চতুরঙ্গ

যে সাংবাদিকের মিথ্যা সংবাদ ছাপানোর উদ্দেশ্য নেই, তার ভয়েরও কিছু নেই

প্রকাশ : ০১ অক্টোবর ২০১৮ | আপডেট : ০১ অক্টোবর ২০১৮

যে সাংবাদিকের মিথ্যা সংবাদ ছাপানোর উদ্দেশ্য নেই, তার ভয়েরও কিছু নেই

সজীব ওয়াজেদ জয়— ফাইল ছবি

  সজীব ওয়াজেদ জয়

কিছু মহল থেকে নতুন ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের সমালোচনা করা হচ্ছে। তাদের মূল আপত্তির জায়গা আইনটির বিশেষ কিছু ধারা। আইসিটি ডিভিশন যখন আইনটির খসড়াগুলো তৈরি করে তখন সেগুলো দেখার সুযোগ আমার হয়েছিল। সকলের সুবিধার্থে এই বিষয়ে আমার মতামত তুলে ধরছি:

সরকারি অফিসের কম্পিউটারে হ্যাকিং এবং গোপনে নজরদারির ক্ষেত্রে আইনের দরকার জনগণের তথ্য ও গোপনীয়তা রক্ষার স্বার্থেই। এই আইনের আগে হ্যাকিং ও তথ্য চুরির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার কোনো আইনি ভিত্তি দেশে ছিল না। তাহলে এই আইনের সাহায্য ছাড়া কিভাবে হ্যাকিং ও তথ্য চুরির বিচার হবে? সরকারি কম্পিউটারে জনগণের জাতীয় পরিচয়পত্রসহ নাগরিকদের অনেক রকম তথ্য সংগৃহীত থাকে। ব্যাংক হিসাব, স্বাস্থ্য বিষয়ক তথ্য, জমির রেকর্ড সবকিছুই আজকাল ডিজিটাইজ করে সংগ্রহ করা হচ্ছে। এগুলো যদি হ্যাক করা হয়, তার দায়ভার কে নেবেন? দায় কিন্তু তখন সরকারের উপরই আসবে। তাই, তথ্য প্রযুক্তি উপদেষ্টা হিসেবে আমি এই আইন প্রণয়নের সুপারিশ করি হ্যাকিং ঠেকানোর জন্য। 

শুধু তাই নয়, সরকারি অফিসে ডিজিটাল নজরদারির মাধ্যমে জনগণের তথ্য সম্বলিত বিভিন্ন দলিল বা নথির ছবি বা ভিডিও তোলাও সম্ভব। গোপনে অডিও রেকর্ডিংয়ের মাধ্যমেও নাগরিকদের অনেক সংবেদনশীল তথ্যের আলোচনা শুনে ফেলা সম্ভব, এমনকি ওয়াই-ফাই পাসওয়ার্ডও।

এর মাধ্যমে হয়তো একজন সাংবাদিকের কাজ কঠিন হয়ে যেতে পারে। কিন্তু কারো দুর্নীতি ফাঁস করার জন্য একজন সাংবাদিকের কি সরকারি অফিসের কম্পিউটার হ্যাক করে নাগরিকদের সংবেদনশীল তথ্য চুরির অধিকার থাকা উচিত? পৃথিবীর কোনো দেশই কিন্তু বেআইনিভাবে সাংবাদিকদের তথ্য সংগ্রহ করার সুযোগ দেয় না, এমনকি যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপিয়ান ইউনিয়নও না। সরকারি অফিসে গোপনে নজরদারি করা সবদেশেই আইনবহির্ভূত, সাংবাদিকদের জন্যও। সাংবাদিকদের তাদের তথ্য অন্যান্য সূত্র থেকে জোগাড় করতে হয়।

যেসব কূটনৈতিক মিশন এই আইনটি নিয়ে আপত্তি তুলেছেন তাদেরকে আমি একটি প্রশ্ন করতে চাই— সাংবাদিকরা কি আপনাদের দূতাবাসের ভেতরে গোপনে নজরদারি করার যন্ত্রপাতি নিয়ে আসতে পারবেন?

আরেকটি আপত্তির জায়গা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতিকরণ নিয়ে যে ধারাটি, সেটি নিয়ে। আমরা দেখেছি কীভাবে ১৫ই আগস্ট ১৯৭৫ এর পর বিএনপি জামায়াত আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনের ঘটনাবলিকে বিকৃত করার অপপ্রয়াস চালিয়েছে। এই বিকৃতিকরণের পেছনে কারণ ছিল যুদ্ধাপরাধীদের মন্ত্রী বানানো ও বঙ্গবন্ধুর খুনিদের প্রতিষ্ঠিত করা। এইসবের বিরুদ্ধে কি কোনো আইন থাকা উচিৎ নয়? আমরা কি ভবিষ্যতে আবারও এই অপরাজনীতির পুনরাবৃত্তি দেখতে চাই? আইনটির এই ধারার বিরুদ্ধে যারা বলছেন তারা আসলে বাঙালি নন। তারা গোপনে জামায়াত সমর্থক রাজাকার।

ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের হলোকাস্ট ডিনায়াল আইনের উপর ভিত্তি করেই এই ধারাটি প্রণয়ন করা হয়েছে। ১৬টি ইউরোপিয়ান দেশে হলোকাস্টে “স্বীকৃত সংখ্যা” থেকে কম মানুষ মারা গিয়েছে এই কথা বললেও কারাদণ্ড দেয়া হয়। এর মধ্যে অনেক দেশ আছে যাদের দূতাবাসগুলো বাংলাদেশে আমাদের এই আইন নিয়ে আপত্তি তুলেছে।

যেসব ইউরোপিয়ান দূতাবাস আমাদের এই আইন নিয়ে আপত্তি তুলেছে, তাদের প্রতি আমার প্রশ্ন— আপনাদের হলোকাস্ট ডিনায়াল আইন থাকতে পারলে আমাদের কেন একই রকম আইন থাকতে পারবে না? আমাদের আইন যদি জাতিসংঘসহ অন্যান্য মানবাধিকারের মানদণ্ডের সাথে সামাঞ্জস্যপূর্ণ না হয়, তাহলে আপনাদেরগুলো কীভাবে হয়? এই ধারাটিতে কোনো ধরনের সংশোধন সম্ভব না।

এই আইনের কিছু অংশ অনলাইনে মিথ্যা বা গুজবের মাধ্যমে সহিংসতা বা ধর্মীয় উন্মাদনা উসকে দেয়ার বিরুদ্ধে। আপনাদের মনে আছে, রামুতে, ফেসবুকে পবিত্র কোরানের পুড়িয়ে দেয়ার মিথ্যা পোস্টের মাধ্যমে পুরো একটি বৌদ্ধ অধ্যুষিত গ্রামে আক্রমণ চালিয়ে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়েছিল। এই ধরনের ঘটনা আমাদের দেশে একাধিকবার ঘটেছে। অতিসম্প্রতি ছাত্রদের আন্দোলনের সময়ও আমরা দেখেছি কীভাবে অনলাইনে গুজব রটানোর মাধ্যমে সহিংসতা উসকে দেয়া হচ্ছিলো। এই আইন ছাড়া আমরা এই ধরনের সহিংসতা উসকে দেয়ার ঘটনাগুলো কীভাবে প্রতিহত করবো?

