ব্যাংক-বীমা

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিশেষ পরিদর্শন প্রতিবেদন

এননটেক্সের ঋণ অনিয়মে জনতার পর্ষদও দায়ী

প্রকাশ : ৩০ অক্টোবর ২০১৮ | আপডেট : ৩০ অক্টোবর ২০১৮ | প্রিন্ট সংস্করণ

এননটেক্সের ঋণ অনিয়মে জনতার পর্ষদও দায়ী

  ওবায়দুল্লাহ রনি

জনতা ব্যাংকে এননটেক্স গ্রুপের ঋণ অনিয়মের পেছনে ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি পরিচালনা পর্ষদও দায়ী। এলসির বিপরীতে পণ্য আসার পর ব্যাংকের টাকা আদায় না করে 'ফোর্স ঋণ' সৃষ্টি করা হয়েছে। ঋণ আদায়ের উদ্যোগ না নিয়ে পরিচালনা পর্ষদ এসব ঋণ বারবার পুনঃতফসিল করে মেয়াদিতে পরিণত করেছে। বিভিন্ন ব্যক্তির মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান দেখিয়ে সুকৌশলে পর্ষদের গোচরেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা লঙ্ঘন করা হয়েছে। এননটেক্সের সব ঋণই মঞ্জুর করেছে পরিচালনা পর্ষদ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালকের নির্দেশনার আলোকে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত বিশদ পরিদর্শনে এসব অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেগ্রিটি অ্যান্ড কাস্টমার সার্ভিস বিভাগের তৎকালীন যুগ্ম পরিচালক বর্তমান ডিজিএম মিজানুর রহমান আকনের নেতৃত্বে পরিদর্শনটি পরিচালিত হয়। পরিদর্শনে উঠে আসা অনিয়মের ভিত্তিতে এননটেক্স গ্রুপকে নতুন ঋণ বন্ধসহ বিভিন্ন নির্দেশনা দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

পরিদর্শন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে স্বাক্ষরিত এমওইউ অনুযায়ী জনতা ব্যাংক তার মোট  মূলধনের সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ ফান্ডেড ঋণ দিতে পারে। গত ডিসেম্বর পর্যন্ত চার হাজার ২৩৩ কোটি টাকা মূলধনের বিপরীতে সর্বোচ্চ ৪২৩ কোটি টাকা ঋণ দেওয়ার সুযোগ ছিল। অথচ মোহাম্মদ ইউনুছ বাদলের মালিকানাধীন এননটেক্স গ্রুপকে পাঁচ হাজার ৬০০ কোটি টাকা ঋণের মধ্যে ফান্ডেড ছিল চার হাজার ৮০৫ কোটি টাকা।

