চতুরঙ্গ

রাজনীতির প্রামাণিক দলিল, দলের দর্পণ

প্রকাশ : ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ | আপডেট : ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ | প্রিন্ট সংস্করণ

রাজনীতির প্রামাণিক দলিল, দলের দর্পণ

  ড. হারুন-অর-রশিদ

উপসম্পাদকীয় বা মতামত বিভাগের প্রচলিত ধারার বাইরে গিয়ে এ নিবন্ধে একটি গবেষণা গ্রন্থ নিয়ে আমি আলোচনা করতে চাই। এর কারণ একটিই- বাংলাদেশের রাজনীতি বিষয়ে লিখতে বা গবেষণায় আগ্রহী সবার জন্যই এটি আকর গ্রন্থ। এটি বাংলাদেশের রাজনীতির প্রমাণিক দলিল, অনেক রাজনৈতিক দলের দর্পণ। আমি সাংবাদিক ও দৈনিক সমকাল-এর উপসম্পাদক অজয় দাশগুপ্ত সংকলিত-সম্পাদিত ও বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত 'সাত দশকের হরতাল ও বাংলাদেশের রাজনীতি' (২০১৮) গ্রন্থের কথা বলছি। ২৫ জানুয়ারি বাংলা একাডেমির কবি শামসুর রাহমান মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হলো বইটির প্রকাশনা সভা। সভাপতি ছিলেন জাতীয় অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান। আলোচকদের মধ্যে ছিলেন- বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. রওনক জাহান, বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজী, দৈনিক অবজারভার পত্রিকার সম্পাদক ইকবাল সোবহান চৌধুরী, এফবিসিসিআইর সাবেক সভাপতি ও সমকাল প্রকাশক এ. কে. আজাদ প্রমুখ। আলোচকদের তালিকায় আমার নামটিও ছিল। সে সুবাদে বইটি অনুষ্ঠানের পূর্বেই দেখে যাওয়ার সুযোগ আমার হয়েছিল। বলার অপেক্ষা রাখে না, এটি অতীব জরুরি ও গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা-কর্ম। এ ধরনের গবেষণা-কর্ম দেশে এই প্রথম। অনুষ্ঠানে বইটি সবার বিপুল প্রশংসা লাভ করে।
আলোচ্য বইটি লেখকের দুই দশকের গবেষণার ফসল। শিরোনামেই এটি স্পষ্ট- যে ভূখণ্ড নিয়ে আমাদের আজকের বাংলাদেশ, সেখানকার বিগত সাত দশক বা ৭০ বছরে (১৯৪৭-২০১৭) সংঘটিত হরতাল ও রাজনীতির প্রধান প্রধান ঘটনা নিয়ে এটি রচিত। জাতীয় পত্রিকা, হাসান হাফিজুর রহমান (সম্পাদিত) স্বাধীনতা যুদ্ধ :দলিলপত্র ও দু'একটি বইয়ের তথ্যসূত্র। তবে পত্রিকা থেকে প্রাপ্ত তথ্যই হচ্ছে এ গবেষণা-কর্মের প্রধান উৎস। দিন হিসাবে ৭০ বছরে ২৫ হাজার ৫শ' ৫০ দিন হয়। লেখক অজয় দাশগুপ্তকে এর প্রতিদিনের জন্য নির্বাচিত সংবাদপত্র পাঠ করে তথ্য সংগ্রহ করতে হয়েছে। এটি নিঃসন্দেহে দুঃসাধ্য, দুঃসাহসিক ও সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। দুঃসাধ্য এ কারণে যে, এ জন্য তাকে চরম ধৈর্যের পরিচয় দিতে হয়েছে। সে পরীক্ষায় তিনি শুধু উত্তীর্ণই নন; অন্য গবেষকদের জন্য তিনি দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করেছেন। এ জন্য তাকে ধন্যবাদ ও অভিনন্দন জানাই।

