বাংলাদেশ

এরশাদের পতনের নেপথ্যে

প্রকাশ : ০৬ ডিসেম্বর ২০১৮ | আপডেট : ০৬ ডিসেম্বর ২০১৮

এরশাদের পতনের নেপথ্যে

  অনলাইন ডেস্ক

আজ ৬ ডিসেম্বর। বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ইতিহাসে একটি তাৎপর্যপূর্ণ দিন। ১৯৯০ সালের এই দিনে গণআন্দোলনের মুখে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন তৎকালীন সামরিক শাসক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ। দিনটিকে আওয়ামী লীগ 'গণতন্ত্র মুক্তি দিবস', বিএনপি 'গণতন্ত্র দিবস' এবং এরশাদের জাতীয় পার্টি 'সংবিধান সংরক্ষণ দিবস' হিসেবে পালন করে । তবে কোনো কোনো রাজনৈতিক দল এই দিনকে 'স্বৈরাচার পতন দিবস' হিসেবেও পালন করে ।

১৯৯০ সাল। সারা দেশে তখন জেনারেল এরশাদ বিরোধী আন্দোলন তুঙ্গে।কেননা কয়েকদিন আগেই বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি এলাকায় চিকিৎসক নেতা ডা. শামসুল আলম মিলনকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে।।এর মধ্যে ডিসেম্বর মাসের এক তারিখে ঢাকা সেনানিবাসে এক জরুরী বৈঠকে বসেন ঊর্ধ্বতন সেনা কর্মকর্তারা। এইচএম এরশাদ যেভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা করছেন, সে প্রেক্ষাপটে সেনাবাহিনীর ভূমিকা কী হওয়া উচিত তা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয় সেই বৈঠকে।

এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে শহীদ ড. মিলন  ও নূর হোসেন 

বৈঠকে ঊর্ধ্বতন সেনা কর্মকর্তারা একমত পোষন করেন দেশের চলমান সংকট একটি রাজনৈতিক বিষয় বলে। তারা একমত হন এ সঙ্কট সমাধানের জন্য রাষ্ট্রপতিকে রাজনৈতিক উদ্যোগ নিতে হবে এ ব্যাপারে। এক্ষেত্রে সেনাবাহিনীর কিছু করণীয় নেই-এটাও তারা সিদ্ধান্ত নেন।

এদিকে প্রেসিডেন্ট এরশাদ দেশে সামরিক আইন জারী করার প্রস্তাব দেন সেনা সদরকে। তবে বৈঠকের সিদ্ধান্ত জানাতে তৎকালীন সেনা প্রধান নূর উদ্দিন ডিসেম্বরের তিন তারিখে রাষ্ট্রপতি এরশাদের সাথে দেখা করতে যান।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সেনাবাহিনীর প্রধান প্রেসিডেন্ট এরশাদকে পদত্যাগের কথা বলবেন এটাই চাইছিলেন সেনা কর্মকর্তারা। কিন্তু সেনাপ্রধান প্রেসিডেন্ট এরশাদকে সরাসরি পদত্যাগের কথা না বললেও জানিয়ে দেন দেশের উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সেনাবাহিনীর অফিসাররা কোন দায়িত্ব নিতে রাজী নন।সেই সঙ্গে দেশে সামরিক শাসন জারীর বিষয়ে সেনাবাহিনী একমত নয় সেটাও স্পষ্ট করেছিলেন তৎকালীন সেনাপ্রধান। 

সেই সময় প্রেসিডেন্টের সাথে সেনাপ্রধানের বৈঠক নিয়ে দেশজুড়ে নানা গুঞ্জন তৈরি হয়েছিল। ডিসেম্বর মাসের চার তারিখে সেনাবাহিনীর চীফ অব জেনারেল স্টাফ মেজর জেনারেল আব্দুস সালাম প্রেসিডেন্ট এরশাদকে সরাসরি পদত্যাগের কথা বলেন।

একদিকে জরুরি অবস্থা এবং কারফিউর মতো কঠোর পদক্ষেপের মাধ্যমেও গণআন্দোলন দমানো যাচ্ছিল না, অন্যদিকে সেনাবাহিনীর নেতিবাচক মনোভাব দেখে  ডিসেম্বরের চার তারিখ রাতেই পদত্যাগের ঘোষণা দেন জেনারেল এরশাদ। 

