ব্যাংক-বীমা

আমানতের যথার্থ ব্যবহার করছে না গ্রামীণ ব্যাংক

বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশদ পরিদর্শন

প্রকাশ : ০৬ নভেম্বর ২০১৮ | আপডেট : ০৬ নভেম্বর ২০১৮ | প্রিন্ট সংস্করণ

আমানতের যথার্থ ব্যবহার করছে না গ্রামীণ ব্যাংক

  শেখ আবদুল্লাহ

ক্ষুদ্রঋণের মাধ্যমে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের হতদরিদ্রদের জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল গ্রামীণ ব্যাংক। প্রতিষ্ঠার পর থেকে দীর্ঘদিন ব্যাংকটি সে লক্ষ্য অনুযায়ী দরিদ্রদের অর্থায়ন করে আসছিল। দারিদ্র্য বিমোচনে বড় ভূমিকা পালন করে আসছিল ব্যাংকটি। কিন্তু কয়েক বছর ধরে দেখা  যাচ্ছে ব্যাংকটির মোট অর্থের একটি বড় অংশ গ্রাহকদের মাঝে ঋণ হিসেবে বিতরণ না করে সহজে মুনাফা করার লক্ষ্যে বিভিন্ন বাণিজ্যিক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে জমা রাখা হচ্ছে। সর্বশেষ ২০১৭ সালে ব্যাংকটি প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা দরিদ্রদের ঋণ হিসেবে না দিয়ে বিভিন্ন বেসরকারি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে জমা রেখেছে। এতে ব্যাংকটির মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হচ্ছে। বঞ্চিত হচ্ছে গ্রামের দরিদ্র মানুষ। সহজ ব্যবস্থাপনা ও নিরাপদে মুনাফা বাড়ানোর জন্য ক্ষুদ্রঋণের পরিবর্তে প্রতিষ্ঠানটি লাভজনক বিনিয়োগ করছে বলে মনে করছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

গ্রামীণ ব্যাংকের ২০১৭ সালের কার্যক্রমের ওপর বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশদ পরিদর্শন প্রতিবেদনে এমন তথ্য তুলে ধরে সদস্যদের মধ্যে ঋণ বিতরণ বাড়ানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে গ্রামীণ ব্যাংকের সুশাসনেও ঘাটতি তৈরি হয়েছে বলে মনে করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। দীর্ঘদিন ধরে পূর্ণাঙ্গ পর্ষদ না থাকা, ২০১৭ সালে পর্ষদের কোনো সভা অনুষ্ঠিত না হওয়া, প্রায় সাড়ে সাত বছর ধরে ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক দিয়ে ব্যাংক পরিচালনার কারণে সুশাসনে ঘাটতি দেখা দিয়েছে বলে মনে করেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিচালকরা।

সম্প্রতি পরিদর্শন শেষ করে বাংলাদেশ ব্যাংক কিছু সুপারিশসহ প্রতিবেদনটি অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে। ২০১৬ সালের তুলনায় ২০১৭ সালে ব্যাংকটির আমানত, ঋণ বিতরণ, মুনাফার মতো খাতগুলোতে উন্নতি হয়েছে। তবে মেয়াদোত্তীর্ণ ঋণ, পুঞ্জিভূত কু-ঋণ বেড়েছে। ২০১১ সালের মে মাসে গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. মুহাম্মদ ইউনূস পদ থেকে ইস্তফা দেন। এরপর থেকে এ পর্যন্ত ব্যাংকটি চলছে ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক দিয়ে। এ ছাড়া ঋণ গ্রহীতা সদস্যদের মধ্য থেকে নির্বাচনের মাধ্যমে পরিচালনা পর্ষদের সদস্য নির্বাচনও হয়নি সময়মতো। রয়েছে বিভিন্ন ধরনের মামলা। ২০১৩ ও ২০১৪ সালে দেশব্যাপী রাজনৈতিক অস্থিরতা ছিল। ২০১৬ সালে দেশব্যাপী বড় বন্যা হয়েছে। সব মিলিয়ে এ সময়ে গ্রামীণ ব্যাংক প্রত্যন্ত অঞ্চলের দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে অর্থায়ন করা এবং পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনায় সুশাসন নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে পিছিয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সাল শেষে গ্রামীণ ব্যাংকের মোট সম্পদের ৩২ দশমিক ৭৩ শতাংশ বা ৭ হাজার ৭১৬ কোটি টাকা বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে জমা রাখা হয়েছে। ওই সময়ে ব্যাংকের মোট সম্পদের পরিমাণ ২৩ হাজার ৫৭৮ কোটি টাকা। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এতে প্রতীয়মান হয় গ্রামীণ ব্যাংক তার সংগ্রহ করা আমানতের বড় একটা অংশ আর্থসামাজিক উন্নয়নের জন্য সদস্যদের মধ্যে ঋণ হিসেবে বিতরণ না করে ব্যাংকসহ লাভজনক খাতে জমা রেখে লাভের পরিমান স্ম্ফীত করার প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। এ অবস্থা ব্যাংকটির মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত করছে। এ জন্য সদস্যদের মধ্যে ঋণ বিতরণ বাড়াতে ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষকে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

