বাংলাদেশ

ভূমিতে দুর্নীতির বিষবৃক্ষ

প্রকাশ : ১৩ জানুয়ারি ২০১৯ | প্রিন্ট সংস্করণ

ভূমিতে দুর্নীতির বিষবৃক্ষ

  হকিকত জাহান হকি

ভূমি মন্ত্রণালয়ের অসৎ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনিয়ম, দুর্নীতি, জালিয়াতি ও স্বেচ্ছাচারিতার কারণে ভূমি খাত দুর্নীতির বিষবৃক্ষে পরিণত হয়েছে। সংশ্নিষ্টরা বলছেন, বিগত দিনে মন্ত্রণালয় কর্তৃপক্ষ ও কতিপয় অসাধু কর্মকর্তার লোভ-লালসার কারণে মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রম থেকে শুরু করে ইউনিয়ন ভূমি অফিস পর্যন্ত দুর্নীতি ছড়িয়ে পড়েছে। এর বিনিময়ে মোটা অঙ্কের অর্থ, সম্পদ ও কোনো কোনো ক্ষেত্রে জমির মালিক হয়েছেন দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।

লাগামহীন দুর্নীতি চলছে গোটা ভূমি খাতে। জানা গেছে, এ খাতে খাজনা আদায়, জমি রেজিস্ট্রেশন, নামজারি, জমির শ্রেণি পরিবর্তন, ভূমি অধিগ্রহণে চেক জালিয়াতি, নীতিমালা ভঙ্গ করে জমি বরাদ্দ দেওয়া, জলমহাল ইজারাসহ নানা ক্ষেত্রে অবাধ দুর্নীতির প্রমাণ রয়েছে। মন্ত্রণালয়ের সদ্য বিদায়ী কর্তৃপক্ষের অবহেলা, উদাসীনতা ও দুর্নীতিপরায়ণ মানসিকতার কারণে জনসম্পৃক্ত অতিগুরুত্বপূর্ণ এই খাতের ভাবমূর্তি দারুণভাবে ক্ষুণ্ণ হয়েছে।

নতুন ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে অনিয়ম, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। তিনি বলেছেন, যেসব কর্মকর্তা দুর্নীতিপ্রবণ তারা যেন চলে যান। মন্ত্রণালয়ে থাকতে হলে জনগণের স্বার্থে সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করতে হবে।

ভূমিমন্ত্রী সমকালকে বলেন, ভূমির সব কাজে শতভাগ স্বচ্ছতা, জবাবদিহি নিশ্চিত করা হবে। নীতি ও আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যে সব কাজ করা হবে। ভূমি ব্যবস্থাপনা আধুনিকায়নের মাধ্যমে অনিয়ম-দুর্নীতি বন্ধ করা হবে। ভূমি ব্যবস্থাপনা ডিজিটালাইজড করা, অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও সেবার মান বৃদ্ধির লক্ষ্যে শিগগির দুই বছরের পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হবে। প্রতিটি ভূমি অফিসের কার্যক্রম অটোমেশনের আওতায় আনা হবে। প্রতিটি অফিসে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হবে। ভূমির দুর্নীতি ঝেঁটিয়ে বিদায় করা হবে। এই খাতে মানুষের হয়রানি, ভোগান্তি বন্ধ করা হবে। সাধারণ মানুষ যাতে সহজে উন্নত সেবা পায় সে ব্যবস্থাই করা হবে। ভূমি খাতের দুর্নীতির ক্ষেত্রে জিরো টলারেন্স নীতি বাস্তবায়ন করা হবে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান সমকালকে বলেন, সবচেয়ে দুর্নীতিপ্রবণ খাতগুলোর মধ্যে ভূমি অন্যতম। দেশে এমন কোনো পরিবার নেই যারা কোনো না কোনোভাবে ভূমির দুর্নীতির শিকার হয়নি। শুধু ব্যক্তি মালিকানাধীন ভূমি নয়, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ভূমি নিয়েও বড় ধরনের দুর্নীতি হয়। মন্ত্রীর দুটি দিকেই দৃষ্টি দিতে হবে। দায়িত্ব গ্রহণের পর দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর মনোভাব ও বক্তব্য দেওয়ায় ভূমিমন্ত্রীকে তিনি সাধুবাদ জানান। তবে বলেন, মন্ত্রীর ঘোষণা কতটুকু বাস্তবায়ন হবে সেটি দেখার অপেক্ষায় থাকবে দেশবাসী।

