বাংলাদেশ

দুই জোটে আসন ভাগাভাগি

শরিকদের আসন কমাচ্ছে আওয়ামী লীগ

নির্বাচন ২০১৮

প্রকাশ : ০৬ ডিসেম্বর ২০১৮ | প্রিন্ট সংস্করণ

শরিকদের আসন কমাচ্ছে আওয়ামী লীগ

  অমরেশ রায় ও রাজীব আহাম্মদ

আওয়ামী লীগ শুরুতে বলেছিল, মহাজোটের শরিকদের জন্য ৬৫ থেকে ৭০টি আসন ছাড়বে। কিন্তু জয়ী হওয়ার মতো প্রার্থী না পাওয়ায় শরিকদের ৫০ থেকে ৫৫টির বেশি আসন ছাড়তে এখন আর রাজি নয় আওয়ামী লীগ।

ক্ষমতাসীন দল বলছে, সব দল অংশ নেওয়ায় এবারের নির্বাচন হবে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ। ফলে শরিকদের অপেক্ষাকৃত দুর্বল প্রার্থীকে মহাজোটের মনোনয়ন দিয়ে আসন হারাতে চায় না আওয়ামী লীগ। দলটির নেতারা জানিয়েছেন, আপিল শুনানির ফয়সালার মধ্য দিয়ে ৮ ডিসেম্বর প্রার্থী তালিকা চূড়ান্ত হওয়ার পর মহাজোটের প্রার্থী নির্ধারণ করা হবে।

দশম সংসদ নির্বাচনে মহাজোটের শরিকরা ৪৯ আসনে জয়ী হয়। পরে তাদের আসন সংখ্যা হয় ৫১। এর মধ্যে এবার ২০টিতেই প্রার্থী দিয়েছে আওয়ামী লীগ। মহাজোট শরিক জাতীয় পার্টির জন্য ২৫, ওয়ার্কার্স পার্টির জন্য ৪, জাসদের জন্য ৩, জেপি ও তরীকতের জন্য একটি করে আসন ফাঁকা রেখে সেখানে প্রার্থী দেয়নি আওয়ামী লীগ।

মহাজোটের নতুন শরিক বিকল্পধারার জন্য ফাঁকা রাখা হয়েছে দুটি আসন। সব মিলিয়ে ৩৬টি আসনে প্রার্থী দেয়নি আওয়ামী লীগ।

২০০৮ সালে সব দলের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত নবম সংসদ নির্বাচনে শরিকদের জন্য ৩৬টি আসন ছেড়েছিল আওয়ামী লীগ। জাতীয় পার্টিকে ২৯টি, ওয়ার্কার্স পার্টিকে চারটি ও জাসদকে তিনটি আসন ছেড়েছিল তারা।

২০১৪ সালে বিএনপিবিহীন নির্বাচনে শরিকদের আসন ছাড়ার ক্ষেত্রে উদার মনোভাব ছিল তাদের। ৬০টি আসন ছেড়ে দেওয়া হয় শরিকদের। এবার তা হচ্ছে না। মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের সময় পার হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে আওয়ামী লীগ। মনোনয়নপত্র বাতিল হওয়া মহাজোটের প্রার্থীদের আপিল প্রক্রিয়ার ওপরও নজর রাখছে।

আওয়ামী লীগ শরিকরাও রয়েছে দুশ্চিন্তায়। যেসব আসনে গত নির্বাচনে তারা জয়ী হয়েছিল, সেখানেও প্রার্থী দিয়েছে আওয়ামী লীগ। যেগুলোতে ছাড় দিয়েছে, সেখানে রয়েছে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী। আওয়ামী লীগ অবশ্য শরিকদের ছাড় দেওয়া আসনে প্রার্থী প্রত্যাহার এবং বিদ্রোহী প্রার্থীদের বসিয়ে দেওয়া হবে বলে কথা দিয়েছে।

আওয়ামী লীগ ও মহাজোটের আসন সমঝোতার সঙ্গে সংশ্নিষ্ট নেতাদের সূত্রে জানা গেছে, ২৮ নভেম্বর মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সময়সীমা পার হওয়ার আগেই আসন বণ্টন প্রক্রিয়া শেষ করার সিদ্ধান্ত ছিল। পরে সিদ্ধান্ত বদল হয়। তা হওয়ায় বাছাইয়ের পরপরই প্রার্থী তালিকা চূড়ান্ত করার সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু আওয়ামী লীগ ও শরিকদের কয়েকজন প্রার্থী বাছাইয়ে বাদ পড়ায় নতুন পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটেছে। আপিল প্রক্রিয়া শেষে প্রার্থিতা চূড়ান্ত হওয়ার পরই আসন বণ্টন সুরাহা করতে চায় আওয়ামী লীগ।

অন্যদিকে, নানা হুঁশিয়ারি সত্ত্বেও আওয়ামী লীগ থেকে 'বিদ্রোহী প্রার্থী' হওয়ার প্রবণতা এবারও কমানো যায়নি। দেশের প্রায় ৭৩টি আসনে কমপক্ষে ৯৫ জন মনোনয়নবঞ্চিত আওয়ামী লীগ নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থিতার আড়ালে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন। যদিও ২ ডিসেম্বর যাচাই-বাছাইকালে প্রায় ৫০ জনের মতো বিদ্রোহী প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল হয়েছে। এরপরও অনেক আসনে শক্তিশালী বিদ্রোহ প্রার্থী রয়ে গেছেন। আওয়ামী লীগের নির্বাচন পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা পাঁচ শীর্ষ নেতা তাদের ঢাকায় ডেকে এনে অথবা টেলিফোনে কথা বলে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারে সম্মত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

মহাজোটের দ্বিতীয় বৃহত্তম দল জাতীয় পার্টি (জাপা)। হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের নেতৃত্বাধীন দলটিকে এখন পর্যন্ত ২৫ আসন ছেড়েছে আওয়ামী লীগ। জাপার দখলে থাকা ৩৬ আসনের ১৪টিতেই প্রার্থী দিয়েছে আওয়ামী লীগ। জাপা চায় অন্তত ৪৭ আসন। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে দলটিকে ৪৮ আসন ছেড়েছিল আওয়ামী লীগ। ২০০৮ সালে নির্বাচনে ছেড়েছিল ২৯ আসন। বিএনপিবিহীন নির্বাচনে 'ঝুঁকি' নিয়ে অংশ নেওয়ার 'পুরস্কার' হিসেবে ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে পাওয়া আসনগুলো আবারও চায় জাপা।

জাপার নয় নেতা আসন বণ্টনে দরকষাকষির দায়িত্বে রয়েছেন। তারা গত দু'দফা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে আসন বণ্টন নিয়ে আলোচনা করেছেন। তারা জানিয়েছেন, জাপাকে এবার ৩০ থেকে ৩২টির বেশি আসন দিতে রাজি হচ্ছে না আওয়ামী লীগ।

জাপাকে ছাড়া আসনগুলো হলো- নীলফামারী-৩, নীলফামারী-৪, লালমনিরহাট-৩, রংপুর-১, রংপুর-৩, কুড়িগ্রাম-২, গাইবান্ধা-১, বগুড়া-২, বগুড়া-৩, বগুড়া-৬, বগুড়া-৭, বরিশাল-৬, পিরোজপুর-৩, ময়মনসিংহ-৪, ময়মনসিংহ-৮, কিশোরগঞ্জ-৩, ঢাকা-৪, ঢাকা-৬, নারায়ণগঞ্জ-৫, সুনামগঞ্জ-৪, সিলেট-২, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২, ফেনী-৩, লক্ষ্মীপুর-২ ও চট্টগ্রাম-৫। এর মধ্যে ২২টি আসনে জাপার দলীয় এমপি রয়েছেন।

