বাংলাদেশ

অগ্রাধিকার খাত ৬ পরিবেশ ও জলবায়ু

উপকূলজুড়ে সবুজ বেষ্টনী গড়ে তুলতে হবে

বিশেষ সাক্ষাৎকার : ড. আইনুন নিশাত

প্রকাশ : ১২ জানুয়ারি ২০১৯ | প্রিন্ট সংস্করণ

উপকূলজুড়ে সবুজ বেষ্টনী গড়ে তুলতে হবে

  শেখ রোকন

পানি ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ এবং ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. আইনুন নিশাত বলেছেন, নতুন করে বৃহৎ অবকাঠামো নির্মাণের আগে বিদ্যমান অবকাঠামোগুলোর সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। এ প্রসঙ্গে তিনি নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণকে 'বলিষ্ঠ পদক্ষেপ' আখ্যা দেন। সমকালের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে শীর্ষস্থানীয় এই জলবায়ু বিজ্ঞানী বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবেলায় বাংলাদেশের উপকূলরেখা বরাবর সবুজ বেষ্টনী গড়ে তোলায় বিশেষ মনোযোগ দিতে হবে সরকারকে। আঞ্চলিক পানি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে তিনি অববাহিকাভিত্তিক সুফল বণ্টনের ওপর জোর দিতে বলেন। ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানির বদলে হিমালয় অঞ্চলে নেপাল, ভুটান ও ভারতের সঙ্গে যৌথভাবে জলবিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্পকে অগ্রাধিকার দিতে বলেন বর্তমান সরকারের নতুন মেয়াদে।

আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে নৌপথ পুনরুদ্ধারে আগামী পাঁচ বছরে ১০ হাজার কিলোমিটার নৌপথ ড্রেজিংয়ের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। এ প্রসঙ্গে আইনুন নিশাত সমকালকে বলেছেন, টানা দুই মেয়াদেই আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার নদী ব্যবস্থাপনায় বিশেষ মনোযোগ দিয়ে এসেছে। এবারের ইশতেহারে তারই প্রতিফলন ঘটেছে। তিনি বলেন, দীর্ঘদিনের অবহেলার কারণে দেশের ছোট নদীগুলো প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছে। বেদখল হয়ে গেছে অনেক নদী। বড় নদীগুলোর দুই তীর ভেঙে অস্বাভাবিক চওড়া হয়েছে ও গভীরতা ক্রমেই কমছে। আগামী মেয়াদে জোর দিতে হবে নদী ব্যবস্থাপনার দিকে। সেক্ষেত্রে ড্রেজিং গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু শুধু খনন নয়, এর মাধ্যমে ভূমি উদ্ধারের বিষয়টি  বিশেষ বিবেচনায় নিতে হবে।

আইনুন নিশাত মনে করেন, গত দুই মেয়াদে যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়নে বৃহৎ পরিকল্পনাগুলো সরকারের বলিষ্ঠ সিদ্ধান্তের প্রমাণ। বিশেষ করে পদ্মা সেতু প্রকল্প রীতিমত 'দুঃসাহসিক'। নিজস্ব অর্থায়নের এই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে নতুন মেয়াদে সরকার গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণকেও অগ্রাধিকারে রাখতে পারে। তিনি মনে করেন, বর্তমানে চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরে যেসব ২০-২৫ ফুট ড্রাফটের সামুদ্রিক জাহাজ ভিড়তে পারে, তা দিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ভূমিকা রাখা কঠিন। যে লক্ষ্য নিয়ে পায়রা সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করা হয়েছে, তা অর্জনে জোর দিতে হবে।

