বাংলাদেশ

এরশাদের পতনের নেপথ্যে

প্রকাশ : ০৬ ডিসেম্বর ২০১৮ | আপডেট : ০৬ ডিসেম্বর ২০১৮

এরশাদের পতনের নেপথ্যে

  অনলাইন ডেস্ক

আজ ৬ ডিসেম্বর। বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ইতিহাসে একটি তাৎপর্যপূর্ণ দিন। ১৯৯০ সালের এই দিনে গণআন্দোলনের মুখে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন তৎকালীন সামরিক শাসক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ। দিনটিকে আওয়ামী লীগ 'গণতন্ত্র মুক্তি দিবস', বিএনপি 'গণতন্ত্র দিবস' এবং এরশাদের জাতীয় পার্টি 'সংবিধান সংরক্ষণ দিবস' হিসেবে পালন করে । তবে কোনো কোনো রাজনৈতিক দল এই দিনকে 'স্বৈরাচার পতন দিবস' হিসেবেও পালন করে ।

১৯৯০ সাল। সারা দেশে তখন জেনারেল এরশাদ বিরোধী আন্দোলন তুঙ্গে।কেননা কয়েকদিন আগেই বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি এলাকায় চিকিৎসক নেতা ডা. শামসুল আলম মিলনকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে।।এর মধ্যে ডিসেম্বর মাসের এক তারিখে ঢাকা সেনানিবাসে এক জরুরী বৈঠকে বসেন ঊর্ধ্বতন সেনা কর্মকর্তারা। এইচএম এরশাদ যেভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা করছেন, সে প্রেক্ষাপটে সেনাবাহিনীর ভূমিকা কী হওয়া উচিত তা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয় সেই বৈঠকে।

এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে শহীদ ড. মিলন  ও নূর হোসেন 

বৈঠকে ঊর্ধ্বতন সেনা কর্মকর্তারা একমত পোষন করেন দেশের চলমান সংকট একটি রাজনৈতিক বিষয় বলে। তারা একমত হন এ সঙ্কট সমাধানের জন্য রাষ্ট্রপতিকে রাজনৈতিক উদ্যোগ নিতে হবে এ ব্যাপারে। এক্ষেত্রে সেনাবাহিনীর কিছু করণীয় নেই-এটাও তারা সিদ্ধান্ত নেন।

এদিকে প্রেসিডেন্ট এরশাদ দেশে সামরিক আইন জারী করার প্রস্তাব দেন সেনা সদরকে। তবে বৈঠকের সিদ্ধান্ত জানাতে তৎকালীন সেনা প্রধান নূর উদ্দিন ডিসেম্বরের তিন তারিখে রাষ্ট্রপতি এরশাদের সাথে দেখা করতে যান।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সেনাবাহিনীর প্রধান প্রেসিডেন্ট এরশাদকে পদত্যাগের কথা বলবেন এটাই চাইছিলেন সেনা কর্মকর্তারা। কিন্তু সেনাপ্রধান প্রেসিডেন্ট এরশাদকে সরাসরি পদত্যাগের কথা না বললেও জানিয়ে দেন দেশের উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সেনাবাহিনীর অফিসাররা কোন দায়িত্ব নিতে রাজী নন।সেই সঙ্গে দেশে সামরিক শাসন জারীর বিষয়ে সেনাবাহিনী একমত নয় সেটাও স্পষ্ট করেছিলেন তৎকালীন সেনাপ্রধান। 

সেই সময় প্রেসিডেন্টের সাথে সেনাপ্রধানের বৈঠক নিয়ে দেশজুড়ে নানা গুঞ্জন তৈরি হয়েছিল। ডিসেম্বর মাসের চার তারিখে সেনাবাহিনীর চীফ অব জেনারেল স্টাফ মেজর জেনারেল আব্দুস সালাম প্রেসিডেন্ট এরশাদকে সরাসরি পদত্যাগের কথা বলেন।

একদিকে জরুরি অবস্থা এবং কারফিউর মতো কঠোর পদক্ষেপের মাধ্যমেও গণআন্দোলন দমানো যাচ্ছিল না, অন্যদিকে সেনাবাহিনীর নেতিবাচক মনোভাব দেখে  ডিসেম্বরের চার তারিখ রাতেই পদত্যাগের ঘোষণা দেন জেনারেল এরশাদ। 

অবশ্য সামরিক শাসক জেনারেল এরশাদ ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য ওইসময় নানা ধরনের কৌশল অবলম্বন করেছিলেন।

বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর আন্দোলন মোকাবেলার জন্য তিনি সাধারণ নির্বাচনের ঘোষণাও দিয়েছিলেন। কিন্তু বিরোধী রাজনৈতিক জোটগুলো এরশাদের সে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে।

ডিসেম্বর মাসের চার তারিখে তখনকার ভাইস-প্রেসিডেন্ট মওদুদ আহমেদকে জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দেবার জন্য বাংলাদেশে টেলিভিশনে পাঠিয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট এরশাদ।

উদ্দেশ্য ছিল, প্রেসিডেন্টের পরিকল্পিত নির্বাচন সম্পর্কে বিস্তারিত ব্যাখ্যা তুলে ধরা।

বিরোধী দলগুলো এ নির্বাচনের প্রস্তাব আগেই বর্জন করেছিল। তারপরও  এরশাদের নির্দেশ মতো ভাইস-প্রেসিডেন্ট মওদুদ আহমদ সন্ধ্যায় বাংলাদেশ টেলিভিশনে গিয়েছিলেন ভাষণ রেকর্ড করার জন্য। সে ভাষণ তিনি রেকর্ডও করেছিলেন।

তবে তা প্রকাশের আগেই এরশাদ পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নেন। এ কারণে ওইদিন মধ্যরাতে মওদুদ আহমেদকে আবারো বাংলাদেশ টেলিভিশনে যেতে হয়েছিল প্রেসিডেন্ট এরশাদের পদত্যাগের ঘোষণা দেবার জন্য।

এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে বিভিন্ন সময় ছন্দপতন হয়েছিল। ১৯৮৭ সালে একটি মিছিলে পুলিশের গুলিতে নূর হোসেন নিহত হবার ঘটনা আন্দোলনে গতি এনেছিল।

আওয়ামীলীগ এবং বিএনপি'র নেতৃত্বে রাজনৈতিক জোট একই সাথে আন্দোলন কর্মসূচী নিয়ে এগিয়েছে। জামায়াতে ইসলামীও মাঠে ছিল। ১৯৯০ সালের অক্টোবর মাস থেকে ছাত্র সংগঠনগুলো 'সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্যের' ব্যানারে আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিল। তবে ১৯৯০ সালের ২৭ নভেম্বর চিকিৎসক নেতা ডা. শামসুল আলম মিলনকে হত্যার পর আন্দোলনের মোড় ঘুরে গিয়েছিল।

ডা. মিলনকে হত্যার পর জেনারেল এরশাদ বিরোধী আন্দোলন আরো তুঙ্গে উঠে। তখন জনগণের ক্ষোভের বিষয়টি বিবেচনায় নিতে শুরু করেছিল সেনাবাহিনী। একইসাথে জেনারেল এরশাদের উপর থেকে সমর্থন প্রত্যাহারের প্রক্রিয়াও শুরু করেছিল তারা।

ওই সময় আন্দোলন দমন করতে সেনা মোতায়েনের জন্য জেনারেল এরশাদ যথেষ্ট চাপ প্রয়োগ করেছিল সেনাবাহিনীকে। তবে কমান্ডিং অফিসাররা সরকারের 'অপকর্মের' দায়িত্ব নিতে রাজী ছিলেন না।

জেনারেল এরশাদ ক্ষমতা ছাড়লে কী হবে সে বিষয়টি নিয়ে আন্দোলনকারী দলগুলো নিজেদের মধ্যে ঐকমত্যের ভিত্তিতে একটি ফর্মুলা ঠিক করে রেখেছিল।

সে ফর্মুলা মতে সাধারণ নির্বাচন পরিচালনার জন্য তিনমাস মেয়াদী একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের কথা ছিল।

কিন্তু সে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান কে হবেন সেটি তখন নির্ধারিত ছিলনা ।

ড. কামাল হোসেন তখন আওয়ামীলীগের সিনিয়র নেতার পাশাপাশি সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতিও ছিলেন। তিনি বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, জেনারেল এরশাদের পদত্যাগের ঘোষণা দেবার পর আন্দোলনকারী দলগুলো তখনকার প্রধান বিচারপতি মোঃ সাহাবুদ্দিন আহমদের বিষয়ে একমত হয়েছিল।

অস্থায়ী সরকার প্রধানের নাম আসার পর ৬ই ডিসেম্বর রাষ্ট্রপতির দপ্তরে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া হয়েছিল। সাহাবুদ্দিন আহমেদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করে দেশে গণতন্ত্রের নতুন যাত্রা শুরু করেন।

