বাংলাদেশ

নুসরাত

এ আঁধার কাটবেই

বিশেষ মন্তব্য

প্রকাশ : ১৪ এপ্রিল ২০১৯ | আপডেট : ১৪ এপ্রিল ২০১৯ | প্রিন্ট সংস্করণ

এ আঁধার কাটবেই

  মুস্তাফিজ শফি

'অমলকান্তি রোদ্দুর হতে চেয়েছিলো'- এই কবিতাপঙ্‌ক্তি এবং পেছনের আখ্যান কার না জানা! নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর কবিতার অমলকান্তির শেষ পরিণতি ছাপাখানার অন্ধকার। নুসরাত জাহান রাফি মেয়েটিও রোদ্দুর হতে চেয়েছিল- ক্ষান্ত বর্ষণ আর কাকডাকা বিকেলের সেই লাজুক রোদ্দুর, জাম আর জামরুলের পাতায় যা নাকি একটু অল্প হাসির মতোন লেগে থাকে। শ্নীলতাহানির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে সসম্মানে বাঁচতে চেয়েছিল সে। প্রতিবাদী কণ্ঠে বলেছিল- জীবনের শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত লড়ে যাব, অপরাধীদের ছাড় দেব না।

দুর্বৃত্তদের কালো থাবাতেই শেষ পর্যন্ত তাকে নিকষ অন্ধকারে ডুবে যেতে হয়েছে; তাকে গ্রাস করেছে নিগূঢ় রাত। ব্যক্তিগতভাবে যুদ্ধে হেরেও সে কিন্তু একটি যুদ্ধের শুরু করে দিয়ে গেছে। যে যুদ্ধ অন্ধকারের বিরুদ্ধে আলোর, অপরাধীদের বিরুদ্ধে শুভ শক্তির।

চারদিকে যখন বৈশাখী রঙের আবাহন, সমকালও যখন রঙে রঙে রঙিন হয়ে উঠছে নববর্ষের ছোঁয়ায়, ঠিক তখন আমরা নুসরাতকে নিয়ে কথা বলছি। বাঙালির সর্বজনীন অসাম্প্রদায়িক উৎসবে আজ রঙিন হবো আমরা। আবার প্রতিবাদীও হবো। নববর্ষের সোনারোদ যখন ভোরে আমাদের জানালায় উঁকি দেবে, উঠোনে ছড়াবে আলো, তখনও আমরা টের পাব আমাদের বোন, আমাদের কন্যা সাহসিকা নুসরাত অনন্ত আকাশ থেকে মুখ বাড়িয়ে ডাকছে। গলা ফাটিয়ে বলছে- 'ও আলোর পথযাত্রী, এ যে রাত্রি, এখানে থেমো না।'

নুসরাত ফেনী জেলার সোনাগাজী উপজেলার ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসার ছাত্রী। গত ২৭ মার্চ মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলা তার শ্নীলতাহানি করে। এই অভিযোগে পরিবারের পক্ষে থানায় মামলা করা হয়। এই মামলায় অধ্যক্ষ গ্রেফতারও হয়েছে। এর পর থেকেই মামলা তুলে নিতে নুসরাত এবং তার পরিবারকে দেওয়া হচ্ছিল নানা হুমকি ধমকি ও চাপ। শেষ পর্যন্ত ঘটল সেই নিষ্ঠুর, নির্মম ঘটনাটি। গত ৬ এপ্রিল পরীক্ষার হল থেকে মাদ্রাসার ছাদে ডেকে নিয়ে কেরোসিন ঢেলে নুসরাতের গায়ে আগুন ধরিয়ে দেয় অধ্যক্ষের পক্ষের লোকজন। তাদের পরনে ছিল বোরকা। মৃত্যুশয্যায় শুয়েই নুসরাত এ ব্যাপারে শেষ জবানবন্দি দিয়ে গেছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সে মারা গেছে ১০ এপ্রিল রাতে। জীবনযুদ্ধে হেরে গেলেও সমাজে যে আগুন ছড়িয়ে দিয়ে গেছে নুসরাত; তার আলোতেই এখন আমাদের পথ চলতে হবে। নৃশংস এই হত্যার ঘটনাকে কেন্দ্র করে সারাদেশের শুভবাদী মানুষ জেগেছে। তাদের কাছে নুসরাত এখন এক প্রতিবাদী চেতনা, অনুপ্রেরণার নাম। নুসরাতের মা শিরিন আক্তার ১২ এপ্রিল শুক্রবার সমকালকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এ ঘটনার প্রতিবাদে রাস্তায় নেমে আসা দেশবাসীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে ফেনীর আঞ্চলিক ভাষায় বলেছেন, 'আঁই চাই সবাই য্যান রাস্তাততুন না সরে। আঁর মাইয়ার সাহস য্যান হারা দেশে ছড়াই যায়।'