অধ্যাপক নিশাত মনে করেন, প্রাকৃতিক পরিবেশ বিষয়ে বর্তমান সরকারের সবচেয়ে বড় অবদান সংবিধানে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে ১৮-ক ধারা যুক্ত করা। এতে বলা হয়েছে- দেশের প্রকৃতি, জীববৈচিত্র্য, জলাভূমি, বনভূমি ইত্যাদি রক্ষায় রাষ্ট্র দায়িত্বপ্রাপ্ত। তিনি মনে করেন, এর মাধ্যমে নীতিগত দিক থেকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ অঙ্গীকার ব্যক্ত হয়েছে। গতানুগতিক উন্নয়ন প্রক্রিয়া ও অবকাঠামো নির্মাণের ক্ষেত্রে প্রাকৃতিক পরিবেশ সুরক্ষায় নজর দেওয়া এখন রাষ্ট্রের সাংবিধানিক কর্তব্য। তিনি প্রত্যাশা করেন, আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে যেসব মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছে, সেখানে উন্নয়ন প্রক্রিয়ার সঙ্গে প্রতিবেশ ব্যবস্থার সংঘাত এড়ানো হবে। সরকারের নতুন মেয়াদের শুরুতেই তিনি সবুজ প্রবৃদ্ধি কৌশলপত্র প্রণয়নের ওপর জোর দেন। আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে উন্নয়ন কাঠামোর সব ক্ষেত্রেই সবুজ প্রবৃদ্ধি কৌশল মেনে চলা উচিত বলে তিনি মনে করেন।

ড. আইনুন নিশাত বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত বাংলাদেশের জন্য এক অনাকাঙ্ক্ষিত কিন্তু অনিবার্য বাস্তবতা। বৈশ্বিক এই দুর্যোগের কারণে আমাদের দেশে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, বন্যা, প্লাবন, খরা, নদীভাঙন, অস্বাভাবিক জোয়ারের তীব্রতা, মাত্রা ও পরম্পরা তিনটিই বাড়ছে। উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা ইতিমধ্যে জটিল আকার ধারণ করেছে। অনেক অধিবাসীই মিঠাপানির অভাবে দেশান্তরী হওয়ার কথা ভাবছে। আওয়ামী লীগের ইশতেহারে লবণাক্ততা রোধ করার কথা বলায় তিনি সন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি মনে করেন, আগামীতে বিভিন্ন দুর্যোগ বিশেষত জলোচ্ছ্বাসের উচ্চতা ও তীব্রতা বাড়বে। এজন্য উপকূলরেখাব্যাপী সবুজ বেষ্টনী গড়ে তোলার বিকল্প নেই।

নদীভাঙনের পাশাপাশি সমুদ্র ও নদীর মোহনায় নতুন নতুন চর জেগে উঠছে। নদী ও পানি বিষয়ে দেশে-বিদেশে সুনামের সঙ্গে কাজ করা এই পানি বিশেষজ্ঞ মনে করেন, জেগে ওঠা নতুন চরগুলোকেও স্থিতিশীল করে তোলায় জোর দিতে হবে। তার মতে, এই লক্ষ্য পূরণে একটি সহজ উপায় হচ্ছে সব চরেই বনায়ন। কিন্তু বনায়নের সঙ্গে সঙ্গে যদি জনবসতি স্থাপিত হতে থাকে, তাহলে বনায়ন টেকসই হবে না। উপকূলে জেগে ওঠা চরে বনায়ন ও বসতির ক্ষেত্রে একটি নীতিমালা প্রণয়নের তাগিদ দেন আইনুন নিশাত।

আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে প্রথমবারের মতো 'ডেল্টা প্ল্যান ২১০০' বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন- ডেল্টা প্ল্যান বা ব-দ্বীপ পরিকল্পনা মূলত পরিবেশের সঙ্গে অভিযোজনভিত্তিক কারিগরি ও অর্থনৈতিক মহাপরিকল্পনা। উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের সঙ্গে পানি সম্পদের ব্যবহার, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং এসবের পারস্পরিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া বিবেচনা করে এই দলিল প্রণয়ন করা হয়েছে। তিনি মনে করেন, ইশতেহারে ডেল্টা প্ল্যানের উল্লেখ এ ব্যাপারে সরকারের চিন্তা-ভাবনার গুরুত্ব নির্দেশ করছে। তবে এর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া সম্পর্কে সংশ্নিষ্টদের ধারণা আরও স্পষ্ট থাকা উচিত বলে তিনি মনে করেন।