জাপার এমপি নেই এমন তিনটি আসনও ছেড়েছে আওয়ামী লীগ। এগুলো হলো নীলফামারী-৩, লালমনিরহাট-৩ ও ফেনী-৩ আসন। এই ২৫ আসনের বেশিরভাগকে বিএনপি অধ্যুষিত বলছেন জাপার নেতারা।

জাপার দখলে থাকা ১৪টি আসনে প্রার্থী দিয়েছে আওয়ামী লীগ। আসনগুলো হলো- কুড়িগ্রাম-১, কুড়িগ্রাম-৩, পটুয়াখালী-১, জামালপুর-৪, ময়মনসিংহ-৫, ময়মনসিংহ-৭, ঢাকা-১, নারায়ণগঞ্জ-৩, সিলেট-৫, হবিগঞ্জ-১, কুমিল্লা-২, কুমিল্লা-৮, চট্টগ্রাম-৯ ও কক্সবাজার-১। এ আসনগুলোর মধ্যে শুধু কুড়িগ্রাম-১, কুড়িগ্রাম-৩ আসনে মহাজোটের মনোনয়নের আশ্বাস পেয়েছে জাপা। এরশাদের জন্য ঢাকা-১৭ আসনে মহাজোটের মনোনয়নের নিশ্চয়তা মিলেছে।

বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদ ময়মনসিংহ-৪ ও ৭ আসনে প্রার্থী। তার সমর্থনে ময়মনসিংহ-৪ আসনে প্রার্থী দেয়নি আওয়ামী লীগ। রওশনের জন্য ময়মনসিংহ-৭ আসনটি আদায়ের চেষ্টা করলেও নিশ্চয়তা পায়নি জাপা। দলটির সদ্য সাবেক মহাসচিব এ বি এম রুহুল আমিন হাওলাদার পটুয়াখালী-১ আসনে প্রার্থী হয়েছিলেন। তার মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে। আপিলে যদি প্রার্থিতা ফিরেও পান, তবুও তার মনোনয়ন নিশ্চিত নয়।

বরিশাল-২ আসনে জাপার প্রার্থী চিত্রনায়ক সোহেল রানার মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে। তিনি আপিল করেছেন। প্রার্থিতা ফিরে পেল তিনি মহাজোটের মনোনয়ন পেতে পারেন। এই ৩১ আসন ছাড়াও রংপুর-২ ও রংপুর-৪ আসনে মহাজোটের মনোনয়ন নিশ্চিত করার চেষ্টা চালাচ্ছে জাপা।

জাপার নবনিযুক্ত মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গাঁ গত সোমবার বলেছিলেন, কয়টি আসনে মহাজোটের মনোনয়ন পওায়া যাবে, তা দু-একদিনের মধ্যে জানা যাবে। তিনি গতকাল বুধবার সমকালকে একই কথা বলেন। তিনি বলেন, আলোচনা চলছে। তারা আশা করছেন, ৫৪ থেকে ৫৫টি আসন পাওয়া যাবে।

১৪ দল শরিক ওয়ার্কার্স পার্টি, জাসদের দুই অংশ, জেপি ও তরীকতের দখলে রয়েছে ১৫টি আসন। তবে এ পাঁচটি দল এখন পর্যন্ত নয়টি আসনের নিশ্চয়তা পেয়েছে। ওয়ার্কার্স পার্টি চারটি, জাসদ তিনটি, বাংলাদেশ জাসদ দুটি, তরীকত ও জেপি একটি আসনে ছাড় পেয়েছে। তাদের দখলে থাকা ছয়টি আসনে প্রার্থী দিয়েছে আওয়ামী লীগ। তবে কুড়িগ্রাম-৪ আসনে আওয়ামী লীগ প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল হওয়ায় সেখানকার জেপির এমপির মহাজোটের মনোনয়ন পাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।

ওয়ার্কার্স পার্টি থেকে দলীয় সভাপতি রাশেদ খান মেননের ঢাকা-৮, সাধারণ সম্পাদক ফজলে হোসেন বাদশার রাজশাহী-২, ইয়াসিন আলীর ঠাকুরগাঁও-৩ ও টিপু সুলতানের বরিশাল-৩ আসনে মহাজোটের মনোনয়ন নিশ্চিত হয়েছে। এসব আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী নেই। গত নির্বাচনে দলটির জয়ী হওয়া সাতক্ষীরা-১ ও নড়াইল-২ আসনে প্রার্থী দিয়েছে আওয়ামী লীগ।

জাসদ গত নির্বাচনে জিতেছিল পাঁচটি আসনে। জাসদের হাসানুল হক ইনুর নেতৃত্বাধীন অংশে এমপি তিনজন। তাদের সবারই মহাজোটের মনোনয়ন নিশ্চিত। হাসানুল হক ইনুর কুষ্টিয়া-২, সাধারণ সম্পাদক শিরীন আখতারের ফেনী-১ এবং স্থায়ী কমিটির সদস্য এ কে এম রেজাউল করিম তানসেনের বগুড়া-৪ আসনে ছাড় পেয়েছে দলটি।

জাসদ ভেঙে গঠিত বাংলাদেশ জাসদের বর্তমান দুই এমপির মধ্যে দলের কার্যকরী সভাপতি মইনউদ্দীন খান বাদলের চট্টগ্রাম-৮ আসনের আশ্বাস দেওয়া হলেও সেখানে প্রার্থী দিয়েছে আওয়ামী লীগ। দলটির সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হক প্রধানের পঞ্চগড়-১ আসনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী দিয়েছে। নাজমুল হক প্রধান সেখানে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন। এ ছাড়া শরিফ নূরুল আম্বিয়াকে নড়াইল-১ আসনটি ছেড়ে দেওয়া হলেও আওয়ামী লীগ থেকে প্রার্থী দেওয়া হয়েছে।

গত নির্বাচনে জেপি ও তরীকত ফেডারেশন দুটি করে আসন পেয়েছিল। এবার পিরোজপুর-২ আসনে জেপি চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর মনোনয়ন নিশ্চিত। চট্টগ্রাম-২ আসনে মনোনয়ন নিশ্চিত তরীকতের চেয়ারম্যান নজিবুল বশর মাইজভাণ্ডারীর। লক্ষ্মীপুর-১ আসনের এমপি এম আউয়াল এবার তরীকতের মনোনয়ন পাননি, স্বতন্ত্র প্রার্থী হলেও বাছাইয়ে মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে। আওয়ামী লীগ থেকে তরীকতে যোগ দিয়ে আনোয়ার খান মনোনয়ন পেয়েছেন। এ আসনেও আওয়ামী লীগের প্রার্থী রয়েছে।

বিকল্পধারার জন্য মুন্সীগঞ্জ-১ ও মৌলভীবাজার-২ আসন ফাঁকা রাখা হয়েছে। মুন্সীগঞ্জে প্রার্থী মাহী বি. চৌধুরী, মৌলভীবাজারে বিএনপি ছেড়ে আসা এম এম শাহীন। লক্ষ্মীপুর-৪ আসনে প্রার্থী বিকল্পধারার মহাসচিব মেজর (অব.) আবদুল মান্নান। এ আসনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী দিলেও আবদুল মান্নানের মনোনয়ন নিশ্চিত বলে জানিয়েছে সূত্র।

আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, ৯ ডিসেম্বর মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিনের আগেই আসন বণ্টন প্রক্রিয়া শেষ করা হবে। কয়েকটি আসনে মহাজোটের শরিক এবং আওয়ামী লীগ উভয়ের প্রার্থী থাকা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিনের পর কোথাও এ ধরনের প্রার্থী থাকলে আওয়ামী লীগ থেকে তাদের বহিস্কার করা হবে।

