চতুরঙ্গ

আওয়ামী লীগ ও বিএনপির অরাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ

প্রকাশ : ৩১ মার্চ ২০১৯

আওয়ামী লীগ ও বিএনপির অরাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ

  অজয় দাশগুপ্ত

আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা, যাদের মধ্যে মন্ত্রিসভার সদস্যও রয়েছেন- নিয়মিত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপিকে উদ্দেশ করে মন্তব্য-সমালোচনা করে থাকেন। তারা বলেন- বিএনপি আন্দোলনেও ব্যর্থ, ভোটের রাজনীতিতেও ব্যর্থ। এটা কটাক্ষ করে বলা। বিএনপি আন্দোলনে বা ভোটে সফল হলে নিশ্চয়ই তাদের জন্য সুখের বিষয় নয়।

তবে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি এবং ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরের জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগের সফলতা থেকে বিএনপির বড় ধরনের ব্যর্থতার সমর্থন মেলে। সিটি করপোরেশন, উপজেলা পরিষদ, ইউনিয়ন পরিষদ ও পৌরসভা নির্বাচনেও আওয়ামী লীগ তার কুশলতা সফলভাবে প্রয়োগ করতে পারছে।

বলা যায়, এসব ক্ষেত্রে বিএনপি একেবারেই অসহায়ের মতো একরূপ বিনাযুদ্ধে আত্মসমর্পণ করেছে। তারা জাতীয় সংসদে নেই; রাজপথেও নেই। এ দলটির শীর্ষ দুই নেতা দুর্নীতির মামলায় সাজাপ্রাপ্ত। চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া জেলে প্রায় ১৪ মাস। এক যুগ হয়ে গেল, তারেক রহমান দেশের বাইরে 'নির্বাসিত জীবন যাপান করছেন'।

তাদের স্বাভাবিক রাজনৈতিক জীবনে ফিরিয়ে আনার দাবি বিএনপির রয়েছে, তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু প্রকৃত অর্থে এ দাবির সমর্থনে 'একটি গাছের পাতাও কি নড়েছে'? এ থেকে একটি উপসংহার কিন্তু টানাই যায়- এক, দেশের বড় অংশের মানুষের এ নিয়ে তেমন মাথাব্যথা নেই। দুই, বিএনপির নেতাকর্মীরাও এ দু'জন নেতার জন্য জান-প্রাণ দিয়ে মাঠে নামতে তেমন মনের জোর পাচ্ছেন না।

তবে বিএনপির সার্থকতা অবশ্যই রয়েছে একটি ক্ষেত্রে- আওয়ামী লীগের অনেক নেতাই মেঠো বক্তৃতাতে বিএনপিকে প্রবল শক্তিশালী প্রতিপক্ষ হিসেবে গণ্য করে বক্তব্য রাখেন। এমনকি যে দশম জাতীয় সংসদে (২০১৪-১৮) বিএনপির একজন সদস্যও ছিলেন না, সে সংসদে প্রদত্ত আওয়ামী লীগ সদস্যদের বক্তব্যের উল্লেখযোগ্য অংশজুড়ে ছিল বিএনপির অতীত ও বর্তমান (সে সময়ের) কর্মকাণ্ডের সমালোচনা।

একাদশ জাতীয় সংসদে বিএনপি অংশগ্রহণ করেছিল। কিন্তু ফল হয়েছে শোচনীয়। একদিকে পূর্বতন ২০ দলীয় জোট অক্ষুণ্ণ রাখতে পেরেছে তারা- পাশাপাশি ড. কামাল হোসেন, আ স ম আবদুর রব, ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, কাদের সিদ্দিকী, মাহমুদুর রহমান মান্না, সুলতান মোহাম্মদ মনসুর প্রমুখ সুপরিচিত রাজনৈতিক ব্যক্তির সমন্বয়ে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট- বিএনপির জোটের রাজনীতির সাফল্যেরই সাক্ষ্য দেবে। এর তুলনায় আওয়ামী লীগের জোট যথেষ্ট 'পানসে' ছিল। কিন্তু নির্বাচনে আওয়ামী লীগের জয়জয়কার। বিএনপি ও তাদের জোটের ভাগ্যে মাত্রই হালি দুয়েক সদস্য। কিন্তু এমন বিপর্যয়ের পরও তারাই রয়ে গেছে আওয়ামী লীগের নিত্যদিনের টার্গেট। রাজনৈতিক লড়াইয়ে আওয়ামী লীগের কাছে গো-হারার পরও তারা থেকে যাচ্ছে যথেষ্ট প্রাসঙ্গিক।