যদিও গ্রামীণ ব্যাংক দাবি করেছে, বাণিজ্যিক ব্যাংকসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে যে টাকা জমা রাখা হয়েছে, তা মুনাফা বাড়ানোর জন্য নয়। ঋণ বিতরণের সুযোগ না থাকায় এ অর্থ জমা রাখা হয়েছে। ব্যাংকের পরিবর্তিত পরিস্থিতি, পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের সীমাবদ্ধতা এবং ঋণ চাহিদার ঘাটতির কারণে ২০১২ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত অনেক তহবিল জমা হয়েছিল। ওইসব তহবিল অলস ফেলে না রেখে বিভিন্ন জায়গায় বিনিয়োগ করা হয়েছে। গ্রামীণ ব্যাংক নিজে ঋণ বিতরণ করলে সরল হারে ১০ শতাংশ বা ক্রমহ্রাসমান ভিত্তিতে ২০ শতাংশ হারে সুদ পায়। কিন্তু কোনো ব্যাংক বা অন্য প্রতিষ্ঠানে এত মুনাফা পাওয়া যায় না। ফলে বাণিজ্যিক ব্যাংকে জমা রাখা গ্রামীণ ব্যাংকের জন্য বেশি লাভজনক হয় না।

এ বিষয়ে গ্রামীণ ব্যাংকের মহাব্যবস্থাপক মোস্তফা কামাল সমকালকে বলেন, বিভিন্ন পরিপ্রেক্ষিতেই গ্রামীণ ব্যাংকের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। আবার ২০১৩ ও ২০১৪ সালে ঋণের চাহিদাও তুলনামূলক কম ছিল। যে কারণে ঋণ বিতরণ কমে যায়। ফলে বাধ্য হয়ে কিছু অর্থ অন্য খাতে বিনিয়োগ করতে হয়েছে। সম্প্রতি এটা কমে এসেছে। তিনি বলেন, সদস্যদের মধ্যে ঋণ বিতরণ বাড়ানোর ক্ষেত্রে গ্রামীণ ব্যাংকের সদিচ্ছার কোনো ঘাটতি নেই। বরং ঋণ বিতরণ বাড়ানোর জন্য বর্তমানে নতুন সদস্য নেওয়ার চেষ্টা চলছে। পাশাপাশি বর্তমান সদস্যদের মধ্যে ঋণ বিতরণ বাড়ানোর উদ্যোগ রয়েছে।

প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসনে ঘাটতি : ২০১৭ সালে ব্যাংকটিতে পরিচালনা পর্ষদের কোনো সভা অনুষ্ঠিত হয়নি। দীর্ঘদিন ধরে কার্যকর পরিচালনা পর্ষদও নেই। নেই স্থায়ী নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালকও। প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসনেও ঘাটতি দেখা দিয়েছে। এ জন্য স্থায়ীভাবে ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগের সুপারিশ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। যদিও এরই মধ্যে নির্বাচনের মাধ্যমে সদস্যদের মধ্য থেকে ৯ জন পরিচালক নির্বাচিত হয়েছেন। সরকারও তিনজন পরিচালক মনোনয়ন দিয়েছে। কয়েক বছর পরে গঠিত পূর্ণাঙ্গ পরিচালনা পর্ষদ গত ২৬ সেপ্টেম্বর প্রথম সভা করে।