আমাদের প্রচলিত ফৌজদারি আইনে এই বিষয়ে কিছুটা বিধান আছে। সেই আইনের আওতায় আপনি যদি এমন কিছু বলেন বা লিখেন যার কারণে কেউ অন্য কাউকে শারীরিকভাবে ক্ষতি করে, তখন আপনার বিরুদ্ধে সেই আইনে ব্যবস্থা নেয়া যায়। এই ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন না থাকলে আপনাকে আসলেই কেউ হতাহত হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। আমাদের কি হতাহতের ঘটনা হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা উচিৎ? নাকি এই ধরনের ঘটনা যাতে ঘটতেই না পারে সেই দিকে মনোযোগ দেয়া উচিৎ? এই ধরনের আইন পৃথিবীর সব দেশেই বিদ্যমান, যুক্তরাষ্ট্রেও আছে।

অনেক ইউরোপিয়ান দেশে, বিদ্বেষ ছড়ানো ও সহিংসতা উসকে দেয়ার বিরুদ্ধে আইন আছে, আমাদের এই আইনও সেইরকমই।

আরেকটি আপত্তির বিষয় যা শোনা যাচ্ছে, তা হলো— এই আইনের আওতায় অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের জন্য যে কাউকে ওয়ারেন্ট ছাড়া গ্রেফতার করা যাবে ও তল্লাশি চালানো যাবে। ওয়ারেন্ট এর প্রয়োজন তখনই পরে যখন অপরাধ ইতিমধ্যে ঘটে গেছে। কোনো অপরাধ সংগঠিত হওয়ার সময় ঘটনাস্থল থেকে ওয়ারেন্ট ছাড়াই গ্রেফতার ও তল্লাশি চালানো যায়। এটা ফৌজদারি আইনের মৌলিক বিষয় আমাদের দেশসহ সব দেশেই। আপনি যদি কোনো চুরির বিষয়ে অভিযোগ করতে পুলিশকে ফোন করেন, পুলিশ কি তখন ওয়ারেন্ট এর জন্য বসে থাকে নাকি তাৎক্ষণিকভাবে চোরকে গ্রেফতার করে চুরির মালামালের খোঁজে তল্লাশি চালাবে? ঠিক সেভাবেই পুলিশ যদি অনলাইন হ্যাকিং সম্পর্কে তথ্য পায় ও হ্যাকারের অবস্থান খুঁজে পায়, তাহলে ওয়ারেন্ট এর জন্য অপেক্ষা করা উচিৎ নাকি তাৎক্ষণিক তাকে থামানো উচিৎ?  

যুক্তরাষ্ট্রসহ বেশিরভাগ দেশেই পুলিশ যদি কাউকে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সময় অনলাইনে ট্র্যাক করতে পারে, তাহলে তাকে ওয়ারেন্ট ছাড়াই গ্রেফতার করতে ও তল্লাশি চালাতে পারে। শুধুমাত্র অপরাধ সংগঠিত হয়ে যাওয়ার পর যদি গ্রেফতার বা তল্লাশি চালাতে হয়, তখন ওয়ারেন্ট এর প্রয়োজন পরে। অপরাধ সংগঠিত হওয়ার সময় ধরা পড়লে কখনোই ওয়ারেন্ট এর প্রয়োজন পরে না।

সর্বশেষ, রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করা নিয়ে যে ধারা সেটা নিয়ে আপত্তি তোলা হয়েছে। আমি একমত, এখানে আসলে আদালতকে ক্ষমতা দেয়া হয়েছে সত্য আর মিথ্যা নির্ণয় করার। কিন্তু, এই ক্ষেত্রে আমাদের মনে রাখতে হবে দেশের সাম্প্রতিক ইতিহাস। প্রেস ক্লাব, সম্পাদক পরিষদসহ সাংবাদিকদের কোনো সংগঠনই কিন্তু তাদের নিজেদের নৈতিকতার সনদ বা আচরণবিধি প্রয়োগ করতে পারেননি। সম্পাদক পরিষদের বর্তমান প্রধান মাহফুজ আনাম, যিনি টেলিভিশনের পর্দায় স্বীকার করেছেন ১/১১ এর সময় আমাদের প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে মিথ্যা ও উদ্দেশ্যমূলক সংবাদ প্রচারের কথা। 

যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপিয়ান ইউনিয়নে হলে তাকে বাধ্য করা হতো সাংবাদিকতা পেশা থেকে পদত্যাগ করতে। শুধু তাই নয়, তাকে আর কোনোদিন সম্পাদক বা সাংবাদিক হিসেবে দায়িত্ব দেয়া হতো না। বাংলাদেশে কিন্তু সম্পাদক পরিষদ উল্টো তার পক্ষ নিয়েই তাকে তাদের জেনারেল সেক্রেটারি নির্বাচিত করেছে। বিষয়টি আমাকে অবাক করে। যেহেতু, ইইউ ও যুক্তরাষ্ট্র মিশন এই আইন নিয়ে তাদের মতামত তুলে ধরেছে, আমি আশা করবো তারা মাহফুজ আনামের স্বীকারোক্তির পরেও একটি প্রথম সারির পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে দায়িত্বরত থাকা নিয়েও তাদের মতামত জানাবেন। তা না হলে, তাদের কার্যকলাপ হবে একপেশে ও আমাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার শামিল। 

এই বিষয়টিকে থেকে আমরা সম্পাদক পরিষদের নৈতিকতা সম্পর্কে কি ধারণা পাই? পরিষ্কারভাবেই, তাদের  নৈতিকতা বলে কিছু নেই। বস্তুতঃ সম্পাদক পরিষদ বলতে চায়, তাদেরকে সরকারের বিরুদ্ধে নোংরা, মিথ্যা প্রচারণা চালাতে দিতে হবে এবং সত্য অবলম্বন না করেই তাদের অপছন্দের রাজনীতিকদের সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করতে দিতে হবে। তারা যদি শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে এমন পরিকল্পনা করেন, তাহলে দেশের ভবিষ্যৎ কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়?

