চতুরঙ্গ

আবার প্রেমে পড়েছি

প্রকাশ : ১৭ ডিসেম্বর ২০১৮ | আপডেট : ১৮ ডিসেম্বর ২০১৮

আবার প্রেমে পড়েছি

   তৌহিদুল হক

মানুষ স্বপ্নে হাবুডুবু খায়। স্বপ্নের বাস্তবায়নে মানুষের মনে বাসা বাঁধে নানা ধরণের ব্যথা, কষ্টের কালো দাগ। প্রতিজন মানুষ প্রত্যাশা করে জীবনে সাফল্য আসবেই। মানুষের এই প্রত্যাশা অমূলক নয়। বেঁচে থাকার অন্যতম অক্সিজেন হলো স্বপ্ন। জীবনের প্রয়োজনে ব্যথাও মানুষকে প্রণোদনা দেয়। বাঁচার লড়াইয়ে নতুন প্রেরণা সৃষ্টি করে। অর্থাৎ মানুষের বাঁচার আকুতি যেমন শ্বাশত তেমনি জটিলতায় পূর্ণ। স্বপ্ন, সাফল্য ও ব্যর্থতার দোলাচলে জীবনের হিসেব-নিকেশ চলে অবিরাম।

মানুষের মুখ আর সুখ নতুন ঠিকানা খোঁজে। পেতে চায় স্পর্শ, পেতে চায় উষ্ণ আলিঙ্গন। কারণ পরস্পর উষ্ণ আলিঙ্গন ও মোবারকবাদ ব্যতিত মানব উন্নয়ন সম্ভব নয়। মানুষের অর্থ, সম্পদ, ঘর-বাড়ি বৃদ্ধির সাথে সাথে মানুষ কতটা মানবিক হতে পেরেছে- এটাই গুরুত্বপূর্ণ ভাবনা। যে ভাবনায় বর্তমান বিশ্বের অনেকে ভাবিত। সকল বস্তুগত উন্নয়ন ব্যর্থ হবে, মুখ থুবড়ে পড়বে যদি মানুষকে সত্যিকার মানুষে পরিণত করা না যায়। মানবিক মানুষ সৃষ্টি করা অর্থাৎ মানুষের আচরণে মানবিকতার ছাপ খুঁজে পাওয়া বর্তমান পৃথিবীর নতুন চ্যালেঞ্জ। চারপাশের মানুষ সদৃশ্য সবাই কী মানুষ? আপাতঃ দৃষ্টিতে হতে পারে! তবে মানুষের ব্যথায় মানুষের দরজার খিল, জানালা শক্ত করে বন্ধ করে দেওয়া- এতো মানুষের মানবিক বৈশিষ্ট্য নয়। এতো মানুষের স্বার্থবান্ধব আচরণ যা অপমানজনক। উন্নয়ন হোক মমতায়পূর্ণ অলংকার।

আমাদের মতো দেশে মানুষের সকল উন্নয়ন হয় দু’টি বৈশিষ্ট্য ধারণ করে। প্রথমটি হলো- দেশের সমস্যাগুলো নিজ ভাবনায় নিয়ে মানুষ নিজেই নিজের উন্নয়ন ঘটায়। দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সম্প্রতি, মানুষের চোখে জল- মানুষ গুরুত্ব দিয়ে ভাবে। মানুষের এই ভাবনাই সম্পদ। এই সম্পদের পরিচর্চা দেশকে একটি উন্নত অবস্থানে নিয়ে যায়। কারণ ইতিহাস সচেতন মানুষ মানুষবান্ধব হবে, হবে প্রীতির বন্ধনে উদ্বুদ্ধকরণ। মানুষকে বস্তুগত সম্পদ সৃষ্টিতে উৎসাহ না দিয়ে মানবিক সম্পদ সৃষ্টিতে উৎসাহ দিতে পারলে- পৃথিবীর চেহারা বদলে যাবে। প্রতিজন মানবিক মানুষ দেশ ও পৃথিবীর রূপ- পরিগ্রহ বদলে দিতে পারে। মানুষ কাজ করবে মানুষের তরে, মানুষের প্রয়োজনে মানুষের দরজার খিল খোলা থাকবে। এভাবে দেশ হবে সত্যিকার অর্থে মানুষবান্ধব দেশ। মানবিকতা একমাত্র শ্লোগান যেখানে উন্নয়নের সকল মর্মকথা গভীরভাবে প্রোথিত। প্রয়োজন চর্চার ও মানুষকে উদ্বুদ্ধ করার।

