বাংলাদেশ

দুই জোটে আসন ভাগাভাগি

শরিকদের আসন কমাচ্ছে আওয়ামী লীগ

নির্বাচন ২০১৮

প্রকাশ : ০৬ ডিসেম্বর ২০১৮ | প্রিন্ট সংস্করণ

শরিকদের আসন কমাচ্ছে আওয়ামী লীগ

  অমরেশ রায় ও রাজীব আহাম্মদ

আওয়ামী লীগ শুরুতে বলেছিল, মহাজোটের শরিকদের জন্য ৬৫ থেকে ৭০টি আসন ছাড়বে। কিন্তু জয়ী হওয়ার মতো প্রার্থী না পাওয়ায় শরিকদের ৫০ থেকে ৫৫টির বেশি আসন ছাড়তে এখন আর রাজি নয় আওয়ামী লীগ।

ক্ষমতাসীন দল বলছে, সব দল অংশ নেওয়ায় এবারের নির্বাচন হবে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ। ফলে শরিকদের অপেক্ষাকৃত দুর্বল প্রার্থীকে মহাজোটের মনোনয়ন দিয়ে আসন হারাতে চায় না আওয়ামী লীগ। দলটির নেতারা জানিয়েছেন, আপিল শুনানির ফয়সালার মধ্য দিয়ে ৮ ডিসেম্বর প্রার্থী তালিকা চূড়ান্ত হওয়ার পর মহাজোটের প্রার্থী নির্ধারণ করা হবে।

দশম সংসদ নির্বাচনে মহাজোটের শরিকরা ৪৯ আসনে জয়ী হয়। পরে তাদের আসন সংখ্যা হয় ৫১। এর মধ্যে এবার ২০টিতেই প্রার্থী দিয়েছে আওয়ামী লীগ। মহাজোট শরিক জাতীয় পার্টির জন্য ২৫, ওয়ার্কার্স পার্টির জন্য ৪, জাসদের জন্য ৩, জেপি ও তরীকতের জন্য একটি করে আসন ফাঁকা রেখে সেখানে প্রার্থী দেয়নি আওয়ামী লীগ।

মহাজোটের নতুন শরিক বিকল্পধারার জন্য ফাঁকা রাখা হয়েছে দুটি আসন। সব মিলিয়ে ৩৬টি আসনে প্রার্থী দেয়নি আওয়ামী লীগ।

২০০৮ সালে সব দলের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত নবম সংসদ নির্বাচনে শরিকদের জন্য ৩৬টি আসন ছেড়েছিল আওয়ামী লীগ। জাতীয় পার্টিকে ২৯টি, ওয়ার্কার্স পার্টিকে চারটি ও জাসদকে তিনটি আসন ছেড়েছিল তারা।

২০১৪ সালে বিএনপিবিহীন নির্বাচনে শরিকদের আসন ছাড়ার ক্ষেত্রে উদার মনোভাব ছিল তাদের। ৬০টি আসন ছেড়ে দেওয়া হয় শরিকদের। এবার তা হচ্ছে না। মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের সময় পার হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে আওয়ামী লীগ। মনোনয়নপত্র বাতিল হওয়া মহাজোটের প্রার্থীদের আপিল প্রক্রিয়ার ওপরও নজর রাখছে।

আওয়ামী লীগ শরিকরাও রয়েছে দুশ্চিন্তায়। যেসব আসনে গত নির্বাচনে তারা জয়ী হয়েছিল, সেখানেও প্রার্থী দিয়েছে আওয়ামী লীগ। যেগুলোতে ছাড় দিয়েছে, সেখানে রয়েছে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী। আওয়ামী লীগ অবশ্য শরিকদের ছাড় দেওয়া আসনে প্রার্থী প্রত্যাহার এবং বিদ্রোহী প্রার্থীদের বসিয়ে দেওয়া হবে বলে কথা দিয়েছে।