এসব ঋণ সৃষ্টির ক্ষেত্রে বিভিন্ন ব্যক্তির মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান দেখিয়ে সুকৌশলে ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ ও পরিচালনা পর্ষদ বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা লঙ্ঘন করেছে। প্রকল্প বাস্তবায়নের সক্ষমতা, পূর্ববর্তী উৎপাদন ও বিক্রয় দক্ষতা বিবেচনা না করে শুধু প্রাক্কলিত আর্থিক বিবরণী ও কাল্পনিক তথ্যের ভিত্তিতে নতুন নতুন প্রকল্পে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ দেওয়া হয়েছে। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানের ঋণ পুনঃতফসিলের পরও গ্রাহক নিয়মিত ঋণ পরিশোধ করতে পারছে না। অথচ এমওইউর নির্দেশনা লঙ্ঘন করে গত বছরের ৪ ডিসেম্বর পুনরায় ১৫০ কোটি টাকার ঋণসীমা অনুমোদন করা হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা পরিপালন না করার জন্য ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ ও পরিচালনা পর্ষদ দায়ী।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদনে এননটেক্সের ছয়টি প্রতিষ্ঠানের কাঁচামাল আমদানির জন্য বিভিন্ন সময়ে এলসি খোলা হয়। এসব এলসির বিপরীতে সৃষ্ট দেনা গ্রাহকের পরিশোধ করার কথা। তবে ব্যাংক টাকা আদায় না করে গ্রাহকের নামে 'ফোর্স লোন' সৃষ্টি করেছে। এমনকি মঞ্জুরিপত্রের শর্তের আলোকে গ্রাহকের কাছ থেকে এলসি মার্জিনও নেওয়া হয়নি। কাঁচামাল থেকে পণ্য প্রস্তুতের পরও দেনা আদায়ে ব্যবস্থা নেয়নি ব্যাংক। এভাবে সৃষ্ট অনেক ফোর্স লোন খেলাপি হলেও তা আমলে না নিয়ে নতুন করে এলসি খোলা হয়েছে। ২০১৩ সাল থেকে এ প্রবণতা দেখা গেলেও পরবর্তী সময়ে এসব ঋণ আদায়ের উদ্যোগ না দিয়ে পরিচালনা পর্ষদ থেকে বারবার পুনঃতফসিল করে ফোর্স ঋণকে মেয়াদি ঋণে পরিণত করা হয়েছে। বর্তমানে শুধু ফোর্স লোনের বিপরীতে ব্যাংকের পাওনা দাঁড়িয়েছে প্রায় দুই হাজার ২০০ কোটি টাকা। এসব ঋণের অধিকাংশই বিরূপ মানের খেলাপি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. আবুল বারকাত ২০০৯ সালের ৯ সেপ্টেম্বর থেকে দুই মেয়াদে পাঁচ বছর জনতা ব্যাংকের চেয়ারম্যান ছিলেন। তিনি চেয়ারম্যান থাকা অবস্থায় এননটেক্স গ্রুপের ঋণ পাঁচ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছিল। আবুল বারকাতের পর ব্যাংকটির চেয়ারম্যান হন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য সচিব শেখ মো. ওয়াহিদ-উজ-জামান। জনতা ভবন করপোরেট শাখার প্রস্তাবের বিপরীতে এসব ঋণ অনুমোদন করা হয়। ঋণপ্রস্তাব পাঠানোর সময়ে শাখাটির ব্যবস্থাপকের দায়িত্বে ছিলেন জনতা ব্যাংকের বর্তমান এমডি আবদুছ ছালাম আজাদ। এ বিষয়ে আবদুছ ছালাম আজাদের বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করা হয়, কিন্তু পাওয়া যায়নি।

জানতে চাইলে অধ্যাপক ড. আবুল বারকাত সমকালকে বলেন, পরিচালনা পর্ষদে সরাসরি কোনো ঋণপ্রস্তাব আসে না। ক্রেডিট কমিটি এবং ম্যানেজমেন্ট কমিটির সুপারিশের পর তা পর্ষদে উত্থাপন হয়। এ দুই স্তরের সুপারিশ ছাড়া তার সময়ে কোনো প্রস্তাবনা পর্ষদে উত্থাপন হয়নি। আবার পর্ষদ থেকে অনুমোদনের পর ঋণছাড়ের পুরো বিষয়টি দেখভাল করে ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ। আর ২২টি প্রতিষ্ঠান যে ইউনুছ বাদলের মালিকানাধীন এননটেক্স গ্রুপের; তা তারা জানতেন না। তারা জানতেন, পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের মালিক বাদল। তার সময়ে পরিচালনা পর্ষদে বাংলাদেশ ব্যাংকের আজকের গভর্নর ফজলে কবিরসহ অনেকেই ছিলেন। তিনি বলেন, 'আমার দ্বারা কোনো খারাপ কাজ হয়নি। আমার সময়ে কোনো খারাপ কাজ যদি হয়ে থাকে, তাহলে তথ্যের ভুলের কারণে হয়েছে। অথবা আমাকে বোকা বানানো হয়ে থাকতে পারে।'

