রাজধানী

সুউচ্চ সব ভবনের নির্মাণ ত্রুটি অনুসন্ধানে দুদক

ইকবাল সেন্টারসহ তিন ভবনের ফাইল তলব

প্রকাশ : ২০ আগষ্ট ২০১৯ | প্রিন্ট সংস্করণ

ইকবাল সেন্টারসহ তিন ভবনের ফাইল তলব

বনানীর ইকবাল সেন্টার- সমকাল

  হকিকত জাহান হকি

রাজধানীর বুকে গড়ে ওঠা সুউচ্চ সব ভবনের নির্মাণ-ত্রুটি অনুসন্ধানে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। গুলশানের এফআর টাওয়ারে অগ্নিকাণ্ড ও প্রাণহানির মর্মান্তিক ঘটনা মাথায় রেখে অভিজাত এলাকার তিনটি ভবনের নির্মাণ-সংক্রান্ত ত্রুটি-বিচ্যুতি যাচাই শেষে অভিযান শুরু করেছে দুদক। ভবন তিনটি হচ্ছে- বনানীর ইকবাল সেন্টার, গুলশান এভিনিউর ১৪০ ও ৭৮ নম্বর হোল্ডিংয়ের দুটি ভবন। এরই মধ্যে দুদকের অনুসন্ধান টিম ওই তিন ভবনের মূল ফাইল চেয়ে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) চেয়ারম্যানের কাছে চিঠি পাঠিয়েছে। ভবনগুলো কবে নির্মাণ করা হয়েছে, নির্মাণ-সংক্রান্ত কী কী শর্ত ছিল, শর্ত অনুযায়ী নির্মাণ করা হয়েছে কি-না, কত তলা নির্মাণের অনুমতি নিয়ে বাস্তবে কত তলা পর্যন্ত করা হয়েছে, নির্মাণের ক্ষেত্রে আইন, বিধিবিধান মানা হয়েছে কি-না- এসব বিষয় খতিয়ে দেখা হবে। যাদের বিরুদ্ধে রাজউকের আইন ও শর্ত ভঙ্গ করে ভবন নির্মাণের প্রমাণ পাওয়া যাবে, তাদের আইনের আওতায় আনা হবে। দুদক টিম পর্যায়ক্রমে আরও সুউচ্চ ভবনের ত্রুটি ও অনিয়ম খতিয়ে দেখবে।

রাজউক থেকে জানা গেছে, ডা. এইচ বি এম ইকবালের মালিকানাধীন ইকবাল টাওয়ারের অনুমোদন নেওয়া হয়েছিল ছয়তলা পর্যন্ত। তবে সেটি ২০ তলা পর্যন্ত  নির্মাণ করা হয়। এ অনিয়ম-ত্রুটির ক্ষেত্রে কারা দায়ী, এ ক্ষেত্রে রাজউকের কোনো কর্মকর্তার হাত আছে কি-না- অনুসন্ধানে এসব তথ্য পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হবে। বর্তমানে দুদক উপপরিচালক মো. আবুবকর সিদ্দিকের নেতৃত্বে একটি বিশেষ টিম ওই তিনটি ভবনের নির্মাণ-সংক্রান্ত ত্রুটির অভিযোগ খতিয়ে দেখছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুদকের এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, ত্রুটিপূর্ণ ভবনগুলো মানুষের জীবনের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। আইন লঙ্ঘন করে ভবন নির্মাণ করা দুর্নীতির অংশ। দুদক এফআর টাওয়ারের নির্মাণ-ত্রুটি অনুসন্ধান করে আইনি ব্যবস্থা নিয়েছে। ইকবাল সেন্টারের নির্মাণ-সংক্রান্ত ত্রুটির অভিযোগও অনুসন্ধান করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, দুর্নীতির প্রমাণ যার বিরুদ্ধে পাওয়া যাবে- সে যে-ই হোক না কেন, আইন অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অভিযুক্তকে ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই।

গত ২৮ মার্চ গুলশানের এফআর টাওয়ারে অগ্নিকাণ্ডে ২৬ জনের মর্মান্তিক মৃত্যুর পর ভবনটির নির্মাণ অনুসন্ধান করে দুদক। পরে মামলা হয়। দুদকের অনুসন্ধান থেকে জানা গেছে, ইমারত বিধিমালা লঙ্ঘন করে প্রথম পর্যায়ে ১৫ থেকে ১৮ তলা ও দ্বিতীয় পর্বে ভুয়া নকশা তৈরি করে ১৯ থেকে ২৩ তলা পর্যন্ত নির্মাণ করা হয়। এ ক্ষেত্রে টাওয়ারের মালিক, নির্মাণ প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার, রাজউকের সংশ্নিষ্ট সাবেক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে ইমারত নির্মাণ বিধিমালা, ১৯৯৬-এর বিধিবিধান লঙ্ঘনের অভিযোগ আনা হয়েছে। তারা বিধিমালা লঙ্ঘন করে ভবন নির্মাণের ছাড়পত্র ইস্যু, ফি জমা ও নকশা অনুমোদন ছাড়া ভুয়া নকশা সৃজন করে অবৈধভাবে ১৯ থেকে ২৩ তলা পর্যন্ত ভবন নির্মাণ করেছেন।

