বাংলাদেশ

আহমদ শফীর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থার নেওয়ার দাবি

প্রকাশ : ১২ জানুয়ারি ২০১৯

আহমদ শফীর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থার নেওয়ার দাবি

শাহ আহমদ শফী -ফাইল ছবি

   সমকাল প্রতিবেদক

মেয়েদের স্কুল-কলেজে না পাঠানোর জন্য হেফাজতে ইসলামের আমির শাহ আহমদ শফীর ওয়াদা করানো এবং নারীশিক্ষার প্রতি কুরুচিপূর্ণ বক্তব্যের নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন বিভিন্ন সংগঠনের নেতৃবৃন্দ। তারা আহমদ শফীকে নারীবিদ্বেষী, স্বাধীনতার চেতনাবিরোধী ও সংবিধানবিরোধী অভিহিত করে তার বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি জানান।

শনিবার বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ও বিবৃতির মাধ্যমে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল, নারীপক্ষ, বাংলাদেশ নারী মুক্তি কেন্দ্র, জাতীয় নারী জোট, সমাজতান্ত্রিক মহিলা ফোরাম, সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলন ও সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট এ দাবি জানায়।

জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু এমপি ও সাধারণ সম্পাদক শিরীন আখতার এমপি এক যৌথ বিবৃতিতে আহমদ শফীর নারী শিক্ষাবিরোধী বক্তব্যের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান। তারা বলেন, শফী হুজুরের নারী শিক্ষাবিরোধী বক্তব্য সংবিধানবিরোধী, মৌলিক অধিকারবিরোধী, মানবাধিকার বিরোধী, নারী অধিকার বিরোধী, স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী। এমনকি ইসলামবিরোধী। ইসলামে কোথাও নারী শিক্ষার বিরুদ্ধে কোনো কথা নেই। তারা বলেন, আহমদ শফী ধর্মের অপব্যাখ্যা করে মনগড়া ফতোয়া দিয়ে দেশ ও সমাজকে আলো থেকে অন্ধকারে নিতে চান। শফীর নারী শিক্ষাবিরোধী ফতোয়ার বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার জন্য সকলের প্রতি আহ্বান জানান।

বিবৃতিতে বলা হয়, সরকার মাদ্রাসা শিক্ষার আধুনিকায়ন, কওমি মাদ্রাসা শিক্ষাকে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ-খবরদারি-নজরদারিতে আনতে চায়। সরকার দাওরায়ে হাদিস সনদকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দিয়েছে। এটাকে সরকারের দুর্বলতা ভেবে তেঁতুল হুজুররা বাড়াবাড়ি করলে, তার ফলাফল তাদের ভোগ করতে হবে।

নারীপক্ষের আন্দোলন সম্পাদক ফরিদা ইয়াছমিন স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে বলা হয়, ১১ জানুয়ারি চট্টগ্রামের হাটহাজারীর দারুল উলুম মঈনুল ইসলাম মাদ্রাসার বার্ষিক মাহফিলে অংশগ্রহণকারীদের হেফাজতে ইসলামের আমির শাহ আহমদ শফী মেয়েদের স্কুল-কলেজে না পাঠানোর জন্য ওয়াদা করিয়েছেন। পাঠালেও বিয়ের পরে স্বামীর টাকা-পয়সার হিসাব রাখা ও স্বামীর কাছে চিঠি লেখার জন্য কেবল চতুর্থ কিংবা পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ানোর কথা বলেছেন। মেয়েদের উচ্চশিক্ষার বিষয়ে তিনি আরও অনেক কদর্য ও কুরুচিপূর্ণ বক্তব্য দিয়েছেন, যা দেশ ও জাতির জন্য অপমানকর। তিনি নিন্দা জানিয়ে বলেন, 'এমন পশ্চাৎপদ এবং নারী শিক্ষা বিস্তারের পক্ষে সরকারি নানামুখী পদক্ষেপ ও নীতির পরিপন্থী বক্তব্য দেওয়া ও ওয়াদা করানোর জন্য সরকার তার বিরুদ্ধে কী পদক্ষেপ গ্রহণ করবে তাও জানতে চায় নারীপক্ষ।'