আইনুন নিশাত বলেন, গত পাঁচ দশকে দেশে ইতিমধ্যে নানা পরিকল্পনার অধীনে ছোট-বড় শত শত অবকাঠামো নির্মিত হয়েছে। ডেল্টা প্ল্যানের অধীনে নতুন নতুন বৃহদাকার অবকাঠামো নির্মাণের আগে ইতিমধ্যে সম্পন্ন হওয়া প্রকল্পগুলোর সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার দিকে নজর দিতে হবে। কারণ, অনেক অবকাঠামোই রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য পূরণ করতে পারছে না। সমকালের প্রশ্নের জবাবে তিনি স্বীকার করেন, পরিবেশ ও পানিসম্পদ সংক্রান্ত কিছু প্রকল্প ও অবকাঠামো অনেক ক্ষেত্রে পরিস্থিতির অবনতি ঘটিয়েছে। তিনি বলেন, পানিসম্পদ উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে পানি ব্যবস্থাপনায় জোর দিতে হবে। অন্যথায় উন্নয়ন টেকসই হবে না।

আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে গঙ্গা ব্যারাজ নির্মাণের কথা বলা হয়েছে। নদী ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে এ ধরনের বড় প্রকল্পের প্রয়োজন আছে বলে আইনুন নিশাত মনে করেন। তবে এর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া, পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে নীতিগত, কারিগরি ও প্রায়োগিক পর্যায়ে উপযুক্ত বিশেষজ্ঞদের নিবিড়ভাবে যুক্ত করতে হবে। তিনি মনে করেন, পানি ব্যবস্থাপনা-সংক্রান্ত বৃহৎ প্রকল্প বাস্তবায়নে বাংলাদেশের বিশেষজ্ঞদের দক্ষতা ও দূরদৃষ্টি কাজে লাগাতে হবে।

ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে অভিন্ন নদীর পানিসম্পদ বিষয়ে অধ্যাপক আইনুন নিশাত মনে করেন, অববাহিকাভিত্তিক পানি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে দুই দেশ ইতিমধ্যে একমত হয়েছে। ২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিংয়ের ঢাকা সফরের সময়ই এ ব্যাপারে সমঝোতা হয়। কিন্তু গত সাত বছরে এর বাস্তবায়ন নিয়ে কোনো অগ্রগতি নেই। তিনি মনে করেন, এই সমঝোতার অধীনেই অভিন্ন নদীগুলোর উজানে পার্বত্য অঞ্চলে ড্যাম নির্মাণ করে জলবিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। অভিন্ন নদীর অংশীদার হিসেবে বাংলাদেশ সেসব প্রকল্পে বিনিয়োগ করে উৎপন্ন জলবিদ্যুতের একটি অংশ পেতে পারে। প্রয়োজনে অন্যান্য দেশের অংশ থেকেও কিনে নিতে পারে।

ভারত-বাংলাদেশে অভিন্ন নদীর পানি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে দেশের অভ্যন্তরে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের মধ্যে সমন্বয়ের তাগিদ দেন ড. নিশাত। তিনি বলেন, বিশেষভাবে সমন্বয় করতে হবে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের মধ্যে।

পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন-সংক্রান্ত শিক্ষায় জোর দেওয়া উচিত বলে আইনুন নিশাত মনে করেন। এসব ক্ষেত্রে বাংলাদেশের আরও বেশি সংখ্যক তরুণ গবেষক ও বিজ্ঞানী প্রয়োজন। তিনি বলেন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন-সংক্রান্ত শিক্ষার মানোন্নয়ন সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থার মানোন্নয়নের সঙ্গেই জড়িত।


মন্তব্য যোগ করুণ

পরের
খবর

জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করা আমাদের একমাত্র কাজ: প্রধানমন্ত্রী


আরও খবর

বাংলাদেশ

মন্ত্রিসভার বৈঠকে বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা— ফোকাস বাংলা

  অনলাইন ডেস্ক

জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করাই বর্তমান সরকারের একমাত্র কাজ বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় লাভের পর সোমবার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে নতুন সরকারের মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকের উদ্বোধনী ভাষণে তিনি এ মন্তব্য করেন। খবর ইউএনবির

জনগণের প্রত্যাশা পূরণের জন্য নতুন মন্ত্রিসভাকে সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করার নির্দেশ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'মন্ত্রিসভা সততা ও নিষ্ঠার সাথে০ তাদের কাজ করবে, প্রতিটি কাজ নিষ্ঠার সাথে করতে হবে, এটি সবসময় মনে রাখতে হবে।'

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে সোমবার তার কার্যালয়ে নতুন সরকারের মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়— ফোকাস বাংলা

