রাজধানী

সমকাল-ওয়ার্ল্ড ভিশন গোলটেবিল আলোচনা

চাই শিশুবান্ধব স্থানীয় কাঠামো

প্রকাশ : ১০ জুলাই ২০১৯ | আপডেট : ১০ জুলাই ২০১৯

চাই শিশুবান্ধব স্থানীয় কাঠামো

বুধবার রাজধানীর ওয়েস্টিন হোটেলে সমকাল ও ওয়ার্ল্ড ভিশন আয়োজিত গোলটেবিল আলোচনায় প্রধান অতিথির বক্তৃতা করেন স্থানীয় সরকার মন্ত্রী তাজুল ইসলাম— সমকাল

  সমকাল প্রতিবেদক

শিশুর সুরক্ষায় শিশুবান্ধব স্থানীয় কাঠামোর মাধ্যমে শিশুর প্রতি সব রবম সহিংসতা বন্ধ করা সম্ভব। এ ছাড়াও পর্যাপ্ত কর্মপরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন এবং বাজেট বরাদ্দের মাধ্যমে ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা এবং সিটি করপোরেশনের মাধ্যমে তাদের জন্য উন্নয়নমূলক কাজ করতে হবে। স্থানীয় সরকার কাঠামোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায়ও শিশুসহ জনগণের অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে সুবিধাজনক সময়ে ও অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শিশুর অভিযোগ ও বক্তব্য শোনার জন্য ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদসহ স্থানীয় সরকারের সব প্রতিষ্ঠানকে নির্দেশনা দিয়ে একটি পরিপত্র জারি করার দাবি জানিয়েছেন তারা।

শিশু সুরক্ষায় সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে বুধবার রাজধানীর গুলশানের ওয়েস্টিন হোটেলে আয়োজিত গোলটেবিল আলোচনায় বিশিষ্টজন এসব কথা বলেন। 'শিশুবান্ধব স্থানীয় সরকার :বর্তমান পরিস্থিতি ও করণীয়' শীর্ষক এ বৈঠকের আয়োজন করে যৌথভাবে সমকাল ও ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশ। সমকালের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক  মুস্তাফিজ শফির সঞ্চালনায় এই আলোচনায় প্রধান অতিথি ছিলেন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মো. তাজুল ইসলাম।

বাংলাদেশে মোট জনসংখ্যার ৪৫ শতাংশ অর্থাৎ প্রায় সাড়ে ছয় কোটি শিশু রয়েছে, যাদের বয়স ১৮ বছরের নিচে। বাংলাদেশ সংবিধান, শিশু অধিকার সনদ, শিশুনীতি ২০১১, শিশু আইন ২০১৩ এবং সংশোধিত শিশুনীতি ২০১৮-তে সব শিশুর সুরক্ষা নিশ্চিত করার কথা থাকলেও বাংলাদেশে ১৮ বছরের আগে ৫৪ শতাংশ শিশুর বিয়ে হচ্ছে এখনও। বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত রয়েছে ১২ লাখ ৮০ হাজার শিশু। প্রায় ৪৩ লাখ শিশু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই যায়নি কখনও। ৩০ লাখ শিশু যাচ্ছে না বিদ্যালয়ে। অসংখ্য শিশু (প্রায় ১১ হাজার) প্রতি বছর পাচার হয়ে যাচ্ছে এবং বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত করা হচ্ছে তাদের। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শারীরিক সহিংসতার শিকার হচ্ছে প্রায় ৮২ শতাংশ শিশু। সম্প্রতি আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে ধর্ষণের ঘটনাও।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী বলেন, 'শিশুরা আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। সরকার নানামুখী কার্যক্রম গ্রহণ করেছে শিশুদের নিরাপত্তায়। তৈরি করা হয়েছে বেশ কিছু আইন। এর পরও সমাজে কিছু বিকৃত মানসিকতার মানুষ রয়েছে। শিশুদের ওপর বিভিন্নভাবে নির্যাতন করছে তারা। এ জন্য রাষ্ট্রের যারা সচেতন মানুষ, তাদের দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে।' ৮২ শতাংশ শিশু ১৪ বছর বয়সের আগেই বিভিন্নভাবে সহিংসতার শিকার হচ্ছে- জরিপের এ তথ্যের সঙ্গে মন্ত্রী একমত নন জানিয়ে বলেন, 'এ জন্য প্রত্যেকেই আপনাদের চারপাশের পরিবেশ বিবেচনা করবেন। দেখবেন সহিংসতার হার এত বেশি নয়। তবে কিছু বিকৃত মানসিকতার লোকের জন্য শিশুদের ওপর সহিংসতার ঘটনাও বেড়েছে। এটা অস্বীকার করছি না। ইতিবাচক-নেতিবাচক যা-ই হোক, যে কোনো বিষয়েই সঠিক তথ্য থাকতে হবে। তাহলে কাজ করতে সহজ হবে। সরকারও সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারবে।' 

