চতুরঙ্গ

যে সাংবাদিকের মিথ্যা সংবাদ ছাপানোর উদ্দেশ্য নেই, তার ভয়েরও কিছু নেই

প্রকাশ : ০১ অক্টোবর ২০১৮ | আপডেট : ০১ অক্টোবর ২০১৮

যে সাংবাদিকের মিথ্যা সংবাদ ছাপানোর উদ্দেশ্য নেই, তার ভয়েরও কিছু নেই

সজীব ওয়াজেদ জয়— ফাইল ছবি

  সজীব ওয়াজেদ জয়

কিছু মহল থেকে নতুন ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের সমালোচনা করা হচ্ছে। তাদের মূল আপত্তির জায়গা আইনটির বিশেষ কিছু ধারা। আইসিটি ডিভিশন যখন আইনটির খসড়াগুলো তৈরি করে তখন সেগুলো দেখার সুযোগ আমার হয়েছিল। সকলের সুবিধার্থে এই বিষয়ে আমার মতামত তুলে ধরছি:

সরকারি অফিসের কম্পিউটারে হ্যাকিং এবং গোপনে নজরদারির ক্ষেত্রে আইনের দরকার জনগণের তথ্য ও গোপনীয়তা রক্ষার স্বার্থেই। এই আইনের আগে হ্যাকিং ও তথ্য চুরির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার কোনো আইনি ভিত্তি দেশে ছিল না। তাহলে এই আইনের সাহায্য ছাড়া কিভাবে হ্যাকিং ও তথ্য চুরির বিচার হবে? সরকারি কম্পিউটারে জনগণের জাতীয় পরিচয়পত্রসহ নাগরিকদের অনেক রকম তথ্য সংগৃহীত থাকে। ব্যাংক হিসাব, স্বাস্থ্য বিষয়ক তথ্য, জমির রেকর্ড সবকিছুই আজকাল ডিজিটাইজ করে সংগ্রহ করা হচ্ছে। এগুলো যদি হ্যাক করা হয়, তার দায়ভার কে নেবেন? দায় কিন্তু তখন সরকারের উপরই আসবে। তাই, তথ্য প্রযুক্তি উপদেষ্টা হিসেবে আমি এই আইন প্রণয়নের সুপারিশ করি হ্যাকিং ঠেকানোর জন্য। 

শুধু তাই নয়, সরকারি অফিসে ডিজিটাল নজরদারির মাধ্যমে জনগণের তথ্য সম্বলিত বিভিন্ন দলিল বা নথির ছবি বা ভিডিও তোলাও সম্ভব। গোপনে অডিও রেকর্ডিংয়ের মাধ্যমেও নাগরিকদের অনেক সংবেদনশীল তথ্যের আলোচনা শুনে ফেলা সম্ভব, এমনকি ওয়াই-ফাই পাসওয়ার্ডও।

এর মাধ্যমে হয়তো একজন সাংবাদিকের কাজ কঠিন হয়ে যেতে পারে। কিন্তু কারো দুর্নীতি ফাঁস করার জন্য একজন সাংবাদিকের কি সরকারি অফিসের কম্পিউটার হ্যাক করে নাগরিকদের সংবেদনশীল তথ্য চুরির অধিকার থাকা উচিত? পৃথিবীর কোনো দেশই কিন্তু বেআইনিভাবে সাংবাদিকদের তথ্য সংগ্রহ করার সুযোগ দেয় না, এমনকি যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপিয়ান ইউনিয়নও না। সরকারি অফিসে গোপনে নজরদারি করা সবদেশেই আইনবহির্ভূত, সাংবাদিকদের জন্যও। সাংবাদিকদের তাদের তথ্য অন্যান্য সূত্র থেকে জোগাড় করতে হয়।

যেসব কূটনৈতিক মিশন এই আইনটি নিয়ে আপত্তি তুলেছেন তাদেরকে আমি একটি প্রশ্ন করতে চাই— সাংবাদিকরা কি আপনাদের দূতাবাসের ভেতরে গোপনে নজরদারি করার যন্ত্রপাতি নিয়ে আসতে পারবেন?

আরেকটি আপত্তির জায়গা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতিকরণ নিয়ে যে ধারাটি, সেটি নিয়ে। আমরা দেখেছি কীভাবে ১৫ই আগস্ট ১৯৭৫ এর পর বিএনপি জামায়াত আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনের ঘটনাবলিকে বিকৃত করার অপপ্রয়াস চালিয়েছে। এই বিকৃতিকরণের পেছনে কারণ ছিল যুদ্ধাপরাধীদের মন্ত্রী বানানো ও বঙ্গবন্ধুর খুনিদের প্রতিষ্ঠিত করা। এইসবের বিরুদ্ধে কি কোনো আইন থাকা উচিৎ নয়? আমরা কি ভবিষ্যতে আবারও এই অপরাজনীতির পুনরাবৃত্তি দেখতে চাই? আইনটির এই ধারার বিরুদ্ধে যারা বলছেন তারা আসলে বাঙালি নন। তারা গোপনে জামায়াত সমর্থক রাজাকার।

ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের হলোকাস্ট ডিনায়াল আইনের উপর ভিত্তি করেই এই ধারাটি প্রণয়ন করা হয়েছে। ১৬টি ইউরোপিয়ান দেশে হলোকাস্টে “স্বীকৃত সংখ্যা” থেকে কম মানুষ মারা গিয়েছে এই কথা বললেও কারাদণ্ড দেয়া হয়। এর মধ্যে অনেক দেশ আছে যাদের দূতাবাসগুলো বাংলাদেশে আমাদের এই আইন নিয়ে আপত্তি তুলেছে।