বেআইনিভাবে ভবন নির্মাণ করা হলে দণ্ডবিধির ৪২০/৪৬৭/৪৬৮/৪৭১/৪১১/১৬৬/১০৯ ধারা ও দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭-এর ৫(২) ধারায় সংশ্নিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়ে থাকে।

রাজউকের তালিকা ধরে দুদকের পর্যালোচনা :রাজউক সূত্র জানায়, অতীতে এক জরিপে রাজধানীতে ছয় হাজার ৪০২টি ত্রুটিপূর্ণ ভবন পাওয়া যায়। পরে দুদকের পক্ষ থেকে রাজউকের ওই তালিকা সংগ্রহ করা হয়। তালিকাটি পর্যালোচনা করে দুদক এতে রাজধানীর বড় বড় ভবন নির্মাণে ত্রুটি পেয়েছে। ওই সব ভবনের সঙ্গে প্রভাবশালী ব্যক্তিরা জড়িত।

দুদকের পর্যালোচনায় দেখা যায়, ছয়তলার অনুমোদন নিয়ে ১০-১২ তলা, নয়তলার অনুমোদন নিয়ে ১২-১৫ তলা, ছয়তলার অনুমোদন নিয়ে ২০ তলা, ২২ তলা পর্যন্ত ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। নকশায় অনুমোদিত আয়তনের চেয়ে বেশি আয়তনে বাড়ি নির্মাণ, রাস্তার জায়গা ছেড়ে না দিয়ে বাড়ি নির্মাণের শর্ত অনেক ক্ষেত্রে ভঙ্গ করা হয়েছে। পাকা দেয়াল তুলে অথবা অন্য কোনোভাবে বাড়িসংলগ্ন সরকারি জায়গা নিজেদের দখলে রাখা ও দুর্বল অবকাঠামোতে বাড়ি নির্মাণ করা হয়েছে। আইন অনুযায়ী, আট ফুট তিন ইঞ্চি রাস্তার পাশে ভবন নির্মাণে রাজউক থেকে অনুমতি দেওয়া হয় না। অথচ ওই মাপের রাস্তার পাশে নির্মাণ করা হয়েছে সারি সারি ভবন।

সূত্র জানায়, ২০১৩ সালে সাভারের রানা প্লাজা ধসে শত শত মানুষের মৃত্যুর ঘটনায় ওই সময় ঝুঁকিপূর্ণ-ত্রুটিপূর্ণ ভবনের নথি অনুসন্ধানে নেমেছিল দুদক। দুদক উপপরিচালক এস এম সাহিদুর রহমানের নেতৃত্বে টিম কিছুদিন অনুসন্ধান কাজও করেছে।

ত্রুটিপূর্ণ কিছু সুউচ্চ ভবন :গুলশান এভিনিউয়ে সাবেক এমপি আবদুল জব্বারের মালিকানাধীন জব্বার টাওয়ার ছয়তলার অনুমতি নিয়ে ২২ তলা, ডা. এইচ বি এম ইকবালের মালিকানাধীন ইকবাল টাওয়ার ছয়তলার অনুমতি নিয়ে ২০ তলা পর্যন্ত নির্মাণ করা হয়েছে। অনুমতি ছাড়াই নির্মাণ করা হয়েছে আবু তাহেরের মালিকানাধীন ১২ তলাবিশিষ্ট তাহের টাওয়ার। একইভাবে ছয়তলার অনুমোদন নিয়ে ১২ তলা ভবন নির্মাণ করেছে ইউনিয়ন প্রপার্টিজ লিমিটেড। এ এইচ এম মোস্তফা কামাল ১৩ তলার অনুমোদন নিয়ে বানিয়েছেন ২০ তলা ভবন। এম এন এইচ বুলু ছয়তলার অনুমোদন নিয়ে নির্মাণ করেন ২০ তলা ভবন। গুলশান এভিনিউ এলাকায় নোমান চৌধুরী ও মনিরুজ্জামান মিলুর মালিকানাধীন দুটি ভবন নির্মাণ করা হয়েছে অবৈধভাবে।

গুলশান এভিনিউ এলাকার শফিউর রহমানের ছয়তলা ভবন, গাজী নুরুল ইসলাম গংয়ের আটতলা ভবন, এসিউর প্রপার্টিজের নয়তলা ভবন, সালাহ উদ্দিন আহমেদের ছয়তলা ভবন, মো. মনিরুজ্জামানের নয়তলা ভবন, আজিজুল হক ও নাজনীন হকের দুটি ভবন অনুমোদন ছাড়াই নির্মাণ করা হয়েছে।

এ ছাড়া বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার 'এ' ব্লক ও 'জি' ব্লকে নয়টি ভবন নির্মাণ করা হয়েছে অনুমোদন ছাড়া। বসুন্ধরা এলাকায় আরও অবৈধ ভবনের নাম রয়েছে রাজউকের তালিকায়। জোয়ার সাহারায় ছয়তলার অনুমোদন নিয়ে ১০ তলা পর্যন্ত নির্মাণ করা হয়েছে একটি ভবন। ফার্মগেটের তেজকুনীপাড়ায় ছয়তলার অনুমোদন নিয়ে ১২ তলা পর্যন্ত নির্মাণ করা হয়েছে বাবুল টাওয়ার।

মন্তব্য


অন্যান্য