ব্যাংক-বীমা

জনতা ব্যাংকের দুই পরিচালক প্রত্যাহার

প্রকাশ : ০৫ অক্টোবর ২০১৮ | প্রিন্ট সংস্করণ

জনতা ব্যাংকের দুই পরিচালক প্রত্যাহার

  ওবায়দুল্লাহ রনি

জালিয়াতি করে ক্রিসেন্ট গ্রুপ ও এননটেক্সকে প্রায় সাড়ে আট হাজার কোটি টাকা ঋণ দেওয়া নিয়ে ব্যাপক আলোচনার মধ্যে জনতা ব্যাংকের দুই পরিচালককে সরিয়ে দিল সরকার। মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার আগেই সম্প্রতি তাদের প্রত্যাহার করা হলো। তারা হলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক মো. আবদুল হক এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মানিক চন্দ্র দে। বাংলাদেশ ব্যাংক ও জনতা ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের পরামর্শে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে জানা গেছে।

জানা গেছে, দুই পরিচালককে প্রত্যাহার বিষয়ে জনতা ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ বরাবর বুধবার চিঠি দেয় আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। ওই দিন জনতা ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়। এরপর গতকাল বৃহস্পতিবার দুই পরিচালককে প্রত্যাহার বিষয়ে অনাপত্তি চেয়ে ব্যাংকের পক্ষ থেকে চিঠি এলে তাতে সায় দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। এরপর গতকাল জনতা ব্যাংকের ওয়েবসাইট থেকে এ দু'জনের নাম সরিয়ে ফেলা হয়। জনতা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ ১৩ পরিচালক পদের মধ্যে বর্তমানে আটজন পরিচালক আছেন। শূন্য হলো পাঁচটি পদ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. সিরাজুল ইসলাম সমকালকে বলেন, জনতা ব্যাংকের দুই পরিচালককে সরকার প্রত্যাহার করেছে। তাতে বাংলাদেশ ব্যাংক অনাপত্তি দিয়েছে।

বাদ দেওয়া দুই পরিচালকের মধ্যে মো. আবদুল হক তিন বছর মেয়াদে জনতা ব্যাংকের পরিচালক হিসেবে যোগদান করেন গত বছরের ১১ জুলাই। ২০২০ সালের ১০ জুলাই পর্যন্ত তার মেয়াদ ছিল। আরেক পরিচালক মানিক চন্দ্র দে ২০১৫ সালের ৩০ জুন তিন বছর মেয়াদে পরিচালক হিসেবে যোগদান করেন। আগামী ২৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত তার মেয়াদ ছিল। জনতা ব্যাংকের বর্তমান চেয়ারম্যান লুনা শামসুদ্দোহা এবং সাবেক চেয়ারম্যান শেখ মো. ওয়াহিদ-উজ-জামানের মধ্যবর্তী সময়ে মানিক চন্দ্র দে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। আইটি খাতের দোহাটেক নিউ মিডিয়ার চেয়ারম্যান লুনা শামসুদ্দোহা গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে জনতা ব্যাংকের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছেন। এর আগে গত ৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত তিন বছর জনতা ব্যাংকের চেয়ারম্যানের দায়িত্বে ছিলেন প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য সচিব শেখ মো. ওয়াহিদ-উজ-জামান।

ঋণ জালিয়াতির কারণে এখন ব্যাংক খাতে আলোচিত জনতা ব্যাংক। বিভিন্ন পক্ষের যোগসাজশে ক্রিসেন্ট গ্রুপ ও এননটেক্স নামের দুই প্রতিষ্ঠানকে সাড়ে আট হাজার কোটি টাকার ঋণ দিয়ে আটকে গেছে ব্যাংকটি। এসব ঋণ আদায় না হওয়ায় ব্যাংকটির মোট খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে নয় হাজার ৮৭৯ কোটি টাকা। অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ব্যাংকটির নিট লোকসান হয়েছে এক হাজার ৫৮৯ কোটি টাকা। জুন শেষে মূলধন ঘাটতি দেখা দিয়েছে দুই হাজার ১৯৫ কোটি টাকা। ক্রিসেন্ট গ্রুপের এক হাজার ৫৭১ কোটি টাকার ঋণ খেলাপি ধরে জুনের হিসাব প্রকাশিত হয়। তবে এরই মধ্যে ক্রিসেন্ট গ্রুপের পাঁচ প্রতিষ্ঠানের তিন হাজার ৪৪৬ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ আদায়ের জন্য নিলাম ডেকেছে জনতা ব্যাংক। এননটেক্সকে দেওয়া সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকা ঋণের একটি অংশও খেলাপিতে পরিণত হয়েছে। ফলে সেপ্টেম্বরের হিসাব চূড়ান্ত হলে জনতার মোট খেলাপি ঋণ প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকায় ঠেকবে বলে সংশ্নিষ্টরা জানিয়েছেন। 


মন্তব্য যোগ করুণ

পরের
খবর

ঋণখেলাপি হয়েও ব্যাংক পরিচালক


আরও খবর

ব্যাংক-বীমা
ঋণখেলাপি হয়েও ব্যাংক পরিচালক

প্রকাশ : ১৪ নভেম্বর ২০১৮ | প্রিন্ট সংস্করণ

  ওবায়দুল্লাহ রনি

ঢাকা ব্যাংকের পরিচালক এমএনএইচ বুলু ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের মিরপুর রোড শাখার একজন ঋণখেলাপি। ইউনিয়ন ব্যাংকের পরিচালক শাহেদুল হক খেলাপি ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের গুলশান শাখার। আইন অনুযায়ী, ঋণখেলাপি কোনো ব্যক্তি ব্যাংকের পরিচালক থাকতে পারেন না। তবে তথ্য গোপন করে এ দু'জনই পরিচালক পদে বহাল আছেন। আবার বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ (বিআরপিডি) থেকে ঋণখেলাপি পরিচালকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নিয়ম থাকলেও এক্ষেত্রে তা করা হয়নি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা বিভাগের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বিষয়টি ধরা পড়ার পর প্রশ্নের মুখে পড়েছে বিআরপিডি। শুধু এ দু'জন নন, ঋণখেলাপি আরও অনেকের ব্যাংকের পরিচালক পদে বহাল থাকার ঘটনা রয়েছে।

