চতুরঙ্গ

ঊনসত্তরের ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানের পাঁচ দশক

প্রকাশ : ১৩ জানুয়ারি ২০১৯ | আপডেট : ১৩ জানুয়ারি ২০১৯

ঊনসত্তরের ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানের পাঁচ দশক

  অজয় দাশগুপ্ত

ঐতিহাসিক ১১ দফা আন্দোলনের ৫০ বছর পূর্ণ হচ্ছে এ বছরের জানুয়ারি মাসে। ১৯৬৯ সালের শুরুতেই চারটি ছাত্র সংগঠন- পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ, পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন (মতিয়া গ্রুপ), পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন (মেনন গ্রুপ) এবং এনএসএফ বা জাতীয় ছাত্র ফেডারেশন (দোলন গ্রুপ) ছাত্রদের বিভিন্ন দাবির সঙ্গে পূর্ব পাকিস্তানের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের ছয় দফা কর্মসূচি, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় অভিযুক্ত আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ মুজিবুর রহমানসহ সব রাজবন্দির মুক্তি, পাকিস্তানকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন বিভিন্ন সামরিক জোট থেকে মুক্ত করা, পাট ও বস্ত্র শিল্প জাতীয়করণ, পার্লামেন্টারি গণতন্ত্র প্রবর্তন প্রভৃতি ১১ দফা দাবিতে আন্দোলন গড়ে তোলার বিষয়ে একমত হয়। ছাত্রদের দাবির সঙ্গে রাজনৈতিক দাবি যুক্ত করা- সেটা ছিল সময়ের দাবি। এই চারটি ছাত্র সংগঠনের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের ভিপি তোফায়েল আহমেদ (ছাত্রলীগ নেতা) ও জিএস নাজিম কামরান চৌধুরী (এনএসএফ)- এই ১০ জনকে নিয়ে গঠিত হয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ। জেলায় জেলায় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয় বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের প্রতিনিধি এবং জেলার প্রধান কলেজের ভিপি-জিএসকে নিয়ে।

তখন ছিল ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খানের শাসনামল। তিনি ১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে চূর্ণ করে দিয়ে পাকিস্তানে সামরিক শাসন জারি করে ক্ষমতায় আসেন। ১৯৬৩ সাল থেকে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর ছিলেন মোনায়েম খান। তখন ছাত্রদের মিছিলে জনপ্রিয় স্লোগান ছিল আইয়ুব-মোনায়েম দুই ভাই, এক দড়িতে ফাঁসি চাই। তবে সে সময়ে প্রকৃতই ফাঁসির দড়ির হুমকিতে ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। তাকে স্বায়ত্তশাসনের ছয় দফা কর্মসূচি প্রদান এবং এর ভিত্তিতে জনমত গঠনের অভিযোগে ১৯৬৬ সালের ৮ মে গ্রেফতার করা হয়। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দীন আহমদসহ আরও অনেক নেতাও তখন জেলে ছিলেন। অনেক ছাত্রনেতাকেও বন্দি করা হয়। তারা বছরের পর বছর বিনা বিচারে জেলে ছিলেন। শেখ মুজিবুর রহমানসহ বন্দিদের মুক্তি ও ছয় দফা মেনে নেওয়ার দাবিতে ১৯৬৬ সালের ৭ জুন পূর্ব পাকিস্তানে হরতাল আহ্বান করা হয়। বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে যে সব হরতাল হয়েছে, তার রূপ (ঢিলেঢাকা, নিরুত্তাপ, শিথিল) যারা দেখেছেন তারা কোনোভাবেই ধারণা করতে পারবেন না যে আওয়ামী লীগের অনেক নেতা জেলে থাকার পরও কী অভাবনীয় সাড়া মিলেছিল তাতে। ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জে পুলিশের গুলিবর্ষণে ১০ জনের মৃত্যু হয়েছিল- এটা সরকারের পক্ষ থেকেই স্বীকার করে নেওয়া হয়। রাজপথ ছিল মিছিলকারীদের দখলে। ১৯৬৮ সালের ৭ জানুয়ারি দৈনিক পাকিস্তান পত্রিকা জানায়, 'পূর্ব পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করার ষড়যন্ত্রের অভিযোগে' ৭ জানুয়ারি পাকিস্তান সিভিল সার্ভিস ও সেনা-নৌ-বিমান বাহিনীর সদস্য এবং রাজনৈতিক নেতাসহ ২৮ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তারা অস্ত্র সংগ্রহের জন্য ভারতের আগরতলায় গোপন বৈঠকে মিলিত হয়েছিলেন। দৈনিক পাকিস্তান ১৮ জানুয়ারি জানায়, আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমান এবং আরও ৬ জন সামরিক কর্মকর্তাকে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় অভিযুক্ত করা হয়েছে। শেখ মুজিবুর রহমান এ ষড়যন্ত্রের প্রধান হোতা এবং তাকেই মামলার প্রধান আসামি করা হয়েছে।

১৯৬৯ সালের জানুয়ারি মাস শুরু হতে না হতেই ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ১১ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করে। ৮ জানুয়ারি পশ্চিম ও পূর্ব পাকিস্তানের কয়েকটি রাজনৈতিক দল ডেমোক্রেটিক অ্যাকশন কমিটি বা ডাক নামে একটি জোট গঠন করে। তাদের আট দফা দাবিতে পার্লামেন্টারি গণতন্ত্র এবং শেখ মুজিবুর রহমানসহ সব রাজবন্দির মুক্তির দাবি ছিল। কিন্তু স্বায়ত্তশাসনের ছয় দফা দাবি ছিল না। পশ্চিম পাকিস্তানের প্রায় সব নেতা ছয় দফা স্বীকার করতে রাজি ছিলেন না। এ জোটের শরিক বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ১৯৬৮ সালের ১৩ ডিসেম্বর পাকিস্তানব্যাপী সকাল-সন্ধ্যা হরতাল ডেকেছিল এবং তা পূর্ণ সফল হয়। তাদের মূল দাবি ছিল আইয়ুব খানের পতন এবং পার্লামেন্টারি গণতন্ত্র কায়েম। কিন্তু শেখ মুজিবুর রহমান ও তার দল ছয় দফার প্রশ্নে অটল থাকে।

ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সদস্য চারটি ছাত্র সংগঠনের মধ্যে ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়নের (মতিয়া গ্রুপ) কর্মী-সমর্থক ছিল অনেক। এনএসএফ (দোলন গ্রুপ) ছিল আইয়ুব খানের সমর্থক ছাত্র সংগঠন থেকে বের হয়ে আসা একটি অংশ। আইয়ুব খান সামরিক শাসন জারি করে পূর্ব পাকিস্তানের প্রধান রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ এবং ন্যাপ (মোজাফফর) ও মণি সিংহের কমিউিনিস্ট পার্টির অনেক নেতাকর্মীকে জেলে পাঠান। তবে ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়ন এমন কঠিন সময়েও ছাত্রদের মধ্যে সক্রিয় থাকে। তারা ঐক্যবদ্ধ হওয়ায় জনগণের মধ্যে বিপুল উৎসাহ সৃষ্টি হয়। তারা মনে করতে থাকে- ছাত্ররা এক হয়েছে। এবার আইযুব খানের রেহাই নেই। তখন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর মোনায়েম খান পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্র-তরুণ এবং মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীর কাছে ছিলেন ধিক্কৃত ও উপহাসের পাত্র। অন্যদিকে, পাকিস্তানের দুঃশাসনে ক্ষুব্ধ এ ভূখণ্ডের জনগণ নিজেদের মনে করতে থাকে বঞ্চিত-শোষিত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক রেহমান সোবহান ১৯৬১ সালেই 'টু-ইকোনমি' তত্ত্ব উপস্থাপন করেন। তিনি পূর্ব পাকিস্তান যে অর্থনৈতিকভাবে বঞ্চিত হচ্ছে সে চিত্র বিভিন্ন লেখায় তুলে ধরেন, যা ছাত্র ও শিক্ষিত মধ্যবিত্তদের মধ্যে আলোড়ন সৃষ্টি করে। শেখ মুজিবুর রহমানের ছয় দফা কর্মসূচিতে এ বঞ্চনার চিত্র ফুটে ওঠে। তাকে যখন আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার প্রধান আসামি করা হয়, তখন এ ভূখণ্ডের মানুষের মধ্যে শঙ্কা তৈরি হয়- এ জনপ্রিয় নেতাকে ফাঁসি দেওয়া হবে না তো? ছাত্রদের আন্দোলনের কর্মসূচি ছিল ১১ দফা। কিন্তু সবকিছু ছাপিয়ে মূল দাবি হয়ে ওঠে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার ও শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তি। জনগণও রাজনৈতিক দলের প্রতি নয়, বরং ছাত্রদের প্রতি ভরসা রাখতে শুরু করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বটতলা, মধুর ক্যান্টিন, ইকবাল হল প্রভৃতি স্থান তখন সবার মুখে মুখে। ১৭ জানুয়ারি ১১ দফার দাবিতে কলা ভবনের বটতলায় প্রথম ছাত্রসভা অনুষ্ঠিত হয়। তখন ১৪৪ ধারা জারি ছিল। আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্স প্রথম বর্ষের ছাত্র। বটতলার সমাবেশে সর্বোচ্চ শ'পাঁচেক ছাত্রছাত্রী সমবেত হয়েছিল। তোফায়েল আহমেদ সভাপতিত্ব করেন। কিন্তু মিছিল করতে চাইলে পুলিশ টিয়ারগ্যাস নিক্ষেপ ও লাঠিচার্জ করে তা ব্যর্থ করে দেয়। সে দিনই প্রথম আমি পুলিশের টিয়ারশেল বিস্ম্ফোরণের আগেই তা ভেজা চটে জড়িয়ে পুলিশের দিকে ছুড়ে মারা প্র্যাকটিস করি। সে যে কী আনন্দ! পরদিনও বটতলা থেকে মিছিল বের করতে গিয়ে পুলিশের হামলার মুখে পড়তে হয়। কিন্তু আমরা শ'খানেক ছাত্রছাত্রী পুলিশকে ফাঁকি দিয়ে মিছিল নিয়ে বটতলা থেকে গুলিস্তান পর্যন্ত চলে যেতে পারি। রাস্তার দু'পাশের জনগণ আমাদের করতালি দিয়ে অভিনন্দন জানায়। ১৯ জানুয়ারি বোরবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ছিল। কিন্তু প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বর্তমানের বুয়েট) খোলা ছিল এবং সেখানকার ছাত্রছাত্রীরা মিছিল করতে গিয়ে বাধার সম্মুখীন হয়ে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়।