৫৫১ পৃষ্ঠার এ বইটিতে ১১টি অধ্যায় রয়েছে। এর মধ্যে প্রথম ও শেষ অধ্যায়টি বাদে বাকিগুলো বিভিন্ন সরকারের শাসনামল অনুযায়ী সাজানো। প্রথম অধ্যায়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ যে কারণে তা হলো, এতে সাত দশকের হরতালের মূল্যায়ন ও বিশ্নেষণ করা হয়েছে। ভারত উপমহাদেশে হরতালের প্রথম উদ্ভব, আমাদের বাংলাদেশ ভূখণ্ডে সারণী আকারে আলোচ্য সময়ের হরতাল সংশ্নিষ্ট বিস্তারিত বিবরণ বা চিত্র, যেমন হরতালের পরিসংখ্যান (শাসনামল অনুযায়ী), হরতালের ধরন বা পর্যায় (জাতীয়, আঞ্চলিক, স্থানীয়), হরতালের স্থায়িত্ব (অর্ধ দিবস, পূর্ণ দিবস, সর্বোচ্চ ১২০ ঘণ্টা), হরতালের সাফল্য-ব্যর্থতা, হরতালের ইস্যু (রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, স্থানীয় বা অন্য), হরতাল আহ্বানকারী পক্ষ (রাজনৈতিক দল, জোট বা অন্য সংগঠন), হরতালে হতাহত ও গ্রেফতারের চিত্র, হরতালে অর্থনৈতিক ক্ষতি, হরতালে শিক্ষাজীবনের ক্ষতি, হরতালের বিকল্প ভাবনা, হরতাল ইস্যুতে সর্বোচ্চ আদালতের অবস্থান ইত্যাদি বিষয় এ অধ্যায়ে স্থান পেয়েছে। তা ছাড়া, কেন এ গবেষণা-কর্ম, গবেষণা-কর্মের তথ্য-উৎস ইত্যাদিও লেখক এ অধ্যায়ে তুলে ধরেছেন। বইয়ের শেষের অধ্যায়ে ভারত, নেপাল, দক্ষিণ আফ্রিকা, শ্রীলংকা, আর্জেন্টিনা, কানাডা, ইতালি, গ্রেট ব্রিটেন, যুক্তরাষ্ট্র ইত্যাদি বহির্দেশের হরতাল, বন্‌ধ্‌ (ভারত, নেপাল, শ্রীলংকা), 'স্টে অ্যাট হোম' কর্মসূচি (দক্ষিণ আফ্রিকা), শ্রমিক ধর্মঘট (কানাডা, ইতালি, গ্রেট ব্রিটেন, যুক্তরাষ্ট্র) ইত্যাদি নমুনা আকারে উল্লেখ করা হয়েছে। শাসনামল অনুযায়ী হরতালের সার্বিক চিত্র ও গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনাবলি নিয়ে বাকি ৯টি অধ্যায় পরিকল্পিত।
আলোচ্য বই থেকে দেখা যায়, ১৯৪৭ থেকে ২০১৭ পর্যন্ত মোট ৬১১ বার জাতীয় পর্যায় এবং ১৬১৯ বার স্থানীয় পর্যায়ে (পৃ. ১৭) হরতাল অনুষ্ঠিত হয়। এর মধ্যে ২০০৯ থেকে ২০১৫ সময়ে ২৪৩ (জাতীয়) + ৪১১ (আঞ্চলিক/স্থানীয়)= ৬৫৪ বার অর্থাৎ প্রতি মাসে গড়ে ৮ বার হরতাল ডাকা হয়। ৭০ বছরের মধ্যে সরকারের শাসনামল হিসাবে জাতীয় ও আঞ্চলিক/স্থানীয় উভয় পর্যায়ে সর্বোচ্চ সংখ্যক হরতালের ঘটনা ছিল এ সময়ে (২০০৯-২০১৫)। এর প্রায় সবই ছিল রাজনৈতিক ইস্যুকেন্দ্রিক (পৃ. ১৮)। উল্লেখ্য, আলোচ্য সময়ে সরকারে ছিল আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোট, আর হরতাল আহ্বানকারী পক্ষ ছিল বিএনপি-জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট বা এককভাবে জামায়াত (যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের রায় ঘোষণা ও তা কার্যকর করার প্রতিবাদে)।