বাংলাদেশ নারী মুক্তি কেন্দ্রের সভাপতি সীমা দত্ত বিবৃতিতে বলেন, যে সময়ে নারী-পুরুষের সবক্ষেত্রে সমান অধিকার ও সমমর্যাদা সময়ের দাবি, সে সময়ে হেফাজতের আমির শফী মেয়েদের চতুর্থ কিংবা পঞ্চম শ্রেণির বেশি না পড়ানোর কথা বলেছেন। এ ধরনের বক্তব্য সমস্ত নারী সমাজ এবং সচেতন মানুষের জন্য অসম্মানজনক। শিক্ষার উদ্দেশ্য যেখানে প্রকৃত মানুষ গড়ে তোলা, সেখানে শফীর এমন বক্তব্য নারীর জন্য অপমানজনক। অবিলম্বে শফীকে এ প্রতিক্রিয়াশীল বক্তব্য প্রত্যাহার করে ক্ষমা চাইতে হবে। বিবৃতিতে তিনি রোববার বিকেল ৪টায় জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে আল্লামা শফীর বক্তব্যের প্রতিবাদে এক বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশের কর্মসূচি ঘোষণা করেন।

নারী শিক্ষাবিরোধী বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে জাতীয় নারী জোট। জোটের আহ্বায়ক আফরোজা হক রীনা আহমদ শফীর বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানান। সমাজতান্ত্রিক মহিলা ফোরামের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি রওশন আরা রুশো ও সাধারণ সম্পাদক শম্পা বসু এক যৌথ বিবৃতিতে সংবিধান পরিপন্থী নারীবিদ্বেষী বক্তব্য দানকারী শফী হুজুরের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।

এদিকে শনিবার 'একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন :পর্যালোচনা' শীর্ষক এক আলোচনা সভায় বক্তারা নারীবিদ্বেষী আহমদ শফীকে জাতির কাছে ক্ষমা চাইতে বলেন। সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সংগঠনের সভাপতি জিয়া উদ্দিন তারেক আলীর সভাপতিত্বে সভায় বক্তব্য দেন সংগঠনের প্রেসিডিয়াম সদস্য পঙ্কজ ভট্টাচার্য, অধ্যাপক ড. আজিজুর রহমান, অ্যাডভোকেট এসএমএ সবুর, অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস, অ্যাডভোকেট অশোক সরকার, জয়ন্তী রায়, অধ্যাপক ড. সৈয়দ আব্দুল্লাহ আল মামুন চৌধুরী, সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য একে আজাদ, অ্যাডভোকেট পারভেস হাসেম প্রমুখ।

সভায় সমাজ প্রগতির অগ্রযাত্রাবিরোধী হেফাজতে ইসলামের আমির শাহ আহমদ শফীকে অবিলম্বে তার ঘৃণিত বক্তব্য প্রত্যাহার ও জাতির কাছে নিঃশর্ত ক্ষমা চাওয়ার দাবি জানানো হয়।

সংবিধান পরিপন্থী নারীবিদ্বেষী বক্তব্যের জন্য শফী হুজুরের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছে সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট। শনিবার সংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি ইমরান হাবিব রুমন এবং সাধারণ সম্পাদক নাসির উদ্দিন প্রিন্স এক যুক্ত বিবৃতিতে বলেন, শফী হুজুরের এই বক্তব্য নারী অধিকার পরিপন্থী। একই সঙ্গে সংবিধান পরিপন্থীও বটে। সংবিধানের ২৮(২) নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে 'রাষ্ট্র ও গণজীবনের সর্বস্তরে নারী-পুরুষ সমান অধিকার লাভ করিবেন।' ২৮ (৩) নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, 'কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষভেদ বা জন্মস্থানের কারণে জনসাধারণের কোন বিনোদন বা বিশ্রামের স্থানে প্রবেশের কিংবা কোনও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তির বিষয়ে কোনও নাগরিককে কোনরূপ অক্ষমতা, বাধ্যবাধকতা, বাধা বা শর্তের অধীন করা যাইবে না।' এর আগেও এই হুজুর নারী সমাজকে অবমাননা করে তাদের তেঁতুলের সঙ্গে তুলনা করে বক্তব্য দিয়েছিলেন। এর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি সরকার।

সংশ্লিষ্ট খবর


মন্তব্য যোগ করুণ

পরের
খবর

জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করা আমাদের একমাত্র কাজ: প্রধানমন্ত্রী


আরও খবর

বাংলাদেশ

মন্ত্রিসভার বৈঠকে বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা— ফোকাস বাংলা

