রাজধানী

গণশুনানি শেষ

গ্যাসের দাম বৃদ্ধি অর্থনীতির জন্য অশনিসংকেত

প্রকাশ : ১৫ মার্চ ২০১৯ | প্রিন্ট সংস্করণ

গ্যাসের দাম বৃদ্ধি অর্থনীতির জন্য অশনিসংকেত

  সমকাল প্রতিবেদক

গ্যাসের দাম বৃদ্ধির শুনানিতে ভোক্তারা বলেছেন, গ্যাসের দাম বাড়ানো হলে শিল্প-কারখানা ও পরিবহন খাত অচল হয়ে পড়বে। বিপর্যস্ত হবে জনজীবন। অর্থনীতিতে অশনিসংকেত দেখা দেবে। জবাবে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) চেয়ারম্যান মনোয়ার ইসলাম বলেছেন, যৌক্তিক হারে বাড়বে গ্যাসের দাম। বিতরণ কোম্পানিগুলো যত বেশি দাম বাড়ানোর আবেদন করুক না কেন, তা যৌক্তিক পর্যায়ে বিবেচনা করা হবে। গ্যাসের দাম বৃদ্ধির ওপর ছয়টি বিতরণ কোম্পানির করা আবেদনের ওপর অনুষ্ঠিত ধারাবাহিক গণশুনানির চতুর্থ ও শেষ দিন গতকাল বৃহস্পতিবার তিনি এসব কথা বলেন।

ব্যবসায়ী ও ভোক্তারা গ্যাসের দাম বৃদ্ধির বিরোধিতা করে আসছেন।

রাজনৈতিক দল ও সামাজিক সংগঠনগুলো বিভিন্ন প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করছে। গতকাল সকালে টিসিবি ভবনের দোতলায় যখন গ্যাসের দাম বৃদ্ধির শুনানি চলছিল, তখন নিচে মূল ফটকের সামনে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের নেতাকর্মীরা গ্যাসের দাম বৃদ্ধির শুনানি বন্ধের দাবিতে বিক্ষোভ করেন। তারা বলেন, কোনোভাবেই গ্যাসের দাম বাড়ানো যাবে না। কারণ, সব কোম্পানি লাভ করছে। এখানে সরকারকে ভর্তুকি দিতে হচ্ছে না। দাম বাড়ালে শিল্প-কারখানা অচল হয়ে যাবে। পরিবহন খাতে অরাজকতা দেখা দেবে। সার্বিক অর্থনীতিতে অশনিসংকেত দেখা দেবে। গ্যাসের দাম বাড়ালে আন্দোলনে যাওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে গণফোরাম।

শুনানিতে মনোয়ার ইসলাম বলেন, বিতরণ কোম্পানি যা চায়, সেই হারে কখনোই দাম বৃদ্ধি করা হয় না। চাওয়ার তুলনায় অনেক কম বৃদ্ধি করা হয়। দাম না বাড়ালে বিতরণ কোম্পানি অসন্তুষ্ট হয়। আবার দাম বৃদ্ধি পেলে ভোক্তারা ভালো চোখে দেখে না। কমিশনের কাছে করা ২০০৯ সাল এবং এর পরবর্তী আবেদন ও মূল্যবৃদ্ধির শতকরা হার তুলে ধরে চেয়ারম্যান বলেন, ২০০৯ সালে বিতরণ কোম্পানিগুলোর ৬৫ দশমিক ৯২ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধির আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বেড়েছিল ১১ শতাংশ। এখানে পর্যায়ক্রমে ২০১৫ সালে ৪০ দশমিক ৭৯ শতাংশ দাম বৃদ্ধির আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২৬ শতাংশ, ২০০৭ সালে ৯৫ শতাংশের বিপরীতে ১১ শতাংশ দাম বাড়ে। এর পর ২০১৮ সালে ৭৫ শতাংশ দাম বৃদ্ধির আবেদনে কোনো দাম বাড়েনি। এবার বিতরণ কোম্পানিগুলো সংশোধিত প্রস্তাবে ১০২ শতাংশ দাম বৃদ্ধির আবেদন করেছে। তবে এতটা দাম বৃদ্ধি পাবে না জানিয়ে মনোয়ার ইসলাম বলেন, আইনের মধ্যে থেকেই যৌক্তিক দাম নির্ধারণ করবে কমিশন।