মুনাফা যথেষ্ট নয় : ২০১৭ সালে গ্রামীণ ব্যাংকের মুনাফা হয়েছে ২২৭ কোটি ৫৩ লাখ টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় ৮৮ কোটি ২৪ লাখ টাকা বেশি। তবে আয়কর রেয়াত ও ব্যয় বিবেচনায় ব্যাংকটির এই মুনাফা যথেষ্ট নয় বলে মনে করে বাংলাদেশ ব্যাংক। অন্যান্য ব্যাংকে যে অর্থ জমা রাখা হয়েছে তা না করে সদস্যদের মধ্যে ঋণ বিতরণ বাড়িয়ে মুনাফা আরও বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

সুদহার কমানোর পরামশ : গ্রামীণ ব্যাংক চার ধরনের ঋণ দেয়। উৎপাদনশীল খাতে বিতরণ করা ঋণের সুদহার সরল হারে ১০ শতাংশ বা ক্রমহ্রাসমান ভিত্তিতে ২০ শতাংশ। গৃহ নির্মাণ সুদহার ৮ শতাংশ। শিক্ষা ঋণের সুদহার শিক্ষা শেষে ৫ শতাংশ। আর ভিক্ষুকদের জন্য ঋণের সুদহার শূন্য শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, বাণিজ্যিক ব্যাংকের সুদহারের তুলনায় গ্রামীণ ব্যাংকের সুদহার অনেক বেশি। গ্রামীণ আর্থসামাজিক উন্নয়নের স্বার্থে ঋণের সুদহার সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনা যেতে পারে।

মেয়াদোত্তীর্ণ ও কু-ঋণ বেড়েছে : প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৬ সালের তুলনায় ২০১৭ সাল শেষে ব্যাংকটির মোট আমানত ৪ দশমিক ২৭ শতাংশ বেড়ে ২০ হাজার ৮৩৫ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। আর মোট ঋণ ও অগ্রিম (কর্মচারী ঋণ বাদে) বেড়েছে ২২ দশমিক ২১ শতাংশ। গত ডিসেম্বর শেষে মোট ঋণের পরিমাণ ছিল ১৪ হাজার ৪৫০ কোটি টাকা। বিদেশি প্রতিষ্ঠান থেকে নেওয়া ধার ১২ দশমিক ৬২ শতাংশ বেড়ে হয়েছে ১৩৭ কোটি টাকা। এসবের পাশাপাশি ব্যাংকটির মেয়াদোত্তীর্ণ ঋণও আড়াই শতাংশ বেড়ে ২৩৩ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। একই সঙ্গে অবলোপনকৃত অনাদায়ী পুঞ্জিভূত কু-ঋণের স্থিতি বেড়েছে ১৬৭ কোটি টাকা বা ৭ দশমিক ৬২ শতাংশ। গত ডিসেম্বর শেষে অবলোপনকৃত অনাদায়ী কু-ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৩৬৮ কোটি টাকা। মেয়াদোত্তীর্ণ ও কু-ঋণ কমানোর জন্য পরামর্শ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংক মনে করে, সামগ্রিকভাবে ব্যাংকের ঋণ ব্যবস্থার অদক্ষতার কারণে এ ধরনের ঋণ বাড়ছে।

বেড়েছে প্রতারণা, জাল জালিয়াতি ও তহবিল তছরুপ :  ২০১৬ সালের তুলনায় ২০১৭ সালে গ্রামীণ ব্যাংকে প্রতারণা ও জাল-জালিয়াতির ঘটনা বেশি ঘটেছে। ২০১৭ সালে সারাদেশে ৪৬৪টি এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় জড়িত অর্থের পরিমাণ ৩২ কোটি ৮৪ লাখ টাকা। এ ঘটনাকে আশঙ্কাজনক উল্লেখ করে বাংলাদেশ ব্যাংক এসব অর্থ আদায়ে নির্দিষ্ট সময়ভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে।

ভারপ্রাপ্ত এমডিকে পূর্ণ দায়িত্ব দেওয়ার প্রস্তাব পর্ষদের : গত ২৬ সেপ্টেম্বর ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদের ১০৪তম সভায় ব্যাংকের বর্তমান ভারপ্রাপ্ত এমডি বাবুল সাহাকে পূর্ণ দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়ে পরিচালকরা একমত প্রকাশ করেছেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে গ্রামীণ ব্যাংকের চেয়ারম্যান ২১ অক্টোবর বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরকে এক চিঠিতে বাবুল সাহাকে পূর্ণাঙ্গ এমডির দায়িত্ব দেওয়ার প্রস্তাব করেছেন।