সদ্য বিদায়ী সরকারের সময় সাইফুজ্জামান চৌধুরী ভূমি প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন। মন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন শামসুর রহমান শরীফ। ওই সময় প্রতিমন্ত্রী মন্ত্রণালয়ের অনেক নিয়মবহির্ভূত কাজের প্রতিবাদ করেছেন। তার প্রতিবাদ, সুপারিশ আমলে নেওয়া হয়নি। দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠী মৎস্যজীবীদের জলমহাল ইজারা দেওয়ার ক্ষেত্রে অনিয়ম, দুর্নীতির ঘটনা ঘটেছে। স্থানীয় প্রভাবশালীদের কাছ থেকে আর্থিক সুবিধা নিয়ে খেটে খাওয়া মৎস্যজীবীদের জলমহাল বিত্তবানদের ইজারা দেওয়া হয়েছে।

নতুন ভূমিমন্ত্রী ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে মন্ত্রণালয়, সংশ্নিষ্ট দপ্তর, অধিদপ্তর, সারাদেশের অ্যাসিল্যান্ড, ভূমি অফিসের সর্বস্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীর সম্পদের হিসাব নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। শিগগির মন্ত্রণালয় থেকে এ-সংক্রান্ত আদেশ জারি করা হবে।

মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্পদের হিসাব নেওয়ার বিষয়ে ভূমিমন্ত্রীর ঘোষণার বিষয়ে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, এটি একটি সুনির্দিষ্ট ঘোষণা। দুর্নীতির বিরুদ্ধে এটি একটি নতুন মাত্রা। এর যথার্থতা প্রমাণিত হবে বাস্তবায়নে। তার মেয়াদের পরেই বোঝা যাবে সেটি কতটুকু কার্যকর হলো। তাদের সম্পদে যদি অসামঞ্জস্য থাকে সে ক্ষেত্রে তিনি সংশ্নিষ্টদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন সেটি দেখার জন্য দেশবাসী অপেক্ষা করবে। প্রতি বছরই ওই হিসাব নেওয়া হলে মন্ত্রীর উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের সুযোগ তৈরি হবে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিগত দিনে ভূমি মন্ত্রণালয় কর্তৃপক্ষ দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর না হওয়ায় সারদেশের ভূমি অফিসগুলো দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে। ভূমি উন্নয়ন করসহ অন্যান্য খাতের আদায় হওয়া অর্থ আত্মসাৎ করা হচ্ছে অবাধে। সাব রেজিস্ট্রার ও এসি ল্যান্ড অফিসে জালিয়াতি করে ভূমির শ্রেণি পরিবর্তন করে জমির মালিকদের কাছ থেকে হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে মোটা অঙ্কের টাকা। উচ্চমানের আবাসিক, বাণিজ্যিক শ্রেণির জমিকে 'নাল' 'ডোবা' দেখানো হচ্ছে। এতে সরকার প্রতিবছর মোটা অঙ্কের রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

সাইফুজ্জামান চৌধুরী ভূমি প্রতিমন্ত্রী থাকাকালে সমকালকে বলেছিলেন, শ্রেণি পরিবর্তন করে জমির রেজিস্ট্রেশন ও নামজারির ক্ষেত্রে রাজস্ব ফাঁকি, অনিয়ম, দুর্নীতি হচ্ছে- এটা অস্বীকার করা যায় না। তিনি বলেছিলেন, জমির দলিল, নামজারি ও খাজনা পরিশোধে অনলাইন সিস্টেম চালু করা হবে। এ পদ্ধতিতে একদিকে দুর্নীতির সুযোগ কমে আসবে, অন্যদিকে দেশের মানুষ হয়রানি থেকে রেহাই পাবে। ওই অনলাইন পদ্ধতি এখন পর্যন্ত চালু হয়নি। এবার তিনি খোদ মন্ত্রীর দায়িত্বে থেকে কাজটি কতটুকু করতে পারেন- এটাই এখন দেখার বিষয়।