সংশ্নিষ্টরা জানান, ব্যাংকের পরিচালকদের স্বার্থসংশ্নিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ নিয়ে খেলাপি হওয়া ছাড়াও কোনো কোনো পরিচালকের বেনামি ঋণ থাকার তথ্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিভিন্ন তদন্তে বেরিয়ে এসেছে। যোগসাজশের মাধ্যমে একে অন্যের ব্যাংক থেকে তুলনামূলক কম সুদে এবং সক্ষমতার তুলনায় বেশি ঋণ নেওয়ার ঘটনাও রয়েছে। ব্যাংকের এমডি বা কর্মকর্তারা বিষয়টি জানলেও ঋণ আদায়ে অনেক ক্ষেত্রে ভয় পান। ফলে এসব ঋণের একটি অংশ খেলাপি হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, গত বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিভিন্ন ব্যাংকের পরিচালকদের নামে এক লাখ ৪৭ হাজার ৫২৯ কোটি টাকার ঋণ রয়েছে। এর মধ্যে খেলাপি ঋণের পরিমাণ চার হাজার কোটি টাকা।

মার্কেন্টাইল ব্যাংকের পরিচালক পদে থাকা এসএ গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শাহাবুদ্দিন আলমকে গ্রেফতারের পর ঋণখেলাপি হয়েও পরিচালক পদে থাকার বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। গত ১৭ অক্টোবর গুলশানের একটি কফি হাউস থেকে শাহাবুদ্দিনকে গ্রেফতার করে সিআইডি। একাধিক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে তার মালিকানাধীন বিভিন্ন কোম্পানির ৩ হাজার ৬২২ কোটি টাকার ঋণের বেশিরভাগই এখন খেলাপি। শাহাবুদ্দিনের বিরুদ্ধে চট্টগ্রামের বিভিন্ন থানায় প্রতারণা, জালিয়াতি ও ঋণখেলাপি-সংক্রান্ত ১২০টি মামলা রয়েছে। কয়েক মাস আগে জাতীয় সংসদে প্রকাশিত শীর্ষ ঋণখেলাপির তালিকায়ও তার নাম ছিল। এ রকম আরও অনেকে খেলাপি হয়েও ব্যাংকের পরিচালক পদে বহাল আছেন।

ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী, কোনো ঋণখেলাপি ব্যক্তি ব্যাংকের পরিচালক থাকতে পারেন না। তবে উচ্চ আদালত থেকে স্থগিতাদেশ নিয়ে অনেকেই পরিচালক পদে বহাল রয়েছেন। আবার অনেক পরিচালক আদালতের নির্দেশে খেলাপি ঋণ নিয়মিত দেখানোর সুযোগ পাচ্ছেন। তবে ইউসিবিএলের মিরপুর শাখায় এমএনএইচ বুলুর ৫৮ কোটি টাকা এবং ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের গুলশান শাখায় শাহেদুল হকের ৬১ কোটি ৫ লাখ টাকার খেলাপি ঋণের তথ্য এসবের বাইরে ছিল। সংশ্নিষ্ট ব্যাংক এ তথ্য গোপন করে তাদের পরিচালক থাকার সুযোগ করে দিয়েছে। যদিও ইউসিবিএলের মিরপুর রোড ছাড়াও প্রিন্সিপাল, গুলশান, বসুন্ধরা, তেজগাঁও, পান্থপথ ও বনানী শাখায় বুলুর মালিকানাধীন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অন্তত ৩৫০ কোটি টাকার ঋণখেলাপি রয়েছে। তবে এসব খেলাপি ঋণের বিপরীতে আদালত থেকে স্থগিতাদেশ নেওয়া থাকলেও মিরপুর রোড শাখার ক্ষেত্রে তা ছিল না। এমএনএইচ বুলু বিএনএস গ্রুপের কর্ণধার। ১০৯ কোটি টাকার সম্পদের তথ্য গোপন এবং প্রায় ২৫ কোটি টাকা জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে গত ৭ অক্টোবর তার বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুদক।

সূত্র জানায়, বুলু ও শাহেদুল হকের বিষয়ে গত ২ অক্টোবর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা বিভাগ থেকে বিআরপিডিতে একটি চিঠি দেওয়া হয়। বিআরপিডির মহাব্যবস্থাপক বরাবর লেখা চিঠিতে বলা হয়, ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী কোনো ঋণখেলাপি ব্যক্তি ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পরিচালক থাকলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। তবে ওই দুই ব্যক্তি ঋণখেলাপি হওয়ার পরও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বুলুর তথ্য গোপনের বিষয়টি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ব্যাংক পরিদর্শন বিভাগের ২০১৭ সালের ডিসেম্বর-ভিত্তিক পরিদর্শন প্রতিবেদনে ধরা পড়ে। আর শাহেদুল হকের খেলাপির তথ্য উঠে এসেছে ২০১৬ সালের ডিসেম্বর-ভিত্তিক পরিদর্শন প্রতিবেদনে। এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়ায় এখন ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগের বক্তব্য চাওয়া হয়েছে।