এ বিষয়ে মহাব্যবস্থাপক মোস্তফা কামাল বলেন, ভারপ্রাপ্ত এমডির এখন অবসর প্রস্তুতি ছুটিতে থাকার কথা। পর্ষদের সুপারিশে তিনি ছুটি বাতিল করে ব্যাংক পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছেন। কিন্তু ভারপ্রাপ্ত হলে সব কাজ যথাযথভাবে করার স্বাধীনতা থাকে না। নিজস্ব উদ্ভাবন, চিন্তা প্রয়োগে নানা সীমাবদ্ধতা থাকে। এতে সামগ্রিক ব্যাংক ব্যবস্থাপনাও ব্যাহত হয়। এ জন্য ব্যাংকের স্বার্থে পূর্ণাঙ্গ দায়িত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে পর্ষদ।


মন্তব্য যোগ করুণ

পরের
খবর

ব্যাংক থেকে টাকা তোলার হিড়িক


আরও খবর

ব্যাংক-বীমা
ব্যাংক থেকে টাকা তোলার হিড়িক

প্রকাশ : ২৭ ডিসেম্বর ২০১৮ | প্রিন্ট সংস্করণ

  ওবায়দুল্লাহ রনি

জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘনিয়ে আসায় ব্যাংক থেকে টাকা তোলার হিড়িক পড়েছে। চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে অধিকাংশ ব্যাংক। নগদ টাকার চাহিদা মেটাতে এক ব্যাংক আরেক ব্যাংক থেকে কলমানিতে প্রচুর ধার নিচ্ছে। এতেও চাহিদা না মেটায় ব্যাংকগুলো ধরনা দিচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে। ১৬ ডিসেম্বরের পর থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক ও কলমানি থেকে দৈনিক গড়ে প্রায় আট হাজার কোটি টাকা ধার করেছে বিভিন্ন ব্যাংক। নগদ টাকার চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় কলমানির সুদহারও বেড়েছে।

সংশ্নিষ্টরা জানান, নির্বাচনের আগে সাধারণত প্রচুর কালো টাকার ছড়াছড়ি হয়। কালো টাকা ছড়ানোর প্রস্তুতির অভিযোগে গত মঙ্গলবার নগদ আট কোটি টাকা ও ১০ কোটি টাকার চেকসহ তিনজনকে গ্রেফতার করেছে র‌্যাব। নির্বাচন কমিশন থেকে একজন প্রার্থীর সর্বোচ্চ ব্যয়সীমা ২৫ লাখ টাকা নির্ধারণ করে দেওয়া হলেও অনেক প্রার্থী তার চেয়ে বেশি খরচ করেন। অনেক প্রার্থী কোটি কোটি টাকা খরচ করেন। এতে করে মানি লন্ডারিংয়ের আশঙ্কা থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবার আগেভাগেই ব্যাংকগুলোকে সতর্ক করে দিয়েছে। গত সপ্তাহে বিএফআইইউ থেকে সব ব্যাংকে চিঠি দিয়ে নগদ টাকার প্রবাহ নিয়ে সতর্ক থাকতে বলা হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক মো. সিরাজুল ইসলাম সমকালকে বলেন, আন্তঃব্যাংকে টাকা না পেলে ব্যাংকগুলো সাধারণত কেন্দ্রীয় ব্যাংকে আসে। চাহিদা বিবেচনায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্বল্প মেয়াদে টাকা দেয়। এটা একটা স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। তবে কোনো অসঙ্গতিপূর্ণ লেনদেন যেন না হয়, সে জন্য ব্যাংকগুলোকে আগে থেকেই সতর্ক করা হয়েছে।

ব্যাংকগুলোর প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশের (এবিবি) সাবেক চেয়ারম্যান ও মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের এমডি আনিস এ. খান সমকালকে বলেন, নির্বাচন ও ঈদের আগে সব সময়ই ব্যাংক থেকে নগদ টাকা উত্তোলন বাড়ে। এ জন্য ব্যাংকগুলো আগে থেকেই প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিল। তিনি বলেন, ব্যাংকিং চ্যানেলে যেন অবৈধ লেনদেন না হয়, তার জন্য ব্যাংকগুলো সতর্ক রয়েছে।