মন্ত্রী আরও বলেন, 'সুবিধাজনক সময়ে ও অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শিশুর অভিযোগ ও বক্তব্য শোনার জন্য ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদসহ স্থানীয় সরকারের যত প্রতিষ্ঠান আছে, সব প্রতিষ্ঠানকে নির্দেশনা দিয়ে একটি পরিপত্র জারি করা হবে।' জনগণকে সব ধরনের সেবা দিতে ইউনিয়ন পরিষদ ও উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান, পৌরসভার মেয়র ও জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানদের উপযোগী করে তোলা ও শিশুদের বিষয়টি যেন উপেক্ষিত না হয় এবং শিশুদের বিষয়ে তাদের করণীয় কী, সে বিষয়ে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য জাতীয় স্থানীয় সরকার ইনস্টিটিউটের পরিচালককে নির্দেশ দেন তিনি।

মুস্তাফিজ শফি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের একটি অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ার পক্ষে সমকাল তার সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকেই নিয়মিত কাজ করে যাচ্ছে। সমাজে যারা পিছিয়ে রয়েছে, তাদের সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য সবাইকে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি শিশুদের মানবিক বোধসম্পন্ন মানুষ হিসেবেও তৈরি করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

স্থানীয় সরকার বিভাগের মহাপরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) নিখিল রঞ্জন রায় বলেন, "সরকার স্থানীয় পর্যায়ে শিশুদের জন্য বিভিন্নভাবে কাজ করছে। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে স্থানীয় সরকার বিভাগে মোট বাজেট ছিল ২৫১ দশমিক ৫৩ বিলিয়ন টাকা। এর মধ্যে শিশুদের জন্য বরাদ্দ ছিল ২৫ দশমিক ৭৬ শতাংশ। এই টাকা ইউনিয়ন ও গ্রাম পর্যায়ে 'ইনকাম সাপোর্ট প্রোগ্রাম ফর দ্য পুওরেস্ট' (আইএসপিপি) এবং ১২টি সিটি করপোরেশনে 'আরবান প্রাইমারি হেলথ কেয়ার সার্ভিস ডেলিভারি প্রকল্পের' মাধ্যমে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য ব্যয় করা হয়েছে। তবে শিশুদের কল্যাণে যে বরাদ্দ দেওয়া হয়, সে অর্থ অনেক ক্ষেত্রে শিশুদের কল্যাণে ব্যয় হয় না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন খাতে ব্যয় করা হয়। এ ক্ষেত্রে সতর্ক হতে হবে এবং শিশুদের টাকা শিশুদের কল্যাণেই ব্যয় করতে হবে।" এ সময় তিনি শিশুদের অধিকার নিশ্চিত করতে সামাজিক ক্যাম্পেইন বাড়ানোর জন্য সবার প্রতি আহ্বান জানান। 