অবশ্য সামরিক শাসক জেনারেল এরশাদ ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য ওইসময় নানা ধরনের কৌশল অবলম্বন করেছিলেন।

বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর আন্দোলন মোকাবেলার জন্য তিনি সাধারণ নির্বাচনের ঘোষণাও দিয়েছিলেন। কিন্তু বিরোধী রাজনৈতিক জোটগুলো এরশাদের সে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে।

ডিসেম্বর মাসের চার তারিখে তখনকার ভাইস-প্রেসিডেন্ট মওদুদ আহমেদকে জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দেবার জন্য বাংলাদেশে টেলিভিশনে পাঠিয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট এরশাদ।

উদ্দেশ্য ছিল, প্রেসিডেন্টের পরিকল্পিত নির্বাচন সম্পর্কে বিস্তারিত ব্যাখ্যা তুলে ধরা।

বিরোধী দলগুলো এ নির্বাচনের প্রস্তাব আগেই বর্জন করেছিল। তারপরও  এরশাদের নির্দেশ মতো ভাইস-প্রেসিডেন্ট মওদুদ আহমদ সন্ধ্যায় বাংলাদেশ টেলিভিশনে গিয়েছিলেন ভাষণ রেকর্ড করার জন্য। সে ভাষণ তিনি রেকর্ডও করেছিলেন।

তবে তা প্রকাশের আগেই এরশাদ পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নেন। এ কারণে ওইদিন মধ্যরাতে মওদুদ আহমেদকে আবারো বাংলাদেশ টেলিভিশনে যেতে হয়েছিল প্রেসিডেন্ট এরশাদের পদত্যাগের ঘোষণা দেবার জন্য।

এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে বিভিন্ন সময় ছন্দপতন হয়েছিল। ১৯৮৭ সালে একটি মিছিলে পুলিশের গুলিতে নূর হোসেন নিহত হবার ঘটনা আন্দোলনে গতি এনেছিল।

আওয়ামীলীগ এবং বিএনপি'র নেতৃত্বে রাজনৈতিক জোট একই সাথে আন্দোলন কর্মসূচী নিয়ে এগিয়েছে। জামায়াতে ইসলামীও মাঠে ছিল। ১৯৯০ সালের অক্টোবর মাস থেকে ছাত্র সংগঠনগুলো 'সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্যের' ব্যানারে আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিল। তবে ১৯৯০ সালের ২৭ নভেম্বর চিকিৎসক নেতা ডা. শামসুল আলম মিলনকে হত্যার পর আন্দোলনের মোড় ঘুরে গিয়েছিল।

ডা. মিলনকে হত্যার পর জেনারেল এরশাদ বিরোধী আন্দোলন আরো তুঙ্গে উঠে। তখন জনগণের ক্ষোভের বিষয়টি বিবেচনায় নিতে শুরু করেছিল সেনাবাহিনী। একইসাথে জেনারেল এরশাদের উপর থেকে সমর্থন প্রত্যাহারের প্রক্রিয়াও শুরু করেছিল তারা।

ওই সময় আন্দোলন দমন করতে সেনা মোতায়েনের জন্য জেনারেল এরশাদ যথেষ্ট চাপ প্রয়োগ করেছিল সেনাবাহিনীকে। তবে কমান্ডিং অফিসাররা সরকারের 'অপকর্মের' দায়িত্ব নিতে রাজী ছিলেন না।

জেনারেল এরশাদ ক্ষমতা ছাড়লে কী হবে সে বিষয়টি নিয়ে আন্দোলনকারী দলগুলো নিজেদের মধ্যে ঐকমত্যের ভিত্তিতে একটি ফর্মুলা ঠিক করে রেখেছিল।

সে ফর্মুলা মতে সাধারণ নির্বাচন পরিচালনার জন্য তিনমাস মেয়াদী একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের কথা ছিল।

কিন্তু সে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান কে হবেন সেটি তখন নির্ধারিত ছিলনা ।