যেসব ইউরোপিয়ান দূতাবাস আমাদের এই আইন নিয়ে আপত্তি তুলেছে, তাদের প্রতি আমার প্রশ্ন— আপনাদের হলোকাস্ট ডিনায়াল আইন থাকতে পারলে আমাদের কেন একই রকম আইন থাকতে পারবে না? আমাদের আইন যদি জাতিসংঘসহ অন্যান্য মানবাধিকারের মানদণ্ডের সাথে সামাঞ্জস্যপূর্ণ না হয়, তাহলে আপনাদেরগুলো কীভাবে হয়? এই ধারাটিতে কোনো ধরনের সংশোধন সম্ভব না।

এই আইনের কিছু অংশ অনলাইনে মিথ্যা বা গুজবের মাধ্যমে সহিংসতা বা ধর্মীয় উন্মাদনা উসকে দেয়ার বিরুদ্ধে। আপনাদের মনে আছে, রামুতে, ফেসবুকে পবিত্র কোরানের পুড়িয়ে দেয়ার মিথ্যা পোস্টের মাধ্যমে পুরো একটি বৌদ্ধ অধ্যুষিত গ্রামে আক্রমণ চালিয়ে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়েছিল। এই ধরনের ঘটনা আমাদের দেশে একাধিকবার ঘটেছে। অতিসম্প্রতি ছাত্রদের আন্দোলনের সময়ও আমরা দেখেছি কীভাবে অনলাইনে গুজব রটানোর মাধ্যমে সহিংসতা উসকে দেয়া হচ্ছিলো। এই আইন ছাড়া আমরা এই ধরনের সহিংসতা উসকে দেয়ার ঘটনাগুলো কীভাবে প্রতিহত করবো?

আমাদের প্রচলিত ফৌজদারি আইনে এই বিষয়ে কিছুটা বিধান আছে। সেই আইনের আওতায় আপনি যদি এমন কিছু বলেন বা লিখেন যার কারণে কেউ অন্য কাউকে শারীরিকভাবে ক্ষতি করে, তখন আপনার বিরুদ্ধে সেই আইনে ব্যবস্থা নেয়া যায়। এই ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন না থাকলে আপনাকে আসলেই কেউ হতাহত হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। আমাদের কি হতাহতের ঘটনা হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা উচিৎ? নাকি এই ধরনের ঘটনা যাতে ঘটতেই না পারে সেই দিকে মনোযোগ দেয়া উচিৎ? এই ধরনের আইন পৃথিবীর সব দেশেই বিদ্যমান, যুক্তরাষ্ট্রেও আছে।

অনেক ইউরোপিয়ান দেশে, বিদ্বেষ ছড়ানো ও সহিংসতা উসকে দেয়ার বিরুদ্ধে আইন আছে, আমাদের এই আইনও সেইরকমই।

আরেকটি আপত্তির বিষয় যা শোনা যাচ্ছে, তা হলো— এই আইনের আওতায় অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের জন্য যে কাউকে ওয়ারেন্ট ছাড়া গ্রেফতার করা যাবে ও তল্লাশি চালানো যাবে। ওয়ারেন্ট এর প্রয়োজন তখনই পরে যখন অপরাধ ইতিমধ্যে ঘটে গেছে। কোনো অপরাধ সংগঠিত হওয়ার সময় ঘটনাস্থল থেকে ওয়ারেন্ট ছাড়াই গ্রেফতার ও তল্লাশি চালানো যায়। এটা ফৌজদারি আইনের মৌলিক বিষয় আমাদের দেশসহ সব দেশেই। আপনি যদি কোনো চুরির বিষয়ে অভিযোগ করতে পুলিশকে ফোন করেন, পুলিশ কি তখন ওয়ারেন্ট এর জন্য বসে থাকে নাকি তাৎক্ষণিকভাবে চোরকে গ্রেফতার করে চুরির মালামালের খোঁজে তল্লাশি চালাবে? ঠিক সেভাবেই পুলিশ যদি অনলাইন হ্যাকিং সম্পর্কে তথ্য পায় ও হ্যাকারের অবস্থান খুঁজে পায়, তাহলে ওয়ারেন্ট এর জন্য অপেক্ষা করা উচিৎ নাকি তাৎক্ষণিক তাকে থামানো উচিৎ?  

যুক্তরাষ্ট্রসহ বেশিরভাগ দেশেই পুলিশ যদি কাউকে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সময় অনলাইনে ট্র্যাক করতে পারে, তাহলে তাকে ওয়ারেন্ট ছাড়াই গ্রেফতার করতে ও তল্লাশি চালাতে পারে। শুধুমাত্র অপরাধ সংগঠিত হয়ে যাওয়ার পর যদি গ্রেফতার বা তল্লাশি চালাতে হয়, তখন ওয়ারেন্ট এর প্রয়োজন পরে। অপরাধ সংগঠিত হওয়ার সময় ধরা পড়লে কখনোই ওয়ারেন্ট এর প্রয়োজন পরে না।

সর্বশেষ, রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করা নিয়ে যে ধারা সেটা নিয়ে আপত্তি তোলা হয়েছে। আমি একমত, এখানে আসলে আদালতকে ক্ষমতা দেয়া হয়েছে সত্য আর মিথ্যা নির্ণয় করার। কিন্তু, এই ক্ষেত্রে আমাদের মনে রাখতে হবে দেশের সাম্প্রতিক ইতিহাস। প্রেস ক্লাব, সম্পাদক পরিষদসহ সাংবাদিকদের কোনো সংগঠনই কিন্তু তাদের নিজেদের নৈতিকতার সনদ বা আচরণবিধি প্রয়োগ করতে পারেননি। সম্পাদক পরিষদের বর্তমান প্রধান মাহফুজ আনাম, যিনি টেলিভিশনের পর্দায় স্বীকার করেছেন ১/১১ এর সময় আমাদের প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে মিথ্যা ও উদ্দেশ্যমূলক সংবাদ প্রচারের কথা। 

যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপিয়ান ইউনিয়নে হলে তাকে বাধ্য করা হতো সাংবাদিকতা পেশা থেকে পদত্যাগ করতে। শুধু তাই নয়, তাকে আর কোনোদিন সম্পাদক বা সাংবাদিক হিসেবে দায়িত্ব দেয়া হতো না। বাংলাদেশে কিন্তু সম্পাদক পরিষদ উল্টো তার পক্ষ নিয়েই তাকে তাদের জেনারেল সেক্রেটারি নির্বাচিত করেছে। বিষয়টি আমাকে অবাক করে। যেহেতু, ইইউ ও যুক্তরাষ্ট্র মিশন এই আইন নিয়ে তাদের মতামত তুলে ধরেছে, আমি আশা করবো তারা মাহফুজ আনামের স্বীকারোক্তির পরেও একটি প্রথম সারির পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে দায়িত্বরত থাকা নিয়েও তাদের মতামত জানাবেন। তা না হলে, তাদের কার্যকলাপ হবে একপেশে ও আমাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার শামিল। 

এই বিষয়টিকে থেকে আমরা সম্পাদক পরিষদের নৈতিকতা সম্পর্কে কি ধারণা পাই? পরিষ্কারভাবেই, তাদের  নৈতিকতা বলে কিছু নেই। বস্তুতঃ সম্পাদক পরিষদ বলতে চায়, তাদেরকে সরকারের বিরুদ্ধে নোংরা, মিথ্যা প্রচারণা চালাতে দিতে হবে এবং সত্য অবলম্বন না করেই তাদের অপছন্দের রাজনীতিকদের সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করতে দিতে হবে। তারা যদি শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে এমন পরিকল্পনা করেন, তাহলে দেশের ভবিষ্যৎ কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়?

যেহেতু গণমাধ্যমের সম্পাদকেরা তাদের নিজেদের তৈরি নৈতিক নির্দেশনাই মানতে রাজি নন, তাহলে আমরা সত্য-মিথ্যা নির্ধারণের ভার আদালতের হাতেই তুলে দেই। গ্রেফতার মানেই জেল নয়। সরকারের প্রমাণ করতে হবে যে আসামি জেনেশুনে মিথ্যা তথ্য প্রকাশ করেছেন। প্রমাণের দায়ভার সরকারের। যে সকল সাংবাদিকের মিথ্যা সংবাদ ছাপানোর উদ্দেশ্য নেই, তাদের ভয়েরও কিছু নেই।

সম্পাদক পরিষদ যদি এ সকল ধারার সংশোধন চান, তাহলে তাদের নিজেদের নৈতিকতার নীতিমালা বাস্তবায়ন করতে হবে। যে সম্পাদক বা সংবাদকর্মী মিথ্যা সংবাদ ছেপেছেন, তাকে অবশ্যই দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দিতে হবে এবং ভবিষ্যতে যাতে আর কোনোদিন সংবাদ তৈরি বা প্রচারের কাজ করতে না পারেন সেই ব্যবস্থা করতে হবে।

লেখক: প্রধানমন্ত্রীর তথ্যপ্রযুক্তি উপদেষ্টা

সংশ্লিষ্ট খবর


মন্তব্য যোগ করুণ

পরের
খবর

ইতিহাসের সন্ধিক্ষণে আসাম


আরও খবর

চতুরঙ্গ
ইতিহাসের সন্ধিক্ষণে আসাম

প্রকাশ : ০৬ নভেম্বর ২০১৮

তপোধীর ভট্টাচার্য

  তপোধীর ভট্টাচার্য

আজ থেকে ঠিক চার মাস আগে লিখেছিলাম- শরশয্যায় রয়েছে আসামের বাঙালি। যারা এই প্রদেশে বিরাজমান জাতিবিদ্বেষ ও হিংস্র ঘৃণার বেপরোয়া অভিব্যক্তি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল, তাদের কেউই অবাক হননি। কিন্তু উচিত বক্তা বিষবৎ। তাই যাদের আঁতে ঘা লেগেছিল, তারা দিনের পর দিন চ্যানেলে–‌চ্যানেলে বিষ ঢেলেছে। শেষ পর্যন্ত লিখিয়েকে চূড়ান্ত হেনস্থা করতে চেয়েছে। শরশয্যা যে মহাভারত থেকে নেওয়া রূপক, এই সহজ কথাটিও বুঝতে চায়নি। না বুঝুক, তাতে যে সত্য ঢাকা পড়ে না তা তো কিছুদিন পরেই স্পষ্ট হল।

এ পোড়া দেশের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা ভোটের ঢাকে কাঠি হিসেবে যখন বাপে–‌তাড়ানো, মায়ে–‌খেদানো বাঙালির জন্য বেছে নিলেন ‘‌উইপোকা’‌ আর ‘‌ঘুসপেটিয়া’‌ বিশেষণ, শরশয্যার আসল অর্থ দিনের আলোর মতো পরিষ্কার হয়ে গেল। কে মূল কীর্তনিয়া আর কে বা দোহার- এ বিষয়ে তর্কের কোনও দরকার নেই। এক ভস্ম আর ছার, দোষ–‌গুণ কব কার!‌ সবই সাম্প্রদায়িকতার রকমফের।

তবে এই মুহূর্তে সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ঘটনা পয়লা নভেম্বর অাসামের তিনসুকিয়া জেলার প্রত্যন্ত এলাকা সদিয়ার একটি গ্রামে পরিকল্পিত গণহত্যার সূচনা। নিতান্ত দিনমজুর শ্রেণির ধনঞ্জয় নমশূদ্র, সুবল বিশ্বাস, শ্যামলাল বিশ্বাস, অনন্ত বিশ্বাস ও অবিনাশ বিশ্বাসকে ঘাতকেরা ঠান্ডা মাথায় খুন করেছে।

