বাংলাদেশ

গণমাধ্যমের সঙ্গে মতবিনিময়

নির্বাচনে কালো টাকা ব্যবহার হলে ব্যবস্থা নেবে দুদক

প্রকাশ : ০৬ ডিসেম্বর ২০১৮

নির্বাচনে কালো টাকা ব্যবহার হলে ব্যবস্থা নেবে দুদক

প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সম্পাদক ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে বৃহস্পতিবার রাজধানীর সেগুনবাগিচায় দুদকের প্রধান কার্যালয় মিলনায়তনে মতবিনিময় সভা হয়— সমকাল

  সমকাল প্রতিবেদক

নির্বাচনী প্রচারণায় যারা কালো টাকা ব্যবহার করবেন, তাদের তালিকা করা হবে। এ লক্ষ্যে কমিশনের গোয়েন্দা ইউনিটকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। যাদের বিরুদ্ধে কালো টাকা ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া যাবে, তাদের আইনের আওতায় আনা হবে। হলফনামার তথ্যও যাচাই-বাছাই করা হবে।

'আন্তর্জাতিক দুর্নীতিবিরোধী দিবস পালন ও উত্তম চর্চার বিকাশে গণমাধ্যমের ভূমিকা' শীর্ষক এক মতবিনিময় সভায় দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান (দুদক) ইকবাল মাহমুদ এ কথা বলেন। ৯ ডিসেম্বর জাতিসংঘ ঘোষিত আন্তর্জাতিক দুর্নীতিবিরোধী দিবস পালন করা হবে।

দিবসটি সামনে রেখে প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সম্পাদক ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে বৃহস্পতিবার রাজধানীর সেগুনবাগিচায় দুদকের প্রধান কার্যালয় মিলনায়তনে মতবিনিময় সভা হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন কমিশনের চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ। সভায় দুর্নীতি দমন ও প্রতিরোধের নানা তথ্য তুলে ধরেন দুদক সচিব ড. মো. শামসুল আরেফিন।

সভার সভাপতি দুদক চেয়ারম্যান বলেন, নির্বাচনী প্রচারণায় কতগুলো গরু-খাসি জবাই করলেন, কতগুলো লাল পোস্টার টানানো হলো— এ ধরনের নানা তথ্য সংগ্রহ করা হবে। মানুষ প্রত্যাশা করে রাজনীতি, প্রশাসন যে ক্ষেত্রেরই হোক না কেন, নেতৃত্ব হতে হবে পুতপবিত্র। নির্বাচনে যারা প্রার্থী হবেন, তারা তাদের হলফনামায় সম্পদের সঠিক হিসাব দেবেন— এটাই কমিশনের প্রত্যাশা। হলফনামার সম্পদের হিসাব খতিয়ে দেখতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড থেকে সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর আয়কর নথি সংগ্রহ করা হবে। একই সঙ্গে রেজিস্ট্রার অব জয়েন্ট স্টক এবং ব্যাংক থেকেও তথ্য সংগ্রহ করা হবে।

ইকবাল মাহমুদ বলেন, দুর্নীতির কোনো সংজ্ঞা এখন পর্যন্ত চূড়ান্তভাবে তৈরি হয়নি। এ ক্ষেত্রে তিনি মনে করেন, বিবেকের বিরুদ্ধে যা করা হয়, সেটাই দুর্নীতি।

সভায় বিভিন্ন গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব দুর্নীতি দমন ও প্রতিরোধে নানা মতামত ও সুপারিশ তুলে ধরেন। তারা বলেন, দুর্নীতি দমনে দুদককে আরও বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করতে হবে। দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রচারণাসহ নানা ক্ষেত্রে কমিশনকে সহায়তার আশ্বাস দেন তারা।

ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম জানান, আন্তর্জাতিক দুর্নীতিবিরোধী দিবস উপলক্ষে দুদকের উদ্যোগের প্রতি সমর্থন জানাতে ও চেয়ারম্যানের প্রতি সম্মান জানাতে তিনি সভায় এসেছেন।

