বাংলাদেশ

পোশাক শ্রমিকদের বিক্ষোভ-সংঘর্ষ অব্যাহত

মজুরি পর্যালোচনায় ফের বৈঠক রোববার

প্রকাশ : ১০ জানুয়ারি ২০১৯

মজুরি পর্যালোচনায় ফের বৈঠক রোববার

বৃহস্পতিবারও রাজধানীর মিরপুর শেওড়াপাড়ায় সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন পোশাক শ্রমিকরা— ফোকাস বাংলা

  সমকাল প্রতিবেদক ও নিজস্ব প্রতিবেদক, সাভার

নতুন মজুরি কাঠামো নিয়ে পোশাক খাতের চলমান শ্রম অসন্তোষ নিরসনে গঠিত ত্রিপক্ষীয় পর্যালোচনা কমিটি গ্রেডভিত্তিক বৈষম্য নিয়ে গভীর পর্যালোচনা করছে। এ সংক্রান্ত শ্রমিকদের আপত্তি আমলে নেওয়া হয়েছে। আগামী রোববার এ বিষয়ে আবারও বৈঠকে বসবে কমিটি। তবে গ্রহণযোগ্য একটি সমাধানের জন্য শ্রমিকদের কাছে আরও কিছু সময় চেয়ে কমিটির পক্ষ থেকে তাদের কাজে ফেরার অনুরোধ জানানো হয়েছে।

এদিকে চতুর্থ দিনের মতো বৃহস্পতিবারও রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় এবং সাভারের কিছু কিছু কারখানায় শ্রমিকরা কর্মবিরতি এবং সড়ক অবরোধ করে। কোথাও কোথাও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে শ্রমিকরা।

এদিকে এক টুইটবার্তায় পোশাক কারখানায় শ্রম অসন্তোষের ন্যায্য ও শান্তিপূর্ণ সমাধানের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন তৈরি পোশাকের প্রধান বাজার জার্মানির ঢাকায় নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত পিটার ফাহরেনহোল্‌জ।

শ্রমিকদের মূল আপত্তি ৩, ৪ ও ৫ নম্বর গ্রেড নিয়ে। নতুন কাঠামোয় এই তিন গ্রেডে অন্যান্য গ্রেডের সমহারে মজুরি বাড়েনি বলে অভিযোগ তাদের। বৃহস্পতিবার পর্যালোচনা কমিটির বৈঠকে এ তিন গ্রেডের মজুরি পরিস্থিতি নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা করেন সরকার, মালিক ও শ্রমিক পক্ষের প্রতিনিধিরা। বিভিন্ন কারখানায় শ্রম অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ায় জরুরিভিত্তিতে বৃহস্পতিবারই প্রথম বৈঠকে বসেন প্রতিনিধিরা।

নতুন মজুরি পাওয়ার পর রাজধানী এবং আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় বেশ কিছু কারখানার শ্রমিকদের অসন্তোষ, সড়ক অবরোধ ও শ্রমিক-পুলিশ সংঘর্ষের পরিপ্রেক্ষিতে গত মঙ্গলবার মালিকপক্ষের ৫ জন, শ্রমিকপক্ষের সমসংখ্যক সদস্য নিয়ে মোট ১২ সদস্যের ত্রিপক্ষীয় পর্যালোচনা কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির অপর দুই সদস্য হচ্ছেন শ্রম ও বাণিজ্য সচিব। বৃহস্পতিবারের বৈঠকে কমিটির প্রায় সব সদস্য উপস্থিত ছিলেন।

সমস্যাকে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছে সরকার: শ্রম মন্ত্রণালয়ে পর্যালোচনা কমিটির বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন শ্রম সচিব আফরোজা খান। তিনি বলেন, কমিটির সব পক্ষ মজুরি নিয়ে তাদের আপত্তির জায়গা থেকে বিশদ আলোচনা করেছেন। এতে দেখা যায়, ১, ২, ৬ ও ৭ নম্বর গ্রেডের মজুরি বৃদ্ধি নিয়ে কোনো পক্ষের আপত্তি নেই। তবে ৩, ৪ ও ৫ নম্বর গ্রেড নিয়ে কিছু আপত্তি আছে শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধিদের। তাদের মতে, অন্যান্য গ্রেডের মতো এই তিন গ্রেডে একই হারে বাড়েনি। বিষয়গুলো আমলে নিয়েছেন তারা। এ আপত্তি গভীর পর্যালোচনা করছেন তারা। একটা সমাধানে আসার চেষ্টা চলছে।