ভূমি অধিগ্রহণের চেক জালিয়াতি করেও দুর্নীতি করা হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত জমির মালিকের এলএ (ভূমি অধিগ্রহণ) চেকে অযৌক্তিভাবে 'বাতিল' লিখে ভয় দেখিয়ে ক্ষতিগ্রস্তের কাছ থেকে আর্থিক সুবিধা নিয়ে পরে 'বাতিল নয়' লেখা হচ্ছে।

খাজনার দাখিলায় কারসাজি করে সরকারকে রাজস্ব বঞ্চিত হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে জমির মালিককে দেওয়া খাজনা রশিদে (দাখিলা) আদায় করা পুরো টাকা উল্লেখ করে এবং দাখিলার সংরক্ষিত অফিস কপিতে তুলনামূলক কম টাকা উল্লেখ করে বাকি টাকা আত্মসাৎ করা হচ্ছে। এমন ঘটনাও আছে যে, খাজনা আদায়কালে রসিদ বইয়ে থাকা কার্বন কপি কৌশলে ভাঁজ করে জমির মালিককে দেওয়া দাখিলায় ১০০ টাকা লেখা হয়। পরে জমির মালিক চলে যাওয়ার পর রসিদ বইয়ে থাকা কার্বন পেপার মেলে ১০ টাকা লেখা হয়। বাকি ৯০ টাকা আত্মসাৎ করেন ভূমি অফিসের সংশ্নিষ্ট কর্মকর্তারা।

সূত্র জানায়, দেশের ২৬ হাজার জলমহালের মধ্যে ৯০ শতাংশই প্রভাবশালীদের দখলে। জলমহালগুলো নিজেদের হাতে রাখতে স্থানীয় প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় এক বা একাধিক মৎস্যজীবী সমিতি গঠন করা হয়ে থাকে। তাতে নিয়ম অনুযায়ী ইজারায় অংশ নেওয়া ও তদবির করে মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে পছন্দের জলমহালগুলো তাদের কর্তৃত্বে রাখতে সুবিধা হয়।

বিগত দিনে মন্ত্রণালয় নীতিমালা লঙ্ঘন করে সর্বোচ্চ দরদাতাকে পাশ কাটিয়ে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ দরদাতাকে জলমহাল ইজারা দিয়েছে। এর মধ্যে পাবনার সুজানগর উপজেলার বিলগম গাড়া, বিল কালিদহ, বিল মহিষাখালী ও বিল শাকনাই জলমহালটির সর্বোচ্চ দরদাতা বোনকোলা মৎস্যজীবী সমবায় সমিতিকে বাদ দিয়ে সৈয়দপুর দক্ষিণপাড়া মৎস্যজীবী সমবায় সমিতিকে ইজারা দেওয়া হয়েছে। সিলেট সদর উপজেলার তিনমুড়ি ধূমখাল জলমহালটির সর্বোচ্চ দরদাতা জিলকার হাওর মৎস্যজীবী সমবায় সমিতিকে বাদ দিয়ে রহমানিয়া মৎস্যজীবী সমবায় সমিতিকে ইজারা দেওয়া হয়েছে।

