চতুরঙ্গ

ইতিহাসের সন্ধিক্ষণে আসাম

প্রকাশ : ০৬ নভেম্বর ২০১৮ | আপডেট : ০৬ নভেম্বর ২০১৮

ইতিহাসের সন্ধিক্ষণে আসাম

তপোধীর ভট্টাচার্য

  তপোধীর ভট্টাচার্য

আজ থেকে ঠিক চার মাস আগে লিখেছিলাম- শরশয্যায় রয়েছে আসামের বাঙালি। যারা এই প্রদেশে বিরাজমান জাতিবিদ্বেষ ও হিংস্র ঘৃণার বেপরোয়া অভিব্যক্তি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল, তাদের কেউই অবাক হননি। কিন্তু উচিত বক্তা বিষবৎ। তাই যাদের আঁতে ঘা লেগেছিল, তারা দিনের পর দিন চ্যানেলে–‌চ্যানেলে বিষ ঢেলেছে। শেষ পর্যন্ত লিখিয়েকে চূড়ান্ত হেনস্থা করতে চেয়েছে। শরশয্যা যে মহাভারত থেকে নেওয়া রূপক, এই সহজ কথাটিও বুঝতে চায়নি। না বুঝুক, তাতে যে সত্য ঢাকা পড়ে না তা তো কিছুদিন পরেই স্পষ্ট হল।

এ পোড়া দেশের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা ভোটের ঢাকে কাঠি হিসেবে যখন বাপে–‌তাড়ানো, মায়ে–‌খেদানো বাঙালির জন্য বেছে নিলেন ‘‌উইপোকা’‌ আর ‘‌ঘুসপেটিয়া’‌ বিশেষণ, শরশয্যার আসল অর্থ দিনের আলোর মতো পরিষ্কার হয়ে গেল। কে মূল কীর্তনিয়া আর কে বা দোহার- এ বিষয়ে তর্কের কোনও দরকার নেই। এক ভস্ম আর ছার, দোষ–‌গুণ কব কার!‌ সবই সাম্প্রদায়িকতার রকমফের।

তবে এই মুহূর্তে সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ঘটনা পয়লা নভেম্বর অাসামের তিনসুকিয়া জেলার প্রত্যন্ত এলাকা সদিয়ার একটি গ্রামে পরিকল্পিত গণহত্যার সূচনা। নিতান্ত দিনমজুর শ্রেণির ধনঞ্জয় নমশূদ্র, সুবল বিশ্বাস, শ্যামলাল বিশ্বাস, অনন্ত বিশ্বাস ও অবিনাশ বিশ্বাসকে ঘাতকেরা ঠান্ডা মাথায় খুন করেছে।

ইতিমধ্যে আলফার (‌স্বাধীন)‌ একজন ক্যাডারকে পুলিশ ধরেছে। কিন্তু নিয়মমাফিক এ সব কথা যখন অচিরেই ভুলে যাব আমরা, বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদতেই থাকবে। এদের পক্ষে বিবৃতি অবশ্য জারি হয়েছে যে, এই পাঁচজন ‘‌‌উইপোকা’‌ বিদেশিকে ওরা মারেনি। তা হলে অসম সরকার যত‌ আশ্বাসই দিক বা আস্ফালন করুক, মারল কারা?‌ ইংরেজিতে যে ‘‌ডিপ স্টেট’‌ বলা হয়, সেই অদৃশ্য অমোঘ শক্তি এদের আততায়ী নয় তো?‌

আলফার বীরপুরুষেরা রাষ্ট্রের কাছে আত্মসমর্পণ করে ‘‌সালফা’‌ পদবি পেয়েছিল, তাদের কে কোথায় কী করছে কেউ তো সে–‌খবর রাখার কথা ভাবেনি। আসামে যখন চরম নৈরাজ্য চলছে, ঘৃণা ও বিদ্বেষের পাটিগণিতে কার ভূমিকা কীরকম, তা জানবার কি উপায় আছে কোনও?‌ আমরা, যারা সাধারণ নাগরিক, কোনওদিন বুঝতেই পারি না, রাজনৈতিক প্রক্রিয়া ও রাষ্ট্রতন্ত্রের কাছে আমজনতার দাম কানাকড়িও নয়।

তাই নরখাদক রাষ্ট্রতন্ত্রের পোয়াবারো হয় সঙ্ঘাত, বিদ্বেষ ও ঘৃণার বাতাবরণে। এনআরসির অজুহাতে আঞ্চলিক প্রভুত্ববাদকে প্রশ্রয় দিয়েছে যে বাঙালির প্রতি চিরবিদ্বেষ–‌প্রবণ, হিন্দি–‌হিন্দু–‌হিন্দুস্থান নীতির প্রবক্তা শাসকশক্তি, তাদের ক্ষমতা–‌দখলের দাবাখেলায় ওই পাঁচজন নিহত বাঙালি বোড়ে ছাড়া অন্য কিছু নয়।

তাই মৃণাল হাজারিকা, জিতেন দত্ত, অখিল গগৈ এবং তাদের প্রীতি–‌খেলার প্রতিপক্ষ সরকার বাহাদুর ইতিহাস ভুলে যাক, মহাভারত ভুলে যাক, হাতে–‌মুখে সেঁটে–‌থাকা নাছোড়বান্দা রক্তের দাগ অস্বীকার করুক- ধারাবাহিক ঘৃণা–‌বিদ্বেষ–‌গণহত্যার কলঙ্কিত বৃত্তান্ত মুছে ফেলা অসম্ভব। একতরফা আনুগত্য–‌সহ মেরুদণ্ড যদি প্রভুশক্তির কাছে সমর্পণ করে দেয়ও অসহায় ছাপোষা বাঙালি, আত্মপ্রতারণা কোন পর্যায়ে পৌঁছলে তবে ধারাবাহিক লাঞ্ছনা–‌অপমান–‌নির্যাতন ভুলে থাকা সম্ভব?‌

অর্জুন নমশূদ্র থেকে দীপক দেবনাথ পর্যন্ত যে–‌বাঙালিরা আত্মহত্যা করে এনআরসি ডি–ভোটার–‌ডিটেনশন ক্যাম্পের আতঙ্ক এড়াতে চাইলেন, গণহত্যার মিছিলের বাইরে তো নন তাঁরা। এই সভ্যতা–‌বিরোধী, মানবতা–‌বিরোধী রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের কি বিচার নেই কোনও?‌ যে–‌কথাটা লিখতে চাইছি, তা হল, এর উৎস হল সেই দাম্ভিক ঘোষণায়:‌ আসাম শুধু আসামিয়াদের জন্যে। বাঙালি–‌বোড়ো–‌কোচ–‌রাজবংশি–‌ডিমাসা–‌কার্বি–‌মণিপুরি–‌নেপালি— কোনও অনসমিয়া ভাষাগোষ্ঠীর ঠাঁই নেই এখানে। ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্টের আগে আবহমান যে–‌ভারতবর্ষের সন্ততি আমরা সবাই, যে ভাষাতেই কথা বলি না কেন এবং অখণ্ড ভারতের যে–‌খণ্ডিত অংশেই বাস করি না কেন, আমাদের কেউ বিদেশি বা বহিরাগত নয়। আমরা সবাই ভারতীয়। আমরা প্রত্যেকে অসমের ভূমিপুত্র।