শ্রম সচিব বলেন, আগামী রোববারের বৈঠকে একটা সমাধানে আসার চেষ্টা করবেন তারা। সেটা না হলেও খুব কম সময়ের মধ্যেই সমাধান আশা করছেন তারা। তিনি বলেন, কমিটিকে এক মাস সময় দেওয়া হয়েছে। তবে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সমাধান হবে। এ সময় পর্যন্ত ধৈর্য ধরে কাজে ফিরতে শ্রমিকদের প্রতি অনুরোধ জানান তিনি। শ্রমিকদের যেকোনো সমস্যা 'হেল্পলাইন'-এ জানানোর অনুরোধ করেন তিনি। কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের (ডিআইএফই) অধীনে পরিচালিত এ কার্যক্রম সম্পর্কে আজ কারখানা অধ্যুষিত এলাকায় মাইকে প্রচার চালানো হবে। এ কার্যক্রমকে আরও শক্তিশালী করার কথা জানান তিনি।

শ্রম অসন্তোষ নিয়ে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা না খুঁজলেও এর পেছনে অসন্তোষের পেছনে কেবল মজুরি নয়, অন্য কিছু আছে বলে মনে করেন শ্রম সচিব। যুক্তি দিয়ে তিনি বলেন, যে সব কারখানায় বর্ধিত মজুরির তুলনায়ও বেশি মজুরি দেওয়া হয়, সে সব কারখানায়ও অসন্তোষ হয়েছে। আবার যে সব এলাকায় পোশাক কারখানা নেই সেখানেও সড়ক অবরোধ হয়েছে।

শ্রম সচিব ছাড়াও বৈঠকে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন এফবিসিসিআইর বর্তমান এবং বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি সফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন, বিজিএমইএ সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান, বিজিএমইএর সাবেক সভাপতিদের মধ্যে সাংসদ আব্দুস সালাম মুর্শেদী, আতিকুল ইসলাম, পোশাক খাতের বড় প্রতিষ্ঠান মোহাম্মদী গ্রুপের এমডি রুবানা হক প্রমুখ। শ্রমিক নেতাদের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন মন্টু ঘোষ, আমিরুল হক আমিন, সিরাজুল ইসলাম রনি, লিমা ফেরদৌসী, নাজমা বেগম প্রমুখ।

সমঝোতার আহ্বান জার্মানির রাষ্ট্রদূতের: ঢাকায় নিযুক্ত জার্মানির রাষ্ট্রদূত পিটার ফাহরেনহোল্‌জ বৃহস্পতিবার এক টুইটবার্তায় বলেন, 'ধর্মঘটি পোশাক শ্রমিকদের দমন করা উচিত নয় পুলিশের। সমঝোতা করতে হবে কারখানা মালিকদের।' সংঘাতের একটি 'শান্তিপূর্ণ ও ন্যায্য' সমাধান প্রত্যাশা করেছেন তিনি। বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের প্রধান বাজার এখন জার্মানি। এক সময়ের প্রধান বাজার যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে দুই বছর ধরে এক নম্বর অবস্থানে উঠে আসে জার্মানি। এ দেশটির মাধ্যমে ইউরোপের অন্যান্য দেশেও যায় বাংলাদেশের পোশাক।

মিরপুরে শ্রমিকদের বিক্ষোভ: ন্যূনতম মজুরির দাবিতে বৃহস্পতিবারও রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন শ্রমিকরা। মিরপুরের শেওড়াপাড়া ও কালশী এলাকায় সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন তারা। এর মধ্যে সকাল ৯টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত মিরপুরের শেওড়াপাড়া এবং সকাল ১১টা পর্যন্ত কালশী সড়ক অবরোধ করা হয়। এ সময় ওই এলাকায় যান চলাচল বন্ধ ছিল। এতে আশপাশ এলাকায় যানজট সৃষ্টি হয়। বিক্ষোভের সময় কোনো বড় অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি।