ইতিমধ্যে আলফার (‌স্বাধীন)‌ একজন ক্যাডারকে পুলিশ ধরেছে। কিন্তু নিয়মমাফিক এ সব কথা যখন অচিরেই ভুলে যাব আমরা, বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদতেই থাকবে। এদের পক্ষে বিবৃতি অবশ্য জারি হয়েছে যে, এই পাঁচজন ‘‌‌উইপোকা’‌ বিদেশিকে ওরা মারেনি। তা হলে অসম সরকার যত‌ আশ্বাসই দিক বা আস্ফালন করুক, মারল কারা?‌ ইংরেজিতে যে ‘‌ডিপ স্টেট’‌ বলা হয়, সেই অদৃশ্য অমোঘ শক্তি এদের আততায়ী নয় তো?‌

আলফার বীরপুরুষেরা রাষ্ট্রের কাছে আত্মসমর্পণ করে ‘‌সালফা’‌ পদবি পেয়েছিল, তাদের কে কোথায় কী করছে কেউ তো সে–‌খবর রাখার কথা ভাবেনি। আসামে যখন চরম নৈরাজ্য চলছে, ঘৃণা ও বিদ্বেষের পাটিগণিতে কার ভূমিকা কীরকম, তা জানবার কি উপায় আছে কোনও?‌ আমরা, যারা সাধারণ নাগরিক, কোনওদিন বুঝতেই পারি না, রাজনৈতিক প্রক্রিয়া ও রাষ্ট্রতন্ত্রের কাছে আমজনতার দাম কানাকড়িও নয়।

তাই নরখাদক রাষ্ট্রতন্ত্রের পোয়াবারো হয় সঙ্ঘাত, বিদ্বেষ ও ঘৃণার বাতাবরণে। এনআরসির অজুহাতে আঞ্চলিক প্রভুত্ববাদকে প্রশ্রয় দিয়েছে যে বাঙালির প্রতি চিরবিদ্বেষ–‌প্রবণ, হিন্দি–‌হিন্দু–‌হিন্দুস্থান নীতির প্রবক্তা শাসকশক্তি, তাদের ক্ষমতা–‌দখলের দাবাখেলায় ওই পাঁচজন নিহত বাঙালি বোড়ে ছাড়া অন্য কিছু নয়।

তাই মৃণাল হাজারিকা, জিতেন দত্ত, অখিল গগৈ এবং তাদের প্রীতি–‌খেলার প্রতিপক্ষ সরকার বাহাদুর ইতিহাস ভুলে যাক, মহাভারত ভুলে যাক, হাতে–‌মুখে সেঁটে–‌থাকা নাছোড়বান্দা রক্তের দাগ অস্বীকার করুক- ধারাবাহিক ঘৃণা–‌বিদ্বেষ–‌গণহত্যার কলঙ্কিত বৃত্তান্ত মুছে ফেলা অসম্ভব। একতরফা আনুগত্য–‌সহ মেরুদণ্ড যদি প্রভুশক্তির কাছে সমর্পণ করে দেয়ও অসহায় ছাপোষা বাঙালি, আত্মপ্রতারণা কোন পর্যায়ে পৌঁছলে তবে ধারাবাহিক লাঞ্ছনা–‌অপমান–‌নির্যাতন ভুলে থাকা সম্ভব?‌

অর্জুন নমশূদ্র থেকে দীপক দেবনাথ পর্যন্ত যে–‌বাঙালিরা আত্মহত্যা করে এনআরসি ডি–ভোটার–‌ডিটেনশন ক্যাম্পের আতঙ্ক এড়াতে চাইলেন, গণহত্যার মিছিলের বাইরে তো নন তাঁরা। এই সভ্যতা–‌বিরোধী, মানবতা–‌বিরোধী রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের কি বিচার নেই কোনও?‌ যে–‌কথাটা লিখতে চাইছি, তা হল, এর উৎস হল সেই দাম্ভিক ঘোষণায়:‌ আসাম শুধু আসামিয়াদের জন্যে। বাঙালি–‌বোড়ো–‌কোচ–‌রাজবংশি–‌ডিমাসা–‌কার্বি–‌মণিপুরি–‌নেপালি— কোনও অনসমিয়া ভাষাগোষ্ঠীর ঠাঁই নেই এখানে। ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্টের আগে আবহমান যে–‌ভারতবর্ষের সন্ততি আমরা সবাই, যে ভাষাতেই কথা বলি না কেন এবং অখণ্ড ভারতের যে–‌খণ্ডিত অংশেই বাস করি না কেন, আমাদের কেউ বিদেশি বা বহিরাগত নয়। আমরা সবাই ভারতীয়। আমরা প্রত্যেকে অসমের ভূমিপুত্র।

অথচ সহজতম ও সবচেয়ে মৌলিক এই সত্যটি শুধুমাত্র জাতিবিদ্বেষের কুযুক্তিতে অস্বীকার করা হয়েছে। হিটলারের প্রচার–‌সচিব গোয়েবলস যেমন ভাবত, হাজারবার মিথ্যা বললেই তা সত্য হয়ে ওঠে, একই নীতিতে আঞ্চলিক প্রভুত্ববাদের প্রশ্রয়দাতা আধিপত্যবাদী আর্যাবর্ত অসমকে ‘‌উইপোকা’‌তুল্য বাঙালিদের নিশ্চিহ্ন করার পরীক্ষাগার হিসেবে ব্যবহার করছে। ভারতে কোথাও বাঙালিরা যে নিরাপদ নয়, সেই অশনি‌ সংকেত দিয়ে গেছে তিনসুকিয়ার প্রত্যন্ত গ্রামে আততায়ীর তাণ্ডব।