অথচ সহজতম ও সবচেয়ে মৌলিক এই সত্যটি শুধুমাত্র জাতিবিদ্বেষের কুযুক্তিতে অস্বীকার করা হয়েছে। হিটলারের প্রচার–‌সচিব গোয়েবলস যেমন ভাবত, হাজারবার মিথ্যা বললেই তা সত্য হয়ে ওঠে, একই নীতিতে আঞ্চলিক প্রভুত্ববাদের প্রশ্রয়দাতা আধিপত্যবাদী আর্যাবর্ত অসমকে ‘‌উইপোকা’‌তুল্য বাঙালিদের নিশ্চিহ্ন করার পরীক্ষাগার হিসেবে ব্যবহার করছে। ভারতে কোথাও বাঙালিরা যে নিরাপদ নয়, সেই অশনি‌ সংকেত দিয়ে গেছে তিনসুকিয়ার প্রত্যন্ত গ্রামে আততায়ীর তাণ্ডব।

এই মর্মান্তিক সত্যটা আগে বুঝে নিই, ধলা সদিয়ার গণহত্যা কোনও আকস্মিক কথা নয়। এমনই চলে এসেছে সাত দশক ধরে। ১৯৫০–‌এর মার্চ–‌এপ্রিলে অসম পুলিসের যোগসাজশে বঙ্গাইগাঁও এবং বরপেটা এলাকায় তিতাপানি, বগুলামারি, বালাগাঁও ইত্যাদি গ্রামে কয়েকশো মানুষ গণহত্যার শিকার হয়েছিল। একদিকে যেমন বহু বাঙালি মুসলমান পূর্ব পাকিস্তানে চলে যান, তেমনি বেশ কিছু বাঙালি হিন্দুও প্রশাসনিক অত্যাচারের কবলে পড়েন। এই কালো ইতিহাস সবিস্তারে লেখার দরকার নেই। ১৯৬০–‌এ গৈরেশ্বরের হত্যাকাণ্ড বা ১৯৮৩–‌র ১৮ ফেব্রুয়ারি নগাঁও জেলার জাগী রোড সংলগ্ন নেলিতে ৬ ঘণ্টার গণহত্যায় তিন হাজার বাঙালি মুসলমানের প্রাণহানি শঙ্করদেব–‌আজান ‌ফকির–বিষ্ণু রাভা–‌হেমাঙ্গ বিশ্বাস–‌ভূপেন হাজারিকার অসমকে চিরদিনের মতো কলঙ্কিত করেছে। নাগরিক অধিকার রক্ষা সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট কালীপদ সেনকেতাঁরই বাড়িতে দিবালোকে ১৯৮৬ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর খুন করে উগ্র বাঙালি–‌বিদ্বেষী আততায়ী। আবার ১৯৭৯–’‌৮৩ সালের মধ্যে কৃষক নেতা ধীরেশ্বর নাথ–‌সহ ৬৫ জন বামপন্থী কর্মী নিহত হয়েছিলেন।

এই প্রেক্ষিতেই পরাভূত হয়েছে সমাজের ইতিবাচক শক্তি। নইলে কি গত তিন বছরে ধাপে ‌ধাপে জাতিবিদ্বেষ অসমের আলো–‌হাওয়া–‌রোদকে এতখানি কলুষিত করতে পারে?‌ অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় যে–‌বুদ্ধিজীবী সত্তর ও আশির দশকে প্রতিস্রোতের মূর্ত প্রতীক ছিলেন, তিনিও এই দুঃসময়ে হয়ে ওঠেন পুরোপুরি অচেনা এক পথভ্রান্ত মানুষ!‌‌ ‌বাঙালি এবং তার ভাষা–সংস্কৃতিকে একতরফা আক্রমণ করে সংখ্যাগুরু ভাষাগোষ্ঠীর কি কল্যাণ হতে পারে, নাকি হওয়া সম্ভব?‌ তা ছাড়া মানুষের এই পৃথিবীতে কেউই বিচ্ছিন্নভাবে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারে না। আমরা একে অপরের সহযোগী সত্তা। তা হলে কেন এত ঘৃণা, এত বিদ্বেষ, এত আক্রোশ?‌ গণহত্যায় প্রাণ হারাল যে পাঁচজন অসহায় বাঙালি, তাদের সঙ্গে দিন–আনা দিন–খাওয়া অসমিয়া বা বোড়ো বা নেপালি বা মণিপুরি ভাষায় কথা–বলা মানুষের তফাত কী?‌ তা হলে প্রথমে এনআরসি এবং তার পোঁ–ধরা তাৎপর্যশূন্য নাগরিকত্ব সংশোধনী বিলকে যে রাষ্ট্রযন্ত্র এবং তার তাঁবেদার ভাষিক আধিপত্যবাদ সন্ত্রাসের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করল- ইতিহাস কি ক্ষমা করবে তাদের?‌

অথচ দেখতে দেখতে আমরা আগ্নেয়গিরির শিখরে পৌঁছে গেছি আজ। কী এর পরিণাম, ভাবতেও শরীর–মন শিউরে ওঠে। অথচ এখনও বাঙালি জাতিসত্তার তাৎপর্য বোঝেনি। নইলে হিন্দু বাঙালি বা মুসলমান বাঙালির মতো কাঁঠালের আমসত্ত্ব এখনও চলে আসে আমাদের জিহ্বা ও কলমের ডগায়?‌ কবে বুঝব, বাঙালি শুধুই বাঙালি, ধর্মবিশ্বাস কখনই তার জাতিসত্তার পরিচায়ক নয়!‌ অথচ এর সুযোগ নিচ্ছে শত্রুপক্ষ। আমরা ইদানীং নতুন দ্বিজাতিতত্ত্বের আমদানিতে কিছুটা বিভ্রান্ত‌- শরণার্থী ও অনুপ্রবেশকারী। সেইজন্যে যখন ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিরোধ করার কথা, আমরা বিভাজিত হয়ে যাই। আর কতদিন এই আত্মহননের মড়ক মেনে নেব?‌ যে সর্বনাশ দেশভাগ করে দিয়েছে, তা কি চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত হয়ে থাকবে?‌ তাহলে রবীন্দ্রনাথ–নজরুল–সুনীতিকুমার–শহীদুল্লাহের মতো মহাজনেরা কী শেখালেন আমাদের?‌