একুশে টেলিভিশনের সিইও ও প্রধান সম্পাদক মনজুরুল আহসান বুলবুল সম্ভাব্য প্রার্থীদের নির্বাচনী হলফনামার তথ্য উল্লেখ করে বলেন, একজন স্ত্রীর টাকায় কেনা গাড়িতে চড়েন, আরেকজনের ব্যাংকে আট কোটি টাকা দেনা থাকার পরও শ্যালিকার টাকায় নির্বাচন করবেন। শ্যালিকা টাকা কোথায় পেলেন সেই তথ্য খতিয়ে দেখা দরকার। একজন প্রার্থীর প্রচারণার জন্য সর্বোচ্চ ২৫ লাখ টাকা খরচের কথা বলেছে ইসি। অথচ এমনও প্রার্থী আছেন, যিনি একদিনেই ২৫ লাখ টাকা খরচ করেন। যারা সংসদে যাবেন, তাদের সৎ হতে হবে।

দৈনিক সমকালের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মুস্তাফিজ শফি বলেন, দুর্নীতি দমনের ক্ষেত্রে মানুষ কথার চেয়ে কাজের অগ্রগতি দেখতে চায়।

চেয়ারম্যানের উদ্দেশে তিনি বলেন, আপনারা রাজনীতির ঊর্ধ্বে আছেন, সেটা কাজ দিয়ে প্রমাণ করতে হবে। বেশি বেশি উদাহরণ সৃষ্টি করুন- গণমাধ্যম কমিশনের পাশে থাকবে।

একাত্তর টেলিভিশনের সিইও মোজাম্মেল বাবু বলেন, দুর্নীতি মামলার বিচারকাজ দ্রুত শেষ করতে সামারি ট্রায়াল চালু করা যেতে পারে। তিনি দুর্নীতি দমন কাজ সহজ করতে জমি, টাকা ও মানুষের ডাটাবেজ তৈরির পরামর্শ দেন।

দৈনিক প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক আব্দুল কাইয়ুম মুকুল বলেন, রাঘববোয়ালদের ধরার চেষ্টা করুন। ব্যর্থ হলেও মানুষ বলবে, দুদক কাজ করেছে। তবে একজন ব্যক্তিকে অভিযুক্ত হিসেবে আমলে নেওয়ার আগে ও ব্যক্তিটিকে ডাকার আগে তাকে দোষী বলার মতো যথেষ্ট তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করতে হবে।

এটিএন বাংলার জ. ই. মামুন বলেন, নির্বাচন এলেই মনোনয়ন-বাণিজ্য হয়। এই বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি। ডিবিসি টেলিভিশনের সিইও মঞ্জুরুল হক দুর্নীতি দমন ও প্রতিরোধে পদ্ধতিগত পরিবর্তনের পরামর্শ দিয়েছেন।

মানবজমিন পত্রিকার যুগ্ম সম্পাদক শামীমুল হক বলেন, দুর্নীতি মামলার বিচারিক কার্যক্রম দুদকের আওতায় আনা হলে বিচারে দীর্ঘসূত্রতা কমে যাবে।

সভায় আরও বক্তব্য দেন কালের কণ্ঠের সম্পাদক ইমদাদুল হক মিলন, এসএ টিভির খ ম হারুন, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের আশিস সৈকত, চ্যানেল টোয়েন্টিফোরের হেড অব নিউজ রাহুল রাহা, আরটিভির সৈয়দ আশিক রহমান, দেশ টিভির ডিএমডি আরিফ হাসান, মাই টিভির খান মো. সালেহ ও হাসান ইমাম।

