চতুরঙ্গ

নিঃশ্বাসে কষ্ট, বিশ্বাসে প্রত্যয়

প্রকাশ : ০১ ডিসেম্বর ২০১৮ | আপডেট : ০১ ডিসেম্বর ২০১৮

নিঃশ্বাসে কষ্ট, বিশ্বাসে প্রত্যয়

বীর প্রতীক তারামন বিবি। ফাইল ছবি

  উমর ফারুক

বিজয় মাসের প্রথম দিনই না ফেরার দেশে চলে গেলেন বীর প্রতীক খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা তারামন বিবি। শুক্রবার রাতে কুড়িগ্রামের রাজিবপুর উপজেলার কাচারীপাড়ার নিজ বাড়িতে মারা যান তিনি। তার মৃত্যুতে শোক জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী। মুক্তিযুদ্ধে অবদান রাখার জন্য বীর প্রতীক খেতাবপ্রাপ্ত দু’জন নারীর মধ্যে একজন হচ্ছেন তারামন বিবি। 

একাত্তরের রণাঙ্গনের এই মুক্তিযোদ্ধাকে নিয়ে গত ১৭ ডিসেম্বর সমকালের সম্পাদকীয় ও মন্তব্য পাতায় একটি নিবন্ধ প্রকাশিত হয়। পাঠকদের জন্য সেটি আবার প্রকাশ করা হলো।

মুক্তিযোদ্ধা তারামন বিবি একাত্তরে একটি মানচিত্র এঁকেছিলেন। এঁকেছিলেন একটি পতাকা। তখন তার বয়স ছিল ১৩ বা ১৪। বীরপ্রতীক খেতাবপ্রাপ্ত। এখন বয়স হয়েছে। দীর্ঘক্ষণ সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারেন না। নিজে নিজে বেশিক্ষণ পথ চলতে পারেন না। অন্যের সাহায্য প্রয়োজন হয়। ২০১৬ সালের নভেম্বর মাসে তিনি বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে এলেন এআইএস বিভাগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে। বক্তব্য রাখলেন ২৬ মিনিট। মুক্তিযুদ্ধের গল্প বললেন। আগামী প্রজন্মের কাছে প্রত্যাশার কথা বললেন। সবার ভালোবাসা চাইলেন। তার বক্তব্যের পুরোটা সময় এক অন্যরকম অনুভূতি জাগাল সবাইকে।

তারামন বিবির জন্ম কুড়িগ্রামের রাজীবপুর, কাচারিপাড়ায়। বাবা আবদুস সোবহান, মাতা কুলসুম বিবি। বক্তব্যের শুরুতে তিনি বললেন, আমি অসুস্থ। কথা বলতে পারব কি-না জানি না। আমার বাবা মারা যান মুক্তিযুদ্ধের আগে। মা খুব অসহায়। এলাকার লোকজন তখন নানাভাবে, অন্যায় অপবাদ দিয়ে আমাদের অপদস্থ করত। নির্যাতন করত। সৈয়দপুর, নীলফামারী, পার্বতীপুরে তখন যুদ্ধ শুরু হয়ে গিয়েছিল। দুর্গাপুরের কিছু মানুষ তখন আমাদের বাড়ির পাশে আশ্রয় নিয়েছিল। তাদের প্রত্যেকের চেহারায় ভয় আর আতঙ্ক। তারা নির্যাতনের গল্প শোনাত। মনে মনে ভাবতাম, যদি প্রতিবাদ করতে পারতাম। যদি কিছু করতে পারতাম দেশটার জন্য। দেশের মানুষের জন্য। আমরা ছিলাম সাত ভাইবোন। বোনরা বড়। ফলে বড় ছেলে না থাকায়, মা ছিল অনেকটা অসহায়। যুদ্ধের সময় আমরা খাল পাড়ি দিয়ে আশ্রয় নিয়েছিলাম এক আত্মীয়ের বাড়িতে।

একদিন সন্ধ্যায়, আমি কচুরমুখি তুলছিলাম রান্নার জন্য। পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন একজন মুক্তিযোদ্ধা। নাম মুহিব হাবিলদার। আমাকে তার সঙ্গে তাদের ক্যাম্পে নিয়ে যেতে চাইলেন। রান্নার কাজের জন্য। মায়ের সঙ্গে কথা হলো তার। এত বড় মেয়ে, ক্যাম্প থেকে ফিরলে সমাজ কী বলবে। এসব সাতপাঁচ না ভেবেই, মা দেশের জন্য আমাকে পাঠিয়ে দিলেন। মুহিব হাবিলদার আমাকে তার ধর্মমেয়ে বানালেন। ক্যাম্পে আমি মূলত রান্নার কাজই করতাম। অস্ত্রগুলো মুছতাম। লুকিয়ে রাখতাম। প্রয়োজনে আবার সেগুলো তাদের হাতে তুলে দিতাম। রান্নার ফাঁকে ফাঁকে বাবা আমাকে অস্ত্র চালানো শেখাতেন। প্রথমে চেষ্টা করলেন রাইফেল চালানো শেখাতে। আমি ছোট মানুষ। বুকে ব্যথা পেতাম। পরে স্টেনগান চালানো শিখলাম। আমাদের ক্যাম্পটি ছিল ১১ নম্বর সেক্টরে। বাবা আমাকে একবার বললেন- তারামন, এলাকায় পাকিস্তানি সেনা ঢুকেছে। তুমি কি একটু লুকিয়ে ওদের খবর এনে দিতে পারবে? আমি রাজি হলাম। বাবা বললেন, তুমি রাজি তো হলে, কিন্তু এ কাজে তো অনেক ঝুঁকি। তুমি মরেও যেতে পারো। 

