চতুরঙ্গ

খালেদা জিয়ার জন্য পথে না নামলেও ...

প্রকাশ : ০৯ ডিসেম্বর ২০১৮ | আপডেট : ০৯ ডিসেম্বর ২০১৮

খালেদা জিয়ার জন্য পথে না নামলেও ...

খালেদা জিয়া- ফাইল ছবি

  অজয় দাশগুপ্ত

কে বেশি জনপ্রিয়- খালেদা জিয়া, নাকি এইচএম এরশাদ? অনেকেই এ প্রশ্নে ভ্রু কুঁচকে বলবেন- এটা কোনো প্রশ্ন হলো? ১ বনাম ১০০ নয়, তারও বেশি ব্যবধান দু'জনের মধ্যে।

এইচএম এরশাদ ৯ বছর বাংলাদেশে কর্তৃত্ব করেছেন। এ সময়ে খালেদা জিয়া ছিলেন তার বিরোধী পক্ষে। আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনাও তার বিরোধিতা করেছেন। কীভাবে এরশাদ সরকারের অবসান ঘটানো যায়, সে জন্য তারা তিন দফা বৈঠক করেছেন।

১৯৯০ সালের ডিসেম্বরে এইচএম এরশাদের ক্ষমতা থেকে বিদায় নেওয়ার পর ১৯৯১ সালের নির্বাচনে খালেদা জিয়া প্রথমবার জয়ী হয়ে ক্ষমতায় আসেন। দু'জনেই পাঁচটি করে আসনে নির্বাচন করে জয়ী হন। এটা দু'জনের মিল এবং অবশ্যই জনপ্রিয়তার প্রমাণ। তবে খালেদা জিয়া নির্বাচন করেছিলেন দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে। আর এইচএম এরশাদ নির্বাচন করেছিলেন বৃহত্তর রংপুরের পাঁচটি আসন থেকে।

রিটার্নিং অফিসাররা পাঁচ আসনেই সদ্য ক্ষমতা ছেড়ে দিতে বাধ্য হওয়া এইচএম এরশাদের মনোনয়নপত্র বাতিল করে দেন। তখন তিনি জেলে। আইনি লড়াইয়ে তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার অনুমতি পেয়ে যান। তবে তার আগেই রংপুরের মানুষ 'তাদের ছাওয়ালের' প্রতি সমর্থন জানিয়ে দিতে থাকে।

দৈনিক সংবাদ ১৯৯১ সালের ১৮ জানুয়ারি লিখেছে, 'আসন্ন নির্বাচনে ক্ষমতাচ্যুত রাষ্ট্রপতি এইচএম এরশাদের মনোনয়নপত্র বাতিলের প্রতিবাদে এবং তার মুক্তির দাবিতে রংপুরে জাতীয় পার্টির ডাকে ১৬ জানুয়ারি সকাল-সন্ধ্যা হরতাল পালিত হয়। ৭০ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। শহরে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে।'

জেল থেকে নির্বাচন করে এইচএম এরশাদ পাঁচটি আসনে জয়ী হন। তবে খালেদা জিয়ার প্রথম দফা শাসনামলে একদিনের জন্যও সংসদে বসতে পারেননি। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনেও তিনি পাঁচটি আসনে জয়ী হন। সপ্তম সংসদে তিনি বসতে পারেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি সমর্থন জানানোর সুবাদে। এ নির্বাচনেও খালেদা জিয়া পাঁচটি আসনে প্রার্থী হয়ে জয়ী হয়েছিলেন। তিনি ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও তিনটি আসনে প্রার্থী হয়ে তিনটিতেই জয়ী হন।

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন তার দল বয়কট করে। এরপর থেকে তিনি রয়েছেন সংসদের বাইরে। একাদশ সংসদ নির্বাচনে তার প্রার্থীপদ বাতিল হয়েছে দুর্নীতির একাধিক মামলায় শাস্তি হওয়ার কারণে। ঠিক ১০ মাস আগে ৮ ফেব্রুয়ারি তিনি প্রথম দণ্ডিত হওয়ার দিন কারাগারে নিক্ষিপ্ত হন। এদিন গুলশানের বাসা থেকে কারাগারে যাওয়ার পথে মগবাজার এলাকায় বিএনপির শত শত কর্মী বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। কিন্তু শাস্তি ঘোষণার পর জানা গেল, তিনি শান্তিপূর্ণ পথে আন্দোলন পরিচালনার নির্দেশ দিয়েছেন। কোনো ভাংচুর-জ্বালাও-পোড়াও নয়, হরতাল বা অবরোধ নয়। গত ১০ মাসে কর্মীরা তার নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছে। মুক্তির জন্য তিনি আইনি লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়েছেন। এখনও সফল হননি। দুর্নীতির মামলায় দণ্ডিত হওয়ার পরও নির্বাচনে প্রার্থী হতে আইনি লড়াইয়ে রয়েছেন। এখনও সাফল্য আসেনি। দেখা যাক, সর্বোচ্চ আদালতে গিয়ে তিনি নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ পান কিনা।

এইচএম এরশাদের সঙ্গে তার তুলনা টানা যায় এখানেই। খালেদা জিয়ার জনপ্রিয়তা এইচএম এরশাদের তুলনায় অনেক অনেক বেশি, সন্দেহ নেই। কিন্তু ১৯৯১ সালে গণঅভ্যুত্থানের মুখে ক্ষমতাচ্যুত এইচএম এরশাদের মুক্তি ও নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগের দাবিতে তার সমর্থকরা যে আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন, বিএনপি তার চেয়ারপারসনের মুক্তি ও নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুযোগের দাবিতে তেমনটি কেন পারল না? এটা ঠিক যে, এখন বাংলাদেশে হরতাল ডাকলে তাতে সাড়া মেলার সম্ভাবনা আদৌ নেই। অবরোধেও মিলবে না সাড়া। বড় মিছিলের উদ্যোগ নিলে তাতে পুলিশের বাধা আসতে পারে। কিন্তু তাই বলে খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে ২০-৩০ হাজার লোকের মিছিলের চেষ্টা কেন হবে না? হরতাল সফল করতে অনেক ফ্যাক্টর প্রয়োজন হয়। কিন্তু দলীয় কর্মী-সমর্থকদের নিয়ে মিছিল-সমাবেশ করায় কেবল দরকার সাহস ও দৃঢ়সংকল্পের। এর কি অভাব রয়েছে বিএনপিতে?

শনিবার বিএনপির বিপুল সংখ্যক কর্মী-সমর্থক দলের নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে কয়েক ঘণ্টার জন্য তালা ঝুলিয়ে দেয়। আরেক দল বিক্ষোভ প্রদর্শন করে গুলশানের চেয়ারপারসনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে। এখানে ভাংচুরের ঘটনাও ঘটে। বিএনপির কর্মীরা রাজপথে নামতে চায় না, এটা বলা যাবে না। তবে তারা খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে রাজপথে না নামলেও নেমেছেন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলের মনোনয়নবঞ্চিত কয়েকজন নেতার পক্ষে। এ কেমন আনুগত্য?

মন্তব্য


অন্যান্য