ব্যাংক-বীমা

সুদহার সিঙ্গেল ডিজিটে আনা এখন সম্ভব নয়: ব্যাংকার্স সভায় এমডিরা

প্রকাশ : ২১ জুলাই ২০১৯ | আপডেট : ২১ জুলাই ২০১৯

সুদহার সিঙ্গেল ডিজিটে আনা এখন সম্ভব নয়: ব্যাংকার্স সভায় এমডিরা

  সমকাল প্রতিবেদক

অনেক সরকারি প্রতিষ্ঠানের আমানতে ব্যাংকগুলোকে এখনও সাড়ে ৯ শতাংশ সুদ দিতে হচ্ছে। মেয়াদি আমানত নিতে হচ্ছে সাড়ে ১০ শতাংশ পর্যন্ত সুদে। এ পরিস্থিতিতে ঋণের সুদহার সিঙ্গেল ডিজিট বা এক অঙ্কে নামিয়ে আনা এখন সম্ভব নয় বলে জানিয়েছেন শীর্ষ ব্যাংকাররা। 

রোববার বাংলাদেশ ব্যাংকে অনুষ্ঠিত 'ব্যাংকার্স সভায়' এমন মতামত দেন বিভিন্ন ব্যাংকের এমডি। গভর্নর ফজলে কবিরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

গত বছরের ২০ জুন ব্যাংকের উদ্যোক্তাদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) এক বৈঠক থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, সব ব্যাংক সর্বোচ্চ ৯ শতাংশ সুদে ঋণ এবং ৬ শতাংশ সুদে আমানত নেবে। শিল্পায়নের স্বার্থে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দিকনির্দেশনার আলোকে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানান বিএবির চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদার। এক অঙ্কের সুদহার কার্যকরের জন্য তখন সিআরআর সাড়ে ৬ শতাংশ থেকে কমিয়ে সাড়ে ৫ শতাংশ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে 'রেপো'র বিপরীতে ধারের সুদহার ৬ দশমিক ৭৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৬ শতাংশ করা হয়। আর সরকারি আমানতের ৫০ শতাংশ বেসরকারি ব্যাংকে রাখার ঘোষণা দেওয়া হয়। এত সুবিধার পরও রাষ্ট্রীয় মালিকানার ৮ ব্যাংক এবং কয়েকটি বিদেশি ব্যাংক ছাড়া সব ব্যাংকের সুদহার এক অঙ্কে না নামানোয় বিভিন্ন মহলের সমালোচনার মুখে রয়েছে ব্যাংকগুলো।

জানা গেছে, রোববার বৈঠকে এমডিরা বলেন, সুদহার পুরোপুরি চাহিদা ও সরবরাহের ওপর নির্ভর করে। এটা রাতারাতি কমানোর কোনো বিষয় নয়। বাজার চাহিদার কারণে বর্তমানে দুই অঙ্ক সুদে আমানত নিতে হচ্ছে। এখন এক অঙ্ক সুদে ঋণ বিতরণ সম্ভব না। এ ছাড়া সরকারি প্রতিষ্ঠানের আমানতে সর্বোচ্চ ৬ শতাংশ সুদ নেওয়ার কথা থাকলেও এখনও সাড়ে ৯ শতাংশের কমে পওয়া যাচ্ছে না। আমানতে ৬ শতাংশ সুদহার কার্যকর না হলে ঋণের সুদ ৯ শতাংশে নামানো যাচ্ছে না। এর পরও ব্যাংকগুলোর ওপর চাপিয়ে দেওয়া হলে তারা তা কার্যকর করবে। তবে তাতে বিপর্যয় নেমে আসতে পারে বলে সতর্ক করেন। সুদহারের কারণে কোনো ব্যাংক লোকসান করলে তখন বিদেশি ব্যাংক আর ওই ব্যাংকের সঙ্গে ব্যবসা করতে চাইবে না। এলসির খরচ অনেক বেড়ে যাবে বলে জানানো হয়।

বৈঠক শেষে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক মো. সিরাজুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, সরকারকে বেসরকারি ব্যাংকগুলো কথা দিয়েছে ৬ শতাংশ সুদে আমানত পেলে পর্যায়ক্রমে ঋণের সুদ ৯ শতাংশে নামাবে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের অবস্থান হলো সরকারের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতি যেন বাস্তবায়ন করে। ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটি ব্যাংক ঋণের সুদ এক অঙ্কে নামিয়েছে। অন্য ব্যাংকগুলোও চেষ্টা করছে। সিঙ্গেল ডিজিট সুদ কার্যকরে বাংলাদেশ ব্যাংকের কোনো চাপ রয়েছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটা চাপের কি? ব্যাংকগুলো কথা দিয়েছে, প্রতিশ্রুতির আলোকে তারা এক অঙ্কে নামাবে এটাই স্বাভাবিক। তবে ব্যাংকগুলো বলছে, এটা রাতারাতি সম্ভব নয়। বাজার থেকে তাদের উচ্চ সুদে আমানত নিতে হচ্ছে। পর্যায়ক্রমে এটা কমলে ঋণের সুদ কমবে।