ডিসেম্বর মাসের চার তারিখে জেনারেল এরশাদ যখন পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছিলেন, তখন রাস্তায় মানুষের ঢল নেমেছিল। বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমদের কাছে জেনারেল এরশাদের ক্ষমতা হস্তান্তর অর্থাৎ ৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত সেই ঢল বজায় ছিল। সূত্র : বিবিসি বাংলা

সংশ্লিষ্ট খবর


মন্তব্য যোগ করুণ

পরের
খবর

বাংলাদেশ কোনো ব্রিটিশ সন্ত্রাসীকে আশ্রয় দেবে না: গওহর রিজভী


আরও খবর

বাংলাদেশ

শামীমা বেগম

  লন্ডন প্রতিনিধি

লন্ডন থেকে সিরিয়ায় গিয়ে ইসলামিক স্টেটে (আইএস) যোগ দেওয়া বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত শামীমা বেগম সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আন্তর্জাতিকবিষয়ক উপদেষ্টা ড. গওহর রিজভী বলেছেন, 'বাংলাদেশ কোনো ব্রিটিশ সন্ত্রাসীকে আশ্রয় দেবে না।'

বুধবার লন্ডনভিত্তিক টিভি চ্যানেল 'চ্যানেল এস'-এর জন্য ধারণকৃত এক সাক্ষাৎকারে তিনি এমন মন্তব্য করেন। আগামী ২৫ ফেব্রুয়ারি 'চ্যানেল এস' সাক্ষাৎকারটি প্রচার করবে।

সিরিয়ায় আইএসের পতনের শেষ মুহূর্তে যুক্তরাজ্যসহ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এখন সবচেয়ে আলোচিত চরিত্র আইএস-বধূখ্যাত শামীমা বেগম। তার যুক্তরাজ্যে ফিরে আসার ইচ্ছে এবং তারপর তার ব্রিটিশ নাগরিকত্ব বাতিলের ঘটনায় যুক্তরাজ্যসহ বিশ্ব গণমাধ্যমে এখন তাকে নিয়ে চলছে জোর আলোচনা। একই সঙ্গে বাংলাদেশেও উচ্চারিত হচ্ছে তার নাম, কারণ শামীমা বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত একজন তরুণী।

গওহর রিজভী বললেন, 'শামীমা ব্রিটিশ নাগরিক, তিনি বেড়ে উঠেছেন ব্রিটেনে। দেশটির সরকারকেই তার দায়িত্ব নিতে হবে। বাংলাদেশ কোনো ব্রিটিশ সন্ত্রাসীকে তার ভূখণ্ডে ঢুকতে দেবে না।'

মা-বাবা বাংলাদেশের দ্বৈত নাগরিক হওয়ায় শামীমা বাংলাদেশের নাগরিকত্ব চাইতে পারেন– যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাজিদ জাভিদের এমন মন্তব্যের বিষয়ে ড. রিজভী বলেন, 'হোম সেক্রেটারি অনেক কিছুই এখন বলতে পারেন। শুধু মা-বাবা অথবা পূর্বপুরুষ বাংলাদেশি, এ কারণে শামীমাও বাংলাদেশি এটা কোনো যুক্তি হতে পারে না।'

এদিকে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম সাজিদ জাবিদের মন্তব্যের জেরে বুধবার বিশ্ব গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে বলেছেন, একজন দ্বৈত নাগরিক বলে ভ্রান্তভাবে শামীমা বেগমের পরিচয় তুলে ধরা হচ্ছে, এ নিয়ে বাংলাদেশ গভীরভাবে উদ্বিগ্ন।

আইএসে যোগ দিতে সিরিয়ায় যাওয়ার সময় শামীমা বেগমের বয়স ছিল মাত্র ১৫ বছর— পিএ

প্রসঙ্গত, মাত্র ১৫ বছর বয়সে বাংলাদেশি অধ্যুষিত পূর্ব লন্ডনের বেথনাল গ্রিন এলাকা থেকে আরও দু’জন বান্ধবীসহ আইএসে যোগ দিতে সিরিয়ায় পালিয়ে গিয়েছিলেন শামীমা বেগম। গত সপ্তাহে লন্ডনের দৈনিক দ্য টাইমসের একজন সাংবাদিক সিরিয়ার একটি শরণার্থী শিবিরে শামীমা বেগমের খোঁজ পান। তখন তিনি অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন। ওই সাংবাদিকের মাধ্যমে তিনি ব্রিটিশ সরকারের কাছে আবেদন করেন যেন তার অনাগত সন্তানের কথা বিবেচনা করে তাকে ব্রিটেনে ফিরতে দেওয়া হয়। এরপর থেকে ব্রিটেনে ব্যাপক বিতর্ক শুরু হয় যে, নিষিদ্ধ একটি জঙ্গি সংগঠনে যোগ দেওয়া তরুণীকে ফেরত আসতে দেয়া উচিত কি-না।