জানতে চাইলে এমএনএইচ বুলু সমকালকে বলেন, নানান ঝামেলার কারণে সময়মতো ঋণ পরিশোধ করতে পারেননি। এজন্য কয়েক মাস ঢাকা ব্যাংকের পর্ষদ থেকে পদত্যাগ করেছেন। ঢাকা ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ তার পদত্যাগপত্র গ্রহণ করে এরই মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠিয়েছে। ২০১৭ সালে ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের মিরপুর রোড শাখার ঘটনা উল্লেখ করলে তিনি বলেন, তখন পরিচালক ছিলাম। তবে এ বিষয়ে উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ ছিল। যদিও ঢাকা ব্যাংকের ওয়েবসাইটে এখনও পরিচালক হিসেবে এমএনএইচ বুলুর নাম রয়েছে।

ঋণখেলাপির দায়ে সম্প্রতি নতুন প্রজন্মের সাউথ বাংলা এগ্রিকালচার অ্যান্ড কমার্স ব্যাংকের দুই পরিচালককে অনাপত্তি দেয়নি কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এদের মধ্যে এগ্রোভিটা গ্রুপের কর্ণধার এম মোয়াজ্জেম হোসেন সম্প্রতি আদালতের স্থগিতাদেশ নিয়ে পরিচালক পদে বহাল হয়েছেন। আর রতনপুর গ্রুপের কর্ণধার মাকসুদুর রহমান পরিচালক পদ ফিরে পেতে নানা উপায়ে চেষ্টা করছেন। মাকসুদুর রহমান সম্প্রতি গ্রেফতার হওয়া শাহাবুদ্দিন আলমের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত। সাউথ বাংলা ব্যাংক থেকে ২৫ কোটি টাকার বেনামি ঋণ নিয়ে আর ফেরত না দেওয়ায় পরিচালক পদ হারিয়েছেন তিনি। এর বাইরে বিভিন্ন ব্যাংকে তার বিপুল অঙ্কের ঋণ রয়েছে। ২০১৫ সালে তিন ব্যাংকে তিনি ৮১২ কোটি টাকার ঋণ পুনর্গঠন করেন। এসব ঋণের বড় অংশই এখন খেলাপি। এ ছাড়া ব্যাংকটির আরেক পরিচালক সান মুন গ্রুপের চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান আদালত থেকে স্থগিতাদেশ নিয়ে পরিচালক পদে বহাল আছেন। এ রকম আরও অনেক পরিচালক কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনার বিরুদ্ধে স্থগিতাদেশ নিয়ে বহাল আছেন। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বা সংশ্নিষ্ট ব্যাংক থেকে এসব ক্ষেত্রে পাল্টা আইনি ব্যবস্থা নিতে দেখা যায় না।

বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, যে কোনো শাখায় ঋণখেলাপি হওয়ার পর তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। এ দু'জনের ক্ষেত্রে কেন ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি সংশ্নিষ্ট বিভাগের জবাব পাওয়ার পর বোঝা যাবে। তিনি আরও বলেন, ঋণখেলাপিরা বড় আইনজীবীর মাধ্যমে পদক্ষেপ নেন। আরেকজন আইনজীবীর মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ব্যাংক পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়াটা অনেক ব্যয়বহুল। যে কারণে স্থগিতাদেশের পর সবসময় আদালতে যাওয়া সম্ভব হয় না।

জানতে চাইলে ব্যাংক মালিকদের সংগঠন বিএবির চেয়ারম্যান ও বেসরকারি এক্সিম ব্যাংকের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদার সমকালকে বলেন, ঋণখেলাপি হলে আইন অনুযায়ী এমনিতেই পরিচালক পদ চলে যায়। এখন খেলাপি হয়েও কেউ যদি আদালত থেকে স্থগিতাদেশ নেন, এক্ষেত্রে নির্দেশনা বাস্তবায়ন করা ছাড়া ব্যাংকের কিছু করার থাকে না।

পরের
খবর

সাত কোম্পানির শেয়ার নিয়ে কারসাজির অভিযোগ


আরও খবর

ব্যাংক-বীমা
সাত কোম্পানির শেয়ার নিয়ে কারসাজির অভিযোগ

অভিযুক্ত কমার্স ব্যাংক ব্রোকারেজ হাউসকে আগামীকাল শুনানিতে ডেকেছে বিএসইসি

প্রকাশ : ১১ নভেম্বর ২০১৮ | প্রিন্ট সংস্করণ

  আনোয়ার ইব্রাহীম

বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের মালিকানাধীন ব্রোকারেজ হাউস কমার্স ব্যাংক সিকিউরিটিজের বিরুদ্ধে তালিকাভুক্ত সাত কোম্পানির শেয়ার নিয়ে কারসাজির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ এনেছে শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি। এ বিষয়ে ব্রোকারেজ হাউসটিকে কারণ দর্শানোর পাশাপাশি আগামীকাল সোমবার নিয়ন্ত্রক সংস্থার কার্যালয়ে শুনানিতে হাজির হতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সংশ্নিষ্ট সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

বেসরকারি ব্যাংকটির ব্রোকারেজ হাউসটির বিরুদ্ধে তালিকাভুক্ত মুন্নু স্ট্যাফেলার্স, মুন্নু সিরামিক, লিগ্যাসি ফুটওয়্যার, বিডি অটোকার, কুইন সাউথ টেক্সটাইল, আলিফ ইন্ডাস্ট্রিজ এবং ইস্টার্ন লুব্রিকেন্টস কোম্পানির শেয়ার নিয়ে কারসাজি করার অভিযোগ আনা হয়েছে। গত দেড় বছরে দেশের শেয়ারবাজারে যেসব শেয়ার নিয়ে বড় ধরনের কারসাজি হয়েছে, এসব শেয়ার তার শীর্ষে। এর কোনোটির বাজারদর এক সপ্তাহ বা এক মাসেই দ্বিগুণ ও তিন গুণ হয়েছে। আবার এক বছরে এর কোনোটির বাজারদর ১০ গুণ ছাড়িয়েছে। পাওয়া গেছে মালিকপক্ষের সংশ্নিষ্টতা। এ অবস্থায় প্রভাবশালী একটি মহল তা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টায় তৎপর বলে জানা গেছে।