এই মর্মান্তিক সত্যটা আগে বুঝে নিই, ধলা সদিয়ার গণহত্যা কোনও আকস্মিক কথা নয়। এমনই চলে এসেছে সাত দশক ধরে। ১৯৫০–‌এর মার্চ–‌এপ্রিলে অসম পুলিসের যোগসাজশে বঙ্গাইগাঁও এবং বরপেটা এলাকায় তিতাপানি, বগুলামারি, বালাগাঁও ইত্যাদি গ্রামে কয়েকশো মানুষ গণহত্যার শিকার হয়েছিল। একদিকে যেমন বহু বাঙালি মুসলমান পূর্ব পাকিস্তানে চলে যান, তেমনি বেশ কিছু বাঙালি হিন্দুও প্রশাসনিক অত্যাচারের কবলে পড়েন। এই কালো ইতিহাস সবিস্তারে লেখার দরকার নেই। ১৯৬০–‌এ গৈরেশ্বরের হত্যাকাণ্ড বা ১৯৮৩–‌র ১৮ ফেব্রুয়ারি নগাঁও জেলার জাগী রোড সংলগ্ন নেলিতে ৬ ঘণ্টার গণহত্যায় তিন হাজার বাঙালি মুসলমানের প্রাণহানি শঙ্করদেব–‌আজান ‌ফকির–বিষ্ণু রাভা–‌হেমাঙ্গ বিশ্বাস–‌ভূপেন হাজারিকার অসমকে চিরদিনের মতো কলঙ্কিত করেছে। নাগরিক অধিকার রক্ষা সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট কালীপদ সেনকেতাঁরই বাড়িতে দিবালোকে ১৯৮৬ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর খুন করে উগ্র বাঙালি–‌বিদ্বেষী আততায়ী। আবার ১৯৭৯–’‌৮৩ সালের মধ্যে কৃষক নেতা ধীরেশ্বর নাথ–‌সহ ৬৫ জন বামপন্থী কর্মী নিহত হয়েছিলেন।

এই প্রেক্ষিতেই পরাভূত হয়েছে সমাজের ইতিবাচক শক্তি। নইলে কি গত তিন বছরে ধাপে ‌ধাপে জাতিবিদ্বেষ অসমের আলো–‌হাওয়া–‌রোদকে এতখানি কলুষিত করতে পারে?‌ অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় যে–‌বুদ্ধিজীবী সত্তর ও আশির দশকে প্রতিস্রোতের মূর্ত প্রতীক ছিলেন, তিনিও এই দুঃসময়ে হয়ে ওঠেন পুরোপুরি অচেনা এক পথভ্রান্ত মানুষ!‌‌ ‌বাঙালি এবং তার ভাষা–সংস্কৃতিকে একতরফা আক্রমণ করে সংখ্যাগুরু ভাষাগোষ্ঠীর কি কল্যাণ হতে পারে, নাকি হওয়া সম্ভব?‌ তা ছাড়া মানুষের এই পৃথিবীতে কেউই বিচ্ছিন্নভাবে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারে না। আমরা একে অপরের সহযোগী সত্তা। তা হলে কেন এত ঘৃণা, এত বিদ্বেষ, এত আক্রোশ?‌ গণহত্যায় প্রাণ হারাল যে পাঁচজন অসহায় বাঙালি, তাদের সঙ্গে দিন–আনা দিন–খাওয়া অসমিয়া বা বোড়ো বা নেপালি বা মণিপুরি ভাষায় কথা–বলা মানুষের তফাত কী?‌ তা হলে প্রথমে এনআরসি এবং তার পোঁ–ধরা তাৎপর্যশূন্য নাগরিকত্ব সংশোধনী বিলকে যে রাষ্ট্রযন্ত্র এবং তার তাঁবেদার ভাষিক আধিপত্যবাদ সন্ত্রাসের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করল- ইতিহাস কি ক্ষমা করবে তাদের?‌

অথচ দেখতে দেখতে আমরা আগ্নেয়গিরির শিখরে পৌঁছে গেছি আজ। কী এর পরিণাম, ভাবতেও শরীর–মন শিউরে ওঠে। অথচ এখনও বাঙালি জাতিসত্তার তাৎপর্য বোঝেনি। নইলে হিন্দু বাঙালি বা মুসলমান বাঙালির মতো কাঁঠালের আমসত্ত্ব এখনও চলে আসে আমাদের জিহ্বা ও কলমের ডগায়?‌ কবে বুঝব, বাঙালি শুধুই বাঙালি, ধর্মবিশ্বাস কখনই তার জাতিসত্তার পরিচায়ক নয়!‌ অথচ এর সুযোগ নিচ্ছে শত্রুপক্ষ। আমরা ইদানীং নতুন দ্বিজাতিতত্ত্বের আমদানিতে কিছুটা বিভ্রান্ত‌- শরণার্থী ও অনুপ্রবেশকারী। সেইজন্যে যখন ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিরোধ করার কথা, আমরা বিভাজিত হয়ে যাই। আর কতদিন এই আত্মহননের মড়ক মেনে নেব?‌ যে সর্বনাশ দেশভাগ করে দিয়েছে, তা কি চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত হয়ে থাকবে?‌ তাহলে রবীন্দ্রনাথ–নজরুল–সুনীতিকুমার–শহীদুল্লাহের মতো মহাজনেরা কী শেখালেন আমাদের?‌