তারামন বিবি গাছে চড়তে জানতেন। সাঁতার কাটতে জানতেন। মায়ের ছেঁড়া শাড়ি পরে, গায়ে গোবর ও মাটি মেখে পাগল সেজেছিলেন তিনি। খবর আনার জন্য পৌঁছে গেলেন মিলিটারি ক্যাম্পে। কাগজ কুড়াতেন। পাগলের অভিনয় করতেন। আর খবর নিতেন ক্যাম্পের কোথায় কী আছে? কোথায় অস্ত্র মজুদ করা হয়? পাকিস্তানি সেনারা সন্দেহ করলে, নাম জিজ্ঞেস করলে, চুলগুলো সামনে এনে মুখ ঢেকে দিতেন। বলতেন, আমি তো পাগল। এসব কাজে তাকে খুব ব্যস্ত থাকতে হতো। খাওয়ার সময়ও পেতেন না। ক্যাম্পে তিনি ছিলেন সবার ছোট। সবাই তাকে খুব আদর করত। একদিন দুপুরবেলা পাকিস্তানি এক গানবোট তাদের দিকে আসতে থাকে। খবর পেয়ে তিনিও তার সহযোদ্ধাদের সঙ্গে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। শত্রুকে পরাস্ত করেন। পরবর্তী সময়ে তারামন বিবি বেশ কয়েকটি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। ভাগ্যের জোরে কয়েকবার মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরেও এসেছেন।

যুদ্ধ শেষে ফিরে আসেন তারামন মায়ের কাছে। তারপর '৭৪-এ বিয়ে হয় আবদুল মজিদের সঙ্গে। এখন তাদের একটি ছেলে ও একটি মেয়ে। এ পর্যন্ত বলেই কাশতে শুরু করলেন তিনি। যদিও শীতকাল, কিন্তু তিনি ঘামছেন। প্রচণ্ড ঘামছেন। মঞ্চে হাতপাখা নিয়ে বাতাস করছে প্রান্ত। আবার বলতে শুরু করলেন। বললেন, আমি জানতাম না, আমি বীরপ্রতীক। আনন্দমোহন কলেজের প্রফেসর বিমল কান্তি ১১ নম্বর সেক্টরের মু্ি‌ক্তযোদ্ধাদের তালিকায় আমার নাম দেখতে পান। তিনি মুক্তিযোদ্ধা সংসদে চিঠি পাঠান। মূলত তিনিই খুঁজে বের করেন আমাকে। এ কথা বলতে বলতে তিনি আবারও কাশতে শুরু করলেন। পানি পান করলেন। আস্তে আস্তে আবার কথা বলতে শুরু করলেন। তার প্রাণশক্তিতে প্রত্যয়। বললেন, আমার মামা, মামাতো ভাই, আত্মীয়-স্বজন অনেকেই মুক্তিযোদ্ধা। তখন আমি ভীষণ অসুস্থ ছিলাম। কথা বলতে পারি না। স্বামী দিনমজুর। সে টাকায় বাচ্চাদের খাওয়াব, নাকি নিজের চিকিৎসা করাব? আমি তখন যক্ষ্ণা রোগে আক্রান্ত ছিলাম। ওটা ছিল '৯৫ সালের কথা। রোকেয়া কবীর, খুশি কবীর ঢাকা থেকে এলেন আমাকে দেখতে। স্বাধীনতার দুই যুগ পর খুঁজে পাওয়া গেল একজন বীর মুক্তিযোদ্ধাকে। কী হাস্যকর, তাই না। তিনি বড় আফসোস করে বলছিলেন, তারামনকে খুঁজে পাওয়া যায় না। কিন্তু চোর-ডাকাতকে রাষ্ট্র খুঁজে পায়। তারামন দেশ স্বাধীন করেছে। চোরও না, ডাকাতও না। তাকে খুঁজে পেতে কেন এত সময় লাগল? সে সময় সাংবাদিকরা খুব ভিড় করতে লাগলেন। সবাই জিজ্ঞেস করছিলেন, আমি কী চাই। তারামন বিবি বললেন, পদক চাই। পদক। শুধু আমার জন্য না, সব মুক্তিযোদ্ধার জন্য। সব অসহায় মুক্তিযোদ্ধাকে সম্মান দিতে হবে। এতদিন তার যুদ্ধ ছিল রাজাকারের সঙ্গে। এবার যুদ্ধ শুরু হয় সরকারের সঙ্গে। সে যুদ্ধেও আমি জিতলাম। সরকার মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান দিল। ভাতা দিল। আমাকে বাড়ি বানিয়ে দেওয়া হলো। রাষ্ট্র আমার দায়িত্ব গ্রহণ করল।