না, আমি শ্মশানে বসে পুষ্পক হাসি হাসছি না। বরং লিখতে চাইছি:‌ ভাঙন পিছনে থাক, সম্মুখে নির্মাণ। তিনসুকিয়ায় ওই পৈশাচিক গণহত্যা আমাদের জড়তা দূর করুক। কে জানে, রাতের সবচেয়ে অন্ধকার প্রহরই হয়তো বা ভোরের পূর্বযাম!‌ সবকিছু যে নষ্ট হয়ে যায়নি, এর প্রমাণ সম্ভবত গতকালই পাওয়া গেল গুয়াহাটির পাণ্ডুমানিগাঁও এলাকায় গণহত্যা–বিরোধী প্রতিবাদী মিছিলে। কেননা, তাতে বিক্ষুব্ধ বাঙালির সঙ্গে পায়ে পা মিলিয়েছেন বিষণ্ণ অসমিয়া তরুণ। এরকম দৃশ্য খুব সুলভ নয় এখন;‌ তবু এই দৃশ্যেরই পুনর্জন্ম চাই। তবে দৃশ্যও প্রতারক হবে যদি সর্বত্র ব্যাপ্ত অবিশ্বাস ও অসহিষ্ণুতার বাতাবরণকে দূর করতে না পারি!‌ যত ক্ষত হয়ে গেছে ইতিমধ্যে, তাদের নিরাময় অসম্ভব নয়। তবে শুশ্রূষার বিশল্যকরণী তখনই সক্রিয় হবে যদি এনআরসি ও নাগরিকত্ব যে বাঙালি–‌সহ অনসমিয়াদের গিলোটিন নয়, তা নিঃসংশয়ে প্রমাণিত হলে। এক্ষেত্রে রাষ্ট্রযন্ত্রকেই সদিচ্ছার প্রমাণ দিতে হবে। নইলে আমরা যতই প্রত্যাশার কথা লিখি না কেন, বিদ্বেষসর্বস্ব আততায়ীরা আশপাশে লুকনো অন্ধকার থেকে হঠাৎ ঝাঁপিয়ে পড়ে আমাদের সমস্ত বিশ্বাসকে ধস্ত করবে। ৭২ বছরে অনেক হারিয়েছি, আর হারাতে চাই না।‌‌‌

লেখক: বিশিষ্ট লেখক ও গবেষক। প্রাক্তন উপাচার্য ও ইমেরিটাস অধ্যাপক: আসাম বিশ্ববিদ্যালয়।


লেখাটি ৬ নভেম্বর ভারতের আজকাল পত্রিকায়


মন্তব্য যোগ করুণ

পরের
খবর

নবগঠিত মন্ত্রিপরিষদ ও জনপ্রত্যাশা


আরও খবর

চতুরঙ্গ

রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ গত ৭ জানুয়ারি বঙ্গভবনে নবনিযুক্ত মন্ত্রীদের শপথ পাঠ করান— পিআইডি

  অধ্যাপক ড. মো. আমির হোসেন

প্রথমে বিউগলে সুর, তারপর জাতীয় সংগীত, এরপর শপথ ও গোপনীয়তার শপথ বাক্য পাঠ এবং শপথপত্রে স্বাক্ষর করে হ্যাট্রিকসহ চতুর্থবার বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী হলেন বঙ্গবন্ধুর কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা। বিশ্ব ইতিহাসে বিরল ঘটনা। এক জনমে একই ব্যক্তির চারবার সরকার প্রধান হওয়ার দৃষ্টান্ত ইতিহাসে খুব বেশি নেই।

'আমি .... সশ্রদ্ধ চিত্তে শপথ করিতেছি যে, আমি আইন অনুয়ায়ী সরকারের মন্ত্রী পদের কর্তব্য বিশ্বস্ততার সহিত পালন করিব। আমি বাংলাদেশের প্রতি অকৃত্রিম বিশ্বাস ও আনুগত্য পোষণ করিব। আমি সংবিধানের রক্ষণ, সমর্থন ও নিরাপত্তা বিধান করিব। এবং আমি ভীতি বা অনুগ্রহ, অনুরাগ বা বিরাগের বশবর্তী না হইয়া সকলের প্রতি আইন অনুযায়ী যথাবিহিত আচরণ করিব।' এই শপথ বাক্য পাঠ করে আওয়ামী লীগের চতুর্থবার সরকারে ২৪ জন মন্ত্রী, ১৯ জন প্রতিমন্ত্রী ও ৩ জন উপমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

এবারের মন্ত্রিসভায় আওয়ামী লীগের অনেক জ্যেষ্ঠ নেতার জায়গা হয়নি, মন্ত্রিত্ব পায়নি শরিক দলগুলোও। এ নিয়ে জল্পনা-কল্পনার শেষ নেই। বিচার-বিশ্লেষণ চলছে সর্বত্র। আনন্দ-হতাশা দুইই আছে। যারা মন্ত্রিত্ব পেয়েছেন তারা এবং তাদের সমর্থকগণ উল্লসিত। যারা মন্ত্রিত্ব পাননি তারা এবং তাদের সমর্থকগণ খানিকটা হতাশ, যা স্বাভাবিক। কেউ কেউ আশাবাদী, কারণ মন্ত্রিসভা এখনও পূর্ণাঙ্গ হয়নি। যারা মন্ত্রিত্ব পাননি তাদের কেউই নতুন মন্ত্রিসভা সম্পর্কে বিরূপ মন্তব্য বা কটূক্তি করেননি বরং সফলতা কামনা করেছেন, উন্নয়নের ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকবে এবং উন্নয়ন কর্মকাণ্ড গতিশীল হবে বলে মন্তব্য করেছেন। এই মন্তব্যগুলোর মাধ্যমে জ্যেষ্ঠ নেতৃবৃন্দ পরিপক্কতার পরিচয় দিয়েছেন, বঙ্গবন্ধুর আদর্শ এবং জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বের প্রতি তাদের আনুগত্য পুনর্ব্যক্ত করেছেন। তাদের এই আচরণ আওয়ামী রাজনীতিতে নিঃসন্দেহে শুভ প্রভাব ফেলবে।

