চতুরঙ্গ

মুক্তিযোদ্ধা—আহা বাছা!

প্রকাশ : ২৩ মার্চ ২০১৯

মুক্তিযোদ্ধা—আহা বাছা!

  অজয় দাশগুপ্ত

একাত্তরের এক জননীর কথা শুনেছিলাম এভাবে—পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সঙ্গে মুক্তিবাহিনীর সশস্ত্র যুদ্ধ চলছে একটি এলাকায়। এক মুক্তিযোদ্ধার মা রণাঙ্গনের কাছে মুক্তিবাহিনীর ঘাঁটিতে গিয়ে আবদার করলেন, তাকে ছেলের সঙ্গে দেখা করতে দিতে হবে। দু'পক্ষে মেশিনগান-মর্টার-রাইফেলের গুলি চলছে, এমন ভয়ঙ্কর পরিস্থিতিতে মা কী করে সন্তানের কাছে যাবেন? কিন্তু মা যে নাছোড়বান্দা, কোনো কথা শুনবেন না। উপায় না দেখে, বাধ্য হয়ে কমান্ডার এক মুক্তিবাহিনীর সদস্যকে দিয়ে মাকে পাঠালেন, যেখানে ছেলে লড়ছে। তিনি দূর থেকে দেখলেন, ছেলে লাইট মেশিনগান থেকে গুলি ছুড়ছে শত্রু পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর অবস্থান লক্ষ্য করে। মা তার সঙ্গে থাকা মুক্তিবাহিনীর সদস্যকে বললেন, চল ফিরে যাই।

- কেন, ছেলের কাছে গিয়ে কথা বলবেন না? - না, দেখতে এসেছিলাম- বাছা আমার ভয় পেয়েছে কি-না। দেখলাম, বীরের মতো লড়ছে। এটাই\হদেখতে এসেছি। এখন পাঠকদের কাছে ক্ষমা চেয়ে নিজের কথা বলি। ১৯৭১ সালে মুক্তিবাহিনীর সদস্য হিসেবে বাংলাদেশের ভূখণ্ড থেকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে বিতাড়নের গৌরবময় যুদ্ধে অংশগ্রহণের সৌভাগ্য আমারও হয়েছিল। রণাঙ্গনে ভয় পাইনি। আমার দুই ভাই অগ্রজ আশীষ ও অনুজ অসীমও মুক্তিযোদ্ধা। বড় ভগ্নিপতি মিহির দাশগুপ্ত ছিলেন বরিশাল-গোপালগঞ্জে প্রবল পরাক্রমশালী পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ত্রাস হেমায়েত বাহিনীর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ী হওয়ার পর ফিরে আসি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে। ১৯৭২ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস শুরু হয়। মুক্তিযুদ্ধে এ প্রতিষ্ঠানের প্রায় দুইশ' জন ছাত্রছাত্রী-শিক্ষক-কর্মচারী আত্মদান করেছেন। আমি থাকতাম জগন্নাথ হলে। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর গণহত্যার অন্যতম প্রধান টার্গেট ছিল সংখ্যালঘু ছাত্রদের এ আবাসস্থল। এ ছাত্রাবাসের সঙ্গে যুক্ত প্রায় অর্ধশত শিক্ষক-ছাত্র-কর্মচারীকে এখানের গণকবরে সমাহিত করা হয়েছে। তাদের স্মরণে আমরা শ'দুয়েক ছাত্র-শিক্ষক ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে রক্ত বিক্রি করে স্মৃতিস্তম্ভ বানিয়েছি।