  অনলাইন ডেস্ক

জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করাই বর্তমান সরকারের একমাত্র কাজ বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় লাভের পর সোমবার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে নতুন সরকারের মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকের উদ্বোধনী ভাষণে তিনি এ মন্তব্য করেন। খবর ইউএনবির

জনগণের প্রত্যাশা পূরণের জন্য নতুন মন্ত্রিসভাকে সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করার নির্দেশ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'মন্ত্রিসভা সততা ও নিষ্ঠার সাথে০ তাদের কাজ করবে, প্রতিটি কাজ নিষ্ঠার সাথে করতে হবে, এটি সবসময় মনে রাখতে হবে।'

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে সোমবার তার কার্যালয়ে নতুন সরকারের মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়— ফোকাস বাংলা

তিনি বলেন, 'দেশের জনগণের প্রতি আমাদের দায়িত্ব ও দায়বদ্ধতা রয়েছে, যারা টানা তৃতীয়বার আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় এনেছে। আমরা এখানে দায়িত্ব পালন করতে এসেছি এবং সততার শক্তি সীমাহীন, আমরা অনেকবার সেটা প্রমাণ করতে পেরেছি।'

শেখ হাসিনা বলেন, 'মন্ত্রিপরিষদ আন্তরিকতা ও সততার সাথে কাজ করলে দেশ উন্নত হবে। দেশের জনগণের নতুন সরকারের প্রতি আশা-আকাঙ্ক্ষা রয়েছে এবং সরকারকে সেগুলো পূরণ করতে হবে। জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করা আমাদের একমাত্র কাজ।'

তিনি বলেন, 'জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্ন ছিল দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানো। এটা আমাদেরও লক্ষ্য। আমরা সেই আশা পূরণের জন্য কাজ করবো। আমরা বাংলাদেশকে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত দেশ হিসেবে গড়ে তুলবো।'

টানা তৃতীয়বারসহ সবমিলিয়ে চতুর্থবারের মত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করায় শেখ হাসিনাকে ফুলের তোড়া দিয়ে অভিনন্দন জানান মন্ত্রিপরিষদ সচিব মো. শফিউল আলম— ফোকাস বাংলা

নবনিযুক্ত মন্ত্রীদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'আওয়ামী লীগের বিগত দুই আমলে উন্নয়নে যে ধারা শুরু হয়েছে, আগামী দিনেও তা বজায় রাখতে থাকবে। জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী আমাদের দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে।'

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে সোমবার সকাল ১০টায় তার তেজগাঁওস্থ কার্যালয়ে নবগঠিত মন্ত্রিসভার প্রথম এই বৈঠক শুরু হয়। এর আগে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মো. শফিউল আলম প্রধানমন্ত্রীকে টানা তৃতীয়বারসহ সবমিলিয়ে চতুর্থবারের মত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করায় ফুলের তোড়া দিয়ে অভিনন্দন জানান।

সংশ্লিষ্ট খবর

পরের
খবর

নাজমুল হুদার জামিন


আরও খবর

বাংলাদেশ
নাজমুল হুদার জামিন

প্রকাশ : ২১ জানুয়ারি ২০১৯

নাজমুল হুদা -ফাইল ছবি

   সমকাল প্রতিবেদক

ঘুষ গ্রহণের মামলায় চার বছরের সাজার রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার অনুমতি পেয়েছেন মন্ত্রী ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা। একই সঙ্গে আপিলের নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তাকে জামিন দেওয়া হয়েছে।

হাইকোর্টের দেওয়া সাজার রায়ের বিরুদ্ধে নাজমুল হুদার করা লিভ টু আপিল (আপিলের অনুমতি চেয়ে আবেদন) মঞ্জুর করে সোমবার এই আদেশ দেওয়া হয়। প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ এই আদেশ দেন।

আদালতে নাজমুল হুদার পক্ষে ছিলেন আইনজীবী এ এফ হাসান আরিফ, মনসুরুল হক চৌধুরী ও অ্যাডভোকেট সিগমা হুদা। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) পক্ষে ছিলেন আইনজীবী খুরশীদ আলম খান।

পরে খুরশীদ আলম খান জানান, তার (নাজমুল হুদা) লিভ টু আপিল মঞ্জুর করেছেন। একইসঙ্গে জামিনও দিয়েছেন। এখন তার এ আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তিনি জামিনে থাকবেন। আপিল বিভাগের এই আদেশের ফলে কারাগারে থাকা নাজমুল হুদার কারামুক্তিতে আইনগত কোনো বাধা নেই।