ড. কামাল হোসেন তখন আওয়ামীলীগের সিনিয়র নেতার পাশাপাশি সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতিও ছিলেন। তিনি বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, জেনারেল এরশাদের পদত্যাগের ঘোষণা দেবার পর আন্দোলনকারী দলগুলো তখনকার প্রধান বিচারপতি মোঃ সাহাবুদ্দিন আহমদের বিষয়ে একমত হয়েছিল।

অস্থায়ী সরকার প্রধানের নাম আসার পর ৬ই ডিসেম্বর রাষ্ট্রপতির দপ্তরে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রক্রিয়া হয়েছিল। সাহাবুদ্দিন আহমেদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করে দেশে গণতন্ত্রের নতুন যাত্রা শুরু করেন।

ডিসেম্বর মাসের চার তারিখে জেনারেল এরশাদ যখন পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছিলেন, তখন রাস্তায় মানুষের ঢল নেমেছিল। বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমদের কাছে জেনারেল এরশাদের ক্ষমতা হস্তান্তর অর্থাৎ ৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত সেই ঢল বজায় ছিল। সূত্র : বিবিসি বাংলা

সংশ্লিষ্ট খবর


মন্তব্য যোগ করুণ

পরের
খবর

খালেদা জিয়ার প্রার্থিতা নিয়ে শুনানি দুপুরে


আরও খবর

বাংলাদেশ

ফাইল ছবি

  সমকাল প্রতিবেদক

আসন্ন একাদশ সংসদ নির্বাচনে তিন আসনে বিএনপি চেয়ারপারসন কারাবন্দি খালেদা জিয়ার প্রার্থিতা বাতিলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে করা রিটের বিভক্ত আদেশের পর তা আবার শুনানির জন্য নতুন বেঞ্চ গঠন করে দিয়েছেন প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন।

বুধবার হাইকোর্টের বিচারপতি জে বি এম হাসানের একক বেঞ্চে এ সংক্রান্ত নথি পাঠানো হয়। মনোনয়নপত্র বাতিল করায় দণ্ডিত খালেদা জিয়ার তিনটি আবেদনের শুনানি এখন এই বেঞ্চে শুনানি হবে। বৃহস্পতিবার বেলা ২টায় শুনানির জন্য দিন ধার্য করেছেন আদালত।

নির্বাচনে অংশ নিতে ফেনী-১, বগুড়া-৬ ও ৭ আসনে খালেদা জিয়ার প্রার্থিতা বাতিলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে করা রিট আবেদনের ওপর মঙ্গলবার বিভক্ত আদেশ দেন হাইকোর্ট। ফলে মামলাটির নথি প্রধান বিচারপতির কাছে যায়।

বুধবার হাইকোর্টের বিভক্ত আদেশের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি না লেখায় তা সংশ্নিষ্ঠ বেঞ্চে ফেরত পাঠান প্রধান বিচারপতি।

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট্র দুর্নীতি মামলায় ১০ বছর এবং জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট্র দুর্নীতি মামলায় ৭ বছরের দণ্ড নিয়ে গত ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে কারাগারে আছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে খালেদা জিয়ারপক্ষে তিনটি মনোনয়নপত্র ক্রয় করেন বিএনপির নেতারা। সাজাপ্রাপ্ত হওয়ার কারণে গত ২ ডিসেম্বর খালেদা জিয়ার মনোনয়নপত্র বাতিল করে দেন তিনটি (ফেনী-১. বগুড়া-৬ ও ৭) আসনের রিটার্নিং কর্মকর্তারা।

পরবর্তীতে তাদের এ সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে ৫ ডিসেম্বর নির্বাচন কমিশনে প্রার্থিতা ফিরে পেতে আপিল করেন খালেদার আইনজীবীরা। আবেদনে নির্বাচনবিধি (১২)-১ এর 'ঘ' অনুসারে মনোনয়নপত্র বাতিলের সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করা হয়।

হাইকোর্টে এক মামলার রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, সংবিধানের ৬৬ (২) (ঘ) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কারও দুই বছরের বেশি সাজা বা দণ্ড হলে সেই দণ্ড বা সাজার বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল বিচারাধীন থাকা অবস্থায় তিনি নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না, যতক্ষণ না আপিলে ওই দণ্ড বাতিল বা স্থগিত হয়।