তিনি বলেন, 'দেশের জনগণের প্রতি আমাদের দায়িত্ব ও দায়বদ্ধতা রয়েছে, যারা টানা তৃতীয়বার আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় এনেছে। আমরা এখানে দায়িত্ব পালন করতে এসেছি এবং সততার শক্তি সীমাহীন, আমরা অনেকবার সেটা প্রমাণ করতে পেরেছি।'

শেখ হাসিনা বলেন, 'মন্ত্রিপরিষদ আন্তরিকতা ও সততার সাথে কাজ করলে দেশ উন্নত হবে। দেশের জনগণের নতুন সরকারের প্রতি আশা-আকাঙ্ক্ষা রয়েছে এবং সরকারকে সেগুলো পূরণ করতে হবে। জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করা আমাদের একমাত্র কাজ।'

তিনি বলেন, 'জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্ন ছিল দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানো। এটা আমাদেরও লক্ষ্য। আমরা সেই আশা পূরণের জন্য কাজ করবো। আমরা বাংলাদেশকে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত দেশ হিসেবে গড়ে তুলবো।'

টানা তৃতীয়বারসহ সবমিলিয়ে চতুর্থবারের মত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করায় শেখ হাসিনাকে ফুলের তোড়া দিয়ে অভিনন্দন জানান মন্ত্রিপরিষদ সচিব মো. শফিউল আলম— ফোকাস বাংলা

নবনিযুক্ত মন্ত্রীদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'আওয়ামী লীগের বিগত দুই আমলে উন্নয়নে যে ধারা শুরু হয়েছে, আগামী দিনেও তা বজায় রাখতে থাকবে। জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী আমাদের দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে।'

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে সোমবার সকাল ১০টায় তার তেজগাঁওস্থ কার্যালয়ে নবগঠিত মন্ত্রিসভার প্রথম এই বৈঠক শুরু হয়। এর আগে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মো. শফিউল আলম প্রধানমন্ত্রীকে টানা তৃতীয়বারসহ সবমিলিয়ে চতুর্থবারের মত প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করায় ফুলের তোড়া দিয়ে অভিনন্দন জানান।

সংশ্লিষ্ট খবর

পরের
খবর

নাজমুল হুদার জামিন


আরও খবর

বাংলাদেশ
নাজমুল হুদার জামিন

প্রকাশ : ২১ জানুয়ারি ২০১৯

নাজমুল হুদা -ফাইল ছবি

   সমকাল প্রতিবেদক

ঘুষ গ্রহণের মামলায় চার বছরের সাজার রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার অনুমতি পেয়েছেন মন্ত্রী ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা। একই সঙ্গে আপিলের নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তাকে জামিন দেওয়া হয়েছে।

হাইকোর্টের দেওয়া সাজার রায়ের বিরুদ্ধে নাজমুল হুদার করা লিভ টু আপিল (আপিলের অনুমতি চেয়ে আবেদন) মঞ্জুর করে সোমবার এই আদেশ দেওয়া হয়। প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ এই আদেশ দেন।

আদালতে নাজমুল হুদার পক্ষে ছিলেন আইনজীবী এ এফ হাসান আরিফ, মনসুরুল হক চৌধুরী ও অ্যাডভোকেট সিগমা হুদা। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) পক্ষে ছিলেন আইনজীবী খুরশীদ আলম খান।

পরে খুরশীদ আলম খান জানান, তার (নাজমুল হুদা) লিভ টু আপিল মঞ্জুর করেছেন। একইসঙ্গে জামিনও দিয়েছেন। এখন তার এ আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তিনি জামিনে থাকবেন। আপিল বিভাগের এই আদেশের ফলে কারাগারে থাকা নাজমুল হুদার কারামুক্তিতে আইনগত কোনো বাধা নেই।

ঘুষ গ্রহণের মামলায় ৬ জানুয়ারি ঢাকার আদালতে আত্মসমর্পণ করেন নাজমুল হুদা। পরে তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-২-এর বিচারক এইচ এম রুহুল ইমরান। এরপর কারাগারে থেকেই তিনি হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে চেম্বার আদালতে লিভ টু আপিল আবেদন করেন।