যেহেতু গণমাধ্যমের সম্পাদকেরা তাদের নিজেদের তৈরি নৈতিক নির্দেশনাই মানতে রাজি নন, তাহলে আমরা সত্য-মিথ্যা নির্ধারণের ভার আদালতের হাতেই তুলে দেই। গ্রেফতার মানেই জেল নয়। সরকারের প্রমাণ করতে হবে যে আসামি জেনেশুনে মিথ্যা তথ্য প্রকাশ করেছেন। প্রমাণের দায়ভার সরকারের। যে সকল সাংবাদিকের মিথ্যা সংবাদ ছাপানোর উদ্দেশ্য নেই, তাদের ভয়েরও কিছু নেই।

সম্পাদক পরিষদ যদি এ সকল ধারার সংশোধন চান, তাহলে তাদের নিজেদের নৈতিকতার নীতিমালা বাস্তবায়ন করতে হবে। যে সম্পাদক বা সংবাদকর্মী মিথ্যা সংবাদ ছেপেছেন, তাকে অবশ্যই দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দিতে হবে এবং ভবিষ্যতে যাতে আর কোনোদিন সংবাদ তৈরি বা প্রচারের কাজ করতে না পারেন সেই ব্যবস্থা করতে হবে।

লেখক: প্রধানমন্ত্রীর তথ্যপ্রযুক্তি উপদেষ্টা

সংশ্লিষ্ট খবর


মন্তব্য যোগ করুণ

পরের
খবর

নবগঠিত মন্ত্রিপরিষদ ও জনপ্রত্যাশা


আরও খবর

চতুরঙ্গ

রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ গত ৭ জানুয়ারি বঙ্গভবনে নবনিযুক্ত মন্ত্রীদের শপথ পাঠ করান— পিআইডি

  অধ্যাপক ড. মো. আমির হোসেন

প্রথমে বিউগলে সুর, তারপর জাতীয় সংগীত, এরপর শপথ ও গোপনীয়তার শপথ বাক্য পাঠ এবং শপথপত্রে স্বাক্ষর করে হ্যাট্রিকসহ চতুর্থবার বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী হলেন বঙ্গবন্ধুর কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা। বিশ্ব ইতিহাসে বিরল ঘটনা। এক জনমে একই ব্যক্তির চারবার সরকার প্রধান হওয়ার দৃষ্টান্ত ইতিহাসে খুব বেশি নেই।

'আমি .... সশ্রদ্ধ চিত্তে শপথ করিতেছি যে, আমি আইন অনুয়ায়ী সরকারের মন্ত্রী পদের কর্তব্য বিশ্বস্ততার সহিত পালন করিব। আমি বাংলাদেশের প্রতি অকৃত্রিম বিশ্বাস ও আনুগত্য পোষণ করিব। আমি সংবিধানের রক্ষণ, সমর্থন ও নিরাপত্তা বিধান করিব। এবং আমি ভীতি বা অনুগ্রহ, অনুরাগ বা বিরাগের বশবর্তী না হইয়া সকলের প্রতি আইন অনুযায়ী যথাবিহিত আচরণ করিব।' এই শপথ বাক্য পাঠ করে আওয়ামী লীগের চতুর্থবার সরকারে ২৪ জন মন্ত্রী, ১৯ জন প্রতিমন্ত্রী ও ৩ জন উপমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

এবারের মন্ত্রিসভায় আওয়ামী লীগের অনেক জ্যেষ্ঠ নেতার জায়গা হয়নি, মন্ত্রিত্ব পায়নি শরিক দলগুলোও। এ নিয়ে জল্পনা-কল্পনার শেষ নেই। বিচার-বিশ্লেষণ চলছে সর্বত্র। আনন্দ-হতাশা দুইই আছে। যারা মন্ত্রিত্ব পেয়েছেন তারা এবং তাদের সমর্থকগণ উল্লসিত। যারা মন্ত্রিত্ব পাননি তারা এবং তাদের সমর্থকগণ খানিকটা হতাশ, যা স্বাভাবিক। কেউ কেউ আশাবাদী, কারণ মন্ত্রিসভা এখনও পূর্ণাঙ্গ হয়নি। যারা মন্ত্রিত্ব পাননি তাদের কেউই নতুন মন্ত্রিসভা সম্পর্কে বিরূপ মন্তব্য বা কটূক্তি করেননি বরং সফলতা কামনা করেছেন, উন্নয়নের ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকবে এবং উন্নয়ন কর্মকাণ্ড গতিশীল হবে বলে মন্তব্য করেছেন। এই মন্তব্যগুলোর মাধ্যমে জ্যেষ্ঠ নেতৃবৃন্দ পরিপক্কতার পরিচয় দিয়েছেন, বঙ্গবন্ধুর আদর্শ এবং জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বের প্রতি তাদের আনুগত্য পুনর্ব্যক্ত করেছেন। তাদের এই আচরণ আওয়ামী রাজনীতিতে নিঃসন্দেহে শুভ প্রভাব ফেলবে।

বিগত এক দশকে জননেত্রী শেখ হাসিনার দৃঢ় নেতৃত্বে নানাবিধ সামাজিক সূচকসহ অর্থনৈতিক আকাশচুম্বী উন্নয়ন হয়েছে যার কারণে বাংলাদেশ এখন উন্নয়নশীল দেশ, বিশ্বের ৪১তম অর্থনীতি, ২০৩২ সালে ২৫তম বৃহৎ অর্থনীতি হবে। জননেত্রী শেখ হাসিনা এখন বিশ্ব নেতা ও মাদার অব হিউম্যানিটি। বিশ্বাঙ্গনে বাংলাদেশের মর্যাদা বেড়েছে। কথিত তলাবিহীন ঝুড়ি এখন উন্নয়নের রোল মডেল। বাংলাদেশের মানুষ এই উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে লাভবান হয়েছে, মাথাপিছু আয় বেড়েছে, খানিকটা স্বস্তিতে আছে মানুষ। মঙ্গায় পীড়িত হচ্ছে না, অনাহারে থাকছে না। আরো অনেক দূর এগোতে হবে। আশায় বুক বাঁধছে মানুষ। গত দশ বছরের উন্নয়ন মানুষকে আশাবাদী করেছে। আশাবাদী হওয়ার কারণ জননেত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শী নেতৃত্ব। তাই তিনি বাংলাদেশের মানুষের অন্তরে জায়গা করে নিয়েছেন। জননেত্রী শেখ হাসিনার ওপর আস্থা রেখেই বাংলাদেশের জনগণ গত নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোটকে একচ্ছত্র বিজয় অর্জনে সমর্থন জানায়। নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন তুলে ঐক্যফ্রন্ট জনগণের সাড়া পায়নি। কারণ বিরামহীন উন্নয়ন অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করতে রাজি নয় মানুষ। বিদেশিদের কাছে নালিশ করেও সাড়া পাচ্ছে না ঐক্যফ্রন্ট। বিদেশিরাও বাংলাদেশের অগ্রযাত্রাকে অব্যাহত রাখার পক্ষে।