ঘুষ গ্রহণের মামলায় ৬ জানুয়ারি ঢাকার আদালতে আত্মসমর্পণ করেন নাজমুল হুদা। পরে তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-২-এর বিচারক এইচ এম রুহুল ইমরান। এরপর কারাগারে থেকেই তিনি হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে চেম্বার আদালতে লিভ টু আপিল আবেদন করেন।

নাজমুল হুদা ও তার স্ত্রী সিগমা হুদার বিরুদ্ধে ২০০৭ সালের ২১ মার্চ দুদকের উপ-পরিচালক মো. শরিফুল ইসলাম ধানমণ্ডি থানায় মামলাটি দায়ের করেন। ২ কোটি ৪০ লাখ টাকা ঘুষ নেওয়ার অভিযোগে এই মামলায় নাজমুল হুদাকে সাত বছরের সাজা দিয়েছিলেন নিম্ন আদালত। ২০১৭ সালে তার সাজা কমিয়ে চার বছরের কারাদণ্ড দেন হাইকোর্ট।

বিচারিক আদালত যেদিন রায় গ্রহণ করবেন, সেদিন থেকে ৪৫ দিনের মধ্যে নাজমুল হুদাকে আত্মসমর্পণের কথা বলা হয়েছে। গত বছরের ১৮ নভেম্বর সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে ৬৭ পৃষ্ঠার রায়টি প্রকাশ পায়। রায় অনুসারে গত ৬ জানুয়ারি আত্মসমর্পণ করেন তিনি।

সংশ্লিষ্ট খবর

পরের
খবর

এমসি কলেজ ছাত্র সংসদ ভবনই বেদখলে


আরও খবর

বাংলাদেশ

কলেজে জাগুক প্রাণ

এমসি কলেজ ছাত্র সংসদ ভবনই বেদখলে

প্রকাশ : ২১ জানুয়ারি ২০১৯ | প্রিন্ট সংস্করণ

  চয়ন চৌধুরী, সিলেট

প্রায় তিন দশক পর দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শুরু হয়েছে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ ডাকসু নির্বাচনের তোড়জোড়। এ হাওয়া লেগেছে দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়েও। ঐতিহ্যবাহী এবং নামি কলেজগুলোর শিক্ষার্থীরাও এখন নির্বাচনের দাবিতে সরব। তারা চান, ছাত্র সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে সব স্থবিরতা কাটিয়ে ক্যাম্পাসে জাগবে প্রাণ

১৯৯১ সাল। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে তখন সরকার গঠন করেছে বিএনপি। অন্যদিকে সিলেটের প্রাচীনতম এবং শিক্ষাক্ষেত্রে ও গণতন্ত্র চর্চার ক্ষেত্রে ঐতিহ্যবাহী মুরারীচাঁদ কলেজ (এমসি কলেজ) ছাত্র সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করেছে আওয়ামী লীগ ও জাসদ সমর্থিত ছাত্রলীগের নেতৃত্বাধীন সর্বদলীয় ছাত্রঐক্য। কিন্তু ক্রমশ উত্তপ্ত হয়ে উঠতে শুরু করল কলেজের পরিবেশ। এ পরিস্থিতিতে ছাত্র সংগঠনগুলোর মধ্যে সংঘাত এড়াতে কর্তৃপক্ষ ছাত্র সংসদ নির্বাচন স্থগিত ঘোষণা করল। তার পর দীর্ঘ ২৭ বছরে আর নির্বাচন হয়নি ঐতিহ্যবাহী এ কলেজটিতে। ছাত্র সংসদ নির্বাচন বন্ধ হয়ে  যাওয়ার কয়েক বছর পর থেকে এর কার্যালয়ও ব্যবহূত হতে শুরু করেছে ভিন্ন কাজে। অবশ্য কার্যালয়ের দ্বিতল ভবনটির সামনে ছাত্র সংসদের সাইনবোর্ডটি আজও ঝুলছে। তবে ভেতরে চলছে ইংরেজি বিভাগের অফিস ও সেমিনার কক্ষের কাজ। তিন বছর আগে ভবন সংকটের অজুহাতে ছাত্র সংসদ কার্যালয় ভবনে স্থাপন করা হয় ইংরেজি বিভাগের অফিস ও সেমিনার কক্ষ। এক দশক আগে ছাত্র সংসদের ওপরতলায় বিদেশি ভাষা শিক্ষাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে এই বেদখল পর্বের শুরু।

