বাংলাদেশ

অগ্রাধিকার খাত ৬ পরিবেশ ও জলবায়ু

উপকূলজুড়ে সবুজ বেষ্টনী গড়ে তুলতে হবে

বিশেষ সাক্ষাৎকার : ড. আইনুন নিশাত

প্রকাশ : ১২ জানুয়ারি ২০১৯ | প্রিন্ট সংস্করণ

উপকূলজুড়ে সবুজ বেষ্টনী গড়ে তুলতে হবে

  শেখ রোকন

পানি ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ এবং ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. আইনুন নিশাত বলেছেন, নতুন করে বৃহৎ অবকাঠামো নির্মাণের আগে বিদ্যমান অবকাঠামোগুলোর সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। এ প্রসঙ্গে তিনি নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণকে 'বলিষ্ঠ পদক্ষেপ' আখ্যা দেন। সমকালের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে শীর্ষস্থানীয় এই জলবায়ু বিজ্ঞানী বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবেলায় বাংলাদেশের উপকূলরেখা বরাবর সবুজ বেষ্টনী গড়ে তোলায় বিশেষ মনোযোগ দিতে হবে সরকারকে। আঞ্চলিক পানি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে তিনি অববাহিকাভিত্তিক সুফল বণ্টনের ওপর জোর দিতে বলেন। ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানির বদলে হিমালয় অঞ্চলে নেপাল, ভুটান ও ভারতের সঙ্গে যৌথভাবে জলবিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্পকে অগ্রাধিকার দিতে বলেন বর্তমান সরকারের নতুন মেয়াদে।

আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে নৌপথ পুনরুদ্ধারে আগামী পাঁচ বছরে ১০ হাজার কিলোমিটার নৌপথ ড্রেজিংয়ের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। এ প্রসঙ্গে আইনুন নিশাত সমকালকে বলেছেন, টানা দুই মেয়াদেই আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার নদী ব্যবস্থাপনায় বিশেষ মনোযোগ দিয়ে এসেছে। এবারের ইশতেহারে তারই প্রতিফলন ঘটেছে। তিনি বলেন, দীর্ঘদিনের অবহেলার কারণে দেশের ছোট নদীগুলো প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছে। বেদখল হয়ে গেছে অনেক নদী। বড় নদীগুলোর দুই তীর ভেঙে অস্বাভাবিক চওড়া হয়েছে ও গভীরতা ক্রমেই কমছে। আগামী মেয়াদে জোর দিতে হবে নদী ব্যবস্থাপনার দিকে। সেক্ষেত্রে ড্রেজিং গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু শুধু খনন নয়, এর মাধ্যমে ভূমি উদ্ধারের বিষয়টি  বিশেষ বিবেচনায় নিতে হবে।

আইনুন নিশাত মনে করেন, গত দুই মেয়াদে যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়নে বৃহৎ পরিকল্পনাগুলো সরকারের বলিষ্ঠ সিদ্ধান্তের প্রমাণ। বিশেষ করে পদ্মা সেতু প্রকল্প রীতিমত 'দুঃসাহসিক'। নিজস্ব অর্থায়নের এই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে নতুন মেয়াদে সরকার গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণকেও অগ্রাধিকারে রাখতে পারে। তিনি মনে করেন, বর্তমানে চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরে যেসব ২০-২৫ ফুট ড্রাফটের সামুদ্রিক জাহাজ ভিড়তে পারে, তা দিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ভূমিকা রাখা কঠিন। যে লক্ষ্য নিয়ে পায়রা সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করা হয়েছে, তা অর্জনে জোর দিতে হবে।

