বরিশাল

বরিশালে সক্রিয় একাধিক গ্রুপ

গ্যাং কালচার (৭)

প্রকাশ : ০৩ আগষ্ট ২০১৯ | প্রিন্ট সংস্করণ

বরিশালে সক্রিয় একাধিক গ্রুপ

  পুলক চ্যাটার্জি, বরিশাল

২০১৭ সালের ৫ এপ্রিল সন্ধ্যায় বরিশাল নগরীর জিলা স্কুল মোড় থেকে শুরু করে ব্রাউন কম্পাউন্ড সড়কে বেপরোয়াভাবে যানবাহন ভাংচুর করে একদল কিশোর। ধারালো অস্ত্র নিয়ে প্রকাশ্যে প্রতিপক্ষের একাধিক ব্যক্তিকে মারধর ও কুপিয়ে জখম করে তারা। এ দলটি একই বছরের ২৪ অক্টোবর চাঁদা না পেয়ে নগরের হেমায়েত উদ্দিন সড়কে মোবাইল ফোনের একটি দোকানে হামলা চালায়। এ দুটি সন্ত্রাসী ঘটনার নেপথ্যে ছিল তানজিম আহম্মেদ ও সৌরভ বালা গ্রুপ। এদের সবাই কিশোর বয়সের ও অধিকাংশই বিদ্যালয়ে পড়ুয়া শিক্ষার্থী। কেউ কেউ পড়ালেখা ছেড়ে দিয়েছে।

তানজিম ও সৌরভ বালা গ্রুপের মতো ৭-৮টি বখাটে কিশোর গ্রুপ বরিশাল নগরীতে সক্রিয় রয়েছে বলে জানা গেছে। বিভিন্ন সূত্র জানায়, বিএম কলেজ ও সংলগ্ন নতুন বাজার, বৈদ্যপাড়া এলাকায় সক্রিয় আছে কিশোর সন্ত্রাসীদের একটি গ্রুপ। এর নেতৃত্ব দিচ্ছে আজমল হোসেন রুমন। নগরীর বটতলা এলাকায় বখাটে রাহুল গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে। এ ছাড়া নগরের আমির কুটির, চৌমাথা, রূপাতলী, সাগরদী, পলাশপুর, কাউনিয়া এবং আমানতগঞ্জ এলাকায় আরও ৪-৫টি বখাটে কিশোর গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে।

অভিযোগ আছে, তানজিম ও সৌরভ বালা গ্রুপ বাংলাদেশ ব্যাংক মোড়, ব্রাউন কম্পাউন্ড ও সদর রোডের একাংশে চাঁদাবাজিসহ সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালায়। এ গ্রুপের উল্লেখযোগ্য সদস্যরা হলো- সাগর হাওলাদার, আরমান শরীফ, আবদুল্লাহ আল তামিম, নাজিম উদ্দিন রাতুল, তৌসিক হাওলাদার, শোভন বিশ্বাস, তানভীর আহসান জিহাদ ও রিফাতুল ইসলাম। এদের বিরুদ্ধে কোতোয়ালি মডেল থানায় একাধিক মামলা রয়েছে। ২০১৭ সালের ৫ এপ্রিল যানবহন ভাংচুরের সময় ধারালো অস্ত্রসহ গ্রেফতার হয়েছিল সৌরভ বালা। ওই ঘটনায় এবং পরবর্তী সময়ে চাঁদা না পেয়ে মোবাইল ফোনের দোকানে হামলার ঘটনায় তানজিম-সৌরভ গ্রুপের শীর্ষ সদস্যরা গ্রেফতার হয়েছিল। অল্প কিছুদিন হাজতে থেকে একে একে সবাই জামিনে মুক্ত হয়ে ফের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে যুক্ত রয়েছে বলে সংশ্নিষ্ট বিভিন্ন সূত্র নিশ্চিত করেছে।