আওয়ামী লীগ ও মহাজোটের আসন সমঝোতার সঙ্গে সংশ্নিষ্ট নেতাদের সূত্রে জানা গেছে, ২৮ নভেম্বর মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সময়সীমা পার হওয়ার আগেই আসন বণ্টন প্রক্রিয়া শেষ করার সিদ্ধান্ত ছিল। পরে সিদ্ধান্ত বদল হয়। তা হওয়ায় বাছাইয়ের পরপরই প্রার্থী তালিকা চূড়ান্ত করার সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু আওয়ামী লীগ ও শরিকদের কয়েকজন প্রার্থী বাছাইয়ে বাদ পড়ায় নতুন পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটেছে। আপিল প্রক্রিয়া শেষে প্রার্থিতা চূড়ান্ত হওয়ার পরই আসন বণ্টন সুরাহা করতে চায় আওয়ামী লীগ।

অন্যদিকে, নানা হুঁশিয়ারি সত্ত্বেও আওয়ামী লীগ থেকে 'বিদ্রোহী প্রার্থী' হওয়ার প্রবণতা এবারও কমানো যায়নি। দেশের প্রায় ৭৩টি আসনে কমপক্ষে ৯৫ জন মনোনয়নবঞ্চিত আওয়ামী লীগ নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থিতার আড়ালে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন। যদিও ২ ডিসেম্বর যাচাই-বাছাইকালে প্রায় ৫০ জনের মতো বিদ্রোহী প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল হয়েছে। এরপরও অনেক আসনে শক্তিশালী বিদ্রোহ প্রার্থী রয়ে গেছেন। আওয়ামী লীগের নির্বাচন পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা পাঁচ শীর্ষ নেতা তাদের ঢাকায় ডেকে এনে অথবা টেলিফোনে কথা বলে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারে সম্মত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

মহাজোটের দ্বিতীয় বৃহত্তম দল জাতীয় পার্টি (জাপা)। হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের নেতৃত্বাধীন দলটিকে এখন পর্যন্ত ২৫ আসন ছেড়েছে আওয়ামী লীগ। জাপার দখলে থাকা ৩৬ আসনের ১৪টিতেই প্রার্থী দিয়েছে আওয়ামী লীগ। জাপা চায় অন্তত ৪৭ আসন। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে দলটিকে ৪৮ আসন ছেড়েছিল আওয়ামী লীগ। ২০০৮ সালে নির্বাচনে ছেড়েছিল ২৯ আসন। বিএনপিবিহীন নির্বাচনে 'ঝুঁকি' নিয়ে অংশ নেওয়ার 'পুরস্কার' হিসেবে ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে পাওয়া আসনগুলো আবারও চায় জাপা।

জাপার নয় নেতা আসন বণ্টনে দরকষাকষির দায়িত্বে রয়েছেন। তারা গত দু'দফা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে আসন বণ্টন নিয়ে আলোচনা করেছেন। তারা জানিয়েছেন, জাপাকে এবার ৩০ থেকে ৩২টির বেশি আসন দিতে রাজি হচ্ছে না আওয়ামী লীগ।

জাপাকে ছাড়া আসনগুলো হলো- নীলফামারী-৩, নীলফামারী-৪, লালমনিরহাট-৩, রংপুর-১, রংপুর-৩, কুড়িগ্রাম-২, গাইবান্ধা-১, বগুড়া-২, বগুড়া-৩, বগুড়া-৬, বগুড়া-৭, বরিশাল-৬, পিরোজপুর-৩, ময়মনসিংহ-৪, ময়মনসিংহ-৮, কিশোরগঞ্জ-৩, ঢাকা-৪, ঢাকা-৬, নারায়ণগঞ্জ-৫, সুনামগঞ্জ-৪, সিলেট-২, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২, ফেনী-৩, লক্ষ্মীপুর-২ ও চট্টগ্রাম-৫। এর মধ্যে ২২টি আসনে জাপার দলীয় এমপি রয়েছেন।

জাপার এমপি নেই এমন তিনটি আসনও ছেড়েছে আওয়ামী লীগ। এগুলো হলো নীলফামারী-৩, লালমনিরহাট-৩ ও ফেনী-৩ আসন। এই ২৫ আসনের বেশিরভাগকে বিএনপি অধ্যুষিত বলছেন জাপার নেতারা।