বিএনপি দাবি করে থাকে, প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ব্যবহার করে তাদের ক্ষমতায় যাওয়ার পথ ঠেকিয়ে রাখছে আওয়ামী লীগ। ভারত-যুক্তরাষ্ট্র-ইউরোপ-চীন ফ্যাক্টরও তাদের অনুকূলে আনার যাবতীয় চেষ্টা ব্যাহত হয়েছে। এসব উড়িয়ে দেওয়ার উপায় নেই। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ ডাকসু নির্বাচনের ফল তাদের জন্য যারপরনাই বিস্ময় ও হতাশার। সন্দেহ নেই যে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ছিল ছাত্রলীগের দখলে। দিনের বেলা মধুর ক্যান্টিনে কেবলই ছাত্রলীগ। ছাত্রদের সব ছাত্রাবাস তাদের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণে। ছাত্রীদের হলগুলোর কর্তৃপক্ষ ছাত্রলীগের প্রতি যথেষ্ট সহানুভূতিশীল ছিল। তারপরও ডাকসুর ভিপি পদে জয়ী হয়েছে 'কোটা' আন্দোলনের নেতা, বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের নিয়মিত ছাত্র নুরুল হক। ছাত্রীদের হলগুলোতে ছাত্রলীগবিরোধী মঞ্চের জয়জয়কার, যাতে নেই জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল। ছাত্রদের একাধিক হলেও ছাত্রলীগবিরোধীরা ভাল ফল করেছে।

বলা যায়, যেখানে ছাত্রলীগের বিকল্প বেছে নেওয়া হয়েছে, সেখানে ছাত্রদলের স্থান হয়নি। আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের কেউ কেউ ধারণা করেছিলেন, কোটা আন্দোলনের সামনের সারিতে থাকা ছাত্রদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নেই। কিন্তু ভিপি পদে নুরুল হকের জয় এবং অন্য পদগুলোতে ভালো ভোট প্রমাণ করে- একটি 'অরাজনৈতিক' বিকল্প ছাত্রশক্তি দৃশ্যমান।

বিএনপি ও জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের নেতৃত্ব কি এসব জাতীয় সংসদ, স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন স্তরের নির্বাচন ও ডাকসু-হল সংসদ নির্বাচনে বিপর্যয়ের কারণ মূল্যায়ন করে দেখছেন? বাংলাদেশের ছাত্র আন্দোলনের ইতিহাসে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের মতো দীর্ঘদিন জনপ্রিয়তা ধরে রাখতে পারেনি আর কোনো ছাত্র সংগঠন। বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন মোটামুটি দুই দশক সম্মুখ সারির সংগঠন ছিল। ১৯৭২ সালে তারা ডাকসু, রাকসু, চাকসু, বুয়েট ও বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে এককভাবে জয়ী হয়। তারপর জনপ্রিয়তায় ভাটার টান যে শুরু, আর তা পুনরুদ্ধার করা যায়নি। আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগ ৭০ বছর ধরেই জনপ্রিয়।