সংশ্লিষ্ট খবর


মন্তব্য যোগ করুণ

পরের
খবর

'অপ্রতিরোধ্য বাংলাদেশ' গড়বে আওয়ামী লীগ


আরও খবর

বাংলাদেশ

ইশতেহার আসছে

'অপ্রতিরোধ্য বাংলাদেশ' গড়বে আওয়ামী লীগ

প্রকাশ : ১২ ডিসেম্বর ২০১৮ | প্রিন্ট সংস্করণ

  অমরেশ রায়

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে দুই প্রধান জোটেই চলছে ইশতেহার ঘোষণায় শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। মহাজোটের প্রধান দল আওয়ামী লীগ তাদের ইশতেহার ঘোষণা করবে ১৮ ডিসেম্বর। অন্যদিকে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ইশতেহার আসছে একদিন আগে, ১৭ ডিসেম্বর

'সমৃদ্ধির অগ্রযাত্রায় অপ্রতিরোধ্য বাংলাদেশ' স্লোগান সামনে রেখে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহার প্রণয়নের কাজ চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। এবারের ইশতেহারে থাকছে উন্নয়ন-সমৃদ্ধির ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখার দৃঢ় প্রত্যয়। আওয়ামী লীগ আবার ক্ষমতায় গেলে দেশের প্রতিটি গ্রামকে শহরে পরিণত করা তথা গ্রামগুলোতেই আধুনিক নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করার অঙ্গীকার থাকছে ইশতেহারে। এ লক্ষ্যে ইশতেহারে গ্রামীণ অর্থনীতি বিকাশের প্রতিশ্রুতিও থাকছে।

অন্যদিকে ইশতেহারে নতুন চমক হিসেবে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য স্থায়ী বেতন কমিশন গঠনের অঙ্গীকারও করা হচ্ছে। আবার সরকার গঠনে সক্ষম হলে আমলাতন্ত্রকে নিয়মানুবর্তী ও জনগণের সেবক হিসেবে গড়ে তোলা এবং জনবান্ধব পুলিশ প্রশাসন প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতিও দিচ্ছে ক্ষমতাসীন দলটি। তরুণদের আকৃষ্ট করতে ইশতেহারে সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা বাড়ানোর অঙ্গীকারও থাকতে পারে।

এ ছাড়া ডেল্টা প্ল্যান-২১০০, ব্লু ইকোনমি তথা সমুদ্র সম্পদভিত্তিক উন্নয়ন, তরুণদের ক্ষমতায়ন এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতিকেও প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। ইশতেহারে তরুণ ভোটারদের আকৃষ্ট করতে কর্মসংস্থান ও তরুণ উদ্যোক্তা সৃষ্টি, সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকার মানোন্নয়ন, নারীর ক্ষমতায়ন ও তাদের স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন, চরাঞ্চলের মানুষ ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উন্নয়ন, প্রান্তিক জনগণের জন্য আধুনিক প্রযুক্তির সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করাকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সংশ্নিষ্টরা বলছেন, এবারের ইশতেহার হবে উন্নত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ নির্মাণের রোডম্যাপ।

আওয়ামী লীগ নেতারা জানিয়েছেন, ১৮ ডিসেম্বর (মঙ্গলবার) দলীয় সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ইশতেহার ঘোষণা করবেন। গত দুটি নির্বাচনের ধারাবাহিকতায় এবারও বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রকে ইশতেহার ঘোষণার ভেন্যু হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে।

আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহার উপকমিটির আহ্বায়ক ড. আবদুর রাজ্জাক সমকালকে বলেন, এবারের ইশতেহারে উন্নয়ন ও অগ্রগতির ধারা অব্যাহত রাখার অঙ্গীকারই প্রাধান্য পাচ্ছে। এরই মধ্যে ইশতেহারের খসড়া প্রণয়ন করে প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার কাছে দিয়েছেন তারা। প্রধানমন্ত্রীর চূড়ান্ত অনুমোদনের পর এটি ঘোষণা করা হবে।

ইশতেহার প্রণয়ন উপকমিটির সূত্রগুলো জানায়, ৬৪ পৃষ্ঠার ইশতেহার তৈরির পাশাপাশি এর একটি সংক্ষিপ্তসারও করা হয়েছে। এবার ইশতেহারের মূল স্লোগান হিসেবে ১৩টি স্লোগানকে প্রস্তাব করা হয়েছিল। সেখান থেকে তিন-চারটি স্লোগানকে প্রাধান্য দিয়ে খসড়া তৈরির পর আওয়ামী লীগ সভাপতিকে দেওয়া হয়েছিল। সেখান থেকেই সামান্য সংশোধন করে 'সমৃদ্ধির অগ্রযাত্রায় অপ্রতিরোধ্য বাংলাদেশ' স্লোগানটি বেছে নিয়েছেন শেখ হাসিনা। আজকালের মধ্যে ইশতেহার ছাপানোর জন্য প্রেসে পাঠানোর কথা রয়েছে।

মূল স্লোগানের পাশাপাশি এবারের ইশতেহারে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একটি বিখ্যাত উদ্ধৃতিও ব্যবহার করা হয়েছে। সেটি হচ্ছে, 'এ স্বাধীনতা আমার ব্যর্থ হয়ে যাবে, যদি আমার মানুষ পেট ভরে ভাত না খায়। এই স্বাধীনতা আমার পূর্ণ হবে না, যদি বাংলার মা-বোনেরা কাপড় না পায়। এই স্বাধীনতা আমার পূর্ণ হবে না, যদি এ দেশের মানুষ, যারা আমার যুবক শ্রেণী আছে তারা চাকুরি না পায় বা কাজ না পায়।' মূলত জাতির পিতার এই উদ্ধৃতিতে বর্ণিত লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নের অঙ্গীকার নিয়েই এবারের ইশতেহার প্রণীত হয়েছে বলে সংশ্নিষ্টরা জানান।

যা থাকছে ইশতেহারে :ইশতেহারের মূল সুরই হচ্ছে উন্নয়ন ও অগ্রগতির পথে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখার অঙ্গীকার। ২০০৮ সালে 'দিনবদলের সনদ' দিয়ে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে 'ডিজিটাল বাংলাদেশ' প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করা হয়। ওই ইশতেহার এবং পরবর্তী ২০১৪ সালের ইশতেহারেও 'রূপকল্প-২০২১' তথা ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশ এবং 'রূপকল্প-২০৪১' তথা ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলার প্রেক্ষিত পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়।

আওয়ামী লীগ নেতারা বলছেন, গত ১০ বছরে মহাজোট সরকার তাদের নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নের পথে অনেকটাই সফল হয়েছে। এই সরকারের বিস্ময়কর উন্নয়ন-অগ্রগতির ফলে দেশ এরই মধ্যে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বের হয়ে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে পৌঁছে গেছে। ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতিও পূরণ হয়েছে অনেক আগেই।

