বাংলাদেশ

নুসরাত হত্যা, জবানবন্দি-২

'প্রেম প্রত্যাখ্যানের ক্ষোভ মিটিয়েছি'

শাহাদাত হোসেন শামীম

প্রকাশ : ১৮ জুন ২০১৯ | আপডেট : ১৮ জুন ২০১৯ | প্রিন্ট সংস্করণ

'প্রেম প্রত্যাখ্যানের ক্ষোভ মিটিয়েছি'

  সাহাদাত হোসেন পরশ

'নুসরাত জাহান রাফি দেড় মাস আগে আমার প্রেম প্রত্যাখ্যান করেছিল। এরপর অপমানও করে আমাকে। তাই তার ওপর ব্যক্তিগত ক্ষোভ ছিল। আলোচনা করেই সিদ্ধান্ত নিয়েছি, ৬ এপ্রিল আরবি পরীক্ষার প্রথম দিন তাকে হত্যা করে আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দেব। থানার ব্যাপারে দেখবেন মাকসুদ আর রুহুল আমিন সাহেব।' নুসরাত হত্যার অন্যতম পরিকল্পনাকারী শাহাদাত হোসেন শামীম আদালতে ১৬৪ ধারার জবানবন্দি ও পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে এসব তথ্য দেয়।

শামীমের জবানবন্দিতে উঠে আসে নুসরাত হত্যা মিশনে কে কী ভূমিকা রেখেছিল। সে জানিয়েছে- পরিকল্পনার অংশ হিসেবে শামীম, জোবায়ের, জাবেদ ও কামরুন নাহার মনি সাইক্লোন শেল্টারের ছাদে ছিল। মনি হত্যা মিশনে ব্যবহারের জন্য তিনটি বোরকা নিয়ে আসে। কেরোসিন সংগ্রহ করে শামীম। উম্মে সুলতানা পপি কৌশলে নুসরাতকে ডাকার দায়িত্ব পায়। ডেকে আনার সময় বলা হবে, নুসরাতের বান্ধবী নিশাতকে ছাদে যেন কারা মারধর করছে। গেটে আফসার স্যার, গেটের বাইরে নূর উদ্দিন, হাফেজ আবদুল কাদের, ইমরান হোসেন মামুন, ইফতেখার হোসেন রানা, শরীফ হোসেন অবস্থান নেবে। সাইক্লোন শেল্টারের নিচে পাহারায় থাকবে মহিউদ্দিন শাকিল ও শামীম। মাকসুদ কাউন্সিলর, আফসার ও সেলিম স্যার,  অধ্যক্ষ সিরাজের দুই ছেলে মিশু ও আদনান, কামরুন নাহার মনি ও উম্মে সুলতানা পপিকে হত্যা পরিকল্পনার বিস্তারিত জানানোর কথা ছিল শামীমের নিজের। তাদের জানানোর পর হত্যার ব্যাপারে সবাই একমত হয়। সবাই 'দায়িত্ব' নিতে রাজি হয়।