জাতীয় মৎস্যজীবী সমিতির সভাপতি ইসলাম আলী সমকালকে বলেন, 'জাল যার জলা তার'- বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের এই ঘোষণা এখন শুধুই একটি স্লোগান। তিনি আরও বলেন, রাজনৈতিক প্রভাবশালীরাও জলমহাল দখল ও ভোগের সঙ্গে জড়িত।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ওয়ান-ইলেভেনের পর দুর্নীতির দায়ে জেলে যাওয়া মন্ত্রণালয়ের ব্যক্তিগত কর্মকর্তা (পিও) কুতুব উদ্দিন আহমদ লাগামহীন দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। রাজধানীর গুলশানে বাড়িসহ সরকারি জমি দখলের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দায়ের করা মামলায় সম্প্রতি তিনি জেলে যান।

ভূমি মন্ত্রণালয়ের কর্মচারী হয়ে খাদ্য অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক পদে চাকরি দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে রাজশাহীর বোয়ালিয়া থানার জাহাঙ্গীর আলমের কাছ থেকে সাত লাখ টাকা ঘুষ নেওয়ার অভিযোগে দায়ের করা দুদকের আরেক মামলায় ভূমি মন্ত্রণালয়ের কর্মচারী আনোয়ার হোসেন বখতিয়ারও জেলে যান। পরে তিনি জামিনে মুক্ত হয়ে কারাগারে থাকা ১৭ দিনও হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করেছেন। এ ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয়ের প্রশাসন শাখা তাকে সহায়তা করেছে।

সংশ্লিষ্ট খবর


মন্তব্য যোগ করুণ

পরের
খবর

আন্দোলন হলেই সড়ক আইন নিয়ে তোড়জোড়


আরও খবর

বাংলাদেশ

বিধি প্রণয়নে কাজ শুরু করেনি মন্ত্রিদের কমিটি

আন্দোলন হলেই সড়ক আইন নিয়ে তোড়জোড়

যশোরে স্কুলছাত্রীর পা বিচ্ছিন্ন

প্রকাশ : ২১ মার্চ ২০১৯ | প্রিন্ট সংস্করণ

বুধবার যশোর-বেনাপোল সড়কের নাভারণে পিকআপের ধাক্কায় স্কুলছাত্রীর পা হারানোর পর বিক্ষুব্ধ এলাকাবাসী ও সহপাঠীরা সড়ক অবরোধ করে গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয় - সমকাল

  রাজীব আহাম্মদ

সংসদে পাসের ছয় মাস পরও বহুল আলোচিত 'সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮' প্রয়োগ ও বাস্তবায়নের অনেক ধাপ এখনও বাকি। বিধিমালা প্রণয়নের পর আইনটি প্রয়োগ শুরু হবে। বিধিমালা প্রণয়নে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নেতৃত্বে তিন মন্ত্রীর সমন্বয়ে কমিটি গঠন করা হয়। মাস পেরুলেও এই কমিটি এখনও প্রথম বৈঠকই করতে পারেনি।

পরিবহন খাত সংশ্নিষ্টরা বলছেন, আন্দোলন ছাড়া সড়ক পরিবহন আইন কখনই গতি পায়নি। আলোচিত দুর্ঘটনায় প্রাণহানিতে যখনই নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলন হয়েছে, শুধু তখনই আইনটির বিষয় আলোচনায় এসেছে। পরিস্থিতি শান্ত হলে ফের থমকে গেছে।

গত বছরের জুলাইয়ে রাজধানীর খিলক্ষেতে বেপরোয়া বাসের চাপায় দুই কলেজ শিক্ষার্থীর মৃত্যুর পর সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলন। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে আট বছর ঝুলে থাকা সড়ক পরিবহন আইনের খসড়া এ ঘটনার সাত দিনের মধ্যে মন্ত্রিসভার চূড়ান্ত অনুমোদন পায়।