তিনি বলেন, গ্রাহকের অর্থে গ্যাস ও বিদ্যুৎ উন্নয়ন তহবিল করা হয়েছে। এ ছাড়া গ্রাহকের অর্থে গড়ে তোলা হয়েছে জ্বালানি নিরাপত্তা তহবিল। এসব তহবিলের সঠিক ব্যবহারের ওপর জোর দিয়ে মনোয়ার ইসলাম বলেন, মন্ত্রণালয়, পেট্রোবাংলা, পিডিবিকে এসব তহবিল সঠিকভাবে ব্যবহার করতে বলা হয়েছে। এতে দেশের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত স্বনির্ভর হবে।

শুনানিতে পেট্রোবাংলার পরিচালক (অর্থ) হারুন উর রশীদ বলেন, ৫০ কোটি এলএনজি আমদানি করায় নয় মাসে নয় হাজার কোটি টাকা ঘাটতি হয়েছে। তিনি বলেন, মুনাফা নয়; নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ করতে চাই, আপনারাও চান। সে কারণে আমদানি করতে হচ্ছে। আর আমদানি করতে হলে দাম বাড়ানোর বিকল্প নেই। দেশীয় তেল-গ্যাস আহরণে সেভাবে কাজ না হওয়ার বিষয়ে তিনি জানান, দক্ষ লোকবলের যথেষ্ট অভাব রয়েছে। সাগরে তেল-গ্যাস আহরণে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা নেই। বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি করতে চাইলেও বাংলাদেশের মডেল পিএসসির দাম আকর্ষণীয় নয়। সে কারণে সংশোধনীতে দাম আকর্ষণীয় করা হচ্ছে।

দুর্নীতির কারণে জ্বালানির দাম বাড়ে- ভোক্তাদের এ অভিযোগ বিষয়ে জ্বালানি বিভাগের যুগ্ম সচিব জহির রায়হান বলেন, একদিনে বিপ্লব হবে না। একটু একটু করে এগিয়ে যেতে পারলে ভালো। দুর্নীতি অনেকের মজ্জাগত দোষে পরিণত হয়েছে।

সিএনজি ফিলিং স্টেশন অ্যান্ড কনভারশন ওয়ার্কস ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ফারহান নূর ভূইয়া বলেন, ৩২ টাকা থেকে ৫০ শতাংশ বাড়িয়ে সিএনজির দাম ৪৮ টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে। এর প্রভাব কী হতে পারে, কেউ ভাবছেন না। এই ঢাকায় একসময় কালো ধোঁয়ায় থাকা যেত না। সে কারণে সিএনজিতে যাওয়া হয়। পরিবেশদূষণের বিষয়টি মাথায় রাখা দরকার।

গতকাল কর্ণফুলী ও পশ্চিমাঞ্চল গ্যাস বিতরণ কোম্পানি তাদের প্রস্তাবে আবাসিকে এক চুলার বর্তমান দর ৭৫০ থেকে বাড়িয়ে এক হাজার ৩৫০ টাকা, দুই চুলা ৮০০ থেকে বাড়িয়ে এক হাজার ৪৪০ টাকা এবং প্রি-পেইড মিটারে ৯ দশমিক ১০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৬ দশমিক ৪১ টাকা করার প্রস্তাব দিয়েছে। অন্যদিকে বিদ্যুতে প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের দাম তিন দশমিক ১৬ থেকে বাড়িয়ে ৯ দশমিক ৭৪ টাকা, সিএনজিতে ৩২ থেকে বাড়িয়ে ৪৮ দশমিক ১০ টাকা, সার উৎপাদনে প্রতি ঘনমিটার ২ দশমিক ৭১ থেকে বাড়িয়ে ৮ দশমিক ৪৪ টাকা, ক্যাপটিভ পাওয়ারে ৯ দশমিক ৬২ থেকে বাড়িয়ে ১৮ দশমিক শূন্য ৪ টাকা, শিল্পে ৭ দশমিক ৭৬ থেকে বাড়িয়ে ২৪ দশমিক শূন্য ৫ টাকা এবং বাণিজ্যিকে ১৭ দশমিক শূন্য ৪ টাকার পরিবর্তে ২৪ দশমিক শূন্য ৫ টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে। একই সঙ্গে তারা বিতরণ চার্জ বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে।