উপরোক্ত শপথবাক্য পাঠ করেই গত দশকের মন্ত্রিপরিষদের সদস্যগণও দায়িত্ব নিয়েছিলেন। বাদপড়া জ্যেষ্ঠ নেতা ও মন্ত্রীবর্গের অনেকে এই শপথ ধারণ করে উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় কম-বেশি অবদান রেখেছেন। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী বলেছেন যে, বাদ পড়েছেন বলে তারা ব্যর্থ হয়েছেন তা ঠিক নয়। আগামীর বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দেয়ার জন্য নতুনদের সুযোগ দেয়া হয়েছে। তবে তারা কঠোর নজরদারিতে থাকবেন। কিন্তু একথা সত্যি যে, কেউ কেউ এই শপথবাক্য ধারণ করেননি, মনেও রাখেননি। বরং উল্টোটাই করেছেন। চলন-বলন, আচার-আচরণ, কথা-বার্তা বদলে যায় কারো কারো। রাষ্ট্রীয় স্বার্থ জলাঞ্জলি দেন, জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হন। বেশ ক'জন মন্ত্রী ব্যাপক সমালোচনার মুখেও পড়েন, যা জননেত্রী শেখ হাসিনাকে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলে। যারা নিজেদের কৃতকর্মের জন্য মন্ত্রিত্ব হারিয়েছেন তাদের উচিত হবে তাদের অতীত কর্মকাণ্ডগুলো মূল্যায়ন করা। ত্রুটি-বিচ্যুতিগুলো সংশোধন করে দল, জনগণ ও রাষ্ট্রের কল্যাণে আত্মনিয়োগ এবং সংশোধিত মানুষ হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করা।

নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় লাভ করায় বর্তমান সরকারের কাছে মানুষের প্রত্যাশাও অনেক। মানুষের আশা ভঙ্গ হোক— জননেত্রী শেখ হাসিনা কিছুতেই তা চাইবেন না। তাছাড়া বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়ার দায়িত্ব তার ওপর বর্তেছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দুই অংকে উন্নীত করা, মাথাপিছু আয়বৃদ্ধি, সব মানুষের জন্য পুষ্টিসম্পন্ন খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিতকরণ, উন্নয়নের সুফল ঘরে ঘরে পৌঁছে দেয়া, অর্থনৈতিক বৈষম্য কমিয়ে আনা, দারিদ্র্য দূরীকরণ, ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি, ব্যাংকিং খাতের বিশৃঙ্খলা দূরীকরণ, মানবসম্পদ সৃষ্টির লক্ষ্যে শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো, প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষার মধ্যে সমন্বয় সৃষ্টি, শিক্ষা ও গবেষণার মান উন্নয়ন, ঘরে ঘরে তথ্য-প্রযুক্তির সুবিধা প্রদান, সামাজিক অরাজকতার অবসান, মাদক ও দুর্নীতির রোধ, নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, সুশাসন প্রতিষ্ঠা, গ্রামে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুয়োগ সৃষ্টি করে গ্রাম থেকে শহরে মাইগ্রেশনের হার কমানো, কৃষিকে যুগোপযোগী করা, গ্রামে শহুরে সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টি, সারাদেশে স্বাস্থ্যসেবা প্রদান ও বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিতকরণ, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, রফতানি খাত ও বাজার সম্প্রসারণ করে রফতানি আয় বৃদ্ধি, শিল্পখাত সম্প্রসারণ, মেগা প্রজেক্টগুলো সফলভাবে সময়মত সম্পন্নকরণ, সারদেশে আধুনিক রেলসার্ভিস সৃষ্টি, রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানসহ বহুবিধ কর্মকাণ্ড সফলতা ও গতিশীলতার সঙ্গে পরিচালনা করতে হবে আগামী ৫ বছর। এ বিষয়গুলো মাথায় রেখে উন্নত প্রযুক্তি ও নিবিড় প্রতিযোগিতার শতকে টিকে থাকতে এবং এগিয়ে যেতেই হয়ত মাননীয় প্রধানমন্ত্রী পরিচ্ছন্ন ইমেজ সম্পন্ন তুলনামূলক কম বয়সী বা তরুণ কিন্তু মেধাবী, উদ্যমী, কর্মতৎপর, সৎ ও নিষ্ঠাবান মনে করে বর্তমান মন্ত্রিসভা গঠন করেছেন। জননেত্রীর মত বাংলাদেশের মানুষেরও বর্তমান মন্ত্রিপরিষদের কাছে প্রত্যাশা অনেক। মানুষ আশা করে বর্তমান মন্ত্রিসভার প্রতিটি সদস্য চলনে-বলনে, কথা-বার্তায়, আচার-আচরণে, চিন্তা-চেতনায় সৎ, পরিচ্ছন্ন ও মার্জিত হবে, জনবিচ্ছিন্ন না হয়ে জনগণের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকবে, জনগণের দুঃখ-দুর্দশা লাঘব করবে, জনগণের কল্যাণে ও বাংলাদেশকে উন্নত দেশে উন্নীত করার বঙ্গবন্ধু ও জননেত্রী শেখ হাসিনার লক্ষ্য বাস্তবায়নে নিজেকে উৎসর্গ করে পঠিত শপথ বাক্যের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করবে এবং শপথ বাক্যের যথার্থতা প্রমাণ করবে।


লেখক: উপ-উপাচার্য (প্রশাসন), জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