জাপার দখলে থাকা ১৪টি আসনে প্রার্থী দিয়েছে আওয়ামী লীগ। আসনগুলো হলো- কুড়িগ্রাম-১, কুড়িগ্রাম-৩, পটুয়াখালী-১, জামালপুর-৪, ময়মনসিংহ-৫, ময়মনসিংহ-৭, ঢাকা-১, নারায়ণগঞ্জ-৩, সিলেট-৫, হবিগঞ্জ-১, কুমিল্লা-২, কুমিল্লা-৮, চট্টগ্রাম-৯ ও কক্সবাজার-১। এ আসনগুলোর মধ্যে শুধু কুড়িগ্রাম-১, কুড়িগ্রাম-৩ আসনে মহাজোটের মনোনয়নের আশ্বাস পেয়েছে জাপা। এরশাদের জন্য ঢাকা-১৭ আসনে মহাজোটের মনোনয়নের নিশ্চয়তা মিলেছে।

বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদ ময়মনসিংহ-৪ ও ৭ আসনে প্রার্থী। তার সমর্থনে ময়মনসিংহ-৪ আসনে প্রার্থী দেয়নি আওয়ামী লীগ। রওশনের জন্য ময়মনসিংহ-৭ আসনটি আদায়ের চেষ্টা করলেও নিশ্চয়তা পায়নি জাপা। দলটির সদ্য সাবেক মহাসচিব এ বি এম রুহুল আমিন হাওলাদার পটুয়াখালী-১ আসনে প্রার্থী হয়েছিলেন। তার মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে। আপিলে যদি প্রার্থিতা ফিরেও পান, তবুও তার মনোনয়ন নিশ্চিত নয়।

বরিশাল-২ আসনে জাপার প্রার্থী চিত্রনায়ক সোহেল রানার মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে। তিনি আপিল করেছেন। প্রার্থিতা ফিরে পেল তিনি মহাজোটের মনোনয়ন পেতে পারেন। এই ৩১ আসন ছাড়াও রংপুর-২ ও রংপুর-৪ আসনে মহাজোটের মনোনয়ন নিশ্চিত করার চেষ্টা চালাচ্ছে জাপা।

জাপার নবনিযুক্ত মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গাঁ গত সোমবার বলেছিলেন, কয়টি আসনে মহাজোটের মনোনয়ন পওায়া যাবে, তা দু-একদিনের মধ্যে জানা যাবে। তিনি গতকাল বুধবার সমকালকে একই কথা বলেন। তিনি বলেন, আলোচনা চলছে। তারা আশা করছেন, ৫৪ থেকে ৫৫টি আসন পাওয়া যাবে।

১৪ দল শরিক ওয়ার্কার্স পার্টি, জাসদের দুই অংশ, জেপি ও তরীকতের দখলে রয়েছে ১৫টি আসন। তবে এ পাঁচটি দল এখন পর্যন্ত নয়টি আসনের নিশ্চয়তা পেয়েছে। ওয়ার্কার্স পার্টি চারটি, জাসদ তিনটি, বাংলাদেশ জাসদ দুটি, তরীকত ও জেপি একটি আসনে ছাড় পেয়েছে। তাদের দখলে থাকা ছয়টি আসনে প্রার্থী দিয়েছে আওয়ামী লীগ। তবে কুড়িগ্রাম-৪ আসনে আওয়ামী লীগ প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল হওয়ায় সেখানকার জেপির এমপির মহাজোটের মনোনয়ন পাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।

ওয়ার্কার্স পার্টি থেকে দলীয় সভাপতি রাশেদ খান মেননের ঢাকা-৮, সাধারণ সম্পাদক ফজলে হোসেন বাদশার রাজশাহী-২, ইয়াসিন আলীর ঠাকুরগাঁও-৩ ও টিপু সুলতানের বরিশাল-৩ আসনে মহাজোটের মনোনয়ন নিশ্চিত হয়েছে। এসব আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী নেই। গত নির্বাচনে দলটির জয়ী হওয়া সাতক্ষীরা-১ ও নড়াইল-২ আসনে প্রার্থী দিয়েছে আওয়ামী লীগ।

