চতুরঙ্গ

ক্রাইস্টচার্চ হত্যাকাণ্ড: জয় হোক শুভবুদ্ধির

প্রকাশ : ১৫ মার্চ ২০১৯ | আপডেট : ০৪ এপ্রিল ২০১৯

ক্রাইস্টচার্চ হত্যাকাণ্ড: জয় হোক শুভবুদ্ধির

  ফাতিহুল কাদির সম্রাট

নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চ শহরের দুটো মসজিদে সন্ত্রাসী হামলায় ৪৯ জন মুসল্লির প্রাণহানিতে বিশ্ববিবেক স্তম্ভিত। প্রাথমিক খবরে অন্তত তিনজন বাংলাদেশির মৃত্যু নিশ্চিত হওয়া গেছে। আরো ৮ জন বাংলাদেশি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন বলে খবরে প্রকাশ। নিখোঁজ আছেন আরও কয়েকজন বাংলাদেশি।

এই নারকীয় হত্যাযজ্ঞে বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষ মর্মাহত ও ব্যথিত। এর মধ্যে আমাদের জন্যে একটা স্বস্তির খবরও আছে। মাত্র পাঁচ মিনিটের জন্যে বাংলাদেশ জাতীয় দলের ক্রিকেটাররা প্রাণে বেঁচে গেছেন। ১৬ মার্চ তৃতীয় টেস্ট ম্যাচটি শুরু হওয়ার কথা ছিল ক্রাইস্টচার্চের হাগলি ওভাল মাঠে। সেজন্যে ক্রিকেটাররা সেখানেই অবস্থান করছিলেন।ক্রাইস্টচার্চ শহরের প্রধান মসজিদ আল নূর মসজিদেই জুমার নামাজ পড়ার কথা ছিল তাদের, যেটি ছিল সন্ত্রাসী হামলার মূল লক্ষ্য।প্রেস ব্রিফিংয়ের কারণে ক্রিকেটারদের মসজিদে যেতে একটু বিলম্ব হয়। তামিম-মিরাজরা মসজিদের কাছে টিম বাস থেকে যখন নামেন তখন ভেতরে গুলি চলছিল। এক নারী তাদের সাবধান করে দেওয়ার কারণে তারা নিরাপদ দূরত্বে চলে যান। ভাগ্যের জোরে ক্রিকেটাররা শুধু বেঁচে যাননি, বেঁচে গেছে বাংলাদেশের ক্রিকেটও। খারাপ খবরের মধ্যে আমাদের জন্যে ভালো খবর এটি। 

প্রাথমিকভাবে পুলিশ বলেছে, হামলাকারীরা ছিল চারজন। তাদের মধ্যে একজন নারী। চারজন সন্ত্রাসীর মধ্যে মূল হামলাকারী নিজের নাম বলেছেন ব্রেন্টন ট্যারেন্ট। তিনি অস্ট্রেলিয়ার গ্রাফটন এলাকার অধিবাসী, বয়স ২৮ বছর। তিনি নিজেকে শ্বেতাঙ্গবাদী বলে পরিচয় দিয়ে অনলাইনে ৭৩ পৃষ্ঠার একটি ম্যানিফেস্টো প্রচার করেছেন। হেলমেটে বসানো মাইক্রো ক্যামেরার মাধ্যমে তিনি হামলার দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লাইভ সম্প্রচার করেছেন। আল নূর মসজিদে হত্যাযজ্ঞ চালানোর পর তিনি কাছাকাছি লিনউড মসজিদে যান এবং সেখানেও নামাজরত মুসল্লিদের ওপর হত্যালীলা চালান। 