সংশ্লিষ্ট খবর

পরের
খবর

ঊনসত্তরের ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানের পাঁচ দশক


আরও খবর

চতুরঙ্গ

  অজয় দাশগুপ্ত

ঐতিহাসিক ১১ দফা আন্দোলনের ৫০ বছর পূর্ণ হচ্ছে এ বছরের জানুয়ারি মাসে। ১৯৬৯ সালের শুরুতেই চারটি ছাত্র সংগঠন- পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ, পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন (মতিয়া গ্রুপ), পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন (মেনন গ্রুপ) এবং এনএসএফ বা জাতীয় ছাত্র ফেডারেশন (দোলন গ্রুপ) ছাত্রদের বিভিন্ন দাবির সঙ্গে পূর্ব পাকিস্তানের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের ছয় দফা কর্মসূচি, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় অভিযুক্ত আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ মুজিবুর রহমানসহ সব রাজবন্দির মুক্তি, পাকিস্তানকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন বিভিন্ন সামরিক জোট থেকে মুক্ত করা, পাট ও বস্ত্র শিল্প জাতীয়করণ, পার্লামেন্টারি গণতন্ত্র প্রবর্তন প্রভৃতি ১১ দফা দাবিতে আন্দোলন গড়ে তোলার বিষয়ে একমত হয়। ছাত্রদের দাবির সঙ্গে রাজনৈতিক দাবি যুক্ত করা- সেটা ছিল সময়ের দাবি। এই চারটি ছাত্র সংগঠনের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের ভিপি তোফায়েল আহমেদ (ছাত্রলীগ নেতা) ও জিএস নাজিম কামরান চৌধুরী (এনএসএফ)- এই ১০ জনকে নিয়ে গঠিত হয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ। জেলায় জেলায় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয় বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের প্রতিনিধি এবং জেলার প্রধান কলেজের ভিপি-জিএসকে নিয়ে।

তখন ছিল ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খানের শাসনামল। তিনি ১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে চূর্ণ করে দিয়ে পাকিস্তানে সামরিক শাসন জারি করে ক্ষমতায় আসেন। ১৯৬৩ সাল থেকে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর ছিলেন মোনায়েম খান। তখন ছাত্রদের মিছিলে জনপ্রিয় স্লোগান ছিল আইয়ুব-মোনায়েম দুই ভাই, এক দড়িতে ফাঁসি চাই। তবে সে সময়ে প্রকৃতই ফাঁসির দড়ির হুমকিতে ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। তাকে স্বায়ত্তশাসনের ছয় দফা কর্মসূচি প্রদান এবং এর ভিত্তিতে জনমত গঠনের অভিযোগে ১৯৬৬ সালের ৮ মে গ্রেফতার করা হয়। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দীন আহমদসহ আরও অনেক নেতাও তখন জেলে ছিলেন। অনেক ছাত্রনেতাকেও বন্দি করা হয়। তারা বছরের পর বছর বিনা বিচারে জেলে ছিলেন। শেখ মুজিবুর রহমানসহ বন্দিদের মুক্তি ও ছয় দফা মেনে নেওয়ার দাবিতে ১৯৬৬ সালের ৭ জুন পূর্ব পাকিস্তানে হরতাল আহ্বান করা হয়। বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে যে সব হরতাল হয়েছে, তার রূপ (ঢিলেঢাকা, নিরুত্তাপ, শিথিল) যারা দেখেছেন তারা কোনোভাবেই ধারণা করতে পারবেন না যে আওয়ামী লীগের অনেক নেতা জেলে থাকার পরও কী অভাবনীয় সাড়া মিলেছিল তাতে। ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জে পুলিশের গুলিবর্ষণে ১০ জনের মৃত্যু হয়েছিল- এটা সরকারের পক্ষ থেকেই স্বীকার করে নেওয়া হয়। রাজপথ ছিল মিছিলকারীদের দখলে। ১৯৬৮ সালের ৭ জানুয়ারি দৈনিক পাকিস্তান পত্রিকা জানায়, 'পূর্ব পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করার ষড়যন্ত্রের অভিযোগে' ৭ জানুয়ারি পাকিস্তান সিভিল সার্ভিস ও সেনা-নৌ-বিমান বাহিনীর সদস্য এবং রাজনৈতিক নেতাসহ ২৮ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তারা অস্ত্র সংগ্রহের জন্য ভারতের আগরতলায় গোপন বৈঠকে মিলিত হয়েছিলেন। দৈনিক পাকিস্তান ১৮ জানুয়ারি জানায়, আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমান এবং আরও ৬ জন সামরিক কর্মকর্তাকে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় অভিযুক্ত করা হয়েছে। শেখ মুজিবুর রহমান এ ষড়যন্ত্রের প্রধান হোতা এবং তাকেই মামলার প্রধান আসামি করা হয়েছে।

১৯৬৯ সালের জানুয়ারি মাস শুরু হতে না হতেই ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ১১ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করে। ৮ জানুয়ারি পশ্চিম ও পূর্ব পাকিস্তানের কয়েকটি রাজনৈতিক দল ডেমোক্রেটিক অ্যাকশন কমিটি বা ডাক নামে একটি জোট গঠন করে। তাদের আট দফা দাবিতে পার্লামেন্টারি গণতন্ত্র এবং শেখ মুজিবুর রহমানসহ সব রাজবন্দির মুক্তির দাবি ছিল। কিন্তু স্বায়ত্তশাসনের ছয় দফা দাবি ছিল না। পশ্চিম পাকিস্তানের প্রায় সব নেতা ছয় দফা স্বীকার করতে রাজি ছিলেন না। এ জোটের শরিক বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ১৯৬৮ সালের ১৩ ডিসেম্বর পাকিস্তানব্যাপী সকাল-সন্ধ্যা হরতাল ডেকেছিল এবং তা পূর্ণ সফল হয়। তাদের মূল দাবি ছিল আইয়ুব খানের পতন এবং পার্লামেন্টারি গণতন্ত্র কায়েম। কিন্তু শেখ মুজিবুর রহমান ও তার দল ছয় দফার প্রশ্নে অটল থাকে।

ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সদস্য চারটি ছাত্র সংগঠনের মধ্যে ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়নের (মতিয়া গ্রুপ) কর্মী-সমর্থক ছিল অনেক। এনএসএফ (দোলন গ্রুপ) ছিল আইয়ুব খানের সমর্থক ছাত্র সংগঠন থেকে বের হয়ে আসা একটি অংশ। আইয়ুব খান সামরিক শাসন জারি করে পূর্ব পাকিস্তানের প্রধান রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ এবং ন্যাপ (মোজাফফর) ও মণি সিংহের কমিউিনিস্ট পার্টির অনেক নেতাকর্মীকে জেলে পাঠান। তবে ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়ন এমন কঠিন সময়েও ছাত্রদের মধ্যে সক্রিয় থাকে। তারা ঐক্যবদ্ধ হওয়ায় জনগণের মধ্যে বিপুল উৎসাহ সৃষ্টি হয়। তারা মনে করতে থাকে- ছাত্ররা এক হয়েছে। এবার আইযুব খানের রেহাই নেই। তখন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর মোনায়েম খান পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্র-তরুণ এবং মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীর কাছে ছিলেন ধিক্কৃত ও উপহাসের পাত্র। অন্যদিকে, পাকিস্তানের দুঃশাসনে ক্ষুব্ধ এ ভূখণ্ডের জনগণ নিজেদের মনে করতে থাকে বঞ্চিত-শোষিত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক রেহমান সোবহান ১৯৬১ সালেই 'টু-ইকোনমি' তত্ত্ব উপস্থাপন করেন। তিনি পূর্ব পাকিস্তান যে অর্থনৈতিকভাবে বঞ্চিত হচ্ছে সে চিত্র বিভিন্ন লেখায় তুলে ধরেন, যা ছাত্র ও শিক্ষিত মধ্যবিত্তদের মধ্যে আলোড়ন সৃষ্টি করে। শেখ মুজিবুর রহমানের ছয় দফা কর্মসূচিতে এ বঞ্চনার চিত্র ফুটে ওঠে। তাকে যখন আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার প্রধান আসামি করা হয়, তখন এ ভূখণ্ডের মানুষের মধ্যে শঙ্কা তৈরি হয়- এ জনপ্রিয় নেতাকে ফাঁসি দেওয়া হবে না তো? ছাত্রদের আন্দোলনের কর্মসূচি ছিল ১১ দফা। কিন্তু সবকিছু ছাপিয়ে মূল দাবি হয়ে ওঠে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার ও শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তি। জনগণও রাজনৈতিক দলের প্রতি নয়, বরং ছাত্রদের প্রতি ভরসা রাখতে শুরু করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বটতলা, মধুর ক্যান্টিন, ইকবাল হল প্রভৃতি স্থান তখন সবার মুখে মুখে। ১৭ জানুয়ারি ১১ দফার দাবিতে কলা ভবনের বটতলায় প্রথম ছাত্রসভা অনুষ্ঠিত হয়। তখন ১৪৪ ধারা জারি ছিল। আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্স প্রথম বর্ষের ছাত্র। বটতলার সমাবেশে সর্বোচ্চ শ'পাঁচেক ছাত্রছাত্রী সমবেত হয়েছিল। তোফায়েল আহমেদ সভাপতিত্ব করেন। কিন্তু মিছিল করতে চাইলে পুলিশ টিয়ারগ্যাস নিক্ষেপ ও লাঠিচার্জ করে তা ব্যর্থ করে দেয়। সে দিনই প্রথম আমি পুলিশের টিয়ারশেল বিস্ম্ফোরণের আগেই তা ভেজা চটে জড়িয়ে পুলিশের দিকে ছুড়ে মারা প্র্যাকটিস করি। সে যে কী আনন্দ! পরদিনও বটতলা থেকে মিছিল বের করতে গিয়ে পুলিশের হামলার মুখে পড়তে হয়। কিন্তু আমরা শ'খানেক ছাত্রছাত্রী পুলিশকে ফাঁকি দিয়ে মিছিল নিয়ে বটতলা থেকে গুলিস্তান পর্যন্ত চলে যেতে পারি। রাস্তার দু'পাশের জনগণ আমাদের করতালি দিয়ে অভিনন্দন জানায়। ১৯ জানুয়ারি বোরবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ছিল। কিন্তু প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বর্তমানের বুয়েট) খোলা ছিল এবং সেখানকার ছাত্রছাত্রীরা মিছিল করতে গিয়ে বাধার সম্মুখীন হয়ে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়।

বাঁধভাঙা আন্দোলন কী, মাটির ঢিবি থেকে উইপোকার মতো কীভাবে ছাত্রছাত্রীরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে বের হয়ে আসতে পারে, সে অভিজ্ঞতা আমার জীবনে প্রথম হয় ১৯৬৯ সালের ২০ জানুয়ারি। সেদিন ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্র ধর্মঘট ডাকে। সকাল ১১টার দিকে বটতলায় সমাবেশ ছিল। নির্ধারিত সময়ের আগেই কলা ভবন ও আশপাশের এলাকা ছাত্রছাত্রীরা ভরে ফেলে। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দলে দলে তারা এসেছে। এ মিছিলের রুট নির্ধারিত হয় উপাচার্যের বাসভবন, এসএম হল, ঢাকা মেডিকেল কলেজ, নাজিমুদ্দিন রোডের জেলখানা, চকবাজার, ইসলামপুর, বাহদুর শাহ পার্ক, গুলিস্তান, তোপখানা রোড হয়ে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার। সে সময়ে আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যত মিছিল বের করেছি, তার বেশিরভাগ এই দীর্ঘ পথ পরিক্রম করত। ২০ জানুয়ারির মিছিল ১৪৪ ধারা উপেক্ষা করে বের হয় এবং ঢাকা মেডিকেল কলেজ এলাকায় গুলি হয় এবং তাতে আসাদুজ্জামান নামের এক ছাত্রনেতা নিহত হন। তখন মোবাইল ফোনের চল ছিল না। টিএন্ডটি ফোনও তেমন ছিল না। কিন্তু সর্বত্র কীভাবে খবর ছড়িয়ে পড়ে- পুলিশ ছাত্র মেরে ফেলেছে গুলি করে। এবারে আইয়ুব খান-মোনায়েম খানের রক্ষা নেই। সেদিন বিকেলে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে শোক মিছিল বের হয়। সামনে ছিলেন কালো পতাকা হাতে দীপা দত্ত নামের এক ছাত্রনেতা। পুলিশ-ইপিআর (বর্তমান বিজিবির পূর্বসূরি) মিছিলে বাধা দিতে চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। শহীদ মিনার থেকেই কর্মসূচি ঘোষণা হয়- ২১ জানুয়ারি ঢাকায় পূর্ণ দিবস হরতাল, ২৩ জানুয়ারি সন্ধ্যায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে মশাল মিছিল এবং ২৪ জানুয়ারি দেশব্যাপী সকাল-সন্ধ্যা হরতাল।

২৪ জানুয়ারি হরতালের দিনেই সকালে তোপখানা রোডে সচিবালয়ে পিকেটিং করার সময় স্কুলছাত্র মতিউর রহমান পুলিশের গুলিতে নিহত হন। এ দিন প্রকৃতপক্ষে ঢাকার ছাত্র-জনতা এবং টঙ্গি-তেজগাঁও-আদমজী-ডেমরা এলাকার শ্রমিকরা একযোগে রাজপথে নেমে আসেন। আমি বর্তমান দোয়েল চত্বর এলাকায় একদল শ্রমিকের মধ্যে পড়ে যাই। মনে আছে, তখন লুঙ্গি-গেঞ্জি পরা এক শ্রমিক আমাকে বুকে টেনে নিয়ে অন্যদের দেখিয়ে বলেছিলেন, 'এই মাসুম বাচ্চা মিছিলে যখন, আমরা ঘরে তাকি ক্যামনে।' সবার মুখে তখন আইয়ুব শাহির পতন চাই, শেখ মুজিবের মুক্তি চাই স্লোগান। মতিঝিলের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি অফিসের টপ বসরা ছাত্রদের ডাকে রাজপথে নেমে আসেন। বড় বড় সরকারি অফিসের শীর্ষ ব্যক্তি থেকে পিয়ন-দারোয়ান একই মিছিলে শামিল হয়েছেন, এ এক অভূতপূর্ব দৃশ্য। অতীতে এমনটি ঢাকা প্রত্যক্ষ করেনি।

