চতুরঙ্গ

নিঃশ্বাসে কষ্ট, বিশ্বাসে প্রত্যয়

প্রকাশ : ০১ ডিসেম্বর ২০১৮ | আপডেট : ০১ ডিসেম্বর ২০১৮

নিঃশ্বাসে কষ্ট, বিশ্বাসে প্রত্যয়

বীর প্রতীক তারামন বিবি। ফাইল ছবি

  উমর ফারুক

বিজয় মাসের প্রথম দিনই না ফেরার দেশে চলে গেলেন বীর প্রতীক খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা তারামন বিবি। শুক্রবার রাতে কুড়িগ্রামের রাজিবপুর উপজেলার কাচারীপাড়ার নিজ বাড়িতে মারা যান তিনি। তার মৃত্যুতে শোক জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী। মুক্তিযুদ্ধে অবদান রাখার জন্য বীর প্রতীক খেতাবপ্রাপ্ত দু’জন নারীর মধ্যে একজন হচ্ছেন তারামন বিবি। 

একাত্তরের রণাঙ্গনের এই মুক্তিযোদ্ধাকে নিয়ে গত ১৭ ডিসেম্বর সমকালের সম্পাদকীয় ও মন্তব্য পাতায় একটি নিবন্ধ প্রকাশিত হয়। পাঠকদের জন্য সেটি আবার প্রকাশ করা হলো।

মুক্তিযোদ্ধা তারামন বিবি একাত্তরে একটি মানচিত্র এঁকেছিলেন। এঁকেছিলেন একটি পতাকা। তখন তার বয়স ছিল ১৩ বা ১৪। বীরপ্রতীক খেতাবপ্রাপ্ত। এখন বয়স হয়েছে। দীর্ঘক্ষণ সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারেন না। নিজে নিজে বেশিক্ষণ পথ চলতে পারেন না। অন্যের সাহায্য প্রয়োজন হয়। ২০১৬ সালের নভেম্বর মাসে তিনি বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে এলেন এআইএস বিভাগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে। বক্তব্য রাখলেন ২৬ মিনিট। মুক্তিযুদ্ধের গল্প বললেন। আগামী প্রজন্মের কাছে প্রত্যাশার কথা বললেন। সবার ভালোবাসা চাইলেন। তার বক্তব্যের পুরোটা সময় এক অন্যরকম অনুভূতি জাগাল সবাইকে।

তারামন বিবির জন্ম কুড়িগ্রামের রাজীবপুর, কাচারিপাড়ায়। বাবা আবদুস সোবহান, মাতা কুলসুম বিবি। বক্তব্যের শুরুতে তিনি বললেন, আমি অসুস্থ। কথা বলতে পারব কি-না জানি না। আমার বাবা মারা যান মুক্তিযুদ্ধের আগে। মা খুব অসহায়। এলাকার লোকজন তখন নানাভাবে, অন্যায় অপবাদ দিয়ে আমাদের অপদস্থ করত। নির্যাতন করত। সৈয়দপুর, নীলফামারী, পার্বতীপুরে তখন যুদ্ধ শুরু হয়ে গিয়েছিল। দুর্গাপুরের কিছু মানুষ তখন আমাদের বাড়ির পাশে আশ্রয় নিয়েছিল। তাদের প্রত্যেকের চেহারায় ভয় আর আতঙ্ক। তারা নির্যাতনের গল্প শোনাত। মনে মনে ভাবতাম, যদি প্রতিবাদ করতে পারতাম। যদি কিছু করতে পারতাম দেশটার জন্য। দেশের মানুষের জন্য। আমরা ছিলাম সাত ভাইবোন। বোনরা বড়। ফলে বড় ছেলে না থাকায়, মা ছিল অনেকটা অসহায়। যুদ্ধের সময় আমরা খাল পাড়ি দিয়ে আশ্রয় নিয়েছিলাম এক আত্মীয়ের বাড়িতে।

