওপর হামলে পড়া হায়ানারা দণ্ডিত হওয়ার পর বলাবলি হচ্ছিল এবার হয়তো দূর হবে অন্ধকার। কিন্তু প্রত্যাশা এর কিছুদিন পরই হোঁচট খেল আরেক রূপা উপাখ্যানের কারণে। যে রাজনীতি ও ভোটের বলি হলেন সুবর্ণচরের গৃহবধূরা কিংবা এরও আগে কটু রানী দাশরা তাদের ও তাদের পরিবারের রাজনীতির প্রতি যে ঘৃণা তৈরি হলো এর প্রভাবও বিরূপ হতে বাধ্য। বস্তুত এভাবেই কোনো একটি বিষয়ের প্রতি ব্যক্তি মানুষের ঘৃণা অনেকের মধ্যে ছড়ায়।

'গণধর্ষণ' শব্দটির ভার এতটাই বেশি যে, তা লিখতে গেলেও কেন জানি আঙুল অচল হয়ে যায়। কিন্তু এটা তো সত্য যে, এই গণধর্ষণগুলোর নিষ্ঠুর অভিজ্ঞতার গুরুভার সারাটা জীবন বয়ে বেড়াতে হবে সুবর্ণচরের এই নারীদের। তবে তাদের আর্তনাদ এখন আর নির্জন সুবর্ণচরে আটকে নেই, ছড়িয়ে পড়েছে গোটা বাংলাদেশে। তারা তাদের প্রতি হওয়া অন্যায়ের সুবিচার পাবেন কি-না জানি না, তবে ওই যে বলা হয় বাংলাদেশ বিশ্বের বুকে বিস্ময় জাগানিয়া নারীর ক্ষমতায়নের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত তার প্রতি সুবিচার হচ্ছে কি? একজন খুনি কিংবা ধর্ষক একটি রাজনৈতিক দলের আদর্শকে কতটা ভুলূণ্ঠিত করে তা কি আদৌ খতিয়ে দেখবেন রাজনৈতিক নেতারা? শাক দিয়ে মাছ ঢাকা যায় কি? যা সত্য তা প্রকাশ হবেই। জনতার আদালতে কিছুই অজানা থাকে না, থাকবে না।

লেখক: সাংবাদিক
deba_bishnu@yahoo.com

মন্তব্য


অন্যান্য