না, আমি শ্মশানে বসে পুষ্পক হাসি হাসছি না। বরং লিখতে চাইছি:‌ ভাঙন পিছনে থাক, সম্মুখে নির্মাণ। তিনসুকিয়ায় ওই পৈশাচিক গণহত্যা আমাদের জড়তা দূর করুক। কে জানে, রাতের সবচেয়ে অন্ধকার প্রহরই হয়তো বা ভোরের পূর্বযাম!‌ সবকিছু যে নষ্ট হয়ে যায়নি, এর প্রমাণ সম্ভবত গতকালই পাওয়া গেল গুয়াহাটির পাণ্ডুমানিগাঁও এলাকায় গণহত্যা–বিরোধী প্রতিবাদী মিছিলে। কেননা, তাতে বিক্ষুব্ধ বাঙালির সঙ্গে পায়ে পা মিলিয়েছেন বিষণ্ণ অসমিয়া তরুণ। এরকম দৃশ্য খুব সুলভ নয় এখন;‌ তবু এই দৃশ্যেরই পুনর্জন্ম চাই। তবে দৃশ্যও প্রতারক হবে যদি সর্বত্র ব্যাপ্ত অবিশ্বাস ও অসহিষ্ণুতার বাতাবরণকে দূর করতে না পারি!‌ যত ক্ষত হয়ে গেছে ইতিমধ্যে, তাদের নিরাময় অসম্ভব নয়। তবে শুশ্রূষার বিশল্যকরণী তখনই সক্রিয় হবে যদি এনআরসি ও নাগরিকত্ব যে বাঙালি–‌সহ অনসমিয়াদের গিলোটিন নয়, তা নিঃসংশয়ে প্রমাণিত হলে। এক্ষেত্রে রাষ্ট্রযন্ত্রকেই সদিচ্ছার প্রমাণ দিতে হবে। নইলে আমরা যতই প্রত্যাশার কথা লিখি না কেন, বিদ্বেষসর্বস্ব আততায়ীরা আশপাশে লুকনো অন্ধকার থেকে হঠাৎ ঝাঁপিয়ে পড়ে আমাদের সমস্ত বিশ্বাসকে ধস্ত করবে। ৭২ বছরে অনেক হারিয়েছি, আর হারাতে চাই না।‌‌‌

লেখক: বিশিষ্ট লেখক ও গবেষক। প্রাক্তন উপাচার্য ও ইমেরিটাস অধ্যাপক: আসাম বিশ্ববিদ্যালয়।


লেখাটি ৬ নভেম্বর ভারতের আজকাল পত্রিকায়

পরের
খবর

বটতলা থেকে ৩২ নম্বরে


আরও খবর

চতুরঙ্গ
বটতলা থেকে ৩২ নম্বরে

প্রকাশ : ০৪ নভেম্বর ২০১৮

  অজয় দাশগুপ্ত

বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট তার নিজের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পরিদর্শনের কথা ছিল। সেদিন প্রত্যুষেই তাকে পরিবারের সদস্যদেরসহ হত্যা করা হয়। এ ঘটনার তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ বাংলাদেশের নানা প্রান্তে হয়েছে। কিন্তু আমরা কিছুটা সময় নিয়েছি বড় ধরনের প্রতিবাদ সংঘটন এবং জাতির পিতার প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শনের। এর আরেকটি কারণ ছিল, ১৫ আগস্টের পরপর দেশের অগ্রণী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ছাত্র আন্দোলনের প্রাণকেন্দ্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রায় দেড় মাসের জন্য বন্ধ হয়ে যাওয়া। সে সময়ে আমি ছিলাম বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগের অঙ্গ সংগঠন হিসেবে গঠিত জাতীয় ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য। আমাদের কমিটির সদস্য বঙ্গবন্ধুপুত্র শেখ কামালকেও ১৫ আগস্টে হত্যা করা হয়। কমিটির কয়েকজন সদস্য ১৫ আগস্টের পর নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েন; দুয়েকজন খুনিচক্রের সঙ্গে হাত মেলাতে তৎপর হয়। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের দুই মাস পর ১৮ অক্টোবর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস শুরু হয়। অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানও রমজান ও শারদীয় দুর্গাপূজার টানা ছুটির পর খুলতে শুরু করে। আমরা ১৭ অক্টোবর গভীর রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ভবনে তিনটি স্লোগান লিখে প্রতিবাদের নতুন অধ্যায়ের সূচনা করি- জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু এবং এক মুজিবের রক্ত থেকে লক্ষ মুজিব জন্ম নেবে। এ কাজে ঝুঁকি ছিল প্রচণ্ড। প্রতি রাতে কারফিউ বলবৎ ছিল। আর্মি-পুলিশ নিয়মিত টহল দিত। খুনিদের চরেরা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে সক্রিয় ছিল। কলাভবনের অদূরে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ও শাহবাগের মোড়ের কাছে বেতার কেন্দ্রে ছিল ট্যাঙ্ক-মেশিনগান সজ্জিত খুনিচক্রের সদস্যরা।

১৯৭৫ সালের ৫ নভেম্বরের সংবাদপত্র থেকে

ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়নের নেতাকর্মীরা ২০ অক্টোবর মধুর ক্যান্টিনে সমবেত হয়ে মিছিল বের করে, যা কলাভবনের বিভিন্ন ফ্লোর প্রদক্ষিণ করে। পরদিনও মিছিল হয় এবং মিছিল শেষে ২৯ অক্টোবর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলা থেকে ধানমণ্ডি ৩২ নম্বর সড়কে শোক মিছিল নিয়ে যাওয়ার কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। পরে প্রস্তুতির সুবিধার জন্য মিছিলের কর্মসূচি নির্ধারিত হয় ৪ নভেম্বর।