লাখো শহীদের আত্মদানে মুক্ত স্বদেশে বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস শুরুর পর একদল ছাত্র 'অটোপ্রমোশন' দাবি করে আন্দোলন শুরু করে। আমরা অনেকেই এটা চাইনি। মুক্তিযুদ্ধের কারণে শিক্ষা জীবন থেকে একটা বছর ঝরে গেছে। এ বছরটি দেশের জন্য উৎসর্গ করা হয়েছে। অটোপ্রমোশন নিয়ে ওপরের ক্লাসে ওঠা যায়, কিন্তু এতে পড়াশোনার যে ঘাটতি হবে—সেটা তো পোষানো যাবে না। কিছু ছাত্রছাত্রী এ যুক্তি মানতে রাজি ছিল না। তারা মিছিল বের করে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বটতলায় সমাবেশ করে। এই বটতলাতেই ১৯৭১ সালের ২ মার্চ বাংলাদেশের পতাকা প্রথম তোলা হয়েছিল, যা আমাদের জাতীয় নেতৃত্ব দেশের পতাকা হিসেবে গ্রহণ করেন। মাহবুব জামান, কাজী আকরাম হোসেনসহ আমরা কয়েকজন অটোপ্রমোশন যারা দাবি করছিল, তাদের বোঝাতে চেষ্টা করি। কিন্তু কয়েকজন উগ্র আচরণ করে। আমাদের মারধর করে। তাতেও আমরা পিছু হটিনি। দু'পক্ষ উপাচার্য ড. মোজাফফর আহমদ চৌধুরীর কাছে যাই। প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কাছেও বিষয়টি পৌঁছায়। আমাদের অবস্থান সকলে মেনে নেন। মারমুখী একদল ছাত্রের মার খেয়েও ন্যায়ের জন্য এই যে নিরস্ত্র অবস্থান ছিল আমাদের, সেটাও তো সাহস। এটাই তো মুত্তিযুদ্ধের চেতনা!
১৯৭১ সালের এপ্রিল-মে মাসে হেমায়েত বাহিনীর সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। অগ্রজ আশীষ দাশগুপ্তকে কমান্ডার হেমায়েতউদ্দিন (বীরবিক্রম) দায়িত্ব দিয়েছিলেন মুক্তিবাহিনীর সদস্যদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থাপনার। পরে আমরা তিন ভাই চলে যাই ভারতে গেরিলা যুদ্ধের আরও ভালো প্রশিক্ষণ গ্রহণের জন্য। আমাদের বাবা-মা-বোনদের দায়িত্ব বর্তায় মুক্তিবাহিনীর সদস্যদের ওপর। সে সময়ে আগৈলঝাড়ার শাহ আলম মতি, সিরাজুল হক সরদারসহ অনেক মুক্তিযোদ্ধা তাদের জীবন বাঁচাতে নিজেদের জীবন বিপন্ন করেছিলেন। আমার প্রশিক্ষণ হয় আগরতলার কাছে পালাটোনায়। পাহাড়ি বনে স্থাপিত ট্রেনিং ক্যাম্পে প্রথম ব্যাচে আমরা ছিলাম ১৭০০ জন। বর্ষায় ভেজা মাটিতে আমাদের ঘুমাতে হয়েছে ছেঁড়া পলিথিনের ওপরে। দুপুরে রুটি ও সবজি-কলাইয়ের ডালের ঘ্যাট, রাতে ভাত-সবজি। মাত্র চারটা টিউবওয়েলে শেষ রাতে লাইন দিয়ে দাঁড়াতাম ৪২৫ জন করে মুখ ধোয়া ও ল্যাট্রিনের পানির জন্য ছোট্ট একটি মগ হাতে। সেই মগ না ধুয়েই তাতে চা ঢেলে নিতাম। সঙ্গে 'ব্রেকফাস্ট' এক টুকরো পাউরুটি।

আমাদের প্রথম ব্যাচের ১৭০০ জন গেরিলার মধ্যে মাত্র কুড়িজনের মতো মাধ্যমিক ও তদূর্ধ্ব পড়াশোনা করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র কেবল আমি। ২১ দিনের সামরিক প্রশিক্ষণের জন্য আমাদের প্রতিদিন ১ টাকা করে দেওয়া হয় ২১ টাকা। আর যুদ্ধ শেষে অস্ত্র জমা দিয়ে পাই ৫০ টাকা। একাত্তরে ২১+৫০= ৭১ টাকা ছিল আমার উপার্জন। কাকতালীয় বটে!