দুই গ্যাস কোম্পানির দাম বাড়ানোর প্রস্তাব বিষয়ে বিইআরসির মূল্যায়ন কমিটির পক্ষে বলা হয়, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে প্রতিদিন গড়ে ৩২০ মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি বিবেচনায় গ্যাসের গড় সরবরাহ ব্যয় দাঁড়ায় প্রতি ঘনমিটার ৭ টাকা ৯২ পয়সা। অন্যদিকে, প্রতিদিন গড়ে ৬৫০ মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি সরবরাহ বিবেচনায় গ্যাসের সরবরাহ ব্যয় দাঁড়ায় প্রতি ঘনমিটারে ১১ টাকা ৭৭ পয়সা। অন্যদিকে ২০১৯-২০ অর্থবছরে প্রতিদিন গড়ে ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি সরবরাহ বিবেচনায় গ্যাসের গড় সরবরাহ ব্যয় প্রতি ঘনমিটারে ১২ টাকা ৪৩ পয়সা হবে।

কমিটি আরও জানায়, কমিশন গত বছরের ১৬ অক্টোবর জারি করা আদেশে পশ্চিমাঞ্চল গ্যাস কোম্পানির বিতরণ চার্জ শূন্য দশমিক ৩৩ টাকা এবং কর্ণফুলীর শূন্য দশমিক ২৫ টাকা নির্ধারণ করে, যা গত ১৮ সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর। ফলে চলতি অর্থবছর শেষে প্রকৃত তথ্যের ভিত্তিতে বিতরণ চার্জ পুনর্নির্ধারণ করা যেতে পারে।


মন্তব্য যোগ করুণ

পরের
খবর

আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের একাংশ আজও রাস্তায়


আরও খবর

রাজধানী

আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা

  সমকাল প্রতিবেদক

বাসচাপায় বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের (বিইউপি) শিক্ষার্থী আবরার আহমেদ নিহতের ঘটনায় নিরাপদ সড়কের দাবিতে আজও অবস্থান নিয়ে আন্দোলন করেছে শিক্ষার্থীদের একাংশ।

রাজধানীর প্রগতি সরণির বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার ফটকের পাশে বৃহস্পতিবার বেলা সোয়া ১২টার দিকে অবস্থান নেন তারা। এরপর আন্দোলনরত এই শিক্ষার্থীরা ৮ দফা দাবিতে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেন।

দুপুরে দেড়টার দিকে মানববন্ধনস্থলে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলতে আসেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের গুলশান জোনের ডিসি মোস্তাক আহমেদ। এসময় শিক্ষার্থীরা তাকে স্বাগত জানান।

প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা পর কর্মসূচি শেষে করে বিইউপির শিক্ষার্থী ফামিন চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, নিরাপদ সড়কের আট দফা দাবিতে আমরা একাত্মতা ঘোষণা করেছি। মেয়র সাত দিন সময় নিয়েছেন। এ সময়ের মধ্যে আমাদের দাবিগুলোর বাস্তবায়ন হচ্ছে কি না সেটা আমরা দেখব।

তিনি বলেন, শুক্র ও শনিবারের পর রোববার থেকে আমরা আবারও মানববন্ধন করব। সড়কে শৃঙ্খলা আনতে আমরা ট্রাফিক পুলিশকে সহযোগিতা করব।

এর আগে বুধবার দাবি মেনে নেওয়ার জন্য ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) মেয়র আতিকুল ইসলামের আশ্বাসের পরিপ্রেক্ষিতে আগামী ২৮ মার্চ পর্যন্ত নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের চলমান সব কর্মসূচি স্থগিত ঘোষণা করা হয়। তবে একাংশ আন্দোলন চালিয়ে নেওয়ার ঘোষণা দেয়।