তবে ব্রোকারেজ হাউসটির চেয়ারম্যান বখতিয়ার আহমেদ অবশ্য তার প্রতিষ্ঠান বা নিজের এসব কারসাজিতে জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। জানতে চাইলে কমার্স ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ সংশ্নিষ্ট সবাই সমকালের কাছে একই দাবি করেছেন।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের জুন থেকে উল্লিখিত শেয়ারগুলো নিয়ে কারসাজি শুরু হয়, যা এখনও চলছে। ব্রোকারেজ হাউসটিসহ এর কয়েকজন গ্রাহক এবং সংশ্নিষ্ট কর্মকর্তারা সরাসরি জড়িত ছিলেন বলেও অভিযোগ আছে। উল্লিখিত কোম্পানিগুলোর শেয়ারদরের অস্বাভাবিক উল্লম্ম্ফনের প্রেক্ষাপটে বিএসইসি তদন্ত করে এমন তথ্য পেয়েছে। তদন্তে শেয়ারবাজার সংক্রান্ত বেশ কয়েকটি আইন লঙ্ঘনের প্রমাণসহ নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে প্রতিবেদন দিয়েছে তদন্ত কমিটি। প্রতিবেদন আমলে নিয়ে আইন অনুযায়ী শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে সংশ্নিষ্ট বিভাগকে নির্দেশ দিয়েছে বিএসইসি। এ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে ব্রোকারেজ হাউসটিকে শুনানিতে ডাকা হয়েছে।

তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে- তালিকাভুক্ত মুন্নু সিরামিক, লিগ্যাসি ফুটওয়্যার, বিডি অটোকার, কুইন সাউথ টেক্সটাইল এবং আলিফ ইন্ডাস্ট্রিজের শেয়ার কারসাজিতে শীর্ষ ভূমিকায় ছিল ব্রোকারেজটি। মুন্নু স্ট্যাফেলার্সের শেয়ার কারসাজি ব্রোকারেজ হাউসটির অবস্থান দ্বিতীয় এবং ইস্টার্ন ল্যুব্রিকেন্টসের শেয়ার কারসাজিতে অবস্থান চতুর্থ।

নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসির তদন্ত কমিটি কারসাজি হওয়া সাত কোম্পানির ক্ষেত্রে অস্বাভাবিক দর বৃদ্ধি ও লেনদেন হওয়া ভিন্ন ভিন্ন সময়ের লেনদেন পরীক্ষা করেছে। কমিটির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, তদন্তকালে কোনো কোনো দিন কমার্স ব্যাংক সিকিউরিটিজ থেকে সংশ্নিষ্ট কোম্পানির লেনদেন হওয়া মোট শেয়ারের ২০ থেকে ৫৮ শতাংশ পর্যন্ত কেনা হয়েছিল।

এ বিষয়ে তদন্ত কমিটি তাদের পর্যবেক্ষণে জানিয়েছে, ব্রোকারেজ হাউসটি থেকে বড় অঙ্কের শেয়ার ক্রয়সংশ্নিষ্ট কোম্পানিগুলোর শেয়ার লেনদেনে একচ্ছত্র প্রাধান্য বিস্তার করে, যা এসব শেয়ারের বাজারদরকে প্রভাবিত করে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে গ্রাহকদের (বিনিয়োগকারী) অ্যাকাউন্ট থেকে শেয়ার কেনাবেচা হলেও ব্রোকারেজ হাউসটির সম্পৃক্ততা ছাড়া এমন শেয়ার কেনাবেচা সম্ভব ছিল না।

তদন্ত কমিটি অভিযোগ এনেছে, কমার্স ব্যাংক সিকিউরিটিজ তার নিজের স্বার্থে গ্রাহকদের কারসাজিমূলক শেয়ার কেনাবেচার সুযোগ করে দেয় এবং কৃত্রিম বাজার সৃষ্টিতে সহায়তা করে। ব্রোকারেজ হাউসটি এসব ঘটনায় সম্পৃক্ত না থাকলে আইন অনুযায়ী তার গ্রাহকদের সন্দেহমূলক কারসাজির বিষয় অবহিত করত, যা হাউসটি করেনি।

সহযোগী প্রতিষ্ঠানের কারসাজি বিষয়ে জানতে চাইলে কমার্স ব্যাংকের চেয়ারম্যান ড. ইঞ্জিনিয়ার রশিদ আহমেদ চৌধুরী জানান, ব্যাংকের সুনাম নষ্ট হয়, এমন কোনো বিষয় তিনি অনুমোদন করবেন না। এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে সংশ্নিষ্টদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (চলতি দায়িত্ব) জাফর আলম বলেন, আমরা মনে করে করি, যেসব অভিযোগ আনা হয়েছে, তা ঠিক নয়। তবে ভবিষ্যতে এমন অভিযোগ যাতে না আসে সে বিষয়ে সতর্ক থাকব। নিজেদের ব্রোকারেজ হাউসে বিও অ্যাকাউন্ট খুলে শেয়ার কেনাবেচার অভিযোগ পাওয়ায় সব কর্মকর্তা-কর্মচারীকে এ ধরনের অ্যাকাউন্ট বন্ধ করা এবং ভবিষ্যতে না খোলার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।