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চাতুরী বিন্যাসের মাধ্যমে প্রকল্প মূল্যায়ন, এক প্রকল্প থেকে তহবিল অন্য প্রকল্পে স্থানান্তর, প্রকল্পগুলো একই গ্রুপভুক্ত এবং মূল কর্ণধার একজন হলেও নতুন নতুন কোম্পানি সৃষ্টির মাধ্যমে অনেক বেশি ঋণ পুঞ্জীভূত করা হয়েছে। ব্যাংক প্রকল্প বাস্তবায়ন অগ্রগতি তদারকি না করায় এবং কিছু প্রকল্পের কাজ দীর্ঘদিনেও শেষ না হওয়ায় তা ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ইউনুছ বাদলের সরাসরি সম্পৃক্ততা রয়েছে গ্যালাক্সি সোয়েটার্স অ্যান্ড ইয়ার্ন ডাইং, সুপ্রভ কম্পোজিট নিট, সিমরান কম্পোজিট এবং লামিসা স্পিনিংয়ে। এসব প্রতিষ্ঠানের কাছে ব্যাংক পাবে দুই হাজার ২৮১ কোটি টাকা। বাকি সব প্রতিষ্ঠান বাদলের বাবা, স্ত্রী, ভাই, ভাবিসহ পরিবারের অন্যদের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। যদিও সব প্রতিষ্ঠানের সুবিধাভোগী ইউনুছ বাদল।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এননটেক্সের সঙ্গে সংশ্নিষ্ট ২২ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১৮টি গাজীপুরের টঙ্গীর ভাদাম এলাকায় একই কম্পাউন্ডে অবস্থিত। প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে ব্যাংক পাবে চার হাজার ৯৭০ কোটি টাকা। একই কম্পাউন্ডে অবস্থিত হলেও প্রকল্পের ভূমি ও যন্ত্রপাতি ব্যাংকের কাছে আলাদাভাবে দেখানো হয়নি। ফলে প্রতিষ্ঠানগুলোর অস্তিত্ব থাকলেও আলাদাভাবে চিহ্নিত করার সুযোগ নেই। এ রকম পরিস্থিতিতে পরিদর্শক দলের পরামর্শে সম্প্রতি ব্যাংক এসব সম্পত্তি 'জনতা ব্যাংকের কাছে দায়বদ্ধ' মর্মে সাইনবোর্ড দিয়েছে। বাকি চার প্রতিষ্ঠানের মধ্যে গাজীপুরের বোর্ডবাজারে এম নূর সোয়েটার্স, ফরিদপুরের বোয়ালমারীতে এমএইচ গোল্ডেন জুট মিলস, নরসিংদীর শিবপুরে সবমেহের স্পিনিং মিলস ও সাইনিং নিট অবস্থিত।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শক দল বলেছে, সার্বিক তথ্য বিশ্নেষণে এসব ঋণের অধিকাংশই গুণগত মানে শ্রেণিকরণযোগ্য। তবে একবারে বিপুল অঙ্কের ঋণখেলাপি করলে ব্যাংকের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়বে। যে কারণে আপাত বস্তুগত মাপকাঠিতে দুই হাজার ৬৪৩ কোটি টাকার ঋণখেলাপি করতে হবে। আর বিভিন্ন সময়ে ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ এবং পর্ষদে যাদের অনুমোদন ও তদারকির দুর্বলতার কারণে ঋণ বৃদ্ধি পেয়েছে, মূলত দায়-দায়িত্ব তাদের ওপর বর্তায়।

জনতা ব্যাংকের সংশ্নিষ্টরা জানান, একক প্রতিষ্ঠানে বিপুল অঙ্কের ঋণ দেওয়ার ঘটনায় জনতা ব্যাংক বিব্রত। তবে এ ঘটনায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক একেবারে দায় এড়াতে পারে না। এর আগে ২০১৪ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের তৎকালীন যুগ্ম পরিচালক বর্তমানে ডিজিএম মোহাম্মদ জহির হোসেনের নেতৃত্বে একটি পরিদর্শন পরিচালিত হয়। তখন এননটেক্স গ্রুপের ১৩টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১২টি একই কম্পাউন্ডে থাকলেও একই গ্রুপভুক্ত বলা হয়নি। ওই সময়ে প্রতিষ্ঠানগুলোর মোট ফান্ডেড ঋণের পরিমাণ ছিল মাত্র এক হাজার ৮২০ কোটি টাকা, যার মধ্যে ফোর্স লোন ছিল মাত্র ২০২ কোটি টাকা। ওই সময়ে এসব প্রতিষ্ঠানকে একক গ্রুপের প্রতিষ্ঠান চিহ্নিত করে নতুন করে ঋণ বিতরণ থেকে বিরত থাকার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা দেওয়া হলে হয়তো আজকের এ পরিস্থিতি সৃষ্টি হতো না।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক মো. সিরাজুল ইসলাম সমকালকে বলেন, পরিদর্শন প্রতিবেদনে উঠে আসা অনিয়মের আলোকে বিভিন্ন ব্যবস্থা চলমান।