বিগত এক দশকে জননেত্রী শেখ হাসিনার দৃঢ় নেতৃত্বে নানাবিধ সামাজিক সূচকসহ অর্থনৈতিক আকাশচুম্বী উন্নয়ন হয়েছে যার কারণে বাংলাদেশ এখন উন্নয়নশীল দেশ, বিশ্বের ৪১তম অর্থনীতি, ২০৩২ সালে ২৫তম বৃহৎ অর্থনীতি হবে। জননেত্রী শেখ হাসিনা এখন বিশ্ব নেতা ও মাদার অব হিউম্যানিটি। বিশ্বাঙ্গনে বাংলাদেশের মর্যাদা বেড়েছে। কথিত তলাবিহীন ঝুড়ি এখন উন্নয়নের রোল মডেল। বাংলাদেশের মানুষ এই উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে লাভবান হয়েছে, মাথাপিছু আয় বেড়েছে, খানিকটা স্বস্তিতে আছে মানুষ। মঙ্গায় পীড়িত হচ্ছে না, অনাহারে থাকছে না। আরো অনেক দূর এগোতে হবে। আশায় বুক বাঁধছে মানুষ। গত দশ বছরের উন্নয়ন মানুষকে আশাবাদী করেছে। আশাবাদী হওয়ার কারণ জননেত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শী নেতৃত্ব। তাই তিনি বাংলাদেশের মানুষের অন্তরে জায়গা করে নিয়েছেন। জননেত্রী শেখ হাসিনার ওপর আস্থা রেখেই বাংলাদেশের জনগণ গত নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোটকে একচ্ছত্র বিজয় অর্জনে সমর্থন জানায়। নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন তুলে ঐক্যফ্রন্ট জনগণের সাড়া পায়নি। কারণ বিরামহীন উন্নয়ন অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করতে রাজি নয় মানুষ। বিদেশিদের কাছে নালিশ করেও সাড়া পাচ্ছে না ঐক্যফ্রন্ট। বিদেশিরাও বাংলাদেশের অগ্রযাত্রাকে অব্যাহত রাখার পক্ষে।

উপরোক্ত শপথবাক্য পাঠ করেই গত দশকের মন্ত্রিপরিষদের সদস্যগণও দায়িত্ব নিয়েছিলেন। বাদপড়া জ্যেষ্ঠ নেতা ও মন্ত্রীবর্গের অনেকে এই শপথ ধারণ করে উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় কম-বেশি অবদান রেখেছেন। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী বলেছেন যে, বাদ পড়েছেন বলে তারা ব্যর্থ হয়েছেন তা ঠিক নয়। আগামীর বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দেয়ার জন্য নতুনদের সুযোগ দেয়া হয়েছে। তবে তারা কঠোর নজরদারিতে থাকবেন। কিন্তু একথা সত্যি যে, কেউ কেউ এই শপথবাক্য ধারণ করেননি, মনেও রাখেননি। বরং উল্টোটাই করেছেন। চলন-বলন, আচার-আচরণ, কথা-বার্তা বদলে যায় কারো কারো। রাষ্ট্রীয় স্বার্থ জলাঞ্জলি দেন, জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হন। বেশ ক'জন মন্ত্রী ব্যাপক সমালোচনার মুখেও পড়েন, যা জননেত্রী শেখ হাসিনাকে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলে। যারা নিজেদের কৃতকর্মের জন্য মন্ত্রিত্ব হারিয়েছেন তাদের উচিত হবে তাদের অতীত কর্মকাণ্ডগুলো মূল্যায়ন করা। ত্রুটি-বিচ্যুতিগুলো সংশোধন করে দল, জনগণ ও রাষ্ট্রের কল্যাণে আত্মনিয়োগ এবং সংশোধিত মানুষ হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করা।

নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় লাভ করায় বর্তমান সরকারের কাছে মানুষের প্রত্যাশাও অনেক। মানুষের আশা ভঙ্গ হোক— জননেত্রী শেখ হাসিনা কিছুতেই তা চাইবেন না। তাছাড়া বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়ার দায়িত্ব তার ওপর বর্তেছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দুই অংকে উন্নীত করা, মাথাপিছু আয়বৃদ্ধি, সব মানুষের জন্য পুষ্টিসম্পন্ন খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিতকরণ, উন্নয়নের সুফল ঘরে ঘরে পৌঁছে দেয়া, অর্থনৈতিক বৈষম্য কমিয়ে আনা, দারিদ্র্য দূরীকরণ, ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি, ব্যাংকিং খাতের বিশৃঙ্খলা দূরীকরণ, মানবসম্পদ সৃষ্টির লক্ষ্যে শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো, প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষার মধ্যে সমন্বয় সৃষ্টি, শিক্ষা ও গবেষণার মান উন্নয়ন, ঘরে ঘরে তথ্য-প্রযুক্তির সুবিধা প্রদান, সামাজিক অরাজকতার অবসান, মাদক ও দুর্নীতির রোধ, নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, সুশাসন প্রতিষ্ঠা, গ্রামে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুয়োগ সৃষ্টি করে গ্রাম থেকে শহরে মাইগ্রেশনের হার কমানো, কৃষিকে যুগোপযোগী করা, গ্রামে শহুরে সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টি, সারাদেশে স্বাস্থ্যসেবা প্রদান ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিতকরণ, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, রফতানি খাত ও বাজার সম্প্রসারণ করে রফতানি আয় বৃদ্ধি, শিল্পখাত সম্প্রসারণ, মেগা প্রজেক্টগুলো সফলভাবে সময়মত সম্পন্নকরণ, সারদেশে আধুনিক রেলসার্ভিস সৃষ্টি, রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানসহ বহুবিধ কর্মকাণ্ড সফলতা ও গতিশীলতার সঙ্গে পরিচালনা করতে হবে আগামী ৫ বছর। এ বিষয়গুলো মাথায় রেখে উন্নত প্রযুক্তি ও নিবিড় প্রতিযোগিতার শতকে টিকে থাকতে এবং এগিয়ে যেতেই হয়ত মাননীয় প্রধানমন্ত্রী পরিচ্ছন্ন ইমেজ সম্পন্ন তুলনামূলক কম বয়সী বা তরুণ কিন্তু মেধাবী, উদ্যমী, কর্মতৎপর, সৎ ও নিষ্ঠাবান মনে করে বর্তমান মন্ত্রিসভা গঠন করেছেন। জননেত্রীর মত বাংলাদেশের মানুষেরও বর্তমান মন্ত্রিপরিষদের কাছে প্রত্যাশা অনেক। মানুষ আশা করে বর্তমান মন্ত্রিসভার প্রতিটি সদস্য চলনে-বলনে, কথা-বার্তায়, আচার-আচরণে, চিন্তা-চেতনায় সৎ, পরিচ্ছন্ন ও মার্জিত হবে, জনবিচ্ছিন্ন না হয়ে জনগণের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকবে, জনগণের দুঃখ-দুর্দশা লাঘব করবে, জনগণের কল্যাণে ও বাংলাদেশকে উন্নত দেশে উন্নীত করার বঙ্গবন্ধু ও জননেত্রী শেখ হাসিনার লক্ষ্য বাস্তবায়নে নিজেকে উৎসর্গ করে পঠিত শপথ বাক্যের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করবে এবং শপথ বাক্যের যথার্থতা প্রমাণ করবে।