সড়কের নিরাপত্তা নিয়ে দেশজুড়ে তুমুল আলোচনার মধ্যেই সাজা ও জরিমানা আগের তুলনায় কয়েক গুণ বাড়িয়ে গত ১৯ সেপ্টেম্বর সংসদে পাস হয় সড়ক পরিবহন আইন। দুর্ঘটনায় মৃত্যুর সাজা তিন বছরের জেল থেকে বাড়িয়ে পাঁচ বছর করা হয়। ৩০২ ধারায় বিচার, অর্থাৎ ইচ্ছাকৃত হত্যা প্রমাণ হলে মৃত্যুদণ্ডের সুযোগ রাখা হয়। বেপরোয়া গাড়ি চালালে দুই বছরের জেল, ভুয়া লাইসেন্সের জন্য এক বছরের জেলের বিধান করা হয়। সড়কে দুর্ঘটনার জন্য দায়ী কর্মকর্তাদেরও শাস্তির আওতায় আনার সুযোগ রয়েছে আইনে। নাগরিক সমাজের প্রশংসা পাওয়া আইনটি গত বছরের ৮ অক্টোবর গেজেট হয়। কিন্তু বিধিমালা না হওয়ায় কার্যকর হয়নি।

আইনটি বাস্তবায়নে গত মাসে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে প্রধান করে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। আইনমন্ত্রী আনিসুল হক ও রেলমন্ত্রী নূরুল ইসলাম সুজন কমিটির সদস্য। তাদের দায়িত্ব বিধিমালা প্রণয়ন করা। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিলের ২৬তম সভায় এ কমিটি গঠনের সময় সড়ক পরিবহনমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছিলেন, বিধি প্রণয়নসহ বাস্তবসম্মত সংশোধনের দিকগুলো দেখবেন তিন মন্ত্রী।

তবে এখন পর্যন্ত বৈঠকে বসেনি ওই কমিটি। রেলমন্ত্রী নূরুল ইসলাম সুজন সমকালকে বলেছেন, তাকে কমিটিতে সদস্য হিসেবে রাখা হয়েছে। এখনও বৈঠক ডাকা হয়নি। ডাক পেলে যাবেন। আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন, কমিটির বৈঠক না হলেও বিধিমালা প্রণয়নের কাজ শুরু হয়েছে। কবে নাগাদ এ কাজ শেষ হবে, তা বলেননি তিনি।

বিআরটিএ সূত্রের খবর, দুই বছর পর্যন্ত লাগতে পারে। ইতিমধ্যে পরিবহন মালিক-শ্রমিক নেতারা আইনটি শিথিল করতে দাবি তুলেছেন। আইনের অনেক সাজাকে খুব বেশি কঠোর বলছেন তারা। সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, পরিবহন নেতাদের 'চাপে' কার্যকরের আগেই সংশোধন হতে পারে বহুল আলোচিত পরিবহন আইন। বিধিমালাতেও কিছু ছাড় আসতে পারে তাদের জন্য।

বিধিমালা না হওয়া পর্যন্ত ৩৬ বছরের পুরনো মোটরযান অধ্যাদেশ-১৯৮৩ দিয়ে চলবে দেশের পরিবহন খাত। নতুন আইনের বর্ধিত সাজা ও জরিমানা ভোগ করতে হবে না দায়ীদের। সড়ক পরিবহন আইনের ১২৫ (৪) ধারায় বলা হয়েছে, 'এই আইনের অধীন বিধি বা প্রবিধান প্রণীত না হওয়া পর্যন্ত উক্ত অধ্যাদেশের (সড়ক পরিবহন অধ্যাদেশ-১৯৮৩) এর অধীন প্রণীত বিধি, প্রবিধান, আদেশ, নির্দেশাবলি, প্রজ্ঞাপন, ইত্যাদির কার্যকারিতা বলবৎ থাকিবে।'

হাইকোর্টের আইনজীবী মাহবুবুল আলম বলেন, নতুন আইন কার্যকর না হওয়ার মানে পুরনো আইনে বিচার হবে। গত মঙ্গলবার কুড়িলে যে বেপরোয়া বাসের চাপায় বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী আবরার আহমেদ চৌধুরী নিহত হয়েছেন, তার চালক দুর্ঘটনার জন্য আদালতে অপরাধী প্রমাণিত হলেও তিন বছরের বেশি তাকে সাজা ভোগ করতে হবে না। নতুন আইন কার্যকর থাকলে তার পাঁচ বছর জেল হতে পারত। মোটা অঙ্কের জরিমানা দিতে হতো বাস মালিককে।