প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, এননটেক্সের ২২ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে প্রকল্প ঋণ রয়েছে ১৭টির নামে। অথচ ব্যাংকের ইস্যু করা প্রকল্প সম্পন্নকরণ রিপোর্ট (পিসিআর) অনুযায়ী কাজ শেষ হয়েছে মাত্র সাতটির। বাকি ১০টির মধ্যে ৭টি প্রতিষ্ঠানের মেশিনারিজ একটি আটতলা ভবনে স্থাপন করা হয়েছে। এসব ঋণ দেওয়ার আগে গ্রাহকের আর্থিক অবস্থা যাচাই করে ঝুঁকি হিসাবায়ন না করায় ব্যবসার গতি কোন দিকে কী অবস্থায় আছে, ব্যাংক তা বুঝতে পারছে না। ঋণ ব্যবহারের ক্ষেত্রে গ্রাহকের দক্ষতা বিষয়ে নিশ্চিত না হয়ে নতুন ঋণ দেওয়া হয়েছে। আবার বিভিন্ন সময়ে যে চলতি মূলধন ঋণ দেওয়া হয়েছে, এর মোট স্থিতি গ্রাহক কর্তৃক সরবরাহ করা মোট স্টক রিপোর্টের চেয়ে অনেক বেশি।

সংশ্লিষ্ট খবর


মন্তব্য যোগ করুণ

পরের
খবর

ব্যাংক থেকে টাকা তোলার হিড়িক


আরও খবর

ব্যাংক-বীমা
ব্যাংক থেকে টাকা তোলার হিড়িক

প্রকাশ : ২৭ ডিসেম্বর ২০১৮ | প্রিন্ট সংস্করণ

  ওবায়দুল্লাহ রনি

জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘনিয়ে আসায় ব্যাংক থেকে টাকা তোলার হিড়িক পড়েছে। চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে অধিকাংশ ব্যাংক। নগদ টাকার চাহিদা মেটাতে এক ব্যাংক আরেক ব্যাংক থেকে কলমানিতে প্রচুর ধার নিচ্ছে। এতেও চাহিদা না মেটায় ব্যাংকগুলো ধরনা দিচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে। ১৬ ডিসেম্বরের পর থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক ও কলমানি থেকে দৈনিক গড়ে প্রায় আট হাজার কোটি টাকা ধার করেছে বিভিন্ন ব্যাংক। নগদ টাকার চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় কলমানির সুদহারও বেড়েছে।

সংশ্নিষ্টরা জানান, নির্বাচনের আগে সাধারণত প্রচুর কালো টাকার ছড়াছড়ি হয়। কালো টাকা ছড়ানোর প্রস্তুতির অভিযোগে গত মঙ্গলবার নগদ আট কোটি টাকা ও ১০ কোটি টাকার চেকসহ তিনজনকে গ্রেফতার করেছে র‌্যাব। নির্বাচন কমিশন থেকে একজন প্রার্থীর সর্বোচ্চ ব্যয়সীমা ২৫ লাখ টাকা নির্ধারণ করে দেওয়া হলেও অনেক প্রার্থী তার চেয়ে বেশি খরচ করেন। অনেক প্রার্থী কোটি কোটি টাকা খরচ করেন। এতে করে মানি লন্ডারিংয়ের আশঙ্কা থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবার আগেভাগেই ব্যাংকগুলোকে সতর্ক করে দিয়েছে। গত সপ্তাহে বিএফআইইউ থেকে সব ব্যাংকে চিঠি দিয়ে নগদ টাকার প্রবাহ নিয়ে সতর্ক থাকতে বলা হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক মো. সিরাজুল ইসলাম সমকালকে বলেন, আন্তঃব্যাংকে টাকা না পেলে ব্যাংকগুলো সাধারণত কেন্দ্রীয় ব্যাংকে আসে। চাহিদা বিবেচনায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্বল্প মেয়াদে টাকা দেয়। এটা একটা স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। তবে কোনো অসঙ্গতিপূর্ণ লেনদেন যেন না হয়, সে জন্য ব্যাংকগুলোকে আগে থেকেই সতর্ক করা হয়েছে।

ব্যাংকগুলোর প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশের (এবিবি) সাবেক চেয়ারম্যান ও মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের এমডি আনিস এ. খান সমকালকে বলেন, নির্বাচন ও ঈদের আগে সব সময়ই ব্যাংক থেকে নগদ টাকা উত্তোলন বাড়ে। এ জন্য ব্যাংকগুলো আগে থেকেই প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিল। তিনি বলেন, ব্যাংকিং চ্যানেলে যেন অবৈধ লেনদেন না হয়, তার জন্য ব্যাংকগুলো সতর্ক রয়েছে।