পালাটোনা থেকে মেলাঘরে পাঠানো হয় খালেদ মোশাররফ ও মেজর হায়দারের তত্ত্বাবধানে। সেখান থেকে যাই সাতক্ষীরা সীমান্ত সংলগ্ন বাগুনদিয়া ক্যাম্প হয়ে বরিশালের নিজ এলাকা তৎকালীন গৌরনদী থানার গৈলা গ্রামে। পালাটোনায় আমার সঙ্গে ছিলেন এক কলেজছাত্র। তার বাড়ি নেত্রকোনার খালিয়াঝুড়ি। স্বাধীনতার পর পড়াশোনা খুব একটা করতে পারেননি। চাকরিতে যোগ দেন। তার পুত্র অবশ্য এ কষ্ট ভুলিয়ে দিয়েছে। পড়াশোনা শেষ করে চাকরিতে যোগ দেওয়ার সময় মুক্তিবাহিনীর সদস্য পিতার সার্টিফিকেট জমা দেওয়া হয়। এ জন্য পুলিশ ভেরিফিকেশনের প্রয়োজন পড়ে। কিন্তু থানা থেকে তাদের রিপোর্ট আর আসে না। বাধ্য হয়ে একাত্তরের ওই যোদ্ধা গেলেন থানায় ওসির কাছে। থানা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডারও ছিলেন তার সঙ্গে। তিনি বলেন, আমি মুক্তিযুদ্ধ করেছি—সে তালিকা তো আছে থানা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের আছে। তাহলে আমাকে কেন আসতে হবে? উত্তর এলো থানার মুন্সির কাছ থেকে- বুঝতেই পারেন, ওসি সাহেবের একটা সম্মানী আছে। সেটা জমা দিয়ে রিপোর্ট নিয়ে যান।

একাত্তরে যারা মুক্তিযুদ্ধ করেছে, যাদের ত্যাগের বিনিময়ে আমাদের দেশ স্বাধীন, যে স্বাধীনতার কারণে আজ বাংলাদেশ বিশ্বের বুকে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারছে—সেই দেশে মুক্তিযোদ্ধাকে থানার ওসিকে সম্মানী না দিলে রিপোর্ট মেলে না। লেখার শিরোনাম দিয়েছি- মুক্তিযোদ্ধা, আহা বাছা! যথার্থ শিরোনাম তো বটেই। মুক্তিযুদ্ধ গবেষক মোস্তফা হোসেইনের কাছে একাত্তরে পাবনার ডিসি বীর মুক্তিযোদ্ধা নুরুল কাদেরের চাকরি জীবনের একটি ঘটনা শুনেছি। এ ঘটনা 'একাত্তর আমার' গ্রন্থেও উল্লেখ রয়েছে। বাংলাদেশ সরকার নুরুল কাদরকে ১৬ ডিসেম্বর বিজয়ের পর পরই সংস্থাপন সচিবের (বর্তমানে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সচিব) দায়িত্ব দেয়। কিন্তু সচিবের বেতন হয় না। কেন? এজি অফিস থেকে উত্তর এলো— 'তিনি যে ১৯৭১ সালে পাবনার ডিসির দায়িত্ব থেকে পদত্যাগ করেছেন, তার তো কোনো ডকুমেন্ট নেই।'