দুপুরে পল্টন ময়দানে মতিউরের জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। ততক্ষণে ঢাকা শহর যেন জ্বলছে। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় শেখ মুজিবের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য প্রদান করেছেন, এমন কয়েকজনের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও বাড়ি জনগণ পুড়িয়ে দেয়। সরকার সমর্থক দৈনিক পাকিস্তান ও মর্নিং নিউজ জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। জনগণ গভর্নর হাউস ও সচিবালয়ে আগুন দেবে, এমন শঙ্কা তৈরি হয়। ততক্ষণে সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। ছাত্রনেতারা তখন পল্টন ময়দান থেকে মিছিল নিয়ে ইকবাল হলের (বর্তমানে সার্জেন্ট জহুরুল হক হল) মাঠে চলে আসেন। পরদিন ২৫ জানুয়ারি প্রদেশব্যাপী হরতাল ঘোষিত হয়। একইসঙ্গে সরকার ঘোষণা করে কারফিউ।

প্রকৃতপক্ষে ২৪ জানুয়ারির ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানই আইয়ুব খানের পতন এবং শেখ মুজিবের মুক্তি অবধারিত করে দেয়। সবাই কেবল অপেক্ষায় ছিল কখন এ দুটি ঘটনা ঘটে। শেখ মুজিবুর রহমান মুক্তিলাভ করেন ২২ ফেব্রুয়ারি। জনগণ তাকে বরণ করে নেন বঙ্গবন্ধু হিসেবে। আইয়ুব খান বিদায় নেন ২৫ মার্চ।

ছাত্রসমাজের নেতৃত্বে ১১ দফার আন্দোলন পরিচালিত হয়েছিল। এ আন্দোলনকেই অভিহিত করা হয় স্বাধীনতা সংগ্রামের ড্রেস রিহার্সাল হিসেবে। এ আন্দোলন চলাকালেই জয় বাংলা স্লোগান ধ্বনিত হতে থাকে। আরও শোনা যায়- পিন্ডি না ঢাকা ঢাকা- ঢাকা, পদ্মা মেঘনা যমুনা- তোমার আমার ঠিকানা প্রভৃতি স্লোগান। সঙ্গোপনে প্রস্তুতি চলতে তাকে স্বাধীনতার। ছাত্রদের ওপর জনতার তখন অগাধ আস্থা। ইকবাল হল সবকিছুর কেন্দ্রে। কারখানায় শ্রমিক-মালিক বিরোধ মীমাংসার জন্য উভয়পক্ষ চলে আসত ওই ছাত্রাবাসে। এমনকি স্বামী-স্ত্রীর ঝগড়া দেখা দিলেও উভয় পক্ষ ভাবত- ইকবাল হলে গেলে একটা সমাধান মিলবেই।

সে সময়ে আমরা দিনের পর দিন ধর্মঘট করেছি- মিছিল করেছি। হাজার হাজার ছাত্রছাত্রী তাতে অংশ নিয়েছে। সকালে বিভিন্ন স্কুল-কলেজে গিয়ে ধর্মঘট করিয়ে মিছিল নিয়ে বটতলার সমাবেশে যোগদান, তারপর ৮-১০ কিলোমিটার মিছিল করে দুপুরে খেয়েই বিকেলে মধুর ক্যান্টিনে কর্মিসভা। দিনের পর দিন আমরা এ ধরনের কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছি ক্লান্তিহীনভাবে। তোফায়েল আহমেদ ছিলেন আন্দোলনের মধ্যমণি। তার বক্তব্য ছাত্র-জনতা মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনত। সাইফউদ্দিন আহমদ মানিক বক্তৃতা দিতেন গুছিয়ে। তার বক্তব্যে থাকত দিকনির্দেশনা। জেলায় জেলায় যে সব কলেজ ছিল, সর্বত্র নিয়মিত নির্বাচন হতো ছাত্র সংসদের। নির্বাচিত ভিপি-জিএসরা জনগণের কাছে বিশেষ মর্যাদা পেতেন। ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়নের প্রার্থীরা বেশিরভাগ কলেজ ছাত্র সংসদে জয়ী হতেন। সাধারণভাবে যে কোনো ছাত্র-গণসমাবেশে ছাত্রনেতাদের বক্তব্য মানুষ বিশেষ আগ্রহ নিয়ে শুনত।

১১ দফার আন্দোলনের মধ্য দিয়ে পতন ঘটে আইযুব খানের। রাজনৈতিক অঙ্গনে যে শূন্যতা তিনি সৃষ্টি করেছিলেন তা দ্রুতই পূরণ হয়ে যায়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হয়ে ওঠেন বাঙালির প্রাণপ্রিয় নেতা। তিনি স্বাধীনতার পথে সুপরিকল্পিতভাবে অগ্রসর হতে থাকেন। জনগণ যে এ জন্য প্রস্তুত হয়ে উঠেছে, সেটা তো তিনি নিশ্চিত হয়ে যান ঊনসত্তরের ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানেই।

এই জানুয়ারিতে ঊনসত্তরের সেই অগ্নিঝরা দিনগুলোর ৫০ বছর পূর্ণ হলো। ১৭ থেকে ২৪ জানুয়ারি, এই আটটি দিন আমাদের এ ভূখণ্ডের ছাত্রসমাজ রাজপথ কাঁপিয়ে দিয়েছিল। অনন্য বিজয় ছিনিয়ে এনেছিল। রক্ত দিয়েছিল আসাদ-মতিউরসহ অনেকে। তাদের স্মৃতির প্রতি জানাই প্রণতি। ২৪ জানুয়ারি ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের অর্ধশত বার্ষিকী নিছক আনুষ্ঠানিকতার জন্য নয়, বরং তা থেকে শিক্ষা গ্রহণের জন্য নানা আয়োজনে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও ছাত্র সংগঠন পালন করবে- এটাই প্রত্যাশা।