লেখক: উপ-উপাচার্য (প্রশাসন), জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

সংশ্লিষ্ট খবর

পরের
খবর

ঊনসত্তরের ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানের পাঁচ দশক


আরও খবর

চতুরঙ্গ

  অজয় দাশগুপ্ত

ঐতিহাসিক ১১ দফা আন্দোলনের ৫০ বছর পূর্ণ হচ্ছে এ বছরের জানুয়ারি মাসে। ১৯৬৯ সালের শুরুতেই চারটি ছাত্র সংগঠন- পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ, পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন (মতিয়া গ্রুপ), পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন (মেনন গ্রুপ) এবং এনএসএফ বা জাতীয় ছাত্র ফেডারেশন (দোলন গ্রুপ) ছাত্রদের বিভিন্ন দাবির সঙ্গে পূর্ব পাকিস্তানের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের ছয় দফা কর্মসূচি, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় অভিযুক্ত আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ মুজিবুর রহমানসহ সব রাজবন্দির মুক্তি, পাকিস্তানকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন বিভিন্ন সামরিক জোট থেকে মুক্ত করা, পাট ও বস্ত্র শিল্প জাতীয়করণ, পার্লামেন্টারি গণতন্ত্র প্রবর্তন প্রভৃতি ১১ দফা দাবিতে আন্দোলন গড়ে তোলার বিষয়ে একমত হয়। ছাত্রদের দাবির সঙ্গে রাজনৈতিক দাবি যুক্ত করা- সেটা ছিল সময়ের দাবি। এই চারটি ছাত্র সংগঠনের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের ভিপি তোফায়েল আহমেদ (ছাত্রলীগ নেতা) ও জিএস নাজিম কামরান চৌধুরী (এনএসএফ)- এই ১০ জনকে নিয়ে গঠিত হয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ। জেলায় জেলায় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয় বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের প্রতিনিধি এবং জেলার প্রধান কলেজের ভিপি-জিএসকে নিয়ে।

তখন ছিল ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খানের শাসনামল। তিনি ১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে চূর্ণ করে দিয়ে পাকিস্তানে সামরিক শাসন জারি করে ক্ষমতায় আসেন। ১৯৬৩ সাল থেকে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর ছিলেন মোনায়েম খান। তখন ছাত্রদের মিছিলে জনপ্রিয় স্লোগান ছিল আইয়ুব-মোনায়েম দুই ভাই, এক দড়িতে ফাঁসি চাই। তবে সে সময়ে প্রকৃতই ফাঁসির দড়ির হুমকিতে ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। তাকে স্বায়ত্তশাসনের ছয় দফা কর্মসূচি প্রদান এবং এর ভিত্তিতে জনমত গঠনের অভিযোগে ১৯৬৬ সালের ৮ মে গ্রেফতার করা হয়। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দীন আহমদসহ আরও অনেক নেতাও তখন জেলে ছিলেন। অনেক ছাত্রনেতাকেও বন্দি করা হয়। তারা বছরের পর বছর বিনা বিচারে জেলে ছিলেন। শেখ মুজিবুর রহমানসহ বন্দিদের মুক্তি ও ছয় দফা মেনে নেওয়ার দাবিতে ১৯৬৬ সালের ৭ জুন পূর্ব পাকিস্তানে হরতাল আহ্বান করা হয়। বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে যে সব হরতাল হয়েছে, তার রূপ (ঢিলেঢাকা, নিরুত্তাপ, শিথিল) যারা দেখেছেন তারা কোনোভাবেই ধারণা করতে পারবেন না যে আওয়ামী লীগের অনেক নেতা জেলে থাকার পরও কী অভাবনীয় সাড়া মিলেছিল তাতে। ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জে পুলিশের গুলিবর্ষণে ১০ জনের মৃত্যু হয়েছিল- এটা সরকারের পক্ষ থেকেই স্বীকার করে নেওয়া হয়। রাজপথ ছিল মিছিলকারীদের দখলে। ১৯৬৮ সালের ৭ জানুয়ারি দৈনিক পাকিস্তান পত্রিকা জানায়, 'পূর্ব পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করার ষড়যন্ত্রের অভিযোগে' ৭ জানুয়ারি পাকিস্তান সিভিল সার্ভিস ও সেনা-নৌ-বিমান বাহিনীর সদস্য এবং রাজনৈতিক নেতাসহ ২৮ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তারা অস্ত্র সংগ্রহের জন্য ভারতের আগরতলায় গোপন বৈঠকে মিলিত হয়েছিলেন। দৈনিক পাকিস্তান ১৮ জানুয়ারি জানায়, আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমান এবং আরও ৬ জন সামরিক কর্মকর্তাকে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় অভিযুক্ত করা হয়েছে। শেখ মুজিবুর রহমান এ ষড়যন্ত্রের প্রধান হোতা এবং তাকেই মামলার প্রধান আসামি করা হয়েছে।

১৯৬৯ সালের জানুয়ারি মাস শুরু হতে না হতেই ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ১১ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করে। ৮ জানুয়ারি পশ্চিম ও পূর্ব পাকিস্তানের কয়েকটি রাজনৈতিক দল ডেমোক্রেটিক অ্যাকশন কমিটি বা ডাক নামে একটি জোট গঠন করে। তাদের আট দফা দাবিতে পার্লামেন্টারি গণতন্ত্র এবং শেখ মুজিবুর রহমানসহ সব রাজবন্দির মুক্তির দাবি ছিল। কিন্তু স্বায়ত্তশাসনের ছয় দফা দাবি ছিল না। পশ্চিম পাকিস্তানের প্রায় সব নেতা ছয় দফা স্বীকার করতে রাজি ছিলেন না। এ জোটের শরিক বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ১৯৬৮ সালের ১৩ ডিসেম্বর পাকিস্তানব্যাপী সকাল-সন্ধ্যা হরতাল ডেকেছিল এবং তা পূর্ণ সফল হয়। তাদের মূল দাবি ছিল আইয়ুব খানের পতন এবং পার্লামেন্টারি গণতন্ত্র কায়েম। কিন্তু শেখ মুজিবুর রহমান ও তার দল ছয় দফার প্রশ্নে অটল থাকে।

ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সদস্য চারটি ছাত্র সংগঠনের মধ্যে ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়নের (মতিয়া গ্রুপ) কর্মী-সমর্থক ছিল অনেক। এনএসএফ (দোলন গ্রুপ) ছিল আইয়ুব খানের সমর্থক ছাত্র সংগঠন থেকে বের হয়ে আসা একটি অংশ। আইয়ুব খান সামরিক শাসন জারি করে পূর্ব পাকিস্তানের প্রধান রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ এবং ন্যাপ (মোজাফফর) ও মণি সিংহের কমিউিনিস্ট পার্টির অনেক নেতাকর্মীকে জেলে পাঠান। তবে ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়ন এমন কঠিন সময়েও ছাত্রদের মধ্যে সক্রিয় থাকে। তারা ঐক্যবদ্ধ হওয়ায় জনগণের মধ্যে বিপুল উৎসাহ সৃষ্টি হয়। তারা মনে করতে থাকে- ছাত্ররা এক হয়েছে। এবার আইযুব খানের রেহাই নেই। তখন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর মোনায়েম খান পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্র-তরুণ এবং মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীর কাছে ছিলেন ধিক্কৃত ও উপহাসের পাত্র। অন্যদিকে, পাকিস্তানের দুঃশাসনে ক্ষুব্ধ এ ভূখণ্ডের জনগণ নিজেদের মনে করতে থাকে বঞ্চিত-শোষিত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক রেহমান সোবহান ১৯৬১ সালেই 'টু-ইকোনমি' তত্ত্ব উপস্থাপন করেন। তিনি পূর্ব পাকিস্তান যে অর্থনৈতিকভাবে বঞ্চিত হচ্ছে সে চিত্র বিভিন্ন লেখায় তুলে ধরেন, যা ছাত্র ও শিক্ষিত মধ্যবিত্তদের মধ্যে আলোড়ন সৃষ্টি করে। শেখ মুজিবুর রহমানের ছয় দফা কর্মসূচিতে এ বঞ্চনার চিত্র ফুটে ওঠে। তাকে যখন আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার প্রধান আসামি করা হয়, তখন এ ভূখণ্ডের মানুষের মধ্যে শঙ্কা তৈরি হয়- এ জনপ্রিয় নেতাকে ফাঁসি দেওয়া হবে না তো? ছাত্রদের আন্দোলনের কর্মসূচি ছিল ১১ দফা। কিন্তু সবকিছু ছাপিয়ে মূল দাবি হয়ে ওঠে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার ও শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তি। জনগণও রাজনৈতিক দলের প্রতি নয়, বরং ছাত্রদের প্রতি ভরসা রাখতে শুরু করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বটতলা, মধুর ক্যান্টিন, ইকবাল হল প্রভৃতি স্থান তখন সবার মুখে মুখে। ১৭ জানুয়ারি ১১ দফার দাবিতে কলা ভবনের বটতলায় প্রথম ছাত্রসভা অনুষ্ঠিত হয়। তখন ১৪৪ ধারা জারি ছিল। আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্স প্রথম বর্ষের ছাত্র। বটতলার সমাবেশে সর্বোচ্চ শ'পাঁচেক ছাত্রছাত্রী সমবেত হয়েছিল। তোফায়েল আহমেদ সভাপতিত্ব করেন। কিন্তু মিছিল করতে চাইলে পুলিশ টিয়ারগ্যাস নিক্ষেপ ও লাঠিচার্জ করে তা ব্যর্থ করে দেয়। সে দিনই প্রথম আমি পুলিশের টিয়ারশেল বিস্ম্ফোরণের আগেই তা ভেজা চটে জড়িয়ে পুলিশের দিকে ছুড়ে মারা প্র্যাকটিস করি। সে যে কী আনন্দ! পরদিনও বটতলা থেকে মিছিল বের করতে গিয়ে পুলিশের হামলার মুখে পড়তে হয়। কিন্তু আমরা শ'খানেক ছাত্রছাত্রী পুলিশকে ফাঁকি দিয়ে মিছিল নিয়ে বটতলা থেকে গুলিস্তান পর্যন্ত চলে যেতে পারি। রাস্তার দু'পাশের জনগণ আমাদের করতালি দিয়ে অভিনন্দন জানায়। ১৯ জানুয়ারি বোরবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ছিল। কিন্তু প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বর্তমানের বুয়েট) খোলা ছিল এবং সেখানকার ছাত্রছাত্রীরা মিছিল করতে গিয়ে বাধার সম্মুখীন হয়ে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়।

বাঁধভাঙা আন্দোলন কী, মাটির ঢিবি থেকে উইপোকার মতো কীভাবে ছাত্রছাত্রীরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে বের হয়ে আসতে পারে, সে অভিজ্ঞতা আমার জীবনে প্রথম হয় ১৯৬৯ সালের ২০ জানুয়ারি। সেদিন ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্র ধর্মঘট ডাকে। সকাল ১১টার দিকে বটতলায় সমাবেশ ছিল। নির্ধারিত সময়ের আগেই কলা ভবন ও আশপাশের এলাকা ছাত্রছাত্রীরা ভরে ফেলে। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দলে দলে তারা এসেছে। এ মিছিলের রুট নির্ধারিত হয় উপাচার্যের বাসভবন, এসএম হল, ঢাকা মেডিকেল কলেজ, নাজিমুদ্দিন রোডের জেলখানা, চকবাজার, ইসলামপুর, বাহদুর শাহ পার্ক, গুলিস্তান, তোপখানা রোড হয়ে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার। সে সময়ে আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যত মিছিল বের করেছি, তার বেশিরভাগ এই দীর্ঘ পথ পরিক্রম করত। ২০ জানুয়ারির মিছিল ১৪৪ ধারা উপেক্ষা করে বের হয় এবং ঢাকা মেডিকেল কলেজ এলাকায় গুলি হয় এবং তাতে আসাদুজ্জামান নামের এক ছাত্রনেতা নিহত হন। তখন মোবাইল ফোনের চল ছিল না। টিএন্ডটি ফোনও তেমন ছিল না। কিন্তু সর্বত্র কীভাবে খবর ছড়িয়ে পড়ে- পুলিশ ছাত্র মেরে ফেলেছে গুলি করে। এবারে আইয়ুব খান-মোনায়েম খানের রক্ষা নেই। সেদিন বিকেলে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে শোক মিছিল বের হয়। সামনে ছিলেন কালো পতাকা হাতে দীপা দত্ত নামের এক ছাত্রনেতা। পুলিশ-ইপিআর (বর্তমান বিজিবির পূর্বসূরি) মিছিলে বাধা দিতে চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। শহীদ মিনার থেকেই কর্মসূচি ঘোষণা হয়- ২১ জানুয়ারি ঢাকায় পূর্ণ দিবস হরতাল, ২৩ জানুয়ারি সন্ধ্যায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে মশাল মিছিল এবং ২৪ জানুয়ারি দেশব্যাপী সকাল-সন্ধ্যা হরতাল।