প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ জানায়, বৃহস্পতিবার সকাল ৯টার দিকে কাফরুল এলাকার পোশাক কারখানার শ্রমিকরা শেওড়াপাড়ায় সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ শুরু করেন। তাদের সঙ্গে মিরপুর থানা এলাকার কয়েকটি পোশাক কারখানার শ্রমিকরাও যোগ দেন। পরিস্থিতি সামাল দিতে অতিরিক্ত পুলিশ অবস্থান নেয় সেখানে। দফায় দফায় পুলিশ তাদের সরে যেতে মাইকিং করে। কিন্তু তারা বিক্ষোভ করতে থাকেন। সড়ক অবরোধ থাকায় মিরপুর ১০ থেকে আগারগাঁও সড়কে সব ধরনের যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এতে আশপাশ এলাকায় যানজট সৃষ্টি হয়। দুপুর ২টার দিকে পুলিশ বুঝিয়ে তাদের সড়ক থেকে সরিয়ে দেয়। এরপর থেকে ওই সড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক হতে থাকে। কাফরুল থানা পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, পোশাক শ্রমিকরা শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ করেছেন। কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি।

এদিকে সকাল ৯টার দিকে পল্লবী থানাধীন কালশী এলাকায় সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন ওই এলাকার কয়েকটি পোশাক কারখানার শ্রমিকরা। এতে কালশী ও আশপাশের সড়কে যানজটের সৃষ্টি হয়। বিকল্প সড়ক ব্যবহার করে যান চলাচল করতে থাকে। নিরাপত্তার জন্য বিপুলসংখ্যক পুলিশ সদস্যসহ জলকামান, সাঁজোয়া যান মোতায়েন করা হয়। পল্লবী থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মইনুল কবির জানান, সকাল ১১টার দিকে মালিকদের সঙ্গে আলোচনার পর শ্রমিকরা অবরোধ প্রত্যাহার করে চলে যান। এরপর যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।

আশুলিয়ায় শ্রমিক বিক্ষোভ-সংঘর্ষ, ১০টি কারখানা ছুটি ঘোষণা: বৃহস্পতিবার সকালে টঙ্গী-আশুলিয়া-ইপিজেড সড়কের আশুলিয়ার বেরন, কাঠগড়া ও জামগড়া এলাকায় শ্রমিক ও পুলিশের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা সড়ক অবরোধ করায় পুলিশ তাদের বাধা দিলে দুই গ্রুপের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া, শ্রমিকদের ইট পাটকেলের বিপরীতে পুলিশ টিয়ারশেল নিক্ষেপ ও লাঠিচার্জ করে। এ সময় পুলিশ ও শ্রমিকসহ আহত হয়েছে অন্তত ৩০ জন। বৃহস্পতিবারও সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে ১০টি পোশাক কারখানায়।

পুলিশ ও বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা জানান, সকালে বেরন এলাকার কয়েকটি কারখানার শ্রমিকরা কারখানায় ঢুকে কর্মবিরতি পালন করেন। এক পর্যায়ে সকাল সাড়ে ৮টার দিতে একযোগে শ্রমিকরা কারখানার বাইরে বেরিয়ে এসে টঙ্গী-আশুলিয়া-ইপিজেড সড়কে অবস্থান নেন। এ সময় তারা সড়কের ওপর ইট ও কাঠের টুকরা ফেলে আগুন জ্বালিয়ে সড়ক অবরোধের চেষ্টা করলে পুলিশ বাধা দেয়। এতে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে পুলিশ শ্রমিকদের ধাওয়া ও লাঠিচার্জ করে। এ সময় শ্রমিকরাও পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে টিয়ারশেল নিক্ষেপ করলে শ্রমিকরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। এ সময় শ্রমিক ও পুলিশের মধ্যে ব্যাপক ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে শ্রমিক ও পুলিশসহ অন্তত ৩০ জন আহত হন। পরে বিজিবি ও পুলিশসহ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর অতিরিক্ত সদস্যদের উপস্থিতিতে প্রায় এক ঘণ্টা পর টঙ্গী-আশুলিয়া-ইপিজেড সড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়। শ্রমিক বিক্ষোভ এড়াতে এসব এলাকার ১০টি কারখানা ছুটি ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ।