এসব কারণে এবারের ইশতেহারের ১১টি শিরোনামের (অনেকগুলো উপশিরোনামসহ) একাধিক অধ্যায়ে আওয়ামী লীগ সরকারের টানা দুই মেয়াদে উন্নয়ন-অগ্রগতির ধারা উপস্থাপন করা হয়েছে। পাশাপাশি আবার ক্ষমতায় গেলে আগামী মেয়াদের (২০১৯-২০২৩) লক্ষ্য ও উন্নয়ন পরিকল্পনা তুলে ধরা হচ্ছে। ১৯৯৬-২০০১ মেয়াদে আওয়ামী লীগ সরকারের 'গৌরবোজ্জ্বল পাঁচ বছর'; ২০০১-২০০৬ মেয়াদে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের 'দুর্নীতি, দুঃশাসন ও দুর্বৃত্তায়নের বিরুদ্ধে গণআন্দোলন' শিরোনামে বক্তব্য স্থান পাচ্ছে। সামরিক স্বৈরশাসন ও প্রতিক্রিয়ার ধারা এবং বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে 'অসাংবিধানিক সরকার' প্রতিষ্ঠার অপচেষ্টা ও তার প্রতিরোধ; সম্ভাবনার স্বর্ণদুয়ার উন্মোচন, সংকট উত্তরণ ও সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদবিরোধী জাতীয় ঐক্য সৃষ্টি শিরোনামে নানা তথ্য স্থান পাচ্ছে। এ ছাড়া ২০০৮ সালের ঐতিহাসিক নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের ক্ষমতায় আসার প্রেক্ষাপটও তুলে ধরা হয়েছে।

ইশতেহারের শুরুতে 'আমাদের অঙ্গীকার' শিরোনামে ২১ দফা অঙ্গীকার করা হয়েছে। এর প্রধান বক্তব্যই হচ্ছে 'আমার গ্রাম-আমার শহর :প্রতিটি গ্রামে আধুনিক নগর সুবিধা নিশ্চত করা।' এ ছাড়া ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন শিরোনাম ও উপশিরোনামে সামষ্টিক অর্থনীতি :উচ্চ আয়, টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন, দারিদ্র্য বিমোচন ও বৈষম্য হ্রাস; কৃষি, খাদ্য, পুষ্টি ও গ্রাম উন্নয়ন; স্থানীয় সরকার, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি; শিল্প উন্নয়ন, অবকাঠামো রূপান্তরে বৃহৎ প্রকল্প, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি, ব্লু-ইকোনমি, জলবায়ু পরিবর্তন, উষ্ণায়ন ও পরিবেশ, গণতন্ত্র ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার থাকছে।

ইশতেহারে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ, সন্ত্রাস, সাম্প্রদায়িকতা ও জঙ্গিবাদ নির্মূলের অঙ্গীকার, নারীর ক্ষমতায়ন; শিশু, প্রতিবন্ধী ও প্রবীণ কল্যাণ কর্মসূচি; তরুণ যুবসমাজকে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে অন্তর্ভুক্তি, মুক্তিযোদ্ধাদের কল্যাণ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন; শ্রমনীতি, সংস্কৃতি ও ক্রীড়া; ক্ষুদ্র-নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী, ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও অনুন্নত সম্প্রদায়; গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও অবাধ তথ্যপ্রবাহ করার অঙ্গীকার করবে আওয়ামী লীগ।

ইশতেহারে এনজিও, প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্র, এসডিজি, শেখ হাসিনার বিশেষ উদ্যোগ এবং উন্নয়ন, গণতন্ত্র, শান্তি ও সমতা প্রতিষ্ঠায় শেখ হাসিনার সম্মোহনী নেতৃত্বের ভূমিকার কথা তুলে ধরা হবে। সবশেষে 'দেশবাসীর কাছে আহ্বান' শিরোনামে আওয়ামী লীগকে আবারও নির্বাচিত করার আহ্বান থাকছে।

সূত্রমতে, ইশতেহারে সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের উন্নত কাজের পরিবেশ, জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন ও সম্মানজনক জীবনধারণের জন্য মূল্যস্ম্ফীতির নিরিখে বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা পুনর্নির্ধারণের জন্য স্থায়ী বেতন কমিশন গঠনের প্রতিশ্রুতি থাকছে। এর আগে আওয়ামী লীগ সরকার সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য শতকরা ১২৩ ভাগ বেতন বৃদ্ধি করেছে, যা স্মরণকালের মধ্যে সর্বোচ্চ।

ইশতেহার প্রণয়নে সংশ্নিষ্টরা জানান, এবারের নির্বাচনে তরুণ ভোটারদের আকৃষ্ট করাটাই হচ্ছে আওয়ামী লীগের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ জন্য ইশতেহারে তরুণ-যুবক, বিশেষ করে নতুন ভোটারদের আকৃষ্ট করার প্রচেষ্টাও থাকছে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে তরুণ ভোটারদের আকৃষ্ট করতে ইশতেহারের বিষয়ে কিছু দিকনির্দেশনাও দিয়েছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা।

সংশ্লিষ্ট খবর

পরের
খবর

ক্ষমতার ভারসাম্য চায় ঐক্যফ্রন্ট


আরও খবর

বাংলাদেশ

ইশতেহার আসছে

ক্ষমতার ভারসাম্য চায় ঐক্যফ্রন্ট

প্রকাশ : ১২ ডিসেম্বর ২০১৮ | প্রিন্ট সংস্করণ

  কামরুল হাসান

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে দুই প্রধান জোটেই চলছে ইশতেহার ঘোষণায় শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। মহাজোটের প্রধান দল আওয়ামী লীগ তাদের ইশতেহার ঘোষণা করবে ১৮ ডিসেম্বর। অন্যদিকে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ইশতেহার আসছে একদিন আগে, ১৭ ডিসেম্বর

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ইশতেহারে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য ও পরপর দুই মেয়াদের বেশি প্রধানমন্ত্রী পদে না থাকার প্রতিশ্রুতি দেবে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। নির্বাচনী ইশতেহার প্রণয়নের লক্ষ্যে গঠিত উপকমিটির খসড়ায় এ অঙ্গীকার করা হয়েছে। তবে খসড়া ইশতেহারে নির্বাচনী স্লোগান এখনও নির্ধারণ করা হয়নি বলে জানা গেছে।

একই সঙ্গে ইশতেহারের খসড়ায় নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকার ব্যবস্থা, প্রশাসনিক সংস্কার ও বিকেন্দ্রীকরণ, মৌলিক অধিকার রক্ষায় বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধ, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিল, পিএসসি ও জেএসসি পরীক্ষা বাতিল, চাকরিতে প্রবেশের সময়সীমা বাড়ানো, নারীর নিরাপত্তা এবং ক্ষমতায়ন, সংসদের

উচ্চকক্ষ ও নিম্নকক্ষ সৃষ্টিসহ বিভিন্ন বিষয়কে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। নির্বাচিত হতে পারলে পাঁচ বছর মেয়াদি শাসনকালে যেসব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করা যাবে সেগুলোর ওপর জোর দিয়েছে ঐক্যফ্রন্ট। জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ও ২০ দলীয় জোটের একক ইশতেহারে স্লোগান নির্ধারণে বিভিন্ন দল ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের কাছে স্লোগান চাওয়া হয়েছে বলে খসড়া উপকমিটির এক সদস্য জানান। তিনি বলেন, বিভিন্ন জায়গা থেকে স্লোগান নেওয়ার পর তা স্টিয়ারিং কমিটির কাছে উপস্থাপন করা হবে। পরে শীর্ষ নেতারা নির্দিষ্ট স্লোগান নির্ধারণ করবেন।

জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের এই নির্বাচনী ইশতেহার প্রণয়নের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। পরে ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতারা এটি চূড়ান্ত করবেন। জোটের স্টিয়ারিং কমিটির অনুমোদন পাওয়ার পর আগামী ১৭ ডিসেম্বর ইশতেহার ঘোষণা করা হবে বলে জানিয়েছেন ঐক্যফ্রন্টের মুখপাত্র ও বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