নাজমুল হুদা ও তার স্ত্রী সিগমা হুদার বিরুদ্ধে ২০০৭ সালের ২১ মার্চ দুদকের উপ-পরিচালক মো. শরিফুল ইসলাম ধানমণ্ডি থানায় মামলাটি দায়ের করেন। ২ কোটি ৪০ লাখ টাকা ঘুষ নেওয়ার অভিযোগে এই মামলায় নাজমুল হুদাকে সাত বছরের সাজা দিয়েছিলেন নিম্ন আদালত। ২০১৭ সালে তার সাজা কমিয়ে চার বছরের কারাদণ্ড দেন হাইকোর্ট।

বিচারিক আদালত যেদিন রায় গ্রহণ করবেন, সেদিন থেকে ৪৫ দিনের মধ্যে নাজমুল হুদাকে আত্মসমর্পণের কথা বলা হয়েছে। গত বছরের ১৮ নভেম্বর সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে ৬৭ পৃষ্ঠার রায়টি প্রকাশ পায়। রায় অনুসারে গত ৬ জানুয়ারি আত্মসমর্পণ করেন তিনি।

সংশ্লিষ্ট খবর

পরের
খবর

এমসি কলেজ ছাত্র সংসদ ভবনই বেদখলে


আরও খবর

বাংলাদেশ

কলেজে জাগুক প্রাণ

এমসি কলেজ ছাত্র সংসদ ভবনই বেদখলে

প্রকাশ : ২১ জানুয়ারি ২০১৯ | প্রিন্ট সংস্করণ

  চয়ন চৌধুরী, সিলেট

প্রায় তিন দশক পর দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শুরু হয়েছে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ ডাকসু নির্বাচনের তোড়জোড়। এ হাওয়া লেগেছে দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়েও। ঐতিহ্যবাহী এবং নামি কলেজগুলোর শিক্ষার্থীরাও এখন নির্বাচনের দাবিতে সরব। তারা চান, ছাত্র সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে সব স্থবিরতা কাটিয়ে ক্যাম্পাসে জাগবে প্রাণ

১৯৯১ সাল। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে তখন সরকার গঠন করেছে বিএনপি। অন্যদিকে সিলেটের প্রাচীনতম এবং শিক্ষাক্ষেত্রে ও গণতন্ত্র চর্চার ক্ষেত্রে ঐতিহ্যবাহী মুরারীচাঁদ কলেজ (এমসি কলেজ) ছাত্র সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করেছে আওয়ামী লীগ ও জাসদ সমর্থিত ছাত্রলীগের নেতৃত্বাধীন সর্বদলীয় ছাত্রঐক্য। কিন্তু ক্রমশ উত্তপ্ত হয়ে উঠতে শুরু করল কলেজের পরিবেশ। এ পরিস্থিতিতে ছাত্র সংগঠনগুলোর মধ্যে সংঘাত এড়াতে কর্তৃপক্ষ ছাত্র সংসদ নির্বাচন স্থগিত ঘোষণা করল। তার পর দীর্ঘ ২৭ বছরে আর নির্বাচন হয়নি ঐতিহ্যবাহী এ কলেজটিতে। ছাত্র সংসদ নির্বাচন বন্ধ হয়ে  যাওয়ার কয়েক বছর পর থেকে এর কার্যালয়ও ব্যবহূত হতে শুরু করেছে ভিন্ন কাজে। অবশ্য কার্যালয়ের দ্বিতল ভবনটির সামনে ছাত্র সংসদের সাইনবোর্ডটি আজও ঝুলছে। তবে ভেতরে চলছে ইংরেজি বিভাগের অফিস ও সেমিনার কক্ষের কাজ। তিন বছর আগে ভবন সংকটের অজুহাতে ছাত্র সংসদ কার্যালয় ভবনে স্থাপন করা হয় ইংরেজি বিভাগের অফিস ও সেমিনার কক্ষ। এক দশক আগে ছাত্র সংসদের ওপরতলায় বিদেশি ভাষা শিক্ষাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে এই বেদখল পর্বের শুরু।

