রাজধানী

বায়ুদূষণ রোধে সমন্বিত অ্যাকশন প্ল্যান চাই

পরিবেশ অধিদপ্তর ও সমকাল গোলটেবিল আলোচনা

প্রকাশ : ১৭ জুন ২০১৯ | প্রিন্ট সংস্করণ

বায়ুদূষণ রোধে সমন্বিত অ্যাকশন প্ল্যান চাই

  সমকাল প্রতিবেদক

শুধু ঢাকা নয়, সারাদেশেই বায়ুদূষণ বাড়ছে। এ কারণে বাড়ছে জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকিও। এই দূষণ নিয়ে মানুষের মধ্যে সচেতনতার অভাব রয়েছে। দূষণ রোধে সব মন্ত্রণালয়, বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন, গণমাধ্যম ও সর্বস্তরের মানুষকে নিয়ে সমন্বিত অ্যাকশন প্ল্যান তৈরি করতে হবে। উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি পরিবেশ সংরক্ষণও জরুরি। দূষণ রোধে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে এগিয়ে যেতে হবে।

গতকাল রোববার জাতীয় প্রেস ক্লাবের তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে বিশ্ব পরিবেশ দিবস-২০১৯ উদযাপন উপলক্ষে 'আসুন বায়ুদূষণ রোধ করি' শীর্ষক এক গোলটেবিল আলোচনা সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানের আয়োজন করে পরিবেশ অধিদপ্তর, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় এবং দৈনিক সমকাল।

গোলটেবিল বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন পরিবেশ অধিদপ্তরের ক্লিন এয়ার অ্যান্ড সাসটেইনেবল এনভায়রনমেন্ট (কেস) প্রকল্পের পরিচালক ও অতিরিক্ত সচিব ড. এস এম মুনজুরুল হান্নান খান। প্রধান অতিথি ছিলেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সচিব আবদুল্লাহ আল মোহসিন চৌধুরী। সঞ্চালনা করেন দৈনিক সমকালের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মুস্তাফিজ শফি। আলোচনার শুরুতে সবাইকে স্বাগত জানান পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. এ কে এম রফিক আহাম্মদ। অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য দেন আন্তর্জাতিক পরিবেশ বিশেষজ্ঞ এবং ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস

অধ্যাপক ড. আইনুন নিশাত, বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান মুকিত মজুমদার বাবু, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ড. নূরুল কাদির, সোলায়মান হায়দার, মো. বিল্লাল হোসেন, মো. মোজাহেদ হোসেন, আলমগীর মুহম্মদ মনসুর উল আলম, পরিবেশ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক কাজী সারওয়ার ইমতিয়াজ হাশমী, বিশ্বব্যাংকের পরামর্শক ড. খালেকুজ্জামান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. আবদুস সালাম, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক ড. মো. খালেকুজ্জামান, বাংলাদেশ অটো ব্রিক ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব বি এন দুলাল, বাংলাদেশ ইটভাটা মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আলহাজ মো. আবু বকর প্রমুখ।

আবদুল্লাহ আল মোহসিন চৌধুরী বলেন, বায়ুদূষণ রোধে অনেক দিন থেকে কাজ হচ্ছে। তাৎক্ষণিক বায়ুদূষণের মাত্রা পরিমাপ করা হচ্ছে, যা ওয়েবসাইটে পাওয়া যাচ্ছে। বায়ুদূষণ বেড়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এর কারণ নির্ণয়ে নতুন জরিপের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দূষণ রোধে যথোপযুক্ত, বাস্তবসম্মত কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে। আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহার অনুসারে কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের কাজ চলছে। সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি ব্যক্তি পর্যায়েও সচেতন হতে হবে। তা হলে দূষণ রোধে ফল মিলবে।

অধ্যাপক ড. আইনুন নিশাত বলেন, বৃষ্টি হওয়ার পরও বায়ুদূষণ কমছে না। ইটভাটা বন্ধ থাকার সময়ও বেশি দূষণ থাকে। রাজধানীর ৩০০ ফুট এলাকায় নির্মাণকাজের জন্য বিপজ্জনক দূষণ পাওয়া যাচ্ছে। এটা রোধে পরিকল্পনা করে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে সবাইকে এগিয়ে যেতে হবে। রাজশাহী শহর পরিচ্ছন্ন, ঢাকা কেন পারবে না? ভারতের চেন্নাই শহরে কেউ পলিথিন ব্যবহার করে না। ঢাকার মানুষ কেন পারবে না? চীন পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন শহর। বাংলাদেশ কেন পারবে না? অন্যরা পারলে বাংলাদেশও পারবে। মনিটরিং কার্যক্রম জোরদার করতে হবে।