আশুলিয়া শিল্প পুলিশ-১ এর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শাহাদাত হোসেন জানান, সকালে আশুলিয়া এলাকায় শ্রমিকরা সড়ক অরবোধ করে বিক্ষোভের চেষ্টা করলে পুলিশ তাদের সড়ক থেকে সরিয়ে দেয়। পরিস্থিতি বর্তমানে শান্ত রয়েছে। শিল্পাঞ্চলের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।


মন্তব্য যোগ করুণ

পরের
খবর

ওবায়দুল কাদেরের বাইপাস সার্জারি সফলভাবে সম্পন্ন


আরও খবর

বাংলাদেশ

ফাইল ছবি

  সমকাল প্রতিবেদক

সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের বাইপাস সার্জারি সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে।

সিঙ্গাপুরে ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে থাকা ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের সদস্য জোবায়দুল হক রাসেল সমকালকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। 

চিকিৎসকের বরাত দিয়ে জোবায়দুল হক রাসেল বলেন, বাংলাদেশ সময় দুপুর ২টায় ওবায়দুল কাদেরের বাইপাস সার্জারি সফলভাবে সম্পন্ন হয়।

সিঙ্গাপুরে ওবায়দুল কাদেরের চিকিৎসা সমন্বয়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালক এবং নিউরোলজিস্ট প্রফেসর ডা. আবু নাসার রিজভী বুধবার বিকেলে  ডা. সিবাস্টিনকে উদ্ধৃত করে জানান, কার্ডিওথোরাসিক সার্জন ডা. সিবাস্টিন কুমার সামির নেতৃত্বে সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে কাদেরের বাইপাস সার্জারি সম্পন্ন হয়। সার্জারির পর কাদেরকে পোস্ট অপারেটিভ কেয়ারে রাখা হয়েছে। 

এর আগে কার্ডিও থোরাসিক সার্জন ডা. সিবাস্টিন কুমার সামি কাদেরের অপারেশন পরবর্তি অগ্রগতি পরিবারের সদস্যদের ব্রিফ করেন।

কাদেরের পরিবার মহান স্রষ্টা ও দেশবাসীর কাছে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তার পূর্ণাঙ্গ সুস্থতার জন্য সবার কাছে দোয়া চান। 

হৃদরোগে আক্রান্ত ওবায়দুল কাদের গুরুতর অসুস্থ হয়ে গত ৩ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে ভর্তি হন। সেখানে তার হৃদযন্ত্রে তিনটি ব্লক ধরা পড়ে এবং একটিতে রিং পরানো হয়। উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে ৪ মার্চ এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে সিঙ্গাপুরে নেওয়া হয়।

সংশ্লিষ্ট খবর

পরের
খবর

‘মনে হচ্ছিল, আমি হয়তো মারা যাচ্ছি বা মারা যাবো’


আরও খবর

বাংলাদেশ

ক্রাইস্টচার্চে মসজিদের ভেতরে ছিলেন বাংলাদেশি ওমর জাহিদ

‘মনে হচ্ছিল, আমি হয়তো মারা যাচ্ছি বা মারা যাবো’

প্রকাশ : ২০ মার্চ ২০১৯

নিউজিল্যান্ডে ক্রাইস্টচার্চে মসজিদে হামলা থেকে বেঁচে ফেরা বাংলাদেশি ওমর জাহিদ

  অনলাইন ডেস্ক

নিউজিল্যান্ডে ক্রাইস্টচার্চে যখন হামলা হয়, তখন মসজিদের ভেতরেই ছিলেন বাংলাদেশি ওমর জাহিদ। মসজিদে খুতবা শুরু হওয়ার কিছুক্ষণের ভেতরেই তিনি গুলির শব্দ শুনতে পান।

তার পিঠে এখনো রয়েছে গুলির একটি ক্ষত। গত ১৫ মার্চের ওই হামলার ঘটনায় অন্তত ৫০ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন অনেক মানুষ।

