চতুরঙ্গ

আমার নিছক আনন্দ যখন অন্যের না বলা কান্না

প্রকাশ : ০২ ডিসেম্বর ২০১৮

আমার নিছক আনন্দ যখন অন্যের না বলা কান্না

   ড. চৌধুরী সায়মা ফেরদৌস

একটি ক্লাসে বাবুল নামে দু'জন ছেলে আছে। বন্ধুরা কীভাবে তাদের আইডেন্টিফাই করেন? এ ক্ষেত্রে দারুণ চটজলদি একটা কৌশল আছে। আমরা মুহূর্তেই তাদের দু'জনের দৈহিক, বাহ্যিক কিংবা মানসিক খুঁত খুঁজে বের করি এবং সে অনুযায়ী সহাস্যে বীরদর্পে নামকরণ করি। যেমন হতে পারে 'কালা বা কাইল্লা বাবুল', 'ধলা বাবুল'। ভার্টিকেল খুঁত বিচারে হতে পারে 'বাইট্টা বাবুল', 'লম্বু বাবুল' কিংবা 'খাম্বা বাবুল'। হরাইজন্টালি গেলে, 'ভোটকা', 'হোদল', 'মোটকা' কিংবা 'খাসি বাবুল' আর 'শুঁটকি বা ট্যাংরা বাবুল'। বুদ্ধির পরিমাপকে যদি আমাদের মতো 'আশরাফুল মাখলুকাতরা' নামকরণের মাপকাঠি হিসেবে নিই তখন বলি 'গাধা বাবুল'; আরেকজন 'বদ বাবুল'। এ রকম বহু নামকরণের সমীকরণ আমাদের জানা আছে। সবকিছুই তাদের খুঁত বিষয়ক। আমরা অবলীলায় খুঁতগুলোকে বারবার স্মরণ করিয়ে প্রায় প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিচ্ছি যুগ যুগ ধরে। একজন শুরু করে, বাকিরা হাসে এবং আস্তে আস্তে সেই খুঁত প্রাধান্য পাওয়া নাম হয়ে যায় তার সামাজিক আইডেন্টিটি! আর কেমন গা-সওয়া হয়ে গেছে ব্যাপারটা। কিন্তু একবার ওই মাপকাঠিগুলো নিজের নামের সঙ্গে জড়িয়ে দেখেন তো ভালো লাগে কি-না? নিছক আনন্দ মনে হয় কি-না? আচ্ছা, যুগ যুগ ধরে চলা এই 'নিছক আনন্দ' তাদের কতটুকু কষ্ট দিয়েছে তার হিসাব করেছি কখনও?

আমরা প্রতিনিয়ত নিজেদের আপনজন বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজনের কাছে হেনস্তা হচ্ছি। বিশ্বাস করুন, যাকে নিয়ে এই 'নিছক হাস্যরস' করা হয়, তার কিন্তু একদম ভালো লাগে না। সে অভ্যাসে পরিণত করে নিয়েছে এসব। কিন্তু প্রতিবারই এই খুঁত ধরে হ্যাঁচকা টান তার গায়ে বেঁধে ড্রিল ফোটার মতো!

আমার মনে হয়, আমাদের সমাজে অনেক সমস্যার মাঝে অন্যতম সমস্যা হলো, প্রতিটা বিষয়ে আমরা মনে করি, আমাদের জ্ঞান আছে এবং অপর পক্ষ চাক বা না চাক, একটি উপদেশ দেওয়ার জন্মগত অধিকার আমাদের আছে! সেদিন এক বিশাল জ্ঞানী রিকশাওয়ালার পাল্লায় পড়েছিলাম।

কারও সঙ্গে অনেক দিন পর দেখা হলেই খেয়াল করে দেখবেন, আমরা তার সঙ্গে ঠিক কীভাবে আলাপন শুরু করি। 'কী ব্যাপার, দিন দিন এত মোটা হচ্ছ কেন?', 'তোমাকে দেখতে এত ক্লান্ত লাগছে কেন? কী হয়েছে তোমার চেহারার?' যাদের বিয়ের বয়স কিন্তু বিয়ে হয়নি তাদের ক্ষেত্রে তো অবশ্যম্ভাবী সম্ভাষণ- 'বিয়ে করছ কবে?' কিংবা তাদের বাবা-মাকে বলি, 'ভাই/আপা, আপনার মেয়ের/ছেলের বিয়ে দেবেন না?' এসব প্রশ্ন করার আগে আমাদের কি একবারও মনে হয় না, যাকে প্রশ্ন করা হচ্ছে, সে এই সমাজেরই একটা অংশ। সে এবং তার পরিবারও জানে, এই সমাজ বিয়ের একটা নির্দিষ্ট বয়স বেঁধে দিয়েছে। তারাও হয়তো হন্যে হয়ে পাত্র কিংবা পাত্রী খুঁজছে। সবকিছু না মেলায় বিয়েটা হচ্ছে না। এর ভেতর আমি যদি সত্যি উৎকণ্ঠিত থাকি, তবে তাদের বুঝমতো জোড়া মিলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করতে পারি। তা না হলে আমার এই 'মূল্যবান' উপদেশ নিজের কাছে রাখাই শ্রেয়।

যদি আপনি বিবাহিত হন এবং বছর গড়িয়ে গেলেও সন্তান না নিয়ে থাকেন তাহলে তো বড়-ছোট সবাই পারলে ঝাঁপিয়ে পড়বে আপনার ওপর। একের পর এক প্রশ্ন করেই যাবে। ব্যক্তিগত প্রশ্ন? আপনাকে বাচ্চা নেওয়া রিলেটেড প্রশ্ন করা তখন পুরো জাতির অধিকার। 'কী ব্যাপার! আর কত অপেক্ষা করবে?', 'কোনো সমস্যা?', 'আমাদের নতুন মুখ কবে দেখাবে?'- এসব প্রশ্নের সম্মুখীন অবশ্য এই সমাজে মেয়েরাই বেশি হয়। আর যদি মেয়ে কর্মজীবী হয়, তাহলে তো বাচ্চা না হওয়ার ১০০% কারণ চাকরি। তখনকার প্রশ্নের ধরন হয়, 'এত ক্যারিয়ার ক্যারিয়ার করে কী হবে?', 'চাকরি করে এত স্ট্রেস নিয়ে কনসিভ করে না। অমুক ভাইয়ের তমুক বউয়েরও তাই হয়েছিল।' একটাবার ভাবে না, এই প্রশ্নগুলো একান্ত ব্যক্তিগত, বাচ্চা চাওয়া না চাওয়া স্বামীর সিদ্ধান্তও হতে পারে। তাদের মানসিক প্রস্তুতির কারণেও হতে পারে। আবার এমনও তো হতে পারে, তারা নিজেরাও চাচ্ছে, কিন্তু বিধাতা রাজি নন। কম আর বেশি প্রত্যেক মানুষেরই বাবা-মা হওয়া একটা ঐশ্বরিক স্বপ্নের মতো। আর এর সময়-সংখ্যা সব ওই ওপরওয়ালাই নির্ধারণ করেন। বিধাতা কাউকে না চাইতেই সন্তান দেন, কারও আশা পূরণ হতে কয়েক বছর গড়ায়। আবার কারও আশা চিরকাল অপূর্ণ থেকে যায়। এই অপেক্ষা, এই আশা-নিরাশায় দোদুল্যমান অবস্থায় থাকা মানুষদের বুক-চেরা কষ্ট এবং সন্তানের আশায় হৃদয়ে রক্তক্ষরণ শুধু যার হয় সে-ই বোঝে! বুঝি না কেবল সবজান্তা শমসের আমরা। ওই ক্ষত-বিক্ষত হৃদয়ে কাঁটা চামচ চালাই নিছক উপদেশ দিয়ে অথবা প্রশ্নবাণে বিদ্ধ করে! তাদের রীতিমতো অপদস্থ করি।