গত ৮ ডিসেম্বর নির্বাচন কমিশনে আপিলের শুনানির পর সংখ্যাগরিষ্ঠের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে খালেদা জিয়ার তিনটি আসনের মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়। প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নুরুল হুদার নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের নির্বাচন কমিশন এই সিদ্ধান্ত দেন।

প্রার্থিতা বাতিল করা নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করে খালেদা জিয়ার পক্ষে রিট দায়ের করা হয়। আদালতে খালেদা জিয়ার পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী এ জে মোহাম্মদ আলী। এবং রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম।

খালেদার বগুড়া-৬ আসনে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর নিজেই প্রার্থী হয়েছেন। বগুড়া-৭ এ প্রার্থী করা হয়েছে মোরশেদ মিলটনকে। খালেদার পৈত্রিক এলাকা ফেনী-১ আসনে প্রার্থী করা হয়েছে মুন্সী রফিকুল আলমকে।

সংশ্লিষ্ট খবর

পরের
খবর

বৈঠকে ইসি


আরও খবর

বাংলাদেশ
বৈঠকে ইসি

প্রকাশ : ১৩ ডিসেম্বর ২০১৮

  সমকাল প্রতিবেদক

আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে সশস্ত্র বাহিনীসহ সব বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে বসেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।

বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনের অডিটরিয়ামে এ বৈঠকে শুরু হয়।

এতে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কেএম নূরুল হুদার সভাপতিত্বে অন্য চার নির্বাচন কমিশনার, ইসি সচিবসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত রয়েছেন।

তফসিল অনুযায়ী, আগামী ৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে বাহিনী সদস্যদের মোতায়েন সম্পর্কিতসহ নানা বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে বৃহস্পতিবারের এ বৈঠকে।

এদিকে এরই মধ্যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে আগামী ২৪ থেকে ২৬ ডিসেম্বরের মধ্যে সেনাবাহিনী মোতায়েনের কথা জানিয়েছে ইসি। 


সংশ্লিষ্ট খবর

পরের
খবর

হারাচ্ছে জমি, অস্তিত্ব সংকটে সমতলের আদিবাসীরা


আরও খবর

বাংলাদেশ
হারাচ্ছে জমি, অস্তিত্ব সংকটে সমতলের আদিবাসীরা

ভূমি কমিশন গঠনের দাবি

প্রকাশ : ১৩ ডিসেম্বর ২০১৮ | প্রিন্ট সংস্করণ

  হাসনাইন ইমতিয়াজ

'জমি চাই মুক্তি চাই' স্লোগানে ১৮৫৫ সালে সাঁওতাল নেতা সিধু, কানু, ভৈরব ও চাঁদ- চার ভাই ইংরেজ শাসকদের বিরুদ্ধে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন। ইতিহাসে তা 'সাঁওতাল বিদ্রোহ' নামে পরিচিত। ওই আন্দোলনে আত্মোৎসর্গ করে গেছেন তারাসহ বহু মানুষ। আত্মদানে মহীয়ান ওই বিদ্রোহের ১৬৩ বছর পরও সেই ভূমির জন্যই স্বাধীন বাংলাদেশে আজও জীবন দিতে হচ্ছে সমতলের আদিবাসীদের। পাকিস্তান আমলে ১৯৬৪ সালে পিতা ফাগু সরেন এবং ২০১১ সালে বড় ভাই গোসাই সরেনকে হারিয়েছেন দিনাজপুরের আদিবাসী কৃষক টুডু সরেন। ২০১৪ সালে নিজেও খুন হন। তার স্ত্রীর ওপর হামলা হয়েছে, কিন্তু ভূমি রক্ষা হয়নি। ভূমিদস্যুরা জাল দলিলের মাধ্যমে টুডু সরেনের ৩৩ একর জমি দখল করে নিয়েছে। নিজেদের বসতভিটা সরকারের অধিগ্রহণের প্রতিবাদে জীবন দিয়েছেন টাঙ্গাইলের মধুপুর গড়ের পিরেন স্ন্যাল। জমি ফিরে পাওয়ার আন্দোলনে ২০১৬ সলে গাইবান্ধায় পুলিশের গুলিতে জীবন হারিয়েছেন তিন সাঁওতাল। এভাবে প্রায়ই মামলা-হামলা, অত্যাচার-নির্যাতনে ভূমিহীন হচ্ছেন সমতলের আদিবাসীরা, যেসব জমিতে শত শত বছর ধরে তারা বাস করেছেন।

