চতুরঙ্গ

রাজনীতি কাদের হাতে

প্রকাশ : ১১ অক্টোবর ২০১৮ | আপডেট : ১৪ অক্টোবর ২০১৮

রাজনীতি কাদের হাতে

  ইমতিয়ার শামীম

একুশে আগস্টের গ্রেনেড হামলা রায়ের পর্যবেক্ষণে এবং মহামান্য রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের কয়েকটি অনুষ্ঠানে দেয়া সাম্প্রতিক বক্তব্যে এমন কিছু কথা রয়েছে, যা আমাদের আবারও রাজনীতি ও রাজনৈতিক সংস্কৃতি সম্পর্কে কিছু গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। প্রশ্নগুলো পুরানোই বটে, কিন্তু সেগুলোর মীমাংসা করা না গেলে মুক্তিযুদ্ধের মধ্যে দিয়ে স্বাধীন একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেও আমরা যে রাজনৈতিক দুঃশাসন, দুর্বৃত্তায়ন ও অস্থিতিশীলতার মধ্যে হাবুডুবু খাচ্ছি, যে দুরপনেয় সাম্প্রদায়িকতা ও মৌলবাদিতা আমাদের এখনও ঘিরে রেখেছে, যে অসাম্য ও বৈষম্য আমাদের এখনও তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে তা শুধু প্রলম্বিতই হবে।

গ্রেনেড হামলা মামলার রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত বলেছেন, ‘রাজনীতি মানেই কি পৈশাচিক আক্রমণ? বিরোধীদলীয় নেতৃবৃন্দকে হত্যা করে ক্ষমতাসীনদের রাজনৈতিক ফায়দা অর্জন মোটেই গণতান্ত্রিক চিন্তার বহিঃপ্রকাশ নয়।’ আদালত জনগণের মনের কথাটিই বলেছেন, ‘সাধারণ জনগণ এ রাজনীতি চায় না।’

অন্যদিকে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫১তম সমাবর্তন অনুষ্ঠানে তার বক্তব্যে বলেছেন, রাজনীতি এখন গরিবের বউয়ের মতো হয়ে গেছে। অবসর নিয়েই আমলা, সামরিক ও পুলিশ কর্মকর্তা, ডাক্তার কিংবা উপাচার্য-শিক্ষক অনেকেই রাজনীতিতে নেমে পড়েন। রাষ্ট্রপতি হাস্যরসের মধ্যে দিয়ে বললেও এই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটিকে নতুন করে উত্থাপন করেছেন, রাজনীতি কাদের হাতে রয়েছে বা যাচ্ছে? রাজনীতি কাদের হাতে থাকা উচিত?

অবসরপ্রাপ্তরা রাজনীতি করবেন, তাতে নিশ্চয়ই কেউ আপত্তি তুলবেন না; কিন্তু প্রশ্ন হলো,রাজনীতিতে নেমেই তিনি কর্মজীবনে কথিত ‘বিশ্বস্ততার’ প্রতিদান হিসেবে সংসদ সদস্য হতে চাইছেন, মন্ত্রী হতে চাইছেন। আর তার আগে কর্মজীবনে ওই বিশ্বস্ততার রেকর্ড গড়তে গিয়ে তিনি মূলত প্রতিষ্ঠানে দলবাজি করছেন, দলীয়করণ ঘটাতে সরকারি দলকে সহায়তা করছেন।

রাজনীতি যে রাজনীতিকদের হাতে থাকছে না, এই কথাগুলো আমাদের মতো অভাজন বহুবার বলেছে, বড় বড় দলগুলো ছোট ছোট যেসব দলকে নিয়ে উপহাস করে থাকে তারাও বলেছে, এমনকি সরকারি দলের সাংসদরাও বলেছেন। যেমন, ২০১৪ সালের বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে সরকারি দল আওয়ামী লীগের একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা ও মন্ত্রী বলেছিলেন, রাজনীতি এখন আর রাজনীতিকদের হাতে নেই। তিনি অবশ্য এ জন্যে ১৯৭৫ পরবর্তী সামরিক শাসন ও শাসকদের দায়ী করেছিলেন। কিন্তু মাত্র কয়েকটি উদাহরণ যদি আমরা পেছন ফিরে দেখি, তা হলেই দেখা যাবে, সমস্যাটি আরও অনেক গভীরের, আরও অনেক সুদূরের এবং সত্যিকার অর্থে বলতে গেলে, ১৯৭২ সাল থেকেই রাজনীতি রাজনীতিকদের হাত থেকে সরে যেতে শুরু করেছে। আর নির্মম হলেও সত্য, রাজনীতিকরাই তাদের নানা তাৎক্ষণিক স্বার্থে এই প্রক্রিয়ার সূত্রপাত ঘটিয়েছেন।

যেমন, এতে কোনও সংশয় ছিল না যে, ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগই নিরংকুশ বিজয়ী হবে। কিন্তু তার পরও এই নির্বাচন শেষ পর্যন্ত যথেষ্ট স্বচ্ছ থাকেনি। যার ফলে জাতীয় সংসদে কয়েকজন বিরোধী দলীয় নেতা এমপি হিসেবে থাকলেও সাংবিধানিকভাবে তাদের পক্ষে বিরোধী দলীয় নেতা নির্বাচন করা সম্ভব হয়নি।

একই বছর অনুষ্ঠিত হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচন। এ নির্বাচনের ভোট গণনার সময় ব্যালট পেপার ছিনতাই করে বিরোধী ছাত্র সংগঠনের অবশ্যম্ভাবী বিজয়কে রুখে দেয়া হয়।

