চতুরঙ্গ

ঊনসত্তরের ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানের পাঁচ দশক

প্রকাশ : ১৩ জানুয়ারি ২০১৯ | আপডেট : ১৩ জানুয়ারি ২০১৯

ঊনসত্তরের ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানের পাঁচ দশক

  অজয় দাশগুপ্ত

ঐতিহাসিক ১১ দফা আন্দোলনের ৫০ বছর পূর্ণ হচ্ছে এ বছরের জানুয়ারি মাসে। ১৯৬৯ সালের শুরুতেই চারটি ছাত্র সংগঠন- পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ, পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন (মতিয়া গ্রুপ), পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন (মেনন গ্রুপ) এবং এনএসএফ বা জাতীয় ছাত্র ফেডারেশন (দোলন গ্রুপ) ছাত্রদের বিভিন্ন দাবির সঙ্গে পূর্ব পাকিস্তানের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের ছয় দফা কর্মসূচি, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় অভিযুক্ত আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ মুজিবুর রহমানসহ সব রাজবন্দির মুক্তি, পাকিস্তানকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন বিভিন্ন সামরিক জোট থেকে মুক্ত করা, পাট ও বস্ত্র শিল্প জাতীয়করণ, পার্লামেন্টারি গণতন্ত্র প্রবর্তন প্রভৃতি ১১ দফা দাবিতে আন্দোলন গড়ে তোলার বিষয়ে একমত হয়। ছাত্রদের দাবির সঙ্গে রাজনৈতিক দাবি যুক্ত করা- সেটা ছিল সময়ের দাবি। এই চারটি ছাত্র সংগঠনের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের ভিপি তোফায়েল আহমেদ (ছাত্রলীগ নেতা) ও জিএস নাজিম কামরান চৌধুরী (এনএসএফ)- এই ১০ জনকে নিয়ে গঠিত হয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ। জেলায় জেলায় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয় বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের প্রতিনিধি এবং জেলার প্রধান কলেজের ভিপি-জিএসকে নিয়ে।

তখন ছিল ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খানের শাসনামল। তিনি ১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে চূর্ণ করে দিয়ে পাকিস্তানে সামরিক শাসন জারি করে ক্ষমতায় আসেন। ১৯৬৩ সাল থেকে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর ছিলেন মোনায়েম খান। তখন ছাত্রদের মিছিলে জনপ্রিয় স্লোগান ছিল আইয়ুব-মোনায়েম দুই ভাই, এক দড়িতে ফাঁসি চাই। তবে সে সময়ে প্রকৃতই ফাঁসির দড়ির হুমকিতে ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। তাকে স্বায়ত্তশাসনের ছয় দফা কর্মসূচি প্রদান এবং এর ভিত্তিতে জনমত গঠনের অভিযোগে ১৯৬৬ সালের ৮ মে গ্রেফতার করা হয়। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দীন আহমদসহ আরও অনেক নেতাও তখন জেলে ছিলেন। অনেক ছাত্রনেতাকেও বন্দি করা হয়। তারা বছরের পর বছর বিনা বিচারে জেলে ছিলেন। শেখ মুজিবুর রহমানসহ বন্দিদের মুক্তি ও ছয় দফা মেনে নেওয়ার দাবিতে ১৯৬৬ সালের ৭ জুন পূর্ব পাকিস্তানে হরতাল আহ্বান করা হয়। বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে যে সব হরতাল হয়েছে, তার রূপ (ঢিলেঢাকা, নিরুত্তাপ, শিথিল) যারা দেখেছেন তারা কোনোভাবেই ধারণা করতে পারবেন না যে আওয়ামী লীগের অনেক নেতা জেলে থাকার পরও কী অভাবনীয় সাড়া মিলেছিল তাতে। ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জে পুলিশের গুলিবর্ষণে ১০ জনের মৃত্যু হয়েছিল- এটা সরকারের পক্ষ থেকেই স্বীকার করে নেওয়া হয়। রাজপথ ছিল মিছিলকারীদের দখলে। ১৯৬৮ সালের ৭ জানুয়ারি দৈনিক পাকিস্তান পত্রিকা জানায়, 'পূর্ব পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করার ষড়যন্ত্রের অভিযোগে' ৭ জানুয়ারি পাকিস্তান সিভিল সার্ভিস ও সেনা-নৌ-বিমান বাহিনীর সদস্য এবং রাজনৈতিক নেতাসহ ২৮ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তারা অস্ত্র সংগ্রহের জন্য ভারতের আগরতলায় গোপন বৈঠকে মিলিত হয়েছিলেন। দৈনিক পাকিস্তান ১৮ জানুয়ারি জানায়, আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমান এবং আরও ৬ জন সামরিক কর্মকর্তাকে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় অভিযুক্ত করা হয়েছে। শেখ মুজিবুর রহমান এ ষড়যন্ত্রের প্রধান হোতা এবং তাকেই মামলার প্রধান আসামি করা হয়েছে।