নিয়ন্ত্রক সংস্থার ডাকা শুনানিতে আগামীকাল কমিশন ভবনে যাবেন বলে নিশ্চিত করেছেন ব্রোকারেজ হাউসটির সিইও এমএ মোতালেব চৌধুরী। এ বিষয়ে অন্য কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান তিনি।

মুন্নু স্ট্যাফেলার্স ও মুন্নু সিরামিক : গত এক বছরে যেসব কোম্পানির শেয়ার নিয়ে বড় ধরনের কারসাজি হয়েছে, তার শীর্ষে আছে মুন্নু গ্রুপের মুন্নু স্ট্যাফেলার্স ও মুন্নু সিরামিক। এক্ষেত্রে কোম্পানি দুটির একাধিক কর্মকর্তার সম্পৃক্ততার অভিযোগ মিলেছে। জানা গেছে, মুন্নু গ্রুপের একাধিক পদস্থ কর্মকর্তা কমার্স ব্যাংক সিকিউরিটিজ থেকে শেয়ার কেনাবেচা করেন। এদের মাধ্যমে অপ্রকাশিত মূল্য সংবেদনশীল তথ্য (ইনসাইড ইনফরমেশন) পেয়ে তা ব্যবহার করেছে হাউসটি এবং তার কয়েকজন বড় গ্রাহক।

মুন্নু সিরামিকের শেয়ার কারসাজি শুরু হয় গত বছরের আগস্ট থেকে। গত বছর ১৩ আগস্ট শেয়ারটি ৪১ টাকায় কেনাবেচা হয়। এর মাত্র তিন সপ্তাহ পর ৬ সেপ্টেম্বর শেয়ারটির দর প্রায় তিন গুণ হয়ে ১১২ টাকা ছাড়ায়। এ ক্ষেত্রে কারসাজির অভিযোগে সমকালে প্রতিবেদন প্রকাশের দিনেই তদন্ত কমিটি গঠন করে বিএসইসি। তদন্ত কমিটি ওই সময়ের লেনদেন পরীক্ষা করে কমার্স ব্যাংকের সম্পৃক্ততার প্রমাণ পায়। অবশ্য এর পরও শেয়ারটির দর বাড়ে। এক বছরেরও কম সময়ের ব্যবধানে গত জুলাই মাসে শেয়ারটি দর প্রায় ১০ গুণ বেড়ে রেকর্ড দর ৩৯৮ টাকায় উঠেছিল।

কমিটি দেখেছে, তদন্তকালীন তিন সপ্তাহের মধ্যে দেশের শেয়ারবাজারের তিন শতাধিক ব্রোকারেজ হাউসের মধ্যে মুন্নু সিরামিকের শেয়ার কেনাবেচায় কমার্স ব্যাংক সিকিউরিটিজ ছিল শীর্ষে। এ সময়ে যত শেয়ার কেনাবেচা হয়েছে, তার সাড়ে ১০ শতাংশেরও বেশি ছিল এ ব্রোকারেজ হাউসটির।

মুন্নু সিরামিকের আগেই মুন্নু স্ট্যাফেলার্স কোম্পানির শেয়ার কারসাজি শুরু হয়েছিল। গত বছরের জুলাইয়ের শুরুতে শেয়ারটির দর ছিল ৫০০ টাকা। এক বছরের ব্যবধানে গত আগস্টে দর ৪ হাজার ৬০০ টাকা ছাড়ায়। তবে কমিশন গত ১ এপ্রিল থেকে ২১ জুন পর্যন্ত সময়ের লেনদেন পরীক্ষা করে। এই সময়ে শেয়ারটির দর ৮০০ টাকা থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকায় উন্নীত হয়েছিল। এ সময় ডিএসইতে যত শেয়ার কেনাবেচা হয়, তার সাড়ে ১০ শতাংশ হয়েছে কমার্স ব্যাংক সিকিউরিটিজ থেকে।

লিগ্যাসি ফুটওয়্যার : প্রায় বন্ধ কোম্পানি লিগ্যাসি ফুটওয়্যারের শেয়ার কারসাজি শুরু হয় গত বছরের জুলাই থেকে। ওই সময় শেয়ারটির দর ছিল ২৫ টাকা। পরের মাত্র দুই মাসে শেয়ারটির দর দ্বিগুণের বেশি বেড়ে ৫৮ টাকা ছাড়ায়। দ্বিতীয় দফায় এর কারসাজি শুরু হয় গত এপ্রিলের শেষ সপ্তাহ থেকে। এ সময় শেয়ারটি ৫৩ টাকায় কেনাবেচা হয়েছে। এর সাড়ে তিন মাস পর গত ১২ আগস্ট শেয়ারটির দর রেকর্ড ২৮০ টাকায় উন্নীত হয়। এ সময়ে এ রুগ্‌ণ কোম্পানিটির শেয়ারদর সোয়া ৫ গুণ বেড়েছে।

বিডি অটোকার : চলতি বছর যে ক'টি শেয়ার নিয়ে বড় ধরনের কারসাজি হয়েছে তার শীর্ষে আছে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন কোম্পানি বিডি অটোকার। স্বল্প মূলধনী এ কোম্পানির ব্যবসা ঢাকার তেজগাঁওস্থ একটি পেট্রোল পাম্পে সীমাবদ্ধ। কোম্পানিটির শেয়ারদরে বড় উল্লম্ম্ফন হয় গত বছরের মে থেকে আগস্টের মধ্যে। ওই সময় শেয়ারটির দর ৬৩ টাকা থেকে ১৪০ টাকা হয়েছিল।