আবার স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ যে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের যুগে প্রবেশ করে, তাতে সংসদীয় রাজনীতিও বিপণ্ন হয়ে পড়ে। মুক্তিযুদ্ধের পরপরই ১৯৭২-এর ৬ জুন খুলনার আবদুল গফুরকে হত্যার মধ্যে দিয়ে সাংসদ হত্যার সূচনা হয়। প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সহিংসতা দানা বাধতে থাকে, যা নির্বাচনের পরও অব্যাহত থাকে। প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরপরই কোটালীপাড়ার সিকির বাজার থেকে নৌকায় করে গোপালগঞ্জে আসার সময় মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার ও সিপিবি নেতা ওয়ালিউর রহমান লেবু, এমপি পদপ্রার্থী ন্যাপনেতা কমলেশ বেদজ্ঞ, ছাত্র ইউনিয়ন নেতা বিষ্ণুপদ ও মানিককে কুপিয়ে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। তোলপাড় তোলা এই রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের আজও কোনও বিচার হয়নি। এরপর ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের সপরিবারে বঙ্গবন্ধু হত্যার পূর্ব পর্যন্ত বিভিন্ন সময় ছয় জন সাংসদ নিহত হন। এসবের পাশাপাশি আরও কত যে সরকারি ও বিরোধী দলীয় নেতাকর্মী রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ও সন্ত্রাসে জীবন দিয়েছেন, তার ইয়ত্তা নেই। রাজনৈতিক হত্যার যে অপসংস্কৃতি তখন শুরু হয়, তা সব রাজনীতিকের জীবনকেই অনিশ্চিত করে তোলে। এরকম সব হত্যার বিচার গত ৪৫ বছরেও হয়নি।

কার্যত বিচারহীনতার সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে রাজনীতিও ন্যাক্কারজনক ভূমিকা রাখছে। তাই গ্রেনেড হামলা মামলার রায়ের পর্যবেক্ষণ যেন শুধু গ্রেনেড হামলাকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে নয়, এ রাষ্ট্রের বিগত কয়েক দশকেরও প্রতিনিধিত্ব করছে।

ভারত ও পাকিস্তান একই সঙ্গে স্বাধীন হলেও পাকিস্তান কেন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে উঠতে ব্যর্থ হয়েছে, এর কারণ সম্পর্কে ভারতের বিশিষ্ট রাজনীতিক ও সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জী বলে থাকেন, স্বাধীন হওয়ার পর থেকেই ভারত একটি ব্যাপারে সতর্ক ছিল-রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোর দলীয় রাজনীতিকরণ যাতে না ঘটে, সে ব্যাপারে দেশটির রাজনীতিকরা সতর্ক ছিলেন। দু-একটি ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম ঘটলেও রাজনৈতিক দলগুলো দেশটির বেসামরিক প্রশাসন ও সামরিক বাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত উচ্চপদস্থ আমলাদের কখনো নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার সুযোগ দেয়নি। দু-একটি ব্যতিক্রমের কথা বলতে গিয়ে তিনি হয়তো বিজেপিকেই ইঙ্গিত করে থাকেন। কারণ বিজেপি ভারতের সাবেক সেনাপ্রধান ভি কে সিংকে মনোনয়ন দিয়েছিল। প্রতিষ্ঠানে দলীয়করণের মাধ্যমে বিজেপি ভারতকে ও ভারতের গণতন্ত্রকে যে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে, তা নিয়ে অনেক রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরই উদ্বেগ রয়েছে।

প্রণব মুখার্জীর এই কথাগুলোকে সূচক ধরে যদি বাংলাদেশকে বিবেচনায় নিই, তা হলে কী দেখতে পাই? দেখা যায়, ১৯৭৫ সালের শুরুর দিকেই দেশটি প্রথমে একদলীয় শাসনব্যবস্থার দিকে যাত্রা করে, আর এর মাত্র কয়েক মাস পরেই রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে ভয়ঙ্কর হত্যাকাণ্ডের মধ্যে দিয়ে রাষ্ট্রের স্থপতিকে সপরিবারে হত্যা করে সামরিক শাসনের সূচনা করে। এই সামরিক শাসন বৈধতা পেতে সেনানিবাস থেকে দু-দুটি রাজনৈতিক দলের জন্ম দেয়, অবসরপ্রাপ্ত ও দলছুটদের একত্রিত করে বারোয়ারী দল গঠনের পরিবেশ  তৈরি করে এবং মুক্তিযুদ্ধবিরোধী দলগুলোকে রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত হওয়ার সুযোগ করে দেয়। অন্যদিকে নির্যাতন-নিপীড়নের পথে ঠেলে দেয় নিয়মতান্ত্রিকভাবে গড়ে ওঠা দলগুলোকে, তাদের জন্যে ভাঙনের ও অনৈক্যের ফাঁদ পাতা হয়, রাজনীতিকে সত্যিই বিপজ্জনক করে তোলা হয়। এই বিপজ্জনক পরিস্থিতির মধ্যে দিয়েই এখনও এগোতে হচ্ছে এ দেশের রাজনীতিকে।