বৈশাখকে আহ্বান জানিয়ে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন- 'মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জরা,/ অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা।' আজ নববর্ষের দিনে আমরা নুসরাতের ছড়িয়ে দেওয়া সেই আগুনে স্নান করে শুচি হবো। নতুন শক্তি অর্জন করব। বৈশাখের তো দুই রূপ। একটি কোমল, একটি রুদ্র। আমরা এবার এই দুই রূপকেই ধারণ করব। উৎসবের আনন্দকে রূপ দেব প্রতিবাদে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে নেব শক্ত অবস্থান। নুসরাত হত্যার দ্রুত বিচার চাইব, নারী ও শিশু নির্যাতনের সব মামলার বিচার চাইব। দুর্বৃত্তদের সর্বোচ্চ শাস্তি চাইব।

আমরা সবাই জানি যে, বিচার ত্বরান্বিত হয় না বলেই দেশে এ রকম নৃশংস ঘটনা বাড়ছে। ১২ এপ্রিল সমকালের প্রথম পাতায় প্রকাশিত বিশেষ প্রতিবেদনেই বলা হয়েছে- পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী এ বছরের প্রথম তিন মাসে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনায় সারাদেশে অন্তত আড়াই হাজার মামলা হয়েছে। আর বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ জানিয়েছে, দেশের প্রধান সংবাদ মাধ্যমগুলোতে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী একই সময়ে সহস্রাধিক নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। তার মানে, এ ধরনের সহিংসতার অধিকাংশ ঘটনাই গণমাধ্যমে আসে না; থেকে যায় লোকচক্ষুর অন্তরালে। আর এ সুযোগে সংশ্নিষ্ট দুর্বৃত্তরাও থেকে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে।

গত ১১ এপ্রিল হাইকোর্ট একটি নির্দেশনা দিয়েছেন, যা ১২ এপ্রিল সমকালসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। দেশের সর্বোচ্চ আদালত বলেছেন, মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফির গায়ে আগুন দিয়ে হত্যার ঘটনা তদন্তে গফিলতি হলে প্রয়োজনে হস্তক্ষেপ করা হবে। আদালত কোনোভাবেই চান না সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনী, চট্টগ্রামের মিতু কিংবা কুমিল্লার তনু হত্যা মামলার মতো এ মামলা হারিয়ে যাক। এখানে লক্ষণীয় বিষয়; সর্বোচ্চ আদালতেরও পর্যবেক্ষণ- তদন্তে গাফিলতির কারণে অনেক গুরুত্বপূর্ণ মামলা লোকচক্ষুর আড়ালে হারিয়ে যায়। অনেকে চাপে পড়ে আপস করতেও বাধ্য হন। এই হারিয়ে যাওয়ার ধারাবাহিকতা, এই আপস যতদিন থাকবে, ততদিন নারী-শিশু নির্যাতন ও হত্যা বন্ধ হবে না, বরং বাড়বে। এটা তো চিরন্তন সত্য- বিচারহীনতা যে কোনো অপরাধকেই উৎসাহিত করে। তবে নুসরাত ঘটনার পর আশার কথা হলো, মানুষ জেগেছে, রাস্তায় নেমেছে। যার যার অবস্থান থেকে কথা বলছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও একাধিকবার বলেছেন, নুসরাত হত্যাকারীদের ছাড় দেওয়া হবে না। তদন্তে ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটিত হয়েছে। জড়িতদের চিহ্নিত করে বেশিরভাগকে গ্রেফতারও করেছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। এবার বিচার দেখার পালা। কোনো জটিলতায় এই বিচারের গতি শ্নথ হোক এটা নিশ্চয়ই আমরা কেউ চাইব না।