জাসদ গত নির্বাচনে জিতেছিল পাঁচটি আসনে। জাসদের হাসানুল হক ইনুর নেতৃত্বাধীন অংশে এমপি তিনজন। তাদের সবারই মহাজোটের মনোনয়ন নিশ্চিত। হাসানুল হক ইনুর কুষ্টিয়া-২, সাধারণ সম্পাদক শিরীন আখতারের ফেনী-১ এবং স্থায়ী কমিটির সদস্য এ কে এম রেজাউল করিম তানসেনের বগুড়া-৪ আসনে ছাড় পেয়েছে দলটি।

জাসদ ভেঙে গঠিত বাংলাদেশ জাসদের বর্তমান দুই এমপির মধ্যে দলের কার্যকরী সভাপতি মইনউদ্দীন খান বাদলের চট্টগ্রাম-৮ আসনের আশ্বাস দেওয়া হলেও সেখানে প্রার্থী দিয়েছে আওয়ামী লীগ। দলটির সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হক প্রধানের পঞ্চগড়-১ আসনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী দিয়েছে। নাজমুল হক প্রধান সেখানে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন। এ ছাড়া শরিফ নূরুল আম্বিয়াকে নড়াইল-১ আসনটি ছেড়ে দেওয়া হলেও আওয়ামী লীগ থেকে প্রার্থী দেওয়া হয়েছে।

গত নির্বাচনে জেপি ও তরীকত ফেডারেশন দুটি করে আসন পেয়েছিল। এবার পিরোজপুর-২ আসনে জেপি চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর মনোনয়ন নিশ্চিত। চট্টগ্রাম-২ আসনে মনোনয়ন নিশ্চিত তরীকতের চেয়ারম্যান নজিবুল বশর মাইজভাণ্ডারীর। লক্ষ্মীপুর-১ আসনের এমপি এম আউয়াল এবার তরীকতের মনোনয়ন পাননি, স্বতন্ত্র প্রার্থী হলেও বাছাইয়ে মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে। আওয়ামী লীগ থেকে তরীকতে যোগ দিয়ে আনোয়ার খান মনোনয়ন পেয়েছেন। এ আসনেও আওয়ামী লীগের প্রার্থী রয়েছে।

বিকল্পধারার জন্য মুন্সীগঞ্জ-১ ও মৌলভীবাজার-২ আসন ফাঁকা রাখা হয়েছে। মুন্সীগঞ্জে প্রার্থী মাহী বি. চৌধুরী, মৌলভীবাজারে বিএনপি ছেড়ে আসা এম এম শাহীন। লক্ষ্মীপুর-৪ আসনে প্রার্থী বিকল্পধারার মহাসচিব মেজর (অব.) আবদুল মান্নান। এ আসনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী দিলেও আবদুল মান্নানের মনোনয়ন নিশ্চিত বলে জানিয়েছে সূত্র।

আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, ৯ ডিসেম্বর মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিনের আগেই আসন বণ্টন প্রক্রিয়া শেষ করা হবে। কয়েকটি আসনে মহাজোটের শরিক এবং আওয়ামী লীগ উভয়ের প্রার্থী থাকা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিনের পর কোথাও এ ধরনের প্রার্থী থাকলে আওয়ামী লীগ থেকে তাদের বহিস্কার করা হবে।

সংশ্লিষ্ট খবর


মন্তব্য যোগ করুণ

পরের
খবর

বিনম্র শ্রদ্ধায় স্মরণ ভাষাশহীদদের


আরও খবর

বাংলাদেশ

শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে বৃহস্পতিবার ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে সর্বস্তরের মানুষ— সমকাল

