চতুরঙ্গ

শততম জন্মদিনে শ্রদ্ধার্ঘ

প্রকাশ : ১৭ মার্চ ২০১৯ | আপডেট : ১৭ মার্চ ২০১৯

শততম জন্মদিনে শ্রদ্ধার্ঘ

জাতীয় ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য হিসেবে রাষ্ট্রপতি ও বাকশাল চেয়ারম্যান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাতে পুষ্পস্তবক তুলে দিচ্ছেন অজয় দাশগুপ্ত

  অজয় দাশগুপ্ত

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শততম জন্মদিনে জানাই শ্রদ্ধা, ভালবাসা। এ লেখার সঙ্গের ছবিটি ১৯৭৫ সালের ১০ জুন বর্তমান গণভবনে তোলা। তার মাত্র তিন আগে ৭ জুন বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ বা বাকশাল এবং তার বিভিন্ন অঙ্গ সংগঠনের কমিটি ঘোষণা করা হয়। ছাত্রদের জন্য গঠিত হয় ২১ সদস্যর কেন্দ্রীয় কমিটি, সম্পাদক শেখ শহীদুল ইসলাম। মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, নূহ-উল আলম লেনিন, ইসমত কাদির গামা, ওবায়দুল কাদের, শেখ কামাল, মাহবুব জামান, রবিউল আলম চৌধুরী, মমতাজ হোসেনসহ ২১ জনকে নিয়ে গঠিত কেন্দ্রীয় কমিটির আমিও সদস্য ছিলাম। আমি তখন জগন্নাথ হল ছাত্র সংসদের জিএস, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সিনেটে ছাত্র প্রতিনিধি এবং জয়ধ্বনি পত্রিকার সম্পাদক। আমাদের কেন্দ্রীয় কার্যালয় স্থাপিত হয় ঢাকা কলেজের বিপরীতে একটি ভবনের দোতালায়।

১০ জুন সকালে শেখ শহীদুল ইসলাম জানান, বিকেলে গণভবনে বাকশাল চেয়ারম্যান ও রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে আমরা সৌজন্য সাক্ষাতের জন্য যাব। কমিটির সদস্যদের বাইরে আমাদের সঙ্গে ছিলেন পাভেল রহমান। তিনি ১৯৭২ সাল থেকে 'জয়ধ্বনি' পত্রিকায় সৌখিন ফটোগ্রাফার হিসেবে কাজ করতেন। আমি ছিলাম সাপ্তাহিক এ পত্রিকার সম্পাদক। এক পর্যায়ে বঙ্গবন্ধু পুত্র শেখ কামালের সঙ্গে তার পরিচয় হয় এবং আবাহনী ক্রীড়াচক্রের বিভিন্ন অনুষ্ঠানের ছবিও তিনি তুলতে থাকেন। এ সুবাদে তিনি বঙ্গবন্ধুর সান্নিধ্যে আসার সুযোগলাভ করেন। কিছুদিন পর শেখ কামালের বিয়ের অনুষ্ঠান হয়। গায়ে হলুদ থেকে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের ছবি তোলেন তিনি। গণভবনে বঙ্গবন্ধুকে আমি পুস্পস্তবক তুলে দিচ্ছি, এ ছবি পাভেল রহমানও তুলেছেন। তবে এ লেখার সঙ্গে দেওয়া ছবিটি গণভবনে কর্মরত প্রধানমন্ত্রীর কোনো ফটোগ্রাফারের তোলা। ২০১৮ সালের ১৫ আগস্ট উপলক্ষে সমকালে একটি লেখা পাঠিয়েছিলেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) শরীফ আজিজ, পিএসসি। তিনি ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুর এডিসি হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ছবিতে বঙ্গবন্ধুর ঠিক পেছনে তিনি দাঁড়িয়ে। 'আমাদ্যের ব্যর্থতা' শিরোনামে তিনি একটি লেখা পাঠান, যার সঙ্গে এ ছবিটি দেওয়া হয়। ১৯৭৫ সালের ১০ জুন বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আমাদের সাক্ষাতের কোনো ছবি আমার কাছে ছিল না। পাভেল রহমান ছবি তুলেছিলেন, তবে তার কোনো কপি আমার হাতে আসেনি। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) শরীফ আজিজের লেখার সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আমার ছবি পেয়ে স্বভাবতই স্মুতিকাতর হই। ছবিতে আরও দেখা যাচ্ছে বাকশালের সেক্রেটারি জেনারেল ও প্রধানমন্ত্রী ক্যাপ্টেন মনসুর আলী (১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে তাকে হত্যা করা হয়), বাকশালের অন্যতম সম্পাদক ও পরে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান, বাকশালের অন্যতম সম্পাদক শেখ ফজলুল হক মনি এবং বাকশালের যুব সংগঠন জাতীয় যুবলীগ সম্পাদক তোফায়েল আহমদ। আমার পেছনে বঙ্গবন্ধুকে পুষ্পস্তবক দেওয়ার জন্য অপেক্ষমান রবিউল আলম চৌধুরী মুক্তাদির, বর্তমানে সংসদ সদস্য।

ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় নেতাদের নিয়ে গঠিত জাতীয় ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্যদের উদ্দেশ্যে বঙ্গবন্ধু কিছু পরামর্শ প্রদান করেন। আমাকে শেখ শহীদুল ইসলাম আগেই বলে রেখেছিলেন, বঙ্গবন্ধুর বক্তব্যের নোট নিতে। ছাত্র জীবনেই জনপ্রিয় সাপ্তাহিক 'জয়ধ্বনি'-এর সম্পাদক হয়েছি। স্বভাবতই সাংবাদিকতায় ঝোঁক ছিল। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আমাদের সাক্ষাৎ পর্ব শেষ হওয়ার পর শেখ শহীদুল ইসলাম তার বক্তব্য ছাপিয়ে একটি বুকলেট করার অনুমতি চাইলেন। আমার জন্য বিস্ময়ের বিষয় ছিল বঙ্গবন্ধুর উত্তর। আমাকে দেখিয়ে তিনি বলেন, 'ওকে তো দেখলাম সব খুটিয়ে খুটিয়ে নোট নিতে। ছাপিয়ে ফেল।' বঙ্গবন্ধুর বক্তব্য কয়েকদিনের মধ্যে ছাপা হয় 'ছাত্রসমাজের প্রতি বঙ্গবন্ধু' শিরোনামে। আমি এর বিবরণ তৈরি করার পর সে সময়ে বঙ্গবন্ধুর প্রেস সেক্রেটারি তোয়াব খানকে দেখাই। বর্তমান নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার তখন বঙ্গবন্ধুর সচিবালয়ে কাজ করতেন। তিনিও এ কপি দেখেন। তোয়াব খানের একটি কথা এখনও মনে আছে- 'বঙ্গবন্ধুর প্রতিটি ভাষণ ও আলোচনার কিছু শব্দ ব্যবহার হয়। বলার একটা ঢং আছে তার। আপনি সেটা ধরতে পেরেছেন।'

এর আগেও বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আমার সাক্ষাতের সুযোগ হয়েছিল। ১৯৭২ সালের মে মাসে ছাত্র ইউনিয়ন থেকে ডাকসু ও বিভিন্ন হল সংসদে নির্বাচিত ভিপি-জিএসরা গিয়েছিলাম রমনা পার্কের পাশের 'গণভবনে' দেখা করতে। তখন কয়েকটি হলে জাসদ-ছাত্রলীগের প্যানেল জয়ী হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু আমাদের সঙ্গে কথা বলেন এবং ছাত্রসমাজের কল্যাণে কাজ করার পরামর্শ দেন। এর কিছুদিন পরেই নতুন শিক্ষানীতি প্রণয়নের জন্য ড. কুদরত-ই-খুদার নেতৃত্বে একটি কমিশন গঠিত হয়। বঙ্গবন্ধু কমিটিকে পরামর্শ দিয়েছিলেন ছাত্রনেতাদের কথা শোনার জন্য। মাহবুব জামান, কাজী আকরাম হোসেন ও আমি কমিটির নেতাদের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনায় ছাত্রদের অভিমত তুলে ধরি।

১৯৭৪ সালের প্রলয়ঙ্করী বন্যা হয়। এবং তারপর নেমে আসে দুর্ভিক্ষ। বাংলাদেশের নানা স্থানে আমরা বন্যায় ত্রাণ কাজ সংগঠিত করি। দুর্ভিক্ষের শিকার অসহায় নারী-পুরুষ দলে দলে ছুটে আসছিল ঢাকায়। তাদের জন্য রাজধানীতে অন্তত অর্ধশত লঙ্গরখানা আমরা পরিচালনা করি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মধুর ক্যান্টিনের সামনে বিভিন্ন দুর্গত এলাকায় পাঠানোর জন্য প্রতিদিন তৈরি হতে থাকে হাজার হাজার পিস আটার রুটি। রুটি বানানোর জন্য ছাত্রছাত্রীদের স্বেচ্ছাশ্রম দিতে বলা হয় এবং তাতে সাড়া মেলে ব্যাপক। লঙ্গরখানা ও মধুর ক্যান্টিনে রুটি বানানোর জন্য আমাদের কাছে প্রয়োজনীয় আটা সরবরাহ করা হয় সরকারি গুদাম থেকে। এর ব্যবস্থা করেছিলেন বঙ্গবন্ধু। এ সব কাজের সমন্বয়সাধনের জন্য আমি এবং ডাকসুর তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক মাহবুবজামান প্রতিদিন সন্ধ্যায় ঢাকা জেলার প্রশাসক রেজাউল হায়াতের সঙ্গে বৈঠক করতাম।