ভাবছেন, সন্তান ধারণ করলেই মুক্তি পাবেন? এক সন্তান হলে 'দ্বিতীয়টা কবে হবে?', 'ভাইবোন ছাড়া বাচ্চা খুব দুঃখ নিয়ে, একাকিত্ব নিয়ে বড় হয়', 'সেসব বাচ্চা অসামাজিক হয়, স্বার্থপর হয়!' এ জাতীয় প্রশ্নে বিব্রত করে তুলি আমরা প্রতিনিয়ত জানাশোনা বা পাশের মানুষদের। এতে তারা বিব্রত হয়। কারণ সেই বাবা-মায়েরও স্বপ্ন ছিল দ্বিতীয় বাচ্চার। হয়তো অনেকবার চেষ্টার পরও তারা দ্বিতীয় বাচ্চার মুখ দেখেনি। বারবার মিসক্যারেজ হয়েছে; বারবার ওই রক্তপিণ্ড তাকে সন্তান হারানোর মতোই কষ্ট দিয়েছে! হেরে যাওয়া মাতৃত্ববোধের যন্ত্রণায় কেঁদেছে, কিন্তু আপনাকে বলেনি। বুকফাটা আর্তনাদ বালিশের নিচেই চাপা পড়েছে। কারণ এই সমাজ তাদের নাম দিয়েছে 'কাক বন্ধ্যা'। যার একেবারেই সন্তান নেই, সেই মেয়েদের আমরা নাম দিয়েছি 'বন্ধ্যা'!

দুটি সন্তান হয়ে গেছে- ভাবছেন নিশ্চিত? সেখানেও আমরা ছাড় দিই না। সেদিন দেখলাম আমার এক আত্মীয়ের দুই মেয়ে। কিন্তু হঠাৎ তিনি আবার সন্তানসম্ভবা। কিন্তু তিনিও ভীষণ লজ্জিত- এই বয়সে মানুষ কী বলবে, তা ভেবে। তার পাড়া-প্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজন কেউ বাকি নেই তাকে টিপ্পনী কাটা থেকে। এমনও বলেছে, 'এখন তো তোমার মেয়ে বিয়ে দেওয়ার কথা। এখন আবার এসব কী!' বেচারা পুরোটা প্রেগন্যান্সি টাইম ঘরেই লুকিয়ে কাটিয়েছে।

এ রকম আমি অনেককে চিনি, যারা আপাতদৃষ্টিতে সমাজের বেঁধে দেওয়া 'সুন্দরী' তালিকায় পড়ে না বিধায় বিলম্বিত বিয়ের কোটায় পড়ে আছেন। তাই সমাজ-সংসার থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছেন। সন্তানের জন্য আশায় বুক বেঁধে রাখা বাবা-মায়েরা সামাজিক আচার-অনুষ্ঠান একটু এড়িয়ে চলেন। বারবার এই অপদস্থ হওয়া কার ভালো লাগে!

এসব ব্যাপার এত চোখে পড়ত না, যদি আমার কিছু বিদেশি বন্ধুর সঙ্গে থাকার সৌভাগ্য না হতো। আমি তিন মাস তিনটা মেয়ের সঙ্গে বাসা শেয়ার করে থেকেছিলাম পিএইচডির শেষদিকে। ওরা একজন ইন্দোনেশিয়ান, একজন ইজিপশিয়ান, একজন বাংলাদেশি। কিন্তু চার পুরুষ ধরে লন্ডনেই আছে। আমি অবাক হয়ে দেখতাম, তারা কারও সঙ্গে দেখা হলেই প্রথমে একটা প্রশংসা করে। যেমন, 'তোমায় দেখতে খুব সুন্দর লাগছে', 'তোমার হাসিটা এখনও আগের মতোই মিষ্টি আছে।' যতবার আমি বাইরে থেকে ঘরে ঢুকেছি ততবার সম্ভাষণ ছিল, 'তুমি অনেক কষ্ট করে এসেছ নিশ্চয়ই। আমি তোমাকে এক কাপ চা করে দিই?' আবার ওরাই বাইরে থেকে আমার পরে ঘরে ফিরলে ওদের কথা শুরু হতো, 'তুমি ভালো ছিলে তো? ঘরের কাজে কি ক্লান্ত লাগছে? আমি কিছু করে দেব?' এই তিন মাসে আমি একটা দিনের জন্যও তাদের কারও খুঁত নিয়ে কথা বলতে শুনিনি; কাউকে ছোট করে উপহাস করতে শুনিনি। তাদের বন্ধুরা যখন বেড়াতে আসত, তাদেরও দেখিনি পরচর্চায় মেতে উঠতে। মাঝেমধ্যে আমি ওদের গল্পের সঙ্গী হয়ে দেখেছি; এরা সারাক্ষণ মুখিয়ে থাকে কে কাকে সাহায্য করবে। কেউ এক কাপ চা এগিয়ে দিলে ধন্যবাদের বন্যা বইয়ে দেয়। ঠিক কবে তা আমারও কিছুটা অভ্যাসে পরিণত হয়েছিল বলতে পারব না। তবে আমিও সবাইকে দেখে একটা প্রশংসা করা, সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়া, পরচর্চা না করা প্রায় ধাতস্থ করে ফেলেছিলাম। ধাতস্থ যে করেছিলাম, তার প্রমাণ হলো দেশে ফিরে এসে। বিশাল বড় একটা ধাক্কা খেয়েছিলাম। স্বভাবতই দেশে ফেরার পর কাছে-দূরের সব আত্মীয় দেখা করতে এসেছিল অথবা আমিই গিয়েছি। প্রায় প্রতিবারই বেশিরভাগ আত্মীয়ের প্রথম সম্ভাষণ ছিল- 'ওমা, তুমি তো বিদেশ থেকে আরও কালো হয়ে এসেছো' অথবা 'কী ব্যাপার! বিদেশি খাবার দেখি তোমাকে মোটা বানিয়ে ছেড়েছে!' 'তোমার চোখের নিচে এত কালি কেন?' অথবা 'এত দিন পর এলে, ক'দিন পর তো আর চিনবেই না।'

আমি জানি, এসব কথার পেছনে হয়তো বা মায়া আছে কিংবা এসব বলাই সামাজিক প্রথা হয়ে গেছে। কিন্তু কেন? এই সমাজে আমরা যে যে যার যার জায়গায় লড়ছি। যার যার জায়গায় দুঃখ-সুখ মিশিয়ে প্রাণপণে ভালোভাবে বেঁচে থাকার চেষ্টা করছি। কেউ সেই চেষ্টায় অনেক বেশি দৃঢ়, কেউবা দুর্বল। কী হয়- আমরা যদি একে অপরকে ভালোবেসে এই উপহাস থেকে দূরে থাকি? টিপ্পনী কাটার বদলে যদি একটু আনন্দ বিলাই; একটু ভালো কথা, একটু আশ্বাস দিই; না চাইলে উপদেশ দেওয়া থেকে বিরত থাকি? ব্যক্তিগত প্রশ্ন করাকে অসভ্যতা ধরে নিয়ে প্রত্যেককে তার নিজের মতো থাকাকে সম্মান জানাই। আস্তিক-নাস্তিক সবাই তো মানব ধর্মকে বুকে লালন করি। তাহলে আমরা তো পারি প্রতিনিয়ত নিছক উপহাস ছেড়ে ভালোবাসার উষ্ণতা ছড়াতে।

লেখক: অধ্যাপক, ডিপার্টমেন্ট অব ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়


মন্তব্য যোগ করুণ

পরের
খবর

শততম জন্মদিনে শ্রদ্ধার্ঘ


আরও খবর

চতুরঙ্গ

জাতীয় ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য হিসেবে রাষ্ট্রপতি ও বাকশাল চেয়ারম্যান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাতে পুষ্পস্তবক তুলে দিচ্ছেন অজয় দাশগুপ্ত