এই বিপজ্জনকতার উদ্বেগ শুধু আমাদের মধ্যেই আটকে নেই; মহামান্য রাষ্ট্রপতিকেও এখন বলতে শুনছি, ‌‘জনগণ এখন ছাত্রনেতাদের ভয় পায়’ (সমকাল, ৯ অক্টোবর ২০১৮)। যে ছাত্রসমাজ তাদের আন্দোলন-সংগ্রাম ত্যাগ তিতিক্ষার মধ্যে দিয়ে এই জাতিকে মুক্তিযুদ্ধের জন্যে প্রস্তুত করেছিল, জনগণ যদি এখন তাদেরই ভয় পায়, তা হলে সেই জনগণ ও ছাত্রসমাজের ভবিষ্যৎ বলে কি কিছু থাকে? রাষ্ট্রপতি আহ্বান রেখেছেন, যারা তরুণ বয়স থেকে রাজনীতি করবেন, রাজনীতিতে তাদেরই অগ্রাধিকার থাকা উচিত। কিন্তু সেই তরুণদের নিয়েও যে তিনি কত শঙ্কিত তার আঁচ পাওয়া যায় এই অভিযোগ থেকে, ‌‌‘ছাত্রলীগের সভাপতি যদি হেলিকপ্টারে এক জেলা থেকে অন্য জেলায় যায়, এটা কি মেনে নেয়া যায়? তারই বা আয়ের উৎস কী? কেউ কি তাকে ব্যবহার করছে?’ তিনি উদ্বিগ্ন বোধ করছেন, কেননা ছাত্রনেতারা এখন মূল দলের আজ্ঞাবহ। তাকে বলতে শুনি, ‘এখন ছাত্ররা মূল দলের পেটে ঢুকে পড়ে। সত্যিকার ছাত্র রাজনীতি করতে হলে এসব থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।’

সামনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন। যা নিয়ে সরকারি দলের মতে, উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনও কারণ নেই; কিন্তু বিরোধী বেশ কিছু দলের মতে, উদ্বেগ-আশঙ্কা রয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে রাজনীতি কাদের হাতে আছে, ভবিষ্যতে কাদের হাতে থাকবে— এ সব প্রশ্নের নিরসন হওয়াও গুরুত্বপূর্ণ। এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুজেঁ নেয়া এখন খুবই জরুরি— যারা অগণতান্ত্রিকতার চর্চা করেন, তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার বলতে কী বুঝব? অগণতান্ত্রিক, মৌলবাদী শক্তিকে গণতান্ত্রিক উপায়ে রুখে দেয়ার পন্থা আসলে কী? রক্তপাতের আশঙ্কাকে আমরা দূর করব কী করে— নির্বাচনে যে কোনও উপায়ে বিজয় নিশ্চিত করে, না কি ইতিবাচক রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রসার ঘটিয়ে? সরকারি দল থেকে বিরোধী দল— কে কাকে মনোনয়ন দেয়ার চিন্তাভাবনা করছেন, সেসব থেকেই অবশ্য আমরা খানিকটা আঁচ করতে পারছি যে, আমাদের সামনে আপাতত কোনো আশার আলো নেই। আশার আলো জ্বালানোই এখন আমাদের বড় সংগ্রাম।

গত কয়েক দশকে রাজনীতিকে কুক্ষীগত করে রাখার নানা প্রচেষ্টাই দেখা গেছে। তার গড় ফল হলো কি রাজনীতিক কি জনগণ— উভয়েই নিরাপত্তাহীন ও অধিকারহীন হয়ে পড়েছেন। কেবলমাত্র রাজনৈতিক স্বচ্ছতার মধ্যে দিয়েই রাজনীতিকরা পারেন এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে। পারেন রাজনীতিকে নিজেদেরই হাতে রাখতে। পারেন আশার আলো জ্বালাতে।

সংশ্লিষ্ট খবর


মন্তব্য যোগ করুণ

পরের
খবর

ইতিহাসের সন্ধিক্ষণে আসাম


আরও খবর

চতুরঙ্গ
ইতিহাসের সন্ধিক্ষণে আসাম

প্রকাশ : ০৬ নভেম্বর ২০১৮

তপোধীর ভট্টাচার্য

  তপোধীর ভট্টাচার্য

আজ থেকে ঠিক চার মাস আগে লিখেছিলাম- শরশয্যায় রয়েছে আসামের বাঙালি। যারা এই প্রদেশে বিরাজমান জাতিবিদ্বেষ ও হিংস্র ঘৃণার বেপরোয়া অভিব্যক্তি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল, তাদের কেউই অবাক হননি। কিন্তু উচিত বক্তা বিষবৎ। তাই যাদের আঁতে ঘা লেগেছিল, তারা দিনের পর দিন চ্যানেলে–‌চ্যানেলে বিষ ঢেলেছে। শেষ পর্যন্ত লিখিয়েকে চূড়ান্ত হেনস্থা করতে চেয়েছে। শরশয্যা যে মহাভারত থেকে নেওয়া রূপক, এই সহজ কথাটিও বুঝতে চায়নি। না বুঝুক, তাতে যে সত্য ঢাকা পড়ে না তা তো কিছুদিন পরেই স্পষ্ট হল।

এ পোড়া দেশের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা ভোটের ঢাকে কাঠি হিসেবে যখন বাপে–‌তাড়ানো, মায়ে–‌খেদানো বাঙালির জন্য বেছে নিলেন ‘‌উইপোকা’‌ আর ‘‌ঘুসপেটিয়া’‌ বিশেষণ, শরশয্যার আসল অর্থ দিনের আলোর মতো পরিষ্কার হয়ে গেল। কে মূল কীর্তনিয়া আর কে বা দোহার- এ বিষয়ে তর্কের কোনও দরকার নেই। এক ভস্ম আর ছার, দোষ–‌গুণ কব কার!‌ সবই সাম্প্রদায়িকতার রকমফের।

তবে এই মুহূর্তে সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ঘটনা পয়লা নভেম্বর অাসামের তিনসুকিয়া জেলার প্রত্যন্ত এলাকা সদিয়ার একটি গ্রামে পরিকল্পিত গণহত্যার সূচনা। নিতান্ত দিনমজুর শ্রেণির ধনঞ্জয় নমশূদ্র, সুবল বিশ্বাস, শ্যামলাল বিশ্বাস, অনন্ত বিশ্বাস ও অবিনাশ বিশ্বাসকে ঘাতকেরা ঠান্ডা মাথায় খুন করেছে।