ব্যাংকাররা জানান, ব্যাংকগুলো আন্তঃসমন্বয়ের মাধ্যমে এক শাখা থেকে আরেক শাখায় নগদ টাকা পাঠিয়ে পরিস্থিতি সামলানোর চেষ্টা করছিল। এতে চাহিদা না মেটায় আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজার (কলমানিতে) ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে প্রতিদিনই বড় অঙ্কের ধার নিচ্ছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ধার নেওয়ার ঘটনা ঘটে গত ১৮ ডিসেম্বর মঙ্গলবার। ওই দিন কলমানি থেকে কয়েকটি ব্যাংক আট হাজার ৫১৫ কোটি টাকা নেয়। আর কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে নেয় এক হাজার ৪০৬ কোটি টাকা। প্রায় প্রতিদিনই এভাবে কমবেশি ধার নেওয়ায় কলমানির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। গতকাল সাড়ে ৪ শতাংশ থেকে ৫ শতাংশ সুদে কলমানিতে লেনদেন হয়েছে। গত ১৭ ডিসেম্বর লেনদেন হয়েছিল এক দশমিক ৭৫ শতাংশ থেকে ৫ শতাংশ সুদে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদহারের সর্বোচ্চ সীমা ৫ শতাংশ নির্ধারণ করে না দিলে সুদহার আরও বাড়ত বলে সংশ্নিষ্টদের ধারণা।

ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন এবিবির চেয়ারম্যান ও ঢাকা ব্যাংকের এমডি সৈয়দ মাহবুবুর রহমান সমকালকে বলেন, নির্বাচনের আগে প্রার্থীরা টাকা খরচ করেন। প্রার্থীর পক্ষেও অনেকে টাকা তোলেন। এতে করে গত কয়েকদিনে ব্যাংকগুলো থেকে টাকা উত্তোলনের প্রবণতা বেড়েছে।

প্রাপ্ত তথ্য মতে, ২৪ ডিসেম্বর সোমবার আন্তঃব্যাংকে কলমানিতে ৫ হাজার ২৭৬ কোটি টাকা লেনদেন হয়। এর আগে ১৭ ডিসেম্বর থেকে ২৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত ৬ কর্মদিবসে কয়েকটি ব্যাংক নিয়েছে ৪০ হাজার ৫৯৪ কোটি টাকা। প্রতিদিন গড়ে ৬ হাজার ৭৬৬ কোটি টাকার ধার নিয়েছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গতকাল দুপুর পর্যন্ত কয়েকটি ব্যাংক কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ৪০০ কোটি টাকা ধার নিয়েছে। আর গত ১৭ ডিসেম্বর থেকে ৬ কর্মদিবসে নিয়েছে পাঁচ হাজার ৭৮৬ কোটি টাকা। রেপো, বিশেষ রেপো এবং তারল্য সহায়তা হিসেবে এসব অর্থ নেয় ব্যাংকগুলো। ব্যাংকগুলোর বিভিন্ন ধরনের সিকিউরিটিজ বন্ধক রেখে ৬ থেকে ৯ শতাংশ সুদে এসব অর্থ দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

বেসরকারি অন্য একটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সমকালকে বলেন, নির্বাচনের পাশাপাশি এবার বছরের শেষ চার দিন ব্যাংক লেনদেন বন্ধ থাকায় অনেকেই টাকা তুলে ঘরে রাখতে পারেন। অল্প কিছুদিনের মধ্যে বিপুল অঙ্কের অর্থ তুলে নেওয়ায় কিছুটা চাপ পড়েছে ব্যাংকগুলোতে। চাপ সামলাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও কলমানিতে ধরনা দিতে হচ্ছে। তবে নির্বাচন শেষে ধীরে ধীরে এসব টাকা আবার ব্যাংকে আসবে বলে তিনি মনে করেন।

সংশ্লিষ্ট খবর

পরের
খবর

ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের শাস্তি চান ব্যাংকের এমডিরা


আরও খবর

ব্যাংক-বীমা

বাংলাদেশ ব্যাংকে বৈঠক

ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের শাস্তি চান ব্যাংকের এমডিরা

