চতুরঙ্গ

পরিবার: সামাজিক ও মানবিক দায়িত্বশীল মায়ার বন্ধন

প্রকাশ : ২৭ জানুয়ারি ২০১৯ | আপডেট : ২৭ জানুয়ারি ২০১৯

পরিবার: সামাজিক ও মানবিক দায়িত্বশীল মায়ার বন্ধন

  আবরার সাদী

বরফ গলে কখনো নদী হয় না। নদীর জন্ম হয় পাহাড়ী ঝর্ণা আর ভূমিকম্প থেকে। কখনও কখনও আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত থেকেও নদীর জন্ম হতে পারে। বরফ গলে কী হয়? বরফ গলে পানি হয়, কখনো বা প্লাবন হয়। বরফ গলা সেই পানি অববাহিকা, নদী, নালা, খাল, বিল হয়ে আবার মিশে যায় তার আপন ঠিকানা— সাগর-মহাসাগরে। ফিরে যায় শুদ্ধ হয়ে, দূষণমুক্ত হয়ে। যাওয়ার সময় সাথে নিয়ে যাওয়া ময়লা আবর্জনাকে ঠেলে দেয় সাগরের অতল গভীরে। ভুলে যায় বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রার দহন আর মিশ্রণে দূষণের স্মৃতি। সাগরের অথৈ তরঙ্গরাশির সাথে মিশে গিয়ে মেতে উঠে অঢেল আনন্দে।

সাগরের বুক থেকে জলরাশির বিচ্ছিন্ন হওয়ার কারণ সূর্যের তাপ আর বাতাসের তীব্র ঝাপটা। সূর্যের তাপ পানিকে স্ফূটনের প্ররোচনা দেয় আর বাতাসের ঝাপটা তাকে উড়ে গিয়ে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার তাড়না যোগায়। বায়ুমণ্ডলে উড়ে যাওয়ার পর থেকেই শুরু হয়ে যায় দূষণের সাথে মেলামেশা। সূর্যের তাপ একসময় সঙ্গ ছেড়ে দেয়, জলরাশিগুলো তাদের আপন পরিচয় বিনষ্ট করে জমা হতে শুরু করে বরফখণ্ডে। এই বরফখণ্ডে পা পিছলে কারো হাড় ভাঙে, কারো বা আবার স্নায়ুরোগ বেড়ে যায়। শক্ত বরফখণ্ডে ধাক্কা লেগে কতই না অনবদ্য সৃষ্টি চিরতরে ধ্বংস হয়ে যায়। কিন্তু ভাগ্যের পরিণতিতে বরফখণ্ডে আবারও আঘাত হানে সূর্যের তাপরশ্মি। বরফ গলে বেয়ে পড়ে ধরণীর বুকে। বিহ্বল হয়ে খুঁজে ফেরে আপন ঠিকানা, সাগরিকা মায়ের বুক। কিন্তু সবটুকু জলরাশি কি আর মায়ের বুকে ফিরে যেতে পারে? পারে না। নর্দমা, হ্রদ, ডোবা কিংবা পুকুরে আটকা পড়ে অপেক্ষা করতে হয় পুনর্জন্মের। অপেক্ষার প্রহরটা জুড়ে থাকে গ্লানিময় হতাশা আর বিতৃষ্ণা ।

প্রতিটা মানুষের মস্তিষ্ক যেন একেকটা বরফকল। মানবিক অভিমান আর সামাজিক দৈন্য সেই বরফকলের চালিকাশক্তি। এই নশ্বর পৃথিবীতে মানুষের সর্বশ্রেষ্ঠ আশ্রয়স্থল তার নিজস্ব পরিবার। বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠীর ভৌগোলিক অবস্থান, সংস্কৃতি, বিশ্বাসের ওপর নির্ভর করে তাদের পরিবারগুলোর আকৃতি, প্রকৃতি এবং দায়িত্বশীল প্রতিজ্ঞা। যাদের পারিবারিক আশ্রয় থাকে না বা নষ্ট হয়ে যায় তাদের হতাশার অন্ধকারে তলিয়ে যাওয়াটা অনিবার্য। অন্তত আমাদের সমাজ-সংস্কৃতিতে এটাই সত্যি। আপনি মানেন বা না মানেন, কারো জন্ম যদি একটা সুনির্দিষ্ট পরিবারে হয়ে থাকে, তাহলে সেই ব্যক্তি নিঃসন্দেহে একজন ভাগ্যবান। পৃথিবীতে এমন অনেক মানুষ আছে যারা জন্মের পর কোনো পারিবারিক পরিচয় সেটে নিতে পারেনি। কারো জন্য হয়তো কোনো উপায় ছিল না তার পিতৃপরিচয় খুঁজে বের করার। কেউ বা হয়তো শৈশবেই হারিয়েছে তার পারিবারিক বন্ধন। তার মানে এই না যে তারা বেঁচে নেই বা তারা কেউ ভালো নেই। এর মানে এই না যে তাদের কোনো পরিবার দরকার নেই বা তারা তাদের নিজস্ব পরিবার চায় না কখনো। হ্যাঁ, পরিবারহীন, বন্ধনহীন ওই লোকগুলোও বেঁচে থাকে, সময় অসময়ে ভালোও থাকে।  তারা কখনোই নিঃশেষ হয়ে যায় না। তবে তাদের যেমন কোনো পিছুটান থাকে না, ঠিক তেমনি তাদের খোঁজ নেওয়ারও কেউ থাকে না।