ব্যাংকাররা জানান, ব্যাংকগুলো আন্তঃসমন্বয়ের মাধ্যমে এক শাখা থেকে আরেক শাখায় নগদ টাকা পাঠিয়ে পরিস্থিতি সামলানোর চেষ্টা করছিল। এতে চাহিদা না মেটায় আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজার (কলমানিতে) ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে প্রতিদিনই বড় অঙ্কের ধার নিচ্ছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ধার নেওয়ার ঘটনা ঘটে গত ১৮ ডিসেম্বর মঙ্গলবার। ওই দিন কলমানি থেকে কয়েকটি ব্যাংক আট হাজার ৫১৫ কোটি টাকা নেয়। আর কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে নেয় এক হাজার ৪০৬ কোটি টাকা। প্রায় প্রতিদিনই এভাবে কমবেশি ধার নেওয়ায় কলমানির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। গতকাল সাড়ে ৪ শতাংশ থেকে ৫ শতাংশ সুদে কলমানিতে লেনদেন হয়েছে। গত ১৭ ডিসেম্বর লেনদেন হয়েছিল এক দশমিক ৭৫ শতাংশ থেকে ৫ শতাংশ সুদে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদহারের সর্বোচ্চ সীমা ৫ শতাংশ নির্ধারণ করে না দিলে সুদহার আরও বাড়ত বলে সংশ্নিষ্টদের ধারণা।

ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন এবিবির চেয়ারম্যান ও ঢাকা ব্যাংকের এমডি সৈয়দ মাহবুবুর রহমান সমকালকে বলেন, নির্বাচনের আগে প্রার্থীরা টাকা খরচ করেন। প্রার্থীর পক্ষেও অনেকে টাকা তোলেন। এতে করে গত কয়েকদিনে ব্যাংকগুলো থেকে টাকা উত্তোলনের প্রবণতা বেড়েছে।

প্রাপ্ত তথ্য মতে, ২৪ ডিসেম্বর সোমবার আন্তঃব্যাংকে কলমানিতে ৫ হাজার ২৭৬ কোটি টাকা লেনদেন হয়। এর আগে ১৭ ডিসেম্বর থেকে ২৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত ৬ কর্মদিবসে কয়েকটি ব্যাংক নিয়েছে ৪০ হাজার ৫৯৪ কোটি টাকা। প্রতিদিন গড়ে ৬ হাজার ৭৬৬ কোটি টাকার ধার নিয়েছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গতকাল দুপুর পর্যন্ত কয়েকটি ব্যাংক কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ৪০০ কোটি টাকা ধার নিয়েছে। আর গত ১৭ ডিসেম্বর থেকে ৬ কর্মদিবসে নিয়েছে পাঁচ হাজার ৭৮৬ কোটি টাকা। রেপো, বিশেষ রেপো এবং তারল্য সহায়তা হিসেবে এসব অর্থ নেয় ব্যাংকগুলো। ব্যাংকগুলোর বিভিন্ন ধরনের সিকিউরিটিজ বন্ধক রেখে ৬ থেকে ৯ শতাংশ সুদে এসব অর্থ দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

বেসরকারি অন্য একটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সমকালকে বলেন, নির্বাচনের পাশাপাশি এবার বছরের শেষ চার দিন ব্যাংক লেনদেন বন্ধ থাকায় অনেকেই টাকা তুলে ঘরে রাখতে পারেন। অল্প কিছুদিনের মধ্যে বিপুল অঙ্কের অর্থ তুলে নেওয়ায় কিছুটা চাপ পড়েছে ব্যাংকগুলোতে। চাপ সামলাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও কলমানিতে ধরনা দিতে হচ্ছে। তবে নির্বাচন শেষে ধীরে ধীরে এসব টাকা আবার ব্যাংকে আসবে বলে তিনি মনে করেন।

সংশ্লিষ্ট খবর

পরের
খবর

ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের শাস্তি চান ব্যাংকের এমডিরা


আরও খবর

ব্যাংক-বীমা

বাংলাদেশ ব্যাংকে বৈঠক

ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের শাস্তি চান ব্যাংকের এমডিরা

