চতুরঙ্গ

খালেদা জিয়ার জন্য পথে না নামলেও ...

প্রকাশ : ০৯ ডিসেম্বর ২০১৮ | আপডেট : ০৯ ডিসেম্বর ২০১৮

খালেদা জিয়ার জন্য পথে না নামলেও ...

খালেদা জিয়া- ফাইল ছবি

  অজয় দাশগুপ্ত

কে বেশি জনপ্রিয়- খালেদা জিয়া, নাকি এইচএম এরশাদ? অনেকেই এ প্রশ্নে ভ্রু কুঁচকে বলবেন- এটা কোনো প্রশ্ন হলো? ১ বনাম ১০০ নয়, তারও বেশি ব্যবধান দু'জনের মধ্যে।

এইচএম এরশাদ ৯ বছর বাংলাদেশে কর্তৃত্ব করেছেন। এ সময়ে খালেদা জিয়া ছিলেন তার বিরোধী পক্ষে। আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনাও তার বিরোধিতা করেছেন। কীভাবে এরশাদ সরকারের অবসান ঘটানো যায়, সে জন্য তারা তিন দফা বৈঠক করেছেন।

১৯৯০ সালের ডিসেম্বরে এইচএম এরশাদের ক্ষমতা থেকে বিদায় নেওয়ার পর ১৯৯১ সালের নির্বাচনে খালেদা জিয়া প্রথমবার জয়ী হয়ে ক্ষমতায় আসেন। দু'জনেই পাঁচটি করে আসনে নির্বাচন করে জয়ী হন। এটা দু'জনের মিল এবং অবশ্যই জনপ্রিয়তার প্রমাণ। তবে খালেদা জিয়া নির্বাচন করেছিলেন দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে। আর এইচএম এরশাদ নির্বাচন করেছিলেন বৃহত্তর রংপুরের পাঁচটি আসন থেকে।

রিটার্নিং অফিসাররা পাঁচ আসনেই সদ্য ক্ষমতা ছেড়ে দিতে বাধ্য হওয়া এইচএম এরশাদের মনোনয়নপত্র বাতিল করে দেন। তখন তিনি জেলে। আইনি লড়াইয়ে তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার অনুমতি পেয়ে যান। তবে তার আগেই রংপুরের মানুষ 'তাদের ছাওয়ালের' প্রতি সমর্থন জানিয়ে দিতে থাকে।

দৈনিক সংবাদ ১৯৯১ সালের ১৮ জানুয়ারি লিখেছে, 'আসন্ন নির্বাচনে ক্ষমতাচ্যুত রাষ্ট্রপতি এইচএম এরশাদের মনোনয়নপত্র বাতিলের প্রতিবাদে এবং তার মুক্তির দাবিতে রংপুরে জাতীয় পার্টির ডাকে ১৬ জানুয়ারি সকাল-সন্ধ্যা হরতাল পালিত হয়। ৭০ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। শহরে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে।'

জেল থেকে নির্বাচন করে এইচএম এরশাদ পাঁচটি আসনে জয়ী হন। তবে খালেদা জিয়ার প্রথম দফা শাসনামলে একদিনের জন্যও সংসদে বসতে পারেননি। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনেও তিনি পাঁচটি আসনে জয়ী হন। সপ্তম সংসদে তিনি বসতে পারেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি সমর্থন জানানোর সুবাদে। এ নির্বাচনেও খালেদা জিয়া পাঁচটি আসনে প্রার্থী হয়ে জয়ী হয়েছিলেন। তিনি ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও তিনটি আসনে প্রার্থী হয়ে তিনটিতেই জয়ী হন।

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন তার দল বয়কট করে। এরপর থেকে তিনি রয়েছেন সংসদের বাইরে। একাদশ সংসদ নির্বাচনে তার প্রার্থীপদ বাতিল হয়েছে দুর্নীতির একাধিক মামলায় শাস্তি হওয়ার কারণে। ঠিক ১০ মাস আগে ৮ ফেব্রুয়ারি তিনি প্রথম দণ্ডিত হওয়ার দিন কারাগারে নিক্ষিপ্ত হন। এদিন গুলশানের বাসা থেকে কারাগারে যাওয়ার পথে মগবাজার এলাকায় বিএনপির শত শত কর্মী বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। কিন্তু শাস্তি ঘোষণার পর জানা গেল, তিনি শান্তিপূর্ণ পথে আন্দোলন পরিচালনার নির্দেশ দিয়েছেন। কোনো ভাংচুর-জ্বালাও-পোড়াও নয়, হরতাল বা অবরোধ নয়। গত ১০ মাসে কর্মীরা তার নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছে। মুক্তির জন্য তিনি আইনি লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়েছেন। এখনও সফল হননি। দুর্নীতির মামলায় দণ্ডিত হওয়ার পরও নির্বাচনে প্রার্থী হতে আইনি লড়াইয়ে রয়েছেন। এখনও সাফল্য আসেনি। দেখা যাক, সর্বোচ্চ আদালতে গিয়ে তিনি নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ পান কিনা।

এইচএম এরশাদের সঙ্গে তার তুলনা টানা যায় এখানেই। খালেদা জিয়ার জনপ্রিয়তা এইচএম এরশাদের তুলনায় অনেক অনেক বেশি, সন্দেহ নেই। কিন্তু ১৯৯১ সালে গণঅভ্যুত্থানের মুখে ক্ষমতাচ্যুত এইচএম এরশাদের মুক্তি ও নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগের দাবিতে তার সমর্থকরা যে আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন, বিএনপি তার চেয়ারপারসনের মুক্তি ও নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুযোগের দাবিতে তেমনটি কেন পারল না? এটা ঠিক যে, এখন বাংলাদেশে হরতাল ডাকলে তাতে সাড়া মেলার সম্ভাবনা আদৌ নেই। অবরোধেও মিলবে না সাড়া। বড় মিছিলের উদ্যোগ নিলে তাতে পুলিশের বাধা আসতে পারে। কিন্তু তাই বলে খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে ২০-৩০ হাজার লোকের মিছিলের চেষ্টা কেন হবে না? হরতাল সফল করতে অনেক ফ্যাক্টর প্রয়োজন হয়। কিন্তু দলীয় কর্মী-সমর্থকদের নিয়ে মিছিল-সমাবেশ করায় কেবল দরকার সাহস ও দৃঢ়সংকল্পের। এর কি অভাব রয়েছে বিএনপিতে?