বাঁধভাঙা আন্দোলন কী, মাটির ঢিবি থেকে উইপোকার মতো কীভাবে ছাত্রছাত্রীরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে বের হয়ে আসতে পারে, সে অভিজ্ঞতা আমার জীবনে প্রথম হয় ১৯৬৯ সালের ২০ জানুয়ারি। সেদিন ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্র ধর্মঘট ডাকে। সকাল ১১টার দিকে বটতলায় সমাবেশ ছিল। নির্ধারিত সময়ের আগেই কলা ভবন ও আশপাশের এলাকা ছাত্রছাত্রীরা ভরে ফেলে। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দলে দলে তারা এসেছে। এ মিছিলের রুট নির্ধারিত হয় উপাচার্যের বাসভবন, এসএম হল, ঢাকা মেডিকেল কলেজ, নাজিমুদ্দিন রোডের জেলখানা, চকবাজার, ইসলামপুর, বাহদুর শাহ পার্ক, গুলিস্তান, তোপখানা রোড হয়ে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার। সে সময়ে আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যত মিছিল বের করেছি, তার বেশিরভাগ এই দীর্ঘ পথ পরিক্রম করত। ২০ জানুয়ারির মিছিল ১৪৪ ধারা উপেক্ষা করে বের হয় এবং ঢাকা মেডিকেল কলেজ এলাকায় গুলি হয় এবং তাতে আসাদুজ্জামান নামের এক ছাত্রনেতা নিহত হন। তখন মোবাইল ফোনের চল ছিল না। টিএন্ডটি ফোনও তেমন ছিল না। কিন্তু সর্বত্র কীভাবে খবর ছড়িয়ে পড়ে- পুলিশ ছাত্র মেরে ফেলেছে গুলি করে। এবারে আইয়ুব খান-মোনায়েম খানের রক্ষা নেই। সেদিন বিকেলে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে শোক মিছিল বের হয়। সামনে ছিলেন কালো পতাকা হাতে দীপা দত্ত নামের এক ছাত্রনেতা। পুলিশ-ইপিআর (বর্তমান বিজিবির পূর্বসূরি) মিছিলে বাধা দিতে চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। শহীদ মিনার থেকেই কর্মসূচি ঘোষণা হয়- ২১ জানুয়ারি ঢাকায় পূর্ণ দিবস হরতাল, ২৩ জানুয়ারি সন্ধ্যায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে মশাল মিছিল এবং ২৪ জানুয়ারি দেশব্যাপী সকাল-সন্ধ্যা হরতাল।

২৪ জানুয়ারি হরতালের দিনেই সকালে তোপখানা রোডে সচিবালয়ে পিকেটিং করার সময় স্কুলছাত্র মতিউর রহমান পুলিশের গুলিতে নিহত হন। এ দিন প্রকৃতপক্ষে ঢাকার ছাত্র-জনতা এবং টঙ্গি-তেজগাঁও-আদমজী-ডেমরা এলাকার শ্রমিকরা একযোগে রাজপথে নেমে আসেন। আমি বর্তমান দোয়েল চত্বর এলাকায় একদল শ্রমিকের মধ্যে পড়ে যাই। মনে আছে, তখন লুঙ্গি-গেঞ্জি পরা এক শ্রমিক আমাকে বুকে টেনে নিয়ে অন্যদের দেখিয়ে বলেছিলেন, 'এই মাসুম বাচ্চা মিছিলে যখন, আমরা ঘরে তাকি ক্যামনে।' সবার মুখে তখন আইয়ুব শাহির পতন চাই, শেখ মুজিবের মুক্তি চাই স্লোগান। মতিঝিলের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি অফিসের টপ বসরা ছাত্রদের ডাকে রাজপথে নেমে আসেন। বড় বড় সরকারি অফিসের শীর্ষ ব্যক্তি থেকে পিয়ন-দারোয়ান একই মিছিলে শামিল হয়েছেন, এ এক অভূতপূর্ব দৃশ্য। অতীতে এমনটি ঢাকা প্রত্যক্ষ করেনি।

দুপুরে পল্টন ময়দানে মতিউরের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। ততক্ষণে ঢাকা শহর যেন জ্বলছে। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় শেখ মুজিবের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য প্রদান করেছেন, এমন কয়েকজনের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও বাড়ি জনগণ পুড়িয়ে দেয়। সরকার সমর্থক দৈনিক পাকিস্তান ও মর্নিং নিউজ জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। জনগণ গভর্নর হাউস ও সচিবালয়ে আগুন দেবে, এমন শঙ্কা তৈরি হয়। ততক্ষণে সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। ছাত্রনেতারা তখন পল্টন ময়দান থেকে মিছিল নিয়ে ইকবাল হলের (বর্তমানে সার্জেন্ট জহুরুল হক হল) মাঠে চলে আসেন। পরদিন ২৫ জানুয়ারি প্রদেশব্যাপী হরতাল ঘোষিত হয়। একইসঙ্গে সরকার ঘোষণা করে কারফিউ।

প্রকৃতপক্ষে ২৪ জানুয়ারির ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানই আইয়ুব খানের পতন এবং শেখ মুজিবের মুক্তি অবধারিত করে দেয়। সবাই কেবল অপেক্ষায় ছিল কখন এ দুটি ঘটনা ঘটে। শেখ মুজিবুর রহমান মুক্তিলাভ করেন ২২ ফেব্রুয়ারি। জনগণ তাকে বরণ করে নেন বঙ্গবন্ধু হিসেবে। আইয়ুব খান বিদায় নেন ২৫ মার্চ।

ছাত্রসমাজের নেতৃত্বে ১১ দফার আন্দোলন পরিচালিত হয়েছিল। এ আন্দোলনকেই অভিহিত করা হয় স্বাধীনতা সংগ্রামের ড্রেস রিহার্সাল হিসেবে। এ আন্দোলন চলাকালেই জয় বাংলা স্লোগান ধ্বনিত হতে থাকে। আরও শোনা যায়- পিন্ডি না ঢাকা ঢাকা- ঢাকা, পদ্মা মেঘনা যমুনা- তোমার আমার ঠিকানা প্রভৃতি স্লোগান। সঙ্গোপনে প্রস্তুতি চলতে তাকে স্বাধীনতার। ছাত্রদের ওপর জনতার তখন অগাধ আস্থা। ইকবাল হল সবকিছুর কেন্দ্রে। কারখানায় শ্রমিক-মালিক বিরোধ মীমাংসার জন্য উভয়পক্ষ চলে আসত ওই ছাত্রাবাসে। এমনকি স্বামী-স্ত্রীর ঝগড়া দেখা দিলেও উভয় পক্ষ ভাবত- ইকবাল হলে গেলে একটা সমাধান মিলবেই।