সংশ্লিষ্ট খবর


মন্তব্য যোগ করুণ

পরের
খবর

খালেদা জিয়ার প্রার্থিতা নিয়ে শুনানি দুপুরে


আরও খবর

বাংলাদেশ

ফাইল ছবি

  সমকাল প্রতিবেদক

আসন্ন একাদশ সংসদ নির্বাচনে তিন আসনে বিএনপি চেয়ারপারসন কারাবন্দি খালেদা জিয়ার প্রার্থিতা বাতিলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে করা রিটের বিভক্ত আদেশের পর তা আবার শুনানির জন্য নতুন বেঞ্চ গঠন করে দিয়েছেন প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন।

বুধবার হাইকোর্টের বিচারপতি জে বি এম হাসানের একক বেঞ্চে এ সংক্রান্ত নথি পাঠানো হয়। মনোনয়নপত্র বাতিল করায় দণ্ডিত খালেদা জিয়ার তিনটি আবেদনের শুনানি এখন এই বেঞ্চে শুনানি হবে। বৃহস্পতিবার বেলা ২টায় শুনানির জন্য দিন ধার্য করেছেন আদালত।

নির্বাচনে অংশ নিতে ফেনী-১, বগুড়া-৬ ও ৭ আসনে খালেদা জিয়ার প্রার্থিতা বাতিলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে করা রিট আবেদনের ওপর মঙ্গলবার বিভক্ত আদেশ দেন হাইকোর্ট। ফলে মামলাটির নথি প্রধান বিচারপতির কাছে যায়।

বুধবার হাইকোর্টের বিভক্ত আদেশের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি না লেখায় তা সংশ্নিষ্ঠ বেঞ্চে ফেরত পাঠান প্রধান বিচারপতি।

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট্র দুর্নীতি মামলায় ১০ বছর এবং জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট্র দুর্নীতি মামলায় ৭ বছরের দণ্ড নিয়ে গত ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে কারাগারে আছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে খালেদা জিয়ারপক্ষে তিনটি মনোনয়নপত্র ক্রয় করেন বিএনপির নেতারা। সাজাপ্রাপ্ত হওয়ার কারণে গত ২ ডিসেম্বর খালেদা জিয়ার মনোনয়নপত্র বাতিল করে দেন তিনটি (ফেনী-১. বগুড়া-৬ ও ৭) আসনের রিটার্নিং কর্মকর্তারা।

পরবর্তীতে তাদের এ সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে ৫ ডিসেম্বর নির্বাচন কমিশনে প্রার্থিতা ফিরে পেতে আপিল করেন খালেদার আইনজীবীরা। আবেদনে নির্বাচনবিধি (১২)-১ এর 'ঘ' অনুসারে মনোনয়নপত্র বাতিলের সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করা হয়।

হাইকোর্টে এক মামলার রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, সংবিধানের ৬৬ (২) (ঘ) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কারও দুই বছরের বেশি সাজা বা দণ্ড হলে সেই দণ্ড বা সাজার বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল বিচারাধীন থাকা অবস্থায় তিনি নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না, যতক্ষণ না আপিলে ওই দণ্ড বাতিল বা স্থগিত হয়।

গত ৮ ডিসেম্বর নির্বাচন কমিশনে আপিলের শুনানির পর সংখ্যাগরিষ্ঠের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে খালেদা জিয়ার তিনটি আসনের মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়। প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নুরুল হুদার নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের নির্বাচন কমিশন এই সিদ্ধান্ত দেন।

প্রার্থিতা বাতিল করা নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করে খালেদা জিয়ার পক্ষে রিট দায়ের করা হয়। আদালতে খালেদা জিয়ার পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী এ জে মোহাম্মদ আলী। এবং রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম।

খালেদার বগুড়া-৬ আসনে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর নিজেই প্রার্থী হয়েছেন। বগুড়া-৭ এ প্রার্থী করা হয়েছে মোরশেদ মিলটনকে। খালেদার পৈত্রিক এলাকা ফেনী-১ আসনে প্রার্থী করা হয়েছে মুন্সী রফিকুল আলমকে।