ঘটনার দিন কিলিং মিশনে জড়িতদের ভূমিকার কথা উল্লেখ করে শামীম জানায়, ৬ এপ্রিল সকাল ৭টা থেকে সাড়ে ৭টার মধ্যে মাদ্রাসা প্রাঙ্গণে একত্র হয় সবাই। এর আগেই ৫ এপ্রিল এক লিটার কেরোসিন কেনা হয়। ওই কেরোসিন নিয়ে ৬ এপ্রিল সকালে ছাদে চলে যায় শামীম। কামরুন নাহার মনি তার বাড়ি থেকে তিনটি বোরকা, হাত ও পা মোজা নিয়ে আসে। শামীম, জাবেদ ও জোবায়ের সকাল সাড়ে ৯টার দিকে বোরকা ও মোজা পরিধান করে। জোবায়ের তার চোখে চশমা ব্যবহার করেছিল। তবে জাবেদ ও শামীমের চোখ ছিল খোলা। ঘটনার দিন সকাল পৌনে ১০টার দিকে নুসরাতকে কৌশলে ডেকে নিয়ে আসে পপি। ওই সময় নিচে গেট পাহারায় ছিল মহিউদ্দিন শাকিল ও শামীম। নুসরাতকে ডেকে ছাদে নেওয়ার পর মনি ও পপি তাকে ধরে ফেলে। শামীম নুসরাতের মুখ চেপে ধরে। নুসরাতের পরনের ওড়না ছিঁড়ে জোবায়ের তার হাত-পা বেঁধে ফেলে। ছাদে তাকে শুইয়ে ফেলার পর শামীম তার মুখ ও গলা ধরে রাখে। মনি নুসরাতের বুক ধরে রাখে। পপি ধরে পা। এ সময় মনি পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী পপিকে শম্পা নামে ডাকতে থাকে। জাবেদ পলিব্যাগ থেকে কেরোসিন নিয়ে নুসরাতের পা থেকে বুক পর্যন্ত ঢেলে দেয়। শামীম নুসরাতের মুখ চেপে ধরায় তার মুখে কেরোসিন দেওয়া যায়নি। তারপর জোবায়ের ম্যাচের কাঠিতে আগুন ধরিয়ে নুসরাতের গায়ে অগ্নিসংযোগ করে। নুসরাতকে বেঁধে ফেলা ও আগুন দিতে মোট পাঁচ মিনিট লাগে। দ্রুত আগুন ছড়িয়ে পড়লে শামীম, জাবেদ ও জোবায়ের বোরকা খুলে ফেলে। শামীম তার বোরকা জাবেদকে দিয়ে দেয়। এরপর শামীম ও জোবায়ের প্রস্রাবখানার পাশ দিয়ে বের হয়ে যায়। জাবেদ চলে যায় মাদ্রাসার হোস্টেলের দিকে। হত্যা মিশন শেষে মনি ও পপি পরীক্ষার হলে ঢুকে পড়ে। ঘটনার পর বাইরে গিয়ে আওয়ামী লীগ নেতা রুহুল আমিনকে ফোন করে নুসরাতের গায়ে আগুন দেওয়ার বিষয়টি জানায় শামীম।

অধ্যক্ষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার কথা বর্ণনা করে শামীম জবানবন্দিতে জানিয়েছে, দশম শ্রেণি থেকে সিরাজের সঙ্গে তার ভালো সম্পর্ক তৈরি হয়। আলিম থেকে ঘনিষ্ঠতা আরও বাড়ে। অধ্যক্ষ সব ব্যাপারে তার সঙ্গে আলাপ করতেন। মাদ্রাসার সব আয়-ব্যয়ের ভাগ পেত শামীম। সিরাজও তাকে নানা সময় আর্থিক সহযোগিতা করতেন। সিরাজের চরিত্র খারাপ, এটা শামীমও জানত। অনেক আগেই মাদ্রাসার কয়েকজন ছাত্রীর সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন সিরাজ। এ ছাড়া কয়েকটি মেয়ে তার বিরুদ্ধে অভিযোগও করে। মাস তিনেক আগে নুসরাত ও তার এক বান্ধবীকে নিপীড়নের চেষ্টা করেন সিরাজ। এ বিষয়টি মাদ্রাসার গভর্নিং বডির সহসভাপতি ও সদস্য কাউন্সিলর মাকসুদ ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেন। একপর্যায়ে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট বেগম আক্তারুজ্জামান শিউলি মাদ্রাসায় যান। তিনিও ঘটনা জানতে পারেন। তবে এটা কীভাবে সমাধান হয়েছিল, তা জানে না শামীম।

শামীম জানায়, ২৭ মার্চ পিয়ন নুরুলের মাধ্যমে নুসরাতকে অধ্যক্ষ তার কক্ষে ডেকে নিপীড়ন করেন। ওই ঘটনায় মামলা দায়েরের পর অধ্যক্ষকে গ্রেফতার করে কারাগারে নেওয়া হয়। এরপর সিরাজের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার ব্যাপারে এক আইনজীবীর সঙ্গে দেখা করে শামীম। ২৮ মার্চ স্থানীয় শেখ মামুন নুসরাতের পক্ষে তার মা-ভাইকে নিয়ে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেন। এরপর শামীম ও তার সাঙ্গোপাঙ্গরা অধ্যক্ষের পক্ষে পাল্টা মানববন্ধন করে। এতে মাকসুদ কাউন্সিলর সরাসরি অধ্যক্ষের পক্ষে অবস্থান নেন। অধ্যক্ষের পক্ষে মানববন্ধনে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা রুহুল আমিন তাদের সমর্থন দেন। শিক্ষার্থীদের জোর করে ভয়-ভীতি দেখিয়ে মানববন্ধনে আনা হয়। পাল্টাপাল্টি মানববন্ধন ঘিরে ২৮ মার্চ শেখ মামুনের সঙ্গে মাকসুদের হাতাহাতি হয়। তারপর সিদ্ধান্ত হয়, ৩০ মার্চ মানববন্ধন হবে। ওই দিনের মানববন্ধনে সেফাত উল্যাহ জনি নামের একজন ব্যাংক কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন। এতে নেতৃত্ব দেন মাকসুদ কাউন্সিলর। মানববন্ধনে মাদ্রাসার শিক্ষক সেলিম ও আফসার উপস্থিত ছিলেন। তাদের সঙ্গে সিরাজের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। স্থানীয় পুলিশ সিরাজের পক্ষের মানববন্ধনে কোনো বাধা দেয়নি।