ছাত্র সংসদ কার্যক্রম বন্ধ থাকলেও মহাবিদ্যালয়টির ১৪ হাজার শিক্ষার্থীকে প্রতি বছর ছাত্র সংসদের জন্য নির্ধারিত ফি ঠিকই দিতে হচ্ছে। এক সময় এই ফি ছিল ১০ টাকা। কয়েক বছর ধরে তা বাড়িয়ে করা হয়েছে ২৫ টাকা। গত আড়াই দশকে এ খাতে জমা হওয়া টাকা কোন কাজে লাগছে, ছাত্র সংসদ কার্যক্রম বন্ধ থাকার পরও ফি বাড়ানোর কারণ কী- এসব নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। অবশ্য কলেজের অধ্যক্ষ নিতাই চন্দ্র চন্দ জানাচ্ছেন, ছাত্র সংসদের ফি বাবদ নেওয়া টাকা নির্ধারিত খাতেই জমা রয়েছে।

রাজা গিরীশ চন্দ্র রায় ১৮৯২ সালে নগরীর টিলাগড় ও বালুচর এলাকায় ১২৪ একর জমিতে প্রমাতামহ মুরারীচাঁদের নামে এ মহাবিদ্যালয় স্থাপন করেন। তখন এটি ছিল অখণ্ড ভারতের আসামের প্রথম কলেজ। ১৯৩২ সালে এ কলেজে ছাত্র সংসদের গঠনতন্ত্র তৈরি করে নির্বাচন প্রক্রিয়া শুরু হয়। কাল পরিক্রমায় এ কলেজের অনেক শিক্ষার্থীই জাতীয় ও স্থানীয় রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ নেতা হয়ে উঠেছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন বাংলাদেশের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রয়াত আবদুস সামাদ আজাদ, সাবেক রেলমন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, সাবেক অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী প্রয়াত সাইফুর রহমান, বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন, সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত, সাবেক শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ। অথচ দীর্ঘ আড়াই দশকের বেশি সময় ধরে ছাত্র সংসদ নির্বাচন বন্ধ থাকায় রুদ্ধ হয়ে গেছে ঐতিহ্যবাহী এ কলেজের শিক্ষার্থীদের মধ্যে নেতৃত্ব গঠন ও গণতান্ত্রিক চর্চার প্রক্রিয়া।

সরেজমিন এমসি কলেজ ক্যাম্পাসে গিয়ে দেখা যায়, লাইব্রেরি ও শহীদ মিনারের মধ্যে ছাত্র সংসদ ভবনে চলছে বিদেশি ভাষা প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, ইংরেজি বিভাগের অফিস ও সেমিনার কক্ষের কার্যক্রম। ইংরেজি বিভাগের অফিস সহকারী অরবিন্দ তালুকদার সমকালকে জানান, কলেজটির ইংরেজি বিভাগের নিজস্ব ভবন নেই। শ্রেণিকক্ষেরও সংকট রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে ২০১৫ সাল থেকে ছাত্র সংসদ ভবনে বিভাগের অফিস ও সেমিনার কক্ষ নিয়ে আসা হয়। তিনি জানান, তারা আসার আগে থেকেই এখানে বিদেশি ভাষা প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের কার্যক্রম চলছিল।

সম্প্রতি বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের পক্ষ থেকে ছাত্র সংসদ নির্বাচনের দাবি উঠতে শুরু করেছে। এ প্রসঙ্গে সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের এমসি কলেজ শাখার আহ্বায়ক সাদিয়া নওশীন তাসমিন সমকালকে বলেন, কলেজে গণতান্ত্রিক পরিবেশ সুনিশ্চিত করতে কার্যকর ছাত্র সংসদ প্রয়োজন। তিনি অভিযোগ করেন, সরকারি দলের ছাত্র সংগঠনের অগণতান্ত্রিক হস্তক্ষেপে অন্যদের স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনাও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। ছাত্র সংসদ গঠিত হলে সাধারণ শিক্ষার্থীদের দাবি আদায়ের পাশাপাশি ক্যাম্পাসে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক পরিবেশ ফিরে আসবে। তিনি বলেন, সংসদ ভবন বেদখল হয়ে গেছে। অথচ প্রতি বছর শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে সংসদ ফি নেওয়া হচ্ছে। এর তহবিলে কত টাকা জমা হয়েছে, তা কোনো কাজে ব্যবহূত হচ্ছে কি-না- এসবের স্বচ্ছ জবাবদিহি প্রয়োজন।