লেখক: সাংবাদিক

সংশ্লিষ্ট খবর

পরের
খবর

বাংলাদেশে মানবাধিকার : আনুষ্ঠানিকতা নয় চর্চাই মুখ্য


আরও খবর

চতুরঙ্গ

  ড. মো. কামাল উদ্দিন

মানবাধিকার ধারণার ব্যাপ্তি, পরিধি ও ব্যবহারের ব্যাপকতা বেড়েছে অনেক গুণ। উন্নয়ন, গণতন্ত্র, সুশাসন, মানবাধিকার, পরিবেশ, সংস্কৃতিসহ মানবসমাজের প্রয়োজনীয় সব প্রত্যয়ের সঙ্গে মানবাধিকারের ধারণাটি খুব জোরালোভাবে সম্পৃক্ত করা হয়েছে। বর্তমান যুগ মানবাধিকার ও টেকসই উন্নয়নের যুগ। মানবাধিকার বিষয় বাদ দিয়ে সুশাসন, গণতন্ত্র ও সর্বোপরি উন্নয়ন কল্পনা করা যায় না এ যুগে।

বৈশ্বিক মানবাধিকারের আওয়াজ পৃথিবীর উত্তর-দক্ষিণ, পূর্ব-পশ্চিম সব জায়গায় লেগেছে। তবে এর মাত্রাগত পার্থক্য ব্যাপক। বাংলাদেশ আজ রাজনৈতিক পরিভাষায় একটি মধ্যম আয়ের দেশ। সত্যি কথা বলতে কী, মানুষের আয় বেড়েছে, দারিদ্র্য কমেছে এবং জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন হয়েছে অনেক। কিন্তু নাগরিকের পরিপূর্ণ মানবাধিকার চর্চা ও রাষ্ট্রীয়ভাবে মানবাধিকার সুরক্ষা বড় ধরনের ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। বাংলাদেশে মানবাধিকার বিষয়টি বিদেশি অনুদানের চরম হাতিয়ার হিসেবে পরিণত হয়েছে।

অনেকে হয়তো আমার সঙ্গে একমত পোষণ নাও করতে পারেন যে, বাংলাদেশে মানবাধিকার চিত্র পূর্বের তুলনায় বহু গুণ বিশ্বজয় হয়েছে। আমাদের মানবাধিকার সনদ আছে, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার চুক্তিতে আমরা স্বাক্ষর করেছি, আমাদের সংবিধানে মানবাধিকার রক্ষার কথা জোরালোভাবে বলা আছে, আমাদের জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আছে, তথ্য কমিশন আছে, দুর্নীতি দমন কমিশন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা আছে (Officially), মানবাধিকার সংগঠন আছে, মানবাধিকার কর্মী আছে, গণতন্ত্র আছে তথাকথিত এবং আজ আমরা মধ্যম আয়ের দেশে উপনীত হয়েছি। কিন্তু আমাদের এত উন্নয়ন ও মানবাধিকার সুরক্ষায় সরকারি ও বেসরকারিভাবে এ সরঞ্জাম থাকার পরও প্রকৃত অর্থে নেই আমাদের মানবাধিকার চর্চা। নারী নির্যাতন, গুম, বিনাবিচারে হত্যা, শিশু নির্যাতন, গণপিটুনিতে মানুষ মারা আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে নতুন মাত্রা যুক্ত করেছে। মানবাধিকার আমাদের কাছে একটি পশ্চিমা ধারণায় পরিণত হয়েছে। এ ধারণা আমাদের দেশের রাজনীতি, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও আমাদের উন্নয়নের সঙ্গে মানায় না। আমাদের মানবাধিকারের কর্মসূচি প্রকৃত অর্থে মানবাধিকার উপভোগ ও সুরক্ষার জন্য নয় বরং বিদেশি অনুদান পাওয়া ও উন্নত রাষ্ট্রগুলোকে খুশি করার জন্য। তাই তো আমরা বর্তমান বিশ্বে একটি চ্যাম্পিয়ন জাতি, যারা মানবাধিকারের সব চুক্তি, সনদ ও কনভেনশন স্বাক্ষর করে মানবাধিকারের কথা বলে মানবাধিকার লঙ্ঘন করি। আমরা অত্যন্ত সফল, কারণ গণতন্ত্র, সুশাসন, মানবাধিকার আন্দোলন, মানবাধিকার কমিশন যেভাবে আমাদের দেশে কাজ করছে বৈশ্বিক মানবাধিকার রক্ষার প্রতিষ্ঠান আমাদের কর্মসূচিতে তেমন উদ্বিগ্ন নয়। আমাদের রাজনৈতিক এলিটরাও অত্যন্ত খুশি, কারণ প্রয়োজন হলে সব কিছু থাকা সত্ত্বেও আমরা মানবাধিকার লঙ্ঘন করতে পারি। আমাদের রাজনীতি একটি অন্যতম মানবাধিকার রাজনীতিতে পরিণত হয়েছে। যেখানে মানবাধিকার সুরক্ষার সব ব্যবস্থাও আছে, তীব্র মাত্রায় মানবাধিকার লঙ্ঘনও আছে। গত কিছু দিন আগে আমরা মানবাধিকার সনদ স্বীকৃতির ৭০ বছর পালন করেছি। এখন ভাবনার বিষয় হলো, আরও কত বছর পার করলে বাংলাদেশের মানুষ মানবাধিকার বর্ণনা সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করবে এবং তাদের অধিকার আর লঙ্ঘিত হবে না তা এখনও অজানা।

উন্নয়নের সঙ্গে মানবাধিকারের সম্পর্ক আজ নতুন নয়। বাংলাদেশের উন্নয়নের প্রশংসা আজ সর্বমহলে। তবে নাগরিককে মানবাধিকার বিবেচনা করে কতটুকু উন্নয়ন করা হয়েছে তা এখন ভাবনার বিষয়। বাংলাদেশের উন্নয়ন ও মানবাধিকার সম্পর্ক নেতিবাচক। যদি মানবাধিকার ধারণা বা বিষয় বাংলাদেশের মতো দেশের উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করে তাহলে উন্নয়ন কর্মসূচি থেকে মানবাধিকারকে বাদ দিতে হবে, না হয় মানবাধিকার বাদ দিয়ে যে উন্নয়ন তাকে উন্নয়ন বলা মুশকিল। তাই আমাদের উন্নয়ন কর্মসূচিতে গুরুত্ব পাওয়া উচিত মানবাধিকার রক্ষার উন্নয়ন। সে জন্য সরকারকেই এগিয়ে আসতে হবে সবার আগে।

লেখক : অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

সংশ্লিষ্ট খবর