বক্তৃতার শেষ পর্বে চলে এলেন তারামন বিবি। সামনে উপস্থিত শিক্ষার্থীরা তখন প্রচণ্ড শিহরিত। তাদের উদ্দেশে বললেন, তোমাদের কাছে আমার দাবি রইল, তোমরা সঠিক মুক্তিযোদ্ধাকে চিনতে শেখো। আমি নারী হয়ে যদি যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করতে পারি, তাহলে তোমরা সঠিক মুক্তিযোদ্ধাদের চিনতে পারবে না কেন? আমরা হারিয়ে যাচ্ছি। খুব শিগগির আমরা সবাই হারিয়ে যাব। কবে হঠাৎ করে শুনবে আমিও মরে গেছি। তোমরা মুক্তিযোদ্ধাদের ভালোবাস। দেশকে ভালোবাস। পতাকা আর মানচিত্রকে ভালোবাস। এই কথা বলতে বলতে তিনি আবারও অসুস্থ হয়ে পড়লেন। তার নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল। কিন্তু তার স্বপ্নে দেশ। চিন্তায় দেশ ও মুক্তিযুদ্ধ। তার কণ্ঠে প্রত্যয়। 

মুক্তিযোদ্ধাদের অধিকার সবার আগে। তারামন বিবিদের অধিকার সবার আগে। তাহলেই ভালো থাকবে দেশ। ভালো থাকবে দেশের অর্থনীতি। ভালো থাকবে মানচিত্র। ভালো থাকবে পতাকা। তারামন বিবি ভালো নেই। তার ফুসফুস ভালো নেই। যাওয়ার সময় তিনি ছোট্ট একটি শিশুর হাত বুকের সঙ্গে শক্ত করে চেপে ধরলেন। বললেন, আমার ফুসফুসটা ভালো নেই। তোমাদের বুকের তাজা নিঃশ্বাসে দেশটাকে সজীব রেখ। ভালো রেখ।

লেখক: শিক্ষক, অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর।


মন্তব্য যোগ করুণ

পরের
খবর

খালেদা জিয়ার জন্য পথে না নামলেও ...


আরও খবর

চতুরঙ্গ

খালেদা জিয়া- ফাইল ছবি

  অজয় দাশগুপ্ত

কে বেশি জনপ্রিয়- খালেদা জিয়া, নাকি এইচএম এরশাদ? অনেকেই এ প্রশ্নে ভ্রু কুঁচকে বলবেন- এটা কোনো প্রশ্ন হলো? ১ বনাম ১০০ নয়, তারও বেশি ব্যবধান দু'জনের মধ্যে।

এইচএম এরশাদ ৯ বছর বাংলাদেশে কর্তৃত্ব করেছেন। এ সময়ে খালেদা জিয়া ছিলেন তার বিরোধী পক্ষে। আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনাও তার বিরোধিতা করেছেন। কীভাবে এরশাদ সরকারের অবসান ঘটানো যায়, সে জন্য তারা তিন দফা বৈঠক করেছেন।

১৯৯০ সালের ডিসেম্বরে এইচএম এরশাদের ক্ষমতা থেকে বিদায় নেওয়ার পর ১৯৯১ সালের নির্বাচনে খালেদা জিয়া প্রথমবার জয়ী হয়ে ক্ষমতায় আসেন। দু'জনেই পাঁচটি করে আসনে নির্বাচন করে জয়ী হন। এটা দু'জনের মিল এবং অবশ্যই জনপ্রিয়তার প্রমাণ। তবে খালেদা জিয়া নির্বাচন করেছিলেন দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে। আর এইচএম এরশাদ নির্বাচন করেছিলেন বৃহত্তর রংপুরের পাঁচটি আসন থেকে।

রিটার্নিং অফিসাররা পাঁচ আসনেই সদ্য ক্ষমতা ছেড়ে দিতে বাধ্য হওয়া এইচএম এরশাদের মনোনয়নপত্র বাতিল করে দেন। তখন তিনি জেলে। আইনি লড়াইয়ে তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার অনুমতি পেয়ে যান। তবে তার আগেই রংপুরের মানুষ 'তাদের ছাওয়ালের' প্রতি সমর্থন জানিয়ে দিতে থাকে।

দৈনিক সংবাদ ১৯৯১ সালের ১৮ জানুয়ারি লিখেছে, 'আসন্ন নির্বাচনে ক্ষমতাচ্যুত রাষ্ট্রপতি এইচএম এরশাদের মনোনয়নপত্র বাতিলের প্রতিবাদে এবং তার মুক্তির দাবিতে রংপুরে জাতীয় পার্টির ডাকে ১৬ জানুয়ারি সকাল-সন্ধ্যা হরতাল পালিত হয়। ৭০ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। শহরে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে।'

জেল থেকে নির্বাচন করে এইচএম এরশাদ পাঁচটি আসনে জয়ী হন। তবে খালেদা জিয়ার প্রথম দফা শাসনামলে একদিনের জন্যও সংসদে বসতে পারেননি। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনেও তিনি পাঁচটি আসনে জয়ী হন। সপ্তম সংসদে তিনি বসতে পারেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি সমর্থন জানানোর সুবাদে। এ নির্বাচনেও খালেদা জিয়া পাঁচটি আসনে প্রার্থী হয়ে জয়ী হয়েছিলেন। তিনি ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও তিনটি আসনে প্রার্থী হয়ে তিনটিতেই জয়ী হন।