গণতান্ত্রিক সংগ্রামে তারা অসম সাহসের পরিচয় দিয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও চেতনা জাগরূক রাখা, বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা ও এ দেশটির অগ্রযাত্রায় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অনন্য অবদান মুছে দেওয়ার অপচেষ্টা রুখে দিতে তারা অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। কিন্তু বাংলাদেশের চার যুগে তারা ডাকসু কিংবা অন্য প্রধান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্র সংসদ নির্বাচনে এককভাবে জয়ী হয়নি- এটাই বাস্তবতা। সদ্য সমাপ্ত ডাকসু নির্বাচনেও তারা প্রধান পদটি হারিয়েছে। কেন এমনটি হতে পারল- নিশ্চয়ই মূল্যায়নের প্রয়োজন রয়েছে।

আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের জন্য অরাজনৈতিক আন্দোলন সাম্প্রতিক সময়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে। ২০১৫ সালের প্রথম তিন মাস তারা বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর সহিংস পন্থায় সরকার উৎখাতের চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়েছিল। প্রকাশ্যে ও গেরিলা কায়দায় সাধারণ মানুষ থেকে পুলিশ-র‌্যাব-বিজিবির ওপর হামলা হয়েছে। কিন্তু শেখ হাসিনার সরকারকে নত করা যায়নি। এ সময়ে ঢাকার দুটি সিটি করপোরেশন এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনও নির্বিঘ্নে পার করে নেয় আওয়ামী লীগ। কিন্তু ২০১৫ সালের আগস্ট-সেপ্টেম্বরেই প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে ভ্যাট আরোপ নিয়ে সৃষ্ট বিভ্রান্তির মুখে দলে দলে ছাত্রছাত্রীরা বনানী-গুলশান-মহাখালীর রাজপথে অবস্থান গ্রহণ করে। এ সময়ে সরকার বাধ্য হয় শিক্ষায় ভ্যাট আদায় হবে না- এমন ঘোষণা দিতে। সরকার ছাত্রছাত্রীদের একক ইস্যুর আন্দোলনের কাছে নতিস্বীকার করে। অথচ এ আন্দোলনের নেতৃত্বে সরকারবিরোধী কোনো ছাত্র সংগঠনকে সামনে দেখা যায়নি। বাংলাদেশ ছাত্রলীগ এ জনপ্রিয় আন্দোলনে শরিক ছিল- সেটা বলা যাবে না। ছাত্রদল ও ইসলামী ছাত্রশিবির আন্দোলনে নেপথ্যে থেকে সুকৌশলে শক্তি জুগিয়েছে- সেটা যদি মেনে নিই তাহলে বলতে হবে; মাত্র কিছুদিন আগেই সহিংস পন্থায় সরকার উৎখাতের অপচেষ্টা করতে ব্যর্থ বিএনপি-জামায়াতে ইসলামীর গোপন কর্মকাণ্ড মোকাবেলা করায় সরকার এবং তার পক্ষের রাজনৈতিক শক্তি যথেষ্ট দক্ষতা দেখাতে পারেনি।

একই চিত্র আমরা দেখতে পাই ২০১৮ সালের এপ্রিল মাসের 'কোটা সংস্কার আন্দোলন' এবং আগস্ট মাসের নিরাপদ সড়ক দাবির আন্দোলনে। কোটা সংস্কার আন্দোলনের শুরুতে বিশ্বদ্যিালয়ের ছাত্রছাত্রীরা সামনের সারিতে ছিল। এক পর্যায়ে তারা ঢাকার বাইরেও ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। অন্যদিকে, নিরাপদ সড়ক দাবির আন্দোলনে সামনের সারিতে ছিল বিদ্যালয় ও কলেজের ছাত্রছাত্রীরা। তাদের সঙ্গে অভিভাবকরাও যোগ দেন। সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের দখলে রাজপথ- এ দৃশ্য বাংলাদেশে বিরল। সরকার ও আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে কেউ কেউ এ দুটি আন্দোলনের পেছনে 'স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির' উস্কানি রয়েছে বলে অভিমত দেন। কিন্তু এটা অস্বীকার করা যাবে না যে, ছাত্রছাত্রীদের এ আন্দোলন জনপ্রিয় ছিল এবং তাতে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ কোন পক্ষ নেবে, সেটা নিয়ে যথেষ্ট দ্বিধা-দ্বন্দ্বে ছিল। আন্দোলন মোকাবেলার কৌশল নিয়েও তাদের মধ্যে অসহায়ত্ব দেখা গেছে। উপরন্তু তাদের ওপরে নেমে এসেছে 'হেলমেট বাহিনী'।