সংশ্লিষ্ট খবর

পরের
খবর

বৈঠকে ইসি


আরও খবর

বাংলাদেশ
বৈঠকে ইসি

প্রকাশ : ১৩ ডিসেম্বর ২০১৮

  সমকাল প্রতিবেদক

আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে সশস্ত্র বাহিনীসহ সব বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে বসেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।

বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনের অডিটরিয়ামে এ বৈঠকে শুরু হয়।

এতে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কেএম নূরুল হুদার সভাপতিত্বে অন্য চার নির্বাচন কমিশনার, ইসি সচিবসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত রয়েছেন।

তফসিল অনুযায়ী, আগামী ৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে বাহিনী সদস্যদের মোতায়েন সম্পর্কিতসহ নানা বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে বৃহস্পতিবারের এ বৈঠকে।

এদিকে এরই মধ্যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে আগামী ২৪ থেকে ২৬ ডিসেম্বরের মধ্যে সেনাবাহিনী মোতায়েনের কথা জানিয়েছে ইসি। 


সংশ্লিষ্ট খবর

পরের
খবর

হারাচ্ছে জমি, অস্তিত্ব সংকটে সমতলের আদিবাসীরা


আরও খবর

বাংলাদেশ
হারাচ্ছে জমি, অস্তিত্ব সংকটে সমতলের আদিবাসীরা

ভূমি কমিশন গঠনের দাবি

প্রকাশ : ১৩ ডিসেম্বর ২০১৮ | প্রিন্ট সংস্করণ

  হাসনাইন ইমতিয়াজ

'জমি চাই মুক্তি চাই' স্লোগানে ১৮৫৫ সালে সাঁওতাল নেতা সিধু, কানু, ভৈরব ও চাঁদ- চার ভাই ইংরেজ শাসকদের বিরুদ্ধে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন। ইতিহাসে তা 'সাঁওতাল বিদ্রোহ' নামে পরিচিত। ওই আন্দোলনে আত্মোৎসর্গ করে গেছেন তারাসহ বহু মানুষ। আত্মদানে মহীয়ান ওই বিদ্রোহের ১৬৩ বছর পরও সেই ভূমির জন্যই স্বাধীন বাংলাদেশে আজও জীবন দিতে হচ্ছে সমতলের আদিবাসীদের। পাকিস্তান আমলে ১৯৬৪ সালে পিতা ফাগু সরেন এবং ২০১১ সালে বড় ভাই গোসাই সরেনকে হারিয়েছেন দিনাজপুরের আদিবাসী কৃষক টুডু সরেন। ২০১৪ সালে নিজেও খুন হন। তার স্ত্রীর ওপর হামলা হয়েছে, কিন্তু ভূমি রক্ষা হয়নি। ভূমিদস্যুরা জাল দলিলের মাধ্যমে টুডু সরেনের ৩৩ একর জমি দখল করে নিয়েছে। নিজেদের বসতভিটা সরকারের অধিগ্রহণের প্রতিবাদে জীবন দিয়েছেন টাঙ্গাইলের মধুপুর গড়ের পিরেন স্ন্যাল। জমি ফিরে পাওয়ার আন্দোলনে ২০১৬ সলে গাইবান্ধায় পুলিশের গুলিতে জীবন হারিয়েছেন তিন সাঁওতাল। এভাবে প্রায়ই মামলা-হামলা, অত্যাচার-নির্যাতনে ভূমিহীন হচ্ছেন সমতলের আদিবাসীরা, যেসব জমিতে শত শত বছর ধরে তারা বাস করেছেন।