২৪ জানুয়ারি হরতালের দিনেই সকালে তোপখানা রোডে সচিবালয়ে পিকেটিং করার সময় স্কুলছাত্র মতিউর রহমান পুলিশের গুলিতে নিহত হন। এ দিন প্রকৃতপক্ষে ঢাকার ছাত্র-জনতা এবং টঙ্গি-তেজগাঁও-আদমজী-ডেমরা এলাকার শ্রমিকরা একযোগে রাজপথে নেমে আসেন। আমি বর্তমান দোয়েল চত্বর এলাকায় একদল শ্রমিকের মধ্যে পড়ে যাই। মনে আছে, তখন লুঙ্গি-গেঞ্জি পরা এক শ্রমিক আমাকে বুকে টেনে নিয়ে অন্যদের দেখিয়ে বলেছিলেন, 'এই মাসুম বাচ্চা মিছিলে যখন, আমরা ঘরে তাকি ক্যামনে।' সবার মুখে তখন আইয়ুব শাহির পতন চাই, শেখ মুজিবের মুক্তি চাই স্লোগান। মতিঝিলের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি অফিসের টপ বসরা ছাত্রদের ডাকে রাজপথে নেমে আসেন। বড় বড় সরকারি অফিসের শীর্ষ ব্যক্তি থেকে পিয়ন-দারোয়ান একই মিছিলে শামিল হয়েছেন, এ এক অভূতপূর্ব দৃশ্য। অতীতে এমনটি ঢাকা প্রত্যক্ষ করেনি।

দুপুরে পল্টন ময়দানে মতিউরের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। ততক্ষণে ঢাকা শহর যেন জ্বলছে। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় শেখ মুজিবের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য প্রদান করেছেন, এমন কয়েকজনের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও বাড়ি জনগণ পুড়িয়ে দেয়। সরকার সমর্থক দৈনিক পাকিস্তান ও মর্নিং নিউজ জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। জনগণ গভর্নর হাউস ও সচিবালয়ে আগুন দেবে, এমন শঙ্কা তৈরি হয়। ততক্ষণে সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। ছাত্রনেতারা তখন পল্টন ময়দান থেকে মিছিল নিয়ে ইকবাল হলের (বর্তমানে সার্জেন্ট জহুরুল হক হল) মাঠে চলে আসেন। পরদিন ২৫ জানুয়ারি প্রদেশব্যাপী হরতাল ঘোষিত হয়। একইসঙ্গে সরকার ঘোষণা করে কারফিউ।

প্রকৃতপক্ষে ২৪ জানুয়ারির ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানই আইয়ুব খানের পতন এবং শেখ মুজিবের মুক্তি অবধারিত করে দেয়। সবাই কেবল অপেক্ষায় ছিল কখন এ দুটি ঘটনা ঘটে। শেখ মুজিবুর রহমান মুক্তিলাভ করেন ২২ ফেব্রুয়ারি। জনগণ তাকে বরণ করে নেন বঙ্গবন্ধু হিসেবে। আইয়ুব খান বিদায় নেন ২৫ মার্চ।

ছাত্রসমাজের নেতৃত্বে ১১ দফার আন্দোলন পরিচালিত হয়েছিল। এ আন্দোলনকেই অভিহিত করা হয় স্বাধীনতা সংগ্রামের ড্রেস রিহার্সাল হিসেবে। এ আন্দোলন চলাকালেই জয় বাংলা স্লোগান ধ্বনিত হতে থাকে। আরও শোনা যায়- পিন্ডি না ঢাকা ঢাকা- ঢাকা, পদ্মা মেঘনা যমুনা- তোমার আমার ঠিকানা প্রভৃতি স্লোগান। সঙ্গোপনে প্রস্তুতি চলতে তাকে স্বাধীনতার। ছাত্রদের ওপর জনতার তখন অগাধ আস্থা। ইকবাল হল সবকিছুর কেন্দ্রে। কারখানায় শ্রমিক-মালিক বিরোধ মীমাংসার জন্য উভয়পক্ষ চলে আসত ওই ছাত্রাবাসে। এমনকি স্বামী-স্ত্রীর ঝগড়া দেখা দিলেও উভয় পক্ষ ভাবত- ইকবাল হলে গেলে একটা সমাধান মিলবেই।

সে সময়ে আমরা দিনের পর দিন ধর্মঘট করেছি- মিছিল করেছি। হাজার হাজার ছাত্রছাত্রী তাতে অংশ নিয়েছে। সকালে বিভিন্ন স্কুল-কলেজে গিয়ে ধর্মঘট করিয়ে মিছিল নিয়ে বটতলার সমাবেশে যোগদান, তারপর ৮-১০ কিলোমিটার মিছিল করে দুপুরে খেয়েই বিকেলে মধুর ক্যান্টিনে কর্মিসভা। দিনের পর দিন আমরা এ ধরনের কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছি ক্লান্তিহীনভাবে। তোফায়েল আহমেদ ছিলেন আন্দোলনের মধ্যমণি। তার বক্তব্য ছাত্র-জনতা মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনত। সাইফউদ্দিন আহমদ মানিক বক্তৃতা দিতেন গুছিয়ে। তার বক্তব্যে থাকত দিকনির্দেশনা। জেলায় জেলায় যে সব কলেজ ছিল, সর্বত্র নিয়মিত নির্বাচন হতো ছাত্র সংসদের। নির্বাচিত ভিপি-জিএসরা জনগণের কাছে বিশেষ মর্যাদা পেতেন। ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়নের প্রার্থীরা বেশিরভাগ কলেজ ছাত্র সংসদে জয়ী হতেন। সাধারণভাবে যে কোনো ছাত্র-গণসমাবেশে ছাত্রনেতাদের বক্তব্য মানুষ বিশেষ আগ্রহ নিয়ে শুনত।

১১ দফার আন্দোলনের মধ্য দিয়ে পতন ঘটে আইযুব খানের। রাজনৈতিক অঙ্গনে যে শূন্যতা তিনি সৃষ্টি করেছিলেন তা দ্রুতই পূরণ হয়ে যায়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হয়ে ওঠেন বাঙালির প্রাণপ্রিয় নেতা। তিনি স্বাধীনতার পথে সুপরিকল্পিতভাবে অগ্রসর হতে থাকেন। জনগণ যে এ জন্য প্রস্তুত হয়ে উঠেছে, সেটা তো তিনি নিশ্চিত হয়ে যান ঊনসত্তরের ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানেই।

এই জানুয়ারিতে ঊনসত্তরের সেই অগ্নিঝরা দিনগুলোর ৫০ বছর পূর্ণ হলো। ১৭ থেকে ২৪ জানুয়ারি, এই আটটি দিন আমাদের এ ভূখণ্ডের ছাত্রসমাজ রাজপথ কাঁপিয়ে দিয়েছিল। অনন্য বিজয় ছিনিয়ে এনেছিল। রক্ত দিয়েছিল আসাদ-মতিউরসহ অনেকে। তাদের স্মৃতির প্রতি জানাই প্রণতি। ২৪ জানুয়ারি ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের অর্ধশত বার্ষিকী নিছক আনুষ্ঠানিকতার জন্য নয়, বরং তা থেকে শিক্ষা গ্রহণের জন্য নানা আয়োজনে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও ছাত্র সংগঠন পালন করবে- এটাই প্রত্যাশা।