বন্যায় ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছিল। সামনে বোরো মৌসুম। অথচ কৃষকের হাতে বীজ নেই, চারা নেই। ডাকসুর পক্ষ থেকে তখন সোহরাওয়ার্দি উদ্যানে বোরো ধন ক্ষেতের জন্য বীজতলা করা হয়। শত শত ছাত্রছাত্রী রাতদিন পরিশ্রম করে। বঙ্গবন্ধুও এ কাজে উৎসাহ দেন। এক রাতে তিনি গোপনে এ ধানের চারা উৎপাদনের আয়োজন দেখে গেছেন, সেটা জানতে পারি তার ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সহকর্মী মহিউদ্দিন আহমদের কাছ থেকে।

বন্যা ত্রাণ, লঙ্গরখানা পরিচালনা ও ধানের বীজতলার কাজে যুক্ত স্বেচ্ছাসেবকদের একদিন বঙ্গবন্ধু ডেকে পাঠান গণভবনে। তিনি তখন বলেন, ছাত্ররা পড়াশোনা করবে। পাশাপাশি দাঁড়াবে দেশ গড়ার জন্য। দুঃখী মানুষের পাশেও তাদের দাঁড়াতে হবে। সে সময়ে আমাদের স্লোগান ছিল, মানুষ বাঁচাও দেশ বাঁচাও। তিনি সেটা পছন্দ করেছিলেন। আমাদের তিনি বলেন, আমি ভুল করলে তোমরা প্রতিবাদ করবে। এতে আপত্তি নেই। কিন্তু তোমাদের নতুন ধারায় ছাত্র আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। কেবল স্লোগান দিয়ে সোনার বাংলা হবে না।

জাতীয় ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটি কাজ করতে পারে ২ মাস ৭ দিন- ১৯৭৫ সালের ৭ জুন থেকে ১৪ আগস্ট পর্যন্ত। একক ছাত্র সংগঠন হিসেবে আমরা বঙ্গবন্ধুর পরামর্শ মেনে কাজ করতে থাকি। জাতীয় ছাত্রলীগের উদ্যোগে একটি বড় কাজ ছিল ১৯৭৫ সালের ১ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দিবস উদযাপন। ওই দিন প্রতিটি বিভাগের ছাত্রছাত্রীরা নিজ নিজ বিভাগে শিক্ষকদের ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানায়। তারপর প্রতিটি বিভাগের ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক ও কর্মচারীদের মিছিল শুরু হয়ে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, জগন্নাথ হলের গণকবর ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদ সংলগ্ন মুক্তিযুদ্ধে শহীদ শিক্ষকদের কবরের পাশে শেস হয়। আমরা নতুন ক্যাম্পাস গড়ে তুলব- এটাই ছিল শপথ।

১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু ঢাকা বিশ্বপরিদর্শনে এসে আমাদের আরও দিকনির্দেশনা দেবেন, এটাই ছিল প্রত্যাশা। যে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম বাংলাদেশের পতাকা তোলা হয় তার শিক্ষার্থীরা নতুন করে শপথ-সংকল্প গ্রহণ করবে উন্নত-সমৃদ্ধ-গর্বিত বাংলাদেশ গঠনের জন্য- আমরা এ লক্ষ্যে কাজ করতে শুরু করি। কিন্তু হিংস্র হায়েনার দল বঙ্গবন্ধুকে আমাদের মাঝ থেকে কেড়ে নেয়। তাদের দুঃশাসন আমাদের জাতীয় জীবন থেকে দীর্ঘ দুই দশকের বেশি সময় অন্ধকার গহ্বরে ফেলে রাখে। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ ঘুড়ে দাঁড়াতে সক্ষম হই। এর পেছনেও কিন্তু ছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রেরণা-উৎসাহ।

শততম জন্মদিনে, জন্মশতবর্ষের যাত্রার শুভদিনে তার প্রতি জানাই প্রণতি।

লেখক: উপসম্পাদক, সমকাল

১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষিত একক ছাত্র সংগঠন জাতীয় ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য

মন্তব্য


অন্যান্য