  অজয় দাশগুপ্ত

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শততম জন্মদিনে জানাই শ্রদ্ধা, ভালবাসা। এ লেখার সঙ্গের ছবিটি ১৯৭৫ সালের ১০ জুন বর্তমান গণভবনে তোলা। তার মাত্র তিন আগে ৭ জুন বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ বা বাকশাল এবং তার বিভিন্ন অঙ্গ সংগঠনের কমিটি ঘোষণা করা হয়। ছাত্রদের জন্য গঠিত হয় ২১ সদস্যর কেন্দ্রীয় কমিটি, সম্পাদক শেখ শহীদুল ইসলাম। মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, নূহ-উল আলম লেনিন, ইসমত কাদির গামা, ওবায়দুল কাদের, শেখ কামাল, মাহবুব জামান, রবিউল আলম চৌধুরী, মমতাজ হোসেনসহ ২১ জনকে নিয়ে গঠিত কেন্দ্রীয় কমিটির আমিও সদস্য ছিলাম। আমি তখন জগন্নাথ হল ছাত্র সংসদের জিএস, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সিনেটে ছাত্র প্রতিনিধি এবং জয়ধ্বনি পত্রিকার সম্পাদক। আমাদের কেন্দ্রীয় কার্যালয় স্থাপিত হয় ঢাকা কলেজের বিপরীতে একটি ভবনের দোতালায়।

১০ জুন সকালে শেখ শহীদুল ইসলাম জানান, বিকেলে গণভবনে বাকশাল চেয়ারম্যান ও রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে আমরা সৌজন্য সাক্ষাতের জন্য যাব। কমিটির সদস্যদের বাইরে আমাদের সঙ্গে ছিলেন পাভেল রহমান। তিনি ১৯৭২ সাল থেকে 'জয়ধ্বনি' পত্রিকায় সৌখিন ফটোগ্রাফার হিসেবে কাজ করতেন। আমি ছিলাম সাপ্তাহিক এ পত্রিকার সম্পাদক। এক পর্যায়ে বঙ্গবন্ধু পুত্র শেখ কামালের সঙ্গে তার পরিচয় হয় এবং আবাহনী ক্রীড়াচক্রের বিভিন্ন অনুষ্ঠানের ছবিও তিনি তুলতে থাকেন। এ সুবাদে তিনি বঙ্গবন্ধুর সান্নিধ্যে আসার সুযোগলাভ করেন। কিছুদিন পর শেখ কামালের বিয়ের অনুষ্ঠান হয়। গায়ে হলুদ থেকে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের ছবি তোলেন তিনি। গণভবনে বঙ্গবন্ধুকে আমি পুস্পস্তবক তুলে দিচ্ছি, এ ছবি পাভেল রহমানও তুলেছেন। তবে এ লেখার সঙ্গে দেওয়া ছবিটি গণভবনে কর্মরত প্রধানমন্ত্রীর কোনো ফটোগ্রাফারের তোলা। ২০১৮ সালের ১৫ আগস্ট উপলক্ষে সমকালে একটি লেখা পাঠিয়েছিলেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) শরীফ আজিজ, পিএসসি। তিনি ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুর এডিসি হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ছবিতে বঙ্গবন্ধুর ঠিক পেছনে তিনি দাঁড়িয়ে। 'আমাদ্যের ব্যর্থতা' শিরোনামে তিনি একটি লেখা পাঠান, যার সঙ্গে এ ছবিটি দেওয়া হয়। ১৯৭৫ সালের ১০ জুন বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আমাদের সাক্ষাতের কোনো ছবি আমার কাছে ছিল না। পাভেল রহমান ছবি তুলেছিলেন, তবে তার কোনো কপি আমার হাতে আসেনি। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) শরীফ আজিজের লেখার সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আমার ছবি পেয়ে স্বভাবতই স্মুতিকাতর হই। ছবিতে আরও দেখা যাচ্ছে বাকশালের সেক্রেটারি জেনারেল ও প্রধানমন্ত্রী ক্যাপ্টেন মনসুর আলী (১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে তাকে হত্যা করা হয়), বাকশালের অন্যতম সম্পাদক ও পরে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান, বাকশালের অন্যতম সম্পাদক শেখ ফজলুল হক মনি এবং বাকশালের যুব সংগঠন জাতীয় যুবলীগ সম্পাদক তোফায়েল আহমদ। আমার পেছনে বঙ্গবন্ধুকে পুষ্পস্তবক দেওয়ার জন্য অপেক্ষমান রবিউল আলম চৌধুরী মুক্তাদির, বর্তমানে সংসদ সদস্য।

ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় নেতাদের নিয়ে গঠিত জাতীয় ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্যদের উদ্দেশ্যে বঙ্গবন্ধু কিছু পরামর্শ প্রদান করেন। আমাকে শেখ শহীদুল ইসলাম আগেই বলে রেখেছিলেন, বঙ্গবন্ধুর বক্তব্যের নোট নিতে। ছাত্র জীবনেই জনপ্রিয় সাপ্তাহিক 'জয়ধ্বনি'-এর সম্পাদক হয়েছি। স্বভাবতই সাংবাদিকতায় ঝোঁক ছিল। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আমাদের সাক্ষাৎ পর্ব শেষ হওয়ার পর শেখ শহীদুল ইসলাম তার বক্তব্য ছাপিয়ে একটি বুকলেট করার অনুমতি চাইলেন। আমার জন্য বিস্ময়ের বিষয় ছিল বঙ্গবন্ধুর উত্তর। আমাকে দেখিয়ে তিনি বলেন, 'ওকে তো দেখলাম সব খুটিয়ে খুটিয়ে নোট নিতে। ছাপিয়ে ফেল।' বঙ্গবন্ধুর বক্তব্য কয়েকদিনের মধ্যে ছাপা হয় 'ছাত্রসমাজের প্রতি বঙ্গবন্ধু' শিরোনামে। আমি এর বিবরণ তৈরি করার পর সে সময়ে বঙ্গবন্ধুর প্রেস সেক্রেটারি তোয়াব খানকে দেখাই। বর্তমান নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার তখন বঙ্গবন্ধুর সচিবালয়ে কাজ করতেন। তিনিও এ কপি দেখেন। তোয়াব খানের একটি কথা এখনও মনে আছে- 'বঙ্গবন্ধুর প্রতিটি ভাষণ ও আলোচনার কিছু শব্দ ব্যবহার হয়। বলার একটা ঢং আছে তার। আপনি সেটা ধরতে পেরেছেন।'

এর আগেও বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আমার সাক্ষাতের সুযোগ হয়েছিল। ১৯৭২ সালের মে মাসে ছাত্র ইউনিয়ন থেকে ডাকসু ও বিভিন্ন হল সংসদে নির্বাচিত ভিপি-জিএসরা গিয়েছিলাম রমনা পার্কের পাশের 'গণভবনে' দেখা করতে। তখন কয়েকটি হলে জাসদ-ছাত্রলীগের প্যানেল জয়ী হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু আমাদের সঙ্গে কথা বলেন এবং ছাত্রসমাজের কল্যাণে কাজ করার পরামর্শ দেন। এর কিছুদিন পরেই নতুন শিক্ষানীতি প্রণয়নের জন্য ড. কুদরত-ই-খুদার নেতৃত্বে একটি কমিশন গঠিত হয়। বঙ্গবন্ধু কমিটিকে পরামর্শ দিয়েছিলেন ছাত্রনেতাদের কথা শোনার জন্য। মাহবুব জামান, কাজী আকরাম হোসেন ও আমি কমিটির নেতাদের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনায় ছাত্রদের অভিমত তুলে ধরি।