এ বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী সমকালকে বলেন, গণতন্ত্র ও মৌলিক অধিকার ফিরিয়ে আনার বিষয়টিকে নির্বাচনী ইশতেহারে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হবে। এক্ষেত্রে সংবিধান সংশোধন থেকে শুরু করে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার করার বিষয়ও থাকবে। আইনের শাসন নিশ্চিত করার ওপর সার্বিকভাবে গুরুত্ব দেওয়া হবে। এ ছাড়া সম্ভাবনাময় যুবসমাজকে মানবসম্পদে পরিণত করার জন্য কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র সৃষ্টির বিষয়ও গুরুত্ব পাবে ইশতেহারে। এর বাইরে জেন্ডারবৈষম্য দূর করা, পরিবেশবান্ধব সবুজ বাংলা গড়া, ক্রিয়েটিভ শিল্পায়ন ঘটানো, আয়বৈষম্য ঘোচানো, জনগণের করের টাকার সদ্ব্যবহার, পাচারকৃত দুর্নীতির টাকা ফেরত আনা, উন্নয়ন ব্যয় জনগণের উপকারে লাগানো ইত্যাদি বিষয়ও নির্বাচনী ইশতেহারে থাকবে।

ঐক্যফ্রন্ট সূত্র জানায়, তাদের ইশতেহারে বিতর্কিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিলের বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে ক্ষমতাসীন সরকারের সমালোচনা, এমনকি ব্যঙ্গ-বিদ্রূপেরও অধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। সামাজিক গণমাধ্যমসহ সব গণমাধ্যমের ওপর কোনো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সরকারি নিয়ন্ত্রণ না থাকার বিষয়েও থাকছে স্পষ্ট ঘোষণা। ঐক্যফ্রন্ট বলছে, প্রতিরক্ষা বাহিনীর জন্য প্রয়োজনীয় যুদ্ধাস্ত্র এবং অন্যসব সরঞ্জাম অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কেনা হবে। সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের জন্য কল্যাণমূলক প্রকল্প নেওয়া হবে। এ ছাড়া আরও বিস্তারিতভাবে সুশাসন ও গণতন্ত্রকে বিকশিত করতে ইশতেহারে চমক সৃষ্টির উপাদান থাকছে বলে জানিয়েছেন নেতারা।

ঐক্যফ্রন্ট নেতারা বলেন, প্রচার ও বোঝার সুবিধার্থে একটি সংক্ষিপ্ত ও আরেকটি বিস্তারিত ইশতেহার করা হয়েছে। তবে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের পাশাপাশি বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটও পৃথক ইশতেহার তৈরি করছে। বিএনপির একজন সিনিয়র নেতা জানান, এই দুই ইশতেহারকে সমন্বিত করে চূড়ান্ত ইশতেহার করা হবে।

ইশতেহার কমিটির প্রধান ও গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেছেন, ইশতেহার কমিটিতে ঐক্যফ্রন্টের সব শরিক দলের প্রতিনিধি আছেন। প্রত্যেকের প্রস্তাব সামনে রেখেই ইশতেহার তৈরি হচ্ছে। ইশতেহারের বিষয়বস্তু সম্পর্কে তিনি বলেন, তারা রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য ছাড়াও সব সংসদীয় কমিটিতেও ভারসাম্য আনার প্রস্তাব করেছেন। জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার বিরোধী দল থেকে হবে। প্রতিটি সাংবিধানিক কমিটিতে বিরোধী দল ও নারী সদস্যদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হবে। রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য প্রদেশ গঠনের বিষয়টিকেও তারা ইশতেহারে আনতে চান।

যা থাকছে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সংক্ষিপ্ত ইশতেহারে

রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ভারসাম্য :ক্ষমতার ভারসাম্য এবং প্রশাসনিক ও স্থানীয় সরকার বিকেন্দ্রীকরণ নিশ্চিত করে গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হবে। নির্বাচনকালীন সরকারের বিধান তৈরি করে মুক্তভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগের অধিকার নিশ্চিত করা হবে। নিম্ন আদালতকে সম্পূর্ণভাবে উচ্চ আদালতের অধীন করা হবে। অনাস্থা ভোট এবং অর্থবিল ছাড়া অন্য যে কোনো ক্ষেত্রে দলীয় সংসদ সদস্য দলের বিরুদ্ধে ভোট দিলেও তাদের পদ শূন্য হবে না এমন সংশোধনী ৭০ অনুচ্ছেদে আনা হবে। সংসদে উচ্চকক্ষ সৃষ্টি করে বিভিন্ন দলের সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব বিবেচনায় নেওয়া হবে। পর পর দুই মেয়াদের বেশি প্রধানমন্ত্রী থাকা যাবে না। তবে এ প্রতিশ্রুতির ব্যাপারে বিএনপির আপত্তি থাকতে পারে বলে ঐক্যফ্রন্ট সূত্র জানিয়েছে। পৌর এলাকাগুলোতে সব সেবা সংস্থাকে মেয়রের অধীনে এনে সিটি গভর্নমেন্ট চালু করা হবে। প্রশাসনিক কাঠামো প্রাদেশিক পর্যায়ে বিন্যস্ত করতে কমিশন করা হবে।

কোটা সংস্কার ও বেকার ভাতা চালু :নির্দিষ্ট কিছু চাকরি, বিশেষ করে সামরিক বাহিনীর মতো চাকরি ছাড়া অন্যান্য চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা বাতিল করা হবে। পিছিয়ে পড়া জনগণ ও প্রতিবন্ধীদের জন্য কোটা রেখে অন্য সব কোটা বিলুপ্ত করার ঘোষণাও থাকছে। ত্রিশোর্ধ্ব শিক্ষিত বেকারের জন্য বেকার ভাতা চালু করা হবে। আগামী তিন বছরের মধ্যে সব সরকারি শূন্য পদে নিয়োগ হবে।

শিক্ষা :পিইসি ও জেএসসি পরীক্ষা বাতিল করা হবে। সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত ছাত্র সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান নিশ্চিত করা হবে। বেসরকারি শিক্ষা পুরোপুরি ভ্যাটমুক্ত থাকবে। মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের কারিগরি শিক্ষায় কর্মসংস্থান তৈরির পরিকল্পনা নেওয়া হবে। শিক্ষা কার্যক্রম আধুনিক করতে শিক্ষা কমিশন গঠন করা হবে। মোবাইল, ইন্টারনেটের খরচ অর্ধেকে নামিয়ে আনা হবে। দেশের বিভিন্ন গণজমায়েতের স্থানে ফ্রি ওয়াইফাইয়ের ব্যবস্থা করা হবে।

আইনের শাসন :বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এবং গুম (এনফোর্সড ডিসঅ্যাপিয়ারেন্স) পুরোপুরি বন্ধ করা হবে। রিমান্ডের নামে পুলিশি হেফাজতে যে কোনো শারীরিক নির্যাতন বন্ধ করা হবে। সাদা পোশাকে কাউকে গ্রেফতার করা হবে না। বিপথগামী রাজনৈতিক কর্মীদের হাত থেকেও নাগরিকরা সুরক্ষিত থাকবে। মামলাজট কমাতে উচ্চ আদালতের বার্ষিক ছুটিও ছয় সপ্তাহে সীমিত করা হবে।