শনিবার বিএনপির বিপুল সংখ্যক কর্মী-সমর্থক দলের নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে কয়েক ঘণ্টার জন্য তালা ঝুলিয়ে দেয়। আরেক দল বিক্ষোভ প্রদর্শন করে গুলশানের চেয়ারপারসনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে। এখানে ভাংচুরের ঘটনাও ঘটে। বিএনপির কর্মীরা রাজপথে নামতে চায় না, এটা বলা যাবে না। তবে তারা খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে রাজপথে না নামলেও নেমেছেন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলের মনোনয়নবঞ্চিত কয়েকজন নেতার পক্ষে। এ কেমন আনুগত্য?

সংশ্লিষ্ট খবর


মন্তব্য যোগ করুণ

পরের
খবর

দুগ্ধ শিল্পের অগ্রগতিতে ডেইরি উন্নয়ন গবেষণা প্রকল্প


আরও খবর

চতুরঙ্গ

বিএলআরআই আঞ্চলিক কেন্দ্রে (ওপরে) এবং সমাজভিত্তিক খামার (নিচে) এলাকায় পাবনা জাতের দেশি গরু

  ড. মো. শাহজাহান

দুধ উৎপাদনে এখনও বাংলাদেশে প্রত্যাশিত পর্যায়ে উন্নীত হয়নি। এ অগ্রগতিতে সংকর জাতের গরুর ভূমিকা অপরিহার্য হলেও টেকশই সংকর জাতের অভাবে দিন দিন ডেইরি শিল্পে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। অনিয়ন্ত্রিত বা অপরিকল্পিত কৃত্রিম প্রজনন এর প্রধান কারণ, যা সঠিক সংকরায়নে বিঘ্ন ঘটিয়ে গরুর কৌলিকমানে দূষণ সৃষ্টি করছে। তাই দেশি গরুর (পাবনা জাত) সঙ্গে অধিক দুধ উৎপাদনকারী বিদেশি জাতের (হলস্টিন ফ্রিজিয়ান) একটি সুনিয়ন্ত্রিত প্রজনন টেকশই সংকর জাত উন্নয়নে অগ্রণী ভূমিকা রাখতে পারে।

আমাদের যে কয়েকটি দেশি জাতের গরু রয়েছে তাদের মধ্যে পাবনা জাত অন্যতম। দেশীয় এই জাতটির উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ানোর এবং এর আবহাওয়া উপযোগী বৈশিষ্ট্যগুলোকে কাজে লাগিয়ে অধিক দুধের সংকর জাত তৈরির লক্ষ্যে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট, সাভার, ঢাকার বাস্তবায়নে উক্ত প্রতিষ্ঠানের আঞ্চলিক কেন্দ্র, বাঘাবাড়ী, শাহজাদপুর, সিরাজগঞ্জে ২০১৬ সাল থেকে ডেইরি উন্নয়ন গবেষণা প্রকল্প চলমান রয়েছে। বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. আজহারুল ইসলাম তালুকদার উক্ত প্রকল্পের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন।

এই প্রকল্পের উদ্দেশ্যসমূহ হচ্ছে— অধিক উৎপাদনশীল সংকর জাতের দুধের গাভীর উন্নয়ন (৫০ শতাংশ দেশি-৫০ শতাংশ ফ্রিজিয়ান); অল্প খরচে অধিক দুধ উৎপাদনের জন্য টেকসই গো-খাদ্য ও খাদ্য-প্রযুক্তির উন্নয়ন এবং প্রকল্প এলাকায় রোগের প্রাদুর্ভাব পর্যালোচনা এবং প্রধান ডেইরির রোগসমূহের প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ।

বিএলআরআইয়ের আঞ্চলিক কেন্দ্রে খামার পর্যায়ে গবেষণার পাশাপাশি পাবনার বেড়া উপজেলায় সমাজভিত্তিক গাভী পালনকারীদের খামারেও গ্রামীণ পরিবেশে পাবনা জাতের গরু নিয়ে গবেষণা চলমান। বিদেশ থেকে আমদানিকৃত বিশুদ্ধ ফ্রিজিয়ান জাতের (১০০ শতাংশ) সিমেন দ্বারা কৃত্রিম প্রজনন ঘটিয়ে অধিক কৌলিকগুণ সম্পন্ন ৫০ শতাংশ পাবনা ও শতাংশ ফ্রিজিয়ান সংকর জাত উৎপাদনের কার্যক্রম নিউক্লিয়াস ব্রিডিং হার্ডের মাধ্যমে চলমান রয়েছে।