প্রকাশ : ১৯ ডিসেম্বর ২০১৮

  সমকাল প্রতিবেদক

ব্যাংক খাতে বর্তমানে সাড়ে ১১ শতাংশ খেলাপি ঋণকে উচ্চ মাত্রার উল্লেখ করে তা কমাতে বলেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে ব্যাংকাররা বলেছেন, তারাও চান খেলাপি ঋণ কমাতে। তবে ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের কারণে তা সম্ভব হচ্ছে না। দৃষ্টান্তমূলক কিছু শাস্তি নিশ্চিত করা গেলে খেলাপি ঋণ আদায় জোরদার হবে। বুধবার অনুষ্ঠিত ব্যাংকার্স সভায় এমন আলোচনা হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সভাকক্ষে গভর্নর ফজলে কবিরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে অধিকাংশ ব্যাংকের এমডি ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে খেলাপি ঋণ কমানো ছাড়াও ব্যাংক খাত ও অর্থনীতির বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয়। ব্যাংকাররা বেসরকারি খাতে বিদেশি ঋণের সুদহারে ৬ শতাংশের সীমা বাড়ানো এবং ডলার দরে সীমা আরোপ পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনার দাবি জানালে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাতে সায় দেয়নি।

সভায় ব্যাংকারেরা জানান, ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের থেকে ঋণ আদায়ের উদ্যোগ নিলেই তারা উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হন। বছরের পর বছর কোনো টাকা পরিশোধ করছেন না, অথচ তাদের খেলাপি হিসেবে দেখানো যাচ্ছে না। এবারের নির্বাচনেও বড় বড় ঋণখেলাপি ব্যাংকের টাকা পরিশোধ না করেও পার পেয়ে গেছেন। পরিস্থিতির উন্নয়নে আইনি সংস্কার দরকার। ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের দৃষ্টান্তমূলক কিছু শাস্তি নিশ্চিত করা গেলে অন্যরা সতর্ক হবে। আইনি সংস্কারের জন্য আইন কমিশনের সঙ্গে আলোচনার উদ্যোগে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সহায়তা করবে বলে বৈঠকে জানানো হয়।

বৈঠক শেষে ব্যাংকগুলোর প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান ও ঢাকা ব্যাংকের এমডি সৈয়দ মাহবুবুর রহমান সাংবাদিকদের জানান, বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, ১১ শতাংশের বেশি খেলাপি ঋণ অনেক উচ্চমাত্রার। খেলাপি ঋণ কমাতে আদায় জোরদারের পাশাপাশি প্রকৃত সমস্যার কারণে কেউ খেলাপি হলে প্রয়োজনে পুনঃতফসিল করতে বলা হয়েছে। 

তিনি বলেন, ব্যাংকগুলোও চায় খেলাপি ঋণ কমাতে। এজন্য ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের আইনের আওতায় আনতে শক্ত আইনি ব্যবস্থা দরকার। দৃষ্টান্তমূলক কিছু শাস্তি হলে সহজে খেলাপি ঋণ আদায় হবে। আইনি সহায়তার ক্ষেত্রে আইন কমিশনের সঙ্গে আলোচনা করা হবে। সৈয়দ মাহবুবুর রহমান জানান, সামগ্রিকভাবে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের বিপরীতে প্রভিশন ঘাটতি নেই। যেসব ব্যাংকের ঘাটতি রয়েছে, শিগগিরই তাদের অনেকে মেটাতে পারবে। এরপরও যেসব ব্যাংকের সমস্যা থাকবে, তা কীভাবে মেটানো যায়, কেন্দ্রীয় ব্যাংক দেখবে।

তিনি জানান, নগদ লেনদেন কমাতে কার্ডভিত্তিক লেনদেন বাড়ানোর ওপর বৈঠকে বাংলাদেশ ব্যাংক গুরুত্ব আরোপ করেছে। ব্যাংকের জামানতি সম্পত্তির ডাটাবেজ করার উদ্যোগ নিয়েও আলোচনা হয়েছে। এক প্রশ্নের জবাবে সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, তবে নির্বাচনের আগে ঋণ বিতরণ ও নগদ অর্থের প্রবাহ নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি।