এ কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের আহ্বান জানিয়ে আমরা বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে লিফলেট বিতরণ করি। আমরা কলাভবন ও কার্জন হলের ক্লাসে ক্লাসে গিয়ে বক্তব্য রাখি, যাতে ছাত্রছাত্রীরা কর্মসূচিতে যোগ দেয়। একই সঙ্গে বরেণ্য শিক্ষক-সাংবাদিক-আইনজীবী-সংস্কৃতিসেবীরা যাতে শোক মিছিলে অংশ নেন, সে জন্যও অনুরোধ জানাতে থাকি। ৪ নভেম্বর সকালে বটতলায় বিপুল সংখ্যক ছাত্র-জনতার সমাবেশ ঘটে। তখন দুটি খবর আমাদের উদ্বিগ্ন করে- এক, ২ নভেম্বর গভীর রাতে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে প্রচণ্ড গোলাগুলি হয়েছে এবং কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ বন্দি নিহত হয়েছেন। দুই, সেনাবাহিনীর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দি করে নতুন একটি সামরিক অভ্যুত্থান সংঘটিত করেছেন। বলা যায়, এক উদ্বেগ ও অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে আমরা বটতলা থেকে মিছিল নিয়ে বঙ্গবন্ধুর বাসভবনের পথে যাত্রা শুরু করি। মিছিলটি নীলক্ষেত মোড়ে পৌঁছলে সেনাবাহিনী তাতে বাধা দেয়। অনেক তর্ক-বিতর্কের পর পথের বাধা দূর হয়। হাজার হাজার নারী-পুরুষ পৌঁছে যায় সেই ঐতিহাসিক স্থানটিতে, যেখান থেকে বঙ্গবন্ধু ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ গভীর রাতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট এখানেই তাকে হত্যা করা হয়েছিল। ঘাতকেরা ক্ষমতা দখল করে বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের সদস্যদের সম্পর্কে দেশ-বিদেশে কুৎসা-অপপ্রচার চালাচ্ছিল। এটাও বলা হচ্ছিল- হত্যাকাণ্ডের কোনো প্রতিবাদ কেউ করেনি। কিন্তু ৪ নভেম্বরের মিছিল থেকে দেশবাসী বার্তা পায়- বাংলাদেশের জনগণের মনে বঙ্গবন্ধু আছেন, থাকবেন।

১৯৭৫ সালের ৬ নভেম্বরের সংবাদপত্র থেকে

বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফেরার সময় আমরা নিশ্চিত হই যে, ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে স্বাধীনতা সংগ্রামের চার মহান নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী ও এএইচএম কামারুজ্জামানকে ২ নভেম্বর গভীর রাতে ব্রাশফায়ারে হত্যা করা হয়েছে। এ ঘৃণ্য কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিকে নিশ্চিহ্ন করার দুরভিসন্ধি থেকে। সন্দেহ নেই, সে ঘটনায় আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগী বিভিন্ন সংগঠনের নেতাকর্মীদের মনোবল অনেকটা ভেঙে যায়। এ সুযোগেই জিয়াউর রহমান ৭ নভেম্বর পাল্টা অভ্যুত্থান সংঘটিত করতে পারেন।

জেলাহত্যার প্রতিবাদে আমরা ৫ নভেম্বর অর্ধদিবস হরতাল আহ্বান করি। হরতাল শেষে বায়তুল মোকাররমের সামনে অনুষ্ঠিত হয় গায়েবানা জানাজা।

৪ নভেম্বর ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সিনেট অধিবেশন। সেখানে ছাত্র প্রতিনিধি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মাহবুব জামান, ইসমত কাদির গামা ও অজয় দাশগুপ্ত। আমরা বিশ্ববিদ্যালয় চ্যান্সেলর ও রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডের নিন্দা জানিয়ে প্রস্তাব উত্থাপন করি এবং সেটা সর্বসম্মতভাবে পাস হয়। সিনেট অধিবেশন থেকেই আমরা তিনজন সরাসরি চলে যাই কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে, যেখান থেকে ৫ নভেম্বরের হরতাল কর্মসূচির সমর্থনে মিছিল বের হয়।

লেখক: সাংবাদিক

সংশ্লিষ্ট খবর

পরের
খবর

বিএনপি নেতাদের প্রথম গণভবন দর্শন


আরও খবর

চতুরঙ্গ

  অজয় দাশগুপ্ত

সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে ১ নভেম্বর সন্ধ্যায় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফকরুল ইসলামসহ বিএনপি আরও চার গুরুত্বপূর্ণ নেতা প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠকে অংশ নিচ্ছেন। তবে তারা এ জন্য নেতা হিসেবে সামনে রেখেছেন ড. কামাল হোসেনকে, গণভবন যার কাছে খুব চেনা। চার দশক আগে ১৯৭৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে গঠিত সামরিক শাসক জিয়াউর রহমানের দল বিএনপির নেতাদের এটাই হবে প্রথম আনুষ্ঠানিক গণভবন দর্শন। সেখানে তাদের অবস্থান স্বস্তির হোক, আনন্দপূর্ণ হোক- এটাই কাম্য। তবে জিয়াউর রহমান সেনাবাহিনীর উপপ্রধান হিসেবে প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার জন্য শেরে বাংলা নগরের গণভবনে গিয়েছিলেন। বেগম খালেদা জিয়া স্বাধীনতার পর জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে একজন গৃহবধূ হিসেবে পারিবারিক সমস্যা নিয়ে কথা বলেছেন। তবে দু'জনের এ সাক্ষাৎ সম্ভবত ধানমণ্ডি ৩২ নম্বর সড়কে বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে অনুষ্ঠিত হয়েছে।

বেগম খালেদা জিয়ার গণভবন দর্শন ২০১৩ সালের ২৮ অক্টোবরেই হতে পারত। ২৫ অক্টোবর ঢাকার সোহরাওয়ার্দি উদ্যানের এক জনসভায় বেগম খালেদা জিয়া 'আজ-কালের' মধ্যে সংলাপের ব্যবস্থা করার জন্য প্রধানমন্ত্রীর কাছে দাবি জানান। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পরদিন খালেদা জিয়াকে ফোন করে ৩৭ মিনিট কথা বলেন এবং গণভবনে বৈঠকের জন্য আমন্ত্রণ জানান। কিন্তু খালেদা জিয়া 'হরতালের মধ্যে' (তখন ৬০ ঘণ্টার হরতাল চলছিল) আলোচনায় অংশ নিতে পারবেন না বলে জানিয়ে দেন। এভাবে তার গণভবন দর্শনের সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যায়। গত পাঁচ বছরে বিএনপির নেতারা প্রধানমন্ত্রীর কাছে আলোচনায় বসার জন্য বার বার আহ্বান জানিয়েছেন। কিন্তু তাতে সাড়া মেলেনি। গণভবন দর্শনও হয়নি।