ডেইরি উন্নয়ন গবেষণা প্রকল্পের চলমান গবেষণা থেকে প্রতীয়মান যে খামারী পর্যায়ে প্রচলিত খাদ্য ব্যবস্থাপনায় এই দেশী গরুর দৈনিক দুধ উৎপাদন গড়ে প্রায় ৪-৫ লিটার, যা নিবিড় পালন ব্যবস্থাপনায় খামার পর্যায়ে সর্বোচ্চ ৮-১০ লিটার পর্যন্ত পাওয়া যাচ্ছে। উক্ত জাতের গরুর দুধের চর্বি, চর্বিবিহীন কঠিন, শর্করা, আমিষ এবং খনিজ পদার্থের গড় পরিমাণ যথাক্রমে ৬ দশমিক ১৭ শতাংশ, ৮ দশমিক ৬৫ শতাংশ, ৪ দশমিক ৪৫ শতাংশ, ৩ দশমিক ৫৩ শতাংশ এবং শূন্য দশমকি ৬৮ শতাংশ পর্যন্ত নথিভুক্ত করা হয়েছে। সাধারণত পূর্ণ বয়স্ক একটি ষাঁড়ের ওজন গড়ে ৩০০-৩৫০ কেজি এবং গাভীর ওজন ২০০-২৫০ কেজি হয়ে থাকে।

বিএলআরআই আঞ্চলিক কেন্দ্র, বাঘাবাড়ী প্রকল্পের খামারে সদ্য প্রসব করা বাছুরগুলোর গড় ওজন ১৯ কেজি। গাভীগুলো সাধারণত প্রসব পরবর্তী ৫০-৬০ দিনের মধ্যে পুনরায় গরম হয়। আশা করা যায়, সঠিক নির্বাচন এবং উক্ত বাছাই পরবর্তী নিয়ন্ত্রিত প্রাকৃতিক বা কৃত্রিম প্রজননে উপরোক্ত কৌলিকগুণসমূহের পর্যায়ক্রমিক উন্নতি হবে।

সর্বোপরি, পরিকল্পিত উদ্দেশ্যসমূহ বাস্তবায়নের ফলে আগামী ২০২১ সালের মধ্যে প্রকল্প এলাকায় ডেইরির রোগের প্রাদুর্ভাব কমপক্ষে ২০ শতাংশ কমানোসহ অল্প খরচে অধিক দুধ উৎপাদনের জন্য খাদ্য সূত্র প্রতিষ্ঠাকরণ এবং ২০২৫ সালের মধ্যে গ্রামীণ পর্যায়ে খাপ খাওয়ানো উপযুক্ত সংকর জাতের দুধের গাভীর উন্নয়নের মাধ্যমে দুধের উৎপাদন কমপক্ষে ২০ শতাংশ বাড়ানো সম্ভব হবে। আশা করা যায়, এর ফলে দুধ উৎপাদনের একটি টেকশই সংকর জাত আগামীতে জাতীয় পর্যায়ে ডেইরি শিল্পের উন্নয়নে অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে।


লেখক: ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা (ডেইরি ব্রিডিং অ্যান্ড জেনেটিক্স), ডেইরি উন্নয়ন গবেষণা প্রকল্প, বিএলআরআই আঞ্চলিক কেন্দ্র, বাঘাবাড়ী, সিরাজগঞ্জ

পরের
খবর

নবগঠিত মন্ত্রিপরিষদ ও জনপ্রত্যাশা


আরও খবর

চতুরঙ্গ

রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ গত ৭ জানুয়ারি বঙ্গভবনে নবনিযুক্ত মন্ত্রীদের শপথ পাঠ করান— পিআইডি

  অধ্যাপক ড. মো. আমির হোসেন

প্রথমে বিউগলে সুর, তারপর জাতীয় সংগীত, এরপর শপথ ও গোপনীয়তার শপথ বাক্য পাঠ এবং শপথপত্রে স্বাক্ষর করে হ্যাট্রিকসহ চতুর্থবার বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী হলেন বঙ্গবন্ধুর কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা। বিশ্ব ইতিহাসে বিরল ঘটনা। এক জনমে একই ব্যক্তির চারবার সরকার প্রধান হওয়ার দৃষ্টান্ত ইতিহাসে খুব বেশি নেই।

'আমি .... সশ্রদ্ধ চিত্তে শপথ করিতেছি যে, আমি আইন অনুয়ায়ী সরকারের মন্ত্রী পদের কর্তব্য বিশ্বস্ততার সহিত পালন করিব। আমি বাংলাদেশের প্রতি অকৃত্রিম বিশ্বাস ও আনুগত্য পোষণ করিব। আমি সংবিধানের রক্ষণ, সমর্থন ও নিরাপত্তা বিধান করিব। এবং আমি ভীতি বা অনুগ্রহ, অনুরাগ বা বিরাগের বশবর্তী না হইয়া সকলের প্রতি আইন অনুযায়ী যথাবিহিত আচরণ করিব।' এই শপথ বাক্য পাঠ করে আওয়ামী লীগের চতুর্থবার সরকারে ২৪ জন মন্ত্রী, ১৯ জন প্রতিমন্ত্রী ও ৩ জন উপমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

এবারের মন্ত্রিসভায় আওয়ামী লীগের অনেক জ্যেষ্ঠ নেতার জায়গা হয়নি, মন্ত্রিত্ব পায়নি শরিক দলগুলোও। এ নিয়ে জল্পনা-কল্পনার শেষ নেই। বিচার-বিশ্লেষণ চলছে সর্বত্র। আনন্দ-হতাশা দুইই আছে। যারা মন্ত্রিত্ব পেয়েছেন তারা এবং তাদের সমর্থকগণ উল্লসিত। যারা মন্ত্রিত্ব পাননি তারা এবং তাদের সমর্থকগণ খানিকটা হতাশ, যা স্বাভাবিক। কেউ কেউ আশাবাদী, কারণ মন্ত্রিসভা এখনও পূর্ণাঙ্গ হয়নি। যারা মন্ত্রিত্ব পাননি তাদের কেউই নতুন মন্ত্রিসভা সম্পর্কে বিরূপ মন্তব্য বা কটূক্তি করেননি বরং সফলতা কামনা করেছেন, উন্নয়নের ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকবে এবং উন্নয়ন কর্মকাণ্ড গতিশীল হবে বলে মন্তব্য করেছেন। এই মন্তব্যগুলোর মাধ্যমে জ্যেষ্ঠ নেতৃবৃন্দ পরিপক্কতার পরিচয় দিয়েছেন, বঙ্গবন্ধুর আদর্শ এবং জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বের প্রতি তাদের আনুগত্য পুনর্ব্যক্ত করেছেন। তাদের এই আচরণ আওয়ামী রাজনীতিতে নিঃসন্দেহে শুভ প্রভাব ফেলবে।