তবে এ কোম্পানির ইতিহাসে সবচেয়ে বড় কারসাজি হয়েছে গত জুন মাসে। মাত্র এক মাসের ব্যবধানে শেয়ারটির দর ১১৯ টাকা থেকে চার গুণ বেড়ে ৪৯০ টাকায় উন্নীত হয়। তবে তদন্ত কমিটি গত ২৮ মে থেকে ১৯ জুন পর্যন্ত সময়ের শেয়ার লেনদেন পরীক্ষা করেছে। এ সময় বিডি অটোকারের ৩৯ লাখ ১১ হাজার শেয়ার কেনাবেচা হয়। উল্লিখিত সময়ে বিক্রি হওয়া শেয়ারের প্রায় ৪১ শতাংশই একা কমার্স ব্যাংক সিকিউরিটিজ থেকে কেনা হয়েছে।

কুইন সাউথ : গত বছরের মার্চে তালিকাভুক্ত হয় বস্ত্র খাতের কোম্পানি কুইন সাউথ টেক্সটাইল। লেনদেন শুরুর দুই সপ্তাহ পরই শেয়ারটির দর নিয়ে কারসাজি হয়। নতুন এ শেয়ারের কারসাজির মূলে ছিল কমার্স ব্যাংক সিকিউরিটিজ। এপ্রিলের মাঝামাঝি থেকে পরের তিন মাসে শেয়ারটির দর ২৭ টাকা থেকে ৬৯ টাকা ছাড়িয়েছিল। কিন্তু কমিশন গত ১১ এপ্রিল থেকে ৭ মে পর্যন্ত সময়ের লেনদেন পরীক্ষা করেছে। এ সময় শেয়ারটির দর ২৭ টাকা থেকে ৫০ টাকায় ওঠে। এ সময়ে কেনাবেচা হওয়া ২ কোটি ৭৯ লাখ শেয়ারের মধ্যে একা কমার্স ব্যাংক সিকিউরিটিজই এর প্রায় ২০ শতাংশ কেনে।

আলিফ ইন্ডাস্ট্রিজ : এ কোম্পানির কারসাজি খতিয়ে দেখতে কমিশনের তদন্ত কমিটি চলতি বছরের ২৯ মে থেকে ৩ জুন পর্যন্ত সময়ের লেনদেন পরীক্ষা করে। এই চার দিনে শেয়ারটির দর ৮৫ টাকা থেকে ৩০ শতাংশ বেড়ে ১১১ টাকা হয়। এ ছাড়া কেনাবেচা হয় ৮৪ লাখ ৭০ হাজার শেয়ার। তদন্ত কমিটি দেখেছে, এ সময়ের লেনদেন হওয়া শেয়ারের প্রায় ২৩ শতাংশই কমার্স ব্যাংক সিকিউরিটিজ থেকে কেনা হয়েছে।

ইস্টার্ন ল্যুব্রিকেন্টস : এ ছাড়া রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ইস্টার্ন ল্যুব্রিকেন্টস কোম্পানির শেয়ার কারসাজিতেও কমার্স ব্যাংক সিকিউরিটিজের সম্পৃক্ততার তথ্য পেয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা। গত এপ্রিলের লেনদেন পরীক্ষা করে কমিশন দেখেছে, এ সময়ে শেয়ারটির দর বাড়াতে ব্রোকারেজ হাউসটি থেকে সিরিজ লেনদেন হয়েছে। এমনকি গ্রাহকদের মার্জিন ঋণের সীমা লঙ্ঘন করে এক টাকার বিপরীতে সাত টাকা পর্যন্ত ঋণ দেওয়া হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট খবর

পরের
খবর

আমানতের যথার্থ ব্যবহার করছে না গ্রামীণ ব্যাংক


আরও খবর

ব্যাংক-বীমা
আমানতের যথার্থ ব্যবহার করছে না গ্রামীণ ব্যাংক

বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশদ পরিদর্শন

প্রকাশ : ০৬ নভেম্বর ২০১৮ | প্রিন্ট সংস্করণ

  শেখ আবদুল্লাহ

ক্ষুদ্রঋণের মাধ্যমে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের হতদরিদ্রদের জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল গ্রামীণ ব্যাংক। প্রতিষ্ঠার পর থেকে দীর্ঘদিন ব্যাংকটি সে লক্ষ্য অনুযায়ী দরিদ্রদের অর্থায়ন করে আসছিল। দারিদ্র্য বিমোচনে বড় ভূমিকা পালন করে আসছিল ব্যাংকটি। কিন্তু কয়েক বছর ধরে দেখা  যাচ্ছে ব্যাংকটির মোট অর্থের একটি বড় অংশ গ্রাহকদের মাঝে ঋণ হিসেবে বিতরণ না করে সহজে মুনাফা করার লক্ষ্যে বিভিন্ন বাণিজ্যিক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে জমা রাখা হচ্ছে। সর্বশেষ ২০১৭ সালে ব্যাংকটি প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা দরিদ্রদের ঋণ হিসেবে না দিয়ে বিভিন্ন বেসরকারি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে জমা রেখেছে। এতে ব্যাংকটির মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হচ্ছে। বঞ্চিত হচ্ছে গ্রামের দরিদ্র মানুষ। সহজ ব্যবস্থাপনা ও নিরাপদে মুনাফা বাড়ানোর জন্য ক্ষুদ্রঋণের পরিবর্তে প্রতিষ্ঠানটি লাভজনক বিনিয়োগ করছে বলে মনে করছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

গ্রামীণ ব্যাংকের ২০১৭ সালের কার্যক্রমের ওপর বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশদ পরিদর্শন প্রতিবেদনে এমন তথ্য তুলে ধরে সদস্যদের মধ্যে ঋণ বিতরণ বাড়ানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে গ্রামীণ ব্যাংকের সুশাসনেও ঘাটতি তৈরি হয়েছে বলে মনে করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। দীর্ঘদিন ধরে পূর্ণাঙ্গ পর্ষদ না থাকা, ২০১৭ সালে পর্ষদের কোনো সভা অনুষ্ঠিত না হওয়া, প্রায় সাড়ে সাত বছর ধরে ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক দিয়ে ব্যাংক পরিচালনার কারণে সুশাসনে ঘাটতি দেখা দিয়েছে বলে মনে করেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিচালকরা।