নুসরাত এখন আর একা নেই। সে এখন দেশের কোটি মানুষের হৃদয়ে 'কন্যা সাহসিকা'। আজ পহেলা বৈশাখে বর্ষবরণের দিনেও তার জন্য রাস্তায় নামবে মানুষ। উৎসব আয়োজনের পাশাপাশি চাইবে তার হত্যার বিচার। আলাদা কর্মসূচিও পালিত হবে। কেউ কেউ কালো গেঞ্জি পরবেন, কালো ব্যাজ ধারণ করবেন। ছায়ানট তো রাজধানীর রমনা বটমূলে তাদের ঐতিহ্যবাহী বর্ষবরণ আয়োজনের এবারের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করেছে 'অনাচারের বিরুদ্ধে জাগ্রত হোক শুভবোধ'। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের মঙ্গল শোভাযাত্রা শেষে বিভিন্ন সংগঠন নুসরাত হত্যার প্রতিবাদে আলাদা কর্মসূচি নিয়ে রাস্তায় নামবে। শাহবাগ থেকে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার পর্যন্ত পদযাত্রা করবে।

নুসরাতের ঘটনাটি আমাদের সামনে আরও কিছু বিষয় নিয়ে এসেছে। মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থা এবং পাঠ্যসূচি নিয়েও আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় একটি সর্বজনীন শিক্ষা ব্যবস্থার দাবি তো দীর্ঘদিনের। স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর কারণেই সেটা আমরা করতে পারিনি। যত কষ্টকরই হোক, পেছনে যত রাজনীতি এবং স্বার্থই থাকুক, একটি প্রগতিশীল, সর্বজনীন শিক্ষাব্যবস্থায় ফিরে যাওয়া ছাড়া আমাদের এখন আর কোনো বিকল্প নেই। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডি নিয়েও ভাবতে হবে। তারা সক্রিয় থাকলে তো সিরাজ-উদ-দৌলার মতো বর্বর মানুষ একটি মাদ্রাসার অধ্যক্ষ থাকতে পারে না। সে জামায়াতের লোক। তার সখ্য ছিল সরকারি দলের স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে। সবকিছু সে দিনের পর দিন ম্যানেজ করেছে টাকা দিয়ে। একজন দুর্বৃত্তের কাছে সবাই মাথা বিক্রি করে দেবে- এ কেমন কথা! কোন সভ্য সমাজে বাস করছি আমরা?

'আমি লড়ব শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত। আমি প্রথমে যে ভুলটা করেছি আত্মহত্যা করতে গিয়ে; সেই ভুলটা দ্বিতীয়বার করব না। মরে যাওয়া মানেই হেরে যাওয়া। আমি মরব না; আমি বাঁচব। আমি তাকে শাস্তি দেব, যে আমায় কষ্ট দিয়েছে। আমি তাকে এমন শাস্তি দেব যে, তাকে দেখে অন্যরা শিক্ষা নেবে'- নুসরাতের সর্বশেষ বক্তব্য, তার লেখা চিরকুট পর্যালোচনা করলে সহজেই অনুমেয়, যে কোনো অবস্থান থেকেই প্রতিবাদ করা যায়। ব্যক্তিগত যুদ্ধে হেরে গেলেও সে কিন্তু একটি যুদ্ধের ডাক দিয়ে গেছে। জ্বালিয়েছে আলোর মশাল। আমাদেরকে সেই মশাল নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। আমরা যদি হেরে যাই, তাহলে হরে যাবে বাংলাদেশ। অতীতে বহুবার আমরা হেরেছি। আর হারতে চাই না। এবার যুদ্ধ জয় করে ফসল ঘরে তুলতে চাই। আমাদের লড়াই করার সাহস আছে; লড়াই করে জেতার ইতিহাসও আছে। নারী হত্যার প্রতিবাদে, শিশু হত্যার প্রতিবাদে, সব নির্যাতন-নীপিড়ন প্রতিরোধে আবার রচিত হোক নয়া ইতিহাস।

নুসরাত, বোন আমাদের, কন্যা আমাদের- তুমি ঘুমাও, আমরা জেগে আছি। আঁধার কেটে আলো আসবেই। আলো আসবেই।

মন্তব্য


অন্যান্য