ছাত্র সংসদ নির্বাচনের দাবিতে বাম ঘরানার দলগুলো কিছুটা সরব হলেও এ কলেজে ছাত্রলীগের কমিটি না থাকায় সংগঠনের পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য মেলেনি। তবে বিভিন্ন ফোরামে বিভিন্ন সময়ে এ নিয়ে বিচ্ছিন্নভাবে দাবি তুলছেন ছাত্রলীগের নেতারা। ২০০৩ সালে তাজিম উদ্দিনকে সভাপতি ও সাইফুল ইসলাম টিপুকে সাধারণ সম্পাদক করে কলেজ ছাত্রলীগের সর্বশেষ কমিটি হয়েছিল। ২০১০ সালের ১৩ জুলাই ছাত্রলীগ কর্মী উদয়ন সিংহ পলাশ হত্যার পর এ কমিটি বাতিল করা হয়।

এমসি কলেজে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের একটি আংশিক কমিটি রয়েছে। এ কমিটির পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, কলেজ ক্যাম্পাসে বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের পরিবেশ নেই। তার পরও শিক্ষা ও গণতন্ত্র চর্চার পরিবেশ ফিরিয়ে আনার স্বার্থে তারা চান ছাত্র সংসদ নির্বাচন দেওয়া হোক।

সিলেট জেলা ছাত্রলীগের সাবেক স্কুলছাত্র বিষয়ক সম্পাদক ও মুরারীচাঁদ কলেজের ছাত্র রাজনীতিতে যুক্ত হোসাইন আহমদ সমকালকে বলেন, ছাত্র সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে পারব না। তার পরও চাই নির্বাচন হোক। কারণ নতুন নেতৃত্ব বেরিয়ে আসবে। তিনি বলেন, প্রাচীন এ কলেজে যেমন অনেক সংকট রয়েছে, তেমনি সম্ভাবনাও রয়েছে। ছাত্রলীগ বরাবরই সাধারণ শিক্ষার্থীদের দাবিতে সরব। তার পরও বলব, ছাত্র সংসদ থাকলে ভালো হতো।

কলেজের ছাত্রলীগ নেতা দেলোয়ার হোসেন বলেন, ছাত্র সংসদ নির্বাচন দেওয়া হোক- এটা সাধারণ শিক্ষার্থীদের প্রাণের দাবি। ক্যাম্পাসে লেখাপড়ার সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিতে ছাত্র সংসদের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। এ নির্বাচন হলে কলেজে প্রাণ ফিরে আসবে।

এমসি কলেজ ছাত্রদলের তিন সদস্যের কমিটির প্রথম সদস্য রুবেল ইসলাম সমকালকে বলেন, ছাত্রলীগের দৌরাত্ম্যে কলেজ ক্যাম্পাসে সহাবস্থানের পরিবেশ নেই। পরীক্ষা থাকলেও ছাত্রদলের কেউ ক্যাম্পাসে যেতে পারে না। গেলেই হামলা-মারধর করা হয়। নির্বাচনের পরিবেশ ও প্রক্রিয়া নিয়ে শঙ্কা থাকার পরও ছাত্রদল শিক্ষার্থীদের দাবি-দাওয়া আদায়ের স্বার্থে ছাত্র সংসদ চায় বলে মন্তব্য করেন রুবেল। ছাত্র ইউনিয়নের কলেজ শাখার যুগ্ম আহ্বায়ক কাওসার আহমদ বলেন, সবার প্রত্যাশা ছাত্র সংসদ নির্বাচন।

ছাত্র সংগঠনগুলোর দাবির সঙ্গে কর্তৃপক্ষ একমত- এ কথা জানিয়ে এমসি কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর নিতাই চন্দ্র চন্দ দাবি করেন, এক বছর আগেই বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের প্রতিনিধিদের এ নির্বাচন দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। অবশ্য এ নিয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো বৈঠক হয়নি, তবে বিভিন্ন ফোরামে আলোচনা হয়েছে। এখন যেহেতু ডাকসু নির্বাচনের কথা হচ্ছে; আশা করি, এমসি কলেজেও ছাত্র সংসদ নির্বাচন হবে। ছাত্র সংসদ ভবনে অন্য বিভাগের কার্যক্রম প্রসঙ্গে তিনি বলেন, নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু হলে বসার জন্য সুবিধামতো কক্ষ বরাদ্দ দেওয়া হবে।

সংশ্লিষ্ট খবর