সম্প্রতি পরিদর্শন শেষ করে বাংলাদেশ ব্যাংক কিছু সুপারিশসহ প্রতিবেদনটি অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে। ২০১৬ সালের তুলনায় ২০১৭ সালে ব্যাংকটির আমানত, ঋণ বিতরণ, মুনাফার মতো খাতগুলোতে উন্নতি হয়েছে। তবে মেয়াদোত্তীর্ণ ঋণ, পুঞ্জিভূত কু-ঋণ বেড়েছে। ২০১১ সালের মে মাসে গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. মুহাম্মদ ইউনূস পদ থেকে ইস্তফা দেন। এরপর থেকে এ পর্যন্ত ব্যাংকটি চলছে ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক দিয়ে। এ ছাড়া ঋণ গ্রহীতা সদস্যদের মধ্য থেকে নির্বাচনের মাধ্যমে পরিচালনা পর্ষদের সদস্য নির্বাচনও হয়নি সময়মতো। রয়েছে বিভিন্ন ধরনের মামলা। ২০১৩ ও ২০১৪ সালে দেশব্যাপী রাজনৈতিক অস্থিরতা ছিল। ২০১৬ সালে দেশব্যাপী বড় বন্যা হয়েছে। সব মিলিয়ে এ সময়ে গ্রামীণ ব্যাংক প্রত্যন্ত অঞ্চলের দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে অর্থায়ন করা এবং পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনায় সুশাসন নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে পিছিয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সাল শেষে গ্রামীণ ব্যাংকের মোট সম্পদের ৩২ দশমিক ৭৩ শতাংশ বা ৭ হাজার ৭১৬ কোটি টাকা বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে জমা রাখা হয়েছে। ওই সময়ে ব্যাংকের মোট সম্পদের পরিমাণ ২৩ হাজার ৫৭৮ কোটি টাকা। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এতে প্রতীয়মান হয় গ্রামীণ ব্যাংক তার সংগ্রহ করা আমানতের বড় একটা অংশ আর্থসামাজিক উন্নয়নের জন্য সদস্যদের মধ্যে ঋণ হিসেবে বিতরণ না করে ব্যাংকসহ লাভজনক খাতে জমা রেখে লাভের পরিমান স্ম্ফীত করার প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। এ অবস্থা ব্যাংকটির মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত করছে। এ জন্য সদস্যদের মধ্যে ঋণ বিতরণ বাড়াতে ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষকে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

যদিও গ্রামীণ ব্যাংক দাবি করেছে, বাণিজ্যিক ব্যাংকসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে যে টাকা জমা রাখা হয়েছে, তা মুনাফা বাড়ানোর জন্য নয়। ঋণ বিতরণের সুযোগ না থাকায় এ অর্থ জমা রাখা হয়েছে। ব্যাংকের পরিবর্তিত পরিস্থিতি, পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের সীমাবদ্ধতা এবং ঋণ চাহিদার ঘাটতির কারণে ২০১২ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত অনেক তহবিল জমা হয়েছিল। ওইসব তহবিল অলস ফেলে না রেখে বিভিন্ন জায়গায় বিনিয়োগ করা হয়েছে। গ্রামীণ ব্যাংক নিজে ঋণ বিতরণ করলে সরল হারে ১০ শতাংশ বা ক্রমহ্রাসমান ভিত্তিতে ২০ শতাংশ হারে সুদ পায়। কিন্তু কোনো ব্যাংক বা অন্য প্রতিষ্ঠানে এত মুনাফা পাওয়া যায় না। ফলে বাণিজ্যিক ব্যাংকে জমা রাখা গ্রামীণ ব্যাংকের জন্য বেশি লাভজনক হয় না।

এ বিষয়ে গ্রামীণ ব্যাংকের মহাব্যবস্থাপক মোস্তফা কামাল সমকালকে বলেন, বিভিন্ন পরিপ্রেক্ষিতেই গ্রামীণ ব্যাংকের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। আবার ২০১৩ ও ২০১৪ সালে ঋণের চাহিদাও তুলনামূলক কম ছিল। যে কারণে ঋণ বিতরণ কমে যায়। ফলে বাধ্য হয়ে কিছু অর্থ অন্য খাতে বিনিয়োগ করতে হয়েছে। সম্প্রতি এটা কমে এসেছে। তিনি বলেন, সদস্যদের মধ্যে ঋণ বিতরণ বাড়ানোর ক্ষেত্রে গ্রামীণ ব্যাংকের সদিচ্ছার কোনো ঘাটতি নেই। বরং ঋণ বিতরণ বাড়ানোর জন্য বর্তমানে নতুন সদস্য নেওয়ার চেষ্টা চলছে। পাশাপাশি বর্তমান সদস্যদের মধ্যে ঋণ বিতরণ বাড়ানোর উদ্যোগ রয়েছে।

প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসনে ঘাটতি : ২০১৭ সালে ব্যাংকটিতে পরিচালনা পর্ষদের কোনো সভা অনুষ্ঠিত হয়নি। দীর্ঘদিন ধরে কার্যকর পরিচালনা পর্ষদও নেই। নেই স্থায়ী নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালকও। প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসনেও ঘাটতি দেখা দিয়েছে। এ জন্য স্থায়ীভাবে ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগের সুপারিশ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। যদিও এরই মধ্যে নির্বাচনের মাধ্যমে সদস্যদের মধ্য থেকে ৯ জন পরিচালক নির্বাচিত হয়েছেন। সরকারও তিনজন পরিচালক মনোনয়ন দিয়েছে। কয়েক বছর পরে গঠিত পূর্ণাঙ্গ পরিচালনা পর্ষদ গত ২৬ সেপ্টেম্বর প্রথম সভা করে।