কোতোয়ালি মডেল থানার এক এসআই বলেন, তানজিম-সৌরভ গ্রুপ ২০১৭ সালের ৫ এপ্রিল সন্ধ্যায় ধারালো অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে যানবহনে বেধড়ক ভাংচুর চালিয়ে আলোচনায় আসে। এক সময় এই গ্রুপটি জেলা ছাত্রদলের সাবেক এক যুগ্ম সম্পাদকের ছত্রছায়ায় থেকে অপকর্ম চালালেও বর্তমানে নগর ছাত্রলীগের এক নেতার আশ্রয়-প্রশ্রয়ে থেকে অপরাধ কর্মকাণ্ডে যুক্ত রয়েছে।

২০১৭ সালের ২৩ এপ্রিল রাতে নগরীর কাউনিয়া এলাকায় কালাখানের বাড়িসংলগ্ন একটি ভবন থেকে আছিয়া আক্তার পাখি নামে এক কলেজছাত্রীর ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। পুলিশ সূত্র জানায়, কিশোর সন্ত্রাসী আজমল হোসেন রুমন গ্রুপের প্রধান রুমন ও পাখি স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে ওই ভবনে ভাড়া থাকত। পাখির মৃত্যুর ঘটনায় রুমনের সংশ্নিষ্টতা পাওয়ায় তাকে গ্রেফতার করে পুলিশ। বর্তমানে জামিনে থাকলেও রুমন একটি হত্যাসহ একাধিক মামলার আসামি। বহু অভিযোগ আছে ব্রজমোহন (বিএম) কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র রুমনের বিরুদ্ধে। মাদক ব্যবসা ও চাঁদাবাজি তার প্রধান কাজ। বিএম কলেজসংলগ্ন বৈদ্যপাড়া, পশ্চিম কাউনিয়া, মধুমিয়ার পুল এলাকার ছাত্রদের মেসে হানা দিয়ে রুমন গ্রুপের সদস্যরা প্রায়ই টাকা ও মূল্যবান জিনিসপত্র নিয়ে যায়। বিএম কলেজের ফ্লাইট সার্জেন্ট ফজলুল হক হলে (মুসলিম হল) থেকে রুমন ও তার অন্তত ২০ সহযোগী সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালায়। মুসলিম হলে মাদক রেখে ব্যবসা করাও অভিযোগ আছে রুমনের বিরুদ্ধে। গত জুন মাসে সহযোগীদের নিয়ে কলেজ ক্যাম্পাসে ধারালো অস্ত্র হাতে মহড়া দেয় সে। পূর্ববিরোধের জের ধরে ওইদিন কলেজ ক্যাম্পাসে একটি ফাস্টফুডের দোকানে ভাংচুর চালায় তারা। মারধর করে দোকান মালিককে।

মধুমিয়ার পুল ও বৈদ্যপাড়া এলাকায় মেসে থাকা বিএম কলেজের একাধিক ছাত্র জানান, কলেজ এলাকার বাসিন্দা নগর ছাত্রলীগের এক নেতার ছত্রছায়ায় আছে রুমন ও তার গ্রুপ। প্রায়ই তারা মেসগুলোতে হানা দেয়। শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে টাকা নেয়। আবার কোনো কোনো শিক্ষার্থীকে নিজেদের দলে ভেড়াতে ভয় দেখায়। বটতলা এলাকার রাহুল গ্রুপ এলাকায় 'হোয়াইট কালার' অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত। এ গ্রুপটি বটতলা বাজার, নবগ্রাম সড়কসহ সরকারি সৈয়দ হাতেম আলী কলেজের শহীদ আলমগীর ছাত্রাবাসে নানা অপকর্ম করে বেড়ায়।

এসব অভিযোগ প্রসঙ্গে বক্তব্য জানতে তানজিম ও সৌরভ বালাকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তারা রিসিভ করেনি। তবে আজমল হোসেন রুমন তার বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