হামলাকারী পুরো হামলার ঘটনাটি নিজেই ভিডিও করে লাইভ সম্প্রচার করে। তাকে গ্রেপ্তারের পর রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ।

ওই ভয়াবহ হামলার সময় মসজিদের ভেতরেই ছিলেন ওমর জাহিদ। সে দিনের সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার বর্ণনা করতে দিয়ে তিনি বলছিলেন, নিউজিল্যান্ড অবশ্যই ভালো একটি দেশ, এটা আমরা বিশ্বাস করতাম এবং এখনো করি। এতদিন ধরে আমরা খুব ভালো একটি জীবনযাপন করছিলাম।

চার বছর ধরে নিউজিল্যান্ডে রয়েছেন ওমর জাহিদ। তিনি বলেন, সে দিন ছিল শুক্রবার। মুসলমান হিসেবে প্রতি শুক্রবারেই জুম্মার নামাজ পড়তে আমরা মসজিদে যাই। দুপুর সাড়ে ১২টায় আমার কাজ শেষ করে নামাজ পড়ার প্রস্তুতি নিই। ক্রাইস্টচার্চে জুম্মার নামাজ শুরু হয় দুপুর ২টায়। খুতবা শুরু হয় তার আধঘণ্টা আগে, দুপুর দেড়টায়।

ওমর জাহিদ বলেন, ওই দিন আমি একটু আগে গিয়েছি, যাতে খুতবা শুনতে পারি। এজন্য বাসা থেকে বের হয় পৌনে একটা বা ১২টা ৫০ মিনিটের দিকে। আমার নিজের গাড়ি চালিয়ে মসজিদে পৌঁছাই ১টা ১০ মিনিটের দিকে। এরপর মসজিদে প্রবেশ করে দুই রাকাত নফল নামাজ পড়ি। এরপর দ্বিতীয় সারিতে গিয়ে বসি, ঠিক মুয়াজ্জিনের পেছনে। দেড়টার দিকে ইমাম সাহেব প্রবেশ করে তার স্থানে গিয়ে সালাম দিয়ে সবে দুই একটা কথা বলতে শুরু করেছেন। এমন সময় আমরা বাইরে থেকে বিকট আওয়াজ শুনতে পেলাম। প্রথমে আমরা ভেবেছিলাম আতশবাজি বা বৈদ্যুতিক কোন শর্টসার্কিট হয়েছে। একটু পরেই দেখতে পাই পেছনের মানুষজন দৌড়াদৌড়ি করছে, চিৎকার করছে। তখন আমাদেরও মনে হলো যে খারাপ কিছু হয়তো ঘটছে। কিন্তু গোলাগুলি হচ্ছে কিনা, সেটা তখনো আমি ঠিকভাবে বুঝতে পারিনি।''

তিনি বলেন, তখন আমি ডানপাশে গিয়ে একেবারে লম্বা হয়ে শুয়ে পড়লাম। আমার সাথে অন্য যারা ছিলেন, তারাও শুয়ে পড়লেন, তবে কয়েকজন হয়তো বের হয়ে গিয়েছিলেন। তাদের কেউ কেউ হয়তো বেঁচে গেছেন। তবে সেই দিন অনেকে হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। নিজের বেঁচে যাওয়ার জন্য ভাগ্যকেই কৃতিত্ব দিতে চান ওমর জাহিদ।

জাহিদ বলেন, আমি আসলে ভাগ্যক্রমে বেঁচে গেছি। কারণ আমার ডানপাশে যিনি ছিলেন, তিনি গুরুতর আহত হয়েছিলেন। তিনি মারা গেছেন কিনা জানি না। আমার পায়ের কাছে ছিল একটি সোমালিয়ান বাচ্চা, সে মারা গেছে। বাম পাশেও একজন ছিলেন, তিনিও মারা গেছেন কিনা নিশ্চিত নই।