সে সময়ে আমরা দিনের পর দিন ধর্মঘট করেছি- মিছিল করেছি। হাজার হাজার ছাত্রছাত্রী তাতে অংশ নিয়েছে। সকালে বিভিন্ন স্কুল-কলেজে গিয়ে ধর্মঘট করিয়ে মিছিল নিয়ে বটতলার সমাবেশে যোগদান, তারপর ৮-১০ কিলোমিটার মিছিল করে দুপুরে খেয়েই বিকেলে মধুর ক্যান্টিনে কর্মিসভা। দিনের পর দিন আমরা এ ধরনের কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছি ক্লান্তিহীনভাবে। তোফায়েল আহমেদ ছিলেন আন্দোলনের মধ্যমণি। তার বক্তব্য ছাত্র-জনতা মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনত। সাইফউদ্দিন আহমদ মানিক বক্তৃতা দিতেন গুছিয়ে। তার বক্তব্যে থাকত দিকনির্দেশনা। জেলায় জেলায় যে সব কলেজ ছিল, সর্বত্র নিয়মিত নির্বাচন হতো ছাত্র সংসদের। নির্বাচিত ভিপি-জিএসরা জনগণের কাছে বিশেষ মর্যাদা পেতেন। ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়নের প্রার্থীরা বেশিরভাগ কলেজ ছাত্র সংসদে জয়ী হতেন। সাধারণভাবে যে কোনো ছাত্র-গণসমাবেশে ছাত্রনেতাদের বক্তব্য মানুষ বিশেষ আগ্রহ নিয়ে শুনত।

১১ দফার আন্দোলনের মধ্য দিয়ে পতন ঘটে আইযুব খানের। রাজনৈতিক অঙ্গনে যে শূন্যতা তিনি সৃষ্টি করেছিলেন তা দ্রুতই পূরণ হয়ে যায়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হয়ে ওঠেন বাঙালির প্রাণপ্রিয় নেতা। তিনি স্বাধীনতার পথে সুপরিকল্পিতভাবে অগ্রসর হতে থাকেন। জনগণ যে এ জন্য প্রস্তুত হয়ে উঠেছে, সেটা তো তিনি নিশ্চিত হয়ে যান ঊনসত্তরের ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানেই।

এই জানুয়ারিতে ঊনসত্তরের সেই অগ্নিঝরা দিনগুলোর ৫০ বছর পূর্ণ হলো। ১৭ থেকে ২৪ জানুয়ারি, এই আটটি দিন আমাদের এ ভূখণ্ডের ছাত্রসমাজ রাজপথ কাঁপিয়ে দিয়েছিল। অনন্য বিজয় ছিনিয়ে এনেছিল। রক্ত দিয়েছিল আসাদ-মতিউরসহ অনেকে। তাদের স্মৃতির প্রতি জানাই প্রণতি। ২৪ জানুয়ারি ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের অর্ধশত বার্ষিকী নিছক আনুষ্ঠানিকতার জন্য নয়, বরং তা থেকে শিক্ষা গ্রহণের জন্য নানা আয়োজনে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও ছাত্র সংগঠন পালন করবে- এটাই প্রত্যাশা।

লেখক: সাংবাদিক

সংশ্লিষ্ট খবর


মন্তব্য যোগ করুণ

পরের
খবর

রাজনীতির প্রামাণিক দলিল, দলের দর্পণ


আরও খবর

চতুরঙ্গ
রাজনীতির প্রামাণিক দলিল, দলের দর্পণ

প্রকাশ : ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ | প্রিন্ট সংস্করণ

  ড. হারুন-অর-রশিদ

উপসম্পাদকীয় বা মতামত বিভাগের প্রচলিত ধারার বাইরে গিয়ে এ নিবন্ধে একটি গবেষণা গ্রন্থ নিয়ে আমি আলোচনা করতে চাই। এর কারণ একটিই- বাংলাদেশের রাজনীতি বিষয়ে লিখতে বা গবেষণায় আগ্রহী সবার জন্যই এটি আকর গ্রন্থ। এটি বাংলাদেশের রাজনীতির প্রমাণিক দলিল, অনেক রাজনৈতিক দলের দর্পণ। আমি সাংবাদিক ও দৈনিক সমকাল-এর উপসম্পাদক অজয় দাশগুপ্ত সংকলিত-সম্পাদিত ও বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত 'সাত দশকের হরতাল ও বাংলাদেশের রাজনীতি' (২০১৮) গ্রন্থের কথা বলছি। ২৫ জানুয়ারি বাংলা একাডেমির কবি শামসুর রাহমান মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হলো বইটির প্রকাশনা সভা। সভাপতি ছিলেন জাতীয় অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান। আলোচকদের মধ্যে ছিলেন- বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. রওনক জাহান, বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজী, দৈনিক অবজারভার পত্রিকার সম্পাদক ইকবাল সোবহান চৌধুরী, এফবিসিসিআইর সাবেক সভাপতি ও সমকাল প্রকাশক এ. কে. আজাদ প্রমুখ। আলোচকদের তালিকায় আমার নামটিও ছিল। সে সুবাদে বইটি অনুষ্ঠানের পূর্বেই দেখে যাওয়ার সুযোগ আমার হয়েছিল। বলার অপেক্ষা রাখে না, এটি অতীব জরুরি ও গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা-কর্ম। এ ধরনের গবেষণা-কর্ম দেশে এই প্রথম। অনুষ্ঠানে বইটি সবার বিপুল প্রশংসা লাভ করে।
আলোচ্য বইটি লেখকের দুই দশকের গবেষণার ফসল। শিরোনামেই এটি স্পষ্ট- যে ভূখণ্ড নিয়ে আমাদের আজকের বাংলাদেশ, সেখানকার বিগত সাত দশক বা ৭০ বছরে (১৯৪৭-২০১৭) সংঘটিত হরতাল ও রাজনীতির প্রধান প্রধান ঘটনা নিয়ে এটি রচিত। জাতীয় পত্রিকা, হাসান হাফিজুর রহমান (সম্পাদিত) স্বাধীনতা যুদ্ধ :দলিলপত্র ও দু'একটি বইয়ের তথ্যসূত্র। তবে পত্রিকা থেকে প্রাপ্ত তথ্যই হচ্ছে এ গবেষণা-কর্মের প্রধান উৎস। দিন হিসাবে ৭০ বছরে ২৫ হাজার ৫শ' ৫০ দিন হয়। লেখক অজয় দাশগুপ্তকে এর প্রতিদিনের জন্য নির্বাচিত সংবাদপত্র পাঠ করে তথ্য সংগ্রহ করতে হয়েছে। এটি নিঃসন্দেহে দুঃসাধ্য, দুঃসাহসিক ও সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। দুঃসাধ্য এ কারণে যে, এ জন্য তাকে চরম ধৈর্যের পরিচয় দিতে হয়েছে। সে পরীক্ষায় তিনি শুধু উত্তীর্ণই নন; অন্য গবেষকদের জন্য তিনি দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করেছেন। এ জন্য তাকে ধন্যবাদ ও অভিনন্দন জানাই।