  সমকাল প্রতিবেদক

ভোর হতেই দেশের সব রাজপথ যেন মিশে যায় শহীদ মিনারে। মায়ের ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে জয়ী বীর বাঙালি জাতি আবারও বিনম্র শ্রদ্ধায় স্মরণ করে তার গর্বিত পূর্বসূরিদের।

দেশের উন্নয়ন ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা আর সমাজে শান্তির সুবাতাস বইয়ে দেওয়ার অঙ্গীকারে বৃহস্পতিবার সারাদেশে পালিত হলো মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস।

রাজধানী থেকে শুরু করে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের শহীদ মিনারের বেদিগুলোও এদিন ভরে ওঠে ফুলেল শ্রদ্ধায়। ফাল্গুন ভোরের হিম হাওয়ায় নগ্ন পদে সবাই ছুটে যান শহীদ মিনারে। দুপুর অবধি রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ছিল লাখো মানুষের ঢল। মা, মাটি, দেশ আর মাতৃভাষার প্রতি বাঙালির অপরিসীম মমত্ববোধের চিরায়ত প্রকাশ ঘটে এদিন। ভাষার জন্য আত্মোৎসর্গকারী শহীদদের প্রতি শিশু-কিশোর, বৃদ্ধ, যুবা, তরুণ-তরুণী, পাহাড়ি, বাঙালি, ভিনদেশি, ধর্ম-বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে সবাই সারিবদ্ধভাবে শহীদ বেদিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। এ সময় সবার কণ্ঠে ছিল অমর একুশের কালজয়ী সেই গান 'আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি...।'

ভাষা শহীদদের প্রতি বৃহস্পতিবার ফুলেল শ্রদ্ধা জানায় সর্বস্তরের মানুষ— সমকাল

বুধবার মধ্যরাতে ঘড়ির কাঁটা ১২টা ছোঁয়ার আগেই বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতাকর্মীদের সারি দেখা যায় শহীদ মিনারে। রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রীসহ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের শ্রদ্ধা নিবেদনের পর্ব শেষ হলে শহীদ মিনার সবার জন্য খুলে দেওয়া হয়। তবে শ্রদ্ধার্ঘ্য অপর্ণের জন্য বৃহস্পতিবার সকালে নামে মানুষের ঢল। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা জানাতে আসা সর্বস্তরের মানুষের সারি আরও দীর্ঘ হয়। এই দিনে বাঙালির শোককে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে বুধবার রাতের চকবাজারের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড। আগুনে পোড়া শতাধিক হতাহতের স্বজনের দুঃখ-বেদনা যেন সালাম-বরকতদের শোকে লীন হয়ে তৈরি করে মর্মন্তুদ এলিজি। চকবাজারের আগুনে স্বজনহারাদের হাহাকার ঢাকা মেডিকেল কলেজের করিডোর আর মর্গ পেরিয়ে এসে মেশে শহীদ মিনারের অর্ধনমিত জাতীয় পতাকায়, প্রভাতফেরির কালো পোশাকে।

একুশের প্রথম প্রহরে কেন্দ্র্রীয় শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে ভাষাশহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। রাত ১২টা ১ মিনিটে প্রথমে রাষ্ট্রপতি পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। এরপরই শ্রদ্ধা জানান প্রধানমন্ত্রী। এরপর স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। পরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দলীয় প্রধান হিসেবে আওয়ামী লীগের মন্ত্রিপরিষদের সদস্য ও দলের শীর্ষ নেতাদের নিয়ে শহীদ বেদিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। এরপর একে একে শ্রদ্ধা জানান ডেপুটি স্পিকার ফজলে রাব্বী মিয়া, বিরোধীদলীয় উপনেতা জিএম কাদের, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র সাঈদ খোকন ও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন প্যানেল মেয়র মোস্তফা কামাল। সহকর্মীদের নিয়ে ভাষাশহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আখতারুজ্জামান। শ্রদ্ধা জানান ঢাকার বিভিন্ন মিশনের কূটনীতিক, একাত্তরের সেক্টর কমান্ডার এবং মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিলের নেতারা। শহীদ বেদিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন সৈনিক, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি, সেনা, নৌ, বিমানবাহিনী, পুলিশ, র‌্যাবসহ বিভিন্ন সংগঠন। বিশিষ্টজনের শ্রদ্ধা জানানোর পর সবার জন্য উন্মুক্ত হয় শহীদ মিনার।