তিনি বলেন, যখন গুলি করা হচ্ছিল, তখন আমার বাম কাঁধে একটি গুলি লাগে। তখন আমার মনে হচ্ছিল যে, আমি হয়তো মারা যাচ্ছি বা মারা যাবো। প্রায় বিশ থেকে ত্রিশ মিনিটের মতো গুলি করা হয়েছে, সঠিক সময়টা আমার মনে নেই। পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত ভয়াবহ। আমি জানি না কিভাবে আমি বেঁচে ফিরে আসলাম। কারণ ভিডিওতে পরে আমি দেখেছি, আমার দিকে সে তিন চারবার গুলি করেছে। আসলে ভাগ্যক্রমে বেঁচে গেছি।''

জাহিদ বলেন, যখন গুলি থেমেছে, তখন আমি দুইজন ভারতীয় বন্ধুকে দেখতে পেলাম। তাদের সঙ্গে আগের বাসায় একসঙ্গে থাকতাম। আসিফ নামের ওই বন্ধুকে আমি ডাকলে তিনি এসে আমাকে পরীক্ষা করে বললেন যে, বুলেট আমার শরীরের ভেতরে যায়নি, শুধুমাত্র একটু স্পর্শ করে গেছে, একটু জখম হয়েছে। তখন আমি উঠে তাদের জিজ্ঞেস করলাম, বন্দুকধারী কি চলে গেছে? ওরা নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারলো না। আমি উঠে পাশের যে মুরুব্বি শুয়ে ছিলেন, তাকে জাগানোর চেষ্টা করলাম। তাকে আমি চিনি, কিন্তু নাম জানি না। তবে তিনি কোন সাড়া দিচ্ছিলেন না। আমি ভাবলাম তিনি হয়তো মারা গেছেন। এরপরে আমি যখন পেছনে তাকালাম, যা দেখলাম তা দেখে আমি যেন বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না।

তিনি বলেন, তিন থেকে চার বছরের যে ছেলেটাকে একটু আগেই কোরান শরীফ পড়ে রাখতে দেখেছি, সে হয়তো একজন হাফেজ, তাকে দেখি বিধ্বস্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে, মুখে গুলির আঘাতের চিহ্ন। গুলি শুরু হওয়ার আগে মোজাম্মেল হক নামের যে বন্ধুর সঙ্গে বাংলাদেশে যাওয়ার ব্যাপারে গল্প করছিলাম, তাকে খোঁজার চেষ্টা করলাম, কিন্তু কোথাও দেখতে পেলাম না। যখন আশেপাশে তাকালাম, দেখলাম যে আমার পরিচিত অনেকেই পড়ে আছেন।

ওমর জাহিদ বলেন, নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চে মুসলমান সম্প্রদায়টি অনেক ছোট। সব মিলিয়ে তিনশ জনের মতো ব্যক্তি নিয়মিত মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে আসেন। এ কারণে প্রায় সবাই একে অপরকে চেনেন। দেখতে পেলাম একজন ভারতীয় ব্যক্তি, যিনি এখানে আসার আগে কিউবায় থাকতেন, এক কোণে দেয়ালে হেলান দিয়ে সোফার মধ্যে বসে আছেন। তিনি খুব ভালো একজন মানুষ ছিলেন, একটি ডেইরি দোকানের মালিক ছিলেন।

এরপর পাঁচ থেকে ১০ সেকেন্ডের মতো মসজিদে ছিলেন ওমর জাহিদ। পেছনের এলাকা অর্থাৎ পার্কিং এলাকা থেকে দেয়াল টপকে একটি বাসায় আশ্রয় নেন।

ওই বাসায় একজন ব্যক্তি ছিলেন, যিনি হয়তো সামরিক বাহিনী বা পুলিশের ডাক্তার ছিলেন। তিনি প্রাথমিক পর্যায়ের সহায়তা দিলেন। আমার সঙ্গে আরো কয়েকজন ছিলেন, যাদের অবস্থা ছিল আরো গুরুতর।

একটু পরে অ্যাম্বুলেন্স এসে গুরুতর আহতদের জোর করে হাসপাতালে নিয়ে যায়। পুলিশ তাদের বলে যে, তারা যেন এখান থেকে অন্য কোথাও না যায়, কারণ তখনো হামলাকারীকে আটক সম্ভব হয়নি।

