বাংলাদেশ

অসাম্প্রদায়িক উৎসবের দিন

প্রকাশ : ১৪ এপ্রিল ২০১৯ | প্রিন্ট সংস্করণ

অসাম্প্রদায়িক উৎসবের দিন

  দীপন নন্দী

সূর্য উঠেছে পুবাকাশে। নতুন এক ভোর নিয়ে। যে ভোরের সঙ্গে সঙ্গে যাত্রা শুরু করেছে নতুন আরেকটি বাংলা বছর। তাকে স্বাগত জানাতে, উদ্‌যাপন করতে সমগ্র বাঙালি জাতি আজ এক কাতারে। ধর্ম, বর্ণ, গোত্র নির্বিশেষে বাঙালির একমাত্র অসাম্প্রদায়িক উৎসবের দিন এটি। যা নিয়ে কথা বলেছেন ভাষাসংগ্রামী ও রবীন্দ্রগবেষক আহমদ রফিক, 'আমাদের এখানে ধর্মনিরপেক্ষ আর কোনো জাতীয় উৎসব নেই। অসাম্প্রদায়িকতার দিক থেকে বিবেচনা করলে পহেলা বৈশাখ অধিক গুরুত্বপূর্ণ। প্রকৃতিগতভাবেও বৈশাখ গুরুত্বপূর্ণ। একদিকে ফসলি মাস, অন্যদিকে কালবৈশাখী। সব মিলিয়ে বৈশাখ উদ্দীপনামূলক এক মাস, যা আমাদের জীবনে নতুন মাত্রা যোগ করে।'

পঞ্জিকার পালাবদলে আজ রোববার পহেলা বৈশাখের দিন। মুঘল সম্রাট আকবরের আমলে যা ছিল খাজনা উপলক্ষ, তা এখন উদ্‌যাপনের উৎসব। আবহমানকাল বাংলার গ্রামীণ জনপদে উদ্‌যাপিত হওয়া নববর্ষের আয়োজন এখন ছুঁয়েছে নগর জীবনে এবং নতুন মাত্রায়। সর্বত্র উদযাপিত হচ্ছে বাংলার উৎসব, উচ্চারিত হচ্ছে বাঙালিয়ানার জয়গান। কণ্ঠে কণ্ঠে ধ্বনিত হচ্ছে, 'সবার উপরে মানুষ সত্য।'

এ নিয়ে শিক্ষাবিদ যতীন সরকার বলেন, বাঙালি সমাজের মানুষ বিভিন্ন ধর্ম-সম্প্রদায়ভুক্ত হলেও বাঙালিত্বকে তারা অধিষ্ঠিত রেখেছে সমস্ত প্রকার ধর্ম-সাম্প্রদায়িকতার ঊর্ধ্বে, সম্প্রদায়নিরপেক্ষ প্রকৃতি-চেতনা ও পরিপার্শ্ব ভাবনা থেকেই উৎসারিত হয়েছে তাদের সব উৎসব। এটি বিশেষভাবে রূপ পেয়েছে ঋতুপরিবর্তনকে কেন্দ্র করে। এই ঋতু-উৎসবের সূচনারূপেই ঘটা করে উদযাপিত হয় নববর্ষ বা বর্ষবরণের উৎসব। শুধু বর্ষবরণ নয়, বর্ষবিদায়ও। চৈত্রসংক্রান্তির বর্ষবিদায়ের মধ্য দিয়েই সূচিত হয় পহেলা বৈশাখের বর্ষবরণ। বাঙালি সমাজ আবহমানকাল ধরে লৌকিক রীতিতেই বর্ষবিদায় ও বর্ষবরণ উৎসব করে আসছে। এ উৎসবের রীতি-পদ্ধতিতে সাম্প্রদায়িক ধর্মতন্ত্রের কোনো ছোঁয়া লাগেনি।'