১৯৬৯ সালের জানুয়ারি মাস শুরু হতে না হতেই ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ১১ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করে। ৮ জানুয়ারি পশ্চিম ও পূর্ব পাকিস্তানের কয়েকটি রাজনৈতিক দল ডেমোক্রেটিক অ্যাকশন কমিটি বা ডাক নামে একটি জোট গঠন করে। তাদের আট দফা দাবিতে পার্লামেন্টারি গণতন্ত্র এবং শেখ মুজিবুর রহমানসহ সব রাজবন্দির মুক্তির দাবি ছিল। কিন্তু স্বায়ত্তশাসনের ছয় দফা দাবি ছিল না। পশ্চিম পাকিস্তানের প্রায় সব নেতা ছয় দফা স্বীকার করতে রাজি ছিলেন না। এ জোটের শরিক বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ১৯৬৮ সালের ১৩ ডিসেম্বর পাকিস্তানব্যাপী সকাল-সন্ধ্যা হরতাল ডেকেছিল এবং তা পূর্ণ সফল হয়। তাদের মূল দাবি ছিল আইয়ুব খানের পতন এবং পার্লামেন্টারি গণতন্ত্র কায়েম। কিন্তু শেখ মুজিবুর রহমান ও তার দল ছয় দফার প্রশ্নে অটল থাকে।

ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সদস্য চারটি ছাত্র সংগঠনের মধ্যে ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়নের (মতিয়া গ্রুপ) কর্মী-সমর্থক ছিল অনেক। এনএসএফ (দোলন গ্রুপ) ছিল আইয়ুব খানের সমর্থক ছাত্র সংগঠন থেকে বের হয়ে আসা একটি অংশ। আইয়ুব খান সামরিক শাসন জারি করে পূর্ব পাকিস্তানের প্রধান রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ এবং ন্যাপ (মোজাফফর) ও মণি সিংহের কমিউিনিস্ট পার্টির অনেক নেতাকর্মীকে জেলে পাঠান। তবে ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়ন এমন কঠিন সময়েও ছাত্রদের মধ্যে সক্রিয় থাকে। তারা ঐক্যবদ্ধ হওয়ায় জনগণের মধ্যে বিপুল উৎসাহ সৃষ্টি হয়। তারা মনে করতে থাকে- ছাত্ররা এক হয়েছে। এবার আইযুব খানের রেহাই নেই। তখন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর মোনায়েম খান পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্র-তরুণ এবং মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীর কাছে ছিলেন ধিক্কৃত ও উপহাসের পাত্র। অন্যদিকে, পাকিস্তানের দুঃশাসনে ক্ষুব্ধ এ ভূখণ্ডের জনগণ নিজেদের মনে করতে থাকে বঞ্চিত-শোষিত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক রেহমান সোবহান ১৯৬১ সালেই 'টু-ইকোনমি' তত্ত্ব উপস্থাপন করেন। তিনি পূর্ব পাকিস্তান যে অর্থনৈতিকভাবে বঞ্চিত হচ্ছে সে চিত্র বিভিন্ন লেখায় তুলে ধরেন, যা ছাত্র ও শিক্ষিত মধ্যবিত্তদের মধ্যে আলোড়ন সৃষ্টি করে। শেখ মুজিবুর রহমানের ছয় দফা কর্মসূচিতে এ বঞ্চনার চিত্র ফুটে ওঠে। তাকে যখন আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার প্রধান আসামি করা হয়, তখন এ ভূখণ্ডের মানুষের মধ্যে শঙ্কা তৈরি হয়- এ জনপ্রিয় নেতাকে ফাঁসি দেওয়া হবে না তো? ছাত্রদের আন্দোলনের কর্মসূচি ছিল ১১ দফা। কিন্তু সবকিছু ছাপিয়ে মূল দাবি হয়ে ওঠে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার ও শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তি। জনগণও রাজনৈতিক দলের প্রতি নয়, বরং ছাত্রদের প্রতি ভরসা রাখতে শুরু করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বটতলা, মধুর ক্যান্টিন, ইকবাল হল প্রভৃতি স্থান তখন সবার মুখে মুখে। ১৭ জানুয়ারি ১১ দফার দাবিতে কলা ভবনের বটতলায় প্রথম ছাত্রসভা অনুষ্ঠিত হয়। তখন ১৪৪ ধারা জারি ছিল। আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্স প্রথম বর্ষের ছাত্র। বটতলার সমাবেশে সর্বোচ্চ শ'পাঁচেক ছাত্রছাত্রী সমবেত হয়েছিল। তোফায়েল আহমেদ সভাপতিত্ব করেন। কিন্তু মিছিল করতে চাইলে পুলিশ টিয়ারগ্যাস নিক্ষেপ ও লাঠিচার্জ করে তা ব্যর্থ করে দেয়। সে দিনই প্রথম আমি পুলিশের টিয়ারশেল বিস্ম্ফোরণের আগেই তা ভেজা চটে জড়িয়ে পুলিশের দিকে ছুড়ে মারা প্র্যাকটিস করি। সে যে কী আনন্দ! পরদিনও বটতলা থেকে মিছিল বের করতে গিয়ে পুলিশের হামলার মুখে পড়তে হয়। কিন্তু আমরা শ'খানেক ছাত্রছাত্রী পুলিশকে ফাঁকি দিয়ে মিছিল নিয়ে বটতলা থেকে গুলিস্তান পর্যন্ত চলে যেতে পারি। রাস্তার দু'পাশের জনগণ আমাদের করতালি দিয়ে অভিনন্দন জানায়। ১৯ জানুয়ারি বোরবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ছিল। কিন্তু প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বর্তমানের বুয়েট) খোলা ছিল এবং সেখানকার ছাত্রছাত্রীরা মিছিল করতে গিয়ে বাধার সম্মুখীন হয়ে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়।

বাঁধভাঙা আন্দোলন কী, মাটির ঢিবি থেকে উইপোকার মতো কীভাবে ছাত্রছাত্রীরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে বের হয়ে আসতে পারে, সে অভিজ্ঞতা আমার জীবনে প্রথম হয় ১৯৬৯ সালের ২০ জানুয়ারি। সেদিন ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্র ধর্মঘট ডাকে। সকাল ১১টার দিকে বটতলায় সমাবেশ ছিল। নির্ধারিত সময়ের আগেই কলা ভবন ও আশপাশের এলাকা ছাত্রছাত্রীরা ভরে ফেলে। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দলে দলে তারা এসেছে। এ মিছিলের রুট নির্ধারিত হয় উপাচার্যের বাসভবন, এসএম হল, ঢাকা মেডিকেল কলেজ, নাজিমুদ্দিন রোডের জেলখানা, চকবাজার, ইসলামপুর, বাহদুর শাহ পার্ক, গুলিস্তান, তোপখানা রোড হয়ে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার। সে সময়ে আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যত মিছিল বের করেছি, তার বেশিরভাগ এই দীর্ঘ পথ পরিক্রম করত। ২০ জানুয়ারির মিছিল ১৪৪ ধারা উপেক্ষা করে বের হয় এবং ঢাকা মেডিকেল কলেজ এলাকায় গুলি হয় এবং তাতে আসাদুজ্জামান নামের এক ছাত্রনেতা নিহত হন। তখন মোবাইল ফোনের চল ছিল না। টিএন্ডটি ফোনও তেমন ছিল না। কিন্তু সর্বত্র কীভাবে খবর ছড়িয়ে পড়ে- পুলিশ ছাত্র মেরে ফেলেছে গুলি করে। এবারে আইয়ুব খান-মোনায়েম খানের রক্ষা নেই। সেদিন বিকেলে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে শোক মিছিল বের হয়। সামনে ছিলেন কালো পতাকা হাতে দীপা দত্ত নামের এক ছাত্রনেতা। পুলিশ-ইপিআর (বর্তমান বিজিবির পূর্বসূরি) মিছিলে বাধা দিতে চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। শহীদ মিনার থেকেই কর্মসূচি ঘোষণা হয়- ২১ জানুয়ারি ঢাকায় পূর্ণ দিবস হরতাল, ২৩ জানুয়ারি সন্ধ্যায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে মশাল মিছিল এবং ২৪ জানুয়ারি দেশব্যাপী সকাল-সন্ধ্যা হরতাল।