পরের সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা তাকে ওই বাড়িতেই থাকতে হয়। বিকেলে পুলিশের গাড়ি এসে ওই বাসা থেকে তাকে নিয়ে নিজের বাসায় পৌঁছে দেয়। এরপর জরুরি বিভাগে যোগাযোগ করা হলে কর্মীরা এসে ইসিজি, ব্লাড টেস্ট আর ড্রেসিং করে দেয়।

ওমর জাহিদ বলেন, এরপরে আমি আবার হাসপাতালে গেলাম আমার বন্ধুদের খবর নিতে। কিন্তু এখনো তাদের সম্পর্কে কোন তথ্য পাইনি। সূত্র: বিবিসি বাংলা। 

সংশ্লিষ্ট খবর

পরের
খবর

রিকশাচালক থেকে কোটিপতি


আরও খবর

বাংলাদেশ

বাপবেটার ইয়াবা কারবার

রিকশাচালক থেকে কোটিপতি

নতুন দৃষ্টান্ত :মাদক সংক্রান্ত ঘটনায় মানি লন্ডারিং আইনে আসামিদের সাড়ে ৮ কোটি টাকার সম্পদ ক্রোকের আদেশ

প্রকাশ : ২০ মার্চ ২০১৯ | প্রিন্ট সংস্করণ

  সাহাদাত হোসেন পরশ

তারা রিকশা চালিয়ে জীবন নির্বাহ করতেন ২০০৯-১০ সালেও। অভাবের সংসারে তিনবেলা পরিবারের সব সদস্যের খাবারও জুটত না ঠিকমতো। কিন্তু গোলাপি বড়ি জীবন বদলে দিল তাদের। তিন বাপবেটা মিলেমিশে শুরু করলেন ইয়াবা কারবার। ধীরে ধীরে বদলে যেতে থাকে সময়, জীবনের চালচিত্র। একপর্যায়ে দেশব্যাপী তৈরি করেন তারা ইয়াবার বড় নেটওয়ার্ক। সেই গোলাপি বড়ির কল্যাণে বদলে যায় পুরো পরিবার, কোটিপতি বনে যান টেকনাফের নাজিরপাড়ার এজাহার মিয়া (৭০) এবং তার দুই ছেলে নুরুল হক ভুট্টো (৩২) ও নূর মোহাম্মদ (৩৫)।

২০১৭ সালের ২৯ আগস্ট এ চক্রের বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং আইনে একটি মামলা দায়ের করা হয় টেকনাফ মডেল থানায়। এরই মধ্যে ওই মামলার তদন্ত শেষ করেছে সিআইডি। সেখানে ইয়াবার কারবারে তিন বাপবেটার এ গ্রুপের ৬০ জনের নাম উঠে এসেছে। এজাহার ও তার দুই ছেলের প্রায় সাড়ে আট কোটি টাকার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ ক্রোক করার আদেশ দিয়েছেন আদালত। তবে তিন বাপবেটা জামিন নেওয়ার পর কোথায় রয়েছেন, তা জানা নেই সংশ্নিষ্টদের। সিআইডির দায়িত্বশীল সূত্র থেকে পাওয়া গেছে এসব তথ্য। এর আগে কক্সবাজারে ইয়াবা কারবারিদের আত্মসমর্পণের সময় আলোচনায় আসে তাদের সম্পদের বিষয়টি।

এ ব্যাপারে সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার মোল্যা নজরুল ইসলাম বলেন, 'বছর দেড়েক আগে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থানার দুটি মাদক মামলার তদন্ত করতে গিয়ে সিআইডি এ চক্রের বিপুল সম্পদের খোঁজ পায়। এরপর মাদক মামলার আসামিদের বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং আইনে মামলা করা হয়। মাদক থেকে মানি লন্ডারিং আইনে মামলার ঘটনাটি সেটি প্রথম ছিল। এ মামলার তিন আসামির সম্পদ জব্দের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।'