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন তার দল বয়কট করে। এরপর থেকে তিনি রয়েছেন সংসদের বাইরে। একাদশ সংসদ নির্বাচনে তার প্রার্থীপদ বাতিল হয়েছে দুর্নীতির একাধিক মামলায় শাস্তি হওয়ার কারণে। ঠিক ১০ মাস আগে ৮ ফেব্রুয়ারি তিনি প্রথম দণ্ডিত হওয়ার দিন কারাগারে নিক্ষিপ্ত হন। এদিন গুলশানের বাসা থেকে কারাগারে যাওয়ার পথে মগবাজার এলাকায় বিএনপির শত শত কর্মী বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। কিন্তু শাস্তি ঘোষণার পর জানা গেল, তিনি শান্তিপূর্ণ পথে আন্দোলন পরিচালনার নির্দেশ দিয়েছেন। কোনো ভাংচুর-জ্বালাও-পোড়াও নয়, হরতাল বা অবরোধ নয়। গত ১০ মাসে কর্মীরা তার নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছে। মুক্তির জন্য তিনি আইনি লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়েছেন। এখনও সফল হননি। দুর্নীতির মামলায় দণ্ডিত হওয়ার পরও নির্বাচনে প্রার্থী হতে আইনি লড়াইয়ে রয়েছেন। এখনও সাফল্য আসেনি। দেখা যাক, সর্বোচ্চ আদালতে গিয়ে তিনি নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ পান কিনা।

এইচএম এরশাদের সঙ্গে তার তুলনা টানা যায় এখানেই। খালেদা জিয়ার জনপ্রিয়তা এইচএম এরশাদের তুলনায় অনেক অনেক বেশি, সন্দেহ নেই। কিন্তু ১৯৯১ সালে গণঅভ্যুত্থানের মুখে ক্ষমতাচ্যুত এইচএম এরশাদের মুক্তি ও নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগের দাবিতে তার সমর্থকরা যে আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন, বিএনপি তার চেয়ারপারসনের মুক্তি ও নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুযোগের দাবিতে তেমনটি কেন পারল না? এটা ঠিক যে, এখন বাংলাদেশে হরতাল ডাকলে তাতে সাড়া মেলার সম্ভাবনা আদৌ নেই। অবরোধেও মিলবে না সাড়া। বড় মিছিলের উদ্যোগ নিলে তাতে পুলিশের বাধা আসতে পারে। কিন্তু তাই বলে খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে ২০-৩০ হাজার লোকের মিছিলের চেষ্টা কেন হবে না? হরতাল সফল করতে অনেক ফ্যাক্টর প্রয়োজন হয়। কিন্তু দলীয় কর্মী-সমর্থকদের নিয়ে মিছিল-সমাবেশ করায় কেবল দরকার সাহস ও দৃঢ়সংকল্পের। এর কি অভাব রয়েছে বিএনপিতে?

শনিবার বিএনপির বিপুল সংখ্যক কর্মী-সমর্থক দলের নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে কয়েক ঘণ্টার জন্য তালা ঝুলিয়ে দেয়। আরেক দল বিক্ষোভ প্রদর্শন করে গুলশানের চেয়ারপারসনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে। এখানে ভাংচুরের ঘটনাও ঘটে। বিএনপির কর্মীরা রাজপথে নামতে চায় না, এটা বলা যাবে না। তবে তারা খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে রাজপথে না নামলেও নেমেছেন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলের মনোনয়নবঞ্চিত কয়েকজন নেতার পক্ষে। এ কেমন আনুগত্য?

সংশ্লিষ্ট খবর

পরের
খবর

আমাদের হারিয়ে যাওয়া মূল্যবোধ


আরও খবর

চতুরঙ্গ
আমাদের হারিয়ে যাওয়া মূল্যবোধ

প্রকাশ : ০৮ ডিসেম্বর ২০১৮

   আবরার সাদী

ভিকারুননিসা নূন স্কুল এন্ড কলেজের আন্দোলন প্রসঙ্গে কিছু কথা বলব। প্রথমেই সমবেদনা জানাই শোকসন্তপ্ত অরিত্রির পরিবারের প্রতি। অরিত্রির আত্মহত্যাকে কেন্দ্র করে বিবদমান পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে আমার এই ব্যক্তিগত অভিমত সবার সঙ্গে শেয়ার করছি, যাতে আর কোনো অরিত্রিকে এ ধরনের মর্মান্তিক ভুল করতে না হয়। আমরা যারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম কিংবা গণমাধ্যমে সচল থাকি, তাদের সবার কাছে আমার অনুরোধ, আমরা সবাই মিলে যেন অরিত্রিদের বাঁচিয়ে রাখি তাদের মূল্যবান জীবনে।