দুর্নীতি দমন :বৃহৎ প্রকল্প, সেবা সংস্থা এবং আর্থিক খাতে দুর্নীতি দমন করে সুশাসন নিশ্চিত করা হবে। বিশেষ ট্রাইব্যুনালে দুর্নীতির তদন্ত করে জড়িতদের বিচারের আওতায় আনা হবে। ন্যায়পাল নিয়োগ করা হবে এবং সংবিধান নির্দেশিত সব দায়িত্ব পালনে ন্যায়পালকে পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া হবে। দুর্নীতি দমন কমিশনকে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেওয়া হবে। দুর্নীতিবাজ সরকারি কর্মকর্তা গ্রেফতারে সরকারের অনুমতির বিধান (সরকারি চাকরি আইন-২০১৮) বাতিল করা হবে। অর্থ পাচার রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং পাচার করা অর্থ ফেরত আনার ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ব্যাংকিং সেক্টরে লুটপাটে জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং ব্যাংকগুলোকে সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংককে সর্বময় ক্ষমতা দেওয়া হবে। সরকারি মদদে শেয়ারবাজারে লুটপাটে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সঠিক ব্যবস্থা ও প্রণোদনার মাধ্যমে শেয়ার বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষা করে শেয়ারবাজারকে দ্রুত সঠিক গতিপথে নিয়ে যাওয়া হবে।

স্বাস্থ্য :উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোকে পর্যায়ক্রমে ৫০ শয্যার করা হবে। প্রত্যেক জেলায় একটি করে মেডিকেল কলেজ ও ৫০০ শয্যার হাসপাতাল, সকল জেলায় ২০ শয্যাবিশিষ্ট সিসিইউ, ২০ শয্যার আইসিইউ, পুরনো ২১ জেলায় অগ্রাধিকারভিত্তিক একটি করে ২০ শয্যার কিডনি ডায়ালাইসিস সেন্টার এবং একটি করে ক্যান্সার কেমোথেরাপি সেন্টার গড়ে তোলা হবে।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি :প্রথম বছরে সব গ্রাহকের জন্য বিদ্যুতের দাম বাড়বে না। সর্বোচ্চ ১০০ ইউনিট ব্যবহারকারীদের বিদ্যুতের মূল্য আগামী পাঁচ বছরে বাড়বে না। গ্রামীণ ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প এবং দেশের সকল সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালকে বাণিজ্যিক দামের পরিবর্তে হ্রাসকৃত বাসস্থানের দামে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হবে।

প্রবাসী কল্যাণ :প্রবাসীদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করা হবে। ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশের শ্রমশক্তি রফতানির জন্য নতুন নতুন বাজার বের করা হবে।

নিরাপদ সড়ক ও পরিবহন :নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের সময় শিক্ষার্থীদের ওপরে নৃশংস হামলাকারীদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনা হবে। বড় শহরগুলোতে ট্রাফিক জ্যাম নিরসনকল্পে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া হবে। শহরে গণপরিবহনকে প্রাধান্য দিয়ে পরিবহন নীতি প্রণয়ন করা হবে এবং আরামদায়ক গণপরিবহনের ব্যবস্থা করা হবে। রেল খাতকে সম্প্রসারণ করা হবে।

কৃষি :কৃষি ভর্তুকি উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বাড়িয়ে সার, বীজ এবং অন্যান্য কৃষি উপকরণ সহজলভ্য করা হবে। কৃষি উৎপাদনকে লাভজনক পেশায় পরিণত করার লক্ষ্যে উৎপাদন খরচের সঙ্গে যৌক্তিক মুনাফা নিশ্চিত করে সব কৃষিপণ্যের মূল্য নির্ধারিত হবে স্থানীয় সমবায় সমিতির মাধ্যমে। নগরবাসী কৃষিপণ্য পাবেন উৎপাদক সমবায় সমিতি নির্ধারিত মূল্যের সর্বোচ্চ তিন গুণ মূল্যে। জলমহাল ও হাওরের ইজারা সম্পূর্ণ বাতিল করে মৎস্যজীবী ও দরিদ্র জনগণের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে। কৃষিনির্ভর এবং শ্রমঘন শিল্পে বিশেষ প্রণোদনা দেওয়া হবে। দেশের দারিদ্র্যপ্রবণ জেলাগুলোতেও শিল্পায়নে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে।

নারীর নিরাপত্তা ও ক্ষমতায়ন :নারীর জন্য সংরক্ষিত আসনের প্রথার পরিবর্তে সরাসরি নির্বাচনের ক্ষেত্রে নারীর জন্য বাধ্যতামূলক ২০ শতাংশ মনোনয়নের বিধান করা হবে। এ বিধানের সঙ্গে পরের দুটি নির্বাচনের ক্ষেত্রে ৩০০ আসনের অতিরিক্ত ১০ শতাংশ সংরক্ষিত নারী সদস্যের বিধান থাকবে। সরকারি পর্যায়ে কর্মজীবী নারীদের সুবিধার জন্য পর্যাপ্ত ডে-কেয়ার সেন্টার স্থাপন করা হবে। বেসরকারি ডে-কেয়ার সেন্টার স্থাপন করার ক্ষেত্রে খুব সহজ শর্তে ঋণ দেওয়া হবে।

এ ছাড়া অতিদরিদ্র ও দুস্থদের জন্য বিনামূল্যে খাদ্য বিতরণ করা হবে। বয়স্কভাতা, দুস্থ মহিলা ভাতা, বিধবা ও স্বামী পরিত্যক্তদের ভাতার পরিমাণ এবং আওতা বাড়ানো হবে। শ্রমিক, ক্ষেতমজুরসহ গ্রাম ও শহরের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য সুলভ মূল্যে রেশনিং চালু করা হবে। পুনর্বাসন ছাড়া শহরের বস্তিবাসী ও হকারদের উচ্ছেদ করা হবে না। হতদরিদ্র মানুষের জন্য বিনামূল্যে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হবে। তিস্তাসহ অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন, রোহিঙ্গা সমস্যাসহ অন্যান্য দ্বিপক্ষীয় সমস্যা আলোচনার মাধ্যমে দ্রুত সমাধান এবং দায়িত্ব পাওয়ার এক বছরের মধ্যে মানুষকে ভেজাল ও রাসায়নিকমুক্ত নিরাপদ খাদ্য পাওয়ার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে এই ইশতেহারে।

ঐক্যফ্রন্ট সূত্র জানায়, খসড়া ইশতেহারে সংখ্যালঘুদের মানবিক মর্যাদা, অধিকার, নিরাপত্তা এবং সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সংখ্যালঘু মন্ত্রণালয় গঠন, তাদের ওপর নির্যাতন প্রতিরোধে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন, কৃষি ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো, গার্মেন্টস শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি বাস্তবায়ন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত, বিভাগীয় সদরে উচ্চ আদালতের বেঞ্চ স্থাপনের বিষয়টি যুক্ত করা হয়েছে।

জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গত ১৩ অক্টোবর জাতীয় প্রেস ক্লাবে আত্মপ্রকাশ করে আনুষ্ঠানিকভাবে। ১০ নভেম্বর গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে নির্বাচনে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয় ঐক্যফ্রন্ট।

