চতুরঙ্গ

বটতলা থেকে ৩২ নম্বরে

প্রকাশ : ০৪ নভেম্বর ২০১৮

বটতলা থেকে ৩২ নম্বরে

  অজয় দাশগুপ্ত

বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট তার নিজের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পরিদর্শনের কথা ছিল। সেদিন প্রত্যুষেই তাকে পরিবারের সদস্যদেরসহ হত্যা করা হয়। এ ঘটনার তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ বাংলাদেশের নানা প্রান্তে হয়েছে। কিন্তু আমরা কিছুটা সময় নিয়েছি বড় ধরনের প্রতিবাদ সংঘটন এবং জাতির পিতার প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শনের। এর আরেকটি কারণ ছিল, ১৫ আগস্টের পরপর দেশের অগ্রণী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ছাত্র আন্দোলনের প্রাণকেন্দ্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রায় দেড় মাসের জন্য বন্ধ হয়ে যাওয়া। সে সময়ে আমি ছিলাম বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগের অঙ্গ সংগঠন হিসেবে গঠিত জাতীয় ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য। আমাদের কমিটির সদস্য বঙ্গবন্ধুপুত্র শেখ কামালকেও ১৫ আগস্টে হত্যা করা হয়। কমিটির কয়েকজন সদস্য ১৫ আগস্টের পর নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েন; দুয়েকজন খুনিচক্রের সঙ্গে হাত মেলাতে তৎপর হয়। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের দুই মাস পর ১৮ অক্টোবর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস শুরু হয়। অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানও রমজান ও শারদীয় দুর্গাপূজার টানা ছুটির পর খুলতে শুরু করে। আমরা ১৭ অক্টোবর গভীর রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ভবনে তিনটি স্লোগান লিখে প্রতিবাদের নতুন অধ্যায়ের সূচনা করি- জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু এবং এক মুজিবের রক্ত থেকে লক্ষ মুজিব জন্ম নেবে। এ কাজে ঝুঁকি ছিল প্রচণ্ড। প্রতি রাতে কারফিউ বলবৎ ছিল। আর্মি-পুলিশ নিয়মিত টহল দিত। খুনিদের চরেরা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে সক্রিয় ছিল। কলাভবনের অদূরে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ও শাহবাগের মোড়ের কাছে বেতার কেন্দ্রে ছিল ট্যাঙ্ক-মেশিনগান সজ্জিত খুনিচক্রের সদস্যরা।

১৯৭৫ সালের ৫ নভেম্বরের সংবাদপত্র থেকে

ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়নের নেতাকর্মীরা ২০ অক্টোবর মধুর ক্যান্টিনে সমবেত হয়ে মিছিল বের করে, যা কলাভবনের বিভিন্ন ফ্লোর প্রদক্ষিণ করে। পরদিনও মিছিল হয় এবং মিছিল শেষে ২৯ অক্টোবর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলা থেকে ধানমণ্ডি ৩২ নম্বর সড়কে শোক মিছিল নিয়ে যাওয়ার কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। পরে প্রস্তুতির সুবিধার জন্য মিছিলের কর্মসূচি নির্ধারিত হয় ৪ নভেম্বর।

এ কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের আহ্বান জানিয়ে আমরা বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে লিফলেট বিতরণ করি। আমরা কলাভবন ও কার্জন হলের ক্লাসে ক্লাসে গিয়ে বক্তব্য রাখি, যাতে ছাত্রছাত্রীরা কর্মসূচিতে যোগ দেয়। একই সঙ্গে বরেণ্য শিক্ষক-সাংবাদিক-আইনজীবী-সংস্কৃতিসেবীরা যাতে শোক মিছিলে অংশ নেন, সে জন্যও অনুরোধ জানাতে থাকি। ৪ নভেম্বর সকালে বটতলায় বিপুল সংখ্যক ছাত্র-জনতার সমাবেশ ঘটে। তখন দুটি খবর আমাদের উদ্বিগ্ন করে- এক, ২ নভেম্বর গভীর রাতে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে প্রচণ্ড গোলাগুলি হয়েছে এবং কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ বন্দি নিহত হয়েছেন। দুই, সেনাবাহিনীর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দি করে নতুন একটি সামরিক অভ্যুত্থান সংঘটিত করেছেন। বলা যায়, এক উদ্বেগ ও অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে আমরা বটতলা থেকে মিছিল নিয়ে বঙ্গবন্ধুর বাসভবনের পথে যাত্রা শুরু করি। মিছিলটি নীলক্ষেত মোড়ে পৌঁছলে সেনাবাহিনী তাতে বাধা দেয়। অনেক তর্ক-বিতর্কের পর পথের বাধা দূর হয়। হাজার হাজার নারী-পুরুষ পৌঁছে যায় সেই ঐতিহাসিক স্থানটিতে, যেখান থেকে বঙ্গবন্ধু ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ গভীর রাতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট এখানেই তাকে হত্যা করা হয়েছিল। ঘাতকেরা ক্ষমতা দখল করে বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের সদস্যদের সম্পর্কে দেশ-বিদেশে কুৎসা-অপপ্রচার চালাচ্ছিল। এটাও বলা হচ্ছিল- হত্যাকাণ্ডের কোনো প্রতিবাদ কেউ করেনি। কিন্তু ৪ নভেম্বরের মিছিল থেকে দেশবাসী বার্তা পায়- বাংলাদেশের জনগণের মনে বঙ্গবন্ধু আছেন, থাকবেন।

১৯৭৫ সালের ৬ নভেম্বরের সংবাদপত্র থেকে

বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফেরার সময় আমরা নিশ্চিত হই যে, ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে স্বাধীনতা সংগ্রামের চার মহান নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী ও এএইচএম কামারুজ্জামানকে ২ নভেম্বর গভীর রাতে ব্রাশফায়ারে হত্যা করা হয়েছে। এ ঘৃণ্য কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিকে নিশ্চিহ্ন করার দুরভিসন্ধি থেকে। সন্দেহ নেই, সে ঘটনায় আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগী বিভিন্ন সংগঠনের নেতাকর্মীদের মনোবল অনেকটা ভেঙে যায়। এ সুযোগেই জিয়াউর রহমান ৭ নভেম্বর পাল্টা অভ্যুত্থান সংঘটিত করতে পারেন।

জেলাহত্যার প্রতিবাদে আমরা ৫ নভেম্বর অর্ধদিবস হরতাল আহ্বান করি। হরতাল শেষে বায়তুল মোকাররমের সামনে অনুষ্ঠিত হয় গায়েবানা জানাজা।

৪ নভেম্বর ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সিনেট অধিবেশন। সেখানে ছাত্র প্রতিনিধি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মাহবুব জামান, ইসমত কাদির গামা ও অজয় দাশগুপ্ত। আমরা বিশ্ববিদ্যালয় চ্যান্সেলর ও রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডের নিন্দা জানিয়ে প্রস্তাব উত্থাপন করি এবং সেটা সর্বসম্মতভাবে পাস হয়। সিনেট অধিবেশন থেকেই আমরা তিনজন সরাসরি চলে যাই কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে, যেখান থেকে ৫ নভেম্বরের হরতাল কর্মসূচির সমর্থনে মিছিল বের হয়।

লেখক: সাংবাদিক

মন্তব্য


অন্যান্য