রাজধানী

একাধিক মামলা নিয়েই চলছিল ভিক্টরের বাসটি

৪৫ সিটের বাস চালানোর লাইসেন্স ছিল না চালকের

প্রকাশ : ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৯ | প্রিন্ট সংস্করণ

একাধিক মামলা নিয়েই চলছিল ভিক্টরের বাসটি

  সাহাদাত হোসেন পরশ

ভিক্টর ক্লাসিক পরিবহনের যে বাস শনিবার চাপা দিয়ে সঙ্গীত পরিচালক পারভেজ রবের ছেলেকে আহত ও তার বন্ধুকে হত্যা করে সেই বাসের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে। মামলাগুলো মাথায় নিয়েই চলছিল বাসটি। এ ছাড়া চালকের হালকা যানবাহন চালানোর লাইসেন্স ছিল। তবে সেই লাইসেন্স দিয়েই ভিক্টরের ৪৫ সিটের বাস চালিয়ে আসছিল চালক রফিকুল ইসলাম। পুলিশের চোখের সামনেই এভাবে দিনের পর দিন অবৈধ লাইসেন্স ও একাধিক মামলা নিয়ে চলছিল ভিক্টরের বাসটি।

শনিবার রাতে বন্ধু মেহেদী হাসান ছোটনকে (২০) নিয়ে কুলখানির খাবার ও জিনিসপত্র কিনতে টঙ্গীর উদ্দেশে রওনা হন সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত কণ্ঠশিল্পী পারভেজ রবের ছেলে ইয়াসির আলভী রব। গত বৃহস্পতিবার উত্তরার ইস্টওয়েস্ট মেডিকেল কলেজের সামনে ভিক্টর পরিবহনের বাসের ধাক্কায় প্রাণ হারিয়েছিলেন পারভেজ। তিনি প্রখ্যাত কণ্ঠশিল্পী ও সঙ্গীত পরিচালক আপেল মাহমুদের চাচাত ভাই। দু'দিনের মাথায় বাবার কুলখানির খাবার কিনতে গিয়ে একই পরিবহনের অন্য একটি বাসের ধাক্কায় গুরুতর আহত হন ছেলে ইয়াসির। একই দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ইয়াসিরের বন্ধু ছোটন। বর্তমানে ইয়াসির শ্যামলীর ট্রমা সেন্টারে চিকিৎসাধীন।

ছোটন নিহত হওয়ার ঘটনায় করা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উত্তরা-পশ্চিম থানার এসআই মো. সাদেক সমকালকে জানান, চালকের লাইসেন্স ও গাড়ির রেজিস্ট্রেশন ছাড়া অন্য কোনো কাগজপত্র গাড়িতে পাওয়া যায়নি। ফিটনেস সনদ, ট্যাক্স টোকেনসহ আরও কিছু কাগজপত্র একটি গাড়িতে থাকে। আগেই একাধিক মামলা থাকায় গাড়ির অন্য কাগজপত্র জব্দ করা ছিল। তিনি আরও জানান, রিমান্ডে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে চালক স্বীকার করেছে, তার ভুলের কারণেই দুর্ঘটনা ঘটেছে। ওই বাসের মালিক কুড়িল বিশ্বরোড এলাকার বাসিন্দা জনৈক শামসুদ্দিন। ছয় মাস ধরে গাড়িটি চালাচ্ছিল রফিকুল। চালক মাদকাসক্ত কি না তাও জানার চেষ্টা চলছে। চালকের সহকারী ও কন্ডাকটরকেও গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।

বিআরটিএর সি সার্কেল (উত্তরা-দিয়াবাড়ি) পরিদর্শক আবদুল মান্নান সমকালকে বলেন, ওই চালকের যে ক্যাটাগরির লাইসেন্স ছিল তাতে যাত্রীবাহী যানবাহন হলে সর্বোচ্চ  ১২ সিটের গাড়ি চালাতে পারবে। আর মালবাহী যানবাহন হলে দুই হাজার ৭০০ কেজির গাড়ি চালানোর কথা। ৪৫ সিটের বাস সে কোনোভাবে চালাতে পারবে না।

এদিকে পারভেজ নিহত হওয়ার ঘটনায় তুরাগ থানায় একটি মামলা করে তার পরিবার। তবে গতকাল পর্যন্ত ওই দুর্ঘটনার জন্য দায়ী চালক ও তার সহকারীকে গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ।

তুরাগ থানার ওসি নুরুল মোত্তাকিন বলেন, ঘাতক চালককে ধরার চেষ্টা চলছে। একাধিক জায়গায় অভিযানও চালানো হয়েছে।