মুনাফা যথেষ্ট নয় : ২০১৭ সালে গ্রামীণ ব্যাংকের মুনাফা হয়েছে ২২৭ কোটি ৫৩ লাখ টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় ৮৮ কোটি ২৪ লাখ টাকা বেশি। তবে আয়কর রেয়াত ও ব্যয় বিবেচনায় ব্যাংকটির এই মুনাফা যথেষ্ট নয় বলে মনে করে বাংলাদেশ ব্যাংক। অন্যান্য ব্যাংকে যে অর্থ জমা রাখা হয়েছে তা না করে সদস্যদের মধ্যে ঋণ বিতরণ বাড়িয়ে মুনাফা আরও বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

সুদহার কমানোর পরামশ : গ্রামীণ ব্যাংক চার ধরনের ঋণ দেয়। উৎপাদনশীল খাতে বিতরণ করা ঋণের সুদহার সরল হারে ১০ শতাংশ বা ক্রমহ্রাসমান ভিত্তিতে ২০ শতাংশ। গৃহ নির্মাণ সুদহার ৮ শতাংশ। শিক্ষা ঋণের সুদহার শিক্ষা শেষে ৫ শতাংশ। আর ভিক্ষুকদের জন্য ঋণের সুদহার শূন্য শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, বাণিজ্যিক ব্যাংকের সুদহারের তুলনায় গ্রামীণ ব্যাংকের সুদহার অনেক বেশি। গ্রামীণ আর্থসামাজিক উন্নয়নের স্বার্থে ঋণের সুদহার সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনা যেতে পারে।

মেয়াদোত্তীর্ণ ও কু-ঋণ বেড়েছে : প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৬ সালের তুলনায় ২০১৭ সাল শেষে ব্যাংকটির মোট আমানত ৪ দশমিক ২৭ শতাংশ বেড়ে ২০ হাজার ৮৩৫ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। আর মোট ঋণ ও অগ্রিম (কর্মচারী ঋণ বাদে) বেড়েছে ২২ দশমিক ২১ শতাংশ। গত ডিসেম্বর শেষে মোট ঋণের পরিমাণ ছিল ১৪ হাজার ৪৫০ কোটি টাকা। বিদেশি প্রতিষ্ঠান থেকে নেওয়া ধার ১২ দশমিক ৬২ শতাংশ বেড়ে হয়েছে ১৩৭ কোটি টাকা। এসবের পাশাপাশি ব্যাংকটির মেয়াদোত্তীর্ণ ঋণও আড়াই শতাংশ বেড়ে ২৩৩ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। একই সঙ্গে অবলোপনকৃত অনাদায়ী পুঞ্জিভূত কু-ঋণের স্থিতি বেড়েছে ১৬৭ কোটি টাকা বা ৭ দশমিক ৬২ শতাংশ। গত ডিসেম্বর শেষে অবলোপনকৃত অনাদায়ী কু-ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৩৬৮ কোটি টাকা। মেয়াদোত্তীর্ণ ও কু-ঋণ কমানোর জন্য পরামর্শ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংক মনে করে, সামগ্রিকভাবে ব্যাংকের ঋণ ব্যবস্থার অদক্ষতার কারণে এ ধরনের ঋণ বাড়ছে।

বেড়েছে প্রতারণা, জাল জালিয়াতি ও তহবিল তছরুপ :  ২০১৬ সালের তুলনায় ২০১৭ সালে গ্রামীণ ব্যাংকে প্রতারণা ও জাল-জালিয়াতির ঘটনা বেশি ঘটেছে। ২০১৭ সালে সারাদেশে ৪৬৪টি এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় জড়িত অর্থের পরিমাণ ৩২ কোটি ৮৪ লাখ টাকা। এ ঘটনাকে আশঙ্কাজনক উল্লেখ করে বাংলাদেশ ব্যাংক এসব অর্থ আদায়ে নির্দিষ্ট সময়ভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে।

ভারপ্রাপ্ত এমডিকে পূর্ণ দায়িত্ব দেওয়ার প্রস্তাব পর্ষদের : গত ২৬ সেপ্টেম্বর ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদের ১০৪তম সভায় ব্যাংকের বর্তমান ভারপ্রাপ্ত এমডি বাবুল সাহাকে পূর্ণ দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়ে পরিচালকরা একমত প্রকাশ করেছেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে গ্রামীণ ব্যাংকের চেয়ারম্যান ২১ অক্টোবর বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরকে এক চিঠিতে বাবুল সাহাকে পূর্ণাঙ্গ এমডির দায়িত্ব দেওয়ার প্রস্তাব করেছেন।

এ বিষয়ে মহাব্যবস্থাপক মোস্তফা কামাল বলেন, ভারপ্রাপ্ত এমডির এখন অবসর প্রস্তুতি ছুটিতে থাকার কথা। পর্ষদের সুপারিশে তিনি ছুটি বাতিল করে ব্যাংক পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছেন। কিন্তু ভারপ্রাপ্ত হলে সব কাজ যথাযথভাবে করার স্বাধীনতা থাকে না। নিজস্ব উদ্ভাবন, চিন্তা প্রয়োগে নানা সীমাবদ্ধতা থাকে। এতে সামগ্রিক ব্যাংক ব্যবস্থাপনাও ব্যাহত হয়। এ জন্য ব্যাংকের স্বার্থে পূর্ণাঙ্গ দায়িত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে পর্ষদ।