ভূমি হারিয়ে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে আদিবাসীরা। কারণ এই ভূমিকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে তাদের জীবন ও সংস্কৃতি। জমির সঙ্গে সঙ্গে কমছে আদিবাসীদের সংখ্যাও। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, উত্তরাঞ্চলের সাঁওতাল, দক্ষিণাঞ্চলের রাখাইন, মধ্যাঞ্চলের গারোদের মতো সমতলের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর দখলি জমি যেমন কমছে, তেমনি কমছে তাদের জনসংখ্যা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আদিবাসীদের জীবনবৈচিত্র্য টিকিয়ে রাখতে হলে তাদের ভূমির অধিকার ফিরিয়ে দিতে হবে। এ জন্য পৃথক ভূমি কমিশন গঠনের দাবি জানিয়েছেন তারা।

ভূমিহীন হচ্ছে আদিবাসীরা :দেশের আদিবাসীদের সংখ্যা নিয়ে নিখুঁত কোনো পরিসংখ্যান নেই। ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুসারে দেশে প্রায় ১৬ লাখ আদিবাসী রয়েছে। তবে আদিবাসী সংগঠনগুলোর দাবি, দেশে ৫৪টির বেশি জাতিসত্তার ৩০ লাখ আদিবাসী রয়েছে। এর মধ্যে দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে দুই-তৃতীয়াংশের বসবাস। জাতীয় আদিবাসী পরিষদের তথ্যমতে, রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের ১৬ জেলায় ৩৮টি জাতিসত্তার ২০ লাখ আদিবাসী বসবাস করে। এদের মধ্যে রয়েছে সাঁওতাল, মুন্ডা, ওঁরাও, রাজোয়াড়, তুরি, কর্মকার, মালো, মাহাতো, চাঁই, বাইছনী, লহরা, হাঁড়ি, ঘাটোয়াল, দোষাদ, চাঁড়াল, ডহরা, ভূমিজ, মালপাহাড়িয়া, গন্ড, পাটনি,

বাগদি, মাহালী, মুসহর, ভুঁইমালি, কোচ, তেলী, গোড়াত, বেতিয়া, নুনিয়াহাড়ি, রাজবংশী, পাহাড়িয়া, ভূঁঁইয়া, রবিদাস, রাই, বেদিয়া ইত্যাদি ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠী। পটুয়াখালী ও বরগুনা জেলার উপকূলবর্তী এলাকায় রাখাইনদের বসবাস। টাঙ্গাইলের মধুপুর জঙ্গল ঘিরে গড়ে উঠেছে গারো ও কোচ আদিবাসীদের গ্রাম। এই আদিবাসীরা প্রধানত কৃষি ও ভূমির ওপর নির্ভরশীল। জাতীয় আদিবাসী পরিষদের দাবি, এক সময় যথেষ্ট জমি থাকলেও বর্তমানে তাদের ৮৫ শতাংশই ভূমিহীন। 'আদিবাসী মানুষের ভূমি অধিকার-উন্নয়ন-মানবাধিকার' শীর্ষক এক গবেষণাপত্রে অর্থনীতিবিদ আবুল বারকাত বলেছেন, সমতলের সাঁওতালদের ৭২ শতাংশ, পাত্র ও পাহান খানাদের ৯০ শতাংশ এবং গারো, হাজং, ডালু ও রাখাইনদের ৬৬ শতাংশের বেশি লোক বর্তমানে ভূমিহীন।