ইতিমধ্যে আলফার (‌স্বাধীন)‌ একজন ক্যাডারকে পুলিশ ধরেছে। কিন্তু নিয়মমাফিক এ সব কথা যখন অচিরেই ভুলে যাব আমরা, বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদতেই থাকবে। এদের পক্ষে বিবৃতি অবশ্য জারি হয়েছে যে, এই পাঁচজন ‘‌‌উইপোকা’‌ বিদেশিকে ওরা মারেনি। তা হলে অসম সরকার যত‌ আশ্বাসই দিক বা আস্ফালন করুক, মারল কারা?‌ ইংরেজিতে যে ‘‌ডিপ স্টেট’‌ বলা হয়, সেই অদৃশ্য অমোঘ শক্তি এদের আততায়ী নয় তো?‌

আলফার বীরপুরুষেরা রাষ্ট্রের কাছে আত্মসমর্পণ করে ‘‌সালফা’‌ পদবি পেয়েছিল, তাদের কে কোথায় কী করছে কেউ তো সে–‌খবর রাখার কথা ভাবেনি। আসামে যখন চরম নৈরাজ্য চলছে, ঘৃণা ও বিদ্বেষের পাটিগণিতে কার ভূমিকা কীরকম, তা জানবার কি উপায় আছে কোনও?‌ আমরা, যারা সাধারণ নাগরিক, কোনওদিন বুঝতেই পারি না, রাজনৈতিক প্রক্রিয়া ও রাষ্ট্রতন্ত্রের কাছে আমজনতার দাম কানাকড়িও নয়।

তাই নরখাদক রাষ্ট্রতন্ত্রের পোয়াবারো হয় সঙ্ঘাত, বিদ্বেষ ও ঘৃণার বাতাবরণে। এনআরসির অজুহাতে আঞ্চলিক প্রভুত্ববাদকে প্রশ্রয় দিয়েছে যে বাঙালির প্রতি চিরবিদ্বেষ–‌প্রবণ, হিন্দি–‌হিন্দু–‌হিন্দুস্থান নীতির প্রবক্তা শাসকশক্তি, তাদের ক্ষমতা–‌দখলের দাবাখেলায় ওই পাঁচজন নিহত বাঙালি বোড়ে ছাড়া অন্য কিছু নয়।

তাই মৃণাল হাজারিকা, জিতেন দত্ত, অখিল গগৈ এবং তাদের প্রীতি–‌খেলার প্রতিপক্ষ সরকার বাহাদুর ইতিহাস ভুলে যাক, মহাভারত ভুলে যাক, হাতে–‌মুখে সেঁটে–‌থাকা নাছোড়বান্দা রক্তের দাগ অস্বীকার করুক- ধারাবাহিক ঘৃণা–‌বিদ্বেষ–‌গণহত্যার কলঙ্কিত বৃত্তান্ত মুছে ফেলা অসম্ভব। একতরফা আনুগত্য–‌সহ মেরুদণ্ড যদি প্রভুশক্তির কাছে সমর্পণ করে দেয়ও অসহায় ছাপোষা বাঙালি, আত্মপ্রতারণা কোন পর্যায়ে পৌঁছলে তবে ধারাবাহিক লাঞ্ছনা–‌অপমান–‌নির্যাতন ভুলে থাকা সম্ভব?‌

অর্জুন নমশূদ্র থেকে দীপক দেবনাথ পর্যন্ত যে–‌বাঙালিরা আত্মহত্যা করে এনআরসি ডি–ভোটার–‌ডিটেনশন ক্যাম্পের আতঙ্ক এড়াতে চাইলেন, গণহত্যার মিছিলের বাইরে তো নন তাঁরা। এই সভ্যতা–‌বিরোধী, মানবতা–‌বিরোধী রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের কি বিচার নেই কোনও?‌ যে–‌কথাটা লিখতে চাইছি, তা হল, এর উৎস হল সেই দাম্ভিক ঘোষণায়:‌ আসাম শুধু আসামিয়াদের জন্যে। বাঙালি–‌বোড়ো–‌কোচ–‌রাজবংশি–‌ডিমাসা–‌কার্বি–‌মণিপুরি–‌নেপালি— কোনও অনসমিয়া ভাষাগোষ্ঠীর ঠাঁই নেই এখানে। ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্টের আগে আবহমান যে–‌ভারতবর্ষের সন্ততি আমরা সবাই, যে ভাষাতেই কথা বলি না কেন এবং অখণ্ড ভারতের যে–‌খণ্ডিত অংশেই বাস করি না কেন, আমাদের কেউ বিদেশি বা বহিরাগত নয়। আমরা সবাই ভারতীয়। আমরা প্রত্যেকে অসমের ভূমিপুত্র।

অথচ সহজতম ও সবচেয়ে মৌলিক এই সত্যটি শুধুমাত্র জাতিবিদ্বেষের কুযুক্তিতে অস্বীকার করা হয়েছে। হিটলারের প্রচার–‌সচিব গোয়েবলস যেমন ভাবত, হাজারবার মিথ্যা বললেই তা সত্য হয়ে ওঠে, একই নীতিতে আঞ্চলিক প্রভুত্ববাদের প্রশ্রয়দাতা আধিপত্যবাদী আর্যাবর্ত অসমকে ‘‌উইপোকা’‌তুল্য বাঙালিদের নিশ্চিহ্ন করার পরীক্ষাগার হিসেবে ব্যবহার করছে। ভারতে কোথাও বাঙালিরা যে নিরাপদ নয়, সেই অশনি‌ সংকেত দিয়ে গেছে তিনসুকিয়ার প্রত্যন্ত গ্রামে আততায়ীর তাণ্ডব।