পরিবহন খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিআরটিএর চেয়ারম্যান মশিয়ার রহমান বলেন, আইনে কোন অপরাধে কী সাজা ও কত টাকা জরিমানা হবে তা নির্ধারণ করা হবে। আইনে চালক লাইসেন্সে ১২ পয়েন্ট রাখা হয়েছে। অপরাধ করলে পয়েন্ট কাটা যাবে। সব পয়েন্ট কাটা গেলে লাইসেন্স কাটা যাবে। কোন অপরাধে কত পয়েন্ট কাটা হবে, তা আইনে নেই। বিধিমালার মাধ্যমে নির্ধারণ করা হবে। আরও কিছু বিষয় রয়েছে যা বিধি দ্বারা নির্ধারণ করা হবে। তাই বিধিমালা না হওয়া পর্যন্ত আইন কার্যকর হবে না।

আইনের খসড়া প্রণয়নে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিত্ব করা একাধিক বিশিষ্ট ব্যক্তি সমকালকে বলেছেন, গত বছর নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে সারাদেশ উত্তাল না হলে হয়ত দশম সংসদে আইনটি পাসই হতো না। পরিবহন নেতাদের চাপে আরও কয়েক বছর আটকে থাকত। সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে পরিবহন আইন তখনই আলোচনায় এসেছে, যখন বেপরোয়া গাড়ির চাপায় প্রাণহানির ঘটনা আলোচিত হয়েছে, আন্দোলন হয়েছে, গণমাধ্যমে শিরোনাম হয়েছে।

২০১০ সালে যুগোপযোগী সড়ক পরিবহন আইন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। গত আট বছরে চারবার আইনের খসড়া তৈরি করা হয়। ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে পরিবহন শ্রমিকদের ডাকা কর্মবিরতি ও সাধারণ মানুষের তীব্র প্রতিক্রিয়ার পর সে সময় ২৭ মার্চ খসড়াটি মন্ত্রিসভার নীতিগত অনুমোদন পায়। আলোচনা থেমে যাওয়ার পর, প্রায় দেড় বছর চলে যায় আইন মন্ত্রণালয়ে, ছিল যাচাই-বাছাইয়ে। অভিযোগ আছে, পরিবহন খাতের নেতাদের চাপেই এত দীর্ঘ সময় লাগে।

সড়ক পরিবহন আইনে ১৪টি অধ্যায় ১২৬টি ধারা রয়েছে। সবচেয়ে আলোচিত ধারা ১০৩। এতে বলা হয়েছে, মোটরযান চালনাজনিত দুর্ঘটনায় গুরুতরভাবে কোনো ব্যক্তি আহত বা নিহত হলে ১৮৬০ সালের দণ্ডবিধির ৩০৪(খ) ধারায় যে শাস্তিই নির্ধারণ করা থাকুক না কেন দুর্ঘটনায় কেউ গুরুতর আহত বা নিহত হলে দায়ী ব্যক্তির অনধিক পাঁচ বছরের জেল বা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড হবে।

নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনের চেয়ারম্যান ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, তিনি চেয়েছিলেন অন্তত ১০ বছর কারাদণ্ডের বিধান রাখা হবে। কিন্তু যাই সাজা রাখা হয়েছে, আইনটি দ্রুত কার্যকর করা উচিত।

মালিক সংগঠন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্যাহ বলেছেন, তারাও চান আইন কার্যকর হোক। আইন সংশোধনের দাবি সম্পর্কে তিনি বলেন, মালিক-শ্রমিকদের জন্য ক্ষতিকর যেসব দিক তারা চিহ্নিত করেছেন, বিধিমালা প্রণয়নের সময় তা তুলে ধরবেন।

পরের
খবর

এবার হচ্ছে চাকসু নির্বাচন


আরও খবর

বাংলাদেশ

ফাইল ছবি

  চবি প্রতিনিধি

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (চাকসু) নির্বাচনের নীতিগত স্বিদ্ধান্ত হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. ইফতেখার উদ্দীন চৌধুরী।