মেয়রের সঙ্গে এক বৈঠকের পর এদিন বিকেলে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের পক্ষে বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের (বিইউপি) শিক্ষার্থী ফয়সাল এনায়েত এক ব্রিফিংয়ে ২৮ মার্চ পর্যন্ত কর্মসূচি স্থগিতের তথ্য জানান।

তিনি বলেন, আগামী ২৮ মার্চ বেলা ১১টায় আমরা আবার মেয়রের কার্যালয়ে বৈঠকে বসব। সেখানে দাবি পূরণের অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হবে। অগ্রগতি দেখ যদি আমরা সন্তুষ্ট না হই, তাহলে আবার বিক্ষোভ শুরু হবে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৭টার দিকে রাজধানীর নর্দ্দা এলাকার প্রগতি সরণির যমুনা ফিউচার পার্কের সামনের রাস্তা পার হওয়ার সময় সড়ক দুর্ঘটনায় পড়েন বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের (বিইউপি) মেধাবী শিক্ষার্থী আবরার আহমেদ।

রাস্তার উল্টো পাশে ছিল আবরারের বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস। জেব্রা ক্রসিং পার হয়ে সেই বাসের কাছে যাচ্ছিলেন তিনি। ঠিক তখন ওই রাস্তায় দুটি বাসের প্রতিযোগিতার মধ্যে পড়ে সুপ্রভাত পরিবহনের একটির ধাক্কায় ছিটকে পড়েন আবরার। এরপর সেই বাসটি তাকে চাপা দিয়ে পালানোর চেষ্টা করে। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, তার নিথর দেহ টেনেও নিয়ে যায় খানিকটা। এতে ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয় আবরারের।

আবরার ছিলেন বিইউপির আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্র। বাবা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আরিফ আহমেদ চৌধুরী, গৃহিণী মা ফরিদা ফাতেমী ও একমাত্র ছোট ভাই আবিদ আহমেদ চৌধুরীকে নিয়ে থাকতেন বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার বাসায়।

নির্মম দুর্ঘটনা সহপাঠী আর পথচারীদের সামনেই ঘটেছে। এরপর ফুঁসে ওঠেন তারা। বারিধারায় বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার মূল গেট থেকে শুরু করে প্রগতি সরণি অবরোধ করে দিনভর চলে বিক্ষোভ। এতে আবরারের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়, আইইউবিসহ আশপাশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা অংশ নেন। তাদের সঙ্গে 'সড়কে হত্যা'র প্রতিবাদে শামিল হন অভিভাবক থেকে শুরু করে স্থানীয় লোকজনও।

পরে সন্ধ্যা পৌনে ৬টার দিকে পুলিশ, শিক্ষক ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের অনুরোধে অবরোধ তুলে নিয়ে বুধবার সকাল ৮টা থেকে নিরাপদ সড়কের দাবিতে আবারও রাস্তায় নামেন তারা।

মঙ্গলবার সুপ্রভাতের দুর্ঘটনা ঘটানো বাসটির রুট পারমিট সাময়িক বাতিল করা হয়েছে। গ্রেফতার করা হয় বাস চালক সিরাজুলকে। মঙ্গলবার রাতে নিহতের চাচা ওই ঘঠনায় বাদী হয়ে গুলশান থানায় একটি মামলা করেন। বুধবার দুপুরে সিরাজুলককে সাত দিনের রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ।

