চতুরঙ্গ

বাংলাদেশে মানবাধিকার : আনুষ্ঠানিকতা নয় চর্চাই মুখ্য

প্রকাশ : ১৯ ডিসেম্বর ২০১৮

বাংলাদেশে মানবাধিকার : আনুষ্ঠানিকতা নয় চর্চাই মুখ্য

  ড. মো. কামাল উদ্দিন

মানবাধিকার ধারণার ব্যাপ্তি, পরিধি ও ব্যবহারের ব্যাপকতা বেড়েছে অনেক গুণ। উন্নয়ন, গণতন্ত্র, সুশাসন, মানবাধিকার, পরিবেশ, সংস্কৃতিসহ মানবসমাজের প্রয়োজনীয় সব প্রত্যয়ের সঙ্গে মানবাধিকারের ধারণাটি খুব জোরালোভাবে সম্পৃক্ত করা হয়েছে। বর্তমান যুগ মানবাধিকার ও টেকসই উন্নয়নের যুগ। মানবাধিকার বিষয় বাদ দিয়ে সুশাসন, গণতন্ত্র ও সর্বোপরি উন্নয়ন কল্পনা করা যায় না এ যুগে।

বৈশ্বিক মানবাধিকারের আওয়াজ পৃথিবীর উত্তর-দক্ষিণ, পূর্ব-পশ্চিম সব জায়গায় লেগেছে। তবে এর মাত্রাগত পার্থক্য ব্যাপক। বাংলাদেশ আজ রাজনৈতিক পরিভাষায় একটি মধ্যম আয়ের দেশ। সত্যি কথা বলতে কী, মানুষের আয় বেড়েছে, দারিদ্র্য কমেছে এবং জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন হয়েছে অনেক। কিন্তু নাগরিকের পরিপূর্ণ মানবাধিকার চর্চা ও রাষ্ট্রীয়ভাবে মানবাধিকার সুরক্ষা বড় ধরনের ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। বাংলাদেশে মানবাধিকার বিষয়টি বিদেশি অনুদানের চরম হাতিয়ার হিসেবে পরিণত হয়েছে।

অনেকে হয়তো আমার সঙ্গে একমত পোষণ নাও করতে পারেন যে, বাংলাদেশে মানবাধিকার চিত্র পূর্বের তুলনায় বহু গুণ বিশ্বজয় হয়েছে। আমাদের মানবাধিকার সনদ আছে, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার চুক্তিতে আমরা স্বাক্ষর করেছি, আমাদের সংবিধানে মানবাধিকার রক্ষার কথা জোরালোভাবে বলা আছে, আমাদের জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আছে, তথ্য কমিশন আছে, দুর্নীতি দমন কমিশন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা আছে (Officially), মানবাধিকার সংগঠন আছে, মানবাধিকার কর্মী আছে, গণতন্ত্র আছে তথাকথিত এবং আজ আমরা মধ্যম আয়ের দেশে উপনীত হয়েছি। কিন্তু আমাদের এত উন্নয়ন ও মানবাধিকার সুরক্ষায় সরকারি ও বেসরকারিভাবে এ সরঞ্জাম থাকার পরও প্রকৃত অর্থে নেই আমাদের মানবাধিকার চর্চা। নারী নির্যাতন, গুম, বিনাবিচারে হত্যা, শিশু নির্যাতন, গণপিটুনিতে মানুষ মারা আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে নতুন মাত্রা যুক্ত করেছে। মানবাধিকার আমাদের কাছে একটি পশ্চিমা ধারণায় পরিণত হয়েছে। এ ধারণা আমাদের দেশের রাজনীতি, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও আমাদের উন্নয়নের সঙ্গে মানায় না। আমাদের মানবাধিকারের কর্মসূচি প্রকৃত অর্থে মানবাধিকার উপভোগ ও সুরক্ষার জন্য নয় বরং বিদেশি অনুদান পাওয়া ও উন্নত রাষ্ট্রগুলোকে খুশি করার জন্য। তাই তো আমরা বর্তমান বিশ্বে একটি চ্যাম্পিয়ন জাতি, যারা মানবাধিকারের সব চুক্তি, সনদ ও কনভেনশন স্বাক্ষর করে মানবাধিকারের কথা বলে মানবাধিকার লঙ্ঘন করি। আমরা অত্যন্ত সফল, কারণ গণতন্ত্র, সুশাসন, মানবাধিকার আন্দোলন, মানবাধিকার কমিশন যেভাবে আমাদের দেশে কাজ করছে বৈশ্বিক মানবাধিকার রক্ষার প্রতিষ্ঠান আমাদের কর্মসূচিতে তেমন উদ্বিগ্ন নয়। আমাদের রাজনৈতিক এলিটরাও অত্যন্ত খুশি, কারণ প্রয়োজন হলে সব কিছু থাকা সত্ত্বেও আমরা মানবাধিকার লঙ্ঘন করতে পারি। আমাদের রাজনীতি একটি অন্যতম মানবাধিকার রাজনীতিতে পরিণত হয়েছে। যেখানে মানবাধিকার সুরক্ষার সব ব্যবস্থাও আছে, তীব্র মাত্রায় মানবাধিকার লঙ্ঘনও আছে। গত কিছু দিন আগে আমরা মানবাধিকার সনদ স্বীকৃতির ৭০ বছর পালন করেছি। এখন ভাবনার বিষয় হলো, আরও কত বছর পার করলে বাংলাদেশের মানুষ মানবাধিকার বর্ণনা সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করবে এবং তাদের অধিকার আর লঙ্ঘিত হবে না তা এখনও অজানা।

উন্নয়নের সঙ্গে মানবাধিকারের সম্পর্ক আজ নতুন নয়। বাংলাদেশের উন্নয়নের প্রশংসা আজ সর্বমহলে। তবে নাগরিককে মানবাধিকার বিবেচনা করে কতটুকু উন্নয়ন করা হয়েছে তা এখন ভাবনার বিষয়। বাংলাদেশের উন্নয়ন ও মানবাধিকার সম্পর্ক নেতিবাচক। যদি মানবাধিকার ধারণা বা বিষয় বাংলাদেশের মতো দেশের উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করে তাহলে উন্নয়ন কর্মসূচি থেকে মানবাধিকারকে বাদ দিতে হবে, না হয় মানবাধিকার বাদ দিয়ে যে উন্নয়ন তাকে উন্নয়ন বলা মুশকিল। তাই আমাদের উন্নয়ন কর্মসূচিতে গুরুত্ব পাওয়া উচিত মানবাধিকার রক্ষার উন্নয়ন। সে জন্য সরকারকেই এগিয়ে আসতে হবে সবার আগে।

লেখক : অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

মন্তব্য


অন্যান্য