সভাপতি এ. কে. আজাদের নেতৃত্বে একুশের প্রথম প্রহরে শহীদ বেদিতে শ্রদ্ধা জানায় ঢাকা ইউনিভার্সিটি অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন— সমকাল

বিশিষ্টজনের প্রতিক্রিয়া: বৃহস্পতিবার সকাল ৮টায় শহীদ মিনারে ফুল দেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ, নৌ প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী প্রমুখ। শ্রদ্ধা নিবেদনের পর ওবায়দুল কাদের সাংবাদিকদের বলেন, বিশ্বের ৩৩ কোটি বাংলা ভাষাভাষী মানুষের মাতৃভাষা বাংলা। ভাষার দিক দিয়ে এর অবস্থান সপ্তম। তাই বাংলাকে জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষার দাবি গোটা জাতির। এ বিষয়ে সরকার কাজ করছে।

তথ্যমন্ত্রী হাছান মাহমুদ বলেন, ভাষাশহীদরা জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান। তাদের অবদানে আজ বাংলা ভাষা বিশ্ব দরবারে স্বীকৃতি পেয়েছে। ভাষা আন্দোলনের পথ ধরেই এসেছে স্বাধীনতা।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নেতৃত্বে দলটির নেতাকর্মীরা বৃহস্পতিবার সকাল ১০টায় ভাষাশহীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। পুষ্পস্তবক অর্পণের পর তিনি সাংবাদিকদের বলেন, গণতন্ত্র হরণ করে সরকার একুশের চেতনাকে ভূলণ্ঠিত করেছে। এ সময় তিনি দলীয় চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াসহ বিরোধী নেতাকর্মীদের মুক্তির দাবি জানান।

বিভিন্ন সংগঠনের শ্রদ্ধা নিবেদন: সভাপতি এ. কে. আজাদের নেতৃত্বে একুশের প্রথম প্রহরে শহীদ বেদিতে শ্রদ্ধা জানায় ঢাকা ইউনিভার্সিটি অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন। প্রথম প্রহরে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে শ্রদ্ধা জানায় জাসদের দুই অংশ, ওয়ার্কার্স পার্টি, সিপিবি, সাম্যবাদী দল, বাসদ, গণতন্ত্রী পার্টি, ন্যাপসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল। ছাত্র সংগঠনগুলোর মধ্যে শ্রদ্ধা জানায় ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্রমৈত্রী, সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট। ভোরে নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশন (ইসি) কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানায়। এ সময় নির্বাচন কমিশনার কবিতা খানম, ইসি সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানায় সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ— সমকাল

আরও শ্রদ্ধা জানায় বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট), জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, ইডেন মহিলা কলেজ, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকার সরকারি মাদ্রাসা-ই-আলিয়া, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক), বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজ, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র, বাংলাদেশ সরকারের আইসিটি ডিভিশন, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি), রেলপথ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ রেলওয়ে, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ, রাজউক ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স সমিতি ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ), ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি, জাতীয় প্রেস ক্লাব, সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক ফ্রন্ট, সামাজিক মহিলা ফোরাম, রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি, শিল্পকলা একাডেমি, উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী, কেন্দ্রীয় খেলাঘর আসর, বাংলা একাডেমি, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট, মহিলা পরিষদ, ছাত্রদল, শ্রমিক দল, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, যুবলীগ, ইনস্টিটিউশন অব ইঞ্জিনিয়ার্স (আইবি), ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স (আইডিবি), বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় গার্হস্থ্য নারী শ্রমিক ইউনিয়নস, ঢাকা নার্স কলেজ, বাংলাদেশ এনজিও ফেডারেশনসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠন। শহীদ মিনারের পাশাপাশি আজিমপুর কবরস্থানে ভাষাশহীদদের কবরেও শ্রদ্ধা জানায় আওয়ামী লীগ, বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন।