'কাকুতি-মিনতির পরও বাস থামছিল না':ট্রমা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন পারভেজ রবের ছেলে ইয়াসির সোমবার সমকালকে বলেন, 'চিকিৎসক জানিয়েছেন দেড় মাসের মতো হাসপাতালে থাকতে হবে। কীভাবে এত দিন চিকিৎসা খরচ চালাব তা নিয়ে পরিবারের সবাই উদ্বিগ্ন। ভিক্টর পরিবহনের কেউ এসে তাদের সঙ্গে যোগাযোগও করেনি।' দুর্ঘটনার কথা স্মরণ করে ইয়াসির বলেন, যখন বাসে ওঠার চেষ্টা করলাম তখনই ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয়। এরপর ঝুলে থাকা অবস্থায় বাস থামানোর কথা বললেও ওরা শুনল না। পেছন থেকে বন্ধু বাঁচাতে গিয়ে সেও মারা গেল। ইয়াসির বলেন, ওরা হয়ত আমাদের মারতে চেয়েছে। তাই এভাবে মেরেছে। এমনও হতে পারে চালক নেশার ঘোরে ছিল। তা না হলে কেন এত কাকুতি-মিনতির পরও বাস থামাল না। খালি রাস্তায় বেপরোয়াভাবে টান মেরে চাপা দিল। দুর্ঘটনার আগে জানতাম না সেটা ভিক্টর পরিবহনের বাস ছিল। পরে জানলাম পরিবহনের নাম। এখন মনে হচ্ছে কেউ জেনেশুনে আমাকে হয় মারতে চেয়েছিল।

ইয়াসিরের মা রুমা সুলতানা বলেন, স্বামীকে হারানোর পরও ছেলেকে বলেছি, প্রতিবাদ করার দরকার নেই। প্রতিবাদ করলে যাকে হারিয়েছি সে ফিরে আসবে। প্রতিবাদ করলে ছেলের শত্রু বাড়তে পারে এমন শঙ্কা ছিল। এখন আবার সেই পরিবহনের বাসের চাপায় ছেলের কোমর ভাঙল। হারাতে হলো ছেলের বন্ধুকে। এখন আর কিছু চাই না। শুধু চাই, যারা এ ঘটনার জন্য দায়ী তাদের বিচার। কীভাবে ছেলে-মেয়ে নিয়ে চলব। চালক ও মালিক ক্ষতিপূরণ না দিলে চিকিৎসার খরচ ও পরিবার নিয়ে কীভাবে চলব। উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়েছি। এখনও স্বামীর ঘাতক চালককে পুলিশ ধরতে পারেনি। মালিককে গ্রেফতার করলেই চালকের সব বের হয়ে যাবে।

তিন দাবিতে প্রতিবাদ : দুই দিনের ব্যবধানে ভিক্টর ক্লাসিক পরিবহনের পৃথক বাসচাপায় সঙ্গীত পরিচালক পারভেজ রব ও মেহেদী হাসান ছোটন নামে এক শিক্ষার্থী নিহত এবং রবের ছেলে আহত হওয়ার ঘটনায় প্রতিবাদে সড়ক অবরোধ করেন শিক্ষার্থীরা। তাদের সঙ্গে যোগ দেন স্থানীয় লোকজনও। গতকাল সোমবার দুপুরে রাজধানীর তুরাগের ধউর এলাকার ইস্টওয়েস্ট মেডিক্যালের সামনে সড়ক অবরোধ করে যান চলাচল বন্ধ করে দেন তারা। পরে পুলিশ তাদের সড়ক থেকে সরিয়ে দিলে সড়কের পাশে মানববন্ধন করেন শিক্ষার্থীরা। এ সময় তারা তিন দফা দাবি জানান। এগুলো হলো- ভিক্টর পরিবহনের লাইসেন্স বাতিল করতে হবে, দুর্ঘটনায় আহত ও নিহতদের পরিবারের সদস্যদের ক্ষতিপূরণ, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে পারভেজ রব ও মেহেদী হাসানকে চাপা দেওয়া বাসের চালক, তার সহকারী এবং সংশ্নিষ্ট কর্মচারীদের গ্রেফতার। পরে পুলিশের আশ্বাসে দাবি পূরণে ২৪ ঘণ্টার সময়সীমা বেঁধে দিয়ে অবরোধ প্রত্যাহার করেন শিক্ষার্থীরা।

নিহত ছোটনের মামাত ভাই ও মামলার বাদী ফিরোজ আলম বলেন, হত্যাকারী চালক ও হেলপারের ফাঁসির দাবিতে ধউর এলাকায় তিন ঘণ্টা সড়ক অবরোধ ছিল। পুলিশ কর্মকর্তারা এসে সংশ্নিষ্টদের গ্রেফতারের আশ্বাস দিয়েছেন। সেটা বাস্তবায়ন না হলে আবার সড়ক অবরোধ করা হবে।

মন্তব্য


অন্যান্য