২৪ জানুয়ারি হরতালের দিনেই সকালে তোপখানা রোডে সচিবালয়ে পিকেটিং করার সময় স্কুলছাত্র মতিউর রহমান পুলিশের গুলিতে নিহত হন। এ দিন প্রকৃতপক্ষে ঢাকার ছাত্র-জনতা এবং টঙ্গি-তেজগাঁও-আদমজী-ডেমরা এলাকার শ্রমিকরা একযোগে রাজপথে নেমে আসেন। আমি বর্তমান দোয়েল চত্বর এলাকায় একদল শ্রমিকের মধ্যে পড়ে যাই। মনে আছে, তখন লুঙ্গি-গেঞ্জি পরা এক শ্রমিক আমাকে বুকে টেনে নিয়ে অন্যদের দেখিয়ে বলেছিলেন, 'এই মাসুম বাচ্চা মিছিলে যখন, আমরা ঘরে তাকি ক্যামনে।' সবার মুখে তখন আইয়ুব শাহির পতন চাই, শেখ মুজিবের মুক্তি চাই স্লোগান। মতিঝিলের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি অফিসের টপ বসরা ছাত্রদের ডাকে রাজপথে নেমে আসেন। বড় বড় সরকারি অফিসের শীর্ষ ব্যক্তি থেকে পিয়ন-দারোয়ান একই মিছিলে শামিল হয়েছেন, এ এক অভূতপূর্ব দৃশ্য। অতীতে এমনটি ঢাকা প্রত্যক্ষ করেনি।

দুপুরে পল্টন ময়দানে মতিউরের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। ততক্ষণে ঢাকা শহর যেন জ্বলছে। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় শেখ মুজিবের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য প্রদান করেছেন, এমন কয়েকজনের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও বাড়ি জনগণ পুড়িয়ে দেয়। সরকার সমর্থক দৈনিক পাকিস্তান ও মর্নিং নিউজ জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। জনগণ গভর্নর হাউস ও সচিবালয়ে আগুন দেবে, এমন শঙ্কা তৈরি হয়। ততক্ষণে সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। ছাত্রনেতারা তখন পল্টন ময়দান থেকে মিছিল নিয়ে ইকবাল হলের (বর্তমানে সার্জেন্ট জহুরুল হক হল) মাঠে চলে আসেন। পরদিন ২৫ জানুয়ারি প্রদেশব্যাপী হরতাল ঘোষিত হয়। একইসঙ্গে সরকার ঘোষণা করে কারফিউ।

প্রকৃতপক্ষে ২৪ জানুয়ারির ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানই আইয়ুব খানের পতন এবং শেখ মুজিবের মুক্তি অবধারিত করে দেয়। সবাই কেবল অপেক্ষায় ছিল কখন এ দুটি ঘটনা ঘটে। শেখ মুজিবুর রহমান মুক্তিলাভ করেন ২২ ফেব্রুয়ারি। জনগণ তাকে বরণ করে নেন বঙ্গবন্ধু হিসেবে। আইয়ুব খান বিদায় নেন ২৫ মার্চ।