একদিন সন্ধ্যায়, আমি কচুরমুখি তুলছিলাম রান্নার জন্য। পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন একজন মুক্তিযোদ্ধা। নাম মুহিব হাবিলদার। আমাকে তার সঙ্গে তাদের ক্যাম্পে নিয়ে যেতে চাইলেন। রান্নার কাজের জন্য। মায়ের সঙ্গে কথা হলো তার। এত বড় মেয়ে, ক্যাম্প থেকে ফিরলে সমাজ কী বলবে। এসব সাতপাঁচ না ভেবেই, মা দেশের জন্য আমাকে পাঠিয়ে দিলেন। মুহিব হাবিলদার আমাকে তার ধর্মমেয়ে বানালেন। ক্যাম্পে আমি মূলত রান্নার কাজই করতাম। অস্ত্রগুলো মুছতাম। লুকিয়ে রাখতাম। প্রয়োজনে আবার সেগুলো তাদের হাতে তুলে দিতাম। রান্নার ফাঁকে ফাঁকে বাবা আমাকে অস্ত্র চালানো শেখাতেন। প্রথমে চেষ্টা করলেন রাইফেল চালানো শেখাতে। আমি ছোট মানুষ। বুকে ব্যথা পেতাম। পরে স্টেনগান চালানো শিখলাম। আমাদের ক্যাম্পটি ছিল ১১ নম্বর সেক্টরে। বাবা আমাকে একবার বললেন- তারামন, এলাকায় পাকিস্তানি সেনা ঢুকেছে। তুমি কি একটু লুকিয়ে ওদের খবর এনে দিতে পারবে? আমি রাজি হলাম। বাবা বললেন, তুমি রাজি তো হলে, কিন্তু এ কাজে তো অনেক ঝুঁকি। তুমি মরেও যেতে পারো। 

তারামন বিবি গাছে চড়তে জানতেন। সাঁতার কাটতে জানতেন। মায়ের ছেঁড়া শাড়ি পরে, গায়ে গোবর ও মাটি মেখে পাগল সেজেছিলেন তিনি। খবর আনার জন্য পৌঁছে গেলেন মিলিটারি ক্যাম্পে। কাগজ কুড়াতেন। পাগলের অভিনয় করতেন। আর খবর নিতেন ক্যাম্পের কোথায় কী আছে? কোথায় অস্ত্র মজুদ করা হয়? পাকিস্তানি সেনারা সন্দেহ করলে, নাম জিজ্ঞেস করলে, চুলগুলো সামনে এনে মুখ ঢেকে দিতেন। বলতেন, আমি তো পাগল। এসব কাজে তাকে খুব ব্যস্ত থাকতে হতো। খাওয়ার সময়ও পেতেন না। ক্যাম্পে তিনি ছিলেন সবার ছোট। সবাই তাকে খুব আদর করত। একদিন দুপুরবেলা পাকিস্তানি এক গানবোট তাদের দিকে আসতে থাকে। খবর পেয়ে তিনিও তার সহযোদ্ধাদের সঙ্গে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। শত্রুকে পরাস্ত করেন। পরবর্তী সময়ে তারামন বিবি বেশ কয়েকটি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। ভাগ্যের জোরে কয়েকবার মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরেও এসেছেন।