ট্যারেন্টের ম্যানিফেস্টো থেকে জানা যায়, তিনি উগ্র শ্বেতাঙ্গবাদী। অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড প্রভৃতি দেশে অশ্বেতাঙ্গ মানুষের অভিবাসন নিয়ে তিনি ক্ষুব্ধ। তিনি চান, তাদের ভূমিতে কেবল তাদের নিজেদেরই অধিকার সুরক্ষিত থাকবে। অশ্বেতাঙ্গ মানুষদের প্রতি তার তীব্র ঘৃণা। সাম্প্রতিককালে ইউরোপে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠা উগ্র জাতীয়তাবাদী চেতনার বিকাশ অস্ট্রেলেশিয়াতেও যে ছড়িয়ে পড়েছে এই ঘটনা তারই প্রমাণ।

হামলাকারীর বন্দুকের নলে লেখা ছিল “To take revenge for Ebba Akerlund"। অর্থাৎ এবা আকেরলান্ড-এর হত্যার প্রতিশোধের জন্যে এই হামলা। কে এই এবা আকেরলান্ড? স্মর্তব্য, ২০১৭ সালের ৭ এপ্রিল সুইডেনের রাজধানী স্টকহোমের কুইন স্ট্রিটে পথচারীদের ওপর ট্রাক তুলে দেয় উজবেকিস্তান থেকে আসা এক আশ্রয়প্রার্থী। তার নাম রাখমত আকিলভ, বয়স ৩৯। এই হামলায় নিহত হয়েছিল ৮ নিরীহ পথচারী, আহত হয়েছিল ১৪ জন।নিহতদের মধ্যে ছিল ১১বছর বয়সী এবা আকেরলান্ড নামের ১১ বছরের এক শ্রবণপ্রতিবন্ধী মেয়ে শিশু। সে স্কুল থেকে মায়ের সাথে ফিরছিল।মায়ের সাথে তাকেও ট্রাকের চাকার নিচে পিষে মরতে হয়েছিল। ১৪ মার্চ ছিল মেয়েটির জন্মদিন। সেই হত্যার প্রতিশোধ নিতেই এবা আকেরলান্ডের জন্মদিনকেই বেছে নেন ব্রেন্টন ট্যারেন্ট ও তার সহযোগীরা।

ইউরোপে আশ্রয়প্রার্থী অভিবাসী কর্তৃক ট্রাক হামলার আরো ভয়াবহ ঘটনা আছে।২০১৬ সালের ১৯ ডিসেম্বর জার্মানির বার্লিন শহরের বড়দিন উপলক্ষে জমজমাট এক মার্কেটে ট্রাক নিয়ে ঢুকে পড়েন আনিস আমরি নামের তিউনিশিয়ান এক ব্যক্তি। তিনি জার্মানিতে আশ্রয় প্রার্থনা করে প্রত্যাখ্যাত হন। ইসলামিক স্টেট (আইএস) এই হামলার দায় স্বীকার করে। তবে সবচেয়ে ভয়াবহ ট্রাক হামলাটি হয় ফ্রান্সের নিস শহরে ২০১৬ সালের ১৪ জুলাই। ফ্রান্সে বসবাসকারী তিউনিশিয়ান বংশোদ্ভূত মোহামেদ লাহুইস বুহলেল নামের এক ব্যক্তি ১৯ টনি একটি ট্রাক ছিনতাই করে বাস্তিল দিবস উদযাপনরত মানুষের ওপর দ্রুত গতিতে চালিয়ে দেন। এতে ৮৬ জনের মৃত্যু হয়, আহত হয় আরো ৪৯৮ জন। ফরাসি সরকারি দেশহজুড়ে জরুরি অবস্থা জারি করে। জরুরি অবস্থার মধ্যেই ২০১৬ সালের ১৩ নভেম্বর ফ্রান্সে একই সাথে তিনটি আত্মঘাতী বোমা হামলা হয়। এতে ১৩০ জন মানুষ নিহত হয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইউরোপের লন্ডন, মাদ্রিদসহ বেশ কয়েকটি শহরে সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা ঘটেছে। এসব হামলার বেশির ভাগ ক্ষেত্রে কোনো না কোনোভাবে মুসলমান এবং আইএস-এর সম্পৃক্ততা প্রমাণিত হয়েছে।