দ্বিতীয়টি হলো- সরকার। একটি নির্বাচিত সরকার একটি নির্দিষ্ট সময় দেশ ও জনগণের ‘শাসন’ করে। উন্নয়নের দিক থেকে তৃতীয় কাতারের দেশগুলোতে রাজনৈতিক দলগুলো দেশ শাসন করে। মানবিক মর্যাদা এবং জনগণের অধিকার সমুন্নত রাখতে শাসনের পরিবর্তে সেবা অপরিহার্য। নির্বাচিত সরকার দেশ ও জনগণের সেবা করবে। সরকারের কাছ থেকে জনগণ সেবা চায়, শাসন না। শাসন- স্বৈরাচার সরকারের মূল বৈশিষ্ট্য। পক্ষান্তরে সেবা- গণতান্ত্রিক সরকারের মূল মাজেজা। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক দলগুলোর ক্ষমতা কেন্দ্রীক মনোভাবে দেশের মানুষের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রতি বিরূপ রুচির সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে পঁচাত্তরের ঘটনা এদেশের মানুষের প্রতি একটি ঐতিহাসিক অবিচার, যা স্বাধীনতা বিরোধী, স্বার্থান্বেষী ও কুচক্রী মহল ঘটিয়েছে। মানুষকে বিভক্ত করেছে, পরস্পর সম্পর্কের জায়গায় ফাটল সৃষ্টি করেছে। এই ফাটলই বর্তমান রাজনীতির মূল প্রেরণা বলে মনে হয়!

চলতি মাসে একটি জাতীয় নির্বাচনের তারিখ ঘোষিত হয়েছে এবং আশান্বিত যে, নির্বাচনটি হবে। একটি নির্বাচন জাতীয় উন্নয়নে অনেক হিসেব-নিকেশ নির্ধারণ করে। কারণ কারা ক্ষমতার মসনদে বসবে তার ওপর সেবা, মানুষে-মানুষে সম্পর্ক, রাষ্ট্রিক ও সমষ্টিগত সহনশীলতাসহ বাংলার প্রায় সবকিছুই নির্ভর করে। অত্যন্ত বেদনাসহ অনুভব করি, এ দেশের মানুষ এখন সামাজিক সম্পর্ক বিশেষ করে বিয়ের ক্ষেত্রেও পরস্পর আত্মীয়ের ক্ষমতা ও সম্পদের দৌরাত্ম্য বিষয়টি যতটা গুরুত্ব দিয়ে বিচার করে ততটা গুরুত্ব দিয়ে পরস্পরের মানবিক আচরণ বিশ্লেষণ করে কি না তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে!

একটি নির্বাচনের মাধ্যমে রাজনৈতিক দলগুলো অর্থাৎ বর্তমানে জোট বা মহাজোট তাদের ইশতেহার জনসম্মুখে বলবে এবং অঙ্গিকার করবে সুদিনের। অঙ্গিকার করবে সেই সুদিনের যা উন্নয়ন অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করবে, সৃষ্টি করবে কর্মসংস্থানের উন্নত ও নিরাপদ পরিবেশ। রাজনৈতিক জোটের দেশের প্রতি মমত্ব কতো, এ দেশের মূল প্রেরণা ও আদর্শের জায়গায় কারা কতটুকু ছাড় দিয়েছে; বিষয়গুলো জনগণের ভোটাধিকার প্রয়োগের পূর্বে ঠাণ্ডা মাথায় বিচার করা উচিত।

কোনরূপ গবেষণা ছাড়াই বলা যায়, এ দেশের মানুষের একটি বড় অংশ রাজনীতি বিমুখ, রাজনীতি পছন্দ করে না। এর মূল কারণ হলো রাজনৈতিক দলগুলোর পরস্পর বিদ্বেষী আচরণ। এবং এই বিদ্বেষী আচরণ প্রাণনাশ পর্যন্ত গড়িয়েছে। কেউ কাউকে হত্যা করতে চাইলে, সু-সম্পর্ক তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা যোজন যোজন দূর।

পরস্পর অসহনশীল আচরণের পশ্চাত্বে যে সমস্ত কারণ রয়েছে, তন্মধ্যে ‘না’ বলার অনুপস্থিতি অন্যতম। বাংলাদেশের রাজনীতিতে যোগ্যকে অযোগ্য আর অযোগ্যকে যোগ্য করার প্রবণতা বেশ দাপটের সাথে ক্রিয়াশীল। যে পিতা প্রয়োজনে সন্তানকে শাসন করে এবং সন্তানের অযৌক্তিক আবদারকে না বলে, সেইতো উত্তম পিতা। আমাদের রাজনীতিতে দল বা জোটের প্রধান পিতার মতো। পিতা সন্তানদের অর্থাৎ কর্মীদের রাজনৈতিক আদব-কায়দা সেখাবেন, অপরাধপ্রবণ আচরণ সংশোধনে ব্যবস্থা নেবে। আবার ব্যবস্থা নিলেও অন্য একটি দল দলছুটদের কিংবা অপরাধপ্রবণ রাজনৈতিক নেতাদের আশ্রয়-প্রশ্রয় প্রদানে সর্বদা বাজপাখির মতো সচেষ্ট ও সক্রিয়মান।