বুধবার রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের হল প্রভোস্ট কমিটির সভা শেষে সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান তিনি।

তিনি বলেন, আমরা চাকসু নির্বাচন দেয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছি। হল প্রভোস্টদের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে। অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদের নীতিমালা সংগ্রহ করে নতুনভাবে চাকসুর নীতিমালা প্রণয়ন করা হবে। এ লক্ষ্যে একটি কমিটি গঠন করা হবে। ওই কমিটি চাকসু নীতিমালা প্রণয়ন করবে। যেহেতু দীর্ঘদিন ধরে চাকসু অচল ছিলো তাই এর নীতিমালা হালনাগাদ করতে হবে। কমিটি নীতিমালা প্রণয়ন করলে সেটি বিভিন্ন পর্ষদে আলোচনা করে চাকসু নির্বাচনের ব্যবস্থা করবো। বিশ্ববিদ্যালয়ে নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করার পরই চাকসু নির্বাচন দেওয়া হবে।’

আলাওল হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. আবদুল হক সমকালকে বলেন ‘প্রভোস্ট কমিটির সভায় চাকসু নির্বাচন আয়োজনের নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ লক্ষ্যে হলের আবাসিক- অনাবাসিক ছাত্র ছাত্রীদের তালিকা হালনাগাদ শুরু করেছি। এই তালিকার ভিত্তিতেই ভোটার তালিকা প্রণয়ন করা হবে।

এদিকে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের এমন সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংগঠনগুলো। চবি ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি ধীষণ প্রদীপ চাকমা সমকালকে বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের এ সিদ্ধান্তকে আমরা সাধুবাদ জানাই। তবে নির্বাচনের আগে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে সব ছাত্র সংগঠনের সহাবস্থান নিশ্চিত করতে হবে।' তিনি বলেন, ডাকসু নির্বাচনে আমরা যেসকল ত্রুটি দেখেছি সেগুলোর যেন পুনরাবৃত্তি না হয় সেদিকে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের নজর দিতে হবে।

চবি ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ফজলে রাব্বী সুজন সমকালকে বলেন, প্রশাসনের এমন সিদ্ধান্তকে আমরা স্বাগত জানাই। শুধু নীতিগত সিদ্ধান্ত নিলেই হবে না, অচিরেই ছাত্রসংগঠগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে  তফসিল ঘোষণা করতে হবে। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে অনুরোধ জানাই চাকসুর গঠনতন্ত্র সংশোধনের করার ক্ষেত্রে ডাকসুকে অনুসরণ করার জন্য। 

উল্লেখ্য সর্বশেষ চাকসু নির্বাচন হয় ১৯৯০ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি। চাকসু নির্বাচনের দাবিতে ছাত্রসংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে আসছে।

সংশ্লিষ্ট খবর

পরের
খবর

উপজেলা নির্বাচন: দ্বিতীয় ধাপে ভোটের হার ৪১.২৫%


আরও খবর

বাংলাদেশ

সিলেটের খাদিম চা বাগানের নির্মলা প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে ভোটারদের সারি- ফাইল ছবি

  সমকাল প্রতিবেদক

উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের দ্বিতীয় ধাপে ভোটার উপস্থিতির হার আরও কমেছে। এই ধাপে ভোটার উপস্থিতির হার ৪১ দশমিক ২৫ ভাগ। এর আগে প্রথম ধাপের ভোটার উপস্থিতির হার ছিল ৪৩ দশমিক ৩২ ভাগ। বুধবার নির্বাচন কমিশন কর্মকর্তাদের কাছ থেকে এ তথ্য পাওয়া গেছে। যদিও দ্বিতীয় ধাপের ভোট শেষে ইসি সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ জানিয়েছিলেন, দ্বিতীয় ধাপে ভোটার উপস্থিতি প্রথম ধাপের তুলনায় বেশি হবে।