মুস্তাফিজ শফি বলেন, বায়ুদূষণ, শব্দদূষণ, মাটি ও পানিদূষণ বন্ধ করে নির্মল বায়ু নিশ্চিত করতে হবে। দূষণ বন্ধ নিজ পরিবার থেকেই শুরু করতে হবে। বিল্ডিংয়ের অন্যান্য বাসিন্দা, পাড়া-মহল্লা থেকে দূষণ বন্ধ কার্যক্রম শুরু করলে সফলতা পাওয়া যাবে। নিজে বন্ধ না করে, অন্যকে বললে বায়ুদূষণ বন্ধ হবে না। ইটভাটার দূষণ কমাতে পরিবেশবান্ধব পদ্ধতি সহজলভ্য করতে হবে। সমন্বিতভাবে বায়ুদূষণ রোধে সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা নিয়ে কাজ করতে হবে। এটা একা পরিবেশ অধিদপ্তর করতে পারবে না। সমন্বিতভাবে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।

ড. এ কে এম রফিক আহাম্মদ বলেন, দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে পরিবেশদূষণ বাড়ছে। জাতিসংঘের তথ্যমতে, পরিবেশদূষণে বিশ্বে বছরে ৭০ লাখ মানুষ মারা যাচ্ছে। এশিয়ার দেশগুলোতে মৃত্যুর হার ৪০ শতাংশ। বায়ুদূষণের কারণে চিকিৎসা ব্যয় বাড়ছে। দেশে শুস্ক মৌসুমে দূষণের মাত্রা বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছে যায়। টেকসই উন্নয়নে পরিবেশ নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে। দেশের ৭৮ শতাংশ ইটভাটা পরিবেশসম্মত উন্নত প্রযুক্তির। ক্লিন এয়ার অ্যান্ড সাসটেইনেবল এনভায়রনমেন্ট (কেস) প্রকল্পের মাধ্যমে বায়ুর মান পরীক্ষা করা হচ্ছে। শিল্পপ্রতিষ্ঠানে ইটিপি স্থাপন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হচ্ছে। এ বছর ১২০টি দূষণকারী ইটভাটা বন্ধ করা হয়েছে। যানবাহনের কালো ধোঁয়া বন্ধে অভিযান চলছে। সবার প্রচেষ্টায় পরিবেশবান্ধব দেশ গড়ে তোলা সম্ভব।

ড. নূরুল কাদির বলেন, বায়ুদূষণ শুধু বাংলাদেশে নয়, বিশ্বের প্রায় সব দেশই বায়ুদূষণের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, বায়ুদূষণে মৃত্যুর সংখ্যা এখন মৃত্যুর চতুর্থ কারণ। সচেতনতা ও উদ্যোগ নিলে দূষণ কমিয়ে আনা সম্ভব। এর জন্য নতুন নতুন টেকনোলজির প্রয়োজন পড়বে। আন্তঃদেশীয় যোগাযোগের মাধ্যমে দূষণ কমাতে হবে।

ড. এস এম মুনজুরুল হান্নান খান বলেন, সন্তানদের পরিবেশবান্ধব দেশ গড়ার স্বপ্ন দেখাতে হবে। দূষিত বায়ু শুধু গরিবদের নয়, ধনীদের ক্ষতি করবে। তাই সবাইকে দ্রুত সচেতন হতে হবে।

মুকিত মজুমদার বাবু বলেন, বায়ুদূষণ রোধে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে সবার মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো। এই নীরব ঘাতক শিশু থেকে শুরু করে সবার ক্ষতি করছে। কঠোর মনিটরিং হলে বায়ুদূষণ বন্ধ হবে। মিডিয়ায় বায়ুদূষণের কুফল প্রচার করতে হবে।

সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন, আইন বিধিমালা প্রণয়নের পাশাপাশি জনগণকে সচেতন করতে হবে। বায়ুদূষণের মাত্রা বাড়লে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিতে হবে। বায়ুদূষণ রোধে পরিবেশ অধিদপ্তরের পাশাপাশি অন্যান্য সরকারি দপ্তর, বিশেষ করে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সংস্থাগুলোকেও কাজে লাগাতে হবে। চিকিৎসকদের বায়ুদূষণের প্রভাব সম্পর্কে সরকারকে ধারণা দিতে হবে।