আলোচনার শুরুতে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ওয়ার্ল্ড ভিশনের অ্যাডভোকেসি অ্যান্ড জাস্টিস ফর চিলড্রেনের ডেপুটি ডিরেক্টর সাবিরা নূপুর। তিনি বলেন, "শিশু আইন এবং নীতিমালায় শিশুবান্ধব পরিবেশের কথা বলা হলেও এখনও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধিত হয়নি। তবে সরকার বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যাপক সফলতা অর্জন করেছে। এ ছাড়া টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বাংলাদেশ সরকার বদ্ধপরিকর। 'আমিই পারি' প্রচারাভিযানের অংশ হিসেবে ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশ ২০১৭ সাল থেকে শিশুর প্রতি সহিংসতা বন্ধে বিভিন্ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে। তবে সহিংসতামুক্ত শিশুবান্ধব পরিবেশ প্রতিষ্ঠায় স্থানীয় সরকার কাঠামো ব্যাপক ভূমিকা রাখতে এবং শিশুর প্রতি সব রকম সহিংসতা বন্ধ করতে পারে। ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা এবং সিটি করপোরেশন- এই তিনটি প্রতিষ্ঠান শিশুর প্রতি সহিংসতা বন্ধে এবং শিশুর সার্বিক উন্নয়নে কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ, বাস্তবায়ন এবং সম্পদ (অর্থ ও জনবল) বরাদ্দ নিশ্চিত করতে পারে।"

তিনি জানান, শিশু অধিকার ও সুরক্ষা নিশ্চিতকরণে শিশুবান্ধব স্থানীয় সরকার কাঠামো বাস্তবায়নে বিদ্যমান স্থানীয় সরকার কীভাবে ভূমিকা রাখতে পারে, তা চিহ্নিত করতে একটি জরিপ করা হয়। প্রতিবেদন প্রকাশ করে তিনি বলেন, 'ওই কর্মএলাকায় ৬১ শতাংশ শিশু শারীরিক ও যৌন সহিংসতার শিকার। ৬১ শতাংশ শিশু শ্রমে যুক্ত। বাল্যবিয়ের শিকার ৬৭ শতাংশ শিশু। এ ছাড়া শতভাগ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুর তালিকা নেই। এর মধ্যে ৬১ শতাংশ ইউনিয়নে শিশু ও নারীকল্যাণ কমিটি থাকলেও কোনোটাতেই নিয়মিত সভা হয় না। ৭৩ শতাংশ ইউনিয়ন কমিটির উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় শিশুর কোনো অংশগ্রহণ নেই।' এ সময় তিনি স্থানীয় সরকারের সক্ষমতা বৃদ্ধি, শিশু অধিকার নিশ্চিত এবং শিশুর প্রতি সহিংসতা বন্ধে বাজেটে পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ, নিয়মিত পরিবীক্ষণের ব্যবস্থা নিশ্চিতকরণ, শিশু অধিকার ও সুরক্ষা বিষয়ক প্রতিবেদন, শিশু অধিকার ও সুরক্ষায় একটি পূর্ণাঙ্গ দিক-নির্দেশনা/নীতিমালা প্রণয়নসহ কয়েক দফা সুপারিশ জানান।

জাতীয় স্থানীয় সরকার ইনস্টিটিউটের পরিচালক (গবেষণা ও পরিকল্পনা) মো. আব্দুল মালেক বলেন, 'শিশুদের অধিকার বিষয়ে জনপ্রতিনিধিদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। পিছিয়ে পড়া ২২টি উপজেলার শিশুদের জন্য বিশেষভাবে কাজ চলছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা (ইউএনও) শিশুবান্ধব প্রকল্প বাস্তবায়ন করছেন। এ ছাড়া মন্ত্রণালয় থেকে যদি কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়, তাহলে জাতীয় স্থানীয় সরকার ইনস্টিটিউট তা বাস্তবায়ন করবে।'