সংশ্লিষ্ট খবর

পরের
খবর

বাবা-ছেলের শেষ কথোপকথন


আরও খবর

রাজধানী
বাবা-ছেলের শেষ কথোপকথন

বাসচাপায় আবরারের মৃত্যু

প্রকাশ : ২১ মার্চ ২০১৯ | প্রিন্ট সংস্করণ

  সাহাদাত হোসেন পরশ

'বাবা, তুমি আমার মূল সার্টিফিকেটের কপিগুলো ফটোকপি করে অ্যাটেসটেড (সত্যায়িত) করে রেখো। তোমার কাছ থেকে সেগুলো সংগ্রহ করে নেব।' আবরার আহমেদ চৌধুরীর সঙ্গে তার বাবা অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আরিফ আহমেদ চৌধুরীর এই ছিল শেষ কথা। সোমবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে ঘুমাতে যাওয়ার আগে বাবা-ছেলের মধ্যে ওই কথোপকথন হয়েছিল। সেই রাতের স্মৃতিচারণ করে গতকাল বুধবার আবরারের বাবা আরিফ আহমেদ চৌধুরী সমকালকে বলেন, ছেলেটা সেনাবাহিনী ও বিমানবাহিনীতে যোগদানের জন্য লিখিত-মৌখিক সব পরীক্ষায় পাস করেছিল। কোন বাহিনীতে যোগ দেবে- তা ঠিক করা হয়ে ওঠেনি। এরই মধ্যে এমন মর্মন্তুদ ঘটনা ঘটল।

বেদনাবিধুর আর শোকার্ত কণ্ঠে আরিফ আহমেদ চৌধুরী জানালেন, মঙ্গলবার তার গাড়িতে বাসা থেকে বসুন্ধরা গেট পর্যন্ত যায় আবরার। সঙ্গে ওর তিন সহপাঠী ছিল। তাকে নামিয়ে দিয়ে আসার মিনিট দশেক পর আবরারের মায়ের কাছে সহপাঠীদের কারও একজনের ফোনকল আসে। সেই কল থেকে দুর্ঘটনার খবর পাওয়া যায়। তখন তিনি ঘুমিয়ে ছিলেন। স্ত্রীর কাছ থেকে দুর্ঘটনার খবর পেয়ে দ্রুত প্রগতি সরণিতে ছুটে যান তিনি। গিয়ে দেখেন রাস্তার ওপাশে জটলা। পুলিশ তাকে জানায়, আবরার ভ্যানের মধ্যে আছে। সঙ্গে সঙ্গে ওই ভ্যান নিয়ে সিএমএইচে চলে যান। তিনি একমুহূর্তও সেখানে দাঁড়াননি। যদি ওকে রিকভারি করা যায়, সেই আশা নিয়ে ছুটে গিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু ডাক্তার তাকে জানান, অলরেডি হি ইজ ডেড। ওয়ান আওয়ার হয়ে গেছে। তার মগজ বেরিয়ে যাওয়া, চাপা খাওয়ার ধরন থেকে আর দু-একজনের সঙ্গে কথা বলে তিনি বুঝতে পারেন, প্রথমে ডান দিক থেকে এসে একটি বাস তাকে হিট করেছে। এরপর আরেকটি বাস তাকে চাপা দিয়েছে। তাতে ও পড়ে গেছে। পরে সহপাঠীরা ধরাধরি করে ওকে এপারে নিয়ে আসে। জেব্রা ক্রসিংয়ের ওপর দিয়ে নিয়ম মেনেই সে পার হচ্ছিল।

ছেলের সঙ্গে কথোপকথনের স্মৃতিচারণ করে বাবা জানালেন, আইএসএসবিতে সাত দিনের পরীক্ষার জন্য আবরারের যাওয়ার কথা ছিল। মঙ্গলবার দুপুর ২টার মধ্যে সেখানে তার সার্টিফিকেট জমা দেওয়ারও কথা ছিল। বাবাকে সব সার্টিফিকেট সত্যায়িত করে রাখতে বলেছিল। সাড়ে ১১টার মধ্যে বিইউপিতে ক্লাস শেষ হওয়ার পর অ্যাটেসটেড সার্টিফিকেট জমা দিত সে।

ছেলেকে ঘিরে বাবার স্বপ্ন ছিল আকাশছোঁয়া। ছেলে সেই আকাশ প্রায় ছুঁয়েও ফেলেছিল। দুর্ঘটনা নয়, কার্যত সড়কে 'হত্যার' মধ্য দিয়ে আবরার আহমেদ চৌধুরীকে ঘিরে বাবার স্বপ্ন ধূলিসাৎ হয়ে গেল। গতকাল যখন প্রগতি সরণিতে আবরারের নামে একটি ফুট ওভারব্রিজের ভিত্তিপ্রস্তর উদ্বোধন করা হলো, তখন অনেকের প্ল্যাকার্ডেই লেখা ছিল- 'ওভারব্রিজ বা টাকা চাই না, নিরাপদ সড়ক চাই।' ওই সময় উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলাম বলেন, 'আবরারের বাবা আজ এখানে আসতে পারেননি। দুই মাসে ফুট ওভারব্রিজের কাজ শেষ হবে। উদ্বোধনের দিন তাকে আসার জন্য অনুরোধ জানাব।'