প্রকাশ : ১৯ ডিসেম্বর ২০১৮

  সমকাল প্রতিবেদক

ব্যাংক খাতে বর্তমানে সাড়ে ১১ শতাংশ খেলাপি ঋণকে উচ্চ মাত্রার উল্লেখ করে তা কমাতে বলেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে ব্যাংকাররা বলেছেন, তারাও চান খেলাপি ঋণ কমাতে। তবে ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের কারণে তা সম্ভব হচ্ছে না। দৃষ্টান্তমূলক কিছু শাস্তি নিশ্চিত করা গেলে খেলাপি ঋণ আদায় জোরদার হবে। বুধবার অনুষ্ঠিত ব্যাংকার্স সভায় এমন আলোচনা হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সভাকক্ষে গভর্নর ফজলে কবিরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে অধিকাংশ ব্যাংকের এমডি ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে খেলাপি ঋণ কমানো ছাড়াও ব্যাংক খাত ও অর্থনীতির বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয়। ব্যাংকাররা বেসরকারি খাতে বিদেশি ঋণের সুদহারে ৬ শতাংশের সীমা বাড়ানো এবং ডলার দরে সীমা আরোপ পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনার দাবি জানালে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাতে সায় দেয়নি।

সভায় ব্যাংকারেরা জানান, ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের থেকে ঋণ আদায়ের উদ্যোগ নিলেই তারা উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হন। বছরের পর বছর কোনো টাকা পরিশোধ করছেন না, অথচ তাদের খেলাপি হিসেবে দেখানো যাচ্ছে না। এবারের নির্বাচনেও বড় বড় ঋণখেলাপি ব্যাংকের টাকা পরিশোধ না করেও পার পেয়ে গেছেন। পরিস্থিতির উন্নয়নে আইনি সংস্কার দরকার। ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের দৃষ্টান্তমূলক কিছু শাস্তি নিশ্চিত করা গেলে অন্যরা সতর্ক হবে। আইনি সংস্কারের জন্য আইন কমিশনের সঙ্গে আলোচনার উদ্যোগে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সহায়তা করবে বলে বৈঠকে জানানো হয়।

বৈঠক শেষে ব্যাংকগুলোর প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান ও ঢাকা ব্যাংকের এমডি সৈয়দ মাহবুবুর রহমান সাংবাদিকদের জানান, বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, ১১ শতাংশের বেশি খেলাপি ঋণ অনেক উচ্চমাত্রার। খেলাপি ঋণ কমাতে আদায় জোরদারের পাশাপাশি প্রকৃত সমস্যার কারণে কেউ খেলাপি হলে প্রয়োজনে পুনঃতফসিল করতে বলা হয়েছে। 

তিনি বলেন, ব্যাংকগুলোও চায় খেলাপি ঋণ কমাতে। এজন্য ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের আইনের আওতায় আনতে শক্ত আইনি ব্যবস্থা দরকার। দৃষ্টান্তমূলক কিছু শাস্তি হলে সহজে খেলাপি ঋণ আদায় হবে। আইনি সহায়তার ক্ষেত্রে আইন কমিশনের সঙ্গে আলোচনা করা হবে। সৈয়দ মাহবুবুর রহমান জানান, সামগ্রিকভাবে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের বিপরীতে প্রভিশন ঘাটতি নেই। যেসব ব্যাংকের ঘাটতি রয়েছে, শিগগিরই তাদের অনেকে মেটাতে পারবে। এরপরও যেসব ব্যাংকের সমস্যা থাকবে, তা কীভাবে মেটানো যায়, কেন্দ্রীয় ব্যাংক দেখবে।

তিনি জানান, নগদ লেনদেন কমাতে কার্ডভিত্তিক লেনদেন বাড়ানোর ওপর বৈঠকে বাংলাদেশ ব্যাংক গুরুত্ব আরোপ করেছে। ব্যাংকের জামানতি সম্পত্তির ডাটাবেজ করার উদ্যোগ নিয়েও আলোচনা হয়েছে। এক প্রশ্নের জবাবে সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, তবে নির্বাচনের আগে ঋণ বিতরণ ও নগদ অর্থের প্রবাহ নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি।

