ব্যাংক-বীমা

ব্যাংক থেকে টাকা তোলার হিড়িক

প্রকাশ : ২৭ ডিসেম্বর ২০১৮ | প্রিন্ট সংস্করণ

ব্যাংক থেকে টাকা তোলার হিড়িক

  ওবায়দুল্লাহ রনি

জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘনিয়ে আসায় ব্যাংক থেকে টাকা তোলার হিড়িক পড়েছে। চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে অধিকাংশ ব্যাংক। নগদ টাকার চাহিদা মেটাতে এক ব্যাংক আরেক ব্যাংক থেকে কলমানিতে প্রচুর ধার নিচ্ছে। এতেও চাহিদা না মেটায় ব্যাংকগুলো ধরনা দিচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে। ১৬ ডিসেম্বরের পর থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক ও কলমানি থেকে দৈনিক গড়ে প্রায় আট হাজার কোটি টাকা ধার করেছে বিভিন্ন ব্যাংক। নগদ টাকার চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় কলমানির সুদহারও বেড়েছে।

সংশ্নিষ্টরা জানান, নির্বাচনের আগে সাধারণত প্রচুর কালো টাকার ছড়াছড়ি হয়। কালো টাকা ছড়ানোর প্রস্তুতির অভিযোগে গত মঙ্গলবার নগদ আট কোটি টাকা ও ১০ কোটি টাকার চেকসহ তিনজনকে গ্রেফতার করেছে র‌্যাব। নির্বাচন কমিশন থেকে একজন প্রার্থীর সর্বোচ্চ ব্যয়সীমা ২৫ লাখ টাকা নির্ধারণ করে দেওয়া হলেও অনেক প্রার্থী তার চেয়ে বেশি খরচ করেন। অনেক প্রার্থী কোটি কোটি টাকা খরচ করেন। এতে করে মানি লন্ডারিংয়ের আশঙ্কা থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবার আগেভাগেই ব্যাংকগুলোকে সতর্ক করে দিয়েছে। গত সপ্তাহে বিএফআইইউ থেকে সব ব্যাংকে চিঠি দিয়ে নগদ টাকার প্রবাহ নিয়ে সতর্ক থাকতে বলা হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক মো. সিরাজুল ইসলাম সমকালকে বলেন, আন্তঃব্যাংকে টাকা না পেলে ব্যাংকগুলো সাধারণত কেন্দ্রীয় ব্যাংকে আসে। চাহিদা বিবেচনায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্বল্প মেয়াদে টাকা দেয়। এটা একটা স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। তবে কোনো অসঙ্গতিপূর্ণ লেনদেন যেন না হয়, সে জন্য ব্যাংকগুলোকে আগে থেকেই সতর্ক করা হয়েছে।

ব্যাংকগুলোর প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশের (এবিবি) সাবেক চেয়ারম্যান ও মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের এমডি আনিস এ. খান সমকালকে বলেন, নির্বাচন ও ঈদের আগে সব সময়ই ব্যাংক থেকে নগদ টাকা উত্তোলন বাড়ে। এ জন্য ব্যাংকগুলো আগে থেকেই প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিল। তিনি বলেন, ব্যাংকিং চ্যানেলে যেন অবৈধ লেনদেন না হয়, তার জন্য ব্যাংকগুলো সতর্ক রয়েছে।

ব্যাংকাররা জানান, ব্যাংকগুলো আন্তঃসমন্বয়ের মাধ্যমে এক শাখা থেকে আরেক শাখায় নগদ টাকা পাঠিয়ে পরিস্থিতি সামলানোর চেষ্টা করছিল। এতে চাহিদা না মেটায় আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজার (কলমানিতে) ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে প্রতিদিনই বড় অঙ্কের ধার নিচ্ছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ধার নেওয়ার ঘটনা ঘটে গত ১৮ ডিসেম্বর মঙ্গলবার। ওই দিন কলমানি থেকে কয়েকটি ব্যাংক আট হাজার ৫১৫ কোটি টাকা নেয়। আর কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে নেয় এক হাজার ৪০৬ কোটি টাকা। প্রায় প্রতিদিনই এভাবে কমবেশি ধার নেওয়ায় কলমানির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। গতকাল সাড়ে ৪ শতাংশ থেকে ৫ শতাংশ সুদে কলমানিতে লেনদেন হয়েছে। গত ১৭ ডিসেম্বর লেনদেন হয়েছিল এক দশমিক ৭৫ শতাংশ থেকে ৫ শতাংশ সুদে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদহারের সর্বোচ্চ সীমা ৫ শতাংশ নির্ধারণ করে না দিলে সুদহার আরও বাড়ত বলে সংশ্নিষ্টদের ধারণা।

ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন এবিবির চেয়ারম্যান ও ঢাকা ব্যাংকের এমডি সৈয়দ মাহবুবুর রহমান সমকালকে বলেন, নির্বাচনের আগে প্রার্থীরা টাকা খরচ করেন। প্রার্থীর পক্ষেও অনেকে টাকা তোলেন। এতে করে গত কয়েকদিনে ব্যাংকগুলো থেকে টাকা উত্তোলনের প্রবণতা বেড়েছে।

প্রাপ্ত তথ্য মতে, ২৪ ডিসেম্বর সোমবার আন্তঃব্যাংকে কলমানিতে ৫ হাজার ২৭৬ কোটি টাকা লেনদেন হয়। এর আগে ১৭ ডিসেম্বর থেকে ২৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত ৬ কর্মদিবসে কয়েকটি ব্যাংক নিয়েছে ৪০ হাজার ৫৯৪ কোটি টাকা। প্রতিদিন গড়ে ৬ হাজার ৭৬৬ কোটি টাকার ধার নিয়েছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গতকাল দুপুর পর্যন্ত কয়েকটি ব্যাংক কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ৪০০ কোটি টাকা ধার নিয়েছে। আর গত ১৭ ডিসেম্বর থেকে ৬ কর্মদিবসে নিয়েছে পাঁচ হাজার ৭৮৬ কোটি টাকা। রেপো, বিশেষ রেপো এবং তারল্য সহায়তা হিসেবে এসব অর্থ নেয় ব্যাংকগুলো। ব্যাংকগুলোর বিভিন্ন ধরনের সিকিউরিটিজ বন্ধক রেখে ৬ থেকে ৯ শতাংশ সুদে এসব অর্থ দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

বেসরকারি অন্য একটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সমকালকে বলেন, নির্বাচনের পাশাপাশি এবার বছরের শেষ চার দিন ব্যাংক লেনদেন বন্ধ থাকায় অনেকেই টাকা তুলে ঘরে রাখতে পারেন। অল্প কিছুদিনের মধ্যে বিপুল অঙ্কের অর্থ তুলে নেওয়ায় কিছুটা চাপ পড়েছে ব্যাংকগুলোতে। চাপ সামলাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও কলমানিতে ধরনা দিতে হচ্ছে। তবে নির্বাচন শেষে ধীরে ধীরে এসব টাকা আবার ব্যাংকে আসবে বলে তিনি মনে করেন।

মন্তব্য


অন্যান্য