চতুরঙ্গ

সাংবাদিকরা কি আগের মতই মার খাবেন

প্রকাশ : ১৩ ডিসেম্বর ২০১৮

সাংবাদিকরা কি আগের মতই মার খাবেন

  রাশেদ মেহেদী

সিলেট, খুলনা, বরিশালসহ কয়েকটি সিটি করপোরেশন নির্বাচন এবং তারও আগে পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে সাংবাদিকরা হামলার শিকার হয়েছেন। মারও খেয়েছেন। গাজীপুর ও রাজশাহী সিটি নির্বাচনে পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে পুলিশের বাধার মুখে পড়ার অভিজ্ঞতা আছে আমার নিজেরও।

গাজীপুর সিটি নির্বাচনে দায়িত্ব পালনকালে আমার গলায় নির্বাচন কমিশনের যে কার্ড ঝুলছিল সেখানে স্পষ্ট করেই লেখা ছিল— আমি দায়িত্ব পালন করবো প্রিজাইডিং অফিসারের নির্দেশ মেনে। কোন পর্যন্ত যেতে পারব সেটাও স্পষ্ট করেই লেখা ছিল। কিন্তু তারপরও মোগরখাল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে এক পুলিশ কর্মকর্তা আমাকে দাঁড় করিয়ে জানতে চান-আমি কেন কেন্দ্রে ঢুকেছি, কেন প্রার্থীদের এজেন্টদের কাছে ভোটের বিষয়ে জানতে চাচ্ছি। আমি তাকে জানাই, আমি আমার দায়িত্ব পালনের সীমাটুকু জানি এবং সে অনুযায়ীই দায়িত্ব পালন করছি। অবশ্য ওই সময় কেন্দ্রের প্রিজাইডিং অফিসার এসে পুলিশ কর্মকর্তাকে জানান, আমি তার অনুমতি নিয়েই সেখানে দায়িত্ব পালন করছি এবং সীমার মধ্যেই আছি। পুলিশ তখন কর্মকর্তা গজগজ করতে করতে চলে যান।

আরও একটা অভিজ্ঞতার বলি। বছর কয়েক আগে নোয়খালীতে উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের খবর সংগ্রহের জন্য একটি কেন্দ্রে ঢোকার পর এক ভোট কক্ষের সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার তেড়ে এলেন তার অনুমতি না নিয়ে ঢোকায়। তাকে জানাই, প্রিজাইডিং অফিসারের সঙ্গে দেখা করে অনুমতি নিয়ে এসেছি। তিনি বললেন, ভোট কক্ষে ঢোকার আগে তার অনুমতি নিতে হবে। আমি গলায় ঝোলানো কার্ড দেখিয়ে বলি, প্রিজাইডিং অফিসারের নির্দেশের বাইরে আর কারও কথা এখানে লেখা নেই। তবু আপনার অনুমতি নেওয়ার কথা যেহেতু বলছেন, আমি এখন অনুমতি চাচ্ছি, প্রার্থীদের এজেন্টদের সঙ্গে কথা বলবো। তিনি বললেন, এভাবে না, কেন্দ্রের বাইরে থেকে তার চোখে চোখ রেখে দৃষ্টি আকর্ষণ করতে হবে এবং তিনি এসে পরিচয় দেখে অনুমতি দেবেন। এরই মধ্যে প্রিজাইডিং অফিসার চলে আসেন। তিনি সহকারি প্রিজাইডিং অফিসারকে জানান, আমি অনুমতি নিয়ে এসেছি এবং কক্ষে ঢোকার জন্য এই অনুমতিই যথেষ্ট। এবার সহকারি প্রিজাইডিং অফিসার বললেন,এর আগের নির্বাচনেও তিনি প্রিজাইডিং অফিসার ছিলেন, এবার ভাগ্যদোষে সহকারি প্রিজাইডিং অফিসার হয়েছেন। তাকে প্রিজাইডিং অফিসারের ক্ষমতা বোঝানোর দরকার নাই!

এরও আগে ২০০৪ সালে মুন্সীগঞ্জে উপ-নির্বাচনের খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে আরও একটা বিচিত্র অভিজ্ঞতা হয়েছিল। সঙ্গে ছিলেন সিনিয়র সাংবাদিক সালিম ভাই (সালিম সামাদ) ও রাশেদ আহমেদ। একটা কেন্দ্রে ঢোকার সময় এক ব্যক্তি প্রায় লাফ দিয়ে সামনে এসে দাঁড়ান। তিনি জানতে চান- আমরা কারা? পরিচয় দেই। ওই ব্যক্তিও নিজের পরিচয় দেন, তিনি নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট। তিনি প্রথমেই বলেন, আমরা কেন্দ্রে ঢুকতে পারবো না। প্রয়োজনে তিনি কেন্দ্রের প্রিজাইডিং অফিসারকে ডাকবেন, তার কাছ থেকেই আমাদের তথ্য নিতে হবে। আমি বলি, আমাদের কেন্দ্রে ঢোকার অনুমতি এই কার্ডেই দেওয়া আছে। কেন্দ্রে ঢুকে ভোটকক্ষে যাওয়ার জন্য আমরা প্রিজাইডিং অফিসারের অনুমতি নেব। তিনি এসে গলার কার্ড খুলে পেছনে কি লেখা আছে দেখলেন। তারপর আমাকে আর রাশেদ আহমেদ ভাইকে ভেতরে যাওয়ার কথা বলে সালিম ভাইকে আটকালেন। কারণ সালিম ভাইয়ের কার্ডটা পকেটে ঢোকানো ছিল। তিনি পকেট থেকে কার্ড বের করে দেখানোর আগেই, আমি হাসতে হাসতে বললাম, আপনি কি বিখ্যাত সাংবাদিক সালিম সামাদের নাম শুনেছেন? ইনি...কথা শেষ হওয়ার আগেই ম্যাজিস্ট্রেট তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠে বললেন, কী বলতে চান আপনি? আমি বিসিএস দিয়ে ম্যাজিস্ট্রেট হয়েছি, সালিম সামাদের নাম জানবো না? আমি এরপর বাক্যটা শেষ করলাম, ইনিই সালিম সামাদ। ম্যাজিস্ট্রেট এবার চোখ সরু করে তাকালেন। সালিম ভাই এবার কার্ড দেখালেন। নাম দেখার পরও ম্যাজিস্ট্রেট চোখে অবিশ্বাসের ছাপ। এর মধ্যে প্রিজাইডিং অফিসার আসেন। তিনি বিনীতভাবে বললেন, ওনারা বোধ হয় ভোট নিয়ে কিছু জানতে চান, ওনাদের সঙ্গে কথা বলে দেখি।