আবুল বারকাত তার আরেক গবেষণায় দেখিয়েছেন, সমতলের ১০ আদিবাসী জনগোষ্ঠী গত কয়েক দশকে ছয় থেকে সাড়ে ছয় লাখ বিঘা জমি হারিয়েছে। ২০১৪ সালের হিসাব অনুযায়ী যার বাজারমূল্য ১০ হাজার কোটি টাকার বেশি। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সাঁওতালরা। গত তিন প্রজন্মে তাদের তিন লাখ বিঘা জমি বেহাত হয়েছে, যার বাজারমূল্য পাঁচ হাজার কোটি টাকা।

যেভাবে ভূমি হারাচ্ছে আদিবাসী :পেছনে ফিরলে দেখা যায়, ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের পর থেকে অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মতো আদিবাসী জনগণও নিজেদের জমি হারিয়েছে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের পর আরেক দফা বাস্তুচ্যুত হয় ক্ষুদ্র জাতিসত্তার লোকেরা। প্রভাবশালীদের ষড়যন্ত্র, মামলা-হামলার পাশাপাশি নিজেদের শিক্ষার অভাব, অজ্ঞতা, অসচেতনতা ও দারিদ্র্যের কারণে ভূমিহীন হচ্ছে আদিবাসী। অনেক ক্ষেত্রে বন্ধকি জমি বিক্রি করতে বাধ্য হয় তারা। স্থানীয় প্রভাবশালীরা জাল দলিল করে, মামালা-হামলার মাধ্যমে ভয়ভীতি দেখিয়ে এবং ভূমি অফিসের এক শ্রেণির অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর সহযোগিতায় এসব জমি দখল করা হচ্ছে।

টাঙ্গাইলের সখিপুর উপজেলার ট্রাইবাল অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান রবীন্দ্র বর্মণ বলেন, শিক্ষার অভাবে আদিবাসীদের জমি বেহাত হচ্ছে। তিনি তার এক আত্মীয়ের উদাহরণ দিয়ে বলেন, সে বিক্রি করেছিল পাঁচ শতাংশ জমি। ক্রেতা ৫-এর পর আরেকটি ৫ বসিয়ে ৫৫ শতাংশ জমি হাতিয়ে নিয়েছে।

অর্থনীতিবিদ আবুল বারকাত তার এক গ্রন্থে দেখিয়েছেন, ১৬টি কারণে আদিবাসীরা ভূমিহীন হচ্ছে। গবেষণায় দেখা গেছে- নিরক্ষতা, জমির দলিল না থাকা, আইনের সঠিক প্রয়োগের অভাব, প্রভাবশালী রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও সাম্প্রদায়িক শক্তির অত্যাচারসহ নানা কারণে আদিবাসী গোষ্ঠীর লোকজন বাস্তুচ্যুত হচ্ছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, সংরক্ষিত বন গড়ে তুলতে বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয় মধুপুর বনের ৯ হাজার ১৪৫ একর জমি সংরক্ষণের জন্য ২০১৬ সালে গেজেট প্রকাশ করায় গেজেটের আওতাভুক্ত ১৩ গ্রামের গারো ও কোচ নৃগোষ্ঠীর এক হাজার ৮৩ পরিবারের ছয় হাজার অধিবাসী এখন উচ্ছেদ আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে।

মধুপুরের জয়েনশাহী আদিবাসী উন্নয়ন পরিষদের সভাপতি ইউজিন নকরেক বলেন, সংরক্ষিত বন ঘোষণার প্রতিবাদ করায় ২০১৬ সালে ইউজিন নকরেকসহ ২০০ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়।

পটুয়াখালীর পাহাম হালিবাট বুড্ডিস্ট ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি উথা চিং বলেন, ভুয়া দলিল ও মামলার মাধ্যমে হয়রানি করে রাখাইনদের ভূমি কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। জানতে চাইলে আদিবাসী পরিষদের সভাপতি রবীন্দ্রনাথ সরেন বলেন, মিথ্যা মামলাসহ নারীদের শ্নীলতাহানি, ধর্ষণ, লোকজনকে হত্যার মাধ্যমে ভয়ভীতি দেখিয়ে জমি দখল করা হয়। এ নিয়ে সুবিচার পান না বলে তিনি অভিযোগ করেন। ২০০১ সালে নওগাঁর মহাদেবপুরে আদিবাসী নেতা আলফ্রেড সরেনকে হত্যার পর দেড় যুগেও তার বিচার হয়নি।