ঘটনার পূর্বাপর বর্ণনা করে শামীম উল্লেখ করে, ১ এপ্রিল কাউন্সিলর মাকসুদ ও শিক্ষক আফসারের নির্দেশে জেলখানার উদ্দেশে বের হয় শামীম ও তার সাঙ্গোপাঙ্গরা। এরপর তারা জেলখানায় দেখা করতে যায়। পরে ৩ এপ্রিল আবার কারাগারে যাওয়ার কথা বলেন সিরাজ। ওই দিন শামীম, নূর উদ্দিন, আবদুল কাদের, জোবায়ের, জাবেদ, শরিফ, শাকিল, রানা ও অধ্যক্ষ সিরাজের দুঃসম্পর্কের ভাগিনা মাহবুব, সিরাজের ছেলে মিশু, আদনান, ইমরান হোসেন মামুন, জাহের কারাগারে যায়। সেদিন সিরাজ শামীমকে বলেন, তাড়াতাড়ি কিছু একটা করতে হবে। নুসরাতকে মামলা তুলে নিতে চাপ দিতে হবে। প্রয়োজনে কাউন্সিলর মাকসুদের সঙ্গে আলাপ করে নুসরাতকে হত্যা করার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়। প্রয়োজনে টাকা লাগলে তিনি দেবেন। মাকসুদও অর্থ দিয়ে সহযোগিতা করবে। এরপর কারাগারে সিরাজের সঙ্গে দেখা করতে যাওয়া সবাইকে অধ্যক্ষের ওই নির্দেশ জানিয়ে দেয় শামীম। সবাই ওই সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত পোষণ করে। এলাকায় গিয়ে বিষয়টি মাকসুদকে জানানো হয়। তিনি বৈঠক করতে বলেন। এরপর মাকসুদ তাদের ১০ হাজার টাকা দেন। শিক্ষক সেলিম স্যার দেন আরও ৫ হাজার টাকা। মাকসুদের নির্দেশনা অনুযায়ী ৪ এপ্রিল সন্ধ্যার পর মাদ্রাসার পশ্চিম হোস্টেলে বৈঠক হয়। সেখানে অধ্যক্ষের মুক্তি পরিষদ গঠন করা হয়েছিল। নূর উদ্দিনকে আহ্বায়ক করে গঠিত ওই কমিটিতে যুগ্ম আহ্বায়ক ছিল শামীম। সদস্য সচিব করা হয় মহিউদ্দিন শাকিলকে। মুক্তি পরিষদে আরও ছিল আবদুল কাদের, জাবেদ, আরিফ, সেজান, শামীম, সালমান, জোবায়ের, পিয়াস, ইমরান হোসেন মামুন, রানা, নাসির, বাদলা ও কামরুল ইসলাম। তাদের নিয়ে মুক্তি পরিষদের বৈঠক হয়। সেখানে সবাই অঙ্গীকার করে- সিরাজের মুক্তির ব্যাপারে সকলে যার যার জায়গা থেকে সহযোগিতা করবে। ৪ এপ্রিল সকালে গোপন বৈঠকে বসে তারা। সেখানে শামীম, নূর উদ্দিন ও আবদুল কাদের নুসরাতকে হত্যার পরিকল্পনা উপস্থাপন করে। বৈঠকে পরিকল্পনা পাস হওয়ার পর সকলে যার যার 'দায়িত্ব' বুঝে নেয়।

মন্তব্য


অন্যান্য