আরব বসন্তের পর মুসলিম অধ্যুষিত আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ যেমন তিউনিশিয়া, লিবিয়া, সিরিয়া, ইরাক প্রভৃতি থেকে শরণার্থীদের ঢেউ নামে ইউরোপে। বিশেষ করে জার্মানি, হাঙ্গেরি, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স ও ইতালিতে শরণার্থী সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করেছে। এর মধ্যে জার্মানি বিপুল সংখ্যক শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়ে মানবিকতার অনন্য নজির স্থাপন করেছে। শরণার্থীদের এই ভিড় ইউরোপের আর্থসামাজিক ক্ষেত্রে বেশ কিছু সমস্যার সৃষ্টি যে করেছে তা অস্বীকার করার উপায় নেই। ইউরোপে মুসলিম জনসংখ্যার বৃদ্ধি ঘটছে অতি দ্রুত। পরিসংখ্যানবিদরা বলছেন, আগামী পঞ্চাশ বছরে জার্মানি, ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সে মুসলিমরা হয়ে উঠবে সংখ্যাগরিষ্ঠ। স্পেন, ইতালি, সুইডেন ও অস্ট্রেলিয়াতেও মুসলিম জনসংখ্যা বাড়ছে। ফলে গোঁড়া খ্রিস্টান ও শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদীদের মধ্যে ক্ষোভ ও অস্বস্তি সৃষ্টি হয়েছে। তারা স্বভূমে স্বকীয় অস্তিত্ব ধরে রাখতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। নিউজিল্যান্ডে সর্বশেষ সন্ত্রাসী হামলা এই ক্ষোভ ও অস্বস্তির অসহিষ্ণু প্রকাশ মাত্র।

মুসলিম কর্তৃক যেকোনো সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডকে ধর্মীয় রং দিতে কার্পণ্য করে না পশ্চিমা মিডিয়া। ব্যক্তিক অপরাধকে সম্প্রদায়ের ওপর চাপানোর প্রবণতাও লক্ষ্যযোগ্য। এই একই প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে ক্রাইস্টচার্চ হামলার পর মুসলমানদের প্রতিক্রিয়াতেও। এর কোনোটাই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। অপরাধী ও সন্ত্রাসীর কোনো ধর্ম নেই। নিরীহ মানুষকে হত্যা পৃথিবীর কোনো ধর্মেই স্বীকৃত নয়। অনেকে এই হামলাকে খ্রিস্টান জঙ্গিবাদ হিসেবে প্রমাণের চেষ্টা করবেন। এর পেছনে কারণও আছে। হত্যাকাণ্ডটি ঘটেছে পবিত্র মসজিদে। হত্যাকারী ধর্মে খ্রিস্টান। নামাজরত অবস্থায় মারা যাওয়া মুসল্লিদের মধ্যে নারী ও শিশুও রয়েছে। কাজেই মুসলমানদের ধর্মীয় অনুভূতি ও বোধে আঘাত লাগাটাই স্বাভাবিক। কিন্তু ঘটনাকে ধর্মীয় রূপ দেওয়া শুভ চিন্তার পরিচায়ক হবে না। এতে ধর্মীয় সহিষ্ণুতা বিনষ্ট হবে। যদি ঘটনায় সম্পৃক্ত ব্যক্তিরা ধর্মীয় সেন্টিমেন্ট দ্বারা চালিতও হয়ে থাকেন, তবু তাকে গোটা খ্রিস্টান ধর্মীয় অনুসারীদের কাজ হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। যেমনটা কোনো মুসলিমের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডকে ইসলামের আদর্শ ও মুসলমান সম্প্রদায়ের কাজ হিসেবে দেখতে আমরা প্রস্তুত নই, তেমনিভাবে এই ঘটনাকে গ্রহণ করতে হবে ব্যক্তি বা গোষ্ঠীবিশেষের ঘৃণ্য কাজ হিসেবে। আমাদের সমাজে খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের নিরাপত্তা, সম্মান ও অধিকারের প্রতি সবাইকে সচেতন থাকতে হবে।

