চতুরঙ্গ

দুগ্ধ শিল্পের অগ্রগতিতে ডেইরি উন্নয়ন গবেষণা প্রকল্প

প্রকাশ : ১৯ জানুয়ারি ২০১৯ | আপডেট : ২০ জানুয়ারি ২০১৯

দুগ্ধ শিল্পের অগ্রগতিতে ডেইরি উন্নয়ন গবেষণা প্রকল্প

বিএলআরআই আঞ্চলিক কেন্দ্রে (ওপরে) এবং সমাজভিত্তিক খামার (নিচে) এলাকায় পাবনা জাতের দেশি গরু

  ড. মো. শাহজাহান

বাংলাদেশে দুধের উৎপাদন এখনও প্রত্যাশিত পর্যায়ে উন্নীত হয়নি। এ অগ্রগতিতে সংকর জাতের গরুর ভূমিকা অপরিহার্য হলেও টেকসই সংকর জাতের অভাবে দিন দিন ডেইরি শিল্পে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। অনিয়ন্ত্রিত বা অপরিকল্পিত কৃত্রিম প্রজনন এর প্রধান কারণ, যা সঠিক সংকরায়নে বিঘ্ন ঘটিয়ে গরুর কৌলিকমানে দূষণ সৃষ্টি করছে। তাই দেশি গরুর (পাবনা জাত) সঙ্গে অধিক দুধ উৎপাদনশীল বিদেশি জাতের (হলস্টিন ফ্রিজিয়ান) একটি সুনিয়ন্ত্রিত প্রজনন টেকসই সংকর জাত উন্নয়নে অগ্রণী ভূমিকা রাখতে পারে।

আমাদের যে কয়েকটি দেশি জাতের গরু রয়েছে তাদের মধ্যে পাবনা জাত অন্যতম। দেশীয় এই জাতটির উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ানোর এবং এর আবহাওয়া উপযোগী বৈশিষ্ট্যগুলোকে কাজে লাগিয়ে অধিক দুধের সংকর জাত তৈরির লক্ষ্যে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট, সাভার, ঢাকার বাস্তবায়নে উক্ত প্রতিষ্ঠানের আঞ্চলিক কেন্দ্র, বাঘাবাড়ী, শাহজাদপুর, সিরাজগঞ্জে ২০১৬ সাল থেকে ডেইরি উন্নয়ন গবেষণা প্রকল্প চলমান রয়েছে। বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. আজহারুল ইসলাম তালুকদার উক্ত প্রকল্পের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন।

এই প্রকল্পের উদ্দেশ্যসমূহ হচ্ছে— অধিক উৎপাদনশীল সংকর জাতের দুধের গাভীর উন্নয়ন (৫০ শতাংশ দেশি-৫০ শতাংশ ফ্রিজিয়ান); অল্প খরচে অধিক দুধ উৎপাদনের জন্য টেকসই গো-খাদ্য ও খাদ্য-প্রযুক্তির উন্নয়ন এবং প্রকল্প এলাকায় রোগের প্রাদুর্ভাব পর্যালোচনা এবং প্রধান ডেইরির রোগসমূহের প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ।

বিএলআরআইয়ের আঞ্চলিক কেন্দ্রে খামার পর্যায়ে গবেষণার পাশাপাশি পাবনার বেড়া উপজেলায় সমাজভিত্তিক গাভী পালনকারীদের খামারেও গ্রামীণ পরিবেশে পাবনা জাতের গরু নিয়ে গবেষণা চলমান। বিদেশ থেকে আমদানিকৃত বিশুদ্ধ ফ্রিজিয়ান জাতের (১০০ শতাংশ) সিমেন দ্বারা কৃত্রিম প্রজনন ঘটিয়ে অধিক কৌলিকগুণ সম্পন্ন ৫০ শতাংশ পাবনা ও ৫০ শতাংশ ফ্রিজিয়ান সংকর জাত উৎপাদনের কার্যক্রম নিউক্লিয়াস ব্রিডিং হার্ডের মাধ্যমে চলমান রয়েছে।

ডেইরি উন্নয়ন গবেষণা প্রকল্পের চলমান গবেষণা থেকে প্রতীয়মান যে খামারী পর্যায়ে প্রচলিত খাদ্য ব্যবস্থাপনায় এই দেশী গরুর দৈনিক দুধ উৎপাদন গড়ে প্রায় ৪-৫ লিটার, যা নিবিড় পালন ব্যবস্থাপনায় খামার পর্যায়ে সর্বোচ্চ ৮-১০ লিটার পর্যন্ত পাওয়া যাচ্ছে। উক্ত জাতের গরুর দুধের চর্বি, চর্বিবিহীন কঠিন, শর্করা, আমিষ এবং খনিজ পদার্থের গড় পরিমাণ যথাক্রমে ৬ দশমিক ১৭ শতাংশ, ৮ দশমিক ৬৫ শতাংশ, ৪ দশমিক ৪৫ শতাংশ, ৩ দশমিক ৫৩ শতাংশ এবং শূন্য দশমকি ৬৮ শতাংশ পর্যন্ত নথিভুক্ত করা হয়েছে। সাধারণত পূর্ণ বয়স্ক একটি ষাঁড়ের ওজন গড়ে ৩০০-৩৫০ কেজি এবং গাভীর ওজন ২০০-২৫০ কেজি হয়ে থাকে।

বিএলআরআই আঞ্চলিক কেন্দ্র, বাঘাবাড়ী প্রকল্পের খামারে সদ্য প্রসব করা বাছুরগুলোর গড় ওজন ১৯ কেজি। গাভীগুলো সাধারণত প্রসব পরবর্তী ৫০-৬০ দিনের মধ্যে পুনরায় গরম হয়। আশা করা যায়, সঠিক নির্বাচন এবং উক্ত বাছাই পরবর্তী নিয়ন্ত্রিত প্রাকৃতিক বা কৃত্রিম প্রজননে উপরোক্ত কৌলিকগুণসমূহের পর্যায়ক্রমিক উন্নতি হবে।

সর্বোপরি, পরিকল্পিত উদ্দেশ্যসমূহ বাস্তবায়নের ফলে আগামী ২০২১ সালের মধ্যে প্রকল্প এলাকায় ডেইরির রোগের প্রাদুর্ভাব কমপক্ষে ২০ শতাংশ কমানোসহ অল্প খরচে অধিক দুধ উৎপাদনের জন্য খাদ্য সূত্র প্রতিষ্ঠাকরণ এবং ২০২৫ সালের মধ্যে গ্রামীণ পর্যায়ে খাপ খাওয়ানো উপযুক্ত সংকর জাতের দুধের গাভীর উন্নয়নের মাধ্যমে দুধের উৎপাদন কমপক্ষে ২০ শতাংশ বাড়ানো সম্ভব হবে। আশা করা যায়, এর ফলে দুধ উৎপাদনের একটি টেকসই সংকর জাত আগামীতে জাতীয় পর্যায়ে ডেইরি শিল্পের উন্নয়নে অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে।


লেখক: ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা (ডেইরি ব্রিডিং অ্যান্ড জেনেটিক্স), ডেইরি উন্নয়ন গবেষণা প্রকল্প, বিএলআরআই আঞ্চলিক কেন্দ্র, বাঘাবাড়ী, সিরাজগঞ্জ

মন্তব্য


অন্যান্য