রাজধানী

ম্যাজিস্ট্রেট পরিচয়ে টাকা নেন তিনি

চাকরি দেওয়ার নামে অভিনব প্রতারণা

প্রকাশ : ১০ জুন ২০১৯ | আপডেট : ১০ জুন ২০১৯ | প্রিন্ট সংস্করণ

ম্যাজিস্ট্রেট পরিচয়ে টাকা নেন তিনি

শাহবাগ থানায় ঢুকে ম্যাজিস্ট্রেট পরিচয়ে পুলিশের সঙ্গে কথা বলছেন সেই প্রতারক- সিসিটিভি ফুটেজ থেকে

  ইন্দ্রজিৎ সরকার

পরিপাটি পোশাক, কথাবার্তায় চৌকস। নিজেকে পরিচয় দেন ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে। এমনকি হুটহাট করে থানায়ও ঢুকে পড়েন। কর্তব্যরত পুলিশ সদস্যরা দাঁড়িয়ে তাকে সালাম দেন। বসতে দেন ওসির কক্ষে। তার ফোনকলে ট্রাফিক আইন ভঙ্গের দায়ে জব্দ যানবাহন ছেড়ে দেয় পুলিশ। এসব দেখে তাকে সন্দেহ করার কোনো কারণ থাকে না সাধারণ মানুষের। আর সেই সুযোগে লোকজনকে চাকরি দেওয়ার নামে তিনি হাতিয়ে নেন লাখ লাখ টাকা। সর্বশেষ গত ৫ মে রাজধানীর শাহবাগ থানায় ঢুকে এমন কাণ্ড ঘটানোর পর তার প্রতারণার বিষয়টি পুলিশের নজরে আসে। সিসিটিভি ক্যামেরায় ধরা পড়ে তার সেদিনের গতিবিধি। এখন পর্যন্ত তার মাধ্যমে প্রতারিত ১৩ জনের খোঁজ পেয়েছে সমকাল। এদিকে ওই দিনই (৫ মে) শাহবাগ থানা থেকে এক পুলিশ কর্মকর্তার অস্ত্র ও গুলি চুরি হয়, যা এখনও উদ্ধার করা যায়নি। ম্যাজিস্ট্রেট পরিচয়ে প্রতারণার বিষয়ে জানতে চাইলে শাহবাগ থানার এসআই মনজুর হোসেন সমকালকে বলেন, এ-সংক্রান্ত অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে। ঘটনাটি তদন্ত করে দেখছে পুলিশ। ভুক্তভোগীরা সমকালকে জানান, কল্যাণপুর বা শ্যামলী থেকে বাহন পরিবহনের  বাসে উঠতেন কথিত সেই ম্যাজিস্ট্রেট। নামতেন হাইকোর্ট বা প্রেস ক্লাব এলাকায়। তার প্রকৃত নাম-ঠিকানা এখনও জানা যায়নি।

তবে তিনি অনেক স্থানে নিজের নাম বলেছেন শাওন। নিয়মিত যাতায়াতের সুবাদে বাহন পরিবহনের চালক-হেলপারদের সঙ্গে তার আলাপ হয়। একদিন তাদের জাহাজে চাকরি করার প্রস্তাব দেন শাওন। সেখানে অল্প পরিশ্রমে অনেক বেশি টাকা আয় করা যাবে, থাকবে নানারকম সুযোগ-সুবিধা। এমন লোভনীয় প্রস্তাবে তারা রাজি হয়ে যান। শাওন জানান, চাকরি পাইয়ে দেওয়ার দায়িত্ব তার, তবে এ জন্য কিছু টাকা খরচ করতে হবে। কয়েক দিন ভেবে রাজি হয়ে যান পরিবহন শ্রমিকসহ নিম্ন আয়ের ১১ জন। এর মধ্যে ৫ মে সকাল ১০টার দিকে চার শ্রমিককে নিয়ে শাহবাগ থানায় যান শাওন। সেখানে নিজেকে দিনাজপুরের ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে পরিচয় দেন। এ সময় থানার ডিউটি অফিসারসহ অন্য কর্মকর্তারা দাঁড়িয়ে তাকে সালাম দেন এবং সৌজন্যসূচক কথা বলেন। পরে তাকে ওসির কক্ষে বসতেও দেওয়া হয়। তখন ওসি পেশাগত কাজে থানার বাইরে ছিলেন। ওই কক্ষে কিছুক্ষণ থাকার পর শাওন বেরিয়ে আসেন। চার শ্রমিককে নিয়ে যান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের বিপরীতে 'ছবির হাটে'। সেখানে তিনি শ্রমিকদের বলেন, 'এবার বুঝতে পারছ তো, লোকজন আমারে কেমন সম্মান করে? আমি বলে দিলে তোমাদের জাহাজে চাকরি পেতে কোনো সমস্যাই হবে না।'