বুঝুন তাহলে, লাখ লাখ নারী-পুরুষের আত্মদানে অর্জিত দেশটির পরিচালনায় আমরা কাদের দেখেছি! নুরুল কাদের পাকিস্তানের নিষ্ঠুর সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন। পাবনায় প্রতিরোধ যুদ্ধ সংঘটিত করেছেন। তারপর মুজিব নগর সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। তার কাছেই চাওয়া হচ্ছে ডিসির দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি গ্রহণের আনুষ্ঠানিক চিঠি!
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব ছিলেন উজ্জ্বল বিকাশ দত্ত। জগন্নাথ হলে আমরা একই সময়ে ছিলাম। ১৯৭৬ সালের ১৫ জানুয়ারি বিচারপতি সায়েম ও জিয়াউর রহমানের দোর্দণ্ড প্রতাপের সামরিক শাসনের সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-বুয়েট-ঢাকা মেডিকেল কলেজের প্রায় এক হাজার ছাত্রছাত্রীকে এক রাতে আটক করে শাহবাগের পুলিশ কন্ট্রোল রুমে নিয়ে যাওয়া হয়। আমরা দু'জন ছিলাম আটক হওয়াদের দলে। সারাদিন আমাদের রোদের মধ্যে অভুক্ত রাখা হয় খোলা মাঠে। সন্ধ্যায় কয়েকজনকে গ্রেফতার দেখিয়ে বাকি সবাইকে বেত্রাঘাত করে ছেড়ে দেওয়া হয়। তিনি সচিবের দায়িত্ব পালনকালে আমাকে বারবার অনুরোধ করেন, আমার মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেট তার হাত থেকে গ্রহণ করার জন্য। এ সার্টিফিকেট আমার হাতে তুলে দিয়ে তিনি খুশি হয়েছেন, আমারও ভালো লেগেছে। আরেকবার ওই মন্ত্রণালয়ে এক অফিসারের কক্ষে গিয়ে দেখি, মিষ্টি বিলানো হচ্ছে। মন্ত্রণালয়ের একজন পদস্থ অফিসারের মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে গেজেট হয়েছে, সে জন্যই এমন আয়োজন! আসলেই কি তিনি একাত্তরে যুদ্ধ করেছিলেন বাংলাদেশের জন্য? ২২ মার্চ প্রথম আলো পত্রিকার একটি খবরের শিরোনাম ছিল- 'মুক্তিযোদ্ধা সনদ বাতিল ৬০ সরকারি কর্মকর্তার'। ওই অফিসার নেই তো এই দলে? একবার জেনেছি, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের এক কর্মকর্তা মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সনদ পেতে আবেদন করেছেন। ১৯৭১ সালে তার বয়স ছিল 'বায়ো কী তেয়ো'। তিনি আবেদন ফরম-এ একস্থানে লিখেছেন— মুক্তিযোদ্ধাদের হয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে গোয়েন্দার কাজ করেছেন, আরেক স্থানে লিখেছেন— বাঙ্কারে বাঙ্কারে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে তুমুল যুদ্ধ করেছেন। এমন বীরত্বের জন্য তিনি মুক্তিযুদ্ধের সার্টিফিকেট পেতেই পারেন! তবে যে ব্যক্তি তার আবেদনের সত্যতা যাচাই করতে নেমেছেন, তিনি আমাকে বলেছেন, মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সার্টিফিকেট পেলে দুই বছর এপটেনশন পাবেন। কত যে বাড়তি কামাবেন, কে জানে।