এই মর্মান্তিক সত্যটা আগে বুঝে নিই, ধলা সদিয়ার গণহত্যা কোনও আকস্মিক কথা নয়। এমনই চলে এসেছে সাত দশক ধরে। ১৯৫০–‌এর মার্চ–‌এপ্রিলে অসম পুলিসের যোগসাজশে বঙ্গাইগাঁও এবং বরপেটা এলাকায় তিতাপানি, বগুলামারি, বালাগাঁও ইত্যাদি গ্রামে কয়েকশো মানুষ গণহত্যার শিকার হয়েছিল। একদিকে যেমন বহু বাঙালি মুসলমান পূর্ব পাকিস্তানে চলে যান, তেমনি বেশ কিছু বাঙালি হিন্দুও প্রশাসনিক অত্যাচারের কবলে পড়েন। এই কালো ইতিহাস সবিস্তারে লেখার দরকার নেই। ১৯৬০–‌এ গৈরেশ্বরের হত্যাকাণ্ড বা ১৯৮৩–‌র ১৮ ফেব্রুয়ারি নগাঁও জেলার জাগী রোড সংলগ্ন নেলিতে ৬ ঘণ্টার গণহত্যায় তিন হাজার বাঙালি মুসলমানের প্রাণহানি শঙ্করদেব–‌আজান ‌ফকির–বিষ্ণু রাভা–‌হেমাঙ্গ বিশ্বাস–‌ভূপেন হাজারিকার অসমকে চিরদিনের মতো কলঙ্কিত করেছে। নাগরিক অধিকার রক্ষা সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট কালীপদ সেনকেতাঁরই বাড়িতে দিবালোকে ১৯৮৬ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর খুন করে উগ্র বাঙালি–‌বিদ্বেষী আততায়ী। আবার ১৯৭৯–’‌৮৩ সালের মধ্যে কৃষক নেতা ধীরেশ্বর নাথ–‌সহ ৬৫ জন বামপন্থী কর্মী নিহত হয়েছিলেন।

এই প্রেক্ষিতেই পরাভূত হয়েছে সমাজের ইতিবাচক শক্তি। নইলে কি গত তিন বছরে ধাপে ‌ধাপে জাতিবিদ্বেষ অসমের আলো–‌হাওয়া–‌রোদকে এতখানি কলুষিত করতে পারে?‌ অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় যে–‌বুদ্ধিজীবী সত্তর ও আশির দশকে প্রতিস্রোতের মূর্ত প্রতীক ছিলেন, তিনিও এই দুঃসময়ে হয়ে ওঠেন পুরোপুরি অচেনা এক পথভ্রান্ত মানুষ!‌‌ ‌বাঙালি এবং তার ভাষা–সংস্কৃতিকে একতরফা আক্রমণ করে সংখ্যাগুরু ভাষাগোষ্ঠীর কি কল্যাণ হতে পারে, নাকি হওয়া সম্ভব?‌ তা ছাড়া মানুষের এই পৃথিবীতে কেউই বিচ্ছিন্নভাবে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারে না। আমরা একে অপরের সহযোগী সত্তা। তা হলে কেন এত ঘৃণা, এত বিদ্বেষ, এত আক্রোশ?‌ গণহত্যায় প্রাণ হারাল যে পাঁচজন অসহায় বাঙালি, তাদের সঙ্গে দিন–আনা দিন–খাওয়া অসমিয়া বা বোড়ো বা নেপালি বা মণিপুরি ভাষায় কথা–বলা মানুষের তফাত কী?‌ তা হলে প্রথমে এনআরসি এবং তার পোঁ–ধরা তাৎপর্যশূন্য নাগরিকত্ব সংশোধনী বিলকে যে রাষ্ট্রযন্ত্র এবং তার তাঁবেদার ভাষিক আধিপত্যবাদ সন্ত্রাসের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করল- ইতিহাস কি ক্ষমা করবে তাদের?‌

অথচ দেখতে দেখতে আমরা আগ্নেয়গিরির শিখরে পৌঁছে গেছি আজ। কী এর পরিণাম, ভাবতেও শরীর–মন শিউরে ওঠে। অথচ এখনও বাঙালি জাতিসত্তার তাৎপর্য বোঝেনি। নইলে হিন্দু বাঙালি বা মুসলমান বাঙালির মতো কাঁঠালের আমসত্ত্ব এখনও চলে আসে আমাদের জিহ্বা ও কলমের ডগায়?‌ কবে বুঝব, বাঙালি শুধুই বাঙালি, ধর্মবিশ্বাস কখনই তার জাতিসত্তার পরিচায়ক নয়!‌ অথচ এর সুযোগ নিচ্ছে শত্রুপক্ষ। আমরা ইদানীং নতুন দ্বিজাতিতত্ত্বের আমদানিতে কিছুটা বিভ্রান্ত‌- শরণার্থী ও অনুপ্রবেশকারী। সেইজন্যে যখন ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিরোধ করার কথা, আমরা বিভাজিত হয়ে যাই। আর কতদিন এই আত্মহননের মড়ক মেনে নেব?‌ যে সর্বনাশ দেশভাগ করে দিয়েছে, তা কি চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত হয়ে থাকবে?‌ তাহলে রবীন্দ্রনাথ–নজরুল–সুনীতিকুমার–শহীদুল্লাহের মতো মহাজনেরা কী শেখালেন আমাদের?‌