কাজী সারওয়ার ইমতিয়াজ হাশমী বলেন, ঢাকার বায়ুদূষণ সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ছে। দূষণ রোধে এখনই সবাইকে নিয়ে একটি রোডম্যাপ তৈরি করে সচেতনতার কাজে নামতে হবে। দূষণের কারণে অসুস্থ বাচ্চার জন্ম হচ্ছে। শিশুরা ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছে। স্কুলের বাচ্চাদের অ্যাজমা বেড়ে যাচ্ছে। পরিচ্ছন্ন ঢাকা গড়তে সবাইকে কাজ করতে হবে।

সোলায়মান হায়দার বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, বায়ুদূষণ একটি নীরব প্রাণঘাতী প্রক্রিয়া। ফুসফুস ক্যান্সারের ২৭ শতাংশ হয় বায়ুদূষণের কারণে। এ ছাড়া হৃদরোগের ২৫ শতাংশ, শ্বাসকষ্টজনিত রোগের ৪৩ শতাংশের জন্য দায়ী দূষিত বায়ু। তিনি বলেন, ঢাকায় বায়ুদূষণের অন্যতম কারণ ইটাভাটা। এই নগরে চারপাশে এক হাজার দুইশ'র অধিক ইটভাটা রয়েছে।

অধ্যাপক ড. মো. খালেকুজ্জামান বলেন, ঘরের বায়ুদূষণ নিয়ে আলোচনা হয় না। শিশুরা মায়ের সঙ্গে বেশি সময় থাকে। রান্নার সময় শিশুরা মায়ের সঙ্গে রান্নাঘরে থাকে। রান্নাঘরের গ্যাসের চুলার দূষণে শিশুরা মারাত্মকভাবে দূষিত হচ্ছে। এতে তাদের ব্লাড ক্যান্সার হচ্ছে।

অধ্যাপক ড. আবদুস সালাম বলেন, বায়ুদূষণে স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে। পরিবেশের তাপমাত্রা বৃদ্ধির পেছনে বায়ুদূষণের দায় রয়েছে।

আলহাজ মো. আবু বকর বলেন, ঢাকায় দূষণের জন্য ইটভাটা ৫৮ শতাংশ দায়ী। উন্নয়নের জন্য সারাদেশে ইটভাটা বাড়ছে, সেইসঙ্গে দূষণও বাড়ছে। ইটের পরিবর্তে ব্লক ব্যবহার বাধ্যতামূলক করলে দূষণ কমে আসবে। ইটভাটার জন্য পরিবেশ প্রযুক্তি সহজলভ্য করতে হবে।

বি এন দুলাল বলেন, সনাতনী ইটভাটায় কৃষিজমি যেমন নষ্ট হয়, আবাসন ব্যবসায়ীদের কারণেও ভূমি নষ্ট হয়। পরিবেশ ও বায়ু দূষণ হয়।

বিশ্বব্যাংকের পরামর্শক ড. খালেকুজ্জামান বলেন, প্রচলিত ইটভাটায় দূষণ বেশি হয়। তিনি বলেন, ডিজেলে সালফারের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ এবং টু স্টোক অটোরিকশা নিষিদ্ধ ও সিএনজিচালিত বাহন নামানোর সিদ্ধান্তে ঢাকা শহরের বায়ুতে সালফারজনিত দূষণের মাত্রা কমেছে; কিন্তু ইটভাটাজনিত দূষণ বেড়েছে।

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মোজাহেদ হোসেন বলেন, রাস্তার ধুলো, সিটি করপোরেশনের ময়লা পোড়ানোর কারণেও বায়ু দূষিত হচ্ছে। এসব রোধের দিকে নজর দিতে হবে।

আলমগীর মুহাম্মদ মনসুর উল আলম বলেন, ইট পোড়ালে বায়ুদূষণ হবেই। তাই নির্মাণকাজে ব্লকের ব্যবহার বাড়াতে হবে। ধীরে ধীরে ইট নিষিদ্ধ করা হবে। আপাতত সরকারি প্রতিষ্ঠানের নির্মাণকাজে ব্লকের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হবে।

বিল্লাল হোসেন বলেন, ইউরোপে প্রচণ্ড ঠাণ্ডায়ও সর্দি-কাশি, শ্বাসকষ্ট হয়নি। কিন্তু দেশে এলে এসব রোগে আক্রান্ত হতে হয়, এর কারণ মূলত দূষিত বায়ু।

মন্তব্য


অন্যান্য