৫৫১ পৃষ্ঠার এ বইটিতে ১১টি অধ্যায় রয়েছে। এর মধ্যে প্রথম ও শেষ অধ্যায়টি বাদে বাকিগুলো বিভিন্ন সরকারের শাসনামল অনুযায়ী সাজানো। প্রথম অধ্যায়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ যে কারণে তা হলো, এতে সাত দশকের হরতালের মূল্যায়ন ও বিশ্নেষণ করা হয়েছে। ভারত উপমহাদেশে হরতালের প্রথম উদ্ভব, আমাদের বাংলাদেশ ভূখণ্ডে সারণী আকারে আলোচ্য সময়ের হরতাল সংশ্নিষ্ট বিস্তারিত বিবরণ বা চিত্র, যেমন হরতালের পরিসংখ্যান (শাসনামল অনুযায়ী), হরতালের ধরন বা পর্যায় (জাতীয়, আঞ্চলিক, স্থানীয়), হরতালের স্থায়িত্ব (অর্ধ দিবস, পূর্ণ দিবস, সর্বোচ্চ ১২০ ঘণ্টা), হরতালের সাফল্য-ব্যর্থতা, হরতালের ইস্যু (রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, স্থানীয় বা অন্য), হরতাল আহ্বানকারী পক্ষ (রাজনৈতিক দল, জোট বা অন্য সংগঠন), হরতালে হতাহত ও গ্রেফতারের চিত্র, হরতালে অর্থনৈতিক ক্ষতি, হরতালে শিক্ষাজীবনের ক্ষতি, হরতালের বিকল্প ভাবনা, হরতাল ইস্যুতে সর্বোচ্চ আদালতের অবস্থান ইত্যাদি বিষয় এ অধ্যায়ে স্থান পেয়েছে। তা ছাড়া, কেন এ গবেষণা-কর্ম, গবেষণা-কর্মের তথ্য-উৎস ইত্যাদিও লেখক এ অধ্যায়ে তুলে ধরেছেন। বইয়ের শেষের অধ্যায়ে ভারত, নেপাল, দক্ষিণ আফ্রিকা, শ্রীলংকা, আর্জেন্টিনা, কানাডা, ইতালি, গ্রেট ব্রিটেন, যুক্তরাষ্ট্র ইত্যাদি বহির্দেশের হরতাল, বন্‌ধ্‌ (ভারত, নেপাল, শ্রীলংকা), 'স্টে অ্যাট হোম' কর্মসূচি (দক্ষিণ আফ্রিকা), শ্রমিক ধর্মঘট (কানাডা, ইতালি, গ্রেট ব্রিটেন, যুক্তরাষ্ট্র) ইত্যাদি নমুনা আকারে উল্লেখ করা হয়েছে। শাসনামল অনুযায়ী হরতালের সার্বিক চিত্র ও গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনাবলি নিয়ে বাকি ৯টি অধ্যায় পরিকল্পিত।
আলোচ্য বই থেকে দেখা যায়, ১৯৪৭ থেকে ২০১৭ পর্যন্ত মোট ৬১১ বার জাতীয় পর্যায় এবং ১৬১৯ বার স্থানীয় পর্যায়ে (পৃ. ১৭) হরতাল অনুষ্ঠিত হয়। এর মধ্যে ২০০৯ থেকে ২০১৫ সময়ে ২৪৩ (জাতীয়) + ৪১১ (আঞ্চলিক/স্থানীয়)= ৬৫৪ বার অর্থাৎ প্রতি মাসে গড়ে ৮ বার হরতাল ডাকা হয়। ৭০ বছরের মধ্যে সরকারের শাসনামল হিসাবে জাতীয় ও আঞ্চলিক/স্থানীয় উভয় পর্যায়ে সর্বোচ্চ সংখ্যক হরতালের ঘটনা ছিল এ সময়ে (২০০৯-২০১৫)। এর প্রায় সবই ছিল রাজনৈতিক ইস্যুকেন্দ্রিক (পৃ. ১৮)। উল্লেখ্য, আলোচ্য সময়ে সরকারে ছিল আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোট, আর হরতাল আহ্বানকারী পক্ষ ছিল বিএনপি-জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট বা এককভাবে জামায়াত (যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের রায় ঘোষণা ও তা কার্যকর করার প্রতিবাদে)।
আন্দোলনের হাতিয়ার হিসেবে হরতাল কর্মসূচির সাফল্য ও ব্যর্থতা উভয়ই অজয় দাশগুপ্ত তার আলোচ্য বইয়ে দেখিয়েছেন। জনসমর্থন ও জনস্বার্থের উপস্থিতি বা অনুপস্থিতি সে ক্ষেত্রে মুখ্য। আমাদের এ অঞ্চলে ঔপনিবেশিক শাসনবিরোধী আন্দোলনের হাতিয়ার হিসেবে হরতালের মতো শক্ত রাজনৈতিক কর্মসূচির উদ্ভব ঘটে। ব্রিটিশ শাসন-শোষণের নিগড় থেকে মুক্তির লক্ষ্যে গত শতকে মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বে ব্যাপক জনসমর্থনভিত্তিক ব্রিটিশবিরোধী বয়কট ও আইন অমান্য আন্দোলন ভারতের স্বাধীনতার আন্দোলনের সাফল্যের ক্ষেত্রে যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, তা সবার জানা। অনুরূপভাবে পাকিস্তানি শাসনামলে বাঙালির জাতীয় মুক্তি বা স্বাধীনতার লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৬৬ সালে 'আমাদের বাঁচার দাবি :৬ দফা কর্মসূচি' পেশ করলে তা দ্রুত বাঙালিদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে এবং ৭ জুন (১৯৬৬) '৬ দফা দাবি দিবস'-এ আওয়ামী লীগ আহূত হরতাল বঙ্গবন্ধু কারাবন্দি থাকা সত্ত্বেও আইয়ুব সরকারের সর্বপ্রকার নির্যাতন-নিষ্পেষণ উপেক্ষা করে শতভাগ সফল হয়েছিল। এভাবে স্বাধীনতাউত্তর বাংলাদেশে সামরিক শাসনের কবল থেকে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রামের সময়কার একাধিক দৃষ্টান্তও উল্লেখ করা যাবে। অন্যদিকে, জনসমর্থনহীন ও জনস্বার্থ বির্বজিত অবস্থায় হরতাল-অবরোধ-প্রতিরোধের মতো সর্বাত্মক রাজনৈতিক কর্মসূচি অবলম্বন যে সংশ্নিষ্টদের জন্য চরম বিপর্যয় ডেকে নিয়ে আসে, তার বহু দৃষ্টান্ত লেখক তার বইয়ে উল্লেখ করেছেন। বিএনপি-জামায়াতের বর্তমান রাজনৈতিক পরিণতি তারই সাক্ষ্য বহন করে, যা বলার অপেক্ষা রাখে না।
অজয় দাশগুপ্তের বর্তমান গ্রন্থটি রাজনৈতিক দল ও নেতৃবৃন্দের জন্য দর্পণ বা আমলনামাস্বরূপ। কে কখন কী বলেছেন এবং পরবর্তী সময়ে কী করেছেন, এ বই তার প্রামাণিক দলিল। উদাহরণস্বরূপ, ১৯৯৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের অর্থমন্ত্রী শাহ এএমএস কিবরিয়া (বর্তমানে প্রয়াত) একবার সাংবাদিকদের ডেকে বলেছিলেন, 'আওয়ামী লীগ বিরোধী দলে গেলেও ভবিষ্যতে হরতাল করবে না' (দ্রষ্টব্য :বইয়ের প্রসঙ্গকথা)। কিন্তু ২০০১ সাল থেকে বিরোধী দলে অবস্থানকালে আওয়ামী লীগ বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের বিরুদ্ধে বহুবার হরতাল কর্মসূচি পালন করে (পৃ. ১৮)। অন্যদিকে, ১৯৯৫ সালে বিএনপি সরকারের সময় আওয়ামী লীগের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলনকালে তখনকার প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় এক জনসভায় ঘোষণা করেছিলেন, 'তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি অসাংবিধানিক' (পৃ. ১৯৭)। একই বছর চট্টগ্রামে এক সুধী সমাবেশে তিনি বলেছিলেন, 'নিরপেক্ষ ব্যক্তি বলে কেউ নেই' (পৃ. ১৯৯)। ২০০৯-১৮ সময়ে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোট সরকারের সময় বিরোধী দলে থাকা বিএনপি সেই খালেদা জিয়ারই নেতৃত্বে কীভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলনের নামে চরম সহিংস কর্মকাণ্ডের আশ্রয় নেয়, তা দেশবাসীর জানা। গ্রন্থটিতে এসব বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে। যেমন 'পেট্রোল বোমায় দগ্ধ নারীর জিজ্ঞাসা' (পৃ. ৪৫৯), 'চট্টগ্রামে (খামারিদের) পুকুরে দুধ ঢেলে অবরোধের প্রতিবাদ' (পৃ. ৪৬১), '২০ দিনে ১০৫ জনের প্রাণহানি' (পৃ. ৪৭০), '৫৩১ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আগুন' (পৃ. ৪৮৩) ইত্যাদি।
কোনো বই বা লেখাই শতভাগ ত্রুটিমুক্ত নয়। অজয় দাশগুপ্তের আলোচ্য বই সম্বন্ধেও একই কথা প্রযোজ্য। ৫৫১ পৃষ্ঠার একটি বইয়ে এমনটি হওয়া নিতান্তই স্বাভাবিক। তবে সংখ্যা বিচারে ত্রুটি খুব কমই চোখে পড়েছে। জেনারেল এরশাদের ক্ষমতা দখলের তারিখ দেওয়া আছে ১৯৮১ সালের ২৪ মার্চ (পৃ. ১৫)। তারিখ ঠিকই আছে; সাল হবে ১৯৮২। মুক্তিযুদ্ধকালে 'মুজিবনগর সরকার' নামে খ্যাত প্রথম বাংলাদেশ সরকার গঠনের তারিখ দেওয়া হয়েছে ১৭ এপ্রিল (পৃ. ৬০)। এটি হবে ১০ এপ্রিল (১৭ এপ্রিল ছিল প্রকাশ্য শপথ গ্রহণের দিন)। বগুড়ায় হরতালের বিরোধিতা এবং আবু হোসেন সরকার মন্ত্রিসভার পতন (১৯৫৬) এ উভয় ঘটনা প্রসঙ্গে রিপোর্ট করতে গিয়ে পত্রিকার (দৈনিক চাষী) প্রতিবেদকই শেরেবাংলা ফজলুল হকের পার্টির নাম 'কৃষক-প্রজা পার্টি' উল্লেখ করেছেন এবং বইয়ে (পৃ. ৩১) সেভাবে স্থান পেয়েছে। ভারত বিভাগের পূর্বে হক সাহেবের পার্টির ওই নাম ছিল (প্রতিষ্ঠা ১৯৩৬)। চুয়ান্নর যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনের কয়েক মাস পূর্বে ১৯৫৩ সালে নতুন নামকরণ করা হয় 'কৃষক-শ্রমিক পার্টি'। অপর একটি বিষয় হলো, বইয়ের প্রথম অধ্যায়ে সার্বিক বিষয়বস্তুর ওপর লেখকের মূল্যায়ন ও বিশ্নেষণ অংশে সেনা-সমর্থিত তথাকথিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় সেনাশাসন-নিয়ন্ত্রণ ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আগস্টের (২০০৮) ছাত্র-শিক্ষক বিদ্রোহের মতো এত বড় ঘটনা (যা দ্রুত সারাদেশে স্টম্ফুলিঙ্গের মতো ছড়িয়ে পড়ে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে কাজ করে), তার অনুল্লেখ (যদিও বইয়ের ভেতরে অন্যত্র এ ঘটনার উল্লেখ রয়েছে)। এটি গুরুত্ব সহকারে আসা উচিত ছিল। আশা করি, লেখক পরবর্তী মুদ্রণ/সংস্করণে এগুলো দেখবেন।
পরিশেষে, এ কথা বলতেই হবে, অজয় দাশগুপ্তের আলোচ্য গ্রন্থটি একটি তথ্যসম্ভার; আমাদের সাত দশক বা ৭০ বছরের রাজনীতির প্রামাণিক দলিল। সংশ্নিষ্ট বিষয়ে গবেষণার ক্ষেত্রে এটি আকর গ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত হবে- সন্দেহ নেই। সাধারণ পাঠকদের বাইরে গবেষক ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো সর্বাধিক উপকৃত হবে। লেখককে বিস্ময়কর ও মহামূল্যবান এ গ্রন্থ উপহার দেওয়ার জন্য অজস্র অভিনন্দন।