সংশ্লিষ্ট খবর

পরের
খবর

যুদ্ধাপরাধীদের সন্তানরাও ভোটের লড়াইয়ে


আরও খবর

বাংলাদেশ
যুদ্ধাপরাধীদের সন্তানরাও ভোটের লড়াইয়ে

প্রকাশ : ১২ ডিসেম্বর ২০১৮ | প্রিন্ট সংস্করণ

  ওয়াকিল আহমেদ হিরন

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলার আসামি, যুদ্ধাপরাধে দণ্ডিত অপরাধী এবং স্বাধীনতাবিরোধীদের সন্তানরাও মনোনয়ন পেয়েছেন কয়েকটি দল থেকে। এরই মধ্যে তাদের মনোনয়নপত্র বৈধ বলে ঘোষণাও করেছেন সংশ্নিষ্ট রিটার্নিং কর্মকর্তারা। মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী হিসেবে পরিচিত তিনজনকে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট থেকে এবং একজনকে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া মনোনয়ন পেয়েছেন দণ্ডিত দুই যুদ্ধাপরাধীর ছেলে এবং একজন অভিযুক্তের ছেলে। মনোনয়নপ্রাপ্ত স্বাধীনতার বিরোধিতাকারীদের মধ্যে রয়েছেন বিএনপির আবদুল মোমিন তালুকদার খোকার ভাই আবদুল মোহিত তালুকদার (বগুড়া-৩ দুপচাঁচিয়া-আদমদীঘি)। প্রথমে মোমিন তালুকদারকে মনোনয়ন দেওয়া হলেও পরে তার ভাইকে দেওয়া হয়। এ ছাড়া মনোনয়ন পেয়েছেন নূরুল ইসলাম আনছার প্রামাণিক (কুষ্টিয়া-৪ কুমারখালী-খোকসা) এবং জামায়াতে ইসলামী নেতা মাওলানা ফরিদউদ্দিন চৌধুরী (সিলেট-৫ কানাইঘাট-জকিগঞ্জ)। আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন পেয়েছেন অ্যাডভোকেট মোসলেমউদ্দিন (ময়মনসিংহ-৬ ফুলবাড়িয়া)।

মনোনয়ন বৈধ দণ্ডিত যুদ্ধাপরাধীদের সন্তানদের :এদিকে, দণ্ডিত তিন যুদ্ধাপরাধীর দুই ছেলে নির্বাচন করছেন ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে এবং একজন যুদ্ধাপরাধীর ছেলে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন। আমৃত্যু কারাদণ্ডে দণ্ডিত যুদ্ধাপরাধী দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ছেলে শামীম বিন সাঈদী জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী হয়েছেন পিরোজপুর-১ (সদর-নাজিরপুর-স্বরূপকাঠি) আসন থেকে। তার বাড়ি পিরোজপুর-২ নির্বাচনী এলাকার ইন্দুরকানী উপজেলায়। একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ফাঁসির দণ্ডাদেশপ্রাপ্ত মতিউর রহমান নিজামীর ছেলে ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান মোমেন পাবনা-১ (সাঁথিয়া-বেড়া) আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন। তিনি আসন্ন নির্বাচনে আপেল প্রতীকে নির্বাচন করবেন।

মনোনয়ন পেয়েছেন জয়পুরহাট-১ আসন থেকে সাবেক মন্ত্রী বিএনপি নেতা যুদ্ধাপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ডাদেশপ্রাপ্ত প্রয়াত আবদুল আলীমের ছেলে ফয়সাল আলীম। মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধে অভিযুক্ত রাজাকার প্রয়াত খলিলুর রহমানের ছেলে আওয়ামী লীগের শওকত হাচানুর রহমান রিমনকে আবারও মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে বরগুনা-২ (পাথরঘাটা-বামনা-বেতাগী) আসন থেকে। রিমন নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করবেন।

তাদের সবার মনোনয়নপত্রই রোববার বৈধ ঘোষণা করেছেন নিজ নিজ এলাকার রিটার্নিং কর্মকর্তারা।

বিশিষ্টজনের ক্ষোভ :যুদ্ধাপরাধী ও স্বাধীনতাবিরোধীদের সন্তানদের মনোনয়ন দেওয়ায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বিশিষ্টজন। তারা বলেছেন, এটা স্ববিরোধিতা। একাধিক সংগঠন নির্বাচনে স্বাধীনতাবিরোধী ও তাদের সন্তানদের মনোনয়ন না দিতে দীর্ঘদিন ধরে নানা প্রচার চালিয়ে আসছে।

সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ সমকালকে বলেন, প্রত্যেক রাজনৈতিক দলের উচিত ছিল চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধী ও তাদের সন্তানদের বাদ দিয়ে মনোনয়ন দেওয়া। কিন্তু যেহেতু দলগুলো সেটা করেনি, এখন নিজ নিজ এলাকার ভোটারই সিদ্ধান্ত নেবেন- তারা যুদ্ধাপরাধী বা তাদের সন্তানকে ভোট দেবেন কি-না।

এ প্রসঙ্গে একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবির সমকালকে বলেন, যুদ্ধাপরাধী ও তাদের সন্তানদের মনোনয়ন দেওয়া খুবই দুর্ভাগ্যজনক। এদের বর্জন করতে হবে এবং আসন্ন নির্বাচনে ওই সব এলাকায় যুদ্ধাপরাধীদের ভোট না দেওয়ার জন্য ভোটারদের প্রতি আহ্বান জানানো হবে। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছে। ক্ষমতায় এসে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করেছে। অথচ সেই দল থেকেও যুদ্ধাপরাধীদের মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি অনাকাঙ্ক্ষিত। যুদ্ধাপরাধী পিতার অপরাধের জন্য যতক্ষণ না তাদের সন্তানরা ক্ষমা চাইবে, ততক্ষণ তাদের বর্জন করতে হবে। রাজাকারমুক্ত সংসদ গড়তে নির্বাচন কমিশনেরও (ইসি) দায়িত্ব রয়েছে বলে জানান তিনি।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর জেয়াদ আল মালুম সমকালকে বলেন, বিজয়ের মাসে একাদশ সংসদ নির্বাচনে দুটি রাজনৈতিক দল থেকে যুদ্ধাপরাধী ও তাদের সন্তানদের মনোনয়ন দেওয়ায় শহীদ পরিবার ও বিচারপ্রার্থীরা হতবিহ্বল ও আতঙ্কগ্রস্ত। এটা মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে স্ববিরোধিতা।

গত ২৯ নভেম্বর বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, কোনো যুদ্ধাপরাধীকে ধানের শীষ প্রতীক দেওয়া হবে না। তবে ২ ডিসেম্বর নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান জানান, বিএনপি সারাদেশে ২৫ জনের মতো যুদ্ধাপরাধীর সন্তানদের মনোনয়ন দিয়েছে। গত রোববার মাদারীপুর জেলা রিটার্নিং কার্যালয়ে মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই শেষে সাংবাদিকদের তিনি এসব কথা বলেন।

এ প্রসঙ্গে শাহরিয়ার কবির বলেন, নির্বাচনের কয়েক মাস আগেই সভা-সেমিনার করে সব রাজনৈতিক দলকে আহ্বান করা হয়েছে, তারা যেন যুদ্ধাপরাধী ও তাদের সন্তানদের মনোনয়ন না দেয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয়, বিএনপি ও জামায়াত অনেক চিহ্নিত রাজাকারকে নমিনেশন দিয়েছে।

তৃতীয়বারের মতো প্রার্থী রিমন :'কুখ্যাত রাজাকার' হিসেবে চিহ্নিত প্রয়াত খলিলুর রহমানের ছেলে শওকত হাচানুর রহমান রিমন বরগুনা-২ (পাথরঘাটা-বামনা ও বেতাগী) আসন থেকে তৃতীয়বারের মতো আওয়ামী লীগের প্রার্থী হয়েছেন। বর্তমানে তিনি এ আসনের এমপি। এর আগে তিনি উপজেলা চেয়ারম্যান ছিলেন। তাবলিগে যুক্ত শওকত হাচানুর রহমান রিমন নিজেকে 'রাজাকারের ছেলে' হিসেবে পরিচয় দিতে বিব্রতবোধ করেন না। এলাকার কয়েকজন জানান, আওয়ামী লীগ থেকে 'যোগ্য ও ভালো প্রার্থী না থাকায়' তাকেই বারবার মনোনয়ন দেওয়া হচ্ছে।