১৯৭৪ সালের প্রলয়ঙ্করী বন্যা হয়। এবং তারপর নেমে আসে দুর্ভিক্ষ। বাংলাদেশের নানা স্থানে আমরা বন্যায় ত্রাণ কাজ সংগঠিত করি। দুর্ভিক্ষের শিকার অসহায় নারী-পুরুষ দলে দলে ছুটে আসছিল ঢাকায়। তাদের জন্য রাজধানীতে অন্তত অর্ধশত লঙ্গরখানা আমরা পরিচালনা করি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মধুর ক্যান্টিনের সামনে বিভিন্ন দুর্গত এলাকায় পাঠানোর জন্য প্রতিদিন তৈরি হতে থাকে হাজার হাজার পিস আটার রুটি। রুটি বানানোর জন্য ছাত্রছাত্রীদের স্বেচ্ছাশ্রম দিতে বলা হয় এবং তাতে সাড়া মেলে ব্যাপক। লঙ্গরখানা ও মধুর ক্যান্টিনে রুটি বানানোর জন্য আমাদের কাছে প্রয়োজনীয় আটা সরবরাহ করা হয় সরকারি গুদাম থেকে। এর ব্যবস্থা করেছিলেন বঙ্গবন্ধু। এ সব কাজের সমন্বয়সাধনের জন্য আমি এবং ডাকসুর তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক মাহবুবজামান প্রতিদিন সন্ধ্যায় ঢাকা জেলার প্রশাসক রেজাউল হায়াতের সঙ্গে বৈঠক করতাম।

বন্যায় ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছিল। সামনে বোরো মৌসুম। অথচ কৃষকের হাতে বীজ নেই, চারা নেই। ডাকসুর পক্ষ থেকে তখন সোহরাওয়ার্দি উদ্যানে বোরো ধন ক্ষেতের জন্য বীজতলা করা হয়। শত শত ছাত্রছাত্রী রাতদিন পরিশ্রম করে। বঙ্গবন্ধুও এ কাজে উৎসাহ দেন। এক রাতে তিনি গোপনে এ ধানের চারা উৎপাদনের আয়োজন দেখে গেছেন, সেটা জানতে পারি তার ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সহকর্মী মহিউদ্দিন আহমদের কাছ থেকে।

বন্যা ত্রাণ, লঙ্গরখানা পরিচালনা ও ধানের বীজতলার কাজে যুক্ত স্বেচ্ছাসেবকদের একদিন বঙ্গবন্ধু ডেকে পাঠান গণভবনে। তিনি তখন বলেন, ছাত্ররা পড়াশোনা করবে। পাশাপাশি দাঁড়াবে দেশ গড়ার জন্য। দুঃখী মানুষের পাশেও তাদের দাঁড়াতে হবে। সে সময়ে আমাদের স্লোগান ছিল, মানুষ বাঁচাও দেশ বাঁচাও। তিনি সেটা পছন্দ করেছিলেন। আমাদের তিনি বলেন, আমি ভুল করলে তোমরা প্রতিবাদ করবে। এতে আপত্তি নেই। কিন্তু তোমাদের নতুন ধারায় ছাত্র আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। কেবল স্লোগান দিয়ে সোনার বাংলা হবে না।

জাতীয় ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটি কাজ করতে পারে ২ মাস ৭ দিন- ১৯৭৫ সালের ৭ জুন থেকে ১৪ আগস্ট পর্যন্ত। একক ছাত্র সংগঠন হিসেবে আমরা বঙ্গবন্ধুর পরামর্শ মেনে কাজ করতে থাকি। জাতীয় ছাত্রলীগের উদ্যোগে একটি বড় কাজ ছিল ১৯৭৫ সালের ১ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দিবস উদযাপন। ওই দিন প্রতিটি বিভাগের ছাত্রছাত্রীরা নিজ নিজ বিভাগে শিক্ষকদের ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানায়। তারপর প্রতিটি বিভাগের ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক ও কর্মচারীদের মিছিল শুরু হয়ে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, জগন্নাথ হলের গণকবর ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদ সংলগ্ন মুক্তিযুদ্ধে শহীদ শিক্ষকদের কবরের পাশে শেস হয়। আমরা নতুন ক্যাম্পাস গড়ে তুলব- এটাই ছিল শপথ।

১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু ঢাকা বিশ্বপরিদর্শনে এসে আমাদের আরও দিকনির্দেশনা দেবেন, এটাই ছিল প্রত্যাশা। যে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম বাংলাদেশের পতাকা তোলা হয় তার শিক্ষার্থীরা নতুন করে শপথ-সংকল্প গ্রহণ করবে উন্নত-সমৃদ্ধ-গর্বিত বাংলাদেশ গঠনের জন্য- আমরা এ লক্ষ্যে কাজ করতে শুরু করি। কিন্তু হিংস্র হায়েনার দল বঙ্গবন্ধুকে আমাদের মাঝ থেকে কেড়ে নেয়। তাদের দুঃশাসন আমাদের জাতীয় জীবন থেকে দীর্ঘ দুই দশকের বেশি সময় অন্ধকার গহ্বরে ফেলে রাখে। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ ঘুড়ে দাঁড়াতে সক্ষম হই। এর পেছনেও কিন্তু ছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রেরণা-উৎসাহ।

শততম জন্মদিনে, জন্মশতবর্ষের যাত্রার শুভদিনে তার প্রতি জানাই প্রণতি।

লেখক: উপসম্পাদক, সমকাল

১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঘোষিত একক ছাত্র সংগঠন জাতীয় ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য

সংশ্লিষ্ট খবর

পরের
খবর

ক্রাইস্টচার্চ হত্যাকাণ্ড: জয় হোক শুভবুদ্ধির


আরও খবর

চতুরঙ্গ

  ফাতিহুল কাদির সম্রাট

নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চ শহরের দুটো মসজিদে সন্ত্রাসী হামলায় ৪৯ জন মুসল্লির প্রাণহানিতে বিশ্ববিবেক স্তম্ভিত। প্রাথমিক খবরে অন্তত তিনজন বাংলাদেশির মৃত্যু নিশ্চিত হওয়া গেছে। আরো ৮ জন বাংলাদেশি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন বলে খবরে প্রকাশ। নিখোঁজ আছেন আরও কয়েকজন বাংলাদেশি।

এই নারকীয় হত্যাযজ্ঞে বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষ মর্মাহত ও ব্যথিত। এর মধ্যে আমাদের জন্যে একটা স্বস্তির খবরও আছে। মাত্র পাঁচ মিনিটের জন্যে বাংলাদেশ জাতীয় দলের ক্রিকেটাররা প্রাণে বেঁচে গেছেন। ১৬ মার্চ তৃতীয় টেস্ট ম্যাচটি শুরু হওয়ার কথা ছিল ক্রাইস্টচার্চের হাগলি ওভাল মাঠে। সেজন্যে ক্রিকেটাররা সেখানেই অবস্থান করছিলেন।ক্রাইস্টচার্চ শহরের প্রধান মসজিদ আল নূর মসজিদেই জুমার নামাজ পড়ার কথা ছিল তাদের, যেটি ছিল সন্ত্রাসী হামলার মূল লক্ষ্য।প্রেস ব্রিফিংয়ের কারণে ক্রিকেটারদের মসজিদে যেতে একটু বিলম্ব হয়। তামিম-মিরাজরা মসজিদের কাছে টিম বাস থেকে যখন নামেন তখন ভেতরে গুলি চলছিল। এক নারী তাদের সাবধান করে দেওয়ার কারণে তারা নিরাপদ দূরত্বে চলে যান। ভাগ্যের জোরে ক্রিকেটাররা শুধু বেঁচে যাননি, বেঁচে গেছে বাংলাদেশের ক্রিকেটও। খারাপ খবরের মধ্যে আমাদের জন্যে ভালো খবর এটি। 

প্রাথমিকভাবে পুলিশ বলেছে, হামলাকারীরা ছিল চারজন। তাদের মধ্যে একজন নারী। চারজন সন্ত্রাসীর মধ্যে মূল হামলাকারী নিজের নাম বলেছেন ব্রেন্টন ট্যারেন্ট। তিনি অস্ট্রেলিয়ার গ্রাফটন এলাকার অধিবাসী, বয়স ২৮ বছর। তিনি নিজেকে শ্বেতাঙ্গবাদী বলে পরিচয় দিয়ে অনলাইনে ৭৩ পৃষ্ঠার একটি ম্যানিফেস্টো প্রচার করেছেন। হেলমেটে বসানো মাইক্রো ক্যামেরার মাধ্যমে তিনি হামলার দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লাইভ সম্প্রচার করেছেন। আল নূর মসজিদে হত্যাযজ্ঞ চালানোর পর তিনি কাছাকাছি লিনউড মসজিদে যান এবং সেখানেও নামাজরত মুসল্লিদের ওপর হত্যালীলা চালান। 