না, আমি শ্মশানে বসে পুষ্পক হাসি হাসছি না। বরং লিখতে চাইছি:‌ ভাঙন পিছনে থাক, সম্মুখে নির্মাণ। তিনসুকিয়ায় ওই পৈশাচিক গণহত্যা আমাদের জড়তা দূর করুক। কে জানে, রাতের সবচেয়ে অন্ধকার প্রহরই হয়তো বা ভোরের পূর্বযাম!‌ সবকিছু যে নষ্ট হয়ে যায়নি, এর প্রমাণ সম্ভবত গতকালই পাওয়া গেল গুয়াহাটির পাণ্ডুমানিগাঁও এলাকায় গণহত্যা–বিরোধী প্রতিবাদী মিছিলে। কেননা, তাতে বিক্ষুব্ধ বাঙালির সঙ্গে পায়ে পা মিলিয়েছেন বিষণ্ণ অসমিয়া তরুণ। এরকম দৃশ্য খুব সুলভ নয় এখন;‌ তবু এই দৃশ্যেরই পুনর্জন্ম চাই। তবে দৃশ্যও প্রতারক হবে যদি সর্বত্র ব্যাপ্ত অবিশ্বাস ও অসহিষ্ণুতার বাতাবরণকে দূর করতে না পারি!‌ যত ক্ষত হয়ে গেছে ইতিমধ্যে, তাদের নিরাময় অসম্ভব নয়। তবে শুশ্রূষার বিশল্যকরণী তখনই সক্রিয় হবে যদি এনআরসি ও নাগরিকত্ব যে বাঙালি–‌সহ অনসমিয়াদের গিলোটিন নয়, তা নিঃসংশয়ে প্রমাণিত হলে। এক্ষেত্রে রাষ্ট্রযন্ত্রকেই সদিচ্ছার প্রমাণ দিতে হবে। নইলে আমরা যতই প্রত্যাশার কথা লিখি না কেন, বিদ্বেষসর্বস্ব আততায়ীরা আশপাশে লুকনো অন্ধকার থেকে হঠাৎ ঝাঁপিয়ে পড়ে আমাদের সমস্ত বিশ্বাসকে ধস্ত করবে। ৭২ বছরে অনেক হারিয়েছি, আর হারাতে চাই না।‌‌‌

লেখক: বিশিষ্ট লেখক ও গবেষক। প্রাক্তন উপাচার্য ও ইমেরিটাস অধ্যাপক: আসাম বিশ্ববিদ্যালয়।


লেখাটি ৬ নভেম্বর ভারতের আজকাল পত্রিকায়

পরের
খবর

বটতলা থেকে ৩২ নম্বরে


আরও খবর

চতুরঙ্গ
বটতলা থেকে ৩২ নম্বরে

প্রকাশ : ০৪ নভেম্বর ২০১৮

  অজয় দাশগুপ্ত

বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট তার নিজের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পরিদর্শনের কথা ছিল। সেদিন প্রত্যুষেই তাকে পরিবারের সদস্যদেরসহ হত্যা করা হয়। এ ঘটনার তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ বাংলাদেশের নানা প্রান্তে হয়েছে। কিন্তু আমরা কিছুটা সময় নিয়েছি বড় ধরনের প্রতিবাদ সংঘটন এবং জাতির পিতার প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শনের। এর আরেকটি কারণ ছিল, ১৫ আগস্টের পরপর দেশের অগ্রণী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ছাত্র আন্দোলনের প্রাণকেন্দ্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রায় দেড় মাসের জন্য বন্ধ হয়ে যাওয়া। সে সময়ে আমি ছিলাম বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগের অঙ্গ সংগঠন হিসেবে গঠিত জাতীয় ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য। আমাদের কমিটির সদস্য বঙ্গবন্ধুপুত্র শেখ কামালকেও ১৫ আগস্টে হত্যা করা হয়। কমিটির কয়েকজন সদস্য ১৫ আগস্টের পর নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েন; দুয়েকজন খুনিচক্রের সঙ্গে হাত মেলাতে তৎপর হয়। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের দুই মাস পর ১৮ অক্টোবর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস শুরু হয়। অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানও রমজান ও শারদীয় দুর্গাপূজার টানা ছুটির পর খুলতে শুরু করে। আমরা ১৭ অক্টোবর গভীর রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ভবনে তিনটি স্লোগান লিখে প্রতিবাদের নতুন অধ্যায়ের সূচনা করি- জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু এবং এক মুজিবের রক্ত থেকে লক্ষ মুজিব জন্ম নেবে। এ কাজে ঝুঁকি ছিল প্রচণ্ড। প্রতি রাতে কারফিউ বলবৎ ছিল। আর্মি-পুলিশ নিয়মিত টহল দিত। খুনিদের চরেরা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে সক্রিয় ছিল। কলাভবনের অদূরে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ও শাহবাগের মোড়ের কাছে বেতার কেন্দ্রে ছিল ট্যাঙ্ক-মেশিনগান সজ্জিত খুনিচক্রের সদস্যরা।

১৯৭৫ সালের ৫ নভেম্বরের সংবাদপত্র থেকে

ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়নের নেতাকর্মীরা ২০ অক্টোবর মধুর ক্যান্টিনে সমবেত হয়ে মিছিল বের করে, যা কলাভবনের বিভিন্ন ফ্লোর প্রদক্ষিণ করে। পরদিনও মিছিল হয় এবং মিছিল শেষে ২৯ অক্টোবর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলা থেকে ধানমণ্ডি ৩২ নম্বর সড়কে শোক মিছিল নিয়ে যাওয়ার কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। পরে প্রস্তুতির সুবিধার জন্য মিছিলের কর্মসূচি নির্ধারিত হয় ৪ নভেম্বর।

