বাংলাদেশ

বিক্রয়যোগ্য কার্বনআরও ১১ বনে

কার্বন বাণিজ্যে মিলবে প্রায় ১৯ হাজার কোটি টাকা

সুন্দরবনে মজুদ পাঁচ কোটি ৬০ লাখ টন

প্রকাশ : ২০ এপ্রিল ২০১৯ | প্রিন্ট সংস্করণ

কার্বন বাণিজ্যে মিলবে প্রায় ১৯ হাজার কোটি টাকা

  আলতাব হোসেন

বিশ্বব্যাংক ও বন বিভাগের সমীক্ষা অনুযায়ী, পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট সুন্দরবনে রয়েছে পাঁচ কোটি ৬০ লাখ টন কার্বন। কার্বন বাণিজ্যে বনের কোনো ক্ষতিও হয় না। এদিকে বিশ্ববাজারে কার্বনের দাম বাড়ছে। শিকাগো কার্বন মার্কেটের বর্তমান সর্বোচ্চ বাজারদর অনুযায়ী, বাংলাদেশ ১৮ হাজার ৮১৬ কোটি টাকার কার্বন বিক্রি করতে পারে। অথচ পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক মন্ত্রণালয় এ ব্যাপারে কোনো উদ্যোগ নিচ্ছে না।

সুন্দরবনের প্রাকৃতিক সম্পদ অটুট রেখেই এর ধারণকৃত কার্বন বিক্রির জন্য ২০০৯ সালে 'সুন্দরবন ফরেন কার্বন ইনভেন্টরি-২০০৯' নামে যৌথ সমীক্ষা চালায় পরিবেশ, বন ও জলবায়ু বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং যুক্তরাষ্ট্র সরকারের একাধিক সংস্থা। যৌথ সমীক্ষায় গাছের সংখ্যা, ঘনত্ব, উচ্চতা, লতা ও গুল্ম এবং জৈব উপাদান মিলিয়ে পাঁচ কোটি ৬০ লাখ টন কার্বনের সন্ধান পায় বন বিভাগ। অথচ অর্থ ব্যয় করে এ সমীক্ষা করার পর ১০ বছর পেরিয়ে গেলেও কার্বন বিক্রির জন্য আন্তর্জাতিক কার্বন স্টক মার্কেটে নিবন্ধন করা হয়নি। নিয়োগ দেওয়া হয়নি কোনো আন্তর্জাতিক ব্রোকার হাউসকে।

কার্বন নিঃসরণকারী শিল্পোন্নত দেশ এবং বহুজাতিক কোম্পানিগুলোই কার্বন কিনে থাকে। বিশ্বব্যাংকের ফরেস্ট  কার্বন ফ্যাসিলিটি তহবিল, যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো কার্বন বাজার ও লন্ডনের আন্তর্জাতিক কার্বন স্টক মার্কেটে এর কেনাবেচা হয়। বাজার পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ২০১০ সালে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার সময় কার্বনের দাম কমে প্রতিটন ১০ ডলারে নেমে আসে। ২০১৭ সাল থেকে আবারও এর দাম বাড়তে শুরু করে। ২০১৮ সালের শেষ দিকে এর দাম টনপ্রতি ১৩ ডলার থেকে ২৫ ডলারের মধ্যে ওঠানামা করে। কখনও কখনও এ দাম তিন ডলারেও নেমে আসে। কখনও আবার ৪০ ডলারে গিয়ে ঠেকে।

২০১৯ সালের ২৫ জানুয়ারি কার্বন বাজার সম্পর্কে বিশ্বব্যাংকের পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২০ সাল পর্যন্ত কার্বনের দাম প্রতি টন ৪০ থেকে ৮০ ডলার পর্যন্ত উঠতে পারে। ২০৩০ সালের মধ্যে প্রতি টন কার্বনের দাম ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে।

জাতিসংঘের আওতায় ১৯৯৭ সালে স্বাক্ষরিত কিয়োটো প্রটোকল অনুযায়ী, কোনো উন্নয়নশীল দেশ তার বনজ সম্পদ সংরক্ষণ এবং ধ্বংস হয়ে যাওয়া বনাঞ্চলে পুনর্বনায়ন করলে শিল্পোন্নত দেশগুলো বনজ সম্পদের কার্বন কিনতে পারবে। কোনো শিল্পোন্নত দেশ যে পরিমাণ কার্বন কিনবে, সেই পরিমাণ কার্বন নিঃসরণও করতে পারবে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সুন্দরবনে সবচেয়ে বেশি কার্বন মজুদ রয়েছে বাইন, পশুর ও কাঁকড়া গাছে। সুন্দরিগাছ মাঝারি ধরনের কার্বন ধারণ করতে পারে। সুন্দরবনের ৬২ শতাংশ এলাকায় গাছের সংখ্যা বাড়ছে, গাছের দৈর্ঘ্য-প্রস্থ বৃদ্ধিসহ চারা গজানোর পরিমাণও তুলনামূলকভাবে ভালো। এদিকে জেগে ওঠা চরগুলোতে নতুন বনাঞ্চলও সৃষ্টি হচ্ছে- যদিও গেওয়া ও কেওড়া গাছের কার্বন ধারণক্ষমতা তুলনামূলকভাবে কম। নেপাল ও ব্রাজিলসহ বিশ্বের বেশ কয়েকটি দেশ বিশ্ববাজারে কার্বন বিক্রি করছে। কিন্তু বাংলাদেশ এক্ষেত্রে পিছিয়ে রয়েছে। সুন্দরবনের নানা প্রজাতির গাছের এ কার্বন ধারণ ক্ষমতা ও বাণিজ্যিক সম্ভাবনা আন্তর্জাতিক কার্বন বাজারে তুলে ধরার ক্ষেত্রে ব্যর্থ হচ্ছে এ দেশ। এভাবে বঞ্চিত হচ্ছে বিশাল অর্থ প্রাপ্তি থেকে।