বিগত এক দশকে জননেত্রী শেখ হাসিনার দৃঢ় নেতৃত্বে নানাবিধ সামাজিক সূচকসহ অর্থনৈতিক আকাশচুম্বী উন্নয়ন হয়েছে যার কারণে বাংলাদেশ এখন উন্নয়নশীল দেশ, বিশ্বের ৪১তম অর্থনীতি, ২০৩২ সালে ২৫তম বৃহৎ অর্থনীতি হবে। জননেত্রী শেখ হাসিনা এখন বিশ্ব নেতা ও মাদার অব হিউম্যানিটি। বিশ্বাঙ্গনে বাংলাদেশের মর্যাদা বেড়েছে। কথিত তলাবিহীন ঝুড়ি এখন উন্নয়নের রোল মডেল। বাংলাদেশের মানুষ এই উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে লাভবান হয়েছে, মাথাপিছু আয় বেড়েছে, খানিকটা স্বস্তিতে আছে মানুষ। মঙ্গায় পীড়িত হচ্ছে না, অনাহারে থাকছে না। আরো অনেক দূর এগোতে হবে। আশায় বুক বাঁধছে মানুষ। গত দশ বছরের উন্নয়ন মানুষকে আশাবাদী করেছে। আশাবাদী হওয়ার কারণ জননেত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শী নেতৃত্ব। তাই তিনি বাংলাদেশের মানুষের অন্তরে জায়গা করে নিয়েছেন। জননেত্রী শেখ হাসিনার ওপর আস্থা রেখেই বাংলাদেশের জনগণ গত নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোটকে একচ্ছত্র বিজয় অর্জনে সমর্থন জানায়। নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন তুলে ঐক্যফ্রন্ট জনগণের সাড়া পায়নি। কারণ বিরামহীন উন্নয়ন অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করতে রাজি নয় মানুষ। বিদেশিদের কাছে নালিশ করেও সাড়া পাচ্ছে না ঐক্যফ্রন্ট। বিদেশিরাও বাংলাদেশের অগ্রযাত্রাকে অব্যাহত রাখার পক্ষে।

উপরোক্ত শপথবাক্য পাঠ করেই গত দশকের মন্ত্রিপরিষদের সদস্যগণও দায়িত্ব নিয়েছিলেন। বাদপড়া জ্যেষ্ঠ নেতা ও মন্ত্রীবর্গের অনেকে এই শপথ ধারণ করে উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় কম-বেশি অবদান রেখেছেন। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী বলেছেন যে, বাদ পড়েছেন বলে তারা ব্যর্থ হয়েছেন তা ঠিক নয়। আগামীর বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দেয়ার জন্য নতুনদের সুযোগ দেয়া হয়েছে। তবে তারা কঠোর নজরদারিতে থাকবেন। কিন্তু একথা সত্যি যে, কেউ কেউ এই শপথবাক্য ধারণ করেননি, মনেও রাখেননি। বরং উল্টোটাই করেছেন। চলন-বলন, আচার-আচরণ, কথা-বার্তা বদলে যায় কারো কারো। রাষ্ট্রীয় স্বার্থ জলাঞ্জলি দেন, জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হন। বেশ ক'জন মন্ত্রী ব্যাপক সমালোচনার মুখেও পড়েন, যা জননেত্রী শেখ হাসিনাকে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলে। যারা নিজেদের কৃতকর্মের জন্য মন্ত্রিত্ব হারিয়েছেন তাদের উচিত হবে তাদের অতীত কর্মকাণ্ডগুলো মূল্যায়ন করা। ত্রুটি-বিচ্যুতিগুলো সংশোধন করে দল, জনগণ ও রাষ্ট্রের কল্যাণে আত্মনিয়োগ এবং সংশোধিত মানুষ হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করা।

নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় লাভ করায় বর্তমান সরকারের কাছে মানুষের প্রত্যাশাও অনেক। মানুষের আশা ভঙ্গ হোক— জননেত্রী শেখ হাসিনা কিছুতেই তা চাইবেন না। তাছাড়া বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়ার দায়িত্ব তার ওপর বর্তেছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দুই অংকে উন্নীত করা, মাথাপিছু আয়বৃদ্ধি, সব মানুষের জন্য পুষ্টিসম্পন্ন খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিতকরণ, উন্নয়নের সুফল ঘরে ঘরে পৌঁছে দেয়া, অর্থনৈতিক বৈষম্য কমিয়ে আনা, দারিদ্র্য দূরীকরণ, ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি, ব্যাংকিং খাতের বিশৃঙ্খলা দূরীকরণ, মানবসম্পদ সৃষ্টির লক্ষ্যে শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো, প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষার মধ্যে সমন্বয় সৃষ্টি, শিক্ষা ও গবেষণার মান উন্নয়ন, ঘরে ঘরে তথ্য-প্রযুক্তির সুবিধা প্রদান, সামাজিক অরাজকতার অবসান, মাদক ও দুর্নীতির রোধ, নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, সুশাসন প্রতিষ্ঠা, গ্রামে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুয়োগ সৃষ্টি করে গ্রাম থেকে শহরে মাইগ্রেশনের হার কমানো, কৃষিকে যুগোপযোগী করা, গ্রামে শহুরে সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টি, সারাদেশে স্বাস্থ্যসেবা প্রদান ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিতকরণ, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, রফতানি খাত ও বাজার সম্প্রসারণ করে রফতানি আয় বৃদ্ধি, শিল্পখাত সম্প্রসারণ, মেগা প্রজেক্টগুলো সফলভাবে সময়মত সম্পন্নকরণ, সারদেশে আধুনিক রেলসার্ভিস সৃষ্টি, রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানসহ বহুবিধ কর্মকাণ্ড সফলতা ও গতিশীলতার সঙ্গে পরিচালনা করতে হবে আগামী ৫ বছর। এ বিষয়গুলো মাথায় রেখে উন্নত প্রযুক্তি ও নিবিড় প্রতিযোগিতার শতকে টিকে থাকতে এবং এগিয়ে যেতেই হয়ত মাননীয় প্রধানমন্ত্রী পরিচ্ছন্ন ইমেজ সম্পন্ন তুলনামূলক কম বয়সী বা তরুণ কিন্তু মেধাবী, উদ্যমী, কর্মতৎপর, সৎ ও নিষ্ঠাবান মনে করে বর্তমান মন্ত্রিসভা গঠন করেছেন। জননেত্রীর মত বাংলাদেশের মানুষেরও বর্তমান মন্ত্রিপরিষদের কাছে প্রত্যাশা অনেক। মানুষ আশা করে বর্তমান মন্ত্রিসভার প্রতিটি সদস্য চলনে-বলনে, কথা-বার্তায়, আচার-আচরণে, চিন্তা-চেতনায় সৎ, পরিচ্ছন্ন ও মার্জিত হবে, জনবিচ্ছিন্ন না হয়ে জনগণের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকবে, জনগণের দুঃখ-দুর্দশা লাঘব করবে, জনগণের কল্যাণে ও বাংলাদেশকে উন্নত দেশে উন্নীত করার বঙ্গবন্ধু ও জননেত্রী শেখ হাসিনার লক্ষ্য বাস্তবায়নে নিজেকে উৎসর্গ করে পঠিত শপথ বাক্যের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করবে এবং শপথ বাক্যের যথার্থতা প্রমাণ করবে।


লেখক: উপ-উপাচার্য (প্রশাসন), জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

সংশ্লিষ্ট খবর

পরের
খবর

ঊনসত্তরের ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানের পাঁচ দশক


আরও খবর

চতুরঙ্গ

  অজয় দাশগুপ্ত

ঐতিহাসিক ১১ দফা আন্দোলনের ৫০ বছর পূর্ণ হচ্ছে এ বছরের জানুয়ারি মাসে। ১৯৬৯ সালের শুরুতেই চারটি ছাত্র সংগঠন- পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ, পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন (মতিয়া গ্রুপ), পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন (মেনন গ্রুপ) এবং এনএসএফ বা জাতীয় ছাত্র ফেডারেশন (দোলন গ্রুপ) ছাত্রদের বিভিন্ন দাবির সঙ্গে পূর্ব পাকিস্তানের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের ছয় দফা কর্মসূচি, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় অভিযুক্ত আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ মুজিবুর রহমানসহ সব রাজবন্দির মুক্তি, পাকিস্তানকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন বিভিন্ন সামরিক জোট থেকে মুক্ত করা, পাট ও বস্ত্র শিল্প জাতীয়করণ, পার্লামেন্টারি গণতন্ত্র প্রবর্তন প্রভৃতি ১১ দফা দাবিতে আন্দোলন গড়ে তোলার বিষয়ে একমত হয়। ছাত্রদের দাবির সঙ্গে রাজনৈতিক দাবি যুক্ত করা- সেটা ছিল সময়ের দাবি। এই চারটি ছাত্র সংগঠনের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের ভিপি তোফায়েল আহমেদ (ছাত্রলীগ নেতা) ও জিএস নাজিম কামরান চৌধুরী (এনএসএফ)- এই ১০ জনকে নিয়ে গঠিত হয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ। জেলায় জেলায় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয় বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের প্রতিনিধি এবং জেলার প্রধান কলেজের ভিপি-জিএসকে নিয়ে।

তখন ছিল ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খানের শাসনামল। তিনি ১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে চূর্ণ করে দিয়ে পাকিস্তানে সামরিক শাসন জারি করে ক্ষমতায় আসেন। ১৯৬৩ সাল থেকে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর ছিলেন মোনায়েম খান। তখন ছাত্রদের মিছিলে জনপ্রিয় স্লোগান ছিল আইয়ুব-মোনায়েম দুই ভাই, এক দড়িতে ফাঁসি চাই। তবে সে সময়ে প্রকৃতই ফাঁসির দড়ির হুমকিতে ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। তাকে স্বায়ত্তশাসনের ছয় দফা কর্মসূচি প্রদান এবং এর ভিত্তিতে জনমত গঠনের অভিযোগে ১৯৬৬ সালের ৮ মে গ্রেফতার করা হয়। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দীন আহমদসহ আরও অনেক নেতাও তখন জেলে ছিলেন। অনেক ছাত্রনেতাকেও বন্দি করা হয়। তারা বছরের পর বছর বিনা বিচারে জেলে ছিলেন। শেখ মুজিবুর রহমানসহ বন্দিদের মুক্তি ও ছয় দফা মেনে নেওয়ার দাবিতে ১৯৬৬ সালের ৭ জুন পূর্ব পাকিস্তানে হরতাল আহ্বান করা হয়। বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে যে সব হরতাল হয়েছে, তার রূপ (ঢিলেঢাকা, নিরুত্তাপ, শিথিল) যারা দেখেছেন তারা কোনোভাবেই ধারণা করতে পারবেন না যে আওয়ামী লীগের অনেক নেতা জেলে থাকার পরও কী অভাবনীয় সাড়া মিলেছিল তাতে। ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জে পুলিশের গুলিবর্ষণে ১০ জনের মৃত্যু হয়েছিল- এটা সরকারের পক্ষ থেকেই স্বীকার করে নেওয়া হয়। রাজপথ ছিল মিছিলকারীদের দখলে। ১৯৬৮ সালের ৭ জানুয়ারি দৈনিক পাকিস্তান পত্রিকা জানায়, 'পূর্ব পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করার ষড়যন্ত্রের অভিযোগে' ৭ জানুয়ারি পাকিস্তান সিভিল সার্ভিস ও সেনা-নৌ-বিমান বাহিনীর সদস্য এবং রাজনৈতিক নেতাসহ ২৮ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তারা অস্ত্র সংগ্রহের জন্য ভারতের আগরতলায় গোপন বৈঠকে মিলিত হয়েছিলেন। দৈনিক পাকিস্তান ১৮ জানুয়ারি জানায়, আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমান এবং আরও ৬ জন সামরিক কর্মকর্তাকে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় অভিযুক্ত করা হয়েছে। শেখ মুজিবুর রহমান এ ষড়যন্ত্রের প্রধান হোতা এবং তাকেই মামলার প্রধান আসামি করা হয়েছে।