আমার সঙ্গে যারা পালাটোনা, মেলাঘর কিংবা বাগুনদিয়া মুক্তিবাহিনীর ক্যাম্পে ছিলেন, বরিশাল-গোপালগঞ্জের হেমায়েত বাহিনীর ক্যাম্পে ছিলেন, তাদের বেশিরভাগ ছিলেন লেখাপড়ার সুযোগ লাভ থেকে বঞ্চিত। তাদের সরকারি অফিসার হওয়ার মতো শিক্ষা বোর্ড বা বিশ্ববিদ্যালয় সার্টিফিকেট ছিল না। মুক্তিবাহিনীতে আমার সহযোদ্ধা সুকুমার পালমা ছিলেন একটি কারখানার শ্রমিক। যুদ্ধে বিজয়ী হওয়ার পর অনেক দিন পিওন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় অফিসে। পরে চাকরি হয় বন বিভাগের একটি বাগানে, মালি হিসেবে। একবার আমার কাছে এসেছিলেন অনুরোধ নিয়ে—টাঙ্গাইল রেঞ্জে দারোয়ানের একটি পদ খালি হয়েছে। যদি কাউকে বলে দিই, তাহলে পদোন্নতি হতে পারে। তার অনুরোধ রেখে অনেক উঁচু পদের একজনকে অনুরোধ করি। কিন্তু সেটা রাখা হয়নি। আবারও বলি, মুক্তিযোদ্ধা, আহা বাছা! মুক্তিযুদ্ধে সাহস ও বীরত্ব প্রদর্শন করেছেন, এমন অনেকে নিশ্চয়ই ভালো আছেন। একজন মুক্তিযোদ্ধা এখন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দায়িত্বে। বয়সের কারণে এখন কোনো মন্ত্রণালয়েই আর একাত্তরের রণাঙ্গনের কারও দায়িত্ব পালনের কথা নয়। বয়স যে হয়ে গেছে! তবে একাত্তরে প্রকৃতই যারা লড়েছেন, তাদের বেশিরভাগ ছিলেন 'মুর্খের দলে'। তাদের সরকারি চাকরি করার মতো শিক্ষা ছিল না। ব্যবসা করার মতো পুঁজি ছিল না। অনেকের মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের জন্য দেওয়া সুবিধা গ্রহণের মতো শিক্ষা ছিল না। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা তাদের নাতি-নাতনিদের জন্য কিছু সুবিধার কথা ঘোষণা করেন। এটা কাদের পাওয়া উচিত, কাদের নয়—সেটা নিয়ে আলোচনা হতেই পারে। কিন্তু কোনোভাবেই বিষয়টিকে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া উচিত নয়। প্রাণের নিয়ম আছে—একদিন শেষ হতেই হবে। আমার 'একাত্তরের ৭১' গ্রন্থের শেষ কয়েকটি বাক্য আছে এভাবে— 'প্রাণের শেষ আছে। একাত্তরে যারা অস্ত্র হাতে লড়েছেন কিংবা কোনো না কোনোভাবে মাতৃভূমির স্বাধীনতার জন্য প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কাজ করেছেন, তারাও একে একে বিদায় নেবেন।... তারপর আমরা সবাই হয়ে যাব ইতিহাস।... তখন কেউ হয়তো বলবে, আমরা আকাশের তারা হয়ে জ্বলজ্বল করছি। ফুটছি নানা রঙের ফুল হয়ে। কেউ বলবে, আমরা মিশে আছি বাংলার সবুজ প্রান্তর আর ধূলিকনার সঙ্গে। কেউ বা বলবে, অসংখ্য নদ-নদী আর বঙ্গোপসাগরের ঊর্মিমালা এ দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের স্মরণ করেই শ্রদ্ধা ও ভালবাসায় আছড়ে পড়ছে কূলে কূলে। মানুষের পুনর্জন্ম হয় কি-না জানা নেই। কিন্তু যদি হয়, ফের একাত্তরের গৌরবের সময়টা ফিরে পেতে চাই।' এখনও বাংলাদেশের নানা প্রান্তে একাত্তরের মুক্তিযোদ্ধাদের অনেকে বেঁচে আছেন। সকলে আর্থিকভাবে ভালো নেই। মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে ভাতা তুলতে গিয়ে বুঝতে পারি, একাত্তরের বীরদের অনেকের জীবন কাটে কষ্টে। ছিন্ন বসন-মলিন মুখ যে গেল না। কিন্তু জীবনে তাদের অনন্য অর্জন- মুক্তিযোদ্ধা। এ 'সম্মান' নতুন করে কেউ পাবে না। দুর্ভাগ্য, তাদের কোনো সংগঠন নেই। মুক্তিযোদ্ধা কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিলের দায়িত্ব অর্পিত হয়েছে মন্ত্রণালয়ের ওপর। জেলা কমান্ডের দায়িত্ব ডিসিদের ওপর। আর থানা বা উপজেলা কমান্ড দেখভাল করছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা। আর এসব আমরা দেখছি এমন এক সময়ে, যখন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে একজন রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধা। মুক্তিযোদ্ধাদের বাকি দিনগুলো সংগঠিত হওয়ার সুযোগ কেন কেড়ে নেওয়া হলো? আবারও বলি, মুক্তিযোদ্ধা, আহা বাছা!

লেখক: সাংবাদিক
ajoydg@gmail.com

মন্তব্য


অন্যান্য