অস্তিত্ব সংকটে আদিবাসীরা :গবেষকদের মতে, ১৯ শতকের গোড়ার দিকে পটুয়াখালী ও বরগুনার উপকূলীয় এলাকায় ৫০ সহস্রাধিক রাখাইন জনগোষ্ঠীর বসবাস ছিল। ৭০ দশকেও তাদের জনসংখ্যা ছিল ৪০ সহস্রাধিক। বেসরকারি সংস্থা কারিতাসের ২০১৪ সালে পরিচালিত জরিপমতে, উপকূলীয় অঞ্চলে আড়াই হাজার রাখাইন রয়েছে। স্থানীয়দের তথ্যমতে, পটুয়াখালী ও বরগুনা অঞ্চলে এক সময় ২৪২টি রাখাইন গ্রাম ছিল। এর মধ্যে ১৯৫টিতে এখন রাখাইন বসতি নেই। এভাবে গত ২০০ বছরে ৮০ ভাগ রাখাইন গ্রাম তাদের হাতছাড়া হয়েছে। জনসংখ্যা কমেছে প্রায় ৯০ শতাংশ। শুধু রাখাইন নয়; সাঁওতাল, ওঁরাও, গারো, মাহাতো, মাহালি, রাজবংশীসহ বিভিন্ন ক্ষুদ্র আদিবাসী গোষ্ঠী অস্তিত্ব সংকটে ভুগছে। ধীরে ধীরে তাদের ভাষা ও সংস্কৃতিও বিপন্ন হয়ে পড়েছে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক একেএম শাহনাওয়াজ বলেন, সাঁওতালরাই এদেশের আসল ভূমিপুত্র। সাঁওতালরা হাজার বছর ধরে তীর-ধনুক দিয়ে আর্যদের ঠেকিয়েছে। ইংরেজদের বিরুদ্ধে লড়েছে। তীর-ধনুক নিয়েই মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছে। কিন্তু তারাই এখন নিজভূমে সংখ্যালঘু।

এ বিষয়ে অ্যাসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড রিফর্ম অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (এলআরডি) নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা বলেন, পূর্বপুরুষের ভূমির সঙ্গে শুধু জীবিকাই নয়, জড়িয়ে আছে আবেগ, ধর্ম, সংস্কৃৃতি। এখান থেকে বিতাড়িত হওয়া মানে শিকড় কেটে যাওয়া। আদিবাসীদের কাছে ভূমি হলো তাদের অস্তিত্বের বিষয়।

আইনগত সমাধান ও ভূমি কমিশন গঠন :পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় ও আদিবাসীদের রক্ষায় আইন বা বিধিবিধান যুগোপযোগী করে পূর্বপুরুষদের প্রথাগত ভূমির ওপর তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে। প্রতিবেশী দেশ ভারত, অস্ট্রেলিয়া ও কানাডায় তাদের জন্য বিশেষ আইন করা হয়েছে। মালয়েশিয়ার হাইকোর্ট রায় দিয়েছেন- জাতিগত সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর বসবাসরত ভূমির ওপর তাদের আইনি অধিকার আছে। কেনিয়ার ওজিয়েক ও বতসোয়ানার বাসারওয়া সান জনগোষ্ঠীকে তাদের ঐতিহ্যগত ভূমি থেকে সরিয়ে সংরক্ষিত পার্ক প্রতিষ্ঠা আদালতের মাধ্যমে বেআইন ঘোষিত হয়েছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এমন আরও অনেক উদাহরণ রয়েছে।

এ বিষয়ে ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ূয়া বলেন, আদিবাসী ও ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর ভূমি অধিকার রক্ষায় আইন রয়েছে। এর যথাযথ প্রয়োগ হলে আদিবাসীদের ভূমি বেহাত হওয়া অনেকাংশেই থামানো যাবে।

এ বিষয়ে আদিবাসীবিষয়ক সংসদীয় ককাসের সমন্বয়ক ও বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক ফজলে হোসেন বাদশা বলেন, সমতলের আদিবাসীদের ভূমির অধিকার রক্ষার জন্য পৃথক ভূমি কমিশন গঠন করতে হবে।