ভূমি হারিয়ে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে আদিবাসীরা। কারণ এই ভূমিকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে তাদের জীবন ও সংস্কৃতি। জমির সঙ্গে সঙ্গে কমছে আদিবাসীদের সংখ্যাও। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, উত্তরাঞ্চলের সাঁওতাল, দক্ষিণাঞ্চলের রাখাইন, মধ্যাঞ্চলের গারোদের মতো সমতলের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর দখলি জমি যেমন কমছে, তেমনি কমছে তাদের জনসংখ্যা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আদিবাসীদের জীবনবৈচিত্র্য টিকিয়ে রাখতে হলে তাদের ভূমির অধিকার ফিরিয়ে দিতে হবে। এ জন্য পৃথক ভূমি কমিশন গঠনের দাবি জানিয়েছেন তারা।

ভূমিহীন হচ্ছে আদিবাসীরা :দেশের আদিবাসীদের সংখ্যা নিয়ে নিখুঁত কোনো পরিসংখ্যান নেই। ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুসারে দেশে প্রায় ১৬ লাখ আদিবাসী রয়েছে। তবে আদিবাসী সংগঠনগুলোর দাবি, দেশে ৫৪টির বেশি জাতিসত্তার ৩০ লাখ আদিবাসী রয়েছে। এর মধ্যে দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে দুই-তৃতীয়াংশের বসবাস। জাতীয় আদিবাসী পরিষদের তথ্যমতে, রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের ১৬ জেলায় ৩৮টি জাতিসত্তার ২০ লাখ আদিবাসী বসবাস করে। এদের মধ্যে রয়েছে সাঁওতাল, মুন্ডা, ওঁরাও, রাজোয়াড়, তুরি, কর্মকার, মালো, মাহাতো, চাঁই, বাইছনী, লহরা, হাঁড়ি, ঘাটোয়াল, দোষাদ, চাঁড়াল, ডহরা, ভূমিজ, মালপাহাড়িয়া, গন্ড, পাটনি,

বাগদি, মাহালী, মুসহর, ভুঁইমালি, কোচ, তেলী, গোড়াত, বেতিয়া, নুনিয়াহাড়ি, রাজবংশী, পাহাড়িয়া, ভূঁঁইয়া, রবিদাস, রাই, বেদিয়া ইত্যাদি ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠী। পটুয়াখালী ও বরগুনা জেলার উপকূলবর্তী এলাকায় রাখাইনদের বসবাস। টাঙ্গাইলের মধুপুর জঙ্গল ঘিরে গড়ে উঠেছে গারো ও কোচ আদিবাসীদের গ্রাম। এই আদিবাসীরা প্রধানত কৃষি ও ভূমির ওপর নির্ভরশীল। জাতীয় আদিবাসী পরিষদের দাবি, এক সময় যথেষ্ট জমি থাকলেও বর্তমানে তাদের ৮৫ শতাংশই ভূমিহীন। 'আদিবাসী মানুষের ভূমি অধিকার-উন্নয়ন-মানবাধিকার' শীর্ষক এক গবেষণাপত্রে অর্থনীতিবিদ আবুল বারকাত বলেছেন, সমতলের সাঁওতালদের ৭২ শতাংশ, পাত্র ও পাহান খানাদের ৯০ শতাংশ এবং গারো, হাজং, ডালু ও রাখাইনদের ৬৬ শতাংশের বেশি লোক বর্তমানে ভূমিহীন।

আবুল বারকাত তার আরেক গবেষণায় দেখিয়েছেন, সমতলের ১০ আদিবাসী জনগোষ্ঠী গত কয়েক দশকে ছয় থেকে সাড়ে ছয় লাখ বিঘা জমি হারিয়েছে। ২০১৪ সালের হিসাব অনুযায়ী যার বাজারমূল্য ১০ হাজার কোটি টাকার বেশি। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সাঁওতালরা। গত তিন প্রজন্মে তাদের তিন লাখ বিঘা জমি বেহাত হয়েছে, যার বাজারমূল্য পাঁচ হাজার কোটি টাকা।