সংশ্লিষ্ট খবর

পরের
খবর

সরকারি প্রাথমিকের শিক্ষকদের সমন্বয় বদলির নির্দেশ


আরও খবর

বাংলাদেশ

  সমকাল প্রতিবেদক

পুরনো সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পড়াশোনার মান নতুন সরকারি হওয়া বিদ্যালয়গুলোর চেয়ে ভালো। এমন ধারণা প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের। নতুন সরকারি হওয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা আগের বেসরকারি রেজিস্টার্ড প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন। সে সময় নানাভাবে প্রভাব ও তদবিরের জোরে অনেক অযোগ্য শিক্ষকও অনায়াসে চাকরি পেয়েছেন।

নতুন সরকারি হওয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ের লেখাপড়ার মান বাড়াতে তাই নতুন উদ্যোগ নিয়েছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নতুন করে সরকারি হওয়া বিদ্যালয় ও আগে থেকেই সরকারি প্রাথমিকের শিক্ষকদের মধ্যে পারস্পরিক বা সমন্বয় বদলি করার নির্দেশ দিয়েছে সরকার।

২০১৩ সালে জাতীয়করণ হওয়া ২৬ হাজার ১৯৩টি বেসরকারি রেজিস্টার্ড প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা এত দিন অন্য সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বদলি হতে পারতেন না। এর ফলে এসব বিদ্যালয়ের শিক্ষার মান 'কাঙ্ক্ষিত মাত্রায়' নিয়ে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না জানিয়ে গত বুধবার প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় নতুন ও পুরনো বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের পার্শ্ববর্তী বিদ্যালয়ে সমন্বয় বদলি করে আগামী ১৫ কর্মদিবসের মধ্যে তা মন্ত্রণালয়কে জানাতে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরকে নির্দেশ দিয়েছে।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৩ সালে একযোগে ৩৬ হাজার ১৬৫টি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে জাতীয়করণ করেন। বঙ্গবন্ধু কন্যা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৩ সালে ২৬ হাজার ১৯৩টি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে সরকারি করে দেন। বর্তমানে বাংলাদেশে ৬৫ হাজার ৫৯৩টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে।

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কাছে পাঠানো প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ওই নির্দেশে বলা হয়েছে, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে প্রতিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মানসম্মত ও একীভূত শিক্ষা নিশ্চিতকরণে সরকার দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। কিন্তু লক্ষ্য করা যাচ্ছে, নতুন জাতীয়করণ হওয়া বিদ্যালয়গুলোতে শুধু আত্তীকরণকৃত শিক্ষকদের দ্বারা পাঠদান কার্যক্রম চলায় সেসব বিদ্যালয়ে শিক্ষার মান কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় নিয়ে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। প্রতিটি বিদ্যালয়ে মানসম্মত ও একীভূত শিক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে পুরনো সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও নতুন জাতীয়করণকৃত সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্যে সমন্বয় সাধন করা জরুরি বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট খবর

পরের
খবর

শোক সন্তপ্ত পরিবারের পাশে থাকার অঙ্গীকার আইনমন্ত্রীর


আরও খবর

বাংলাদেশ

ফাইল ছবি

  সমকাল প্রতিবেদক

পুরান ঢাকায় চকবাজার এলাকায় মর্মান্তিক অগ্নিকাণ্ডে হতাহতের ঘটনায় গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক।

এই প্রাণহানির ঘটনায় বৃহস্পতিবার এক শোক বার্তায় তিনি বলেন, ঘটনাটি খুবই মর্মান্তিক ও বেদনাদায়ক। শোক সন্তপ্ত পরিবারকে সমবেদনা জানানোর ভাষা আমার জানা নেই। তবে এই দুঃখের সময় আমি তাদের পাশে থাকার অঙ্গীকার করছি।

এ সময় নিহতদের রুহের মাগফেরাত কামনা করেন মন্ত্রী।

সংশ্লিষ্ট খবর