কার্বন বিক্রি ছাড়াও জাতিসংঘের অধীনে তৈরি 'বনায়নের মাধ্যমে কার্বন নিঃসরণ কমানো' বা 'রিডিউসিং ইমিশন ফ্রম ডিফরেস্ট্রেশন অ্যান্ড ফরেস্ট ডিগ্রেডেশনের (রিড)' তহবিল থেকেও অর্থ পাওয়ার পথ খোলা আছে। কিন্তু বাংলাদেশ এসব ক্ষেত্রে দক্ষতার পরিচয় দিতে পারছে না বলে দেশের জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা অভিযোগ করেছেন।

এ বিষয়ে নেটওয়ার্ক অন ক্লাইমেট চেঞ্জ ইন বাংলাদেশের সমন্বয়কারী মিজানুর রহমান বিজয় সমকালকে বলেন, বিশ্বে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত নতুন বাস্তবতা হচ্ছে কার্বন বাণিজ্য। বায়ুম লে কার্বন ডাই-অক্সাইড কম নিঃসরণের জন্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে ক্রেডিট বিনিময়ের নাম কার্বন বাণিজ্য। বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবন ক্ষতিকর কার্বন হজম করে পৃথিবীর উষ্ণতা রোধে অবদান রাখছে। সুন্দরবন সিডর-আইলার মতো ভয়ঙ্কর দুর্যোগে বাংলাদেশকে মায়ের মতো আগলে রাখতে পারে। আবার কার্বন বিক্রি করে দেশের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করতে পারে। সরকারের আমলাদের অদক্ষতার কারণে জলবায়ু তহবিল, কার্বন বিক্রিসহ জলবায়ু-সংক্রান্ত নানা খাত থেকে অর্থ আনতে ব্যর্থ হচ্ছে বাংলাদেশ। যদিও নেপাল ও ভুটানসহ এশিয়ার কয়েকটি দেশ কার্বন বিক্রি করেছে।

এ বিষয়ে প্রধান বন সংরক্ষক শফিউল আলম চৌধুরী বলেন, অতি কার্বন নির্গমনকারী শিল্পোন্নত দেশ ও বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর কাছে সুন্দরবনের কার্বন বিক্রি করা সম্ভব। শিগগিরই এ বিষয়ে উদ্যোগ নিয়ে আন্তর্জাতিক ব্রোকার নিয়োগ করা হবে। বাজার পর্যবেক্ষণ করে দাম বাড়লে বিক্রি করা হবে। তিনি বলেন, প্রাথমিকভাবে সুন্দরবনে এবং পর্যায়ক্রমে দেশের আরও ১১টি বনের কার্বন ধারণ ক্ষমতাকে আন্তর্জাতিক বাজারে বিক্রির পরিকল্পনা ছিল।

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক মন্ত্রী মো. শাহাব উদ্দিন সমকালকে বলেন, সুন্দরবনের ক্ষতি না হলে সেখানকার কার্বন উপযুক্ত মূল্যে বিক্রি করা হবে। তিনি এ ব্যাপারে দ্রুত ব্যবস্থা নেবেন।

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপমন্ত্রী হাবিবুন নাহার সমকালকে বলেন, কার্বন বিক্রির কথা শুনলেও এ ব্যাপারে তিনি এখনও বিস্তারিত খোঁজ নিতে পারেননি। এ বিষয়ে খোঁজ নিয়ে তিনি প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার নির্দেশ দেবেন। তিনি বলেন, কার্বন বিক্রি করে সরকারের পাশাপাশি সুন্দরবন রক্ষাকারী স্থানীয় মানুষেরও লাভ হতে পারে।

আন্তর্জাতিক জলবায়ু বিশেষজ্ঞ এবং ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. আইনুন নিশাত সমকালকে বলেন, সমীক্ষার সময় কার্বনের দাম বেশ ভালো ছিল। তখন কেন তা বিক্রি করা হয়নি, তা পরিস্কার নয়। তারপর থেকে কার্বন মার্কেটে ক্রেতা কমে কমেছে, দরও পড়ে গেছে। বাজারদর আবারও বাড়লে সুন্দরবনের কার্বন বিক্রি করার পরিকল্পনা নেওয়া উচিত।

বিক্রয়যোগ্য কার্বন আছে আরও ১১ বনে :সমীক্ষা অনুযায়ী, সুন্দরবন ছাড়াও দেশের আরও ১১টি বনকে কার্বন-বাণিজ্যের আওতায় নিয়ে আসা সম্ভব। সেগুলো হচ্ছে গাজীপুরের ভাওয়াল, টাঙ্গাইলের মধুপুর, সিলেটের খাদিমনগর, হবিগঞ্জের সাতছড়ি, মৌলভীবাজারের লাউয়াছড়া, চট্টগ্রামের কাপ্তাই ও দুধপুকুরিয়া জাতীয় উদ্যান এবং হবিগঞ্জের রেমা-কালেঙ্গার, কক্সবাজারের চকরিয়ার ফাসিয়াখালী, রাজঘাট-মধাকাচাপিয়া ও চট্টগ্রামের সীতাকু সংরক্ষিত বন।

মন্তব্য


অন্যান্য