একটি পরিবারে সবারই কিছু দায় থাকে, কিছু কর্তব্য থাকে। আমাদের সমাজের খুব সাধারণ একটা পারিবারিক গঠন যদি আমরা চিন্তা করি; সেখানে স্বাভাবিকভাবে একজন মা, একজন বাবা এবং ভাই-বোন থাকে। খুব সাদাসিধা মধ্যবিত্ত একটা জীবনধারায় যেভাবে পরিবারগুলো চলে তাদের চিত্র প্রায় একই রকম। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায়— বাবা বাইরে আয়-রোজগারের কাজ করেন আর মা সংসার চালান। কিছু কিছু ক্ষেত্রে বাবা-মা দুজনকেই আয়-রোজগারে ব্যস্ত থাকতে দেখা যায়। নব্বই দশকের শেষার্ধে এসে দ্বৈত আয়ের পরিবার সংখ্যা বাড়তে শুরু করে। যাই হোক, মূল বিষয়ে ফিরে আসি। একটা পরিবারকে যে রকম করে বাবা-মা দু'জনে অনেক পরিশ্রম করে সাঁজান, গুছিয়ে রাখেন, ঠিক তেমনি পরিবারের সন্তানদেরও সেই সাঁজানো পরিমণ্ডলটা সঠিকভাবে ব্যবহার করা কিংবা কাজে লাগানোটাও একটা কর্তব্য। এটা শুধু প্রয়োজনের তাগিদে নয়, এটাকে প্রতিটা সন্তানের পারিবারিক দায় বলা যেতে পারে।

সন্তানের পারিবারিক দায় কেন বলছি, এবার তা নিয়ে বলি। শুধু মানুষ নয়, পৃথিবীতে যেকোনো প্রাণি একাকীত্ব নিয়ে ভালো থাকতে পারে না। বিশেষ করে মানবজাতি সৃষ্টির ইতিহাস যদি আমরা দেখি, তাহলে দেখবো মানুষ সৃষ্টির পরপরই তার সঙ্গীর প্রয়োজন বোধ করতে শুরু করেছিল। একাকীত্ব থেকে মুক্তিলাভের আশায় মানুষ সুস্থভাবে বেঁচে থাকার তাগিদেই গড়ে তোলে পরিবার।  বুনতে শুরু করে পারিবারিক সম্পর্কের জাল। যেহেতু সুস্থভাবে, সুন্দরভাবে বেঁচে থাকাটাই উদ্দেশ্য, তাই মানুষ জ্ঞানত হোক আর না জেনেই হোক, কয়েকটা মৌলিক অঙ্গীকার নিয়েই পরিবার গড়ে তোলে। (১) একাকীত্ব দূরীকরণ, (২) সুনির্দিষ্ট আশ্রয়স্থল নির্ণয়ন (৩) জৈবিক চাহিদা পূরণ (৪) সুস্থ বিনোদন (৫) বংশ বিস্তারের সঠিক পন্থা পরিচালন এবং (৬) পারিবারিক দায়িত্ব হস্তান্তরের সঠিক সমীকরণ।

প্রথম তিনটা অঙ্গীকারের পূর্ণতা পেতে প্রাথমিকভাবে পিতা-মাতাই দায়িত্বশীল ভূমিকায় থাকেন। চতুর্থ এবং পঞ্চম অঙ্গীকার বাস্তবায়নে পিতামাতা এবং সন্তান উভয়পক্ষেরই দায় জড়িত। ষষ্ঠ অঙ্গীকার বাস্তবায়নের দায় মূলত সন্তানদের ওপরেই থাকে, পিতামাতা শুধুমাত্র সহযোগী ভূমিকা পালনের কর্তব্যটা বহন করেন।