তদন্ত-সংশ্নিষ্ট দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, এ মামলার তদন্তে উঠে এসেছে- এজাহার মিয়া ও তার দুই ছেলে আটটি ব্যাংক ও চারটি মোবাইল ব্যাংকিং এজেন্টের মাধ্যমে ১৮২টি হিসাব নম্বর থেকে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মাদক বিক্রির অর্থ সংগ্রহ করতেন। এ অর্থে তারা নির্মাণ করেছেন দুটি বিলাসবহুল বাড়ি। কক্সবাজার শহর ও টেকনাফে নয় স্থানে জমি কিনেছেন। মাদকের অর্থ দিয়ে বিলাসী জীবনযাপন করতেন তারা।

তদন্ত সূত্র বলছে, এজাহার মিয়ার ছেলে ভুট্টো স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত মাদক ব্যবসায়ী। এজাহার ও তার দুই ছেলে কখনও নিজে, কখনও বাহকের মাধ্যমে ইয়াবার চালান টেকনাফ থেকে ঢাকা, নরসিংদী, নারায়ণগঞ্জ, জয়পুরহাট, মুন্সীগঞ্জ, বরিশাল, টাঙ্গাইল, ফরিদপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় পৌঁছে দিতেন। পুরো এ চক্রে আরও যারা রয়েছেন- কক্সবাজারের নাজিরপাড়ার

নুরুল আলমের ছেলে জালাল উদ্দিন ও আবছার উদ্দীন, মো. বেলাল, জালিয়াপাড়ার মো. আরিফ, আবদুর রহমান, অলিয়াবাদের নুরুল মোস্তফা, ডেইলপাড়ার মোহাম্মদ তৈয়ব, কলেজপাড়ার নুরুল কবিরের ছেলে রাশেদুল ইসলাম, হেলাল, মো. কামাল, মোহাম্মদ হাসান, দক্ষিণ জালিয়াপাড়ার আবদুল কাদেরের ছেলে মোজাহার আলম, কুলালপাড়ার মৃত আলী আহমদের ছেলে আবু তাহের, মিরপুর ১০ নম্বরের বাসিন্দা মো. হামিদ, নরসিংদীর বাঘাটার মৃত চান মিয়ার ছেলে মো. রাসেল, মুন্সীগঞ্জের উত্তর কাজী কসবার জাফর শেখের ছেলে রিয়াজ, চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদার মৃত রুস্তম আলীর ছেলে আবদুল কুদ্দুস, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়ার দুর্গাপুরের সুমাইয়া আক্তার রানী, জামালপুরের তালাশের মনির হোসেনের ছেলে নাঈম হোসেন, কুমিল্লার মুরাদনগরের মৃত আশরাফ আলীর ছেলে মো. শাহজালাল, গাজীপুরের টঙ্গীর সোহেল আহমেদ, ঢাকার পল্লবীর আবদুর রহিম জনি, পশ্চিম শেওড়াপাড়ার মো. স্বপন, চাঁদপুর সদরের আফজাল হোসেনের ছেলে সালাউদ্দিন, মধ্য বাড্ডার গোলাম ফারুক, নরসিংদী সদরের মধ্যনগর এলাকার বজলুর রহমানের ছেলে রায়হান খান, মধ্য বাড্ডার আফরোজা আক্তার এ্যানী প্রমুখ।

সিআইডির অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার নাজিম উদ্দিন আল আজাদ বলেন, 'মাদক একটি জাতীয় সমস্যা বিবেচনায় মানি লন্ডারিং আইন, ২০১২ (সংশোধনী-২০১৫)-এর ১৪ ধারা অনুযায়ী মূল তিন আসামির স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ ক্রোকের আবেদন করা হয়। আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে কক্সবাজারের বিশেষ জজ আদালত মূল তিন আসামির সম্পদ ক্রোকের আদেশ দেন।'

এখন এই সম্পদ কারা দেখভাল করবে- এটা জানতে চাইলে নাজিম উদ্দিন আরও বলেন, 'ক্রোক করা সম্পদ জেলা প্রশাসক বা পুলিশ সুপার দেখভাল করতে পারেন। আদালত হয়তো পরবর্তী আদেশে সেটা বলবেন। সম্পদ ক্রোকের আদেশের অনুলিপি মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও জেলা রেজিস্ট্রার অফিসে দেওয়া হয়েছে।'

সংশ্লিষ্ট খবর