ইসি থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, দ্বিতীয় ধাপে ১২৩ উপজেলার মধ্যে চেয়ারম্যান পদে আওয়ামী লীগের মনোনীত নৌকা প্রতীকে বিজয়ী হয়েছেন ৭৪ জন। যার মধ্যে ২৩ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়। এছাড়া স্বতন্ত্র প্রার্থীরা বিজয়ী হয়েছেন ৩৮ উপজেলার চেয়ারম্যান পদে। পাশাপাশি বর্তমান সংসদের প্রধান বিরোধী দল জাতীয় পার্টির মনোনীত লাঙ্গল প্রতীকের প্রার্থী জয়ী হয়েছেন দুটি উপজেলায়। রাঙামাটির ৮ উপজেলার ফল এখনও পাওয়া যায়নি এবং আদালতের আদেশে গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের নির্বাচন স্থগিত রয়েছে।

এর আগে প্রথম ধাপে ৮১ উপজেলার মধ্যে ১৮টির চেয়ারম্যান পদে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ী হন আওয়ামী লীগ প্রার্থীরা। বাকিগুলোর মধ্যে আওয়ামী লীগ মনোনীতরা জয়ী হন ৪৩ উপজেলায়। স্বতন্ত্র প্রার্থীরা বিজয়ী হন ২৩টি উপজেলার চেয়ারম্যান পদে।

ইসি সূত্র জানায়, দ্বিতীয় ধাপে সবচেয়ে কম ভোট পড়েছে সিলেটের দক্ষিণ সুরমা উপজেলায় ৮ দশমিক ৬৩ ভাগ। এই উপজেলায় মোট ভোটার ছিলেন এক লাখ ৭০ হাজার ৪৫৯ জন। ভোট দিয়েছেন মাত্র ১৪ হাজার ৭০৪ জন। ৪৪৭টি ভোট বাতিল করা হয়েছে। ছয় হাজার ৪৬২ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন আওয়ামী লীগ মনোনীত নৌকার প্রার্থী মোহাম্মদ আবু জাহিদ।

এই ধাপের ১১৬ উপজেলার মধ্যে দ্বিতীয় সর্বনিম্ন ভোট পড়েছে একই জেলার জৈন্তাপুর উপজেলায়। এক লাখ ৬ হাজার ৬২২ জন ভোটারের মধ্যে ভোট দিয়েছেন মাত্র ১০ হাজার ছয়জন। ভোটের হার ৯ দশমিক ৩৮ ভাগ। এর মধ্যে ২৩৮ ভোট বাতিল করা হয়েছে। এই উপজেলায় স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. কামাল আহমদ ঘোড়া প্রতীকে পাঁচ হাজার ৬৬০ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন।

দ্বিতীয় ধাপে সর্বোচ্চ ভোট পড়েছে খাগড়াছড়ির মহালছড়ি উপজেলায় ৭৯ দশমিক ৬৭ ভাগ। এখানে স্বতন্ত্র প্রার্থী বিমল কান্তি চাকমা কাপপিরিচ প্রতীকে ১৯ হাজার ৮৩৫ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। এ উপজেলায় মোট ভোটার ৩১ হাজার ৮৯৩ জনের মধ্যে ২৫ হাজার ৪০৯ জন ভোট দিয়েছেন।

১৮ মার্চ ভোটের দিন কেন্দ্রে ভোটারদের লাইন দেখেই বোঝা গিয়েছিল পাহাড়ের ২৫ উপজেলায় ভোটার উপস্থিতি বেশি। তবে সমতলের উপজেলাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভোট পড়েছে ঠাকুরগাঁওয়ের হরিপুরে ৬৬ দশমিক ৫০ ভাগ এবং বগুড়ার গাবতলী উপজেলায় ৬৫ দশমিক ৩২ ভাগ। এই দুটি উপজেলাতেই নৌকা প্রতীকের প্রার্থী চেয়ারম্যান পদে বিজয়ী হয়েছেন।

সংশ্লিষ্ট খবর