স্কুল-কলেজের অধ্যক্ষ, হেড টিচার আর ক্লাস টিচারদের গ্রেফতার করে শাস্তি দিলেই কি বিবদমান এই সমস্যার স্থায়ী কোনো সমাধান আদৌ হবে? গ্রেফতারের দাবি যদি জানানো হয়, তাহলে অরিত্রির হাতে এই অল্প বয়সে মোবাইল ফোন তুলে দেওয়ার রীতি যারা তৈরি করেছে, স্কুলের শৃঙ্খলা ভঙ্গের মূল হোতা তো তারাই, ঘটনার সূত্রপাতও আসলে সেখান থেকেই- তাহলে কেন তাদের গ্রেফতার করে বিচারের আওতায় আনার দাবি জানানো হচ্ছে না। কারণ আমরা সবাই ক্ষণস্থায়ী আবেগী জনগোষ্ঠী। পরিকল্পিত জীবনধারা এবং দূরদৃষ্টি দিয়ে আমরা আমাদের সমাজকে সাজাতে শিখিনি।

আমাদের দেশে আন্দোলন একটি ফ্যাশন হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে এসব ঘটনায় কয়েকদিনের উত্তাল উন্মাদনা ছাড়া আর কিছুই হয় না। সড়ক দুর্ঘটনা হলে আমরা রাস্তা অবরোধ করে বসে থাকি। ফ্যাক্টরিতে আগুন লাগলে আমরা ধর্মঘট ডেকে কাজ বন্ধ রাখি। এসব আন্দোলন কখনও ঘটনা বা দুর্ঘটনার মূল কারণকে চিহ্নিত করার প্রয়াস নিয়ে হয় না। বরং কোনো একটি বিপদ কীভাবে সচেতনতা এবং সতর্কতার সঙ্গে এড়িয়ে চলা যায়- সে ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপ হিসেবে কাজে লাগানো হয় না।

কেন এসব আন্দোলনকে আমাদের দেশে গঠনমূলকভাবে চিন্তা করা হয় না? আপনারা যারা সমাজের দায়িত্বশীল, সৃজনশীল ও প্রগতিশীল, তারা কেন ছকের বাইরে এসে চিন্তা করেন না? স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের হাতে স্মার্টফোন তুলে দেওয়ার আদৌ কোনো প্রয়োজন আছে কি-না, স্মার্টফোন হাতে পেয়ে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার কতটা ক্ষতি হচ্ছে, নৈতিকতা এবং মূল্যবোধের অবক্ষয় কীভাবে হচ্ছে, কীভাবে তারা অপসংস্কৃতির দিকে ধাবিত হচ্ছে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের হাতছানিতে কীভাবে তারা দিন দিন অসামাজিক হয়ে পড়ছে, কীভাবে শৃঙ্খলাবিধির প্রতি অসম্মান করছে, শৃঙ্খলাবোধ সম্পর্কে অভিভাবকরা কতটা জ্ঞাত, লাগামহীন প্রতিযোগিতা আর অযৌক্তিক আহদ্মাদের বিপরীতে অভিভাবকদের দায়-দায়িত্ব কতটুকু, সামাজিকভাবে এসব প্রযুক্তিগত রোগ থেকে মুক্তি পাওয়ার উপায় কী ইত্যাদি বিষয় নিয়ে কেন কাজ করছেন না?

আমি জানি আমার ব্যক্তিগত অভিমত, প্রচলিত চিন্তাধারার বিপরীতে এবং আপনার বা আপনাদের কাছে বিরক্তির কারণ হতে পারে। তবুও আমি অনুরোধ করছি, একটিবার হলেও ভেবে দেখুন। দৃশ্যত অপরাধীদের বিচারের দাবিতে নিজেকে সীমাবদ্ধ না রেখে, প্রতিটি অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনার মূল কারণ চিহ্নিত করে সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে নিজের দায়িত্বশীলতাকে বৃদ্ধি করে এসব সামাজিক ও পারিবারিক বিপদ থেকে নিজেকে, নিজের পরিবারকে এবং সমাজকে রক্ষার উদ্যোগ নিন।

করপোরেট জীবনে আমরা কমবেশি সবাই RCA বা Root Cause Analysis প্রসেসের সঙ্গে পরিচিত। নিজেদের ব্যবসায়িক এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্বার্থ নিরাপদ রাখার জন্য এই প্রসেস প্রায় সব প্রতিষ্ঠানে অনুশীলন করা হয়। তবে নিজের সন্তান, পরিবার-পরিজন ও সমাজ ব্যবস্থাকে নিরাপদ রাখার জন্য আমরা এ ধরনের কি কিছু করতে পারি না? আসুন একবার সবাই মিলে ঘুরে দাঁড়াই, ফিরে তাকাই আমাদের হারিয়ে যাওয়া মূল্যবোধ, সামাজিক সম্পর্ক, সচেতন বিবেক আর মানবিক দায়বদ্ধতার দিকে।

লাগামহীন আহদ্মাদ নয়, দায়িত্বশীল ভালোবাসা দিয়ে আগলে রাখুন প্রিয়জনকে। শুধু আবেগী হয়ে নয়, সচেতন সত্তা নিয়ে এগিয়ে আসুন সামাজিক কল্যাণে।