অধ্যাপক নিশাত মনে করেন, প্রাকৃতিক পরিবেশ বিষয়ে বর্তমান সরকারের সবচেয়ে বড় অবদান সংবিধানে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে ১৮-ক ধারা যুক্ত করা। এতে বলা হয়েছে- দেশের প্রকৃতি, জীববৈচিত্র্য, জলাভূমি, বনভূমি ইত্যাদি রক্ষায় রাষ্ট্র দায়িত্বপ্রাপ্ত। তিনি মনে করেন, এর মাধ্যমে নীতিগত দিক থেকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ অঙ্গীকার ব্যক্ত হয়েছে। গতানুগতিক উন্নয়ন প্রক্রিয়া ও অবকাঠামো নির্মাণের ক্ষেত্রে প্রাকৃতিক পরিবেশ সুরক্ষায় নজর দেওয়া এখন রাষ্ট্রের সাংবিধানিক কর্তব্য। তিনি প্রত্যাশা করেন, আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে যেসব মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছে, সেখানে উন্নয়ন প্রক্রিয়ার সঙ্গে প্রতিবেশ ব্যবস্থার সংঘাত এড়ানো হবে। সরকারের নতুন মেয়াদের শুরুতেই তিনি সবুজ প্রবৃদ্ধি কৌশলপত্র প্রণয়নের ওপর জোর দেন। আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে উন্নয়ন কাঠামোর সব ক্ষেত্রেই সবুজ প্রবৃদ্ধি কৌশল মেনে চলা উচিত বলে তিনি মনে করেন।

ড. আইনুন নিশাত বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত বাংলাদেশের জন্য এক অনাকাঙ্ক্ষিত কিন্তু অনিবার্য বাস্তবতা। বৈশ্বিক এই দুর্যোগের কারণে আমাদের দেশে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, বন্যা, প্লাবন, খরা, নদীভাঙন, অস্বাভাবিক জোয়ারের তীব্রতা, মাত্রা ও পরম্পরা তিনটিই বাড়ছে। উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা ইতিমধ্যে জটিল আকার ধারণ করেছে। অনেক অধিবাসীই মিঠাপানির অভাবে দেশান্তরী হওয়ার কথা ভাবছে। আওয়ামী লীগের ইশতেহারে লবণাক্ততা রোধ করার কথা বলায় তিনি সন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি মনে করেন, আগামীতে বিভিন্ন দুর্যোগ বিশেষত জলোচ্ছ্বাসের উচ্চতা ও তীব্রতা বাড়বে। এজন্য উপকূলরেখাব্যাপী সবুজ বেষ্টনী গড়ে তোলার বিকল্প নেই।

নদীভাঙনের পাশাপাশি সমুদ্র ও নদীর মোহনায় নতুন নতুন চর জেগে উঠছে। নদী ও পানি বিষয়ে দেশে-বিদেশে সুনামের সঙ্গে কাজ করা এই পানি বিশেষজ্ঞ মনে করেন, জেগে ওঠা নতুন চরগুলোকেও স্থিতিশীল করে তোলায় জোর দিতে হবে। তার মতে, এই লক্ষ্য পূরণে একটি সহজ উপায় হচ্ছে সব চরেই বনায়ন। কিন্তু বনায়নের সঙ্গে সঙ্গে যদি জনবসতি স্থাপিত হতে থাকে, তাহলে বনায়ন টেকসই হবে না। উপকূলে জেগে ওঠা চরে বনায়ন ও বসতির ক্ষেত্রে একটি নীতিমালা প্রণয়নের তাগিদ দেন আইনুন নিশাত।

আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে প্রথমবারের মতো 'ডেল্টা প্ল্যান ২১০০' বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন- ডেল্টা প্ল্যান বা ব-দ্বীপ পরিকল্পনা মূলত পরিবেশের সঙ্গে অভিযোজনভিত্তিক কারিগরি ও অর্থনৈতিক মহাপরিকল্পনা। উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের সঙ্গে পানি সম্পদের ব্যবহার, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং এসবের পারস্পরিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া বিবেচনা করে এই দলিল প্রণয়ন করা হয়েছে। তিনি মনে করেন, ইশতেহারে ডেল্টা প্ল্যানের উল্লেখ এ ব্যাপারে সরকারের চিন্তা-ভাবনার গুরুত্ব নির্দেশ করছে। তবে এর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া সম্পর্কে সংশ্নিষ্টদের ধারণা আরও স্পষ্ট থাকা উচিত বলে তিনি মনে করেন।