বাংলাদেশ ব্যাংক কোনো সার্কুলারের মাধ্যমে নির্দেশনা দেবে কি-না জানতে চাইলে সিরাজুল ইসলাম বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংক চাইছে ব্যাংকগুলোর প্রতিশ্রুতির আলোকে এক অঙ্ক সুদহার কার্যকর হোক। যেহেতু প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ব্যাংকগুলো সিঙ্গেল ডিজিট সুদের বিষয়টি বলেছে; সুতরাং তারা চেষ্টা করছে। হয়তো সময় লাগছে। তবে পর্যায়ক্রমে কমে আসবে। তা ছাড়া সুদহারের সঙ্গে খেলাপি ঋণের বিষয়টি সম্পৃক্ত। খেলাপি ঋণ আদায় করতে না পারলে সুদহার কমানো যাবে না। এদিকেও জোর দিতে বলা হয়েছে।

বৈঠক শেষে ব্যাংকগুলোর প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন এবিবির চেয়ারম্যান ও ঢাকা ব্যাংকের এমডি সৈয়দ মাহবুবুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, সুদহারের বিষয়টি বাংলাদেশ ব্যাংক তাদের ওপর চাপিয়ে দেয়নি। এটা বাস্তবায়নে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কোনো চাপ নেই। ব্যাংকগুলোর উদ্যোক্তারা এটা বলেছেন। এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানতে চেয়েছে ব্যাংকগুলো কী করছে। ব্যাংকগুলোর পর্ষদের সদস্যরা যেহেতু প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, ফলে ব্যাংকগুলোরই দায়িত্ব এটা বাস্তবায়ন করা। সে লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছেন তারা।

সিঙ্গেল ডিজিট সুদে ঋণ বিতরণের বিষয়ে ব্যাংকগুলোর প্রতিশ্রুতির এক বছর পার হয়েছে, কার্যকর করতে আর কতদিন লাগবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, একবছর পার হলেই হবে না। এ সময়ে অবস্থার অনেক পরিবর্তন হয়েছে। তবে এখন দেখা যাচ্ছে আমদানি কমে আসছে। ফলে চলতি হিসাবে ব্যবধান কমেছে। কিছুদিন আগে বাজার থেকে ডলার কিনতে গিয়ে তারল্যের ওপর চাপ ছিল। এখন রেমিট্যান্স বাড়ছে, রফতানি বাড়ছে, আবার সঞ্চয়পত্র থেকেও কিছু কিছু টাকা ব্যাংকে আসছে। ফলে আশা করা যায় সুদহার কমে আসবে। তবে কাল না পরশু কমবে নির্দিষ্টভাবে তা বলা যাবে না। এর আগে ২০১৬ ও ২০১৭ সালে যখন সিঙ্গেল ডিজিট সুদে ঋণ বিতরণ হয়েছিল তখন কিন্তু কোনো ঘোষণা দিতে হয়নি।

মাহবুবুর রহমান বলেন, সিঙ্গেল ডিজিট সুদের সময়ে সবচেয়ে বেশি শিল্পের প্রবৃদ্ধি হয়েছে। ফলে আমানতে ৬ এবং ঋণে ৯ শতাংশ সুদ কার্যকর করা সবার দায়িত্ব। এক্ষেত্রে সরকারি প্রতিষ্ঠানসহ যাদের কাছ থেকে ব্যাংকগুলো আমানত পায়, তাদেরও দায়িত্ব আছে। সবাই মিলে কাজ করতে হবে। এটা শুধু ব্যাংকের বিষয় না, যাদের থেকে আমরা আমানত আনি তাদেরও দায়িত্ব আছে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে বৈঠকটি শুধু ৬, ৯ নিয়ে হয়নি। এটা ছিল ত্রৈমাসিক বৈঠক। এখানে ব্যাংকগুলোর বর্তমান অবস্থা, দেশের অর্থনীতি, এসএমই খাতে কীভাবে অর্থায়ন বাড়ানো যায় এসব বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে এক বৈঠকে খেলাপি ঋণ ১০ শতাংশে নামানোর বিষয়ে কথা হয়েছিল। সে বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক জানতে চেয়েছে। গত মার্চ প্রান্তিকে খেলাপি ঋণ বাড়লেও জুনে কমে আসছে বলে অধিকাংশ ব্যাংক বৈঠকে জানিয়েছে।

মন্তব্য


অন্যান্য