নর্দান বাংলাদেশ রিজিয়নের রিজিয়নাল অ্যাডভোকেসি অ্যান্ড চাইল্ড প্রোটেকশন কো-অর্ডিনেটর মো. জামাল উদ্দিন বলেন, '৭০টি ইউনিয়ন, ২০টি পৌরসভা ও ২টি সিটি করপোরেশনের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ হয়েছে। সেখানকার অনেক জনপ্রতিনিধিই শিশুদের উন্নয়নে কাজ করার ইচ্ছা পোষণ করেছেন এবং অনেকে করেনও। ওই সিটি করপোরেশনগুলোতে শিশুদের কল্যাণে বাজেট বরাদ্দ রয়েছে। তবে চ্যালেঞ্জের বিষয় হলো শিশুদের কল্যাণে তা ব্যয় করার ধরন। এ ক্ষেত্রে ইউনিয়ন পর্যায়ে যেসব শিশু ও নারীকল্যাণ কমিটি রয়েছে, তাদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আরও দক্ষ করে তুলতে হবে।' 

গবেষক মুস্তফা মনোয়ার বলেন, 'সরকারের যেসব আইনের ভিত্তিতে স্থানীয় সরকার গঠন করা হয়েছে, সেগুলো আলাদা আইন। ফলে বরাদ্দের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এ ছাড়া স্থানীয় জনবল সংকটের কারণেও অনেক কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব হয় না।' 

ওয়ার্ল্ড ভিশনের রিজিয়নাল ফিল্ড ডিরেক্টর বুলি হাগিদক বলেন, "ওয়ার্ল্ড ভিশন মাঠ পর্যায়ে কাজ করে। বর্তমানে ৩০টি জেলায় ৯৩টি উপজেলার ৪৩৪টি ইউনিয়নে কাজ করছে। বর্তমানে আমাদের সেবার আওতায় ১ লাখ ৮০ হাজার 'রেজিস্টার্ড চিলড্রেন' রয়েছে। ২০২১ সালের মধ্যে ৫ লাখ শিশুকে নিয়ে কাজ করা লক্ষ্য নিয়েই আমরা এগিয়ে চলেছি।" 

জাতীয় শিশু ফোরামের সহসভাপতি অপূর্ব সরকার বলেন, 'বাজেটে নারী ও শিশুদের জন্য একটি খাতে বরাদ্দ দেওয়া হয়। কিন্তু দেশে নারীদের সংখ্যা পুরুষের সমান। ফলে এখানে নারীদের ক্ষেত্রটাই অনেক বেশি। আমরা চাই বাজেটে শুধু শিশুদের জন্য সুনির্দিষ্ট একটি খাত করা হোক। বাজেটটা যেন শিশুদের উন্নয়নেই দেওয়া হয়। এ ছাড়া প্রত্যেক ইউনিয়ন, উপজেলা ও পৌরসভায় একটি শিশু সুরক্ষা বিষয়ক কমিটি থাকার কথা। এটা যেন কার্যকর করা হয় এবং সেখানে যেন শিশু প্রতিনিধি অন্তর্ভুক্ত রাখা হয়।' ফোরামের আরেক সদস্য কথা আক্তার বলেন, 'বর্তমানে শিশুরা কোনো জায়গাতেই নিরাপদ নয়। ফলে ইউনিয়ন পরিষদে শিশুদের পরামর্শ বক্সে অভিযোগ দেওয়ার জন্য আরও প্রচারণা চালাতে হবে। পাশাপাশি সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অভিযোগ বক্স খোলার দাবি জানাচ্ছি।' এ সময় ফোরামের সহ-সম্পাদক দোলা আক্তার রেবা শিশুদের অভিযোগ শোনার জন্য নির্দিষ্ট সময় নির্ধারণ করে মন্ত্রণালয় থেকে পরিপত্র জারি করার আহ্বান জানান। 

সভায় অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য দেন নীলফামারী জেলার কিশোরগঞ্জ উপজেলা চেয়ারম্যান শাহ মো. আবুল কালাম বারী (পাইলট) ও দিনাজপুর জেলার কাহারোল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. আতাউর রহমান।

মন্তব্য


অন্যান্য