লেখক: সাংবাদিক

সংশ্লিষ্ট খবর

পরের
খবর

বাংলাদেশে মানবাধিকার : আনুষ্ঠানিকতা নয় চর্চাই মুখ্য


আরও খবর

চতুরঙ্গ

  ড. মো. কামাল উদ্দিন

মানবাধিকার ধারণার ব্যাপ্তি, পরিধি ও ব্যবহারের ব্যাপকতা বেড়েছে অনেক গুণ। উন্নয়ন, গণতন্ত্র, সুশাসন, মানবাধিকার, পরিবেশ, সংস্কৃতিসহ মানবসমাজের প্রয়োজনীয় সব প্রত্যয়ের সঙ্গে মানবাধিকারের ধারণাটি খুব জোরালোভাবে সম্পৃক্ত করা হয়েছে। বর্তমান যুগ মানবাধিকার ও টেকসই উন্নয়নের যুগ। মানবাধিকার বিষয় বাদ দিয়ে সুশাসন, গণতন্ত্র ও সর্বোপরি উন্নয়ন কল্পনা করা যায় না এ যুগে।

বৈশ্বিক মানবাধিকারের আওয়াজ পৃথিবীর উত্তর-দক্ষিণ, পূর্ব-পশ্চিম সব জায়গায় লেগেছে। তবে এর মাত্রাগত পার্থক্য ব্যাপক। বাংলাদেশ আজ রাজনৈতিক পরিভাষায় একটি মধ্যম আয়ের দেশ। সত্যি কথা বলতে কী, মানুষের আয় বেড়েছে, দারিদ্র্য কমেছে এবং জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন হয়েছে অনেক। কিন্তু নাগরিকের পরিপূর্ণ মানবাধিকার চর্চা ও রাষ্ট্রীয়ভাবে মানবাধিকার সুরক্ষা বড় ধরনের ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। বাংলাদেশে মানবাধিকার বিষয়টি বিদেশি অনুদানের চরম হাতিয়ার হিসেবে পরিণত হয়েছে।

অনেকে হয়তো আমার সঙ্গে একমত পোষণ নাও করতে পারেন যে, বাংলাদেশে মানবাধিকার চিত্র পূর্বের তুলনায় বহু গুণ বিশ্বজয় হয়েছে। আমাদের মানবাধিকার সনদ আছে, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার চুক্তিতে আমরা স্বাক্ষর করেছি, আমাদের সংবিধানে মানবাধিকার রক্ষার কথা জোরালোভাবে বলা আছে, আমাদের জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আছে, তথ্য কমিশন আছে, দুর্নীতি দমন কমিশন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা আছে (Officially), মানবাধিকার সংগঠন আছে, মানবাধিকার কর্মী আছে, গণতন্ত্র আছে তথাকথিত এবং আজ আমরা মধ্যম আয়ের দেশে উপনীত হয়েছি। কিন্তু আমাদের এত উন্নয়ন ও মানবাধিকার সুরক্ষায় সরকারি ও বেসরকারিভাবে এ সরঞ্জাম থাকার পরও প্রকৃত অর্থে নেই আমাদের মানবাধিকার চর্চা। নারী নির্যাতন, গুম, বিনাবিচারে হত্যা, শিশু নির্যাতন, গণপিটুনিতে মানুষ মারা আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে নতুন মাত্রা যুক্ত করেছে। মানবাধিকার আমাদের কাছে একটি পশ্চিমা ধারণায় পরিণত হয়েছে। এ ধারণা আমাদের দেশের রাজনীতি, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও আমাদের উন্নয়নের সঙ্গে মানায় না। আমাদের মানবাধিকারের কর্মসূচি প্রকৃত অর্থে মানবাধিকার উপভোগ ও সুরক্ষার জন্য নয় বরং বিদেশি অনুদান পাওয়া ও উন্নত রাষ্ট্রগুলোকে খুশি করার জন্য। তাই তো আমরা বর্তমান বিশ্বে একটি চ্যাম্পিয়ন জাতি, যারা মানবাধিকারের সব চুক্তি, সনদ ও কনভেনশন স্বাক্ষর করে মানবাধিকারের কথা বলে মানবাধিকার লঙ্ঘন করি। আমরা অত্যন্ত সফল, কারণ গণতন্ত্র, সুশাসন, মানবাধিকার আন্দোলন, মানবাধিকার কমিশন যেভাবে আমাদের দেশে কাজ করছে বৈশ্বিক মানবাধিকার রক্ষার প্রতিষ্ঠান আমাদের কর্মসূচিতে তেমন উদ্বিগ্ন নয়। আমাদের রাজনৈতিক এলিটরাও অত্যন্ত খুশি, কারণ প্রয়োজন হলে সব কিছু থাকা সত্ত্বেও আমরা মানবাধিকার লঙ্ঘন করতে পারি। আমাদের রাজনীতি একটি অন্যতম মানবাধিকার রাজনীতিতে পরিণত হয়েছে। যেখানে মানবাধিকার সুরক্ষার সব ব্যবস্থাও আছে, তীব্র মাত্রায় মানবাধিকার লঙ্ঘনও আছে। গত কিছু দিন আগে আমরা মানবাধিকার সনদ স্বীকৃতির ৭০ বছর পালন করেছি। এখন ভাবনার বিষয় হলো, আরও কত বছর পার করলে বাংলাদেশের মানুষ মানবাধিকার বর্ণনা সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করবে এবং তাদের অধিকার আর লঙ্ঘিত হবে না তা এখনও অজানা।

উন্নয়নের সঙ্গে মানবাধিকারের সম্পর্ক আজ নতুন নয়। বাংলাদেশের উন্নয়নের প্রশংসা আজ সর্বমহলে। তবে নাগরিককে মানবাধিকার বিবেচনা করে কতটুকু উন্নয়ন করা হয়েছে তা এখন ভাবনার বিষয়। বাংলাদেশের উন্নয়ন ও মানবাধিকার সম্পর্ক নেতিবাচক। যদি মানবাধিকার ধারণা বা বিষয় বাংলাদেশের মতো দেশের উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করে তাহলে উন্নয়ন কর্মসূচি থেকে মানবাধিকারকে বাদ দিতে হবে, না হয় মানবাধিকার বাদ দিয়ে যে উন্নয়ন তাকে উন্নয়ন বলা মুশকিল। তাই আমাদের উন্নয়ন কর্মসূচিতে গুরুত্ব পাওয়া উচিত মানবাধিকার রক্ষার উন্নয়ন। সে জন্য সরকারকেই এগিয়ে আসতে হবে সবার আগে।

লেখক : অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

সংশ্লিষ্ট খবর