১৯৬৯ সালের জানুয়ারি মাস শুরু হতে না হতেই ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ১১ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করে। ৮ জানুয়ারি পশ্চিম ও পূর্ব পাকিস্তানের কয়েকটি রাজনৈতিক দল ডেমোক্রেটিক অ্যাকশন কমিটি বা ডাক নামে একটি জোট গঠন করে। তাদের আট দফা দাবিতে পার্লামেন্টারি গণতন্ত্র এবং শেখ মুজিবুর রহমানসহ সব রাজবন্দির মুক্তির দাবি ছিল। কিন্তু স্বায়ত্তশাসনের ছয় দফা দাবি ছিল না। পশ্চিম পাকিস্তানের প্রায় সব নেতা ছয় দফা স্বীকার করতে রাজি ছিলেন না। এ জোটের শরিক বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ১৯৬৮ সালের ১৩ ডিসেম্বর পাকিস্তানব্যাপী সকাল-সন্ধ্যা হরতাল ডেকেছিল এবং তা পূর্ণ সফল হয়। তাদের মূল দাবি ছিল আইয়ুব খানের পতন এবং পার্লামেন্টারি গণতন্ত্র কায়েম। কিন্তু শেখ মুজিবুর রহমান ও তার দল ছয় দফার প্রশ্নে অটল থাকে।

ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সদস্য চারটি ছাত্র সংগঠনের মধ্যে ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়নের (মতিয়া গ্রুপ) কর্মী-সমর্থক ছিল অনেক। এনএসএফ (দোলন গ্রুপ) ছিল আইয়ুব খানের সমর্থক ছাত্র সংগঠন থেকে বের হয়ে আসা একটি অংশ। আইয়ুব খান সামরিক শাসন জারি করে পূর্ব পাকিস্তানের প্রধান রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ এবং ন্যাপ (মোজাফফর) ও মণি সিংহের কমিউিনিস্ট পার্টির অনেক নেতাকর্মীকে জেলে পাঠান। তবে ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়ন এমন কঠিন সময়েও ছাত্রদের মধ্যে সক্রিয় থাকে। তারা ঐক্যবদ্ধ হওয়ায় জনগণের মধ্যে বিপুল উৎসাহ সৃষ্টি হয়। তারা মনে করতে থাকে- ছাত্ররা এক হয়েছে। এবার আইযুব খানের রেহাই নেই। তখন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর মোনায়েম খান পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্র-তরুণ এবং মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীর কাছে ছিলেন ধিক্কৃত ও উপহাসের পাত্র। অন্যদিকে, পাকিস্তানের দুঃশাসনে ক্ষুব্ধ এ ভূখণ্ডের জনগণ নিজেদের মনে করতে থাকে বঞ্চিত-শোষিত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক রেহমান সোবহান ১৯৬১ সালেই 'টু-ইকোনমি' তত্ত্ব উপস্থাপন করেন। তিনি পূর্ব পাকিস্তান যে অর্থনৈতিকভাবে বঞ্চিত হচ্ছে সে চিত্র বিভিন্ন লেখায় তুলে ধরেন, যা ছাত্র ও শিক্ষিত মধ্যবিত্তদের মধ্যে আলোড়ন সৃষ্টি করে। শেখ মুজিবুর রহমানের ছয় দফা কর্মসূচিতে এ বঞ্চনার চিত্র ফুটে ওঠে। তাকে যখন আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার প্রধান আসামি করা হয়, তখন এ ভূখণ্ডের মানুষের মধ্যে শঙ্কা তৈরি হয়- এ জনপ্রিয় নেতাকে ফাঁসি দেওয়া হবে না তো? ছাত্রদের আন্দোলনের কর্মসূচি ছিল ১১ দফা। কিন্তু সবকিছু ছাপিয়ে মূল দাবি হয়ে ওঠে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার ও শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তি। জনগণও রাজনৈতিক দলের প্রতি নয়, বরং ছাত্রদের প্রতি ভরসা রাখতে শুরু করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বটতলা, মধুর ক্যান্টিন, ইকবাল হল প্রভৃতি স্থান তখন সবার মুখে মুখে। ১৭ জানুয়ারি ১১ দফার দাবিতে কলা ভবনের বটতলায় প্রথম ছাত্রসভা অনুষ্ঠিত হয়। তখন ১৪৪ ধারা জারি ছিল। আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্স প্রথম বর্ষের ছাত্র। বটতলার সমাবেশে সর্বোচ্চ শ'পাঁচেক ছাত্রছাত্রী সমবেত হয়েছিল। তোফায়েল আহমেদ সভাপতিত্ব করেন। কিন্তু মিছিল করতে চাইলে পুলিশ টিয়ারগ্যাস নিক্ষেপ ও লাঠিচার্জ করে তা ব্যর্থ করে দেয়। সে দিনই প্রথম আমি পুলিশের টিয়ারশেল বিস্ম্ফোরণের আগেই তা ভেজা চটে জড়িয়ে পুলিশের দিকে ছুড়ে মারা প্র্যাকটিস করি। সে যে কী আনন্দ! পরদিনও বটতলা থেকে মিছিল বের করতে গিয়ে পুলিশের হামলার মুখে পড়তে হয়। কিন্তু আমরা শ'খানেক ছাত্রছাত্রী পুলিশকে ফাঁকি দিয়ে মিছিল নিয়ে বটতলা থেকে গুলিস্তান পর্যন্ত চলে যেতে পারি। রাস্তার দু'পাশের জনগণ আমাদের করতালি দিয়ে অভিনন্দন জানায়। ১৯ জানুয়ারি বোরবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ছিল। কিন্তু প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বর্তমানের বুয়েট) খোলা ছিল এবং সেখানকার ছাত্রছাত্রীরা মিছিল করতে গিয়ে বাধার সম্মুখীন হয়ে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়।