এসব উদাহরণ এ কারণেই দিলাম যে, সাংবাদিকরা কতুটুকু দায়িত্বপালন করবেন, কীভাবে করবেন, সে সম্পর্কে নির্বাচনী দায়িত্ব পালনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অনেকেরই স্পষ্ট ধারণা নেই। যে কারণে আমাদের পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতিতে পড়তে হয়। আমার মত অন্য সাংবাদিকরাও এ ধরনের অসংখ্য বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েছেন, বিভিন্ন আড্ডায়-আলাপে শুনেছি। নির্বাচন কমিশনের প্রতি অনুরোধ- সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সাংবাদিকদের দায়িত্ব পালনের পরিধি সম্পর্কে স্পষ্ট করে জানান। তাহলে অনাকাঙ্ক্ষিত অনেক পরিস্থিতি এড়ানো সম্ভব হবে।

অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির পাশাপাশি গত কয়েকটি নির্বাচনে যেটা বড় সংকট হিসেবে সামনে এসেছে তা হচ্ছে সাংবাদিকদের ওপর হামলা, মারধর। সিলেট সিটি নির্বাচনে ক্যাডার-পুলিশ যৌথভাবে একজন সাংবাদিককে পিটিয়ে রক্তাক্ত করেছে, আমরা দেখেছি। বরিশাল এবং খুলনা সিটি নির্বাচনেও সাংবাদিকরা ক্যাডারদের নির্মম হামলার শিকার হয়েছেন। সাংবাদিকদের ওপর হামলার বিচার এদেশে এখন আর হয় না। বলাই হয়ে থাকে, 'সাংবাদিক পেটালে কিছু হয় না'। বিশেষ করে কয়েক মাস আগে সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সময় দায়িত্ব পালনরত সাংবাদিকদের ওপর 'হেলমেট বাহিনী'র নৃশংস হামলার ঘটনার পর 'সাংবাদিক পেটালে কিছু হয় না' বাক্যটি প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে।

যারা প্রকাশ্যে শত শত মানুষের চোখের সামনে সাংবাদিকদের পেটান তাদের সুশীল নেতারা সংবাদ সম্মেলন করে বলে দেন, 'আমাদের কর্মীরা সাংবাদিকদের ফুলের টোকাও দেয়নি।' আর আমাদের শ্রদ্ধেয় সাংবাদিক নেতারা নিদেন পক্ষে একটা সমাবেশ আর ফেসবুকে কয়েকটা স্ট্যাটাস দিয়ে প্রতিবাদের রুটিন দায়িত্ব শেষ করেন। 

এবারের জাতীয় নির্বাচনেও কি তাই হবে? সাংবাদিকরা পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে মার খাবেন আর আগের কৌশলেই আমাদের সাংবাদিক নেতারা তা মানিয়ে নেওয়াবেন আমাদের? কারণ সাংবাদিকদের পক্ষে 'মূর্তির মত' দাঁড়িয়ে থেকে দায়িত্ব পালন সম্ভব নয়। তাহলে প্রথমত সাংবাদিকদের নিজের অফিসে চাকরিটা থাকেবে না। দ্বিতীয়ত, দেশের মানুষও নির্বাচন সংক্রান্ত পূর্ণাঙ্গ তথ্য পাবে না। এ কারণেই শ্রদ্ধেয় সাংবাদিক নেতাদের প্রতি অনুরোধ- অন্তত একবার নির্বাচন কমিশনে যান। নির্বাচনে অংশ নেওয়া রাজনৈতিক দলগুলোর নীতি নির্ধারক পর্যায়ের নেতাদের কাছে যান। তাদের অতীতের হামলার ঘটনাগুলোর উদাহরণ দিয়ে বলুন, সাংবাদিকদের ওপর হামলা রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে এবং পেশাগত দায়িত্ব পালনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিবার সাংবাদিকরা মার খাওয়ার পর আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদের সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে এসে পূর্ব প্রতিকারমূলক ব্যবস্থার দিকে নজর দিন। আমরা আপনাদের সঙ্গেই আছি।

মন্তব্য


অন্যান্য