ট্যারেন্টের ম্যানিফেস্টো থেকে জানা যায়, তিনি উগ্র শ্বেতাঙ্গবাদী। অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড প্রভৃতি দেশে অশ্বেতাঙ্গ মানুষের অভিবাসন নিয়ে তিনি ক্ষুব্ধ। তিনি চান, তাদের ভূমিতে কেবল তাদের নিজেদেরই অধিকার সুরক্ষিত থাকবে। অশ্বেতাঙ্গ মানুষদের প্রতি তার তীব্র ঘৃণা। সাম্প্রতিককালে ইউরোপে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠা উগ্র জাতীয়তাবাদী চেতনার বিকাশ অস্ট্রেলেশিয়াতেও যে ছড়িয়ে পড়েছে এই ঘটনা তারই প্রমাণ।

হামলাকারীর বন্দুকের নলে লেখা ছিল “To take revenge for Ebba Akerlund"। অর্থাৎ এবা আকেরলান্ড-এর হত্যার প্রতিশোধের জন্যে এই হামলা। কে এই এবা আকেরলান্ড? স্মর্তব্য, ২০১৭ সালের ৭ এপ্রিল সুইডেনের রাজধানী স্টকহোমের কুইন স্ট্রিটে পথচারীদের ওপর ট্রাক তুলে দেয় উজবেকিস্তান থেকে আসা এক আশ্রয়প্রার্থী। তার নাম রাখমত আকিলভ, বয়স ৩৯। এই হামলায় নিহত হয়েছিল ৮ নিরীহ পথচারী, আহত হয়েছিল ১৪ জন।নিহতদের মধ্যে ছিল ১১বছর বয়সী এবা আকেরলান্ড নামের ১১ বছরের এক শ্রবণপ্রতিবন্ধী মেয়ে শিশু। সে স্কুল থেকে মায়ের সাথে ফিরছিল।মায়ের সাথে তাকেও ট্রাকের চাকার নিচে পিষে মরতে হয়েছিল। ১৪ মার্চ ছিল মেয়েটির জন্মদিন। সেই হত্যার প্রতিশোধ নিতেই এবা আকেরলান্ডের জন্মদিনকেই বেছে নেন ব্রেন্টন ট্যারেন্ট ও তার সহযোগীরা।

ইউরোপে আশ্রয়প্রার্থী অভিবাসী কর্তৃক ট্রাক হামলার আরো ভয়াবহ ঘটনা আছে।২০১৬ সালের ১৯ ডিসেম্বর জার্মানির বার্লিন শহরের বড়দিন উপলক্ষে জমজমাট এক মার্কেটে ট্রাক নিয়ে ঢুকে পড়েন আনিস আমরি নামের তিউনিশিয়ান এক ব্যক্তি। তিনি জার্মানিতে আশ্রয় প্রার্থনা করে প্রত্যাখ্যাত হন। ইসলামিক স্টেট (আইএস) এই হামলার দায় স্বীকার করে। তবে সবচেয়ে ভয়াবহ ট্রাক হামলাটি হয় ফ্রান্সের নিস শহরে ২০১৬ সালের ১৪ জুলাই। ফ্রান্সে বসবাসকারী তিউনিশিয়ান বংশোদ্ভূত মোহামেদ লাহুইস বুহলেল নামের এক ব্যক্তি ১৯ টনি একটি ট্রাক ছিনতাই করে বাস্তিল দিবস উদযাপনরত মানুষের ওপর দ্রুত গতিতে চালিয়ে দেন। এতে ৮৬ জনের মৃত্যু হয়, আহত হয় আরো ৪৯৮ জন। ফরাসি সরকারি দেশহজুড়ে জরুরি অবস্থা জারি করে। জরুরি অবস্থার মধ্যেই ২০১৬ সালের ১৩ নভেম্বর ফ্রান্সে একই সাথে তিনটি আত্মঘাতী বোমা হামলা হয়। এতে ১৩০ জন মানুষ নিহত হয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইউরোপের লন্ডন, মাদ্রিদসহ বেশ কয়েকটি শহরে সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা ঘটেছে। এসব হামলার বেশির ভাগ ক্ষেত্রে কোনো না কোনোভাবে মুসলমান এবং আইএস-এর সম্পৃক্ততা প্রমাণিত হয়েছে।

আরব বসন্তের পর মুসলিম অধ্যুষিত আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ যেমন তিউনিশিয়া, লিবিয়া, সিরিয়া, ইরাক প্রভৃতি থেকে শরণার্থীদের ঢেউ নামে ইউরোপে। বিশেষ করে জার্মানি, হাঙ্গেরি, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স ও ইতালিতে শরণার্থী সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করেছে। এর মধ্যে জার্মানি বিপুল সংখ্যক শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়ে মানবিকতার অনন্য নজির স্থাপন করেছে। শরণার্থীদের এই ভিড় ইউরোপের আর্থসামাজিক ক্ষেত্রে বেশ কিছু সমস্যার সৃষ্টি যে করেছে তা অস্বীকার করার উপায় নেই। ইউরোপে মুসলিম জনসংখ্যার বৃদ্ধি ঘটছে অতি দ্রুত। পরিসংখ্যানবিদরা বলছেন, আগামী পঞ্চাশ বছরে জার্মানি, ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সে মুসলিমরা হয়ে উঠবে সংখ্যাগরিষ্ঠ। স্পেন, ইতালি, সুইডেন ও অস্ট্রেলিয়াতেও মুসলিম জনসংখ্যা বাড়ছে। ফলে গোঁড়া খ্রিস্টান ও শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদীদের মধ্যে ক্ষোভ ও অস্বস্তি সৃষ্টি হয়েছে। তারা স্বভূমে স্বকীয় অস্তিত্ব ধরে রাখতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। নিউজিল্যান্ডে সর্বশেষ সন্ত্রাসী হামলা এই ক্ষোভ ও অস্বস্তির অসহিষ্ণু প্রকাশ মাত্র।

মুসলিম কর্তৃক যেকোনো সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডকে ধর্মীয় রং দিতে কার্পণ্য করে না পশ্চিমা মিডিয়া। ব্যক্তিক অপরাধকে সম্প্রদায়ের ওপর চাপানোর প্রবণতাও লক্ষ্যযোগ্য। এই একই প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে ক্রাইস্টচার্চ হামলার পর মুসলমানদের প্রতিক্রিয়াতেও। এর কোনোটাই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। অপরাধী ও সন্ত্রাসীর কোনো ধর্ম নেই। নিরীহ মানুষকে হত্যা পৃথিবীর কোনো ধর্মেই স্বীকৃত নয়। অনেকে এই হামলাকে খ্রিস্টান জঙ্গিবাদ হিসেবে প্রমাণের চেষ্টা করবেন। এর পেছনে কারণও আছে। হত্যাকাণ্ডটি ঘটেছে পবিত্র মসজিদে। হত্যাকারী ধর্মে খ্রিস্টান। নামাজরত অবস্থায় মারা যাওয়া মুসল্লিদের মধ্যে নারী ও শিশুও রয়েছে। কাজেই মুসলমানদের ধর্মীয় অনুভূতি ও বোধে আঘাত লাগাটাই স্বাভাবিক। কিন্তু ঘটনাকে ধর্মীয় রূপ দেওয়া শুভ চিন্তার পরিচায়ক হবে না। এতে ধর্মীয় সহিষ্ণুতা বিনষ্ট হবে। যদি ঘটনায় সম্পৃক্ত ব্যক্তিরা ধর্মীয় সেন্টিমেন্ট দ্বারা চালিতও হয়ে থাকেন, তবু তাকে গোটা খ্রিস্টান ধর্মীয় অনুসারীদের কাজ হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। যেমনটা কোনো মুসলিমের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডকে ইসলামের আদর্শ ও মুসলমান সম্প্রদায়ের কাজ হিসেবে দেখতে আমরা প্রস্তুত নই, তেমনিভাবে এই ঘটনাকে গ্রহণ করতে হবে ব্যক্তি বা গোষ্ঠীবিশেষের ঘৃণ্য কাজ হিসেবে। আমাদের সমাজে খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের নিরাপত্তা, সম্মান ও অধিকারের প্রতি সবাইকে সচেতন থাকতে হবে।