আবরার সাদী, স্টেট অব মেরিল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্রে কর্মরত।

পরের
খবর

আমার নিছক আনন্দ যখন অন্যের না বলা কান্না


আরও খবর

চতুরঙ্গ

   ড. চৌধুরী সায়মা ফেরদৌস

একটি ক্লাসে বাবুল নামে দু'জন ছেলে আছে। বন্ধুরা কীভাবে তাদের আইডেন্টিফাই করেন? এ ক্ষেত্রে দারুণ চটজলদি একটা কৌশল আছে। আমরা মুহূর্তেই তাদের দু'জনের দৈহিক, বাহ্যিক কিংবা মানসিক খুঁত খুঁজে বের করি এবং সে অনুযায়ী সহাস্যে বীরদর্পে নামকরণ করি। যেমন হতে পারে 'কালা বা কাইল্লা বাবুল', 'ধলা বাবুল'। ভার্টিকেল খুঁত বিচারে হতে পারে 'বাইট্টা বাবুল', 'লম্বু বাবুল' কিংবা 'খাম্বা বাবুল'। হরাইজন্টালি গেলে, 'ভোটকা', 'হোদল', 'মোটকা' কিংবা 'খাসি বাবুল' আর 'শুঁটকি বা ট্যাংরা বাবুল'। বুদ্ধির পরিমাপকে যদি আমাদের মতো 'আশরাফুল মাখলুকাতরা' নামকরণের মাপকাঠি হিসেবে নিই তখন বলি 'গাধা বাবুল'; আরেকজন 'বদ বাবুল'। এ রকম বহু নামকরণের সমীকরণ আমাদের জানা আছে। সবকিছুই তাদের খুঁত বিষয়ক। আমরা অবলীলায় খুঁতগুলোকে বারবার স্মরণ করিয়ে প্রায় প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিচ্ছি যুগ যুগ ধরে। একজন শুরু করে, বাকিরা হাসে এবং আস্তে আস্তে সেই খুঁত প্রাধান্য পাওয়া নাম হয়ে যায় তার সামাজিক আইডেন্টিটি! আর কেমন গা-সওয়া হয়ে গেছে ব্যাপারটা। কিন্তু একবার ওই মাপকাঠিগুলো নিজের নামের সঙ্গে জড়িয়ে দেখেন তো ভালো লাগে কি-না? নিছক আনন্দ মনে হয় কি-না? আচ্ছা, যুগ যুগ ধরে চলা এই 'নিছক আনন্দ' তাদের কতটুকু কষ্ট দিয়েছে তার হিসাব করেছি কখনও?

আমরা প্রতিনিয়ত নিজেদের আপনজন বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজনের কাছে হেনস্তা হচ্ছি। বিশ্বাস করুন, যাকে নিয়ে এই 'নিছক হাস্যরস' করা হয়, তার কিন্তু একদম ভালো লাগে না। সে অভ্যাসে পরিণত করে নিয়েছে এসব। কিন্তু প্রতিবারই এই খুঁত ধরে হ্যাঁচকা টান তার গায়ে বেঁধে ড্রিল ফোটার মতো!

আমার মনে হয়, আমাদের সমাজে অনেক সমস্যার মাঝে অন্যতম সমস্যা হলো, প্রতিটা বিষয়ে আমরা মনে করি, আমাদের জ্ঞান আছে এবং অপর পক্ষ চাক বা না চাক, একটি উপদেশ দেওয়ার জন্মগত অধিকার আমাদের আছে! সেদিন এক বিশাল জ্ঞানী রিকশাওয়ালার পাল্লায় পড়েছিলাম।

কারও সঙ্গে অনেক দিন পর দেখা হলেই খেয়াল করে দেখবেন, আমরা তার সঙ্গে ঠিক কীভাবে আলাপন শুরু করি। 'কী ব্যাপার, দিন দিন এত মোটা হচ্ছ কেন?', 'তোমাকে দেখতে এত ক্লান্ত লাগছে কেন? কী হয়েছে তোমার চেহারার?' যাদের বিয়ের বয়স কিন্তু বিয়ে হয়নি তাদের ক্ষেত্রে তো অবশ্যম্ভাবী সম্ভাষণ- 'বিয়ে করছ কবে?' কিংবা তাদের বাবা-মাকে বলি, 'ভাই/আপা, আপনার মেয়ের/ছেলের বিয়ে দেবেন না?' এসব প্রশ্ন করার আগে আমাদের কি একবারও মনে হয় না, যাকে প্রশ্ন করা হচ্ছে, সে এই সমাজেরই একটা অংশ। সে এবং তার পরিবারও জানে, এই সমাজ বিয়ের একটা নির্দিষ্ট বয়স বেঁধে দিয়েছে। তারাও হয়তো হন্যে হয়ে পাত্র কিংবা পাত্রী খুঁজছে। সবকিছু না মেলায় বিয়েটা হচ্ছে না। এর ভেতর আমি যদি সত্যি উৎকণ্ঠিত থাকি, তবে তাদের বুঝমতো জোড়া মিলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করতে পারি। তা না হলে আমার এই 'মূল্যবান' উপদেশ নিজের কাছে রাখাই শ্রেয়।