লেখক: উপাচার্য, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়

পরের
খবর

রাজনীতিতে তারকা ও তারুণ্য


আরও খবর

চতুরঙ্গ

বলা না-বলা

রাজনীতিতে তারকা ও তারুণ্য

প্রকাশ : ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

তরুণরা অন্যায়ের প্রতিবাদ-প্রতিরোধে নির্ভীক; কিন্তু প্রচলিত ধারার রাজনীতিতে তারা অনাগ্রহী

  আবু সাঈদ খান

প্রায়ই শুনি- তরুণরা এখন রাজনীতিবিমুখ। কথাটি পুরোপুরি সত্য নয়। আসল সত্য হলো, প্রচলিত ধারার রাজনীতিতে তাদের আগ্রহ নেই। তবে অন্যায়ের প্রতিবাদ-প্রতিরোধে তারা নির্ভীক। তার প্রমাণ গণজাগরণ মঞ্চ (২০১৩), বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভ্যাটবিরোধী আন্দোলন (২০১৫), কোটা সংস্কার আন্দোলন (২০১৮) এবং নিরাপদ সড়ক আন্দোলন (২০১৮)। পার্থক্য এই যে, '৫২-এর ভাষা আন্দোলন, '৬২-৬৪-এর শিক্ষা আন্দোলন, '৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান কিংবা '৯০-এর গণআন্দোলনে ছাত্র সংগঠনগুলোর নেতৃত্ব ও পরিকল্পনা ছিল, রাজনৈতিক দলগুলোরও ভূমিকা ছিল। কিন্তু গণজাগরণ মঞ্চসহ সাম্প্রতিক আন্দোলনগুলোতে ছাত্র সংগঠনের কর্মীরা অংশ নিলেও তা তাদের পরিকল্পিত আন্দোলন ছিল না। চূড়ান্ত বিচারে এসব সাধারণ শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ম্ফূর্ত আন্দোলন।

এসব ঘটনাপ্রবাহ থেকে প্রতীয়মান, প্রচলিত রাজনীতির সঙ্গে তরুণদের বেশ দূরত্ব তৈরি হয়েছে। এসব ছাত্র সংগঠনের নিজস্ব কোনো কর্মসূচি নেই। বাম ছাত্র সংগঠনগুলো সাংগঠনিক দুর্বলতার কারণে সাধারণ ছাত্রদের আকৃষ্ট করতে পারছে না। ছাত্রনেতারা এখন অভিভাবক রাজনৈতিক দলগুলোর গুণকীর্তনে মশগুল। অন্ধের মতো রাজনৈতিক দলের লেজুড়বৃত্তি করছে। এমনকি 'লাঠি' হিসেবেও ব্যবহূত হচ্ছে।
দীর্ঘদিন (প্রায় তিন দশক) ডাকসুসহ কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচন হচ্ছে না। ফলে সংগঠনগুলোর মধ্যে আদর্শিক রাজনীতি নেই। সাধারণ ছাত্রদের মন জয়ের কোনো চেষ্টাও নেই। যেটি আছে- জোর করে মিছিলে যেতে বাধ্য করা। না গেলে হলে থাকতে পারবে না। এমনকি শারীরিকভাবেও নাজেহাল হতে হবে। বলা বাহুল্য, যখন যে দল ক্ষমতায় থাকে, তখন সেই দলের হাতেই সাধারণ শিক্ষার্থীদের নিগ্রহের শিকার হতে হয়। এর ফলে ছাত্র রাজনীতি জনপ্রিয়তা হারিয়েছে।

ছাত্রনেতাদের অনেকে এখন বিত্ত-বৈভবে টইটম্বুর। তারা সাধারণ ছাত্রদের ভালোবাসার পাত্র হতে পারছেন না। তারকা খ্যাতিও পাচ্ছেন না। যেমনটি পেয়েছিলেন ষাট-সত্তর-আশির দশকের ছাত্রনেতারা। এ ক্ষেত্রে রাশেদ খান মেনন, মতিয়া চৌধুরী, তোফায়েল আহমেদ, নূরে আলম সিদ্দিকী, আ স ম আবদুর রব, শাজাহান সিরাজ, আবদুল কুদ্দুস মাখন, মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, আ ফ ম মাহবুবুল হক, মাহমুদুর রহমান মান্না, সুলতান মোহাম্মদ মনসুর, মুশতাক হোসেন, আমানউল্লাহ আমান, খায়রুল কবীর খোকন প্রমুখের কথা বলা যায়। ছাত্রনেতা থাকাকালে তাদের পরিচিতি শিক্ষাঙ্গনে সীমাবদ্ধ ছিল না। তারা 'ন্যাশনাল ফিগার' হয়ে উঠেছিলেন। রাজনৈতিক দলও তাদের মূল্যায়ন করত। তাদের প্রায় সবাই রাজনৈতিক দলে যোগদানের অল্প সময়ের মধ্যে জাতীয় নির্বাচনে মনোনয়ন পান। অনেকে এমপি-মন্ত্রীও হন। '৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের নায়ক তোফায়েল আহমেদ '৭০-এ এমএনএ হলেন। মুক্তিযুদ্ধ শেষে প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সচিবের দায়িত্ব পেলেন। ছাত্রনেতাদের অনেকেই ছিলেন ছাত্র আন্দোলনের মধ্য দিয়ে উঠে আসা রাজনীতিক।

পঞ্চাশ, ষাট, সত্তর ও আশির দশকে রাজনৈতিক অঙ্গন ছিল তারুণ্যের প্রাণপ্রাচুর্যে ভরপুর। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ এবং আশি-নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে তারুণ্যই ছিল প্রাণশক্তি। তবে রাজনৈতিক নেতৃত্ব কখনও কখনও তরুণদের বিপজ্জনকও মনে করে। অগ্নিযুগের বিপ্লবীদের ওপর স্বয়ং মহাত্মা গান্ধী নাখোশ ছিলেন। তার চোখে তরুণ বিপ্লবীদের কর্মকাণ্ড ছিল হঠকারী। যে কারণে ক্ষুব্ধ গান্ধী জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে নিন্দা জ্ঞাপনে বিরত ছিলেন। ভারতকে এ গ্লানি থেকে বাঁচিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তিনি এই নির্মমতার প্রতিবাদে 'নাইট' উপাধি বর্জন করেন। ১৯৪৭-উত্তরকালেও মুসলিম লীগ নেতৃত্ব পূর্ব বাংলার তরুণ তুর্কিদের ওপর ক্ষিপ্ত হয়েছিলেন। তখন শামসুল হক, শেখ মুজিব, কমরুদ্দিন আহমদ, অলি আহাদ, তাজউদ্দীন আহমদ, মোহাম্মদ তোয়াহাসহ তরুণ মুসলিম লীগ কর্মীরা প্রতিবাদী হয়ে ওঠেন। মুসলিম লীগের সঙ্গে এদের বিরোধ চরমে ওঠে। এরই পরিণতিতে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বে আওয়ামী মুসলিম লীগ (পরে মুসলিম শব্দটি বাদ দেওয়া হয়) গঠন করা হয়। স্বাধীনতা-উত্তরেও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠ যুব-ছাত্রনেতারা জাসদ গঠন করেন। এমন দৃষ্টান্ত আরও আছে। প্রবীণের সঙ্গে তরুণের দ্বন্দ্ব চিরন্তন। তারপরও রাজনীতিতে তরুণদের অংশগ্রহণের সুযোগ অবারিত করতে হবে। এ ভিন্ন রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তনের সুযোগ নেই।