এরই মধ্যে শামীমা বেগমের ব্রিটিশ নাগরিকত্ব বাতিল করার সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে মঙ্গলবার পূর্ব লন্ডনে বসবাসরত শামীমার মায়ের কাছে চিঠি পাঠান যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাজিদ জাভেদ। শামীমা হোম অফিসের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করতে পারবেন বলেও চিঠিতে জানানো হয়।

সম্প্রতি তৃতীয় সন্তানের জন্ম দেওয়া ১৯ বছর বয়সী শামীমা তার ব্রিটিশ নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়াকে 'অন্যায়' বলে উল্লেখ করেন। তার আগের দুটি সন্তান অপুষ্টি ও চিকিৎসার অভাবে মারা যায়।

ব্রিটিশ নাগরিকত্ব হারানো শামীমা বুধবার আইটিভি নিউজকে বলেন, ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তটি অত্যন্ত 'হৃদয়-বিদারক'। তবে তিনি তার ডাচ স্বামীর মাধ্যমে নাগরিকত্ব পাওয়ার চেষ্টা করতে পারেন বলে জানান।

সংশ্লিষ্ট খবর

পরের
খবর

বিনম্র শ্রদ্ধায় স্মরণ ভাষাশহীদদের


আরও খবর

বাংলাদেশ

শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে বৃহস্পতিবার ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে সর্বস্তরের মানুষ— সমকাল

  সমকাল প্রতিবেদক

ভোর হতেই দেশের সব রাজপথ যেন মিশে যায় শহীদ মিনারে। মায়ের ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে জয়ী বীর বাঙালি জাতি আবারও বিনম্র শ্রদ্ধায় স্মরণ করে তার গর্বিত পূর্বসূরিদের।

দেশের উন্নয়ন ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা আর সমাজে শান্তির সুবাতাস বইয়ে দেওয়ার অঙ্গীকারে বৃহস্পতিবার সারাদেশে পালিত হলো মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস।

রাজধানী থেকে শুরু করে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের শহীদ মিনারের বেদিগুলোও এদিন ভরে ওঠে ফুলেল শ্রদ্ধায়। ফাল্গুন ভোরের হিম হাওয়ায় নগ্ন পদে সবাই ছুটে যান শহীদ মিনারে। দুপুর অবধি রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ছিল লাখো মানুষের ঢল। মা, মাটি, দেশ আর মাতৃভাষার প্রতি বাঙালির অপরিসীম মমত্ববোধের চিরায়ত প্রকাশ ঘটে এদিন। ভাষার জন্য আত্মোৎসর্গকারী শহীদদের প্রতি শিশু-কিশোর, বৃদ্ধ, যুবা, তরুণ-তরুণী, পাহাড়ি, বাঙালি, ভিনদেশি, ধর্ম-বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে সবাই সারিবদ্ধভাবে শহীদ বেদিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। এ সময় সবার কণ্ঠে ছিল অমর একুশের কালজয়ী সেই গান 'আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি...।'

ভাষা শহীদদের প্রতি বৃহস্পতিবার ফুলেল শ্রদ্ধা জানায় সর্বস্তরের মানুষ— সমকাল

বুধবার মধ্যরাতে ঘড়ির কাঁটা ১২টা ছোঁয়ার আগেই বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতাকর্মীদের সারি দেখা যায় শহীদ মিনারে। রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রীসহ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের শ্রদ্ধা নিবেদনের পর্ব শেষ হলে শহীদ মিনার সবার জন্য খুলে দেওয়া হয়। তবে শ্রদ্ধার্ঘ্য অপর্ণের জন্য বৃহস্পতিবার সকালে নামে মানুষের ঢল। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা জানাতে আসা সর্বস্তরের মানুষের সারি আরও দীর্ঘ হয়। এই দিনে বাঙালির শোককে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে বুধবার রাতের চকবাজারের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড। আগুনে পোড়া শতাধিক হতাহতের স্বজনের দুঃখ-বেদনা যেন সালাম-বরকতদের শোকে লীন হয়ে তৈরি করে মর্মন্তুদ এলিজি। চকবাজারের আগুনে স্বজনহারাদের হাহাকার ঢাকা মেডিকেল কলেজের করিডোর আর মর্গ পেরিয়ে এসে মেশে শহীদ মিনারের অর্ধনমিত জাতীয় পতাকায়, প্রভাতফেরির কালো পোশাকে।