বাঁধভাঙা আন্দোলন কী, মাটির ঢিবি থেকে উইপোকার মতো কীভাবে ছাত্রছাত্রীরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে বের হয়ে আসতে পারে, সে অভিজ্ঞতা আমার জীবনে প্রথম হয় ১৯৬৯ সালের ২০ জানুয়ারি। সেদিন ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্র ধর্মঘট ডাকে। সকাল ১১টার দিকে বটতলায় সমাবেশ ছিল। নির্ধারিত সময়ের আগেই কলা ভবন ও আশপাশের এলাকা ছাত্রছাত্রীরা ভরে ফেলে। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দলে দলে তারা এসেছে। এ মিছিলের রুট নির্ধারিত হয় উপাচার্যের বাসভবন, এসএম হল, ঢাকা মেডিকেল কলেজ, নাজিমুদ্দিন রোডের জেলখানা, চকবাজার, ইসলামপুর, বাহদুর শাহ পার্ক, গুলিস্তান, তোপখানা রোড হয়ে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার। সে সময়ে আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যত মিছিল বের করেছি, তার বেশিরভাগ এই দীর্ঘ পথ পরিক্রম করত। ২০ জানুয়ারির মিছিল ১৪৪ ধারা উপেক্ষা করে বের হয় এবং ঢাকা মেডিকেল কলেজ এলাকায় গুলি হয় এবং তাতে আসাদুজ্জামান নামের এক ছাত্রনেতা নিহত হন। তখন মোবাইল ফোনের চল ছিল না। টিএন্ডটি ফোনও তেমন ছিল না। কিন্তু সর্বত্র কীভাবে খবর ছড়িয়ে পড়ে- পুলিশ ছাত্র মেরে ফেলেছে গুলি করে। এবারে আইয়ুব খান-মোনায়েম খানের রক্ষা নেই। সেদিন বিকেলে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে শোক মিছিল বের হয়। সামনে ছিলেন কালো পতাকা হাতে দীপা দত্ত নামের এক ছাত্রনেতা। পুলিশ-ইপিআর (বর্তমান বিজিবির পূর্বসূরি) মিছিলে বাধা দিতে চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। শহীদ মিনার থেকেই কর্মসূচি ঘোষণা হয়- ২১ জানুয়ারি ঢাকায় পূর্ণ দিবস হরতাল, ২৩ জানুয়ারি সন্ধ্যায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে মশাল মিছিল এবং ২৪ জানুয়ারি দেশব্যাপী সকাল-সন্ধ্যা হরতাল।

২৪ জানুয়ারি হরতালের দিনেই সকালে তোপখানা রোডে সচিবালয়ে পিকেটিং করার সময় স্কুলছাত্র মতিউর রহমান পুলিশের গুলিতে নিহত হন। এ দিন প্রকৃতপক্ষে ঢাকার ছাত্র-জনতা এবং টঙ্গি-তেজগাঁও-আদমজী-ডেমরা এলাকার শ্রমিকরা একযোগে রাজপথে নেমে আসেন। আমি বর্তমান দোয়েল চত্বর এলাকায় একদল শ্রমিকের মধ্যে পড়ে যাই। মনে আছে, তখন লুঙ্গি-গেঞ্জি পরা এক শ্রমিক আমাকে বুকে টেনে নিয়ে অন্যদের দেখিয়ে বলেছিলেন, 'এই মাসুম বাচ্চা মিছিলে যখন, আমরা ঘরে তাকি ক্যামনে।' সবার মুখে তখন আইয়ুব শাহির পতন চাই, শেখ মুজিবের মুক্তি চাই স্লোগান। মতিঝিলের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি অফিসের টপ বসরা ছাত্রদের ডাকে রাজপথে নেমে আসেন। বড় বড় সরকারি অফিসের শীর্ষ ব্যক্তি থেকে পিয়ন-দারোয়ান একই মিছিলে শামিল হয়েছেন, এ এক অভূতপূর্ব দৃশ্য। অতীতে এমনটি ঢাকা প্রত্যক্ষ করেনি।