নগরে কিশোর সন্ত্রাসী গ্রুপের অপকর্ম সম্পর্কে জানতে চাইলে বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্যানেল মেয়র-১ ও ১৯ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর গাজী নঈমুল ইসলাম লিটু সমকালকে বলেন, নগরীর বিভিন্ন স্থান থেকে, বিশেষ করে ১৯ নম্বর ওয়ার্ডের নতুন বাজার এলাকা থেকে বহুবার উঠতি সন্ত্রাসীদের মাদকসহ ধরে পুলিশে দিয়েছি। কিন্তু অল্প কিছুদিন পরে তারা জামিনে মুক্ত হয়ে আবার মাদক ব্যবসা ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড শুরু করে।

নগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক অভিযোগ করেন, নগরীর একাধিক থানা ও ফাঁড়ি পুলিশের চিহ্নিত কিছু কর্মকর্তার সঙ্গে কিশোর সন্ত্রাসীদের সখ্য থাকায় দিনে দিনে তাদের দৌরাত্ম্য বাড়ছে। নতুন বাজার ও নাজির মহল্লায় তাদের উৎপাত বেড়েছে। পুলিশ জানে কারা এসব করছে; কিন্তু কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না। বখাটে সন্ত্রাসীরা প্রভাবশালী ছাত্রলীগ নেতাদের ছত্রছায়ায় চলছে এমন অভিযোগ প্রসঙ্গে এই আওয়ামী লীগ নেতা বলেন, তিনি কখনও সন্ত্রাসীদের প্রশ্রয় দেন না। থানা থেকে কোনো মাদক ব্যবসায়ীকে মুক্ত করেন না। যদি কেউ মাদক ব্যবসায়ী ও সন্ত্রাসীদের প্রশ্রয় দিয়ে থাকেন সেটা অন্যায়।

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অসীম কুমার নন্দী বলেন, মাদকের প্রভাব, পরিবার থেকে উপযুক্ত শিক্ষা না পাওয়া এবং রাজনৈতিক কারণে সৃষ্টি হচ্ছে কিশোর সন্ত্রাসী ও বখাটে গ্রুপ। সহজলভ্য হওয়ায় জড়িয়ে পড়ছে মাদক ব্যবসা এবং সেবনে। যে কারণে সামান্য ঘটনায়ও এরা বড় ধরনের অপরাধ সংঘটিত করছে। এ অবস্থা থেকে উত্তোরণের জন্য প্রথমেই সমাজ থেকে মাদকের প্রভাব নির্মূল করতে হবে। পারিবারিক বন্ধন ও সামাজিক মূল্যবোধকে আরও শেকড়ে ছড়িয়ে দিতে হবে। সমাজের সর্বস্তরে বাড়াতে হবে সচেতনতা। রাজনৈতিক নেতাদেরও সতর্ক হতে হবে; যেন তারা কোনো অপরাধীকে আশ্রয়-প্রশ্রয় না দেন।

বরিশাল সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক কাজী এনায়েত হোসেন শিবলু বলেন, পারিবারিক বন্ধন নাজুক হলে কিশোররা বখাটেপনা ও অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। রাজনৈতিক দলের বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে শক্তি প্রদর্শন করে। নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার প্রয়োজনে বিভিন্ন অপরাধ কর্মকাণ্ডে জড়ায়।

এ ব্যাপারে বরিশাল মহানগর পুলিশের কমিশনার মোহাম্মদ শাহাবউদ্দিন খান বলেন, কিশোর অপরাধ ও বখাটেপনা কমাতে নগর পুলিশের উদ্যোগে বিদ্যালয় ও কলেজে সচেতনতামূলক সভা করা হচ্ছে। অভিভাবক ও শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সঙ্গেও মতবিনিময় করে সবাইকে এ ব্যাপারে সচেতন করা হচ্ছে। থানায় থানায় সভা করে কিশোর অপরাধসহ সব ধরনের অপরাধ নিয়ন্ত্রণে রাখার প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে।

মন্তব্য


অন্যান্য