আবরারদের পারিবারিক বন্ধু তানবিরা খান তার ফেসবুক পোস্টে লিখেন, ' মঙ্গলবার যখন ওর মায়ের কাছে গেলাম, তখন সে অবিরত কথা বলে যাচ্ছে। তার আবরারের কত কথা! কিন্তু সব কথার মাঝে একটু পর পর, একটি কথাই "আমি তো আর ওরে পাব না!"

পরের
খবর

আবার সেই দৃশ্যপট


আরও খবর

রাজধানী
আবার সেই দৃশ্যপট

প্রকাশ : ২১ মার্চ ২০১৯ | প্রিন্ট সংস্করণ

প্রগতি সরণি থেকে শাহবাগ, সায়েন্স ল্যাবরেটরি থেকে গুলিস্তান- বাসচাপায় বিইউপি শিক্ষার্থী আবরারের মৃত্যুর পর নিরাপদ সড়কের দাবিতে বুধবার রাজধানীর ছয়টি স্পটে অবরোধ ও বিক্ষোভ করেছে শিক্ষার্থীরা। তাদের হাতে ছিল নানা রকম স্লোগান সংবলিত পোস্টার - সমকাল

  বিশেষ প্রতিনিধি

গত বছর জুলাই-আগস্টের দিনগুলো ছিল এ রকমই। শ্রেণিকক্ষ ছেড়ে রাজপথে নেমে এসেছিল শিক্ষার্থীরা। একটাই দাবি তাদের- চাই নিরাপদ সড়ক। সেই উত্তাল সময়ের দৃশ্যপটই যেন ফিরে এসেছে আবার। রাজপথে রাজীব-মীমের করুণ মৃত্যুর মাত্র সাত মাসের ব্যবধানে সড়ক বিশৃঙ্খলার যূপকাষ্ঠে বলি হলেন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী আবরার। প্রতিবাদে এবারও পথে দাঁড়িয়েছেন শিক্ষার্থীরা। তাদের স্লোগানের ভাষায়, ব্যানার-ফেস্টুন-প্ল্যাকার্ডের লেখায় ফুটে উঠেছে একই রকম ক্রোধ, ঘৃণা আর বিচারের দাবি। সেবার যেমন প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল- 'সড়ক মেরামতের কাজ চলছে'; এবারও তাই। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরও নতুন নতুন টনক নাড়ানো স্লোগান। গতকাল বুধবার আবরারের মৃত্যুস্থল কুড়িল থেকে শাহবাগ, সায়েন্স ল্যাবরেটরি, গুলিস্তানসহ রাজধানী ছাড়িয়ে দেশের বিভিন্ন শহরেও বিক্ষোভে ফেটে পড়েন শিক্ষার্থীরা।

গতকাল সাতসকালেই মাথার ওপর খরতাপ ছড়াচ্ছিল চৈত্রের সূর্য। গরমের তীব্রতা উপেক্ষা করে সমবেত শিক্ষার্থীদের স্লোগানে স্লোগানে উত্তাল হয়ে উঠেছিল রাজধানীর বিভিন্ন রাজপথ। কেউ প্ল্যাকার্ড হাতে, কেউ ফেস্টুন নিয়ে, কেউ বা জাতীয় পতাকা নিয়ে অংশ নেন গতকাল বুধবারের বিক্ষোভে। অনেকের মাথা ঢাকা ছিল কালো কাপড়ে।

প্রগতি সরণির রক্তমাখা 'ব্ল্যাক স্পট'টির চারদিক রশি দিয়ে ঘিরে রেখেছিলেন শিক্ষার্থীরা। উৎসুক মানুষ এসে দেখছিল কলঙ্কিত স্থানটি, যেখানে কেড়ে নেওয়া হয়েছে মেধাবী শিক্ষার্থী আবরারের জীবনপ্রদীপ। জেব্রা ক্রসিংয়ে নিয়ম মেনে রাস্তা পার হতে গিয়েও জীবন হারাতে হয়েছে তাকে। সুপ্রভাত পরিবহনের ঘাতক বাসচালক পিষিয়ে মেরে ফেলেছে তাকে। বাসের নাম 'সুপ্রভাত' হলেও মঙ্গলবার সকালে সে বিভীষিকা বয়ে আনে আবরারের পরিবার ও স্বজনের জীবনে।

