চতুরঙ্গ

আমাদের হারিয়ে যাওয়া মূল্যবোধ

প্রকাশ : ০৮ ডিসেম্বর ২০১৮ | আপডেট : ০৮ ডিসেম্বর ২০১৮

আমাদের হারিয়ে যাওয়া মূল্যবোধ

   আবরার সাদী

ভিকারুননিসা নূন স্কুল এন্ড কলেজের আন্দোলন প্রসঙ্গে কিছু কথা বলব। প্রথমেই সমবেদনা জানাই শোকসন্তপ্ত অরিত্রির পরিবারের প্রতি। অরিত্রির আত্মহত্যাকে কেন্দ্র করে বিবদমান পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে আমার এই ব্যক্তিগত অভিমত সবার সঙ্গে শেয়ার করছি, যাতে আর কোনো অরিত্রিকে এ ধরনের মর্মান্তিক ভুল করতে না হয়। আমরা যারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম কিংবা গণমাধ্যমে সচল থাকি, তাদের সবার কাছে আমার অনুরোধ, আমরা সবাই মিলে যেন অরিত্রিদের বাঁচিয়ে রাখি তাদের মূল্যবান জীবনে।

স্কুল-কলেজের অধ্যক্ষ, হেড টিচার আর ক্লাস টিচারদের গ্রেফতার করে শাস্তি দিলেই কি বিবদমান এই সমস্যার স্থায়ী কোনো সমাধান আদৌ হবে? গ্রেফতারের দাবি যদি জানানো হয়, তাহলে অরিত্রির হাতে এই অল্প বয়সে মোবাইল ফোন তুলে দেওয়ার রীতি যারা তৈরি করেছে, স্কুলের শৃঙ্খলা ভঙ্গের মূল হোতা তো তারাই, ঘটনার সূত্রপাতও আসলে সেখান থেকেই- তাহলে কেন তাদের গ্রেফতার করে বিচারের আওতায় আনার দাবি জানানো হচ্ছে না। কারণ আমরা সবাই ক্ষণস্থায়ী আবেগী জনগোষ্ঠী। পরিকল্পিত জীবনধারা এবং দূরদৃষ্টি দিয়ে আমরা আমাদের সমাজকে সাজাতে শিখিনি।

আমাদের দেশে আন্দোলন একটি ফ্যাশন হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে এসব ঘটনায় কয়েকদিনের উত্তাল উন্মাদনা ছাড়া আর কিছুই হয় না। সড়ক দুর্ঘটনা হলে আমরা রাস্তা অবরোধ করে বসে থাকি। ফ্যাক্টরিতে আগুন লাগলে আমরা ধর্মঘট ডেকে কাজ বন্ধ রাখি। এসব আন্দোলন কখনও ঘটনা বা দুর্ঘটনার মূল কারণকে চিহ্নিত করার প্রয়াস নিয়ে হয় না। বরং কোনো একটি বিপদ কীভাবে সচেতনতা এবং সতর্কতার সঙ্গে এড়িয়ে চলা যায়- সে ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপ হিসেবে কাজে লাগানো হয় না।

কেন এসব আন্দোলনকে আমাদের দেশে গঠনমূলকভাবে চিন্তা করা হয় না? আপনারা যারা সমাজের দায়িত্বশীল, সৃজনশীল ও প্রগতিশীল, তারা কেন ছকের বাইরে এসে চিন্তা করেন না? স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের হাতে স্মার্টফোন তুলে দেওয়ার আদৌ কোনো প্রয়োজন আছে কি-না, স্মার্টফোন হাতে পেয়ে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার কতটা ক্ষতি হচ্ছে, নৈতিকতা এবং মূল্যবোধের অবক্ষয় কীভাবে হচ্ছে, কীভাবে তারা অপসংস্কৃতির দিকে ধাবিত হচ্ছে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের হাতছানিতে কীভাবে তারা দিন দিন অসামাজিক হয়ে পড়ছে, কীভাবে শৃঙ্খলাবিধির প্রতি অসম্মান করছে, শৃঙ্খলাবোধ সম্পর্কে অভিভাবকরা কতটা জ্ঞাত, লাগামহীন প্রতিযোগিতা আর অযৌক্তিক আহদ্মাদের বিপরীতে অভিভাবকদের দায়-দায়িত্ব কতটুকু, সামাজিকভাবে এসব প্রযুক্তিগত রোগ থেকে মুক্তি পাওয়ার উপায় কী ইত্যাদি বিষয় নিয়ে কেন কাজ করছেন না?

আমি জানি আমার ব্যক্তিগত অভিমত, প্রচলিত চিন্তাধারার বিপরীতে এবং আপনার বা আপনাদের কাছে বিরক্তির কারণ হতে পারে। তবুও আমি অনুরোধ করছি, একটিবার হলেও ভেবে দেখুন। দৃশ্যত অপরাধীদের বিচারের দাবিতে নিজেকে সীমাবদ্ধ না রেখে, প্রতিটি অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনার মূল কারণ চিহ্নিত করে সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে নিজের দায়িত্বশীলতাকে বৃদ্ধি করে এসব সামাজিক ও পারিবারিক বিপদ থেকে নিজেকে, নিজের পরিবারকে এবং সমাজকে রক্ষার উদ্যোগ নিন।

করপোরেট জীবনে আমরা কমবেশি সবাই RCA বা Root Cause Analysis প্রসেসের সঙ্গে পরিচিত। নিজেদের ব্যবসায়িক এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্বার্থ নিরাপদ রাখার জন্য এই প্রসেস প্রায় সব প্রতিষ্ঠানে অনুশীলন করা হয়। তবে নিজের সন্তান, পরিবার-পরিজন ও সমাজ ব্যবস্থাকে নিরাপদ রাখার জন্য আমরা এ ধরনের কি কিছু করতে পারি না? আসুন একবার সবাই মিলে ঘুরে দাঁড়াই, ফিরে তাকাই আমাদের হারিয়ে যাওয়া মূল্যবোধ, সামাজিক সম্পর্ক, সচেতন বিবেক আর মানবিক দায়বদ্ধতার দিকে।

লাগামহীন আহদ্মাদ নয়, দায়িত্বশীল ভালোবাসা দিয়ে আগলে রাখুন প্রিয়জনকে। শুধু আবেগী হয়ে নয়, সচেতন সত্তা নিয়ে এগিয়ে আসুন সামাজিক কল্যাণে।

আবরার সাদী, স্টেট অব মেরিল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্রে কর্মরত।

মন্তব্য


অন্যান্য