প্রায় একই অবস্থা ছিল বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর। এ দুটি আন্দোলন থেকে ছাত্রদল যে কোনো ফায়দা লুটতে পারেনি- সেটা ডাকসু নির্বাচনে শোচনীয় ফল থেকে স্পষ্ট। সঙ্গোপনে-নিভৃতে এত বড় আন্দোলন সংগঠিত করতে পারার জন্য প্রয়োজন ছিল সুদক্ষ-চৌকস কর্মী বাহিনীর। কিন্তু এমন সক্ষমতা তারা অর্জন করেছে- তার প্রমাণ এখন পর্যন্ত মেলেনি। এ ক্ষমতা থাকলে খালেদা জিয়ার মুক্তি দাবির আন্দোলনে সেটা প্রয়োগ হতে আমরা দেখতে পেতাম।

২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারি-মার্চ মাসে মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্তদের বিচারের দাবিতে শাহবাগ মোড়কে কেন্দ্র করে যে গণজাগরণ মঞ্চ গড়ে উঠেছিল, সন্দেহ নেই যে তাতে অন্যতম প্রধান প্রেরণা ছিল আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ। আন্দোলনে সামনের সারিতে ছাত্রলীগ আসেনি, কিন্তু শুরুর দিকে এ সংগঠনের শত শত নেতাকর্মী দলীয় স্লোগান ভুলে গিয়ে জমায়েতে অংশ নিয়েছে, সেটাই একমাত্র সত্য। প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা এ আন্দোলন যেন সফল হয়, ব্যাপক মানুষের জাগরণ ঘটাতে পারে, সে জন্য অনন্যসাধারণ দূরদৃষ্টির পরিচয় দিয়েছেন। তার সুফলও মিলেছে। 'জয় বাংলা' স্লোগান ফিরে আসে। বিএনপির ভেতরে প্রশ্ন ওঠে- কেন তাদের নেতৃত্ব এ আন্দোলনে নেই? কিন্তু এটাও দেখা গেছে, বাম ঘরানার রাজনীতিকরা এবং বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের নেতারা অস্থায়ী মঞ্চে স্থান পেয়েছেন, বক্তব্য রেখেছেন- অথচ ছাত্রলীগ-আওয়ামী লীগের নেতাদের কেউ মঞ্চে উঠতে চাইলে বলা হয়েছে- 'রাজনৈতিক নেতাদের এখানে স্থান নেই'। গণজাগরণ মঞ্চ গড়ে ওঠার মূল কারিগর ছিল আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ- এটাই বাস্তবতা। কিন্তু কেন তারা প্রকাশ্য মঞ্চে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠতে পারল না, তার পর্যালোচনা এমনকি ছয় বছর পরও হতে পারে।

এ আন্দোলনে বিএনপির অসহায়ত্ব ও দ্বিচারিতা তো আরও প্রকট। ১৯৭১ সালে যে জামায়াতে ইসলামী পাকিস্তানি সৈন্যদের সহযোগী হিসেবে গণহত্যা-ধর্ষণ-লুটপাটে প্রকাশ্যে অংশ নিয়েছে, সেটা বিএনপি প্রকাশ্যে কখনও স্বীকার করতে চায়নি। বরং এ ভয়ঙ্কর অপরাধী শক্তির সঙ্গে তারা জোট গঠন করেছে। কখনও বলছে, তাদের জোট আন্দোলনের। কখনও বলছে, জোট কেবল নির্বাচনের। আবার তারেক রহমানের মতে, এ জোট 'আদর্শের মিলের'। জামায়াতে ইসলামী যখন যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বানচাল করার জন্য একের পর এক হরতাল ডেকেছে, তার প্রতি বিএনপি প্রকাশ্যে সমর্থন জানায়নি। কিন্তু এ ধরনের একটি হরতালের দিনেই ভারতের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জির সঙ্গে খালেদা জিয়ার নির্ধারিত একটি বৈঠক বাতিল করা হয়েছে। বাংলাদেশে একটানা হরতালের সময়ে এ বৈঠক নির্ধারিত ছিল অনেক আগেই এবং তার অনুরোধ গিয়েছিল বিএনপির তরফেই। প্রকৃতপক্ষে খালেদা জিয়া জামায়াতে ইসলামীকে একটিই বার্তা দিতে চেয়েছেন- স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধে তারা যতই পাকিস্তানি সৈন্যদের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে বদনামের ভাগীদার হোক না কেন, তাদের সঙ্গে মিত্রতা থাকবেই।

গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলনের শুরুতে বিএনপি নেতারা বলছিলেন কেবল যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নয়, সরকারের 'দুর্নীতি-অনিয়ম' এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি যুক্ত করতে। কিন্তু কয়েক দিনের মধ্যেই তাদের অবস্থা সম্পূর্ণ পাল্টে গেল। খালেদা জিয়া বিবৃতি দিয়ে আন্দোলনকারীদের 'নাস্তিক ও ইসলামবিরোধী' আখ্যা দিলেন। তার দলের পত্রিকা 'আমার দেশ' নেমে পড়ল ব্লগারবিরোধী জেহাদে। দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিচার শুরু হওয়ার পর বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী তো আরও একাকার হয়ে গেল। ২০১৩ সালের মে মাসের শুরুতে বিএনপিকে দেখা গেল হেফাজতে ইসলামের বিশাল জমায়েতের সুফল ঘরে তুলতে অতিমাত্রায় ব্যগ্র। ধর্মান্ধ এ রাজনৈতিক গোষ্ঠীর ঢাকায় অবস্থানের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে বিএনপি ভেবেছিল, শেখ হাসিনার সরকারের পতন ঘটাতে পারবে। এ অপচেষ্টা শেখ হাসিনা ব্যর্থ করে দেন।

বিএনপি কি ১৯৭১ সালের রাজাকার-আলবদর এবং বর্তমানের ধর্মান্ধ রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে আঁতাতের কুফল কখনও পর্যালোচনা করে দেখেছে? বাংলা ভাই ও শায়খ আবদুর রহমানের জেএমবিকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়ার পরিণতি যে দেশের জন্য কতটা বিপর্যয়কর হতে পারে, সেটা কি তারা মূল্যায়নের সময় পেয়েছে? এ ধরনের ঐক্যের পরিণতি কি দলের জন্যও ভালো হয়েছে?

এ বছরের অক্টোবর মাসে আওয়ামী লীগের জাতীয় সম্মেলন। ধরে নিতে পারি, স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী সম্মেলনে গুরুত্ব পাবে। দল টানা ১০ বছর ক্ষমতায় থেকেছে এবং আরও পাঁচ বছর থাকার ম্যান্ডেট পেয়েছে- এটাও নিশ্চয়ই নেতাকর্মীদের আনন্দের কারণ হবে। কিন্তু পরপর দুটি সাধারণ নির্বাচনে দলের জন্য যে গোলাপ ফুটেছে, তার সঙ্গে থাকা কাঁটা নিশ্চয়ই অনেককে বিঁধবে। অরাজনৈতিক বিভিন্ন আন্দোলনের মুখে দলের বিভিন্ন পর্যায়ে যে অসহায়ত্বের প্রকাশ ঘটতে দেখা গেছে, সেটা নিয়েও কি প্রশ্ন উঠবে না? নিকট ভবিষ্যতে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর চ্যালেঞ্জ না-ও আসতে পারে। কিন্তু 'অরাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ' যে আসবে না- সেটা কি নিশ্চিত করে বলা যায়?

মন্তব্য


অন্যান্য