ছাত্রসমাজের নেতৃত্বে ১১ দফার আন্দোলন পরিচালিত হয়েছিল। এ আন্দোলনকেই অভিহিত করা হয় স্বাধীনতা সংগ্রামের ড্রেস রিহার্সাল হিসেবে। এ আন্দোলন চলাকালেই জয় বাংলা স্লোগান ধ্বনিত হতে থাকে। আরও শোনা যায়- পিন্ডি না ঢাকা ঢাকা- ঢাকা, পদ্মা মেঘনা যমুনা- তোমার আমার ঠিকানা প্রভৃতি স্লোগান। সঙ্গোপনে প্রস্তুতি চলতে তাকে স্বাধীনতার। ছাত্রদের ওপর জনতার তখন অগাধ আস্থা। ইকবাল হল সবকিছুর কেন্দ্রে। কারখানায় শ্রমিক-মালিক বিরোধ মীমাংসার জন্য উভয়পক্ষ চলে আসত ওই ছাত্রাবাসে। এমনকি স্বামী-স্ত্রীর ঝগড়া দেখা দিলেও উভয় পক্ষ ভাবত- ইকবাল হলে গেলে একটা সমাধান মিলবেই।

সে সময়ে আমরা দিনের পর দিন ধর্মঘট করেছি- মিছিল করেছি। হাজার হাজার ছাত্রছাত্রী তাতে অংশ নিয়েছে। সকালে বিভিন্ন স্কুল-কলেজে গিয়ে ধর্মঘট করিয়ে মিছিল নিয়ে বটতলার সমাবেশে যোগদান, তারপর ৮-১০ কিলোমিটার মিছিল করে দুপুরে খেয়েই বিকেলে মধুর ক্যান্টিনে কর্মিসভা। দিনের পর দিন আমরা এ ধরনের কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছি ক্লান্তিহীনভাবে। তোফায়েল আহমেদ ছিলেন আন্দোলনের মধ্যমণি। তার বক্তব্য ছাত্র-জনতা মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনত। সাইফউদ্দিন আহমদ মানিক বক্তৃতা দিতেন গুছিয়ে। তার বক্তব্যে থাকত দিকনির্দেশনা। জেলায় জেলায় যে সব কলেজ ছিল, সর্বত্র নিয়মিত নির্বাচন হতো ছাত্র সংসদের। নির্বাচিত ভিপি-জিএসরা জনগণের কাছে বিশেষ মর্যাদা পেতেন। ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়নের প্রার্থীরা বেশিরভাগ কলেজ ছাত্র সংসদে জয়ী হতেন। সাধারণভাবে যে কোনো ছাত্র-গণসমাবেশে ছাত্রনেতাদের বক্তব্য মানুষ বিশেষ আগ্রহ নিয়ে শুনত।

১১ দফার আন্দোলনের মধ্য দিয়ে পতন ঘটে আইযুব খানের। রাজনৈতিক অঙ্গনে যে শূন্যতা তিনি সৃষ্টি করেছিলেন তা দ্রুতই পূরণ হয়ে যায়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হয়ে ওঠেন বাঙালির প্রাণপ্রিয় নেতা। তিনি স্বাধীনতার পথে সুপরিকল্পিতভাবে অগ্রসর হতে থাকেন। জনগণ যে এ জন্য প্রস্তুত হয়ে উঠেছে, সেটা তো তিনি নিশ্চিত হয়ে যান ঊনসত্তরের ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানেই।

এই জানুয়ারিতে ঊনসত্তরের সেই অগ্নিঝরা দিনগুলোর ৫০ বছর পূর্ণ হলো। ১৭ থেকে ২৪ জানুয়ারি, এই আটটি দিন আমাদের এ ভূখণ্ডের ছাত্রসমাজ রাজপথ কাঁপিয়ে দিয়েছিল। অনন্য বিজয় ছিনিয়ে এনেছিল। রক্ত দিয়েছিল আসাদ-মতিউরসহ অনেকে। তাদের স্মৃতির প্রতি জানাই প্রণতি। ২৪ জানুয়ারি ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের অর্ধশত বার্ষিকী নিছক আনুষ্ঠানিকতার জন্য নয়, বরং তা থেকে শিক্ষা গ্রহণের জন্য নানা আয়োজনে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও ছাত্র সংগঠন পালন করবে- এটাই প্রত্যাশা।

লেখক: সাংবাদিক

মন্তব্য


অন্যান্য