তিনি আরও বলেন, বেসরকারি খাতে সর্বোচ্চ ৬ শতাংশ সুদে বিদেশি ঋণ নেওয়া যায়। আগে যখন লন্ডন ইন্টার ব্যাংক অফার রেট (লাইবর) দশমিক ৬৭ শতাংশ ছিল, তখনও বিদেশি ঋণের সুদহারে সর্বোচ্চ সীমা ছিল ৬ শতাংশ। ব্যাংকগুলো ওই সীমা বাড়ানোর দাবি জানিয়েছে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, বৈদেশিক ঋণের সুদহার যেহেতু বাড়ছে, এখন স্থানীয় মুদ্রার ঋণ বিতরণে জোর দিতে হবে। ব্যাংকাররা বলেছেন, স্থানীয় মুদ্রায় ঋণ যথেষ্ট নয়। বৈদেশিক মুদ্রায় ঋণ লাগবেই। তিনি জানান, রফতানি ও রেমিট্যান্সে ভালো প্রবৃদ্ধি হচ্ছে। তেলের দামে নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা দিয়েছে। এতে করে বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে চাপ কমে আসছে। এখন বৈদেশিক মুদ্রার দরে সীমা আরোপের ক্ষেত্রে সরাসরি দর নির্ধারণ না করে শতাংশ বিবেচনায় সীমা আরোপ করা যায় কি-না, তার অনুরোধ জানানো হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য মতে, গত সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৯৯ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা হয়েছে। মোট ঋণের যা ১১ দশমিক ৪৫ শতাংশ। এই খেলাপি ঋণের মধ্যে তিন মাসে বেড়েছে ১০ হাজার ৩০ কোটি টাকা। আর চলতি বছরের নয় মাসে বেড়েছে ২৫ হাজার ৬৭ কোটি টাকা। ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণের মধ্যে শুধু রাষ্ট্রীয় মালিকানার বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে রয়েছে ৪৮ হাজার ৮০ কোটি টাকা। বিশেষায়িত দুই ব্যাংকে রয়েছে পাঁচ হাজার ২৪১ কোটি টাকা। বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে ৪৩ হাজার ৬৬৬ কোটি টাকা ও বিদেশি ব্যাংকে রয়েছে দুই হাজার ৩৮৩ কোটি টাকা।

পরের
খবর

এবার ব্যাংক ক্লোজিং ২৭ ডিসেম্বর


আরও খবর

ব্যাংক-বীমা

ফাইল ছবি

  সমকাল প্রতিবেদক

নির্বাচনের কারণে এবার ব্যাংকের বার্ষিক হিসাব ক্লোজিং হবে ২৭ ডিসেম্বর। তবে যথারীতি ৩১ ডিসেম্বর ব্যাংক হলিডে পালিত হবে।

ব্যাংক হলিডের দিন ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়সহ গুরুত্বপূর্ণ সব শাখা খোলা থাকলেও ওই দিন লেনদেন হয় না। ফলে সাপ্তাহিক ছুটি, ভোট ও ব্যাংক হলিডের কারণে ২৮ ডিসেম্বর থেকে টানা চারদিন স্বাভাবি ব্যাংকিং লেনদেন কার্যক্রম বন্ধ থাকবে।

তবে এ সময়ের মধ্যে ইন্টারনেট ব্যাংকিং এবং ব্যাংকগুলোর এটিএম বুথ থেকে লেনদেন করা যাবে।

ব্যাংক ক্লোজিং বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে মঙ্গলবার একটি সার্কুলার জারি করে ব্যাংকগুলোর প্রধান নির্বাহীদের কাছে পাঠানো হয়েছে।

এতে বলা হয়, ৩০ ডিসেম্বর জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এর পরিপ্রেক্ষিতে সকল তফসিলি ব্যাংকের চলতি বছরের বার্ষিক হিসাব ক্লোজিং আগামী ২৭ ডিসেম্বর বৃহস্পতিবার নির্ধারণ করা হলো। ৩১ ডিসেম্বর যথারীতি ব্যাংক হলিডে অপরিবর্তিত থাকবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক মো. সিরাজুল ইসলাম সমকালকে বলেন, ২৭ ডিসেম্বরের পরের দু'দিন শুক্র ও শনিবার সাপ্তাহীক ছুটি। আর ৩০ ডিসেম্বর রোববার নির্বাচনের কারণে ব্যাংক বন্ধ থাকবে। যে কারণে ব্যাংক ক্লোজিং ২৭ ডিসেম্বর নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে এটিএম বুথ, অনলাইন ব্যাংকিংয়ে লেনদেন করা যাবে। ফলে গ্রাহকদের কোনো সমস্যা হবে না।


সংশ্লিষ্ট খবর