ঘটনার পর নিউজিল্যান্ডের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে অনেকে কটু মন্তব্য করছেন। একটি মসজিদে হামলা চালানোর পর গাড়িতে বন্দুক উঁচিয়ে ১০ মিনিট পথ পাড়ি দিয়ে আরেকটি মসজিদে হামলার পর হত্যাকারীরা পুলিশের সামনে পড়ে। এমনটা বাংলাদেশে ঘটা অসম্ভব। তাই বলে যে নিউজিল্যান্ড বাংলাদেশের চেয়েও অনিরাপদ দেশ এমনটা বলা যৌক্তিক হবে না। আমাদের মনে রাখতে হবে, বিশ্বের দুর্নীতিমুক্ত রাষ্টের তালিকায় নিউজিল্যান্ডের অবস্থান ডেনমার্কের সাথে প্রথম। বিশ্বের সবচেয়ে নিরাপদ রাষ্টের সূচকে দেশটি আছে দুই নম্বরে। আর সবচেয়ে শান্তিপূর্ণ দেশের তালিকায় নিউজিল্যান্ডের স্থান আইসল্যান্ডের পরেই। কাজেই একটি ঘটনা দিয়ে একটি দেশ ও জাতিকে মূল্যায়ন করা সুবুদ্ধির পরিচায়ক হতে পারে না।

নিউজিল্যান্ডে অপরাধপ্রবণতা বিরল। মানুষ রাতে ঘরের দরোজা দিয়ে ঘুমানোর প্রয়োজনও অনুভব করে না সেদেশে। কাজেই সে দেশের পুলিশকে আমাদের দেশের পুলিশের মতো সদা সতর্ক থাকতে হয় না। নিউজিল্যান্ড পুলিশের শতকরা ৭৫ ভাগ হলো কনস্টেবল। তাদের কারো হাতেই কোনো আগ্নেয়াস্ত্র নেই। এমনকি আত্মরক্ষার মতো কোনো অস্ত্রও নেই। অফিসারদের হাতে আগ্নেয়াস্ত্র রাখার অনুমতি আছে। মজার বিষয় হলো, তাদের প্রধান অস্ত্র হলো মরিচগুঁড়ার স্প্রে। আর আছে পিস্তল। কাজেই এমন দুর্ধর্ষ ঘটনায় পুলিশের তাৎক্ষণিক রেসপন্স করা বা অ্যাকশনে যাওয়া সম্ভব ছিল না। এই ঘটনার পর নিউজিল্যান্ড পুলিশ আরো তৎপর ও সশস্ত্র হবে বলে বিশ্বাস করার কারণ আছে।

ঘটনার পর নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জাসিন্ডা আরডার্ন গণমাধ্যমের সাথে কথা বলার সময় ঘটনার দিনটিকে নিউজিল্যান্ডের ইতিহাসে একটি কালো দিবস হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তিনি নিউজিল্যান্ড রাষ্ট্রের অসাম্প্রদায়িক ও মানবিক চরিত্র অক্ষুণ্ণ রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। ঘটনায় তিনি গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচারের প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছেন। প্রতিবেশী অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী স্কট মরিসনও শোক প্রকাশ করে তদন্তে সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন। তাদের কথার ওপর আমাদের আস্থা রাখতে হবে। ধর্মীয় ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় সবাইকে হতে হবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

জয় হোক শুভবুদ্ধির।


লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, বাংলা, লক্ষ্মীপুর সরকারি কলেজ, লক্ষ্মীপুর

পরের
খবর

নিবিড় নজরদারিও রুখতে পারেনি অনন্য উত্থান


আরও খবর

চতুরঙ্গ

  অজয় দাশগুপ্ত

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্ম ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ। আর কয়েকদিন পরেই (২০১৯, ১৭ মার্চ) তিনি শতবর্ষে পা দেবেন। ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্মের ৭ মাসের মধ্যেই (১৯৪৮, ১১ মার্চ) তিনি বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে হরতাল পালন করতে গিয়ে জেলে গেলেন। তখন তার বয়স ২৮ বছরও পূর্ণ হয়নি। অথচ সদ্যোজাত পাকিস্তান রাষ্ট্রের গোয়েন্দা বিভাগ বা ইন্টেলিজেন্স ব্রাঞ্চ তার ওপর কঠোর নজরদারি শুরুর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। প্রতিদিন শুধু নয়, কখনও কখনও প্রতি মুহূর্তের গতিবিধির ওপর চলত নজরদারি। তরুণ এক মুসলিম লীগ কর্মীকে কেন তাদের এত ভয়? তিনি তো মুসলিম লীগের কোনো নেতা ছিলেন না। ব্রিটিশ আমলে কলিকাতাকেন্দ্রিক যে রাজনীতি ছিল, তাতে সক্রিয় ছিলেন। মুসলিম লীগের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগেরও নেতা ছিলেন। তিনি পাকিস্তান হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত বাংলা প্রদেশের (পশ্চিমবঙ্গসহ) মুখ্যমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর অনুসারী ছিলেন। এ কারণে পাকিস্তান হওয়ার পর পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন এবং তার সরকারের প্রতি অনুগত মুসলিম লীগের সব নেতা তার ওপর রুষ্ট ছিলেন। তারা সম্ভবত কলিকাতার অভিজ্ঞতা থেকেই বুঝতে পেরেছিলেন, 'এ চ্যাতা পোলা' (ফরিদপুর-বরিশাল অঞ্চলে সাহসী-উদ্যমী তরুণদের এভাবে বলা হয়)। যে কোনো সময় ভয়ঙ্কর বিপদ হয়ে উঠতে পারেন। তাই প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকেও কাজে লাগানো হয় তার ওপর নজরদারির জন্য।

এ নজরদারি কতটা নিবিড় ছিল, সেটা আমরা জানতে পারি বঙ্গবন্ধুর ওপর গোয়েন্দা দপ্তর যে নজরদারি করেছে, তার প্রতিবেদনে। বাংলাদেশ পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগকে ধন্যবাদ যে, তারা ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জনের পর যখন আওয়ামী লীগ সরকার গঠিত হয় এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন, তখন এগুলো ধ্বংস করে ফেলেননি। প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ যে, তিনি পুলিশ বিভাগের আন্তরিক সহযোগিতা নিয়ে আমাদের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের বিভিন্ন দলিল দেশবাসী ও বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরেছেন। উইকিলিকস যেসব গোপন দলিল ফাঁস করেছে, সেটা নিয়ে বাংলাদেশে প্রচুর আলোচনা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন সরকারি গোপন দলিল বিভিন্ন সময়ে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করার রেওয়াজ আছে। এসব দলিলে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট হত্যাকাণ্ড এবং এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ সময়ের তথ্য মেলে। বাংলাদেশে এসব দলিলের তথ্য নিয়ে আলোচনাও হয়। তবে বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ্য করি, বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে গোয়েন্দা বিভাগের যে দুটি দলিল প্রকাশিত হয়েছে, তা নিয়ে আলোচনা এখনও তেমন নজরে আসেনি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জানিয়েছেন, পর্যায়ক্রমে সব গোয়েন্দা রিপোর্ট প্রকাশ করা হবে। প্রথম দুটি খণ্ডে রয়েছে ১৯৪৮ থেকে ১৯৫২ সাল পর্যন্ত তথ্য। এ সময়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি রাজনৈতিক ঘটনা ছিল ভাষা আন্দোলন ও আওয়ামী লীগ গঠন। গোয়েন্দা প্রতিবেদনে এ সময়ে বঙ্গবন্ধুর ভূমিকা আমরা বিশেষভাবে অবহিত হই।