ভুক্তভোগী বাসচালক আরিফ সরদার জানান, শাওনের কথায় আশ্বস্ত হয়ে তিনিসহ ১১ শ্রমিক মাথাপিছু ১৮ হাজার ৬০০ টাকা করে দেন। এই টাকা 'সরকারি ফি' হিসেবে নেওয়া হয়। এর পর তাদের চট্টগ্রামে শিপিং করপোরেশনের কার্যালয়ে পাঠানো হয়। সেখানে গিয়ে তারা জানতে পারেন, জাহাজে নিয়োগের কোনো কার্যক্রম চলছে না। এদিকে শাওনের খোঁজ নেই। প্রতারণার বিষয়টি বুঝতে পেরে ৮ মে তারা শাহবাগ থানায় গিয়ে ঘটনাটি জানান।

আরিফ সরদার আরও জানান, শাওন তাকে বলেছিলেন, রাস্তায় কোথাও ট্রাফিক পুলিশ বাস আটকালে তিনি ছাড়িয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করবেন। তার কথা অনুযায়ী দু'বার ট্রাফিক বাস আটকালে আরিফ তাকে ফোন করেন। এরপর শাওন সংশ্নিষ্ট পুলিশ সদস্যের সঙ্গে কথা বলে বাসটি ছাড়ানোর ব্যবস্থা করে দেন। ফলে তার প্রভাব সম্পর্কে আরিফের মনে ভালো ধারণা তৈরি হয়।

আরেক ভুক্তভোগী কাকরাইলের ড্যাফোডিল স্টুডিওর ফটোগ্রাফার আলী আশরাফ জানান, অনেক দিন ধরে স্টুডিওতে যাতায়াতের সুবাদে তাকে পুলিশ সদর দপ্তরের বিশেষ ফটোগ্রাফার হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার প্রস্তাব দেন ওই প্রতারক। এরপর কয়েক দফায় দেড় লাখ টাকা নিয়ে কেটে পড়েন।

পুলিশ ও ভুক্তভোগীদের সূত্রে জানা যায়, এই প্রতারকের বিরুদ্ধে নানা কৌশলে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার আরও কিছু অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যে পল্টনে বায়োটেক নামে একটি প্রতিষ্ঠানের বিক্রয় ব্যবস্থাপকও তার ফাঁদে পড়ে টাকা খুইয়েছেন। প্রতারক শাওন নিজেকে কোথাও দিনাজপুরের, আবার কোথাও রাজশাহীর ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দাবি করেছেন। এ ছাড়া পুলিশ সুপার, পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী কমিশনার বা এসি প্যাট্রল হিসেবেও পরিচয় দিতেন তিনি। প্রতারণায় ব্যবহূত তার মোবাইল ফোনটির সূত্র ধরে তদন্তে দেখা যায়, সেটি ভুয়া নাম-ঠিকানায় নিবন্ধন করা। সেই সিমকার্ডটি ফরিদপুরের মোজাহারুল নামের এক ব্যক্তির।

মন্তব্য


অন্যান্য