এ কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের আহ্বান জানিয়ে আমরা বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে লিফলেট বিতরণ করি। আমরা কলাভবন ও কার্জন হলের ক্লাসে ক্লাসে গিয়ে বক্তব্য রাখি, যাতে ছাত্রছাত্রীরা কর্মসূচিতে যোগ দেয়। একই সঙ্গে বরেণ্য শিক্ষক-সাংবাদিক-আইনজীবী-সংস্কৃতিসেবীরা যাতে শোক মিছিলে অংশ নেন, সে জন্যও অনুরোধ জানাতে থাকি। ৪ নভেম্বর সকালে বটতলায় বিপুল সংখ্যক ছাত্র-জনতার সমাবেশ ঘটে। তখন দুটি খবর আমাদের উদ্বিগ্ন করে- এক, ২ নভেম্বর গভীর রাতে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে প্রচণ্ড গোলাগুলি হয়েছে এবং কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ বন্দি নিহত হয়েছেন। দুই, সেনাবাহিনীর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দি করে নতুন একটি সামরিক অভ্যুত্থান সংঘটিত করেছেন। বলা যায়, এক উদ্বেগ ও অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে আমরা বটতলা থেকে মিছিল নিয়ে বঙ্গবন্ধুর বাসভবনের পথে যাত্রা শুরু করি। মিছিলটি নীলক্ষেত মোড়ে পৌঁছলে সেনাবাহিনী তাতে বাধা দেয়। অনেক তর্ক-বিতর্কের পর পথের বাধা দূর হয়। হাজার হাজার নারী-পুরুষ পৌঁছে যায় সেই ঐতিহাসিক স্থানটিতে, যেখান থেকে বঙ্গবন্ধু ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ গভীর রাতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট এখানেই তাকে হত্যা করা হয়েছিল। ঘাতকেরা ক্ষমতা দখল করে বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের সদস্যদের সম্পর্কে দেশ-বিদেশে কুৎসা-অপপ্রচার চালাচ্ছিল। এটাও বলা হচ্ছিল- হত্যাকাণ্ডের কোনো প্রতিবাদ কেউ করেনি। কিন্তু ৪ নভেম্বরের মিছিল থেকে দেশবাসী বার্তা পায়- বাংলাদেশের জনগণের মনে বঙ্গবন্ধু আছেন, থাকবেন।

১৯৭৫ সালের ৬ নভেম্বরের সংবাদপত্র থেকে

বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফেরার সময় আমরা নিশ্চিত হই যে, ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে স্বাধীনতা সংগ্রামের চার মহান নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী ও এএইচএম কামারুজ্জামানকে ২ নভেম্বর গভীর রাতে ব্রাশফায়ারে হত্যা করা হয়েছে। এ ঘৃণ্য কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিকে নিশ্চিহ্ন করার দুরভিসন্ধি থেকে। সন্দেহ নেই, সে ঘটনায় আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগী বিভিন্ন সংগঠনের নেতাকর্মীদের মনোবল অনেকটা ভেঙে যায়। এ সুযোগেই জিয়াউর রহমান ৭ নভেম্বর পাল্টা অভ্যুত্থান সংঘটিত করতে পারেন।

জেলাহত্যার প্রতিবাদে আমরা ৫ নভেম্বর অর্ধদিবস হরতাল আহ্বান করি। হরতাল শেষে বায়তুল মোকাররমের সামনে অনুষ্ঠিত হয় গায়েবানা জানাজা।

৪ নভেম্বর ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সিনেট অধিবেশন। সেখানে ছাত্র প্রতিনিধি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মাহবুব জামান, ইসমত কাদির গামা ও অজয় দাশগুপ্ত। আমরা বিশ্ববিদ্যালয় চ্যান্সেলর ও রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডের নিন্দা জানিয়ে প্রস্তাব উত্থাপন করি এবং সেটা সর্বসম্মতভাবে পাস হয়। সিনেট অধিবেশন থেকেই আমরা তিনজন সরাসরি চলে যাই কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে, যেখান থেকে ৫ নভেম্বরের হরতাল কর্মসূচির সমর্থনে মিছিল বের হয়।

লেখক: সাংবাদিক

সংশ্লিষ্ট খবর

পরের
খবর

বিএনপি নেতাদের প্রথম গণভবন দর্শন


আরও খবর

চতুরঙ্গ

  অজয় দাশগুপ্ত

সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে ১ নভেম্বর সন্ধ্যায় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফকরুল ইসলামসহ বিএনপি আরও চার গুরুত্বপূর্ণ নেতা প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠকে অংশ নিচ্ছেন। তবে তারা এ জন্য নেতা হিসেবে সামনে রেখেছেন ড. কামাল হোসেনকে, গণভবন যার কাছে খুব চেনা। চার দশক আগে ১৯৭৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে গঠিত সামরিক শাসক জিয়াউর রহমানের দল বিএনপির নেতাদের এটাই হবে প্রথম আনুষ্ঠানিক গণভবন দর্শন। সেখানে তাদের অবস্থান স্বস্তির হোক, আনন্দপূর্ণ হোক- এটাই কাম্য। তবে জিয়াউর রহমান সেনাবাহিনীর উপপ্রধান হিসেবে প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার জন্য শেরে বাংলা নগরের গণভবনে গিয়েছিলেন। বেগম খালেদা জিয়া স্বাধীনতার পর জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে একজন গৃহবধূ হিসেবে পারিবারিক সমস্যা নিয়ে কথা বলেছেন। তবে দু'জনের এ সাক্ষাৎ সম্ভবত ধানমণ্ডি ৩২ নম্বর সড়কে বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে অনুষ্ঠিত হয়েছে।

বেগম খালেদা জিয়ার গণভবন দর্শন ২০১৩ সালের ২৮ অক্টোবরেই হতে পারত। ২৫ অক্টোবর ঢাকার সোহরাওয়ার্দি উদ্যানের এক জনসভায় বেগম খালেদা জিয়া 'আজ-কালের' মধ্যে সংলাপের ব্যবস্থা করার জন্য প্রধানমন্ত্রীর কাছে দাবি জানান। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পরদিন খালেদা জিয়াকে ফোন করে ৩৭ মিনিট কথা বলেন এবং গণভবনে বৈঠকের জন্য আমন্ত্রণ জানান। কিন্তু খালেদা জিয়া 'হরতালের মধ্যে' (তখন ৬০ ঘণ্টার হরতাল চলছিল) আলোচনায় অংশ নিতে পারবেন না বলে জানিয়ে দেন। এভাবে তার গণভবন দর্শনের সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যায়। গত পাঁচ বছরে বিএনপির নেতারা প্রধানমন্ত্রীর কাছে আলোচনায় বসার জন্য বার বার আহ্বান জানিয়েছেন। কিন্তু তাতে সাড়া মেলেনি। গণভবন দর্শনও হয়নি।