একুশের প্রথম প্রহরে কেন্দ্র্রীয় শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে ভাষাশহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। রাত ১২টা ১ মিনিটে প্রথমে রাষ্ট্রপতি পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। এরপরই শ্রদ্ধা জানান প্রধানমন্ত্রী। এরপর স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। পরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দলীয় প্রধান হিসেবে আওয়ামী লীগের মন্ত্রিপরিষদের সদস্য ও দলের শীর্ষ নেতাদের নিয়ে শহীদ বেদিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। এরপর একে একে শ্রদ্ধা জানান ডেপুটি স্পিকার ফজলে রাব্বী মিয়া, বিরোধীদলীয় উপনেতা জিএম কাদের, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র সাঈদ খোকন ও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন প্যানেল মেয়র মোস্তফা কামাল। সহকর্মীদের নিয়ে ভাষাশহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আখতারুজ্জামান। শ্রদ্ধা জানান ঢাকার বিভিন্ন মিশনের কূটনীতিক, একাত্তরের সেক্টর কমান্ডার এবং মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিলের নেতারা। শহীদ বেদিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন সৈনিক, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি, সেনা, নৌ, বিমানবাহিনী, পুলিশ, র‌্যাবসহ বিভিন্ন সংগঠন। বিশিষ্টজনের শ্রদ্ধা জানানোর পর সবার জন্য উন্মুক্ত হয় শহীদ মিনার।

সভাপতি এ. কে. আজাদের নেতৃত্বে একুশের প্রথম প্রহরে শহীদ বেদিতে শ্রদ্ধা জানায় ঢাকা ইউনিভার্সিটি অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন— সমকাল

বিশিষ্টজনের প্রতিক্রিয়া: বৃহস্পতিবার সকাল ৮টায় শহীদ মিনারে ফুল দেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ, নৌ প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী প্রমুখ। শ্রদ্ধা নিবেদনের পর ওবায়দুল কাদের সাংবাদিকদের বলেন, বিশ্বের ৩৩ কোটি বাংলা ভাষাভাষী মানুষের মাতৃভাষা বাংলা। ভাষার দিক দিয়ে এর অবস্থান সপ্তম। তাই বাংলাকে জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষার দাবি গোটা জাতির। এ বিষয়ে সরকার কাজ করছে।

তথ্যমন্ত্রী হাছান মাহমুদ বলেন, ভাষাশহীদরা জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান। তাদের অবদানে আজ বাংলা ভাষা বিশ্ব দরবারে স্বীকৃতি পেয়েছে। ভাষা আন্দোলনের পথ ধরেই এসেছে স্বাধীনতা।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নেতৃত্বে দলটির নেতাকর্মীরা বৃহস্পতিবার সকাল ১০টায় ভাষাশহীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। পুষ্পস্তবক অর্পণের পর তিনি সাংবাদিকদের বলেন, গণতন্ত্র হরণ করে সরকার একুশের চেতনাকে ভূলণ্ঠিত করেছে। এ সময় তিনি দলীয় চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াসহ বিরোধী নেতাকর্মীদের মুক্তির দাবি জানান।

বিভিন্ন সংগঠনের শ্রদ্ধা নিবেদন: সভাপতি এ. কে. আজাদের নেতৃত্বে একুশের প্রথম প্রহরে শহীদ বেদিতে শ্রদ্ধা জানায় ঢাকা ইউনিভার্সিটি অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন। প্রথম প্রহরে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে শ্রদ্ধা জানায় জাসদের দুই অংশ, ওয়ার্কার্স পার্টি, সিপিবি, সাম্যবাদী দল, বাসদ, গণতন্ত্রী পার্টি, ন্যাপসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল। ছাত্র সংগঠনগুলোর মধ্যে শ্রদ্ধা জানায় ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্রমৈত্রী, সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট। ভোরে নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশন (ইসি) কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানায়। এ সময় নির্বাচন কমিশনার কবিতা খানম, ইসি সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানায় সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ— সমকাল