যেভাবে ভূমি হারাচ্ছে আদিবাসী :পেছনে ফিরলে দেখা যায়, ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের পর থেকে অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মতো আদিবাসী জনগণও নিজেদের জমি হারিয়েছে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের পর আরেক দফা বাস্তুচ্যুত হয় ক্ষুদ্র জাতিসত্তার লোকেরা। প্রভাবশালীদের ষড়যন্ত্র, মামলা-হামলার পাশাপাশি নিজেদের শিক্ষার অভাব, অজ্ঞতা, অসচেতনতা ও দারিদ্র্যের কারণে ভূমিহীন হচ্ছে আদিবাসী। অনেক ক্ষেত্রে বন্ধকি জমি বিক্রি করতে বাধ্য হয় তারা। স্থানীয় প্রভাবশালীরা জাল দলিল করে, মামালা-হামলার মাধ্যমে ভয়ভীতি দেখিয়ে এবং ভূমি অফিসের এক শ্রেণির অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর সহযোগিতায় এসব জমি দখল করা হচ্ছে।

টাঙ্গাইলের সখিপুর উপজেলার ট্রাইবাল অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান রবীন্দ্র বর্মণ বলেন, শিক্ষার অভাবে আদিবাসীদের জমি বেহাত হচ্ছে। তিনি তার এক আত্মীয়ের উদাহরণ দিয়ে বলেন, সে বিক্রি করেছিল পাঁচ শতাংশ জমি। ক্রেতা ৫-এর পর আরেকটি ৫ বসিয়ে ৫৫ শতাংশ জমি হাতিয়ে নিয়েছে।

অর্থনীতিবিদ আবুল বারকাত তার এক গ্রন্থে দেখিয়েছেন, ১৬টি কারণে আদিবাসীরা ভূমিহীন হচ্ছে। গবেষণায় দেখা গেছে- নিরক্ষতা, জমির দলিল না থাকা, আইনের সঠিক প্রয়োগের অভাব, প্রভাবশালী রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও সাম্প্রদায়িক শক্তির অত্যাচারসহ নানা কারণে আদিবাসী গোষ্ঠীর লোকজন বাস্তুচ্যুত হচ্ছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, সংরক্ষিত বন গড়ে তুলতে বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয় মধুপুর বনের ৯ হাজার ১৪৫ একর জমি সংরক্ষণের জন্য ২০১৬ সালে গেজেট প্রকাশ করায় গেজেটের আওতাভুক্ত ১৩ গ্রামের গারো ও কোচ নৃগোষ্ঠীর এক হাজার ৮৩ পরিবারের ছয় হাজার অধিবাসী এখন উচ্ছেদ আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে।

মধুপুরের জয়েনশাহী আদিবাসী উন্নয়ন পরিষদের সভাপতি ইউজিন নকরেক বলেন, সংরক্ষিত বন ঘোষণার প্রতিবাদ করায় ২০১৬ সালে ইউজিন নকরেকসহ ২০০ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়।

পটুয়াখালীর পাহাম হালিবাট বুড্ডিস্ট ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি উথা চিং বলেন, ভুয়া দলিল ও মামলার মাধ্যমে হয়রানি করে রাখাইনদের ভূমি কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। জানতে চাইলে আদিবাসী পরিষদের সভাপতি রবীন্দ্রনাথ সরেন বলেন, মিথ্যা মামলাসহ নারীদের শ্নীলতাহানি, ধর্ষণ, লোকজনকে হত্যার মাধ্যমে ভয়ভীতি দেখিয়ে জমি দখল করা হয়। এ নিয়ে সুবিচার পান না বলে তিনি অভিযোগ করেন। ২০০১ সালে নওগাঁর মহাদেবপুরে আদিবাসী নেতা আলফ্রেড সরেনকে হত্যার পর দেড় যুগেও তার বিচার হয়নি।