পিতামাতার নিরলস পরিশ্রমে সাঁজানো পারিবারিক পরিমণ্ডলের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হলে প্রতিটা সন্তানকে অবশ্যই নিজেদের ব্যক্তিত্ব গঠন, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ বৃদ্ধি, মানবিক মূল্যবোধ শিক্ষা, ধর্মীয় এবং সামাজিক আচরণবিধির অনুশীলন, জাগতিক জ্ঞান আহরণ এবং সুস্থ-মনস্তাত্বিক চিন্তাশক্তি বৃদ্ধির মাধ্যমে নিজেদেরকে যোগ্য করে তুলতে হবে। যোগ্য হয়ে বেড়ে ওঠাটাই যেকোনো পরিবারের কাছে তার সন্তানদের সবচেয়ে বড় দায়। শুধু খেয়ালের ভুলে, শুধু অযৌক্তিক অভিমানে, শুধু দুষ্ট মানবিক প্ররোচনায়, শুধু স্বার্থপর বিনোদনের হাতছানিতে যারা নিজেদের পারিবারিক দায়কে অস্বীকার করেন তাদের জন্যই আমার আজকের এই লেখা। আমি লিখছি আমাদের নিজস্ব সামাজিক পরিমণ্ডলকে বিবেচনায় নিয়ে। এখানে প্রাচ্য, মধ্যপ্রাচ্য, অস্ট্রেলিয়া, ইউরোপ কিংবা আমেরিকানদের জীবনধারার সাথে মিল নাও থাকতে পারে। যারা নিজের পিতা-মাতার নিরলস পরিশ্রমে গড়ে তোলা পরিবারকে অভিযুক্ত করে স্বার্থপর চৌরাস্তার দিকে পা বাড়ানোর চিন্তা ভাবনা করছেন তারা একবার চিন্তা করে দেখুন। অভিযুক্ত পরিবারের প্রতি কতটুকু দায় আপনি নিজে নিবারণ করেছেন; পারিবারিক পরিমণ্ডলের ন্যূনতম সুবিধাটুকু কাজে লাগিয়ে কতটুকু যোগ্য আপনি হতে পেরেছেন।

মনে রাখতে হবে, মানব জীবন সামুদ্রিক জলরাশি নয়। সাগরের বুক থেকে জলরাশির বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া এবং সাগরের বুকে ফিরে আসাটা প্রাকৃতিক নিয়ম এবং সামগ্রিক পরিমণ্ডলের প্রয়োজন আর পরিশোধনের কারণেই হয়ে থাকে। কিন্তু মানবজীবন নিয়ন্ত্রণের ভার মস্তিষ্ক নামক বরফকলের উপরেই ন্যস্ত। অন্যায়ভাবে সংসার ত্যাগ হয়তো আপনার ফিরে আসার রাস্তাটাকে চিরদিনের জন্য বন্ধ করে দেবে। কোনো এক অপরিচ্ছন্ন নর্দমায়ই হয়তো কাটবে আপনার বাকিটা জীবন। স্রষ্টা প্রদত্ত মস্তিষ্কটাকে বরফকল বানিয়ে না রেখে উষ্ণতার সূর্যে রূপান্তর করুন। পারিবারিক দায়টাকে সাদরে গ্রহণ করুন, ধৈর্যশীল হোন, অনাগত দুর্দিনের অনিষ্ট মোকাবেলায় পরিবারের পাশেই থাকুন; সাময়িক অনাচারী বিনোদনের চিন্তা ঝেড়ে ফেলুন নিজের মন থেকে, পারিবারিক পরিমণ্ডলের সুযোগ-সুবিধা সঠিকভাবে ব্যবহার করতে শিখুন, নিজের যোগ্যতা বৃদ্ধি করতে পরিবারের সহায়তা নিন, সফলতার পেছনে না ছুঁটে মানব জীবনটাকে স্বার্থক করে তুলুন।

ভালো থাকুন; ভালোবাসুন নিজেকে, নিজের পরিবারকে; প্রমাণ করুন নিজের যোগ্যতা এবং স্বার্থক হোক আপনার ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও মানবিক জীবন। 'অটুট থাকুক দায়িত্বশীল মায়ার বন্ধন'।


লেখক: যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী

আরও পডুন

মন্তব্য


অন্যান্য