এ সময়ের ঘটনাবলি আমরা আরও দুটি গ্রন্থ থেকে জানতে পারি- শেখ মুজিবুর রহমানের নিজের লেখা 'অসমাপ্ত আত্মজীবনী' ও 'কারাগারের রোজনামচা'। অপার বিস্ময়ের যে, গোয়েন্দারা এ সময়ের বিভিন্ন ঘটনা যেভাবে উল্লেখ করেছেন এবং বঙ্গবন্ধু যেভাবে তার বইয়ে উল্লেখ করেছেন, তার মধ্যে অসম্ভব মিল। বলা যায়, পাকিস্তানের গোয়েন্দারা তাদের 'লক্ষ্যবস্তুকে' ভালোভাবেই নজরদারি করতে পেরেছেন। এটি অবশ্যই পেশাগত দক্ষতার পরিচয় বহন করে।

আরেকটি বিষয় বলতে চাই- বঙ্গবন্ধুর লেখার সাহিত্য গুণমান। তিনি অনলবর্ষী বক্তা; কিন্তু একই সঙ্গে বলতেন সাধারণ মানুষের ভাষায়। ৭ মার্চ, ১৯৭১ তারিখের ভাষণ তার শ্রেষ্ঠ নজির। কিন্তু তিনি যে এত সুন্দরভাবে সাহিত্যের ভাষা রপ্ত করেছেন, সেটা এ গ্রন্থ দুটি পাঠ করার আগে খুব বেশি মানুষের জানা ছিল বলে মনে হয় না। 'সাত দশকের হরতাল ও বাংলাদেশের রাজনীতি' বইটি রচনা করতে গিয়ে আমি ১৯৪৭ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত প্রায় প্রতিদিনের কোনো না কোনো সংবাদপত্র পাঠ করেছি। এর মধ্যে পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে বিভিন্ন সময়ে আওয়ামী লীগের তরুণ নেতা হিসেবে শেখ মুজিবুর রহমানের বিভিন্ন বিবৃতি পাঠ করার সময় মনে হয়েছে- এত সহজ করে বলা যায়! লেখা ও বলায় সমান দক্ষ ছিলেন তিনি, যে গুণ আমাদের দেশের অন্য কোনো রাজনৈতিক নেতার মধ্যে আদৌ ছিল না কিংবা এখনও নেই। প্রকৃতই তিনি ছিলেন সম্মোহনী ক্ষমতাসম্পন্ন বা ক্যারিশম্যাটিক নেতা।

এ দুটি গ্রন্থ তিনি লিখেছেন ১৯৬৬ থেকে ১৯৬৮ সালের মধ্যে। 'অসমাপ্ত আত্মজীবনী' গ্রন্থ থেকে আমরা জানতে পারি, ১৯৪৬ সালে দিল্লিতে মুসলিম লীগের কনভেনশন শেষে তিনি আগ্রার তাজমহল দেখতে যান। তিনি লিখেছেন, 'চাঁদ অন্ধকার ভেদ করে এগিয়ে আসছে আর সাথে সাথে তাজ যেন ঘোমটা ফেলে দিয়ে নতুন রূপ ধারণ করছে। কী অপূর্ব দেখতে! আজও একুশ বৎসর পরে লিখতে গিয়ে তাজের রূপকে ভুলি নাই, আর ভুলতে পারব না।' [পৃষ্ঠা ৫৯]

১৯৪৬ থেকে ২১ বছর- ১৯৬৭ বৈকি। তখন তিনি ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি। পাকিস্তানের দোর্দণ্ড প্রতাপশালী প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের সরকার তার বিরুদ্ধে পাকিস্তান ভেঙে বাংলাদেশ গঠনের চেষ্টার অভিযোগে রাষ্ট্রদ্রোহের আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দিয়েছে। এ মামলায় অভিযুক্ত কয়েকজনের কাছে শুনেছি, তারা এবং তাদের কাছের-দূরের অনেকে ধরেই নিয়েছিলেন 'ফাঁসি নিশ্চিত'। আর এ মামলার এক নম্বর অভিযুক্ত শেখ মুজিবুর রহমান তখন স্ত্রী রেনুর অনুরোধে তারই দেওয়া ডায়েরিতে রাজনীতি, সমাজ জীবন, পরিবার, ভারতবর্ষের বিভাজন, সাম্প্রদায়িক উন্মাদনা- কত কিছুই না লিখে রাখছেন। তাজমহলের কথা লিখতে গিয়ে তার নিশ্চয়ই প্রিয়তমা স্ত্রীর কথা বিশেষভাবে মনে এসেছিল। এ গ্রন্থেরই আরেক স্থানে লিখেছেন, 'আব্বাসউদ্দিন সাহেব যখন ভাটিয়ালি গান আস্তে আস্তে গাইতেছিলেন তখন মনে হচ্ছিল, 'নদীর ঢেউগুলিও যেন তাঁর গান শুনছে।' [পৃষ্ঠা-১১১]

আরেক স্থানে লিখেছেন, 'জেলখানায় আমি ফুলের বাগান করতাম। তাদের (আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক শামসুল হক ও তার সদ্য বিবাহিত স্ত্রী আফিয়া খাতুন) দেখা হবার দিনে (জেলগেটে পরিবারের সদস্যদের সাক্ষাতের সময়) ফুল তুলে হয় ফুলের মালা, না হয় তোড়া বানিয়ে দিতাম।' [পৃষ্ঠা- ১৬৯]

এত মানবিক! এমন না হলে যে জাতির পিতা হওয়া যায় না! এ গ্রন্থের ১৭৪ পৃষ্ঠায় তিনি লিখেছেন, "শামসুল হক সাহেব দুয়েকদিন আমার ওপর রাগের মাথায় বলেন, 'আমাকে না ছাড়লে বন্ড দিয়ে চলে যাব। তোমার ও ভাসানীর পাগলামির জন্য জেল খাটব নাকি?"

কিন্তু নিজের মুক্তির বিষয়ে বঙ্গবন্ধুর অবস্থান কী ছিল? ১৯৫১ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর এস.আই.এসবি এন হোসেন তার রিপোর্টে লিখেছেন, আদেশ পেয়ে আমি ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে নিরাপত্তাবন্দি শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে দেখা করি। কিন্তু 'He is not willing to furnish any bond for his release. His attitude appears to be stiff.' [সিক্রেট ডকুমেন্ট, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃ :৮৬]

বরিশাল-ফরিদপুরের আঞ্চলিক ভাষায় কেউ হয়তো স্বগতোক্তি করবেন- 'ব্যাটা একখান!'