এখনও সবুজের মাঝে, সবুজ খুঁজি। বাংলার প্রশস্ত মাঠে সবুজের চাষ হয়। ধানের ক্ষেত- সবুজের বাগান। বাংলার গ্রামীণ বৈশিষ্ট্যই আমাদের বৈশিষ্ট্য। মেঠো পথে মানুষের পদচারণ, পরস্পর আলাপ বিনিময়, মানুষের মুখের হাসি- এ সবই সম্পদ। বাংলা হবে বাংলার। আমাদের দেশে রাজনৈতিক দলগুলো সব সময় আমাদের বিদেশি স্বপ্নে বিভোর করে রেখেছে। বাংলার জনগণ বাঙ্গালি হতে চেয়েছে, খাঁটি বাঙ্গালি। বিদেশি মনোভাবে বাঙ্গালি নয়। এদেশের যে মেয়েটি যৌতুকের কারণে স্বামীর হাতে নির্যাতিত হয়, কল্পনা করি সেই স্বামীর ঘরে ফিরতে দেরি হলে মেয়েটির চোখে অশ্রুর আনাগোনা। কল্পনা করি, অসহায় পিতার বলতে না পারা কথাগুলো। পৃথিবীতে একজন পিতার জন্য সবচেয়ে কষ্টের হলো সন্তানের নির্যাতন দেখা ও কিছু করতে না পেরে সহ্য করা।

এদেশের রাজনৈতিক দলগুলো জনগণের মধ্যে বিবেধ সৃষ্টি করে মুনাফা নেয়। জনগণকে আশা দেয় ঠিকই কিন্তু সেই আশা দূর-দূরান্তে। বরং বিবেধ সৃষ্টি করেই জনগণকে শাসন করে গণতন্ত্রের নামে, ধর্মের নামে। সম্প্রতির কথা বলে নৈরাজ্যের পতাকা উড়ায়।

এদেশের মানুষ সবুজের পানে, সমুদ্রের পানে কতটা মায়া জাগানিয়া দৃষ্টিতে তাকায়? এতো প্রেম, শ্বাশত প্রেম। এই প্রেমে বার বার পড়েছি। শহুরে জীবনে ছোট্ট সংসারে সবুজ খেলা। অর্থাৎ মানুষ তার অন্তর ভুলবে কি করে? গ্রামই এ দেশের মানুষের অন্তর। এ দেশের রাজনৈতিক দলগুলো কতটা গ্রাম- গ্রামান্তরে, গ্রামীণ পরিবেশে হাট-বাজারে, সবুজের অপূর্ব বিন্যাসে কতটা মানুষের হয়ে দৃষ্টিপাত করেছে? এদেশের জনগণ যা চায় তাই হওয়া উচিৎ নির্বাচনী ইশতেহার, তাই হওয়া উচিৎ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মূল প্রেরণা। আমাদের দেশের রাজনৈতিক নেতাদের প্রটোকলে জনগণ নেতাকে বুঝতে পারে না, আবার নেতাও জনগণকে বুঝতে পারে না। পরিস্থিতি দাঁড়িয়েছে- নেতাশূন্য জনগণ, জনগণবিহীন নেতা। কী অপূর্ব রাজনীতি? পরস্পর অভিযোগ তন্ত্র আর দাঁত কেলিয়ে হাসাহাসি! আর কতো- পুরাতন শত্রু হাতে নিবে জাতীয় ইজ্জত। বাংলার পতাকা আমার সম্মান, আদর্শ আর ইজ্জতের এক টুকরো কাপড়।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একজন ভোটার হিসেবে সবুজ আর সমুদ্রের পাশাপাশি অবস্থানে নিজেকে দাঁড় করে ভেবেছি- এতো মায়া, এতো প্রেম। সর্বত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে বাংলার মানুষের অনন্ত প্রেম। এই প্রেমে বার বার পড়েছি। সবুজ আর সমুদ্রের, শীতের কুয়াশায় কোন এক অচেনা নারীর মুখোচ্ছবি চোখের দৃষ্টিতে ভাসে। এই দৃষ্টিতে বাংলার জনগণকে দেখি, দেখি পরস্পর বন্ধনের অপূর্ব দৃশ্য যা নৈরাজ্য বিশ্বাস করে না, প্রেমে বিশ্বাসী। জনগণ আর রাজনীতির অপূর্ব মিলন, প্রেমের শ্বাশত আলিঙ্গন। এই প্রেমই হোক রাজনৈতিক দলের রাজনীতি ও উন্নয়নকর্ম।

লেখক : কবি ও সহকারী অধ্যাপক, সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
ই-মেইল: tawohid@gmail.com

মন্তব্য


অন্যান্য