ঘটনার পর নিউজিল্যান্ডের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে অনেকে কটু মন্তব্য করছেন। একটি মসজিদে হামলা চালানোর পর গাড়িতে বন্দুক উঁচিয়ে ১০ মিনিট পথ পাড়ি দিয়ে আরেকটি মসজিদে হামলার পর হত্যাকারীরা পুলিশের সামনে পড়ে। এমনটা বাংলাদেশে ঘটা অসম্ভব। তাই বলে যে নিউজিল্যান্ড বাংলাদেশের চেয়েও অনিরাপদ দেশ এমনটা বলা যৌক্তিক হবে না। আমাদের মনে রাখতে হবে, বিশ্বের দুর্নীতিমুক্ত রাষ্টের তালিকায় নিউজিল্যান্ডের অবস্থান ডেনমার্কের সাথে প্রথম। বিশ্বের সবচেয়ে নিরাপদ রাষ্টের সূচকে দেশটি আছে দুই নম্বরে। আর সবচেয়ে শান্তিপূর্ণ দেশের তালিকায় নিউজিল্যান্ডের স্থান আইসল্যান্ডের পরেই। কাজেই একটি ঘটনা দিয়ে একটি দেশ ও জাতিকে মূল্যায়ন করা সুবুদ্ধির পরিচায়ক হতে পারে না।

নিউজিল্যান্ডে অপরাধপ্রবণতা বিরল। মানুষ রাতে ঘরের দরোজা দিয়ে ঘুমানোর প্রয়োজনও অনুভব করে না সেদেশে। কাজেই সে দেশের পুলিশকে আমাদের দেশের পুলিশের মতো সদা সতর্ক থাকতে হয় না। নিউজিল্যান্ড পুলিশের শতকরা ৭৫ ভাগ হলো কনস্টেবল। তাদের কারো হাতেই কোনো আগ্নেয়াস্ত্র নেই। এমনকি আত্মরক্ষার মতো কোনো অস্ত্রও নেই। অফিসারদের হাতে আগ্নেয়াস্ত্র রাখার অনুমতি আছে। মজার বিষয় হলো, তাদের প্রধান অস্ত্র হলো মরিচগুঁড়ার স্প্রে। আর আছে পিস্তল। কাজেই এমন দুর্ধর্ষ ঘটনায় পুলিশের তাৎক্ষণিক রেসপন্স করা বা অ্যাকশনে যাওয়া সম্ভব ছিল না। এই ঘটনার পর নিউজিল্যান্ড পুলিশ আরো তৎপর ও সশস্ত্র হবে বলে বিশ্বাস করার কারণ আছে।

ঘটনার পর নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জাসিন্ডা আরডার্ন গণমাধ্যমের সাথে কথা বলার সময় ঘটনার দিনটিকে নিউজিল্যান্ডের ইতিহাসে একটি কালো দিবস হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তিনি নিউজিল্যান্ড রাষ্ট্রের অসাম্প্রদায়িক ও মানবিক চরিত্র অক্ষুণ্ণ রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। ঘটনায় তিনি গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচারের প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছেন। প্রতিবেশী অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী স্কট মরিসনও শোক প্রকাশ করে তদন্তে সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন। তাদের কথার ওপর আমাদের আস্থা রাখতে হবে। ধর্মীয় ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় সবাইকে হতে হবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

জয় হোক শুভবুদ্ধির।


লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, বাংলা, লক্ষ্মীপুর সরকারি কলেজ, লক্ষ্মীপুর

মন্তব্য


অন্যান্য