এরপর ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। বিএনপি তা কেবল বয়কট করেনি, প্রতিহতের চেষ্টা করে। বেগম খালেদা জিয়া সংসদ সদস্য না থাকায় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সংসদ ভবনে দেখা হয়নি তার। পরের বছরের প্রথম তিন মাস বিএনপি শেখ হাসিনার সরকারকে উৎখাতের জন্য টানা হরতাল-অবরোধ কর্মসূচি বলবৎ করার চেষ্টা করে। এ কর্মসূচি চলাকালে ২৪ জানুয়ারি খালেদা জিয়ার কনিষ্ঠ পুত্র আরাফাত রহমান কোকোর মৃত্যু হয়। সে সময়ে সমবেদনা জানাতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিএনপির গুলশানস্থ কার্যালয়ে গিয়েছিলেন বেগম খালেদা জিয়াকে সমবেদনা জানাতে। কিন্তু বিএনপির নেতা-কর্মীরা প্রধানমন্ত্রীকে ভেতরে প্রবেশ করতে দেয়নি। এভাবে দুই নেত্রীর সাক্ষাতের আরেকটি সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যায়। পাকিস্তান আমলের শেষ দিকে পূর্ব পাকিস্তানে ক্ষমতা ছিল প্রাদেশিক গভর্নরের হাতে। তার অফিস ও বাসবভন ছিল গভর্নর হাউসে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জনের পর গভর্নর হাউস বঙ্গবভন নাম পায়। এটা পরিণত হয় রাষ্ট্রপতির অফিস ও বাসসভনে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রমনা পার্কের কাছে একটি অপেক্ষাকৃত ছোট দ্বিতল ভবনকে প্রধানমন্ত্রীর অফিস হিসেবে ব্যবহার শুরু করেন। এর নাম দেওয়া হয় 'গণভবন'। ১৯৭৪ সালে শেরে বাংলা নগরে বর্তমান গণভবন নির্মাণ কাজ শেষ হলে বঙ্গবন্ধু সেখানে অফিস শুরু করেন। তবে বঙ্গবন্ধু বরাবরই ধানমণ্ডি বাসভবনে থেকেছেন। আমার দুটি গণভবনেই বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ ঘটেছে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর সামরিক শাসন জারি হলে গণভবনকে পরিণত করা হয় সামরিক আদালতে। জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতি ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে অফিস করতেন বঙ্গভবনে। আর বসবাস করতেন ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে। এইচ এম এরশাদ সামরিক শাসক এবং প্রেসিডেন্ট হিসেবে ক্যান্টনমেন্টে বসবাস করতেন। তবে তার আমলে তেজগাঁওয়ে সাবেক সংসদ ভবনকে রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ে পরিণত করা হয়। বেগম খালেদা জিয়া ১৯৯১ সালে প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হয়েও এখানেই অফিস করতে থাকেন। এভাবে আমরা পেয়ে যাই প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, যা এখনও চালু আছে। তবে খালেদা জিয়া বসবাস করতে থাকেন ক্যান্টনমেন্টে।

১৯৯৬ সালের ২৩ জুন প্রথম বারের মতো প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেন শেখ হাসিনা। শেরে বাংলা নগরের গণভবন তার কাছে কেবল একটি অফিস নয়, ছিল গভীর আবেগের। ১৯৭৫ সালের ১৪ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এখানেই সর্বশেষ অফিস করেছেন। শেখ হাসিনার প্রধানমন্ত্রীর আমলে গণভবন তার বাসস্থানে পরিণত হয়। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী কার্যালয় রয়ে যায় তেজগাঁতেই। ২০০১ সালে বেগম খালেদা জিয়া ফের প্রধানমন্ত্রীর পদ গ্রহণ করেন। কিন্তু তিনি প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন হিসেবে গণভবনকে কখনও ব্যবহার করেননি। কেন গণভবনে আপত্তি, তার কারণ বোধগম্য নয়। ফের এ ভবনটি পরিত্যক্ত ঘোষণা হয়। বিএনপি নেতারাও গণভবন দর্শনের সুযোগ পাননি। ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণের পর শেখ হাসিনা আবার গণভবনে বসবাসের জন্য ফিরে যান। তার দায়িত্ব পালনকালে বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের কোনো নেতা গণভবনে গিয়েছিলেন, এমনটি জানা যায় না। বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিবিজরিত এ স্থানটি তাদের কখনও আকৃষ্ট করেনি। ১ নভেম্বর (২০১৮) হবে তাদের প্রথম গণভবন দর্শন। কেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের মহানায়কের অফিসটিকে জিয়াউর রহমান 'সামরিক আদালতে' পরিণত করেছিলেন, সে প্রশ্ন তাদের মনে একবারের জন্যও উদয় হবে কি? চার দশক ধরে বঙ্গবন্ধুর অবদান অস্বীকার করার নীতিও কি সঠিক ছিল?

লেখক: সাংবাদিক

৩১ অক্টোবর, ২০১৮

ajoydg@gmail.com



File:- সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে ১ নভেম্বর সন্ধ্যায় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফকরুল ইসলামসহ বিএনপি আরও চার গুরুত্বপূর্ণ নেতা প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠকে অংশ নিচ্ছেন।