অস্তিত্ব সংকটে আদিবাসীরা :গবেষকদের মতে, ১৯ শতকের গোড়ার দিকে পটুয়াখালী ও বরগুনার উপকূলীয় এলাকায় ৫০ সহস্রাধিক রাখাইন জনগোষ্ঠীর বসবাস ছিল। ৭০ দশকেও তাদের জনসংখ্যা ছিল ৪০ সহস্রাধিক। বেসরকারি সংস্থা কারিতাসের ২০১৪ সালে পরিচালিত জরিপমতে, উপকূলীয় অঞ্চলে আড়াই হাজার রাখাইন রয়েছে। স্থানীয়দের তথ্যমতে, পটুয়াখালী ও বরগুনা অঞ্চলে এক সময় ২৪২টি রাখাইন গ্রাম ছিল। এর মধ্যে ১৯৫টিতে এখন রাখাইন বসতি নেই। এভাবে গত ২০০ বছরে ৮০ ভাগ রাখাইন গ্রাম তাদের হাতছাড়া হয়েছে। জনসংখ্যা কমেছে প্রায় ৯০ শতাংশ। শুধু রাখাইন নয়; সাঁওতাল, ওঁরাও, গারো, মাহাতো, মাহালি, রাজবংশীসহ বিভিন্ন ক্ষুদ্র আদিবাসী গোষ্ঠী অস্তিত্ব সংকটে ভুগছে। ধীরে ধীরে তাদের ভাষা ও সংস্কৃতিও বিপন্ন হয়ে পড়েছে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক একেএম শাহনাওয়াজ বলেন, সাঁওতালরাই এদেশের আসল ভূমিপুত্র। সাঁওতালরা হাজার বছর ধরে তীর-ধনুক দিয়ে আর্যদের ঠেকিয়েছে। ইংরেজদের বিরুদ্ধে লড়েছে। তীর-ধনুক নিয়েই মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছে। কিন্তু তারাই এখন নিজভূমে সংখ্যালঘু।

এ বিষয়ে অ্যাসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড রিফর্ম অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (এলআরডি) নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা বলেন, পূর্বপুরুষের ভূমির সঙ্গে শুধু জীবিকাই নয়, জড়িয়ে আছে আবেগ, ধর্ম, সংস্কৃৃতি। এখান থেকে বিতাড়িত হওয়া মানে শিকড় কেটে যাওয়া। আদিবাসীদের কাছে ভূমি হলো তাদের অস্তিত্বের বিষয়।

আইনগত সমাধান ও ভূমি কমিশন গঠন :পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় ও আদিবাসীদের রক্ষায় আইন বা বিধিবিধান যুগোপযোগী করে পূর্বপুরুষদের প্রথাগত ভূমির ওপর তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে। প্রতিবেশী দেশ ভারত, অস্ট্রেলিয়া ও কানাডায় তাদের জন্য বিশেষ আইন করা হয়েছে। মালয়েশিয়ার হাইকোর্ট রায় দিয়েছেন- জাতিগত সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর বসবাসরত ভূমির ওপর তাদের আইনি অধিকার আছে। কেনিয়ার ওজিয়েক ও বতসোয়ানার বাসারওয়া সান জনগোষ্ঠীকে তাদের ঐতিহ্যগত ভূমি থেকে সরিয়ে সংরক্ষিত পার্ক প্রতিষ্ঠা আদালতের মাধ্যমে বেআইন ঘোষিত হয়েছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এমন আরও অনেক উদাহরণ রয়েছে।

এ বিষয়ে ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ূয়া বলেন, আদিবাসী ও ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর ভূমি অধিকার রক্ষায় আইন রয়েছে। এর যথাযথ প্রয়োগ হলে আদিবাসীদের ভূমি বেহাত হওয়া অনেকাংশেই থামানো যাবে।

এ বিষয়ে আদিবাসীবিষয়ক সংসদীয় ককাসের সমন্বয়ক ও বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক ফজলে হোসেন বাদশা বলেন, সমতলের আদিবাসীদের ভূমির অধিকার রক্ষার জন্য পৃথক ভূমি কমিশন গঠন করতে হবে।