যুদ্ধ শেষে ফিরে আসেন তারামন মায়ের কাছে। তারপর '৭৪-এ বিয়ে হয় আবদুল মজিদের সঙ্গে। এখন তাদের একটি ছেলে ও একটি মেয়ে। এ পর্যন্ত বলেই কাশতে শুরু করলেন তিনি। যদিও শীতকাল, কিন্তু তিনি ঘামছেন। প্রচণ্ড ঘামছেন। মঞ্চে হাতপাখা নিয়ে বাতাস করছে প্রান্ত। আবার বলতে শুরু করলেন। বললেন, আমি জানতাম না, আমি বীরপ্রতীক। আনন্দমোহন কলেজের প্রফেসর বিমল কান্তি ১১ নম্বর সেক্টরের মু্ি‌ক্তযোদ্ধাদের তালিকায় আমার নাম দেখতে পান। তিনি মুক্তিযোদ্ধা সংসদে চিঠি পাঠান। মূলত তিনিই খুঁজে বের করেন আমাকে। এ কথা বলতে বলতে তিনি আবারও কাশতে শুরু করলেন। পানি পান করলেন। আস্তে আস্তে আবার কথা বলতে শুরু করলেন। তার প্রাণশক্তিতে প্রত্যয়। বললেন, আমার মামা, মামাতো ভাই, আত্মীয়-স্বজন অনেকেই মুক্তিযোদ্ধা। তখন আমি ভীষণ অসুস্থ ছিলাম। কথা বলতে পারি না। স্বামী দিনমজুর। সে টাকায় বাচ্চাদের খাওয়াব, নাকি নিজের চিকিৎসা করাব? আমি তখন যক্ষ্ণা রোগে আক্রান্ত ছিলাম। ওটা ছিল '৯৫ সালের কথা। রোকেয়া কবীর, খুশি কবীর ঢাকা থেকে এলেন আমাকে দেখতে। স্বাধীনতার দুই যুগ পর খুঁজে পাওয়া গেল একজন বীর মুক্তিযোদ্ধাকে। কী হাস্যকর, তাই না। তিনি বড় আফসোস করে বলছিলেন, তারামনকে খুঁজে পাওয়া যায় না। কিন্তু চোর-ডাকাতকে রাষ্ট্র খুঁজে পায়। তারামন দেশ স্বাধীন করেছে। চোরও না, ডাকাতও না। তাকে খুঁজে পেতে কেন এত সময় লাগল? সে সময় সাংবাদিকরা খুব ভিড় করতে লাগলেন। সবাই জিজ্ঞেস করছিলেন, আমি কী চাই। তারামন বিবি বললেন, পদক চাই। পদক। শুধু আমার জন্য না, সব মুক্তিযোদ্ধার জন্য। সব অসহায় মুক্তিযোদ্ধাকে সম্মান দিতে হবে। এতদিন তার যুদ্ধ ছিল রাজাকারের সঙ্গে। এবার যুদ্ধ শুরু হয় সরকারের সঙ্গে। সে যুদ্ধেও আমি জিতলাম। সরকার মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান দিল। ভাতা দিল। আমাকে বাড়ি বানিয়ে দেওয়া হলো। রাষ্ট্র আমার দায়িত্ব গ্রহণ করল।

বক্তৃতার শেষ পর্বে চলে এলেন তারামন বিবি। সামনে উপস্থিত শিক্ষার্থীরা তখন প্রচণ্ড শিহরিত। তাদের উদ্দেশে বললেন, তোমাদের কাছে আমার দাবি রইল, তোমরা সঠিক মুক্তিযোদ্ধাকে চিনতে শেখো। আমি নারী হয়ে যদি যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করতে পারি, তাহলে তোমরা সঠিক মুক্তিযোদ্ধাদের চিনতে পারবে না কেন? আমরা হারিয়ে যাচ্ছি। খুব শিগগির আমরা সবাই হারিয়ে যাব। কবে হঠাৎ করে শুনবে আমিও মরে গেছি। তোমরা মুক্তিযোদ্ধাদের ভালোবাস। দেশকে ভালোবাস। পতাকা আর মানচিত্রকে ভালোবাস। এই কথা বলতে বলতে তিনি আবারও অসুস্থ হয়ে পড়লেন। তার নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল। কিন্তু তার স্বপ্নে দেশ। চিন্তায় দেশ ও মুক্তিযুদ্ধ। তার কণ্ঠে প্রত্যয়। 

মুক্তিযোদ্ধাদের অধিকার সবার আগে। তারামন বিবিদের অধিকার সবার আগে। তাহলেই ভালো থাকবে দেশ। ভালো থাকবে দেশের অর্থনীতি। ভালো থাকবে মানচিত্র। ভালো থাকবে পতাকা। তারামন বিবি ভালো নেই। তার ফুসফুস ভালো নেই। যাওয়ার সময় তিনি ছোট্ট একটি শিশুর হাত বুকের সঙ্গে শক্ত করে চেপে ধরলেন। বললেন, আমার ফুসফুসটা ভালো নেই। তোমাদের বুকের তাজা নিঃশ্বাসে দেশটাকে সজীব রেখ। ভালো রেখ।

লেখক: শিক্ষক, অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর।

মন্তব্য


অন্যান্য