এরপর ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। বিএনপি তা কেবল বয়কট করেনি, প্রতিহতের চেষ্টা করে। বেগম খালেদা জিয়া সংসদ সদস্য না থাকায় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সংসদ ভবনে দেখা হয়নি তার। পরের বছরের প্রথম তিন মাস বিএনপি শেখ হাসিনার সরকারকে উৎখাতের জন্য টানা হরতাল-অবরোধ কর্মসূচি বলবৎ করার চেষ্টা করে। এ কর্মসূচি চলাকালে ২৪ জানুয়ারি খালেদা জিয়ার কনিষ্ঠ পুত্র আরাফাত রহমান কোকোর মৃত্যু হয়। সে সময়ে সমবেদনা জানাতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিএনপির গুলশানস্থ কার্যালয়ে গিয়েছিলেন বেগম খালেদা জিয়াকে সমবেদনা জানাতে। কিন্তু বিএনপির নেতা-কর্মীরা প্রধানমন্ত্রীকে ভেতরে প্রবেশ করতে দেয়নি। এভাবে দুই নেত্রীর সাক্ষাতের আরেকটি সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যায়। পাকিস্তান আমলের শেষ দিকে পূর্ব পাকিস্তানে ক্ষমতা ছিল প্রাদেশিক গভর্নরের হাতে। তার অফিস ও বাসবভন ছিল গভর্নর হাউসে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জনের পর গভর্নর হাউস বঙ্গবভন নাম পায়। এটা পরিণত হয় রাষ্ট্রপতির অফিস ও বাসসভনে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রমনা পার্কের কাছে একটি অপেক্ষাকৃত ছোট দ্বিতল ভবনকে প্রধানমন্ত্রীর অফিস হিসেবে ব্যবহার শুরু করেন। এর নাম দেওয়া হয় 'গণভবন'। ১৯৭৪ সালে শেরে বাংলা নগরে বর্তমান গণভবন নির্মাণ কাজ শেষ হলে বঙ্গবন্ধু সেখানে অফিস শুরু করেন। তবে বঙ্গবন্ধু বরাবরই ধানমণ্ডি বাসভবনে থেকেছেন। আমার দুটি গণভবনেই বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ ঘটেছে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর সামরিক শাসন জারি হলে গণভবনকে পরিণত করা হয় সামরিক আদালতে। জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতি ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে অফিস করতেন বঙ্গভবনে। আর বসবাস করতেন ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে। এইচ এম এরশাদ সামরিক শাসক এবং প্রেসিডেন্ট হিসেবে ক্যান্টনমেন্টে বসবাস করতেন। তবে তার আমলে তেজগাঁওয়ে সাবেক সংসদ ভবনকে রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ে পরিণত করা হয়। বেগম খালেদা জিয়া ১৯৯১ সালে প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হয়েও এখানেই অফিস করতে থাকেন। এভাবে আমরা পেয়ে যাই প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, যা এখনও চালু আছে। তবে খালেদা জিয়া বসবাস করতে থাকেন ক্যান্টনমেন্টে।

১৯৯৬ সালের ২৩ জুন প্রথম বারের মতো প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেন শেখ হাসিনা। শেরে বাংলা নগরের গণভবন তার কাছে কেবল একটি অফিস নয়, ছিল গভীর আবেগের। ১৯৭৫ সালের ১৪ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এখানেই সর্বশেষ অফিস করেছেন। শেখ হাসিনার প্রধানমন্ত্রীর আমলে গণভবন তার বাসস্থানে পরিণত হয়। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী কার্যালয় রয়ে যায় তেজগাঁতেই। ২০০১ সালে বেগম খালেদা জিয়া ফের প্রধানমন্ত্রীর পদ গ্রহণ করেন। কিন্তু তিনি প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন হিসেবে গণভবনকে কখনও ব্যবহার করেননি। কেন গণভবনে আপত্তি, তার কারণ বোধগম্য নয়। ফের এ ভবনটি পরিত্যক্ত ঘোষণা হয়। বিএনপি নেতারাও গণভবন দর্শনের সুযোগ পাননি। ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণের পর শেখ হাসিনা আবার গণভবনে বসবাসের জন্য ফিরে যান। তার দায়িত্ব পালনকালে বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের কোনো নেতা গণভবনে গিয়েছিলেন, এমনটি জানা যায় না। বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিবিজরিত এ স্থানটি তাদের কখনও আকৃষ্ট করেনি। ১ নভেম্বর (২০১৮) হবে তাদের প্রথম গণভবন দর্শন। কেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের মহানায়কের অফিসটিকে জিয়াউর রহমান 'সামরিক আদালতে' পরিণত করেছিলেন, সে প্রশ্ন তাদের মনে একবারের জন্যও উদয় হবে কি? চার দশক ধরে বঙ্গবন্ধুর অবদান অস্বীকার করার নীতিও কি সঠিক ছিল?

লেখক: সাংবাদিক

৩১ অক্টোবর, ২০১৮

ajoydg@gmail.com



File:- সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে ১ নভেম্বর সন্ধ্যায় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফকরুল ইসলামসহ বিএনপি আরও চার গুরুত্বপূর্ণ নেতা প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠকে অংশ নিচ্ছেন।