তিনি আরও বলেন, বেসরকারি খাতে সর্বোচ্চ ৬ শতাংশ সুদে বিদেশি ঋণ নেওয়া যায়। আগে যখন লন্ডন ইন্টার ব্যাংক অফার রেট (লাইবর) দশমিক ৬৭ শতাংশ ছিল, তখনও বিদেশি ঋণের সুদহারে সর্বোচ্চ সীমা ছিল ৬ শতাংশ। ব্যাংকগুলো ওই সীমা বাড়ানোর দাবি জানিয়েছে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, বৈদেশিক ঋণের সুদহার যেহেতু বাড়ছে, এখন স্থানীয় মুদ্রার ঋণ বিতরণে জোর দিতে হবে। ব্যাংকাররা বলেছেন, স্থানীয় মুদ্রায় ঋণ যথেষ্ট নয়। বৈদেশিক মুদ্রায় ঋণ লাগবেই। তিনি জানান, রফতানি ও রেমিট্যান্সে ভালো প্রবৃদ্ধি হচ্ছে। তেলের দামে নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা দিয়েছে। এতে করে বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে চাপ কমে আসছে। এখন বৈদেশিক মুদ্রার দরে সীমা আরোপের ক্ষেত্রে সরাসরি দর নির্ধারণ না করে শতাংশ বিবেচনায় সীমা আরোপ করা যায় কি-না, তার অনুরোধ জানানো হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য মতে, গত সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৯৯ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা হয়েছে। মোট ঋণের যা ১১ দশমিক ৪৫ শতাংশ। এই খেলাপি ঋণের মধ্যে তিন মাসে বেড়েছে ১০ হাজার ৩০ কোটি টাকা। আর চলতি বছরের নয় মাসে বেড়েছে ২৫ হাজার ৬৭ কোটি টাকা। ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণের মধ্যে শুধু রাষ্ট্রীয় মালিকানার বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে রয়েছে ৪৮ হাজার ৮০ কোটি টাকা। বিশেষায়িত দুই ব্যাংকে রয়েছে পাঁচ হাজার ২৪১ কোটি টাকা। বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে ৪৩ হাজার ৬৬৬ কোটি টাকা ও বিদেশি ব্যাংকে রয়েছে দুই হাজার ৩৮৩ কোটি টাকা।

পরের
খবর

এবার ব্যাংক ক্লোজিং ২৭ ডিসেম্বর


আরও খবর

ব্যাংক-বীমা

ফাইল ছবি

  সমকাল প্রতিবেদক

নির্বাচনের কারণে এবার ব্যাংকের বার্ষিক হিসাব ক্লোজিং হবে ২৭ ডিসেম্বর। তবে যথারীতি ৩১ ডিসেম্বর ব্যাংক হলিডে পালিত হবে।

ব্যাংক হলিডের দিন ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়সহ গুরুত্বপূর্ণ সব শাখা খোলা থাকলেও ওই দিন লেনদেন হয় না। ফলে সাপ্তাহিক ছুটি, ভোট ও ব্যাংক হলিডের কারণে ২৮ ডিসেম্বর থেকে টানা চারদিন স্বাভাবি ব্যাংকিং লেনদেন কার্যক্রম বন্ধ থাকবে।

তবে এ সময়ের মধ্যে ইন্টারনেট ব্যাংকিং এবং ব্যাংকগুলোর এটিএম বুথ থেকে লেনদেন করা যাবে।

ব্যাংক ক্লোজিং বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে মঙ্গলবার একটি সার্কুলার জারি করে ব্যাংকগুলোর প্রধান নির্বাহীদের কাছে পাঠানো হয়েছে।

এতে বলা হয়, ৩০ ডিসেম্বর জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এর পরিপ্রেক্ষিতে সকল তফসিলি ব্যাংকের চলতি বছরের বার্ষিক হিসাব ক্লোজিং আগামী ২৭ ডিসেম্বর বৃহস্পতিবার নির্ধারণ করা হলো। ৩১ ডিসেম্বর যথারীতি ব্যাংক হলিডে অপরিবর্তিত থাকবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক মো. সিরাজুল ইসলাম সমকালকে বলেন, ২৭ ডিসেম্বরের পরের দু'দিন শুক্র ও শনিবার সাপ্তাহীক ছুটি। আর ৩০ ডিসেম্বর রোববার নির্বাচনের কারণে ব্যাংক বন্ধ থাকবে। যে কারণে ব্যাংক ক্লোজিং ২৭ ডিসেম্বর নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে এটিএম বুথ, অনলাইন ব্যাংকিংয়ে লেনদেন করা যাবে। ফলে গ্রাহকদের কোনো সমস্যা হবে না।


সংশ্লিষ্ট খবর