শিক্ষার্থীদের হাতে ধরা প্ল্যাকার্ড ও ফেস্টুনগুলোয় লেখা- 'ওস্তাদ স্পিড বাড়ান, সামনে স্টুডেন্ট', 'উই ওয়ান্ট জাস্টিস', 'বাসের নিচে পড়ে মরি, লাশ বানিয়ে বল স্যরি', 'আমাদের দেশে হবে সেই মন্ত্রী কবে, কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে', 'আর কত?', 'প্রতিবার ছাত্র হত্যার পর মিথ্যা আশ্বাস বন্ধ করো', 'বার্থ ইন হসপিটাল, ডেথ ইন রোড', 'জন্ম যখন মায়ের কোলে, মৃত্যু কেন রোডে', 'ভাই এখন কবরে, আর খুনিকে দেখাও খবরে', 'ওভারব্রিজ বা টাকা নয়, নিরাপদ সড়ক চাই', 'একজন করে মরবে আর একটি করে ফুট ওভারব্রিজ বানাবে তা চাই না' ইত্যাদি স্লোগান, প্রশ্ন ও ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া। কোনো কোনো শিক্ষার্থী বাসের গায়েও বিভিন্ন স্লোগান লিখে দেন। কেউ আবার রাস্তায় যানবাহনের চালকের ড্রাইভিং লাইসেন্স পরীক্ষা করেন। প্রগতি সরণিতে অ্যাম্বুলেন্স ও রোগী বহনকারী গাড়ি ছাড়া আর সব যান চলাচল দিনভর বন্ধ ছিল।

রাজধানীতে অবস্থানকারী বিইউপির ছাত্র শাকিল আহমেদ সমকালকে বলেন, এমন মৃত্যু কারও কাম্য নয়। স্বাভাবিক মৃত্যুর নিশ্চয়তা চাই। শুধু মেধাবী শিক্ষার্থী নয়, একজন সাধারণ মানুষকেই বা কেন অকালে প্রাণ হারাতে হবে? কাউকেই যেন এমন পরিণতি বরণ করতে না হয়। তাই শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নেমেছে।

শুধু প্রগতি সরণি নয়, রাজধানীর আরও বেশ কিছু এলাকা গতকাল স্লোগানে স্লোগানে মুখর ছিল। বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা বিইউপির আন্দোলনকারীদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেন। নিহত শিক্ষার্থীর প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে ফেসবুকে 'বিইউপি মিরর' নামে একটি গ্রুপ খুলেছেন ছাত্রছাত্রীরা। এই গ্রুপে আবরারকে নিয়ে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় পালিত কর্মসূচির খবর তুলে ধরা হচ্ছে। প্রগতি সরণিতে গতকাল শিক্ষার্থীরা আবরারের জন্য দোয়া মাহফিলেরও আয়োজন করেন।

বসুন্ধরার 'বি' ব্লকের ৬ নম্বর সড়কের ১২২ নম্বর বাসায় আবরার পরিবারের সঙ্গে বসবাস করতেন। সেখানে গিয়ে দেখা যায়, স্তব্ধতা নেমে এসেছে। নিরাপত্তারক্ষী আবদুল আজিজ জানান, তার মতো ভদ্র ও মিশুক ছেলে পুরো বসুন্ধরা এলাকায় খুঁজে পাওয়া দুস্কর। ঘটনার দিন সকালে বাসা থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্দেশে রওনা হন আবরার। কিছু সময় পর তার দুর্ঘটনার খবর পাওয়া যায়। আবরার মারা যাওয়ার পর তার পরিবারের সদস্যরা বসুন্ধরার বাসায় এখনও ফেরেননি। বারিধারা ডিওএইচএসে তার ফুফুর বাসায় রয়েছেন সকলে।