ছাত্র সংসদ কার্যক্রম বন্ধ থাকলেও মহাবিদ্যালয়টির ১৪ হাজার শিক্ষার্থীকে প্রতি বছর ছাত্র সংসদের জন্য নির্ধারিত ফি ঠিকই দিতে হচ্ছে। এক সময় এই ফি ছিল ১০ টাকা। কয়েক বছর ধরে তা বাড়িয়ে করা হয়েছে ২৫ টাকা। গত আড়াই দশকে এ খাতে জমা হওয়া টাকা কোন কাজে লাগছে, ছাত্র সংসদ কার্যক্রম বন্ধ থাকার পরও ফি বাড়ানোর কারণ কী- এসব নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। অবশ্য কলেজের অধ্যক্ষ নিতাই চন্দ্র চন্দ জানাচ্ছেন, ছাত্র সংসদের ফি বাবদ নেওয়া টাকা নির্ধারিত খাতেই জমা রয়েছে।

রাজা গিরীশ চন্দ্র রায় ১৮৯২ সালে নগরীর টিলাগড় ও বালুচর এলাকায় ১২৪ একর জমিতে প্রমাতামহ মুরারীচাঁদের নামে এ মহাবিদ্যালয় স্থাপন করেন। তখন এটি ছিল অখণ্ড ভারতের আসামের প্রথম কলেজ। ১৯৩২ সালে এ কলেজে ছাত্র সংসদের গঠনতন্ত্র তৈরি করে নির্বাচন প্রক্রিয়া শুরু হয়। কাল পরিক্রমায় এ কলেজের অনেক শিক্ষার্থীই জাতীয় ও স্থানীয় রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ নেতা হয়ে উঠেছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন বাংলাদেশের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রয়াত আবদুস সামাদ আজাদ, সাবেক রেলমন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, সাবেক অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী প্রয়াত সাইফুর রহমান, বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন, সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত, সাবেক শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ। অথচ দীর্ঘ আড়াই দশকের বেশি সময় ধরে ছাত্র সংসদ নির্বাচন বন্ধ থাকায় রুদ্ধ হয়ে গেছে ঐতিহ্যবাহী এ কলেজের শিক্ষার্থীদের মধ্যে নেতৃত্ব গঠন ও গণতান্ত্রিক চর্চার প্রক্রিয়া।

সরেজমিন এমসি কলেজ ক্যাম্পাসে গিয়ে দেখা যায়, লাইব্রেরি ও শহীদ মিনারের মধ্যে ছাত্র সংসদ ভবনে চলছে বিদেশি ভাষা প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, ইংরেজি বিভাগের অফিস ও সেমিনার কক্ষের কার্যক্রম। ইংরেজি বিভাগের অফিস সহকারী অরবিন্দ তালুকদার সমকালকে জানান, কলেজটির ইংরেজি বিভাগের নিজস্ব ভবন নেই। শ্রেণিকক্ষেরও সংকট রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে ২০১৫ সাল থেকে ছাত্র সংসদ ভবনে বিভাগের অফিস ও সেমিনার কক্ষ নিয়ে আসা হয়। তিনি জানান, তারা আসার আগে থেকেই এখানে বিদেশি ভাষা প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের কার্যক্রম চলছিল।

সম্প্রতি বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের পক্ষ থেকে ছাত্র সংসদ নির্বাচনের দাবি উঠতে শুরু করেছে। এ প্রসঙ্গে সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের এমসি কলেজ শাখার আহ্বায়ক সাদিয়া নওশীন তাসমিন সমকালকে বলেন, কলেজে গণতান্ত্রিক পরিবেশ সুনিশ্চিত করতে কার্যকর ছাত্র সংসদ প্রয়োজন। তিনি অভিযোগ করেন, সরকারি দলের ছাত্র সংগঠনের অগণতান্ত্রিক হস্তক্ষেপে অন্যদের স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনাও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। ছাত্র সংসদ গঠিত হলে সাধারণ শিক্ষার্থীদের দাবি আদায়ের পাশাপাশি ক্যাম্পাসে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক পরিবেশ ফিরে আসবে। তিনি বলেন, সংসদ ভবন বেদখল হয়ে গেছে। অথচ প্রতি বছর শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে সংসদ ফি নেওয়া হচ্ছে। এর তহবিলে কত টাকা জমা হয়েছে, তা কোনো কাজে ব্যবহূত হচ্ছে কি-না- এসবের স্বচ্ছ জবাবদিহি প্রয়োজন।