আরও শ্রদ্ধা জানায় বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট), জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, ইডেন মহিলা কলেজ, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকার সরকারি মাদ্রাসা-ই-আলিয়া, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক), বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজ, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র, বাংলাদেশ সরকারের আইসিটি ডিভিশন, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি), রেলপথ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ রেলওয়ে, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ, রাজউক ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স সমিতি ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ), ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি, জাতীয় প্রেস ক্লাব, সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক ফ্রন্ট, সামাজিক মহিলা ফোরাম, রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি, শিল্পকলা একাডেমি, উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী, কেন্দ্রীয় খেলাঘর আসর, বাংলা একাডেমি, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট, মহিলা পরিষদ, ছাত্রদল, শ্রমিক দল, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, যুবলীগ, ইনস্টিটিউশন অব ইঞ্জিনিয়ার্স (আইবি), ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স (আইডিবি), বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় গার্হস্থ্য নারী শ্রমিক ইউনিয়নস, ঢাকা নার্স কলেজ, বাংলাদেশ এনজিও ফেডারেশনসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠন। শহীদ মিনারের পাশাপাশি আজিমপুর কবরস্থানে ভাষাশহীদদের কবরেও শ্রদ্ধা জানায় আওয়ামী লীগ, বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন।

সংশ্লিষ্ট খবর

পরের
খবর

সরকারি প্রাথমিকের শিক্ষকদের সমন্বয় বদলির নির্দেশ


আরও খবর

বাংলাদেশ

  সমকাল প্রতিবেদক

পুরনো সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পড়াশোনার মান নতুন সরকারি হওয়া বিদ্যালয়গুলোর চেয়ে ভালো। এমন ধারণা প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের। নতুন সরকারি হওয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা আগের বেসরকারি রেজিস্টার্ড প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন। সে সময় নানাভাবে প্রভাব ও তদবিরের জোরে অনেক অযোগ্য শিক্ষকও অনায়াসে চাকরি পেয়েছেন।

নতুন সরকারি হওয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ের লেখাপড়ার মান বাড়াতে তাই নতুন উদ্যোগ নিয়েছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নতুন করে সরকারি হওয়া বিদ্যালয় ও আগে থেকেই সরকারি প্রাথমিকের শিক্ষকদের মধ্যে পারস্পরিক বা সমন্বয় বদলি করার নির্দেশ দিয়েছে সরকার।

২০১৩ সালে জাতীয়করণ হওয়া ২৬ হাজার ১৯৩টি বেসরকারি রেজিস্টার্ড প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা এত দিন অন্য সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বদলি হতে পারতেন না। এর ফলে এসব বিদ্যালয়ের শিক্ষার মান 'কাঙ্ক্ষিত মাত্রায়' নিয়ে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না জানিয়ে গত বুধবার প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় নতুন ও পুরনো বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের পার্শ্ববর্তী বিদ্যালয়ে সমন্বয় বদলি করে আগামী ১৫ কর্মদিবসের মধ্যে তা মন্ত্রণালয়কে জানাতে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরকে নির্দেশ দিয়েছে।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৩ সালে একযোগে ৩৬ হাজার ১৬৫টি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে জাতীয়করণ করেন। বঙ্গবন্ধু কন্যা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৩ সালে ২৬ হাজার ১৯৩টি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে সরকারি করে দেন। বর্তমানে বাংলাদেশে ৬৫ হাজার ৫৯৩টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে।

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কাছে পাঠানো প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ওই নির্দেশে বলা হয়েছে, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে প্রতিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মানসম্মত ও একীভূত শিক্ষা নিশ্চিতকরণে সরকার দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। কিন্তু লক্ষ্য করা যাচ্ছে, নতুন জাতীয়করণ হওয়া বিদ্যালয়গুলোতে শুধু আত্তীকরণকৃত শিক্ষকদের দ্বারা পাঠদান কার্যক্রম চলায় সেসব বিদ্যালয়ে শিক্ষার মান কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় নিয়ে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। প্রতিটি বিদ্যালয়ে মানসম্মত ও একীভূত শিক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে পুরনো সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও নতুন জাতীয়করণকৃত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্যে সমন্বয় সাধন করা জরুরি বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট খবর