বাংলা নববর্ষের ইতিহাস নিয়ে 'নববর্ষে দেনা শোধ করে...' শীর্ষক প্রবন্ধে বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান লিখেছেন, 'আমাদের দেশে ১০ই মার্চ ১৫৮৫ খ্রি. মোঘল সম্রাট বাদশাহ আকবরের ফরমান অনুযায়ী আমির ফতেউল্লাহ সিরাজী উদ্ভাবিত বাংলা ফসলি সাল নববর্ষ চালু হয়। ১০ই মার্চ থেকেই তখন (১ বৈশাখ ছিল) নতুন সাল গণনা হতো। বাংলাদেশে এবং বাংলাদেশের বাইরে এখন পয়লা বৈশাখই বাঙালির নববর্ষ হিসেবে পালিত হয়। কিন্তু উদযাপনের দিন বাংলাদেশে বাংলা একাডেমীর সুপারিশকৃত পঞ্জিকাই অনুসরণ করা হয়। বাংলা নববর্ষ সম্রাট আকবর চালু করেছিলেন রাজস্ব আদায়ের জন্য। এর সঙ্গে যতই উৎসব আনুষ্ঠানিকতা থাক, মূলে ছিল অর্থনীতি।'

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী সমকালকে বলেন, 'পহেলা বৈশাখ শুধু আমাদের একার উৎসব নয়। গোটা অঞ্চলেই বৈশাখ উদ্‌যাপিত হয়। সেই সঙ্গে পুরো অঞ্চলেই প্রকৃতির বদল হয়। আমরা নিজস্ব সংস্কৃতির কথা বলি, সেটার সঙ্গে প্রকৃতির সংলগ্নতা রয়েছে। এটাই আমাদের সংস্কৃতির অন্যতম উপাদান। কিন্তু এখন প্রকৃতির সঙ্গে বিচ্ছিন্নতার সৃষ্টি হচ্ছে, যা শুধু আমাদের সংস্কৃতির জন্য নয়, অর্থনীতি ও সামাজিক জীবনের জন্যেও ক্ষতিকর। বৈশাখে প্রকৃতির সঙ্গে মৈত্রীর সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে- এটাই নববর্ষের অনুভূতি। পহেলা বৈশাখকে আমরা আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ করে তুলতে পারব যদি অর্থবছর বৈশাখ থেকে শুরু হয়। যেহেতু এটির প্রচলন নেই, সেহেতু পহেলা বৈশাখের তুলনায়, পহেলা জানুয়ারি আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়েছে। কারণ, সেখান থেকে অর্থবছর ও শিক্ষাবছর শুরু হয়। প্রকৃতিগতভাবেই পহেলা বৈশাখ থেকে অর্থবছর শুরু করা সম্ভব।'

কথাসাহিত্যিক আনোয়ারা সৈয়দ হক বর্ষবরণের এ আয়োজনকে 'বৃহত্তর সাংস্কৃতিক চেতনার উন্মেষ' বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, পহেলা বৈশাখ আমাদের একমাত্র অসাম্প্রদায়িক উৎসব। আমাদের জাতিসত্তার চেতনার দিক থেকে বিবেচনা করলে আমরা সেটিই দেখতে পাই। আমাদের দেশে ধর্ম, বর্ণ, সংস্কৃতিতে ভিন্ন হলেও, আমরা চেতনাগত দিক থেকে সহমত। আমরা বিশ্বাস করি 'ধর্ম যার যার, উৎসব সবার'। পহেলা বৈশাখ সে চেতনার উন্মেষ ঘটায়। এ উৎসবকে ঘিরেই আমাদের বৃহত্তর সাংস্কৃতিক চেতনা আবর্তিত হয়।