দুপুরে পল্টন ময়দানে মতিউরের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। ততক্ষণে ঢাকা শহর যেন জ্বলছে। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় শেখ মুজিবের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য প্রদান করেছেন, এমন কয়েকজনের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও বাড়ি জনগণ পুড়িয়ে দেয়। সরকার সমর্থক দৈনিক পাকিস্তান ও মর্নিং নিউজ জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। জনগণ গভর্নর হাউস ও সচিবালয়ে আগুন দেবে, এমন শঙ্কা তৈরি হয়। ততক্ষণে সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। ছাত্রনেতারা তখন পল্টন ময়দান থেকে মিছিল নিয়ে ইকবাল হলের (বর্তমানে সার্জেন্ট জহুরুল হক হল) মাঠে চলে আসেন। পরদিন ২৫ জানুয়ারি প্রদেশব্যাপী হরতাল ঘোষিত হয়। একইসঙ্গে সরকার ঘোষণা করে কারফিউ।

প্রকৃতপক্ষে ২৪ জানুয়ারির ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানই আইয়ুব খানের পতন এবং শেখ মুজিবের মুক্তি অবধারিত করে দেয়। সবাই কেবল অপেক্ষায় ছিল কখন এ দুটি ঘটনা ঘটে। শেখ মুজিবুর রহমান মুক্তিলাভ করেন ২২ ফেব্রুয়ারি। জনগণ তাকে বরণ করে নেন বঙ্গবন্ধু হিসেবে। আইয়ুব খান বিদায় নেন ২৫ মার্চ।

ছাত্রসমাজের নেতৃত্বে ১১ দফার আন্দোলন পরিচালিত হয়েছিল। এ আন্দোলনকেই অভিহিত করা হয় স্বাধীনতা সংগ্রামের ড্রেস রিহার্সাল হিসেবে। এ আন্দোলন চলাকালেই জয় বাংলা স্লোগান ধ্বনিত হতে থাকে। আরও শোনা যায়- পিন্ডি না ঢাকা ঢাকা- ঢাকা, পদ্মা মেঘনা যমুনা- তোমার আমার ঠিকানা প্রভৃতি স্লোগান। সঙ্গোপনে প্রস্তুতি চলতে তাকে স্বাধীনতার। ছাত্রদের ওপর জনতার তখন অগাধ আস্থা। ইকবাল হল সবকিছুর কেন্দ্রে। কারখানায় শ্রমিক-মালিক বিরোধ মীমাংসার জন্য উভয়পক্ষ চলে আসত ওই ছাত্রাবাসে। এমনকি স্বামী-স্ত্রীর ঝগড়া দেখা দিলেও উভয় পক্ষ ভাবত- ইকবাল হলে গেলে একটা সমাধান মিলবেই।

সে সময়ে আমরা দিনের পর দিন ধর্মঘট করেছি- মিছিল করেছি। হাজার হাজার ছাত্রছাত্রী তাতে অংশ নিয়েছে। সকালে বিভিন্ন স্কুল-কলেজে গিয়ে ধর্মঘট করিয়ে মিছিল নিয়ে বটতলার সমাবেশে যোগদান, তারপর ৮-১০ কিলোমিটার মিছিল করে দুপুরে খেয়েই বিকেলে মধুর ক্যান্টিনে কর্মিসভা। দিনের পর দিন আমরা এ ধরনের কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছি ক্লান্তিহীনভাবে। তোফায়েল আহমেদ ছিলেন আন্দোলনের মধ্যমণি। তার বক্তব্য ছাত্র-জনতা মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনত। সাইফউদ্দিন আহমদ মানিক বক্তৃতা দিতেন গুছিয়ে। তার বক্তব্যে থাকত দিকনির্দেশনা। জেলায় জেলায় যে সব কলেজ ছিল, সর্বত্র নিয়মিত নির্বাচন হতো ছাত্র সংসদের। নির্বাচিত ভিপি-জিএসরা জনগণের কাছে বিশেষ মর্যাদা পেতেন। ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়নের প্রার্থীরা বেশিরভাগ কলেজ ছাত্র সংসদে জয়ী হতেন। সাধারণভাবে যে কোনো ছাত্র-গণসমাবেশে ছাত্রনেতাদের বক্তব্য মানুষ বিশেষ আগ্রহ নিয়ে শুনত।

১১ দফার আন্দোলনের মধ্য দিয়ে পতন ঘটে আইযুব খানের। রাজনৈতিক অঙ্গনে যে শূন্যতা তিনি সৃষ্টি করেছিলেন তা দ্রুতই পূরণ হয়ে যায়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হয়ে ওঠেন বাঙালির প্রাণপ্রিয় নেতা। তিনি স্বাধীনতার পথে সুপরিকল্পিতভাবে অগ্রসর হতে থাকেন। জনগণ যে এ জন্য প্রস্তুত হয়ে উঠেছে, সেটা তো তিনি নিশ্চিত হয়ে যান ঊনসত্তরের ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানেই।

এই জানুয়ারিতে ঊনসত্তরের সেই অগ্নিঝরা দিনগুলোর ৫০ বছর পূর্ণ হলো। ১৭ থেকে ২৪ জানুয়ারি, এই আটটি দিন আমাদের এ ভূখণ্ডের ছাত্রসমাজ রাজপথ কাঁপিয়ে দিয়েছিল। অনন্য বিজয় ছিনিয়ে এনেছিল। রক্ত দিয়েছিল আসাদ-মতিউরসহ অনেকে। তাদের স্মৃতির প্রতি জানাই প্রণতি। ২৪ জানুয়ারি ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের অর্ধশত বার্ষিকী নিছক আনুষ্ঠানিকতার জন্য নয়, বরং তা থেকে শিক্ষা গ্রহণের জন্য নানা আয়োজনে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও ছাত্র সংগঠন পালন করবে- এটাই প্রত্যাশা।

লেখক: সাংবাদিক

সংশ্লিষ্ট খবর