১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের সময়ের কথা তিনি লিখেছেন এভাবে- 'আমি হাসপাতালে (ঢাকা মেডিকেল কলেজ) আছি। সন্ধ্যায় মোহাম্মদ তোয়াহা ও অলি আহাদ দেখা করতে আসে। আমার কেবিনের একটা জানালা ছিল ওয়ার্ডের দিকে।... বললাম আরও কয়েকজন ছাত্রলীগ নেতাকে খবর দিতে।... খবর পেয়েছি, আমাকে শীঘ্রই আবার জেলে পাঠিয়ে দেবে, কারণ আমি নাকি হাসপাতালে বসে রাজনীতি করছি।' [পৃষ্ঠা. ১৯৬-১৯৭]

তিনি লিখেছেন, 'সেখানেই ঠিক হল আগামী ২১শে ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষা দিবস পালন করা হবে।... আমিও আমার মুক্তি দাবি করে ১৬ ফেব্রুয়ারি থেকে অনশন ধর্মঘট শুরু করব।'

সে সময়ের গোয়েন্দা রিপোর্ট এ বিষয়ে কী বলছে? ১৯৫২ সালের ১ জানুয়ারি এম জাফর তার গোপন প্রতিবেদনে লিখেছেন, নিরাপত্তাবন্দি শেখ মুজিবুর রহমানকে চিকিৎসার জন্য ঢাকা আনা হয়েছে। কিন্তু 'He is taking undue advantage of his coming to Dacca in furtherance of his political activity. This is indeed misuse of a favour.' [সিক্রেট ডকুমেন্ট, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃ :১৩৭]

১৯৫২ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি আইবির এস আই এ আজিজ তার গোপন প্রতিবেদনে লিখেছেন, 'Hunger Strike of Sheikh Mujibar Rahman and Mahiuddin' শিরোনামের লিফলেট ঢাকা শহরের বিভিন্ন স্থানে বিতরণ করা হয়েছে।'

১৯৪৯ সালের ২৩ জুন ঢাকায় আওয়ামী লীগ গঠন করা হয়। তখনও তিনি রাজবন্দি। কমিটির সভাপতি মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। সাধারণ সম্পাদক শামসুল হক। যুগ্ম সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমান। বয়স তখন কেবলই ২৯ বছর। এ বছরের শেষ দিকে ভাসানী সাহেব তাকে বললেন, 'পাকিস্তান যেতে হবে। সোহরাওয়ার্দী সাহেব লাহোর আছেন। ... তাদের বল, একটা নিখিল পাকিস্তানভিত্তিক পার্টি হওয়া দরকার।... সোহরাওয়ার্দী সাহেব ছাড়া আর কেউ এর নেতৃত্ব দিতে পারবে না।' [অসমাপ্ত আত্মজীবনী পৃ :১৩৫]। এই পৃষ্ঠায় তিনি লিখেছেন, 'কি করে লাহোর যাব বুঝতে পারছি না। আমার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা ঝুলছে। খুঁজে বেড়াচ্ছে পুলিশ। ...তাছাড়া যেতে হবে ভারত হয়ে, পূর্ব পাঞ্জাবে মুসলমান পেলেই হত্যা করে।' কিন্তু ভাসানী সাহেব বললেন, 'তা আমি কি জানি! যেভাবে পার লাহোর যাও।'

হ্যাঁ, তিনি গেলেন। লাহোরে তখন ভীষণ শীত। ১৩৭ পৃষ্ঠায় তিনি লিখেছেন, 'রাতে আমার ভীষণ জ্বর হল।' গোয়েন্দা রিপোর্টের প্রথম খণ্ডের ২৯৪ পৃষ্ঠা থেকে আমরা জানতে পারি, ঢাকা থেকে করাচি গোয়েন্দা দপ্তরের টেলিগ্রাম গেছে, 'শেখ মুজিবুর রহমান ১৫ অক্টোবর রাতে লাহোরের পথে কলিকাতা রওনা হয়েছেন। তিনি লাহোরে সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করবেন। তার ওপর নজর রাখার জন্য পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।'

১৯৪৯ সালের ২১ অক্টোবর ঢাকার ডিআইবির সুপারিশ 'পূর্ব বাংলায় ফিরলেই যেন তাকে গ্রেফতার করা হয়।' [প্রথম খণ্ড, পৃ. : ২৯৬]

এ গ্রন্থ থেকেই আমরা জানিতে পারি, পশ্চিম পাঞ্জাবের সিআইডি তাদের ১৯৪৯ সালের নভেম্বর মাসের গোপন প্রতিবেদনে বলেছে, শেখ মুজিব ৩০ অক্টোবর দিল্লি থেকে লাহোর আসেন। ... তিনি ৩-৪ দিন জ্বরে ভোগার কারণে কোনো কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে পারেননি।' [পৃ :৩০৫]

ওই সময়ে বঙ্গবন্ধু যাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন, প্রায় সব তথ্য হাতে এসেছিল পশ্চিম পাকিস্তানের গোয়েন্দাদের। তাকে ছায়ার মতো অনুসরণ করা হয়েছিল। ১৯৪৯ সালের ২১ নভেম্বর বঙ্গবন্ধুর সেখানে অবস্থানকালে যেসব কর্মকাণ্ড করেছেন, সে বিষয়ে পশ্চিম পাঞ্জাব থেকে ঢাকার ডিআইজি ইন্টেলিজেন্সকে বিশদ জানানো হয়। এ সংক্রান্ত প্রতিবেদনের সঙ্গে অসমাপ্ত আত্মজীবনীর ১৩৬ থেকে ১৪৪ পৃষ্ঠা পর্যন্ত বিবরণের প্রায় হুবহু মিল। পাকিস্তানের গোয়েন্দাদের দক্ষতার আবারও প্রশংসা করছি। তবে বঙ্গবন্ধু নিজেই বিভিন্ন সময়ে বলেছেন, তিনি গোপন কর্মকাণ্ডে বিশ্বাস করেন না। আত্মগোপনে থেকে রাজনীতি করতে কখনও চাননি। আমাদের ভাবতে বিস্ময় লাগে যে, সে সময়ের পশ্চিম পাকিস্তানের গুরুত্বপূর্ণ অনেক রাজনীতিবিদ পাকিস্তানে সরকারবিরোধী গণতান্ত্রিক রাজনীতি সূচনা করার জন্য শেখ মুজিবুর রহমানের মতো এক তরুণ নেতাকে কতটা গুরুত্ব দিয়ে কথা বলেছেন। অসমাপ্ত আত্মজীবনী থেকে আমরা জানতে পারি, পূর্ব পাকিস্তানের পথে তিনি রওনা হয়েছেন। কিন্তু বিমান ছাড়তে দেরি হচ্ছে। এক ঘণ্টা পর বিমান ছাড়ল। তিনি লিখেছেন, 'আমি বুঝতে পারলাম, আমাকে যেতে দিবে না আটক করবে, এই নিয়ে দেরি করেছে। বোধ হয় শেষ পর্যন্ত দেখল, বাংলার ঝঞ্ঝাট পাঞ্জাবে কেন?' [পৃষ্ঠা :১৪৩]। তিনি ঢাকায় ফিরেই গ্রেফতার হয়ে গেলেন। ১৬৭ পৃষ্ঠায় তিনি লিখেছেন, 'দুই ঘণ্টা ইন্টারোগেশন চলল। লাহোর গিয়েছিলাম কিনা? কোথায় ছিলাম? কি কি করেছি?.. আমাকে নিরাপত্তা আইনে গ্রেফতার দেখাল।'

গোয়েন্দা রিপোর্টের প্রথম খণ্ডের ৩২৫-৩২৮ পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে, 'শেখ মুজিবুর রহমানকে ৩১ ডিসেম্বর গ্রেফতার করা হয়।... তিনি সোহরাওয়ার্দী ও মওলানা ভাসানীর একনিষ্ঠ সমর্থক।... তাকে নিরাপত্তা বন্দি হিসেবে আটক রাখার সুপারিশ করা হচ্ছে।'

এমন আরও শত ধরনের তথ্য আমরা গোয়েন্দা প্রতিবেদনের দুটি খণ্ডে পাই। আরও হাজারো তথ্য-খবর মিলবে পরের খণ্ডগুলোতে। বঙ্গবন্ধুর আরও যেসব লেখা-ডায়েরি প্রকাশ করার অপেক্ষায়- তার সঙ্গে মিলিয়ে দেখা যাবে এসব তথ্য। ইতিহাসের অনেক অজানা তথ্য এভাবে আলোর মুখ দেখবে। শুধু অপূর্ণতা থাকবে আমাদের- বঙ্গবন্ধু যদি আরও লেখার অবকাশ পেতেন! কেবল ইতিহাসের জন্য নয়, আমাদের বাংলা সাহিত্যও কতভাবেই না বঞ্চিত হলো!

ধিক, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের ঘাতক এবং তাদের পৃষ্ঠপোষকদের। 

লেখক: সাংবাদিক
ajoydg@gmail.com


সংশ্লিষ্ট খবর