যদি আপনি বিবাহিত হন এবং বছর গড়িয়ে গেলেও সন্তান না নিয়ে থাকেন তাহলে তো বড়-ছোট সবাই পারলে ঝাঁপিয়ে পড়বে আপনার ওপর। একের পর এক প্রশ্ন করেই যাবে। ব্যক্তিগত প্রশ্ন? আপনাকে বাচ্চা নেওয়া রিলেটেড প্রশ্ন করা তখন পুরো জাতির অধিকার। 'কী ব্যাপার! আর কত অপেক্ষা করবে?', 'কোনো সমস্যা?', 'আমাদের নতুন মুখ কবে দেখাবে?'- এসব প্রশ্নের সম্মুখীন অবশ্য এই সমাজে মেয়েরাই বেশি হয়। আর যদি মেয়ে কর্মজীবী হয়, তাহলে তো বাচ্চা না হওয়ার ১০০% কারণ চাকরি। তখনকার প্রশ্নের ধরন হয়, 'এত ক্যারিয়ার ক্যারিয়ার করে কী হবে?', 'চাকরি করে এত স্ট্রেস নিয়ে কনসিভ করে না। অমুক ভাইয়ের তমুক বউয়েরও তাই হয়েছিল।' একটাবার ভাবে না, এই প্রশ্নগুলো একান্ত ব্যক্তিগত, বাচ্চা চাওয়া না চাওয়া স্বামীর সিদ্ধান্তও হতে পারে। তাদের মানসিক প্রস্তুতির কারণেও হতে পারে। আবার এমনও তো হতে পারে, তারা নিজেরাও চাচ্ছে, কিন্তু বিধাতা রাজি নন। কম আর বেশি প্রত্যেক মানুষেরই বাবা-মা হওয়া একটা ঐশ্বরিক স্বপ্নের মতো। আর এর সময়-সংখ্যা সব ওই ওপরওয়ালাই নির্ধারণ করেন। বিধাতা কাউকে না চাইতেই সন্তান দেন, কারও আশা পূরণ হতে কয়েক বছর গড়ায়। আবার কারও আশা চিরকাল অপূর্ণ থেকে যায়। এই অপেক্ষা, এই আশা-নিরাশায় দোদুল্যমান অবস্থায় থাকা মানুষদের বুক-চেরা কষ্ট এবং সন্তানের আশায় হৃদয়ে রক্তক্ষরণ শুধু যার হয় সে-ই বোঝে! বুঝি না কেবল সবজান্তা শমসের আমরা। ওই ক্ষত-বিক্ষত হৃদয়ে কাঁটা চামচ চালাই নিছক উপদেশ দিয়ে অথবা প্রশ্নবাণে বিদ্ধ করে! তাদের রীতিমতো অপদস্থ করি।

ভাবছেন, সন্তান ধারণ করলেই মুক্তি পাবেন? এক সন্তান হলে 'দ্বিতীয়টা কবে হবে?', 'ভাইবোন ছাড়া বাচ্চা খুব দুঃখ নিয়ে, একাকিত্ব নিয়ে বড় হয়', 'সেসব বাচ্চা অসামাজিক হয়, স্বার্থপর হয়!' এ জাতীয় প্রশ্নে বিব্রত করে তুলি আমরা প্রতিনিয়ত জানাশোনা বা পাশের মানুষদের। এতে তারা বিব্রত হয়। কারণ সেই বাবা-মায়েরও স্বপ্ন ছিল দ্বিতীয় বাচ্চার। হয়তো অনেকবার চেষ্টার পরও তারা দ্বিতীয় বাচ্চার মুখ দেখেনি। বারবার মিসক্যারেজ হয়েছে; বারবার ওই রক্তপিণ্ড তাকে সন্তান হারানোর মতোই কষ্ট দিয়েছে! হেরে যাওয়া মাতৃত্ববোধের যন্ত্রণায় কেঁদেছে, কিন্তু আপনাকে বলেনি। বুকফাটা আর্তনাদ বালিশের নিচেই চাপা পড়েছে। কারণ এই সমাজ তাদের নাম দিয়েছে 'কাক বন্ধ্যা'। যার একেবারেই সন্তান নেই, সেই মেয়েদের আমরা নাম দিয়েছি 'বন্ধ্যা'!

দুটি সন্তান হয়ে গেছে- ভাবছেন নিশ্চিত? সেখানেও আমরা ছাড় দিই না। সেদিন দেখলাম আমার এক আত্মীয়ের দুই মেয়ে। কিন্তু হঠাৎ তিনি আবার সন্তানসম্ভবা। কিন্তু তিনিও ভীষণ লজ্জিত- এই বয়সে মানুষ কী বলবে, তা ভেবে। তার পাড়া-প্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজন কেউ বাকি নেই তাকে টিপ্পনী কাটা থেকে। এমনও বলেছে, 'এখন তো তোমার মেয়ে বিয়ে দেওয়ার কথা। এখন আবার এসব কী!' বেচারা পুরোটা প্রেগন্যান্সি টাইম ঘরেই লুকিয়ে কাটিয়েছে।

এ রকম আমি অনেককে চিনি, যারা আপাতদৃষ্টিতে সমাজের বেঁধে দেওয়া 'সুন্দরী' তালিকায় পড়ে না বিধায় বিলম্বিত বিয়ের কোটায় পড়ে আছেন। তাই সমাজ-সংসার থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছেন। সন্তানের জন্য আশায় বুক বেঁধে রাখা বাবা-মায়েরা সামাজিক আচার-অনুষ্ঠান একটু এড়িয়ে চলেন। বারবার এই অপদস্থ হওয়া কার ভালো লাগে!