ছাত্র সংসদ নির্বাচনের দাবিতে বাম ঘরানার দলগুলো কিছুটা সরব হলেও এ কলেজে ছাত্রলীগের কমিটি না থাকায় সংগঠনের পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য মেলেনি। তবে বিভিন্ন ফোরামে বিভিন্ন সময়ে এ নিয়ে বিচ্ছিন্নভাবে দাবি তুলছেন ছাত্রলীগের নেতারা। ২০০৩ সালে তাজিম উদ্দিনকে সভাপতি ও সাইফুল ইসলাম টিপুকে সাধারণ সম্পাদক করে কলেজ ছাত্রলীগের সর্বশেষ কমিটি হয়েছিল। ২০১০ সালের ১৩ জুলাই ছাত্রলীগ কর্মী উদয়ন সিংহ পলাশ হত্যার পর এ কমিটি বাতিল করা হয়।

এমসি কলেজে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের একটি আংশিক কমিটি রয়েছে। এ কমিটির পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, কলেজ ক্যাম্পাসে বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের পরিবেশ নেই। তার পরও শিক্ষা ও গণতন্ত্র চর্চার পরিবেশ ফিরিয়ে আনার স্বার্থে তারা চান ছাত্র সংসদ নির্বাচন দেওয়া হোক।

সিলেট জেলা ছাত্রলীগের সাবেক স্কুলছাত্র বিষয়ক সম্পাদক ও মুরারীচাঁদ কলেজের ছাত্র রাজনীতিতে যুক্ত হোসাইন আহমদ সমকালকে বলেন, ছাত্র সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে পারব না। তার পরও চাই নির্বাচন হোক। কারণ নতুন নেতৃত্ব বেরিয়ে আসবে। তিনি বলেন, প্রাচীন এ কলেজে যেমন অনেক সংকট রয়েছে, তেমনি সম্ভাবনাও রয়েছে। ছাত্রলীগ বরাবরই সাধারণ শিক্ষার্থীদের দাবিতে সরব। তার পরও বলব, ছাত্র সংসদ থাকলে ভালো হতো।

কলেজের ছাত্রলীগ নেতা দেলোয়ার হোসেন বলেন, ছাত্র সংসদ নির্বাচন দেওয়া হোক- এটা সাধারণ শিক্ষার্থীদের প্রাণের দাবি। ক্যাম্পাসে লেখাপড়ার সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিতে ছাত্র সংসদের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। এ নির্বাচন হলে কলেজে প্রাণ ফিরে আসবে।

এমসি কলেজ ছাত্রদলের তিন সদস্যের কমিটির প্রথম সদস্য রুবেল ইসলাম সমকালকে বলেন, ছাত্রলীগের দৌরাত্ম্যে কলেজ ক্যাম্পাসে সহাবস্থানের পরিবেশ নেই। পরীক্ষা থাকলেও ছাত্রদলের কেউ ক্যাম্পাসে যেতে পারে না। গেলেই হামলা-মারধর করা হয়। নির্বাচনের পরিবেশ ও প্রক্রিয়া নিয়ে শঙ্কা থাকার পরও ছাত্রদল শিক্ষার্থীদের দাবি-দাওয়া আদায়ের স্বার্থে ছাত্র সংসদ চায় বলে মন্তব্য করেন রুবেল। ছাত্র ইউনিয়নের কলেজ শাখার যুগ্ম আহ্বায়ক কাওসার আহমদ বলেন, সবার প্রত্যাশা ছাত্র সংসদ নির্বাচন।

ছাত্র সংগঠনগুলোর দাবির সঙ্গে কর্তৃপক্ষ একমত- এ কথা জানিয়ে এমসি কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর নিতাই চন্দ্র চন্দ দাবি করেন, এক বছর আগেই বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের প্রতিনিধিদের এ নির্বাচন দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। অবশ্য এ নিয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো বৈঠক হয়নি, তবে বিভিন্ন ফোরামে আলোচনা হয়েছে। এখন যেহেতু ডাকসু নির্বাচনের কথা হচ্ছে; আশা করি, এমসি কলেজেও ছাত্র সংসদ নির্বাচন হবে। ছাত্র সংসদ ভবনে অন্য বিভাগের কার্যক্রম প্রসঙ্গে তিনি বলেন, নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু হলে বসার জন্য সুবিধামতো কক্ষ বরাদ্দ দেওয়া হবে।

সংশ্লিষ্ট খবর