এখন রাজনীতিতে উল্লেখযোগ্য তরুণদের উপস্থিতি আছে। তবে তারুণ্যের স্পর্ধিত দাপট নেই; ছাত্রনেতাদের মধ্যে নেই তারকা খ্যাতি। এ কারণেই রাজনীতি প্রাণপ্রাচুর্য ও জৌলুস দুই-ই হারাতে বসেছে। এমনই পটভূমিতে রাজনীতিতে সামরিক-বেসামরিক আমলা ও ব্যবসায়ীরা জেঁকে বসেছেন। এখন আসছেন তারকারা।

ক্রিকেট, নাটক, সিনেমা কিংবা সঙ্গীত ভুবন থেকে তারকারা রাজনীতিতে ভিড় করছেন। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, তারকা খুঁজছে রাজনৈতিক দলগুলোও। তারকাদের বরণ করে নিচ্ছে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, এমনকি জাতীয় পার্টিও। এ রাজনীতির পথিকৃৎ প্রতিবেশী ভারত। বিগত নির্বাচনে বিজেপি চমক দেখিয়েছিল, তারকাদের দলে ভিড়িয়েছিল। তাদের মধ্য থেকে কণ্ঠশিল্পী বাবুল সুপ্রিয় ও অভিনেত্রী স্মৃতি ইরানী মন্ত্রী হয়েছেন। তবে তামিলনাড়ূর রাজনীতি বরাবরই তারকা-শোভিত। সেখানে এমজি রামচন্দ্রন, জয়ললিতা, করুণানিধির পথ ধরে নতুন করে সক্রিয় হয়েছেন রজনীকান্ত, কমল হাসান প্রমুখ। সম্প্রতি তারকাদের টেনে এনেছে তৃণমূল কংগ্রেসও। কবীর সুমন, দেব প্রমুখ তারকা তৃণমূল কংগ্রেসে নাম লিখিয়ে সাংসদ হয়েছেন। পিছিয়ে নেই পশ্চিমা দুনিয়াও। রিয়েলিটি শোর ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট।

এবার জাতীয় নির্বাচনে ফারুক, কবরী, মমতাজ, রিয়াজ, ফেরদৌস, শমী কায়সার, রোকেয়া প্রাচী, জ্যোতিকা জ্যোতি, ক্রিকেটার মাশরাফি, সাকিব আল হাসানসহ এক ঝাঁক তারকা আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চেয়েছিলেন। মমতাজ বিগত সংসদেও এমপি ছিলেন। এবারও এমপি হয়েছেন। ফারুক ও মাশরাফি এবার এমপি হয়েছেন। সঙ্গীতশিল্পী বেবী নাজনীন, কনকচাঁপা বিএনপির মনোনয়ন নিয়ে ভোটযুদ্ধে শামিল হয়েছিলেন। মনির খান মনোনয়ন না পেয়ে বিএনপি ছেড়েছেন। জাপা থেকে অভিনেতা সোহেল রানা প্রার্থী হয়েছিলেন। সংরক্ষিত নারী আসনের মহাজন এখন আওয়ামী লীগ। তাই আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন চেয়েছেন কবরী, মৌসুমী, অপু বিশ্বাস, রোকেয়া প্রাচী, জ্যোতিকা জ্যোতি ও শমী কায়সার। এদের সবাই আওয়ামী লীগ রাজনীতির অনুসারী কি-না, তা নিয়ে সংশয়ও আছে। সে বিতর্কে যেতে চাই না। রাজনীতি করার অধিকার সবারই আছে। তবে তাদেরকে অবশ্যই রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে আসতে হবে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, ফারুক ছাত্র রাজনীতিতে ছিলেন। কবরীও অভিনয় জীবন ছেড়ে রাজনীতিতে যোগ দিয়ে এমপি হয়েছিলেন। তাদের ব্যাপারে প্রশ্ন তুলছি না। কিন্তু যারা ক্যারিয়ারের শুরুতে বা মাঝপথে রাজনীতিক হতে চাইছেন, তাদের আগমন নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায়। তারা রাজনীতিতে কী ভূমিকা রাখবেন, জানি না। তবে রাজনীতিতে নাম লেখানোর এ প্রবণতা সাংস্কৃৃতিক অঙ্গনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। এ প্রসঙ্গে ক্রিকেট তারকা মাশরাফি বিন মুর্তজার কথা বলা যায়। খেলার মাঠ থেকে রাজনীতির মাঠে চলে গেলেন। সাকিব আল হাসানও আওয়ামী লীগের মনোয়ন চেয়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাকে নিরুৎসাহিত করেছেন। কারণ, ক্রিকেটে তার আরও বহু দূর যাওয়ার আছে। আমার মনে হয়, এমন উপদেশ মাশরাফির জন্যও প্রযোজ্য ছিল। ক্রিকেটকে তার আরও অনেক কিছু দেওয়ার ছিল। অবসর নেওয়ার পরও ক্রিকেট ব্যবস্থ্থাপনায় ভূমিকা রাখতে পারতেন। তা হলো না। কেউ কেউ বলছেন, ক্রিকেট ও রাজনীতি দুই ক্ষেত্রেই ভূমিকা রাখবেন। বাস্তবে তা কতটুকু সম্ভব?

শুধু মাশরাফি নয়, মনোনয়নের জন্য ভিড় করা উদীয়মান শিল্পীদের স্ব-স্ব অঙ্গনে ভূমিকা রাখার সুযোগ আছে। তা উপেক্ষা করে তারা কেন এমপি হতে চাইছেন? এর কারণ কি এই যে, এমপি-মন্ত্রী হলে দ্রুত বিত্ত-বৈভবের মালিক হওয়া যায়? এমন অসুস্থ প্রতিযোগিতায় অবসরপ্রাপ্ত আমলা ও ব্যবসায়ী, এমনকি পেশাদার রাজনীতিকদের একাংশ শামিল হয়েছেন। এ প্রতিযোগিতায় খেলোয়াড়-শিল্পীদের দেখতে চাই না। চাই তারা স্ব-স্ব অঙ্গনকে আলোকিত করুন। আর রাজনীতি করতে হলে পছন্দের দলে নাম লিখিয়ে আগে তালিম নিন, তারপর মনোনয়ন চান; তখন কারও কিছু বলার থাকবে না। সবারই মনে রাখা দরকার-রাজনীতিক হওয়ার পথপরিক্রমা আছে; শর্টকাট রাস্তা নেই। এটি মনোনয়নপ্রত্যাশীদের বুঝলেই হবে না শুধু। তা সর্বাগ্রে বুঝতে হবে রাজনৈতিক নেতৃত্বকেই।

নীতিনির্ধারকদের আরও বুঝতে হবে- রাজনীতিতে তারকাদের চেয়ে তারুণ্যই বেশি জরুরি।

আবু সাঈদ খান: সাংবাদিক ও লেখক
ask_bangla71@yahoo.com

পরের
খবর

ছাত্র আন্দোলন ও শিক্ষার্থী


আরও খবর

চতুরঙ্গ
ছাত্র আন্দোলন ও শিক্ষার্থী

প্রকাশ : ৩০ জানুয়ারি ২০১৯

  অজয় দাশগুপ্ত

পাঁচ কোটিরও বেশি ছাত্রছাত্রী অথচ বাংলাদেশে এখন ছাত্র আন্দোলন কার্যত অনুপস্থিত।

পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশে উত্তরণের সময় সংগঠিত শিল্পে শ্রমিক সংখ্যা সর্বসাকল্যে ছিল লাখ দুয়েক। কিন্তু এখন তৈরি পোশাক শিল্পেই কাজ করছে ৪০ লাখের বেশি শ্রমিক। কিন্তু শ্রমিক আন্দোলন কার্যত নেই। যেসব বামপন্থি রাজনীতিক শ্রমিকশ্রেণির নেতৃত্বে সর্বহারার একনায়কতন্ত্র কায়েমের কথা বলতেন, তারা এত বিপুল সংখ্যক শ্রমিকের ক'জনকেই-বা সংগঠিত করতে পেরেছেন— সে হিসাব হাতে গুণেই করে ফেলা যায়। শ্রমিক নেতা ডা. ওয়াজেদুল ইসলাম নির্মাণ শ্রমিকদের কথা প্রায়শই বলেন। এখন শহর-গ্রাম, সর্বত্র পাকা বাড়ি নির্মাণের জোয়ার। বসতবাড়ির বাইরেও নির্মাণ হচ্ছে কারখানা, হাসপাতাল, বিদ্যালয় ও অন্যান্য প্রয়োজনে পাকা ভবন। নির্মাণ শ্রমিকের সংখ্যা ৪০ লাখ ছাড়িয়েছে। চা বাগানে কাজ করছে লাখ দুই শ্রমিক। শ্রমিক আছে, আন্দোলন নেই। কেন?

বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান। কৃষি মানেই গ্রাম। শহরবাসীর সংখ্যা বাড়ছে। অনেক গ্রামও শহরের রূপ পাচ্ছে। তারপরও কৃষি কাজই ৪০ শতাংশের বেশি মানুষের জীবিকার প্রধান উৎস হয়ে আছে। কৃষকের সমস্যা আছে- কৃষি মজুরের সমস্যা আছে। কিন্তু কৃষক ও ক্ষেতমজুরের আন্দোলন কোথায়? প্রতিবেশী ভারতে সাম্প্রতিক সময়ে কৃষকদের আন্দোলন নতুন মাত্রা পেয়েছে। তারা ফসলের ন্যায্যমূল্য দাবি করছে। ব্যাংক ঋণের সুবিধা বাড়াতে বলছে। প্রধান দুটি রাজনৈতিক দল বিজেপি ও কংগ্রেস কৃষকদের তুষ্ট করার জন্য সচেষ্ট রয়েছে। কিন্তু কৃষিপ্রধান বাংলাদেশে কার্যত নেই কৃষি আন্দোলন। এ ক্ষেত্রে বরং গণমাধ্যম বেশি সোচ্চার।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ বা ডাকসু নির্বাচন ১১ মার্চ অনুষ্ঠিত হবে— এমনটিই ঘোষণা করা হয়েছে। ২৮ বছরের বেশি নির্বাচন হয় না ডাকসু এবং অন্যান্য কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদের। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন টেলিভিশন ক্যামেরার ভিড়। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ছাত্রনেতাদের ডেকে সভা করছে। তাতে এমন অনেক ছাত্র সংগঠন আমন্ত্রিত, যাদের ২০টির মতো হল ছাত্র সংসদের সব পদে প্রার্থী দেওয়ার ক্ষমতা নেই। এমনকি ডাকসুর ২৫ পদেও প্রার্থী দেওয়া নিদারুণ কষ্টের। ডাকসুর গঠনতন্ত্রে কিছু সংশোধন এসেছে। ৩০ বছর বয়স পর্যন্ত যে কোনো ছাত্র বা ছাত্রী ভোটার ও প্রার্থী হতে পারবেন। সাধারণত ১৬-১৭ বছর বয়সে মাধ্যমিক পরীক্ষায় ছাত্রছাত্রীরা উত্তীর্ণ হয়। এ হিসাবে কেউ অনার্স শেষ বর্ষে ২২-২৩ বছরে এবং মাস্টার্স কোর্সে ২৩-২৪ বছর বয়সে অধ্যয়ন করে। ছাত্র সংসদ এসব নিয়মিত ছাত্রছাত্রীর জন্যই হওয়ার কথা। তাহলে কেন ভিপি-জিএস এবং অন্যান্য পদে নির্বাচিত হওয়ার জন্য বয়স বাড়ানো হবে— সঙ্গত প্রশ্ন। অনেকেই বলবেন, এটাও রেওয়াজ। যারা অপরের তরে জীবন-যৌবন উৎসর্গ করবেন, তাদের পক্ষে একই সঙ্গে নিত্যদিন ক্লাস করা ও মাঝেমধ্যে পরীক্ষা দেওয়া সম্ভব নয়। অতএব, যারা নির্দিষ্ট বিষয়ে অনার্স ও মাস্টার্স কোর্স সম্পন্ন করেছে, তাদের জন্য বছর পাঁচেক গ্রেস পিরিয়ড দেওয়া যেতেই পারে।

১৯৬৯ সালের ছাত্র গণঅভ্যুত্থানের নায়ক তোফায়েল আহমেদ ২৫ বছর বয়সে ডাকসুর ভিপি নির্বাচিত হয়েছিলেন। তার আগে ছিলেন তৎকালীন ইকবাল হলের ভিপি (বর্তমান সার্জেন্ট জহুরুল হক হল)। তারও আগে নির্বাচিত হয়েছিলেন বরিশাল বিএম কলেজ ছাত্র সংসদে। স্বৈরশাসক আইয়ুব খানকে ক্ষমতাচ্যুত করায় তার ভূমিকা সর্বজনবিদিত। তোফায়েল আহমেদের আগের টার্মে ডাকসুর ভিপি হয়েছিলেন মাহফুজা খানম। বয়স ২১ বছর পূর্ণ না হতেই তিনি ডাকসুর ভিপি নির্বাচিত হন। সে সময়ে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পদার্থবিদ্যা বিভাগের কৃতী ছাত্র। ডাকসুর ভিপি থাকা অবস্থাতেই এমএসসিতে প্রথম শ্রেণি পেয়েছিলেন।

ডাকসুর আরেক ভিপি আ স ম আবদুর রব। তিনি ১৯৭১ সালের ২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বটতলায় বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা তুলেছিলেন। ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল মুজিবনগরে যে বাংলাদেশ সরকার শপথ গ্রহণ করে, তারা এ পতাকাকেই জাতীয় পতাকা হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেন। তিনি ডাকসুর ভিপি নির্বাচিত হন ১৯৭০ সালে, বয়স যখন ২৫ বছর।

ষাটের দশকের শেষ দিকে আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগ ছিল জনপ্রিয় সংগঠন। তখনকার সব বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদে নির্বাচিত হয়েছিল তাদের নেতারা। বাঙালির প্রাণের দাবি স্বায়ত্তশাসনের ৬ দফাকে জনপ্রিয় করার জন্য এ সংগঠনের নেতাকর্মীরা প্রাণান্ত পরিশ্রম করেছেন। ঊনসত্তরের ছাত্র গণঅভ্যুত্থান সৃষ্টি এবং একাত্তরে স্বাধীনতার সশস্ত্র সংগ্রামের জন্য ছাত্র সমাজ ও দেশবাসীকে প্রস্তুত করে তোলায় ছাত্রলীগের অবদান অনন্যসাধারণ।

১৯৭২ সালে ডাকসুর ভিপি নির্বাচিত হন মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম। তখন তিনি একই সঙ্গে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি, বয়স ২৩ বছর। ডাকসুর ভিপি থাকা অবস্থাতেই তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অর্থনীতি বিভাগ থেকে অনার্সে প্রথম শ্রেণি পেয়েছিলেন। সে সময়ে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন ছিল জনপ্রিয় সংগঠন। রাজশাহী, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, খুলনা— সব বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদে এ সংগঠনের জয়জয়কার। ১৯৭২ সালে ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন মাহবুব জামান। বয়স ছিল ২২ বছর। প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিপি-জিএস যথাক্রমে আবুল কাসেম ও মু. হিলালউদ্দিনও ছিলেন একই বয়সের।

আমরা কিন্তু বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনের দিকেও তাকাতে পারি। তার জন্ম ১৯২০ সালে। শৈশবে চোখের কঠিন ব্যাধিতে আক্রান্ত হওয়ায় তিন-চার বছর শিক্ষাজীবন থেকে ঝরে যায়। এ কারণে অপেক্ষাকৃত কম বয়সীদের সঙ্গে তিনি স্কুল-কলেজে পড়াশোনা করেছেন। ১৯৪৮ সালে ভাষা আন্দোলন গড়ে তোলার সময় বয়স তার ২৮ বছর। তখন তিনি গ্রেফতার হয়ে যান। এর আগে তিনি পাকিস্তান আন্দোলনে সক্রিয় অংশ নিয়েছেন। বয়স যখন ২৬ বছর, তখন অবিভক্ত বাংলার মুসলিম লীগ প্রাদেশিক কমিটির অন্যতম সম্পাদক হিসেবে তার নাম বিবেচনায় ছিল। ১৯৪৮ সালে তিনি নেপথ্যে থেকে পূর্ব পাকিস্তানে ছাত্রলীগ পুনর্গঠনে প্রধান ভূমিকা রাখেন। ১৯৫৬ সালে ৩৬ বছর বয়সে তিনি আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। তখন এমপি-মন্ত্রীও ছিলেন। ১৯৬৬ সালে বাঙালির মুক্তি সনদ '৬ দফা' প্রদানের সময় বয়স ৪৬ বছর। ১৯৭১ বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের মহানায়ক তিনি, বাঙালিরা একাট্টা তার পেছনে। তিনি বঙ্গবন্ধু, জাতির পিতা। ৭ মার্চ তার অবিনাশী উচ্চারণ- এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। অথচ বয়স ৫১ বছর পূর্ণ হতেও ১০ দিন বাকি।

পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়ন পাকিস্তানের শাসকদের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছে। তখন এ ভূখণ্ডে হিন্দু প্রভাবিত কংগ্রেস গুরুত্ব হারিয়েছে। মুসলিম প্রভাবিত মুসলিম লীগকে বাঙালিরা প্রত্যাখ্যান করেছে। আইয়ুব খানের সামরিক শাসন জাঁকিয়ে বসেছে। শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে তরুণ আওয়ামী লীগ নেতারা বাঙালির অধিকারের দাবি সামনে আনার চেষ্টা করতেই নেমে এসেছে নিষ্ঠুর নির্যাতন। এ সময়েই এগিয়ে আসে ছাত্র সমাজ। তাদের নেতৃত্ব দেয় ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়ন। ছাত্র সংগঠনগুলো যখন ঐক্যবদ্ধ হয়েছে, জনগণ তাদের ওপরে ভরসা রাখতে শুরু করেছে। তবে রাজনৈতিক দাবির পাশাপাশি শিক্ষার বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের দাবিও সামনে আনা হয়। আইয়ুব খান শিক্ষাকে পণ্য করতে চেয়েছিলেন। তার প্রণীত একাধিক শিক্ষা নীতিতে বলা হয়— শিক্ষা সবার জন্য নয়। যার অর্থ আছে, সেই কেবল ভর্তির যোগ্য হবে। এর বিরুদ্ধে ছাত্র সংগঠনগুলো রুখে দাঁড়ায়। ধনী-দরিদ্র, সবার জন্য শিক্ষার দাবি সামনে আনে তারা। এখন বাংলাদেশে পাঁচ কোটির বেশি ছাত্রছাত্রী। অর্থের অভাবে পড়তে পারছে না, এ সমস্যা ক্রমে কমে যাচ্ছে। সরকার বিদ্যালয়ের সব ছাত্রছাত্রীকে বিনামূল্যে বই দিচ্ছে। প্রায় এক কোটি ছাত্রছাত্রী সরকারের কাছ থেকে বৃত্তি পাচ্ছে। অতীতে ছাত্র সংগঠনগুলো এসব দাবিতে সোচ্চার হয়েছিল বলেই এখন তার সুফল মিলছে।

প্রায় তিন দশক ছাত্র সংগঠনের নির্বাচন নেই। কে দায়ী এ জন্য? কেউ এ জন্য সন্ত্রাসকে দায়ী করবেন। কেউবা বলবেন, রাজনৈতিক দলগুলো ছাত্র সংগঠনকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিচ্ছে না। ক্ষমতায় যে দল থাকে, তার ছাত্র সংগঠন বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দখলে নিয়ে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে— এ বাস্তবতাও আমাদের মনে রাখতে হবে। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনাতেও ক্ষমতাসীন দলের একচেটিয়া কর্তৃত্ব। অথচ একই সঙ্গে এখন প্রবল তাগিদ— শিক্ষার মান বাড়াতেই হবে। অর্থনীতির অগ্রগতি যোগ্য-দক্ষ অনেক তরুণ-তরুণী চাইছে। এ বিষয়ে নির্বাচিত ছাত্র সংসদ ভূমিকা রাখতে পারে। ছাত্র সংগঠন ভূমিকা রাখতে পারে। সত্তরের দশকের শুরুতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সিনেটে ছাত্র প্রতিনিধি ছিলাম। আরও ছিলেন ছাত্রলীগ সভাপতি শেখ শহীদুল ইসলাম, ডাকসু সহসভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম ও সাধারণ সম্পাদক মাহবুব জামান এবং ছাত্রলীগ নেতা ইসমত কাদির গামা। আমরা শিক্ষার প্রসার ও মানোন্নয়নে বিভিন্ন প্রস্তাব রেখেছি। আবার একই সঙ্গে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যার নিন্দা জানিয়ে ১৯৭৫ সালের ৪ নভেম্বর প্রস্তাব তুলে তা পাসও করিয়েছি।

ছাত্র সংসদের মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মের মধ্য থেকে নেতৃত্ব গড়ে উঠবে— এটা বলা হয়ে থাকে। সে নেতৃত্ব কিন্তু নিয়মিত শিক্ষার্থীদের মধ্য থেকেই আসতে হবে। এবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যে বয়সসীমা নির্ধারণ করা হয়েছে, সেটা দীর্ঘস্থায়ী হবে না— এটাই কাম্য। আমরা ছাত্রছাত্রীদের কাছ থেকে তাদের শিক্ষাগত ও বয়সের উপযোগী ভূমিকাই আশা করব। এর মধ্য থেকেই কেউ কেউ নিজেকে চিহ্নিত করতে পারবেন অনন্যসাধারণ হিসেবে। যেমনটি আমরা দেখেছি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ক্ষেত্রে। ছাত্রছাত্রীদের সবাই ছাত্র সংগঠনে যুক্ত হয় না। ডিবেটিং সোসাইটি, সাংস্কৃতিক সংগঠন— এসবেও আগ্রহ থাকে। কেউ এ বয়সেই সমাজসেবার কাজেও যুক্ত হয়। কেউবা বেশি মনোযোগী হয় রাজনৈতিক দলের কর্মকাণ্ডে। কিন্তু ছাত্র সংসদ সবার জন্য। কেবল রাজনৈতিক দলের ছাত্র সংগঠনের জন্য নয়, বহু পথ-মত-ধারার অনুসারী ছাত্রছাত্রীদের জন্যও আমাদের স্পেস তৈরি করে দিতে হবে। আবারও বলছি, তারা যেন এ ভূমিকায় স্বাভাবিক শিক্ষা জীবনেই আসতে পারে, সেটা নিশ্চিত করতে হবে।

ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ভোটার-প্রার্থী হওয়ার জন্য যেমন বয়স বাড়ানো হচ্ছে, তেমনি সরকারি চাকরিতে আবেদনের বয়সও ৩৫ বছর করার দাবি উঠছে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় বিএনপি-গণফোরামের জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ইশতেহারে তো সরকারি চাকরিতে বয়সসীমা তুলে দেওয়ার হাস্যকর প্রস্তাবও করা হয়েছিল। আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি, শিক্ষিত তরুণ-তরুণীদের মধ্যে ব্যাপক বেকারত্বই এ দাবির পেছনে কাজ করছে। যদি ২০-২৫ বছরের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কিংবা কোনো টেকনিক্যাল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে পাস করে সরকারি বা বেসরকারি কোনো প্রতিষ্ঠানে চাকরি পায় কিংবা নিজেই কোনো ধরনের উপার্জনমূলক উদ্যোগে যুক্ত হয়ে পড়ার পরিবেশ থাকে, তাহলে চাকরির বয়সসীমা ইস্যুটিই থাকবে না। আমাদের একটি বড় চ্যালেঞ্জও মনে রাখা চাই— উচ্চশিক্ষা নিয়ে প্রতি বছর লাখ লাখ তরুণ-তরুণী বের হচ্ছে; কিন্তু আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি বলছে— কম লোক দিয়েই বেশি কাজ করানো সম্ভব।

পাঁচ কোটি ছাত্রছাত্রীর সামনে ইস্যুর অভাব নেই। শিক্ষার মান বাড়ানোর কথা বলেছি। পড়াশোনার পরিবেশ উন্নত করার জন্য অনেক বিষয় তারা সামনে আনতে পারে। তারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় নিজেদের গড়ে তোলার কথা বলবে। প্রিয় বাংলাদেশকে আরও উন্নত ও সমৃদ্ধ করার কথা বলবে। অসাম্প্রদায়িক দেশ গঠন ও মুক্তবুদ্ধির প্রসারের কথা বলবে। এটা ছাত্র সংগঠনে থেকে করতে পারে। ছাত্র সংসদের কাঠামোতে করতে পারে। ডিবেটিং সোসাইটি, সাংস্কৃতিক সংগঠন কিংবা অন্য কোনো সংগঠনের ব্যানারে করতে পারে। কিন্তু মূল কথা হচ্ছে— ছাত্রছাত্রীদের যথাযথ অবদান রাখা। এ সুযোগ সৃষ্টির জন্য কিন্তু সরকার ও সব রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ব এবং বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় যুক্তদেরও ভূমিকা রাখতে হবে।


লেখক: সাংবাদিক

সংশ্লিষ্ট খবর