বর্তমানে পয়লা বৈশাখের আয়োজনে মুখ্য হয়ে উঠেছে সাংস্কৃতিক কার্যক্রম, যা প্রবর্তনের কৃতিত্ব প্রায় পুরোটুকুই বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের। তিনি শান্তিনিকেতনে প্রথম ঋতুভিত্তিক উৎসবের আয়োজন করেন। সেই ধারাবাহিকতায় বাংলার প্রান্ত থেকে শহরে ছড়িয়ে পড়ে বর্ষবরণের আয়োজন। ১৯৬১ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে রবীন্দ্রচর্চা নিষিদ্ধ করার চেষ্টা হয়েছিল, সেই চেষ্টা প্রতিরোধেরও অংশ হয়ে গিয়েছিল বর্ষবরণের আয়োজন।

এ বিষয়ে শিক্ষাবিদ ও কথাসাহিত্যিক অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বলেন, বৈশাখ প্রকৃতিতে সব রঙ নিয়ে আসে। বৈশাখ মানেই রঙের মেলা। যদিও এ সময় প্রকৃতি খুব কঠোর থাকে, যার মাধ্যমে বৈশাখ আমাদের মধ্যে সুদৃঢ় এক শক্তি তৈরি করে দেয়। বৈশাখে প্রকৃতির বৈপরীত্য থাকে। একটি কোমল, আরেকটি রূঢ় রূপ। এটা ঠিক বাঙালিদের চরিত্রের মতো। সব মিলিয়ে আমার কাছে বৈশাখ মানে আত্মআবিস্কারের মাস। যেখানে আমাদের মেধা-মনীষার সৃজনশীল সব উপাদানই রয়েছে।

গ্রামীণ জীবন থেকে শহুরে জীবনে বাংলা নববর্ষ উদ্‌যাপনের ব্যাপকতা লাভ করে ১৯৬৭ সালে রমনা উদ্যানের অশ্বত্থমূলে ছায়ানটের প্রভাতি আয়োজনের মধ্য দিয়ে। এ পথচলা এত সহজ ছিল না। পাকিস্তান আমলে তো বটেই, স্বাধীন বাংলাদেশেও আক্রমণের শিকার হয়েছে এ উৎসব। ২০০১ সালে ধর্মীয় উগ্রবাদীদের বোমায় রক্তাক্ত হয়েছে। রমনায় বোমা হামলা করেও সংস্কৃতির অগ্রযাত্রা থামাতে পারেনি ধর্মীয় উগ্রবাদীরা। পরের বছর থেকে বিপুল উৎসাহে মানুষ বর্ষবরণের আয়োজনে যোগ দিয়ে আসছেন। তবুও ধর্মীয় উগ্রবাদীদের আস্ম্ফালন এখনও থেমে নেই। তারা পহেলা বৈশাখ উদ্‌যাপনকে 'ইমান-আকিদাবিরোধী হিন্দুয়ানি শিরকি অপসংস্কৃতি' দাবি করে আসছে। সে সঙ্গে তা বন্ধ করতে সরকারের কাছে দাবি জানিয়ে আসছে।

তবে ধর্মের সঙ্গে বর্ষবরণের মতো সংস্কৃতি সাংঘর্ষিক নয় বলে মনে করেন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব আসাদুজ্জামান নূর। তিনি বলেন, 'সত্যিকার অর্থে ধর্মের সঙ্গে সংস্কৃতির কোনো বিরোধ নেই। প্রতিটি ধর্মের মূল কথা হলো সুন্দরভাবে বাঁচা, সংস্কৃতি তো সেই কথাই বলে। সংস্কৃতি সুন্দরের সঙ্গে জীবনের সংযোগ ঘটায়। বর্ষবরণ উৎসবের মধ্য দিয়ে আমরা সেই বার্তাই প্রতিবছর দিয়ে আসছি।'

সেই বার্তা নিয়েই আজ দেশব্যাপী উদ্‌যাপিত হচ্ছে বাংলা নববর্ষ। কায়মনে বাঙালি প্রার্থনা করবে- 'মুছে যাক গ্লানি ঘুচে যাক জরা/ অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা...।'

মন্তব্য


অন্যান্য