আইনুন নিশাত বলেন, গত পাঁচ দশকে দেশে ইতিমধ্যে নানা পরিকল্পনার অধীনে ছোট-বড় শত শত অবকাঠামো নির্মিত হয়েছে। ডেল্টা প্ল্যানের অধীনে নতুন নতুন বৃহদাকার অবকাঠামো নির্মাণের আগে ইতিমধ্যে সম্পন্ন হওয়া প্রকল্পগুলোর সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার দিকে নজর দিতে হবে। কারণ, অনেক অবকাঠামোই রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য পূরণ করতে পারছে না। সমকালের প্রশ্নের জবাবে তিনি স্বীকার করেন, পরিবেশ ও পানিসম্পদ সংক্রান্ত কিছু প্রকল্প ও অবকাঠামো অনেক ক্ষেত্রে পরিস্থিতির অবনতি ঘটিয়েছে। তিনি বলেন, পানিসম্পদ উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে পানি ব্যবস্থাপনায় জোর দিতে হবে। অন্যথায় উন্নয়ন টেকসই হবে না।

আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে গঙ্গা ব্যারাজ নির্মাণের কথা বলা হয়েছে। নদী ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে এ ধরনের বড় প্রকল্পের প্রয়োজন আছে বলে আইনুন নিশাত মনে করেন। তবে এর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া, পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে নীতিগত, কারিগরি ও প্রায়োগিক পর্যায়ে উপযুক্ত বিশেষজ্ঞদের নিবিড়ভাবে যুক্ত করতে হবে। তিনি মনে করেন, পানি ব্যবস্থাপনা-সংক্রান্ত বৃহৎ প্রকল্প বাস্তবায়নে বাংলাদেশের বিশেষজ্ঞদের দক্ষতা ও দূরদৃষ্টি কাজে লাগাতে হবে।

ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে অভিন্ন নদীর পানিসম্পদ বিষয়ে অধ্যাপক আইনুন নিশাত মনে করেন, অববাহিকাভিত্তিক পানি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে দুই দেশ ইতিমধ্যে একমত হয়েছে। ২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিংয়ের ঢাকা সফরের সময়ই এ ব্যাপারে সমঝোতা হয়। কিন্তু গত সাত বছরে এর বাস্তবায়ন নিয়ে কোনো অগ্রগতি নেই। তিনি মনে করেন, এই সমঝোতার অধীনেই অভিন্ন নদীগুলোর উজানে পার্বত্য অঞ্চলে ড্যাম নির্মাণ করে জলবিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। অভিন্ন নদীর অংশীদার হিসেবে বাংলাদেশ সেসব প্রকল্পে বিনিয়োগ করে উৎপন্ন জলবিদ্যুতের একটি অংশ পেতে পারে। প্রয়োজনে অন্যান্য দেশের অংশ থেকেও কিনে নিতে পারে।

ভারত-বাংলাদেশে অভিন্ন নদীর পানি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে দেশের অভ্যন্তরে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের মধ্যে সমন্বয়ের তাগিদ দেন ড. নিশাত। তিনি বলেন, বিশেষভাবে সমন্বয় করতে হবে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের মধ্যে।

পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন-সংক্রান্ত শিক্ষায় জোর দেওয়া উচিত বলে আইনুন নিশাত মনে করেন। এসব ক্ষেত্রে বাংলাদেশের আরও বেশি সংখ্যক তরুণ গবেষক ও বিজ্ঞানী প্রয়োজন। তিনি বলেন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন-সংক্রান্ত শিক্ষার মানোন্নয়ন সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থার মানোন্নয়নের সঙ্গেই জড়িত।

মন্তব্য


অন্যান্য