মুক্তিযুদ্ধের সময় পাথরঘাটার রায়হানপুর গ্রামের বাসিন্দা খলিলুর রহমান বরগুনা মহকুমার পিস কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন। যুদ্ধাপরাধের বিভিন্ন অভিযোগে অভিযুক্ত খলিল রাজাকার স্বাধীনতার পর একপর্যায়ে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানও হন। আশির দশকের শেষ দিকে মারা যান তিনি। গত ২৩ নভেম্বর রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে মুক্তিযোদ্ধা মনি মণ্ডল বরগুনা-২ আসন থেকে শওকত হাচানুর রহমান রিমনকে মনোনয়ন না দেওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি দাবি জানান।

মোসলেমউদ্দিনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আইসিটিতে :ময়মনসিংহ-৬ (ফুলবাড়িয়া) আসনে অ্যাডভোকেট মোসলেমউদ্দিনকে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। রোববার জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা তার মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করেন। তার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে যুদ্ধাপরাধের বিভিন্ন অভিযোগ দাখিল করা হলেও নানা কারণে এখনও তদন্ত শুরু করা যায়নি বলে সমকালকে জানিয়েছেন তদন্ত সংস্থার প্রধান সমন্বয়ক আবদুল হাননান খান।

বর্তমান এমপি মোসলেমউদ্দিন এর আগেও পাঁচবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি ময়মনসিংহে রাজাকার ও শান্তি কমিটির সদস্য ছিলেন। ২০১২ সালের ৪ এপ্রিল আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ওয়ার ক্রাইম ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটির আহ্বায়ক ডা. এম এ হাসানের দেওয়া যুদ্ধাপরাধীদের তালিকায় মোসলেমউদ্দিনের নাম রয়েছে। ২০১২ সালের ৬ এপ্রিল ফুলবাড়িয়া উপজেলা আওয়ামী লীগ নেতা জোড়াবাড়িয়া গ্রামের বাসিন্দা ওয়াহেদ আলী ম লের ছেলে মুক্তিযোদ্ধা জালাল উদ্দিন বাদী হয়ে তার বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে ময়মনসিংহের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা করেন।

আনছারের বিরুদ্ধে অভিযোগ :কুষ্টিয়া-৪ আসনে বিএনপির প্রার্থী নূরুল ইসলাম আনছার প্রামাণিকের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা হয় ২০০৯ সালের ১০ জুন। খোকসা থানায় করা এ মামলা ২০১৫ সালের শেষে ঢাকায় আইসিটিতে স্থানান্তর করা হয়। এ মামলায় আনছার চার নম্বর আসামি। তার মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করেছেন জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা।

২০০৯ ও ২০১০ সালে কুষ্টিয়ায় একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির পক্ষ থেকে প্রণীত রাজাকারের তালিকায়ও আনছারের নাম রয়েছে। তবে নিজেকে 'আওয়ামী পরিবারের সন্তান' দাবি করার পাশাপাশি এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বিএনপি নেতা আনছার।

এলাকার মুক্তিযোদ্ধারা জানিয়েছেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় আনছার প্রামাণিক কুমারখালী উপজেলায় রাজাকার বাহিনী গঠন করেন। তারা সে সময় কুমারখালী বাজারে কালীদাস, কালাদত্ত ও চিত্তশার দোকান লুট করেন। লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করেন যদুবয়রা গোবিন্দপুর গ্রামে গৌড় ঠাকুরের বাড়িতে। হেলালপুর গ্রামে দুই ভাই বীরেন্দ্রনাথ ও ধীরেন্দ্রনাথকে গুলি করে হত্যা করা হয়। তাদের ছোট ভাই হরেন্দ্রনাথ আইসিটিতে একটি মামলা করেন, যা বর্তমানে তদন্তাধীন।

মোমিনের বিরুদ্ধে অভিযোগ :যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত বিএনপি নেতা সাবেক এমপি আবদুল মোমিন তালুকদার খোকা পলাতক। তার পক্ষে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন তার মেয়ে নাছিমা আক্তার লাকি।

আদমদীঘি উপজেলার কায়েতপাড়া গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা মুহাম্মদ সুবেদ আলী ২০১১ সালের মার্চে বগুড়ায় আবদুল মোমিন তালুকদার খোকার বিরুদ্ধে মামলা করেন। পরে তা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে পাঠানো হয়। মামলায় বলা হয়, ১৯৭১ সালের ২৪ নভেম্বর আদমদীঘি বাজারের পশ্চিমে খারির ব্রিজের উত্তর শ্মশানঘাটে আবদুল মোমিন তালুকদার গুলি করে মনসুরুল হক তালুকদার টুলু, আবদুস ছাত্তার, আবদুল জলিল, আলতাফ হোসেনসহ ১৫ মুক্তিযোদ্ধাকে হত্যা করেন। মোমিনের বাবা মৃত আবদুল মজিদ তালুকদার মুক্তিযুদ্ধের সময় স্থানীয় শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন। বাবা-ছেলে দু'জনই সে সময় পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে সহযোগিতা করেন বলে মামলায় অভিযোগ করা হয়।

২০১৭ সালের ১৮ মে মোমিন তালুকদার খোকার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর নজরে থাকার পরও তাকে পলাতক দেখানো হয়েছে দাবি করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর সুলতান মাহমুদ শিমন সমকালকে বলেন, সংশ্নিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। তিনি জানান, মোমিন তালুকদার মুক্তিযুদ্ধের সময় রাজাকারদের আদমদীঘি থানা কমান্ডার ছিলেন। তার বিরুদ্ধে সে সময় হত্যা, নির্যাতন ও লুণ্ঠন চালানোর অভিযোগ পাওয়া গেছে। তার বিরুদ্ধে দাখিল করা অভিযোগ গ্রহণ করেছেন ট্রাইব্যুনাল।

মোমিন তালুকদার বগুড়া-৩ আসন থেকে দু'বার এমপি নির্বাচিত হন। ২০০১ সালে এমপি নির্বাচিত হওয়ার পর বন ও পরিবেশবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি হন তিনি। বর্তমানে তিনি বিএনপির কেন্দ্রীয় সহসাংগঠনিক সম্পাদক।

আদমদীঘি থানার কায়েতপাড়া গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা মুহাম্মদ সুবেদ আলী ২০১১ সালের মার্চে বগুড়ার আদালতে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে বিএনপি নেতা মোমিনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। আইসিটিতে অভিযোগ জমা হওয়ার পর তদন্ত শুরু করে তদন্ত সংস্থা।

মাওলানা ফরিদউদ্দিন চৌধুরী :সিলেট-৫ (কানাইঘাট-জকিগঞ্জ) আসনে ফের প্রার্থী হয়েছেন জামায়াত নেতা মাওলানা ফরিদউদ্দিন চৌধুরী। তিনি এবার বিএনপির নেতৃত্বে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট থেকে ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করবেন। ২০১০ সালে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের উদ্যোগ নেওয়ার পর ফরিদউদ্দিন আলোচনায় আসেন। সরকার প্রণীত শীর্ষ যুদ্ধাপরাধীদের তালিকায় ফরিদউদ্দিনের নাম ছিল ২৪ নম্বরে। এলাকাবাসী জানান, মুক্তিযুদ্ধের সময় ফরিদউদ্দিন আলবদর বাহিনীর কমান্ডার ছিলেন। সিলেট শহরতলি খাদিমনগরের আলবদর বাহিনীর ৩১ পাঞ্জাব হেডকোয়ার্টারে কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করেন তিনি।