এসব ব্যাপার এত চোখে পড়ত না, যদি আমার কিছু বিদেশি বন্ধুর সঙ্গে থাকার সৌভাগ্য না হতো। আমি তিন মাস তিনটা মেয়ের সঙ্গে বাসা শেয়ার করে থেকেছিলাম পিএইচডির শেষদিকে। ওরা একজন ইন্দোনেশিয়ান, একজন ইজিপশিয়ান, একজন বাংলাদেশি। কিন্তু চার পুরুষ ধরে লন্ডনেই আছে। আমি অবাক হয়ে দেখতাম, তারা কারও সঙ্গে দেখা হলেই প্রথমে একটা প্রশংসা করে। যেমন, 'তোমায় দেখতে খুব সুন্দর লাগছে', 'তোমার হাসিটা এখনও আগের মতোই মিষ্টি আছে।' যতবার আমি বাইরে থেকে ঘরে ঢুকেছি ততবার সম্ভাষণ ছিল, 'তুমি অনেক কষ্ট করে এসেছ নিশ্চয়ই। আমি তোমাকে এক কাপ চা করে দিই?' আবার ওরাই বাইরে থেকে আমার পরে ঘরে ফিরলে ওদের কথা শুরু হতো, 'তুমি ভালো ছিলে তো? ঘরের কাজে কি ক্লান্ত লাগছে? আমি কিছু করে দেব?' এই তিন মাসে আমি একটা দিনের জন্যও তাদের কারও খুঁত নিয়ে কথা বলতে শুনিনি; কাউকে ছোট করে উপহাস করতে শুনিনি। তাদের বন্ধুরা যখন বেড়াতে আসত, তাদেরও দেখিনি পরচর্চায় মেতে উঠতে। মাঝেমধ্যে আমি ওদের গল্পের সঙ্গী হয়ে দেখেছি; এরা সারাক্ষণ মুখিয়ে থাকে কে কাকে সাহায্য করবে। কেউ এক কাপ চা এগিয়ে দিলে ধন্যবাদের বন্যা বইয়ে দেয়। ঠিক কবে তা আমারও কিছুটা অভ্যাসে পরিণত হয়েছিল বলতে পারব না। তবে আমিও সবাইকে দেখে একটা প্রশংসা করা, সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়া, পরচর্চা না করা প্রায় ধাতস্থ করে ফেলেছিলাম। ধাতস্থ যে করেছিলাম, তার প্রমাণ হলো দেশে ফিরে এসে। বিশাল বড় একটা ধাক্কা খেয়েছিলাম। স্বভাবতই দেশে ফেরার পর কাছে-দূরের সব আত্মীয় দেখা করতে এসেছিল অথবা আমিই গিয়েছি। প্রায় প্রতিবারই বেশিরভাগ আত্মীয়ের প্রথম সম্ভাষণ ছিল- 'ওমা, তুমি তো বিদেশ থেকে আরও কালো হয়ে এসেছো' অথবা 'কী ব্যাপার! বিদেশি খাবার দেখি তোমাকে মোটা বানিয়ে ছেড়েছে!' 'তোমার চোখের নিচে এত কালি কেন?' অথবা 'এত দিন পর এলে, ক'দিন পর তো আর চিনবেই না।'

আমি জানি, এসব কথার পেছনে হয়তো বা মায়া আছে কিংবা এসব বলাই সামাজিক প্রথা হয়ে গেছে। কিন্তু কেন? এই সমাজে আমরা যে যে যার যার জায়গায় লড়ছি। যার যার জায়গায় দুঃখ-সুখ মিশিয়ে প্রাণপণে ভালোভাবে বেঁচে থাকার চেষ্টা করছি। কেউ সেই চেষ্টায় অনেক বেশি দৃঢ়, কেউবা দুর্বল। কী হয়- আমরা যদি একে অপরকে ভালোবেসে এই উপহাস থেকে দূরে থাকি? টিপ্পনী কাটার বদলে যদি একটু আনন্দ বিলাই; একটু ভালো কথা, একটু আশ্বাস দিই; না চাইলে উপদেশ দেওয়া থেকে বিরত থাকি? ব্যক্তিগত প্রশ্ন করাকে অসভ্যতা ধরে নিয়ে প্রত্যেককে তার নিজের মতো থাকাকে সম্মান জানাই। আস্তিক-নাস্তিক সবাই তো মানব ধর্মকে বুকে লালন করি। তাহলে আমরা তো পারি প্রতিনিয়ত নিছক উপহাস ছেড়ে ভালোবাসার উষ্ণতা ছড়াতে।

লেখক: অধ্যাপক, ডিপার্টমেন্ট অব ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়