আন্দোলনের হাতিয়ার হিসেবে হরতাল কর্মসূচির সাফল্য ও ব্যর্থতা উভয়ই অজয় দাশগুপ্ত তার আলোচ্য বইয়ে দেখিয়েছেন। জনসমর্থন ও জনস্বার্থের উপস্থিতি বা অনুপস্থিতি সে ক্ষেত্রে মুখ্য। আমাদের এ অঞ্চলে ঔপনিবেশিক শাসনবিরোধী আন্দোলনের হাতিয়ার হিসেবে হরতালের মতো শক্ত রাজনৈতিক কর্মসূচির উদ্ভব ঘটে। ব্রিটিশ শাসন-শোষণের নিগড় থেকে মুক্তির লক্ষ্যে গত শতকে মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বে ব্যাপক জনসমর্থনভিত্তিক ব্রিটিশবিরোধী বয়কট ও আইন অমান্য আন্দোলন ভারতের স্বাধীনতার আন্দোলনের সাফল্যের ক্ষেত্রে যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, তা সবার জানা। অনুরূপভাবে পাকিস্তানি শাসনামলে বাঙালির জাতীয় মুক্তি বা স্বাধীনতার লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৬৬ সালে 'আমাদের বাঁচার দাবি :৬ দফা কর্মসূচি' পেশ করলে তা দ্রুত বাঙালিদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে এবং ৭ জুন (১৯৬৬) '৬ দফা দাবি দিবস'-এ আওয়ামী লীগ আহূত হরতাল বঙ্গবন্ধু কারাবন্দি থাকা সত্ত্বেও আইয়ুব সরকারের সর্বপ্রকার নির্যাতন-নিষ্পেষণ উপেক্ষা করে শতভাগ সফল হয়েছিল। এভাবে স্বাধীনতাউত্তর বাংলাদেশে সামরিক শাসনের কবল থেকে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রামের সময়কার একাধিক দৃষ্টান্তও উল্লেখ করা যাবে। অন্যদিকে, জনসমর্থনহীন ও জনস্বার্থ বির্বজিত অবস্থায় হরতাল-অবরোধ-প্রতিরোধের মতো সর্বাত্মক রাজনৈতিক কর্মসূচি অবলম্বন যে সংশ্নিষ্টদের জন্য চরম বিপর্যয় ডেকে নিয়ে আসে, তার বহু দৃষ্টান্ত লেখক তার বইয়ে উল্লেখ করেছেন। বিএনপি-জামায়াতের বর্তমান রাজনৈতিক পরিণতি তারই সাক্ষ্য বহন করে, যা বলার অপেক্ষা রাখে না।
অজয় দাশগুপ্তের বর্তমান গ্রন্থটি রাজনৈতিক দল ও নেতৃবৃন্দের জন্য দর্পণ বা আমলনামাস্বরূপ। কে কখন কী বলেছেন এবং পরবর্তী সময়ে কী করেছেন, এ বই তার প্রামাণিক দলিল। উদাহরণস্বরূপ, ১৯৯৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের অর্থমন্ত্রী শাহ এএমএস কিবরিয়া (বর্তমানে প্রয়াত) একবার সাংবাদিকদের ডেকে বলেছিলেন, 'আওয়ামী লীগ বিরোধী দলে গেলেও ভবিষ্যতে হরতাল করবে না' (দ্রষ্টব্য :বইয়ের প্রসঙ্গকথা)। কিন্তু ২০০১ সাল থেকে বিরোধী দলে অবস্থানকালে আওয়ামী লীগ বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের বিরুদ্ধে বহুবার হরতাল কর্মসূচি পালন করে (পৃ. ১৮)। অন্যদিকে, ১৯৯৫ সালে বিএনপি সরকারের সময় আওয়ামী লীগের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলনকালে তখনকার প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় এক জনসভায় ঘোষণা করেছিলেন, 'তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি অসাংবিধানিক' (পৃ. ১৯৭)। একই বছর চট্টগ্রামে এক সুধী সমাবেশে তিনি বলেছিলেন, 'নিরপেক্ষ ব্যক্তি বলে কেউ নেই' (পৃ. ১৯৯)। ২০০৯-১৮ সময়ে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোট সরকারের সময় বিরোধী দলে থাকা বিএনপি সেই খালেদা জিয়ারই নেতৃত্বে কীভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলনের নামে চরম সহিংস কর্মকাণ্ডের আশ্রয় নেয়, তা দেশবাসীর জানা। গ্রন্থটিতে এসব বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে। যেমন 'পেট্রোল বোমায় দগ্ধ নারীর জিজ্ঞাসা' (পৃ. ৪৫৯), 'চট্টগ্রামে (খামারিদের) পুকুরে দুধ ঢেলে অবরোধের প্রতিবাদ' (পৃ. ৪৬১), '২০ দিনে ১০৫ জনের প্রাণহানি' (পৃ. ৪৭০), '৫৩১ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আগুন' (পৃ. ৪৮৩) ইত্যাদি।
কোনো বই বা লেখাই শতভাগ ত্রুটিমুক্ত নয়। অজয় দাশগুপ্তের আলোচ্য বই সম্বন্ধেও একই কথা প্রযোজ্য। ৫৫১ পৃষ্ঠার একটি বইয়ে এমনটি হওয়া নিতান্তই স্বাভাবিক। তবে সংখ্যা বিচারে ত্রুটি খুব কমই চোখে পড়েছে। জেনারেল এরশাদের ক্ষমতা দখলের তারিখ দেওয়া আছে ১৯৮১ সালের ২৪ মার্চ (পৃ. ১৫)। তারিখ ঠিকই আছে; সাল হবে ১৯৮২। মুক্তিযুদ্ধকালে 'মুজিবনগর সরকার' নামে খ্যাত প্রথম বাংলাদেশ সরকার গঠনের তারিখ দেওয়া হয়েছে ১৭ এপ্রিল (পৃ. ৬০)। এটি হবে ১০ এপ্রিল (১৭ এপ্রিল ছিল প্রকাশ্য শপথ গ্রহণের দিন)। বগুড়ায় হরতালের বিরোধিতা এবং আবু হোসেন সরকার মন্ত্রিসভার পতন (১৯৫৬) এ উভয় ঘটনা প্রসঙ্গে রিপোর্ট করতে গিয়ে পত্রিকার (দৈনিক চাষী) প্রতিবেদকই শেরেবাংলা ফজলুল হকের পার্টির নাম 'কৃষক-প্রজা পার্টি' উল্লেখ করেছেন এবং বইয়ে (পৃ. ৩১) সেভাবে স্থান পেয়েছে। ভারত বিভাগের পূর্বে হক সাহেবের পার্টির ওই নাম ছিল (প্রতিষ্ঠা ১৯৩৬)। চুয়ান্নর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনের কয়েক মাস পূর্বে ১৯৫৩ সালে নতুন নামকরণ করা হয় 'কৃষক-শ্রমিক পার্টি'। অপর একটি বিষয় হলো, বইয়ের প্রথম অধ্যায়ে সার্বিক বিষয়বস্তুর ওপর লেখকের মূল্যায়ন ও বিশ্নেষণ অংশে সেনা-সমর্থিত তথাকথিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় সেনাশাসন-নিয়ন্ত্রণ ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আগস্টের (২০০৮) ছাত্র-শিক্ষক বিদ্রোহের মতো এত বড় ঘটনা (যা দ্রুত সারাদেশে স্টম্ফুলিঙ্গের মতো ছড়িয়ে পড়ে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে কাজ করে), তার অনুল্লেখ (যদিও বইয়ের ভেতরে অন্যত্র এ ঘটনার উল্লেখ রয়েছে)। এটি গুরুত্ব সহকারে আসা উচিত ছিল। আশা করি, লেখক পরবর্তী মুদ্রণ/সংস্করণে এগুলো দেখবেন।
পরিশেষে, এ কথা বলতেই হবে, অজয় দাশগুপ্তের আলোচ্য গ্রন্থটি একটি তথ্যসম্ভার; আমাদের সাত দশক বা ৭০ বছরের রাজনীতির প্রামাণিক দলিল। সংশ্নিষ্ট বিষয়ে গবেষণার ক্ষেত্রে এটি আকর গ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত হবে- সন্দেহ নেই। সাধারণ পাঠকদের বাইরে গবেষক ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো সর্বাধিক উপকৃত হবে। লেখককে বিস্ময়কর ও মহামূল্যবান এ গ্রন্থ উপহার দেওয়ার জন্য অজস্র অভিনন্দন।

লেখক: উপাচার্য, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়

মন্তব্য


অন্যান্য